ইসমাত মৌসুমী
শারমিন সুলতানা (আসল নাম নয়) বিষণ্ণমুখে বসে ছিলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারে অপেক্ষমাণ রোগীর জন্য নির্ধারিত চেয়ারে। ৩৬ বছরের এই নারী এখনো বিয়ের সুযোগ পাননি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হওয়ার দুর্ভাগ্য তাকে সব দিক থেকে চেপে ধরেছে। বড় দুই ভাই বিয়ের পর থেকে আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মা আর ছোট দুই বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে চাকরির পাশাপাশি টিউশনি করেন শারমিন। দুই বছর আগে কিছু সমস্যা দেখা দেয়ায় চিকিৎসকের কাছে আসেন শারমিন। ডান দিকের স্তনে একটা টিউমার হয়েছে। প্রায় সময়ই ব্যথা অনুভব করেন শারমিন। এক বছর যাবৎ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আছেন। শারমিন মাঝে মধ্যেই জানতে চেয়েছেন তিনি সুস্খ হয়ে উঠবেন কি না। ডাক্তার হেসে আশ্বাস দিয়েছেন কিন্তু তার পরিস্খিতি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছেন। শারমিন নিজে কোনো পরিবর্তন অনুভব করছেন না। এ জন্য শঙ্কাও কাটছে না তার।
হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে এসেছেন রহিমা বিবি। আট মাস আগে প্রথম এসেছিলেন হাসপাতালের আউটডোরে। ডান হাতের বগলের নিচে ছুলে গেছে অনেকখানি জায়গা। সেই সাথে পুরো হাতে ও ঘাড়ে ব্যথা। ডান দিকের পাঁজরেও মাঝে মধ্যে ব্যথা করে। আউটডোরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। স্তন ক্যান্সার। ছড়িয়ে গেছে বেশ অনেকখানি এলাকায়। ৬০ বছর বয়সী রহিমা বিবির মায়েরও এই সমস্যা ছিল। মা মারা যাওয়ার আগে ডান হাত ফুলে গিয়ে প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল। মাথায়ও ছিল প্রচণ্ড ব্যথা। শেষের দিকে ব্যথার জন্য চোখে দেখতেন না রহিমা বিবির মা। চিকিৎসকরা ধারণা করছেন, জেনেটিক অ্যাবনর্মালিটি ছিল তার মায়ের, যা মায়ের দেহ থেকে মেয়ের শরীরে এসেছে। রহিমা বিবিকে ওষুধ দেয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা তার দুই মেয়েকেও পরীক্ষা করিয়ে নিতে বলেছেন।
লিলি আফরোজের ২২ বছর বয়সে স্তনে টিউমার ধরা পড়ে। তখন তার বিয়ে হয়নি। লিলিদের পরিবার খুব একটা শিক্ষিত নয়, তবে সচ্ছল। লিলির মা ভেবেছিলেন এটা কোনো গোপন রোগ, তাই কাউকে না জানিয়ে একা একা মেয়েকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। ধরা পড়ে টিউমার, তবে আর্লি স্টেজের। চিকিৎসকরা তা অপারেশন করে ফেলে দেন। এরপর লিলির বিয়ে হয়। দুই সন্তানের মা হন। ছেলেদের বয়স যখন ১৩ ও ১০ বছর তখন আবার বুকে ব্যথা অনুভব করেন। দুই পাশেই। লিলি বিশেষজ্ঞ চিকিৎকের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় যে, শরীরের বেশ অনেক স্খানেই ছড়িয়ে গেছে ক্যান্সারের শিকড়। রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে হাতে, পায়ের ওপরের অংশে, গলার কাছে কিছু অংশও আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সার্জারির সময় পার হয়ে গেছে। লিলি আফরোজ অবশ্য এতটা জানেন না। তবে অনুভব করেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে তার শরীর। শুয়ে-বসে কোনো কিছুতেই শান্তি পান না তিনি।
এ দেশে প্রতি বছর ২২ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই সংখ্যা কম নয়, বরং আশঙ্কাজনক। স্তন ক্যান্সারও ক্যান্সারের সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে এটিকে শনাক্ত করা না গেলে সারা দেহে ছড়িয়ে যায় এর শেকড়। তখন আর উপড়ে ফেলা সম্ভব হয় না। বরং জীবনের মেয়াদ কিছু বাড়িয়ে দিতে চিকিৎসকরা ওষুধ দিয়ে এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করেন। ক্যান্সার দুরারোগ্য ব্যাধি। এ জন্য প্রতিষেধকের চেয়ে প্রতিরোধ করতে পারার ব্যাপারে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
প্রকৃতি তার স্বভাবমতো একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে, যার ছন্দ নারীদেহের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক নিয়মের এতটুকু ছন্দপতন ডেকে আনে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি।
বয়স : যে মেয়েদের পিরিয়ড তাড়াতাড়ি শুরু হয় এবং মেনোপজ অর্থাৎ মাসিক বìধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি দেরি করে ঘটে তাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাভাবিক সময় হচ্ছে ১০-১১ বছর থেকে শুরু হয়ে ৪৯-৫০ বছর পর্যন্ত পিরিয়ড থাকা।
ভৌগোলিক সীমারেখা : স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ভৌগোলিক সীমারেখায় বিভিন্ন মাত্রার হয়ে থাকে। যেমন প্রতি এক লাখ নারীর স্তন ক্যান্সার হওয়ার হার জাপানে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, চীনে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, আবার ইংল্যান্ডে ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ, স্কটল্যান্ডে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উত্তর আমেরিকায় এই হার ৯০ দশমিক ৭ শতাংশ বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ নারীর ক্ষেত্রে। জরিপে দেখা গেছে, যেসব জাপানি বা চীনা নারী যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার হওয়ার হার মার্কিন নারীদের মতোই। কেননা এ ক্ষেত্রে অভিবাসী নারীদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ও লাইফস্টাইল মার্কিনিদের মতো হয়ে যাওয়ায় স্তন ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও মার্কিনিদের পর্যায়েই পৌঁছেছে।
রিপ্রোডাকটিভ ফ্যাক্টরস : অর্থাৎ বয়স এবং রিপ্রোডাকটিভ সময় এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের মেনোপজ ৪৫ বছরে হয় তাদের চেয়ে যাদের ৫৫ বছরে মেনোপজ হয় তাদের ঝুঁকি দশ গুণ বেশি অর্থাৎ প্রতি দশ বছরে ঝুঁকি দ্বিগুণ হারে বাড়ে।
প্রথম গর্ভধারণকাল : যারা প্রথম সন্তান নিচ্ছেন ৩০ বছর বয়সে বা তার পরে, তাদের ঝুঁকি দ্বিগুণ। যাদের সন্তান ৩০ বছরের আগে হয় তাদের ঝুঁকি কম থাকে বা অনেক সময় এরা ঝুঁকিমুক্ত থাকে। এখন অনেক নারী ৩৫ বছরে বা তার পরে বিয়ের আসনে বসছেন, তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কতখানি থাকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। সর্বোপরি এদের গর্ভধারণের জটিলতাও বহু গুণ বাড়ে।
ইনহেরিটেড রিস্ক : দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ১০ শতাংশ নারীর স্তন ক্যান্সারের কারণ তার বংশানুক্রমিক উপাদান অর্থাৎ মায়ের জেনেটিক অ্যাবনর্মালিটি ছিল কিন্তু তার কোনো ক্যান্সার হয়নি। তিনি জেনেটিক অ্যাবনর্মালিটি নিয়েই সুস্খ জীবন কাটিয়ে গেছেন। কিন্তু মেয়ের মধ্যে এই জেনেটিক অ্যাবনর্মালিটি ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। ক্যান্সার সংক্রামক নয়, কিন্তু বংশগত কিছু উপাদানের কারণে এ ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়। দু’টি জিনকে স্তন ক্যান্সারের জন্য শনাক্ত করা গেছে, তা হচ্ছে বিআরসিএ-১ ও বিআরসিএ-২। এর বাইরে সুনির্দিষ্ট আর কোনো জিনকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ব্রেস্ট ডিজিজ : কারো বুকে হয়তো কিছু সমস্যা ছিল যা চিকিৎসার পরে সেরে গেছে কিন্তু দেখা গেছে, এ ধরনের নারীরা পরবর্তী জীবনে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন অনেকেই। এটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কিশোর বয়সে কারো স্তনে সমস্যা দেখা দিলে তাকে পরবর্তী জীবনের আশঙ্কার জন্য সাবধানে থাকতে হবে।
রেডিয়েশন : রেডিয়েশন এক্সপোজার যেকোনো ক্যান্সারের ঝুঁকিকেই বাড়িয়ে তোলে। স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও এতে বেড়ে যায়। যেমন টিউমারকুলোসিসের জন্য যদি এক্স-রে করা হয় তা হলে তা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। কেননা এক্স-রের সময় তেজস্ক্রিয় রশ্মির আওতায় বুকের অনেকখানি অংশ চলে আসে।
লাইফস্টাইল : স্তন ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো লাইফস্টাইল। এখন অনেকেই চর্বিজাতীয় খাবার বেশি খান, বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে। এটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর তো বটেই, স্তন ক্যান্সারের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যারা সবজি খান তাদের এই ঝুঁকি অনেকটা কম থাকে। কোল্ডড্রিংকস, ফাস্টফুড এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ওজন : শরীরের ওজন বেড়ে গেলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ে। ওজন বাড়তে দেয়া ঠিক নয়, অর্থাৎ খাবার নিয়ন্ত্রণ করা সেই সাথে ব্যায়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মেনোপজের পর ওজন বৃদ্ধি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির কারণ।
অ্যালকোহল : কিছু কিছু জরিপে দেখা গেছে, অ্যালকোহলের সাথে অর্থাৎ যেসব নারী মদ পান করেন তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। তবে এর কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
হরমোন : যেসব নারী দীর্ঘমেয়াদি কনট্রাসেপটিভ পিল খান অর্থাৎ দীর্ঘ সময় জন্মনিয়ন্ত্রণের ট্যাবলেট খান তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। পিল খাওয়া ছেড়ে দিলেও পরবর্তী ১০ বছর পর্যন্ত এই নারীরা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির মুখে থাকেন। এ জন্য দীর্ঘ সময় পিল খাওয়া ঠিক নয়। তবে পিলের উপাদান, খাওয়ার মেয়াদ, মাত্রা এবং আরো কিছু বিষয় এর সাথে জড়িত। যারা খুব কম বয়সে পিল খাওয়া শুরু করেন তারা ঝুঁকির মুখে থাকেন বেশি।
হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি : হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (এইচআরটি) বিভিন্ন কারণে দেয়া হয়; কিন্তু মেনোপজের পরে যখন নারীদেহে হরমোনের মাত্রা কমে যায় তখন এইচআরটি দেয়া হয় শারীরিক সুস্খতার জন্য। কিন্তু এটি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি জরায়ুতেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় একই সাথে। এ জন্য এইচআরটি চলাকালে নির্ধারিত সময়ে শারীরিক সুস্খতা ঠিক থাকার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
অক্টোবর মাস ছিল স্তন ক্যান্সারের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির মাস। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ কোম্পানি সানোফি এভেন্টিস এ দেশে স্পোর্টস উইমেনদের সাথে এ বিষয়ে একটি যৌথ কর্মসূচি পালন করে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা। মানুষ সজাগ থাকলে অনেক সমস্যাই প্রাথমিক পর্যায়ে কাটিয়ে ওঠা যায় যা বেশি দেরি করে ফেললে আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। সানেফির রয়েছে রিসার্চ ল্যাব, যেখানে স্তন ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত আছে। সানোফি এভেন্টিসের অনকোলজি ম্যানেজার ডা. মাহমুদ আবেদিন খান কথা বলেছেন এ বিষয়ে। তার মতে, ফিমেল জেন্ডারই ঝুঁকিপূর্ণ, এ জন্য নারীদের নিজের শরীরের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
আর্লি পিরিয়ড ও লেইট মেনোপজ যাদের, তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
হাইফ্যাটি ডায়েট স্তন ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, তা এড়িয়ে চলা উচিত।
যে দেশে গড় ফ্যাট কনজাঙ্কশন বেশি, সেখানে ক্যান্সারের হার বেশি।
শাকসবজি স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
রেডিয়েশন এক্সপোজার ঝুঁকি বাড়ায় তাই খুব প্রয়োজন না হলে রেডিয়েশন এক্সপোজার নয়। অ্যাওয়ারনেস বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর হার কমেছে এটা আশাব্যঞ্জক। প্রাচীন আমলে নাইফ, ছাট ও ফায়ার দিয়েও ক্যান্সার চিকিৎসা হতো যা এখন সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন নামে অভিহিত। সানোফি-এভেন্টিস এ বিষয়ে তাদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছে, যা নতুন সম্ভাবনা ডেকে আনছে।
ক্যান্সার মানে কষ্টকর মৃত্যু, তা যে ক্যান্সারই হোক না কেন। একটা পর্যায়ে কোনো ওষুধই কাজে আসে না। তখন ক্যান্সারের শিকড় শারীরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে ব্যাহত করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। জীবন যে রকম সত্য, মৃত্যুও ঠিক সে রকমই সত্য তবে অবশ্যই তা স্বাভাবিক মৃত্যু। ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতনতা, খাবারের নিয়মের প্রতি সচেতনতা, জীবনযাপনের ধরন যদি পজিটিভ হয় তাহলে শুধু স্তন ক্যান্সার কেন, অনেক রোগ থেকেই দূরে থাকা ও নিরাপদে থাকা সম্ভব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



