somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সায়েন্সব্লগ ২: চোখটিপের বিজ্ঞান

১৭ ই আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চোখটিপের আর পলক পড়ার মাঝে কি পার্থক্য? যেকাউকে প্রশ্নটা করলেই ত্বরিৎ জবাব চলে আসবে, 'চোখটিপ একচোখে দেয়।' এখন যদি ত্যানা প্যাঁচাই, যদি বলে, 'কারও যদি শুধু একচোখেই পলক পড়ে, তাহলে?' ... সমস্যা নেই, উত্তর আছে ...'সময়ের দৈর্ঘ্য' ... চোখের পলক নিমিষেই পড়ে ... চোখটিপ বা উইংক দিতে হয় একটু সময় নিয়ে।

মনে করার চেষ্টা করুন প্রথম কবে উইংক করেছিলেন, কেমন ছিল সে ঘটনাটা? মনে করতে করতে আপাতত চোখটিপকে বিদায় দিই।
এর কাছাকাছি ব্যাপারগুলো নিয়ে একটু পড়াশোনা করি, শেষে আবার চোখটিপের কথায় ফিরে আসব।

***************************************
এডিসনকে নিয়ে একটা মুভি হয়েছিল, যেখানে দেখাননো হয় যে এডিসন তাঁর তৈরী 'কাইনেটোস্কোপ' বা সহজে বললে ভিডিও ক্যামেরা প্রথম ব্যবহার করতে যাচ্ছেন, ক্যামেরার সামনে একব্যাক্তি বসে আছেন (অনেক আগে দেখেছি কে, কেন বসেছিলেন কিছুই মনে নেই), এডিসন যেই ক্যামেরা অন করলেন, অমনি লোকটা দিল এক 'হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ--চ্চো!!'
জানিনা সত্যি কিনা, সত্যি হলে মানুষের তোলা প্রথম মোশন পিকচারটা হবে হাঁচি দেয়ার

আসলে তা না, তার অনেক আগেই মাইব্রিজ নামক আরেক নাইনটিন্থ সেঞ্চুরী গীক (বাংলায় কি আঁতেল বলা যায়, একটু ভিন্ন) বের করে ফেলেছিলেন বিদঘুটে নামের "জু ...স্কোপ' (নামটা মনে নেই)। তো এই মাইব্রিজ মহোদয়ই খেয়াল করেছেন যে স্থিরছবির একটা সিরিজকে খুবদ্রুত শাটার ফেলে প্রদর্শন করলে সেটা চলমান একটা দৃশ্য হয়ে যায়। সেই থেকে মুভির শুরু, আজ মুভি দেখে মানুষ হাসে, কাঁদে, ভালবাসে, প্রত্যয়ী হয়, আরো কতকিছু। ধন্যবাদ সেইসব গীকদের।

তো, মুভির ব্যাপারে আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, এর ভুলগুলো। একই সিকোয়েন্সের সবগুলো দৃশ্য সবসময় একটানে নেয়া হয়না, তো যখন পুরোনো দৃশ্য আবার নেয়া হয়, মুভি এ্যাসিস্ট্যান্টরা যারপরনাই ব্যাস্তব থাকেন যাতে অবিকল আগের সেটটি তৈরী হয়, কিন্তু মানুষ বলে কথা, ভুল থাকবেই। মজার ব্যাপার হলো সবাই সেই ভুলগুলোকে ফ্রেন্ডলি/স্পোর্টিলি নেয়, টিকেটের দাম ফেরত দিতে হবে বলে রাস্তায় বেরোয়না। হলিউডের মুভিগুলোতে এরকম সিকোয়েন্সের ভুলের স্ক্রীনশটওয়ালা ই-মেইলগুলো কমবেশী সবাই পেয়েছেন, মাঝখানে এত বেশী আসত একটু বিরক্ত ছিলাম, ভাবতাম আসলেই দর্শকদের রাস্তায় নামা উচিত, এত এত ভুল করবে আর গাদাগাদা পয়স হাতিয়ে নেবে সেটাতো হয়না, হলোই বা পুঁজিবাদী সমাজ। কিন্তু মানুষ রাস্তায় নামেনা, কারণ যখন সে মুভি উপভোগ করে তখন এই সামান্য ভুলগুলো পুরোপুরি তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, কোন সমস্যাই হয়না। কেন হয়না, কারণ মুভি খুব ফাস্ট, এত অল্পসময়ে এসব সুক্ষ্ণভুল ধরা মানুষের পক্ষে সম্ভব না। সত্যি বলতে কি, মুভিতে তো আরও বড় সমস্যাই আছে। মুভি হলো একগাদা স্থিরচি্ত্রকে পরপর দেখানো, খুব দ্রুত। এরকম একগাদা স্থিরচিত্রকে পরপর দেখানো হলে আমাদের কাছে সেটা কন্টিনিউয়াস মনে হয়, কারণ স্থিরচিত্রগুলোর মাঝের অল্পসময়ের গ্যাপটা আমরা ধরতে পারিনা।

অনেকদিন পর্যন্ত এব্যাপারে অনেকেরই ধারনা ছিল (আমার ধারনা এখনও পারসেপশন মেজরের অনেক গবেষক একই ধারনা পোষন করেন) ভুল, অধিকাংশ গবেষকরাই সহজতম ব্যাখ্যাটা বেছে নিয়েছিলেন, বলেছেন, মানুষের মুভি বা টিভির সামনে বসে অর্থাৎ দ্বিমাত্রিক স্ক্রিনে দেখা জগতের পারসেপশন (পারসেপশন হলো সেই মেকানিজম যেটা দিয়ে চোখে ঢোকা দৃশ্য, কানে শোনা শব্দ কে আমরা ইন্টারপ্রিট করে ব্রেইনে পাঠাই), আর রিয়াল লাইফে ত্রিমাত্রিক জগতের পারসেপশন, এই দুটো পারসেপশনের মেকানিজম এক না। সেজন্যই, স্থিরচিত্রগুলোর মাঝের গ্যাপা আমরা লক্ষ্য করিনা, কিন্তু রিয়াল লাইফে আমরা কন্টিনিউয়াস সিন দেখি।

একটু দাঁড়ান!

রিয়াল লাইফে কি আমরা আসলেই কন্টিনিউয়াস সীন দেখি?
এই নিয়ে পরীক্ষা করেছেন কেন্ট স্টেটের লেভিন আর হার্ভার্ডের গবেষক সিমন।
তাঁরা মজার একটি পরীক্ষা করেছেন, যেখানে একগ্রুপ দর্শকদের একটি দৃশ্য দেখানো হয় যেটায়, একজন অভিনেত্রী ফোনরিং শুনে উঠে আসেন, রিসিভার তোলেন আর ফোনে কথা বলা শুরু করেন। দৃশ্যটি যখন ধারন করা হয়, তখন অভিনেত্রীর কথাবলার মাঝপথে একবার 'কাট' করে, তাঁর জায়গায় অন্য একজন অভিনেত্রী অন্য একটি পোশাক পরে ফোনে কথা বলা শুরু করেন।
মুভিটা দেখানোর পর দর্শকদের বলা হয় তারা কোন 'অদ্ভুত' কিছু দেখেছেন কিনা। ৬৬% বলেন, দেখেননি।
আরেকগ্রুপকে আগেই অদ্ভুত কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করে মুভি দেখতে বলা হলো, তারপর দেখা গেল প্রায় সবাই বুঝতে পারছে কোথায় কি ঝামেলা।
এতো গেল সেলুলয়েডের পর্দায় আমাদের ঝামেলার কথা, এখন রিয়াল লাইফে আসলে কি হয় সেটাও দেখা দরকার। সেজন্যও লেভিন আর সিমন একটা মজার পরীক্ষা করেছেন, তবে সত্যি বলতে কি, পরীক্ষাটা আমার পছন্দ হয়নি। তাও শেয়ার করি; এই পরীক্ষায় ফুটপাতের উপর একজন অভিনেতা র‌্যান্ডমলি একজন পথচারীকে ধরে 'অমুক জায়গায় কিভাবে যাব?' জিজ্ঞেস করবে, কথাবলতে বলতে ফুটপাতে হাঁটবে। তখন তাদের পাশদিয়ে আরও দুজন অভিনেতা ভারী কিছু নিয়ে ক্রস করে যাবে, ঠিক যে মুহুর্তে তারা পরস্পরকে ক্রস করবে, সেমুহুর্তে কথা বলতে থাকা অভিনেতা আর ভারী জিনিস বয়ে যাওয়া একজন অভিনেতা দ্রুত নিজেদের মাঝে জায়গা বদল করে নেবে। অর্থাৎ, পথচারীর সাথে প্রথমে যে কথা বলছিল, আর পরে জায়গা বদলের যে কথা বলছে, তারা ভিন্ন লোক। ৫০% এর মতো পথচারী ব্যাপারটা টেরই পায়নি। মানে রিয়াল লাইফেও আমরা কন্টিনিউয়াসলি দেখিনা।
এই পরীক্ষাটা আমার এজন্য পছন্দ হয়নি যে হয়ত পথচারী অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল, পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা যখন কথা বলি তখন আমরা সবসময় একে অন্যের দিকে তাকিয়ে কথা বলিনা।

তবে রিয়াল লাইফে যে আমরা আসলেই কন্টিনিউয়াসলি দেখিন, তার আরো সহজ প্রমাণ আছে ...আমাদের চোখের পলক পড়ে আবার চোখ খোলার মাঝে যে সময়টুকু পাই, তা হলো ৮০ মিলিসেকন্ড। এই ৮০ মিলিসেকেন্ড আমাদের চোখে আলো ঢোকেনা, অর্থাৎ রিয়াল লাইফে যদি আমরা কন্টিনিউয়াসলি দেখতাম তাহলে কিছুক্ষণ পরপর আমরা কালো (!) একটা ক্যানভাস দেখতে পেতাম।

এই যে গ্যাপ বা ইনকনসিস্টেন্সী, এটা কেন আমরা ধরতে পারছিনা? সেটা আরেক কাহিনী, আরেকদিন বলব, শুধু এটুকু বলে রাখা যায়, আমাদের নিউরাল সিস্টেম একটা ট্রিক মাস্টার!

আমাদের চোখ-নাক-কান-ত্বক-জিহবার মাধ্যমে যে পরিবেশগত ইনপুটগুলো আমাদের শরীরে ঢোকে, সেগুলোকে নিউরাল সিস্টেম আবার প্রসেস করে, প্রসেসের পর তার অর্থটা আমরা বুঝি। এই প্রসেসিংয়ের সময়ই সে যাবতীয় যাদুকরী কাজগুলো করে, সব প্রত্যঙ্গ গুলোর মাধ্যমে ঢোকা ইনপুটগুলোর মধ্যে একটা সমন্বয় ঘটায়। সেটা নিয়ে গবেষনা চলছে দিনরাত, মজার একটা ব্যাপার বেরিয়ে আসছে, সেটা হলে মানুষের ব্রেইন টাইমকে কিভাবে নিচ্ছে।

সে নিয়ে আবার আলোচনা করা যাবে পরে, আজ শুরু করলাম চোখটিপি দিয়ে, সেটা দিয়েই শেষ করি।

অনেকেই উঠতি বয়েসে চোখটিপি প্র্যাকটিস করেন, এটা সত্যি যে ভাল উইংকারদের আলাদা একটা কদর আছে, বন্ধুদের মাঝেও, মিষ্টি-দুষ্টু মেয়েদের মাঝেও। তো পরামর্শ বা উপদেশ যাই বলুন, সেটা হলো, উইংক প্র‌্যাকটিস করতে করতে এমন করে ফেলবেননা যেন তা ৮০ মিলিসেকেন্ডের কম সময়েই সেরে ফেলেন! তাহলে নিজেই তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন উইংক আর চোখের পলক নিয়ে। উইংক দেয়ার জায়গায় চোখের পলক ফেলে, চোখের পলক ফেলার জায়গায় উইংক করে বিপদে পড়তে পারেন ।

এসব ছাইপাশ কথার চেয়ে যারা পরের পর্ব নিয়ে এখনই আগ্রহ প্রকাশ করছেন, তাদের একটা প্রশ্ন করে রাখি আগাম।

ছোটবেলায় নিশ্চয়ই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, অলিম্পিকেও হয়ত দেখেন। আলোর গতি শব্দের চেয়ে বেশি, তার পরেও দৌড় প্রতিযোগিতায় ডেস্টিনেশনের কাছে উজ্জল বাতির ফ্ল্যাশ ব্যবহার না করে, প্রতিযোগীদের পেছনে বিপজ্জনক বন্দুকের গুলী ব্যবহার করা হয় কেন?
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০০৭ দুপুর ২:৪৭
১৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×