আজ ৬ই ডিসেম্বর ছিল, স্বৈরাচারের হাত থেকে আমাদের মুক্তির দিন।
মাঝে মাঝে একটা প্রশ্ন আমাকে ভীত করে তোলে। এই যে বিদেশে আছি, চাকরি বাকরি করছি, অথবা দেশে থাকলেও হয়ত ভাল কোন চাকরী করতাম; তখন হঠাৎ যদি একটা যুদ্ধ লাগত? ঠিক ৭১ এ যেমন দেশ আক্রান্ত হয়েছিল পাক হানাদের দ্বারা, সেরকম কিছু? তাহলে কি এই নিরাপদ/নিশ্চয়তামূলক জীবন ছেড়ে দেশের জন্য লড়ার রিস্কটা নিতাম? এখনই যদি যুদ্ধ লাগে, তাহলে কি দেশে গিয়ে অস্ত্র ধরব, না নিয়মিত অফিস করে রাতে ইন্টারনেটে এখানে সেখানে গনসংযোগ করেই দেশের প্রতি দ্বায়িত্ব শেষ করব? খুব কঠিন প্রশ্ন। ভয় হয়, সাধারন চিন্তায় ভাবলে মনে হয় যে, দেশে ফিরে যাবনা। হয়ত দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা তখন করব, কিন্তু সবটাই এখনকার নিশ্চয়তাটুকুকে অটুট রেখে। আমি জানিনা এরকম প্রশ্নের জবাবে আপনি পাঠক কি ভাবছেন।
তবে এটা বুঝি যে, সমস্যাটা দেখা না দিলে বলা যায়না কি করব; মানে যুদ্ধ লেগে গেলে তখনই শুধু বলা যাবে কি করব। যুদ্ধ করার জন্য যে ছুটে যাবনা সেটা আমি পুরো নিশ্চিত নই। মনের যে অংশটুকু যুদ্ধে যাবার জন্য সায় দেয়, সেখানে বাস করে এক অদ্ভুত স্মৃতি। হুমায়ুন আহমেদ তার 'জোছনা ও জননীর গল্প' বইয়ে লিখেছিলেন ৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের খবর যখন তিনি পেলেন, তখন ঢাকার খোলা রাস্তায় তিনি আর তাঁর বন্ধু (সম্ভবতঃ আনিস সাবেত) প্রাণখুলে দৌড়েছিলেন, আর কতক্ষণ পরপরই হেসে উঠেছিলেন। তাঁর বর্ণনাটা যতবার পড়েছি ততবারই মনে হয়েছে 'ইস্, আমি যদি তখন থাকতাম।' পড়তে পড়তে অদ্ভুত অনুভুতি হতো, আনন্দে হাসতে থাকি। আমরা এই প্রজন্ম সেই ১৬ই ডিসেম্বর পাইনি, আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে এরকম ছোটখাটো একটা স্বাদ আমরা পেয়েছিলাম। সেটা ছিল ৯০ এর ৬ই ডিসেম্বর। সেসময় আমাদের ভয় হতো এই এরশাদকে হয়ত কোনদিনই সরানো যাবেনা গদি থেকে, কিন্তু ৬ই ডিসেম্বর সেই ভয় দূর করে দিয়েছিলো। সাথে সাথে এক আত্নবিশ্বাস দিয়েছিলো আমাদের যে, সামরিক স্বৈরাচার এদেশে আর জাঁকিয়ে বসতে পারবেনা।
আজ, আমাদের সেই ভয় আবার কবরের ঘুম ভেঙে মোটাতাজা তাগড়া হয়ে ফিরে আসছে, আমাদের সেই আত্নবিশ্বাসকে একদল লুটেরা, যাদের হাতে আমরা বিজয়কে ছেড়ে দিয়েছিলাম, তারা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
আমরা যাদেরকে বিশ্বাস করেছিলাম, তারা সেই একই স্বৈরাচারকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছে, আমরা মুখ লুকাই কোথায়? ... শুধু তাইনা, যেকারনে এই কাড়াকাড়ি, সেই একই কারনে দেশের সাথে সবচেয়ে বড় হারামীপনা করা রাজাকার/আলবদর/আলশামসদেরও আঁচলের তলায় ঢুকিয়েছে ... তারপর আবারও সামরিক শাসনের কাছে দেশকে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা এখন নতুন ধান্দায় ব্যস্ত ...
আর সেই সামরিক শাসকেরা আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মৌন মিছিল, হ্যাঁ জনাব, মৌনমিছিলের মতো "মহাঅপরাধের" দায়ে জেল-জরিমানা করেছেন ...
আমরা এখন কোথায় যাব?
৯০ এর গনআন্দোলনে এই সামান্য আমার কোন অংশগ্রহনই নেই বলতে গেলে। আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। কারফিউ চলত, আমরা কলোনীর গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পুলিশের গাড়ী দেখা গেলে দূর থেকে ইট-পাটকেল ছুড়তাম; গাড়ী কাছাকাছি এলে ভোঁ দৌড়। এই সামান্য অংশগ্রহনেই আমি এক অদ্ভুত অভিমান বোধ করি, হতাশ লাগে।
তখন ভাবি,
যারা আত্নদান করেছেন, নিরলসভাবে নিঃস্বার্থভাবে স্বৈরাচারের বিরোধিতা করে দিনরাত আন্দোলনে ছিলেন, সরাসরি যুদ্ধে ছিলেন, তারা কি ভয়াবহ অভিমানে আছেন?
নুরহোসেনের বাবা-মা বা ডাঃ মিলনের স্ত্রী-সন্তানেরা আজ কিভাবে মুখ লুকিয়ে কাঁদেন।
তারপর ভাবি,
৭১ এর রাজাকরের গাড়ীতে যখন দেশের পতাকা উড়ে/ একাত্তরের সবচেয়ে বড় ক্রিমিনালদের একটাকে যখন "দেশের প্রতি বিশেষ অবদানের" জন্য বনানীতে জমিদেয়া হয় -- তখন সেই মুক্তিযু্দ্ধের সময়ের মানুষেরা কিভাবে অভিমানে ডুকরে উঠে! মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র আত্নায় কি কঠিন কষ্ট অনুভূত হয়!!! ভাবতে পারিনা, গায়ে কাঁটা দেয়।
শেষপর্যন্ত কি, একদল নীরব অভিমানীতে ভরে যাবে এদেশ?
আরেকবার জেগে উঠবেনা?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



