somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সায়েন্সব্লগ ৪: সুন্দরী চেনার বিজ্ঞান (বাকী অংশ)

০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৩:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্বের শেষে যেখানে এসে আলোচনাটা থেমেছিল, তা হলো একটা সাধারণ প্রশ্ন,

তারমানে, সুন্দর/সুন্দরীদের চেহারা এভারেজ মানুষের চেহারার চেয়ে আলাদা না?

হ্যাঁ, গবেষকরা গবেষণা চালানোর নতুন ছুতো পেয়ে গেলেন। এখন দেখতে হবে আসলেই কোথায় সমস্যা। আমরা কিভাবে যৌন্দর্য্যের পারসেপশন ধারন করি?

এবার তারা যে পরীক্ষাটি চালান, সেখানে আগের পরীক্ষায় নির্দিষ্ট হওয়া সুন্দর চেহারা ৩০ টি আর অসুন্দর চেহারা ৩০ টি মিলিয়ে মোট ৬০ টি ছবিকে ব্যবহার করেন। এবারও একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ভলান্টিয়ারকে (সাবজেক্ট) বলা হলো, এই ৬০ টি মুখের ছবিগুলোকে এভারেজ মানুষের চেহারার চেয়ে আলাদা মনে হওয়ার ভিত্তিতে মার্কিং করুন? , মানে এক্ষেত্রে এভারেজ মানুষের চেহারার চেয়ে বেশী আলাদা হলে বেশী নাম্বার দেয়া হবে। এক্ষেত্রে আমরা ভাবতে পারি যে ঐশ্বরিয়া আর শোয়ার্জনেইগার, দুজনেই নয়-দশের মতো পাবেন। কিন্তু সেখানেই গোল বাঁধল।

গবেষকরা প্রাপ্ত রেজাল্ট থেকে দেখতে পেলেন যে, আকর্ষণীয় আর অনাকর্ষণীয় চেহারাগুলো এইক্ষেত্রে খুব ভালোভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, অনাকর্যণীয় চেহারাগুলো এখানে আকর্ষণীয় চেহারাগুলোর চেয়ে বেশী নম্বর পেয়েছে; অর্থাৎ, অনাকর্ষনীয় চেহারা হলো এভারেজ চেহারার চেয়ে বেশী আলাদা, এবং ভাইস ভার্সা।

তারমানে, আকর্ষণীয় চেহারার সাথে এভারেজ মানুষের চেহারার মিল বেশী?

এটাতো দুনিয়া কাঁপানো ব্যাপার হয়ে গেল, এতে তো পৃথিবীর সব মানুষই খুশী হবে। এবং আসলেই তাই, পরবর্তী পরীক্ষণগুলোতে দেখা গেল, এভারেজ চেহারাকেই মানুষ বেশী আকর্ষণীয় মনে করে। অর্থাৎ, ঐশৃিয়া রায় একটি এভারেজ চেহারার অধিকারি!!

হুমম, এখন আসা যাক এভারেজ চেহারা জিনিসটা কি?
এটা আমরা সবাই অবচেতন মনে নিজের মাথার ভেতর তৈরী করি, তবে অবশ্যই সেটা খুব নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে। এভারেজ চেহারা আমাদের মাথায় তৈরী হয় এভাবে -- আমরা আশেপাশে যত মানুষ দেখি সবার চেহারাকেই একটা নির্দিষ্ট আকৃতির ফেইস ইমেজের উপর বসাই; এভাবে যত চেহারা দেখি সেগুলোর সবগুলোর গড়করে একটা "প্রমাণ চেহারা" আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে থাকে। সেই "প্রমাণ চেহারা"টাই এভারেজ চেহারা। সূতরাং এটাও বুঝতে পারছেন যে, এই চেহারাটা প্রতিনিয়ত বদলায়। তবে শিশুবেলায় যত ফ্রিকোয়েন্টলি আমরা চেহারার গড় নিই, বয়েসের সাথে সাথে সেটা হয়ত কমতে থাকে।

তো, এই এভারেজ চেহারা নিয়ে গবেষকরা পরীক্ষণ চালালেন। তাঁরা বেশ কয়েকটি ভিন্ন মুখাবয়বের সেট (ধরুন প্রত্যেকটা সেটে ৫০ টা মুখাবয়ব) ব্যবহার করে পরীক্ষণটা চালান। প্রত্যেক সেটেই সবগুলো মুখের এভারেজ, আবার ধরুন দশটা, বিশটা, ত্রিশটা মুখের এভারেজও নিলেন। তারপর সাবজেক্টদের উপর জরিপ চালালেন সেইছবিগুলোকে (মূল ছবি আর এভারেজগুলোকে) সুন্দরের ক্রমে সাজাতে। দেখা গেল, প্রত্যেক সেটেই এভারেজ ছবিগুলো সুন্দরের তালিকায় আছে। এখান থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেল যে এভারেজ চেহারাকে আমরা সুন্দর হিসেবেই পারসিভ করি।

এখন আসা যাক গাণিতিক ব্যাখ্যায়। মানুষের মুখের উপাদানগুলো কি কি? চুল, কপাল, চোখ, নাক, ঠোঁট, গাল, চিবুক -- এগুলোইতো। এখন অধিকাংশ মানুষকেই খেয়াল করলে দেখবেন, এগুলোর অধিকাংশই খুব সুন্দর। কারো হয়ত নাকটা খানিক বোঁচা, কারো হয়ত চোখগুলো অত টানাটানা না, কারো হয়ত গাল বেশী ফোলা, কারো হয়ত মাথায় চুল নেই -- এরকম একটা দুটো প্যারামিটারই একজনকে তথাকথিত অনাকর্ষণীয় বানিয়ে দেয়। একটা মানুষের মুখশ্রীর অধিকাংশ ফিচারই খুব ভাল থাকে। এর ফলে কি হবে? যখন আপনি হাজার দশেক মানুষের মুখের এভারেজ করবেন, তখন দেখবেন গড়ে সবার নাকের উচ্ছতাও ভাল, চোখও টানাটানা, সবই ভাল। সেই সবই ভালটা হয়ে যায় আমাদের মাথার মাঝে গেঁথে যাওয়া এভারেজ চেহারা। কাজেই সেটা আকর্ষণীয় হতে বাধ্য।

এটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আরো মজার মজার পরীক্ষা করেছেন। এরকম একটা পরীক্ষা হলো, আপনাকে একটানা একই ব্যাক্তির বেশ কয়েকটা ইমেজ বা ছবি দেখানো হলো। ছবিগুলোতে তার ইমেজকে ইচ্ছেমতো নানা এ্যাঙ্গেলে বাঁকানো বা ডিসটোর্ট করা হয়েছে। ফলে মুখটা বেশী ফোলা, কপালটা বেশী বড় এমন নানারকম ছবি আপনি দেখতে পাচ্ছেন। তো যে ছবির সিরিজটা দেখানো হলো, তাতে মুখকে ০% থেকে ৭০-৮০% পর্যন্ত ডিসটোর্ট করে অনেকগুলো ছবি দেখানোর পর একটা ২০% ডিসটোর্টেড ছবি দেখিয়ে বলা হলো, "এটা কি নরমাল না ডিসটোর্টেড?" অধিকাংশ সাবজেক্টই বললেন, "নরমাল"। অর্থাৎ, একগাদা মুখের ছবি একটানা দেখে আপনার মাথার ভেতরের এভারেজ ইমেজটি হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেছে, সেজন্য আপনি ডিসটোর্টেড ইমেজকেও নরমাল ভাবছেন।

এখন, এই এভারেজ ইমেজের থিওরী এখন কি কাজে লাগাতে পারি?

বিউটিশিয়ানদের কাজে লাগে। সব বিউটিশিয়ানরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে প্রতিটি মানুষই সুন্দর। আসলেও তাই। প্রতিটি মানুষেরই অধিকাংশ ফেইস-ফিচারই এভারেজ ইমেজের কাছাকাছি। বিউটিশিয়ানরা, ক্লায়েন্টের কোন ফেইস ফিচারটা এভারেজ ইমেজ থেকে দূরে সরে গেছে সেটাকে মার্ক করে, সে জায়গাটাকে এভারেজ ইমেজের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। ফলে মূহুর্তেই চেহারা বদলে যায়। এবং একই কারণে সব বিয়ের কনেকে একরকম দেখায়

আর্টিস্ট, বিশেষ করে যারা স্কেচ করেন, মানে পেন্সিলের দুচারটা টানে এক একজনের ছবি এঁকে ফেলেন, তাঁরা অবচেতনভাবে এই এভারেজ ইমেজ ব্যবহার করেন। তাঁরা এভারেজ ইমেজের চেয়ে চেহারার যে অংশটা বেশী আলাদা সেটাকে ফোকাস করেন, তখনই ছবিটা বা স্কেচটাতে মানুষটার ইমেজ ফুটে ওঠে।

আমরাও করি, অহরহ, অবচেতনভাবে। একটা মানুষকে যে আমরা দেখলেই চিনে ফেলি, সেটাও করি এভাবে। মাথার ভেতর এভারেজ যে ইমেজেটা জমা আছে, সেটার সাথে একেকজনের ডিফারেন্স মনে রাখি। সেই ডিফারেন্সটা দিয়ে রিকগনাইজ করি।

এখন বোঝাই যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে আমরা সবাই সাধারণত একই রকম মানুষ দেখি, তাই আমাদের সবার মাথার ভেতরের এভারেজ ইমেজটি মোটামুটি কাছাকাছি। এজন্যই বিভিন্ন দেশে মানুষের চয়েস বিভিন্নরকম, এবং স্থান বদলের সাথে সাথে সৌন্দর্য্যের পারসেপশনও বদলে যায়। সেটা হয়, বয়েসের সাথে সাথেও।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এজন্যই যতই দিন যায় প্রেমিক/প্রেমিকাকে দেখতে নাকি ততই সুন্দর লাগে।

এই শেষ কথাটা যাদের মনে হলো ঠিকনা, তাদের জন্য একটা টিপস দিয়ে শেষ করছি।

বেশী বেশী করে মনের মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকুন।
৩৯টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×