চৌদ্দ.
এর মাঝে আরো দু'জন ব্যাক্তির সাক্ষাতকার আমরা নিয়েছি। এক জন ইঞ্জিনিয়ার এস এম শহীদুল্লাহ অন্য জন স্থপতি কবি রবিউল হোসাইন।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রকৌশলী এস এম শহিদুল্লাহ ও তার এসোসিয়েটরা মিলে শুরু করেছিলেন শহিদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েট্স। ১৯৭৩ সালে এক দিন ভাষ্কর আবদুল্লাহ খালিদ গেলেন শহিদুল্লাহ সাহেবের অফিসে। গিয়ে বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ'র সহায়তায় কলাভবনের ঐতিহাসিক আমতলার সামনে মুক্তিযুদ্ধের একটা স্মারক ভাষ্কর্য্য স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সেই সেই ভাষ্কর্য্য নির্মান করবেন তিনি। এ কাজের জন্য কতৃপক্ষের বাজেট খুবই সামান্য, এটি নির্মানের ব্যাপারে সাহায্য চাইলেন শিল্পী এস এম শহিদুল্লাহ'র কাছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় কারারুদ্ধ ছিলেন শহীদুল্লাহ সাহেব, মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন আপন দুই ভাই কে। বিনা বাক্যে বিনা পারিশ্রমিকে রাজি হয়ে যান তিনি।

অপরাজেয় বাংলা নির্মান এর কারিগরিতে ছিল অভিনবত্ব। বাজেটের স্বল্পতার কারনে এটি নির্মানে বাংলাদেশে সেই প্রথমবারের মত নেয়া হয়ে ছিল এক নতুন পদ্ধতির। এ সম্পর্কে বলতে যেয়ে এস এম শহীদুল্লাহ বলেন, ... প্রথাগত যে মেটেরিয়াল যেমন মেটাল মার্বল বা খুব দামী ষ্টোন এগুলোতে যে খরচ পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তা এফোর্ট করতে পারে না। তো উনি(আবদুল্লাহ খালিদ) একটা নতুন আইডিয়া করেছেন কংক্রিট, রী ইনফোর্স কংক্রিট। সব চে কম দামী মেটেরিয়াল, সেটা দিয়েই করা যায় কিনা সেটা নিয়ে আলাপ করার জন্যই তিনি আমার কাছে আসলেন কত খরচে কি করা যায়? ... রী ইনফোর্স পদ্ধতিতে করলে মেইন একটা টেকনিক্যাল অসুবিধা আছে... যদি খুব ওভার সাইজ করে দি, ধরেন একটা কিউবই করে দিলাম তখন সেখান থেকে কেটে কেটে ভেঙ্গে বা খুড়ে বের করা ভাষ্করের পক্ষে খুবই কষ্টকর হবে। ... সো উইদ ইন হাফ এন ইঞ্চি ফ্রম দি সার্ফেস অব রিয়েল ষ্টাচু ঐ পর্য্যন্ত আমাকে ঢালাইটা করে দিতে হবে তাকে। তার পরে ১০ মিলিমিটারের মত খোদাই করাটা তার জন্য সুবিধা হবে। ... এক দম নতুন... পৃথিবীতে আর কোথাও রী ইনফোর্স কংক্রিটের ষ্টাচু নাই!
মজার ব্যাপার হলো অপরাজেয় বাংলা নির্মানের প্রথম দিকে ভারত থেকে চিন্তা মনি কর খবর পেয়ে দেখতে এসে ছিলেন এর নির্মান। সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ও বদরুল আলম বেনু উভয় কে তিনি তখন নাকি বলেছিলেন, তোমরা যা করতে চাইছ তা ত করা সম্ভব না। এ ভাবে ত ভাষ্কর্য্য নির্মান সম্ভব নয়! সেই অসম্ভব যে নির্মান করা গেছে তা ত আর কাউকে আজকের দিনে বুঝিয়ে দিতে হবে না কারো! আমাদের স্বাধীনতার মত সে সত্য সে দিন নির্মান করতে পেরেছিলেন আমাদেরই দেশের তরুনেরা। কি অদ্ভুত কি অদ্ভুত! এ সব কথার কিছুই কোন দিন শুনি নি, জানতাম না আমি। আজ যখনি অপরাজেয় বাংলার কাছে যাই একবার করে ঐ পাথরের বেদীটা আমি ছুঁয়ে আসি। আমার ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশের জন্য সেই সব দিনের মানুষদের ভালোবাসা'র এত টুকু পরশ একটু অনুভব যদি নিতে পারি! মনে মনে নিজেকে বলি, এ আমার পরশ পাথর।

১৯৭৩ এ কবি ও স্থপতি রবিউল হোসাইন রনাঙ্গনের অস্ত্র ফেলে সদ্য স্বাধীন দেশে নব উদ্দিপনায় শুরু করেছেন জীবন। তিনিও ছিলেন শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েট্স এর এক জন। যে বেদীর ওপর দাড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারক অপরাজেয় বাংলা, যে তিন কোনা বেদী মূলে আজকের প্রজন্ম এসে জড়ো হয়, দ্রোহে জ্বলে ওঠে, প্রেমে আকুল হয় সেই বেদীটির নকসা করেছেন রবিউল হোসাইন।

সেই সময়ে কবি বেলাল চৌধুরী সম্পাদিত সচিত্র সন্ধানীতে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের স্মারক ভাষ্কর্য্য গুলো নিয়ে একটি কভার স্টোরী লিখে ছিলেন রবিউল হোসাইন। তিনি বললেন এই ভাষ্কর্য্য নির্মানটি ও ছিল অভিনব। মূল মডেল টিকে ব্লো করে অনেক গুন বড় করা হয়। পুরো ঢালাইটি এক সাথে করা হয়নি। পুরো ফর্মাটি এক সাথে তৈরী করা অসম্ভব। শহীদুল্লাহ সাহেব করলেন কি ছয় ইঞ্চি ছয় ইঞ্চি অন্তর অন্তর কাটলে যে প্রেফাইটা হয় সেটাকে পেপারে একে কার্ডবোড দিয়ে ফর্মা তৈরি করে তরপর ঢালাই করলেন তিনি। ভেতরে লোহার রড তাকে কেন্দ্র করে ছয় ইঞ্চি করে করে ঢালাই দিয়ে ওঠানো হয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। বলা যায় এই শিল্প কর্মটি নির্মান ক্ষেত্রে প্রকৌশল বিদ্যা, স্থাপত্য বিদ্যা এবং ভাষ্কর্য্য বিদ্যার এক অভিনব সন্নিবেশ।
জাহানারা গার্ডেনের শহীদুল্লাহ এন্ড এসোসিয়েট্স এর অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সেদিন কত কি মনে হতে লাগল আমার! ফার্মগেটের দিকে যাবার পথে দুনিয়ার কোচিং সেন্টার। রাস্তার ওপর গিজ গিজ করছে মানুষ। সবাই ছুটছে। গাড়ীর হর্ন, রিক্সার এলোমেলো জট, বাস অলাদের হাকা হাকি, ফুট পাথের দোকানির জিকিরঃ একশো, একশো, একশো... টেলিফোন কম্পানীর জায়েন্ট জায়েন্ট বিলবোর্ড গুলোতে দেশপ্রেমের নানা নসিহত দেখে কেবল মনে হতে থাকে আমার দেশাত্ববোধ কি কোন দিন বিক্রয় যোগ্য পন্য হতে পারে?
(ছলিবেক)
মূর্তি লইয়া আমার প্রামান্য কথন: অপরাজেয় বাংলা (১ থেকে ১৪ এবং + )
ওয়েব ঠিকানা,
অপরাজেয় বাংলা
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মে, ২০০৯ রাত ১২:০২