ক'দিন আগে দৈনিক 'প্রথম আলো' পত্রিকা থেকে আমাকে যোগাযোগ করে আমার 'লোহাখোর' ছবিটি নিযে় একটি স্বাক্ষাৎকার দেযা়র জন্য অনুরোধ করা হয়। তাঁরা শনিবারে প্রকাশিতব্য "ছুটিরদিনে"(১৬ই জানুযা়রী ২০১০) স্বাক্ষাৎকারটি ছাপতে চান। আমি রাজি হওযা়য় ই-মেইলের মাধ্যমে আমাকে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয় যার উত্তর আমি লিখে পাঠাই। দু'দির পর আমার এক বন্ধু পত্রিকার অংশবিশেষ আমাকে স্কান-করে পাঠালেন। আমি তাতে যা দেখলাম তাতে হাঁসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। প্রথমত আমার নামটাই তারা বিকৃত করে ছাপলেন। আর তার নিচে যা চাপা হযে়ছে তাতে আমার বক্তব্যের আশি ভাগ অংশই নেই। আমি নিচে (( ))-চিহ্নের ভেতর সেঅংশগুলো উল্লেখ করলাম। 'প্রথম আলো' এসব কথা ছাপবে এটা আশাকরাটাই বোধহয় আমার ভুল হযে়ছে। লখ্য করে দেখুন কোন কোন অংশগুলো "প্রথম আলো" ছাপেনি। এই নোটটি দাযা়করে আপনাদের প্রোফাইলে পোস্ট করবেন। আমি সবাইকে বাপারটা জানাতে চাই।
________________________ :
প্রশ্নঃ 'লোহাখোর' ছবিটি তৈরীর ধারনাটা আপনার প্রথম মনে আসে কিভাবে?
আমি যখন খুব ছোট ছিলাম আমার বাবা তখন সিতাকুন্ডের কাছে কাশেম জুটমিল-এ সিভিল ইন্জিনিযা়র হিসেবে কাজ করতেন। সেই সময় থেকেই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের কথা জানতাম। ঐ এলাকায় বাইরের কারো প্রবেশাধিকার ছিলনা কিন্তু ভেতরে কী ঘটছে না ঘটছে তার অনেক খবরই বাইরে বেরিযে় আসত। তার বহুদিন পর আমি যখন আমার প্রথম পূর্নদৈর্ঘ ছবি "জীবন জলেবেলে" তৈরী শুরু করি তখন উত্তরবঙের অনেক কৃষকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় যারা চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙ্গার কাজ করতেন। তারাই আমাকে এই কঠিন কর্মক্ষেত্রের অনেক লোহর্শক গল্প শোনান। ঐ গল্পগুলো শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম এই সহজ-সরল মানুষগুলো, যারা কযে়কশ বছর ধরে ব্রম্মপুত্র নদীর অববাহীকার নরম মাটিতে ফসল ফলিযে় জীবন কাটিযে়ছে তারা কীভাবে কঠিন লোহালক্কড় আর আগুনের ভেতর মাসের পর মাস বেচে থাকে। মূলত এই কৌতুহল থেকেই "লোহাখোর" ছবিটির যাত্রা শুরু। সেটা ছিলো ১৯৯৯ সালের কথা। তার পর অনেক চডা়ই-উত্রাই পেরিযে় দেশে বিদেশে অসংক্ষ মানুষের স্বকৃয় সহযোগীতার ফলে ২০০৫ সালের জানুযা়রী মাসে এ ছবির কাজ আমরা শুরু করি এবং ২০০৭ এ এসে এর সম্পাদনার কাজ শেষ হয়।
প্রশ্নঃ বাংলাদেশের জাহাজ-ভাংঙ্গা শিল্পকে আপনি নিজে কীভাবে দেখেন?
আমরা যখন শুটিংএর কাজ শুরু করি। এক ইযা়র্ডের মালিক আমাকে বলেছিলেন।"এটা হচ্ছে ভাই আকটা নর্দমা। নর্দমার কাজ খুব নোংরা কাজ। কিন্তু আমরা স্বেচ্ছায় এর দ্বায় দাযী়ত্ব নিযে়ছি যাতে পয়সা কামানো যায়। কিন্তু যারা আমাদেরকে দিযে় এই কাজটা করান এবং বিশাল অঙ্কের টাকা আয় করেন তাদেরও কিছু দায়-দাযী়ত্ব আছে। তবে তাদের কাউকে আপনি খুজে পাবেন না। আমাকে খুব সহজে খুজে পাবেন।" (( ভদ্রলোক খুব সংক্ষেপে বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের অবস্থা এবং প্রেক্ষাপটের বর্ননা দিলেন। এই শিল্পের শুরু হযে়ছিলো পাশ্চাত্তে, কিন্তু খরচ বাচিযে় সস্তায় কাজটি করিযে় অধিক মুনাফা লাভ করার উদ্দেশ্যেই তথাকথিত উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের ব্যবসাযী়রা শিল্পটি এই উপহাদেশে রপ্তানি করেন। একই কারণে তৈরীপোষাক শিল্প, ঔষধ শীল্প অন্যান্য শীল্পও এদেশে এসেছে। যতদিন পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের দিযে় এই কাজগুলো ন্যাজ্জমূল্য না দিযে় করিযে় নেবেন ততদিন এদেশের শিল্পাঙ্গনে শ্রমিকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবেনা। )) "লোহাখোর" ছবিটি আমরা ব্রাসেল্সে ইউরোপিযা়ন পার্লামেন্টেও দেখিযে়ছি। European Commission-এর Environmental Commissioner Stavros Dimas ২০ মিনিট দেখতে এসে পুরো ৯০ মিনিটের ছবিটিই দেখলেন আর শেষে আবেগাপ্লুত কন্ঠে বক্তব্য রাখলেন। কিন্তু পরে আমি অনেক NGO-প্রতিনিধীর সাথে কথা বলে জানতে পেলাম যে এরকম বক্তব্য তারা গত কুডি় বছর ধরেই শুনছেন। (( এই সাহায্যসংস্থাগুলোর দাবি ছিলো, ই ইউ যাতে শিপিং ব্যাবসার সাথে জডি়ত আন্তর্জাতিক ব্যাবসাযি়ক প্রতিষ্ঠান, বিশেষকরে IMO (International Maritime Organization)-এর , যারা মুলত জাহাজভাঙ্গা শিল্পটি পরোক্ষ ভাবে নিয়ন্ত্রন করে, ওপর চাপ দেয়. কিন্তু EU সেটা করতে নারাজ। আমার ধারনা World Bank আর IMF যেকারণে প্রায়শই তাদের বিভিন্ন চুক্তিপত্রে আমাদের দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেননা, IMO ঠিক একই কারণে আমাদের দেশের জাহাজ-ভাঙ্গা শিল্পের অবস্থার কোন পরিবর্তন চাননা। এই ইন্ডাস্ট্রির মধ্য দিযে় পশ্চিমা ব্যবসাযী়রা যে বিশাল মুনাফা লাভ করেন তাতে টান পড়উক এটা IMO কখনই চাইবেনা। কারণ এই ব্যবসাযী়দে স্বার্থ দেখাটাই IMO-র মূল কাজ। ই ইউ কেন এই ব্যাপারে নাক গলাতে চায়না সেটা বোঝাও খুব কঠিন নয়। বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প যদি নর্দমা হয় তাহলে যে মানুষগুলো সেখানে কাজ করেন তারা হলেন এই নর্দমার কীট। দু'একটা কীটের মরা-বাচায় কারো বিচলিত হাবার কথা নয়। পরিবেশ দুষনের দিক থেকে বলুন আর শ্রমিকের অধিকার হরনের দিক থেকে বলুন আমাদের দেশের পুঁজীপতিদের আচরন সব শিল্পেই একরকম। তেলের জাহাজ-ভাঙ্গতে গিযে় পুডে় মরা আর রেংস-ভবন ভাংতে গিযে় লাশ হযে় ঝুলে থাকার মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখিনা। এর মূল কারণ শ্রমিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এবং এই আচরনের কথা পশ্চিমা বিশ্ব খুব ভালো করেই জানেন। পশ্চিমা ব্যবসাযী়রা যেহেতু আমাদের শ্রমিকদের দিযে় জাহাজ-ভাঙ্গার কাজটা কারান সেহেতু এরা তাদেরও শ্রমিক। ))
প্রশ্নঃ ইযা়র্ডে শ্রমিকদের সাথে আপনার কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?
(( পি. এইচ. পি - ইযা়র্ডে শ্রমিকরা এবং একই সাথে মালিকপক্ষও এই ছবির কাজে আমাদের প্রত্যাশার বাইরে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের এই আন্তরিক সহযোগিতা না পেলে এ ছবি এভাবে নির্মান করা কখনোই সম্ভব হতনা। কাজের সময়, খাবার সময়, ঘুমের সময়, মোটকথা দিনের এমন কোন সময় ছিলোনা যখন আমরা ক্যমেরা নিযে় শ্রমিকদের সাথে ছিলাম না। কিন্তু তারা কোনদিন এর জন্যে বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করেননি। এই গাঙ্গেয়-দ্বীপের মানুষ যে মূলত মাযা়-মমতা দিযে় গডা় এই সত্যটা কাজ করতে গিযে় আরেকবার গভীর ভাবে উপলব্ধি করলাম। ))
প্রশ্নঃ এ ছবি'র চিত্রগ্রহনের সময়কার এমন কোন ঘটনার কথা কী মনে পডে় যা আপনার স্মৃতিতে রেখাপাত করেছে?
(( একবার এক তেলের ট্যাংকারে শুটিং করতে গিযে় ভেতরে আগুন ধরে যায়। আমরা কোন রকমে শেষ মুহূর্তে প্রাণে বেঁচে যাই। কিন্তু আমারা যখন প্রাণ ভযে় পালাচ্ছিলাম, গ্যাস-কাটাররা তখন এমন অট্টহাঁসিতে ফেটে পড়ল যে আমারা ছবির দলের সবাই একটু ভ্যাবা-চেকা খেযে় গেলাম। যখন জানতে চাইলাম হটাৎ এত হাঁসির কী হল, তার উত্তরে তারা জানালেনঃ কোন মানুষকে এতটা ভয় পেতে তাঁরা নাকি এর আগে কোনদিন দেখেননি। আমাদের আস্বস্ত করার জন্য একজন বললেন, দূর্ঘটনা আর আগের মত হয় না। তারা এখন অনেক সাবধানে কাজ করেন।আগুন লাগলেও জান-মালের তেমন একটা ক্ষতি হয় না। আমি তখন প্রশ্ন করলামঃ "তাহলে এখানে কিছুদিন পর পর মানুষ মারা যায় কেন?" মুখে হাঁসি ফুটিযে় সে তরুন তখন জবাব দিলেনঃ "আমরা যে এইহানে অহনো বহুত মানুষ বাইচা আছি এইডা যাতে আপনারা টের পান এর লাইগা মাইজে-মইদ্দে আমরা দুই-এক জন মইরা যাই। আপানারা সাম্বাদিক-ভাইরাতো আমরা না মরলে আমাগো খবর লননা। আমরা কেমনে মরলাম এইডাই খালি আপনেরা জানবার চান, কিন্তু আমরা যে কেমনে বাইচা আছি এইডার খবর কি আপনেরা কোনদিন নিছেন?" নিরক্ষর এই মানুষটি নিজের অজান্তেই রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেছিলেন। সেদিনের সেই দুর্ঘটনা আর তাঁর কথাগুলো আমার আজীবন মনে থাকবে। আজ আমাদের সবার কাম্য হওযা় উচিত যাতে এই মানুষগুলোকে বার বার মরে প্রমাণ করতে না হয় যে তাঁরা এখনো বেঁচে আছেন।))
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৮:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


