somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সত্যের মত একটি গল্প....

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ৯:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সদ্য বিবাহিতা মেয়েটির দিন যায় শ্বশুরের মুখে নানারকম মজার মজার গল্প শুনে আর শাশুড়ীর জন্য পান বানিয়ে। মাঝে মাঝে একটু সংসারের ঝুট ঝামেলা সামাল দিতে হয়। ছোট দেবরটা মাত্র ক্লাস টুতে পড়ে, ননদটা ক্লাস সিক্সে আর মেজ দেবর তার সমবয়সী ....মেয়েটার সারাদিনের সাথী এই পাঁচজন মানুষ । মেজটার সাথে সারাদিন কথাকাটাকাটি, ননদের সাথে গুটুর গুটুর গল্প আর ছোটটা সারাদিন আঁচল ধরে বসে থাকে আবদার করার জন্য। এত আনন্দের মাঝে থেকেও প্রতিটি পড়ন্ত বিকেলে মেয়েটা জানালার ধারে মন খারাপ করে বসে থাকে। তার চোখে থাকে শূণ্যতা...মনে অজানা ভয়। তার সবচেয়ে আপন মানুষটাযে বহুদূরে। চিঠি লিখলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়না। এদিকে তারা সবাই এ বাড়ি ছেড়ে অন্যকোথাও চলে যাবে। সে যদি ফিরে এসে দেখে দরজায় তালা তাহলে বেচারা কি করবে! দেশের পরিস্থিতিও খুব খারাপ.......সে কবে ফিরবে?

ছেলেটি তখন চাকরীর সুবাদে ঢাকায়। অসুস্থ শরীরে পালিয়ে বেড়ানো জীবন...অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে...মেসের মালিক সবাইকে মেস ছেড়ে দিতে বলেছে...পকেটে একটা কানাকড়িও নেই। কারো কাছে হাত পাতার মত অবস্থাও এখন নেই। সবারই একই পরিস্থিতি। বারবার বাড়ির কথা মনে পড়ে। প্রিয়জনদের কথা মনে পড়লেই ডুকরে কেঁদে উঠে ছেলেটি.....। নতুন বউটির চেহারা প্রতি মুহুর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠে.......সে কি বেঁচে আছে? ছেলেটি কোন চিন্তাভাবনা ছাড়াই বাড়ির পথে হাটা শুরু করে। হেটে হেটে ঢাকা থেকে কোন এক অজপাড়াগাঁয়ের উদ্দেশ্যে। কিন্তু মাঝপথে ছেলেটি একটা মুক্তিসেনার দলে ভিড়ে যায়।

১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। তারপর একে একে মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ি ফিরতে শুরু করলো। কেউ কেউ এসে ঘরটা শূণ্য পেল। সবাই ফিরে আসে...পাশের বাড়ির কলিম, ঐ বাড়ির কামরুল, জামিলার বাবা জহির.....কিন্তু সে আসেনা। তার কোন খবর নেই। তার খবর কেউ দিতে পারেনা। ছেলেটি সম্পর্কে কেউ জানতনা। চাকরীর কারণে সে থাকত ঢাকায়। তার মেসের মালিকের কাছে খবর জানতে গেলে সে বলে ছেলেটি একদিন রাতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল....তারপরের ঘটনা সে জানেনা। হয়ত ঢাকায় সে পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে নিহত হয়েছিলো অথবা রাজাকাররাই তাকে ধরিয়ে দিয়েছিলো অথবা অন্য কোন উপায়ে সে নিখোঁজ। এখন শুধু কান্নাই মেয়েটার নিত্যসঙ্গী। মেয়টা তবুও জানালার ধারে লোহার শিক আঁকড়ে ধরে বসে থাকে।

মার্চ মাস ১৯৭২। মেয়েটার শ্বশুর আর বাবা মেয়েটাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেয়ার কথা চিন্তা করতে থাকেন। মেয়েটি কিছুই বলতে পারেনা। শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়েটিকে নিয়ে যায় তার বাবা মা। যাওয়ার আগে মেয়েটি একটা শার্ট লুকিয়ে ব্যাগে ভরে নিল। সবকিছু ছাপিয়ে তার মনের গহীন কোণে কোথায় যেন আশার প্রদীপ জ্বলতে থাকে। সৃষ্টিকর্তা এত নিষ্ঠুর হতে পারেনা।

৩৭ বছর হয়ে গেলো। সে ফিরে আসেনি। ৫৫ বছরের নিঃস্বঙ্গ মেয়েটি এখনো বিশ্বাস করে সে বেঁচে আছে। ৭২ এর এপ্রিলে তার দ্বীতিয় বিয়ের আগের দিন রাতে মেয়েটি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় পাশের গ্রামে তার খালার বাড়িতে। তারপর অনেক ঘটনাবহুল জীবন তার।

এটা সত্যের কাছাকাছি একটি গল্প। হয়তবা কারো সাথে মিলেও যেতে পারে। আমরা কতজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের কথা জানি?

২৬ শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বর এলে তাঁর প্রতি এবং তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হয়ে যায় (আমরা এটা ছাড়া কিছু কি আর পারি?)।
কিন্তু যখন দেখি এই মহিলাটিই রাস্তায় ফুটপাথে শুয়ে শুয়ে ভিক্ষা করে...তার মাথার নিচে ময়লা একটা শার্ট আর তার পাশ দিয়ে রাজপথে ছুটে চলে কোন এক রাজাকারের বি এম ডব্লু....তখন কেমন লাগে?

১৪ই ডিসেম্বর চ্যানেল আইতে মো.সা.ফারুকীর টেলিফিল্ম "এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি..." দেখলাম। সেখানে একটা দৃশ্যে কখগ নামক রাজাকার পার্টির চেয়ারম্যানের পুত্র নামাজের মোনাজাতে বলছে "হে আল্লাহ তুমি আমার বাবাকে ভালো মানুষ করে দাও। সে যেন মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে।" দেশের সকল রাজাকারের পুত্রকন্যারা কি এভাবে মোনাজাত করে?





সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৪০
৩৩টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×