**************************************************************
১.
প্রতিবারই ঢাকা থেকে যেদিন ক্যাডেট কলেজে ফিরে যাই, মনটা ফুরফুরে থাকে। কারণ অবশ্যই আছে, একেকটা ছুটি এতবেশী লম্বা থাকে যে, যদিও বাবা-মা জানতে পারলে রাগ করবে, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, ছুটি কাটাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠি। কলোনীর বন্ধুবান্ধবদের এখন আর অত ভালো লাগেনা, কলেজের বন্ধুদের মতো "পশ" না ওরা।
কিন্তু এবার কেমন যেন সকাল থেকেই মনটা ভালো নেই। একটু পরেই ভাইয়ার গাড়ী আসবে, মালিবাগ চৌরাস্তায় সোহাগের টার্মিনালে নিয়ে যাবে। আজ বাবাও আমাদের সাথে বেরুবে, বাবার মাথায় বাড়ী করার ভুত চেপেছে, রিটায়ারমেন্টের পর এলপিআরের সময় লোকের যা হয় আর কি! কোথায় কোথায় যেন যাবে, ইট, সিমেন্ট, রডের খোঁজখবর নিতে। প্রত্যেকবারের মতো আজও মা সকাল থেকে ব্যস্ত, আমার পছন্দের কিছু খাবার বানাচ্ছে, বিশেষ করে গরুর মাংসের কাবাবের ঘ্রাণ পাচ্ছি রান্নাঘর থেকে।
ব্যাগ হাতে বেরুতে বেরুতে হঠাৎ চোখ গিয়ে পড়ে দরজার কড়াটার উপর; আনমনা হয়ে যাই। ছোটবেলায় রোজ দুপুরে বাবার আসার অপেক্ষায় থাকতাম, কড়া নাড়া শুনেই বুঝে ফেলতাম বাবা এসেছে। মা'র কড়া নাড়াটাও বুঝতে পারতাম, আপুদেরটাও, ভাইয়ারটাও। অদ্ভুত! একেকজন এককেভাবে দরজার কড়া নাড়ে। আমারটাও নিশ্চয়ই অন্যেরা বোঝে। আচ্ছা প্রতিবার আমি কলেজে যাবার সময় যে মা সিঁড়ির নীচ পর্যন্ত গিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসে, মা'র চোখ ছলছল করে; মাও নিশ্চয়ই আমি কলেজ থেকে ফিরে আসলে কড়া নাড়া থেকেই বুঝে ফেলে, "বাবু এসেছে"। মা নিশ্চয়ই অনেক খুশী হয়। নিজের কড়া নাড়ার শব্দটা রেকর্ড করা গেলে ভালো হতো।
দরজার কড়াটাকে ধরে আমি আনমনে নাড়াতে থাকি, আমার বেরুতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। হঠাৎ মেঝো আপু মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলে, "কিরে পাগলা, কড়া নাড়ছিস কেন?"। আমি লজ্জা পাই, নাহ্, এখন বেরুতে হবে।
ভাইয়া বড় হয়ে গেছে, বাবার সামনেই এখন সিগারেট কেনে, ডাইনিংয়ে বসে সিগারেট খায়। ও যখন সিগারেট খায়, বাবা তখন ডাইনিংয়ে আসেনা। কলোনীর গেটের কাছে আজিজ মিয়ার দোকানের সামনে ভাইয়া গাড়ী থামায়, সিগারেট কিনবে। গাড়ীর কাঁচ ভেদ করে চোখ পড়ে আজিজ মিয়ার দোকানের সামনে সাজানো ছোট ছোট বয়ামগুলোর উপর। এই বয়ামগুলোকে ঘিরে কেটেছে আমার শৈশব, পালা করে একেকবার একেকটা বয়ামের জিনিস কিনতাম। নামও ভুলে গেছি, বাবুল বিস্কুট, সুপার বিস্কুট, চিনির গোল্লা, সন্দেশ, বাবল গাম, আরো কত কি! বুকটা কেন জানি হু হু করে উঠে। বুঝতে পারছিনা, কেন এবার এত খারাপ লাগছে। আজিজ মিয়ার ছেলেটা দোকানদারি করছিল, আমাকে দেখে হাত জাগিয়ে বলে, "বাইয়া, আবার যাইতেছেন?"। ভিআইপিদের মতো হাতটাকে একটু উঠিয়ে মুচকি হাসি।
সামনের সীটে বাবার দিকে চোখ পড়ে, একমনে লিখে যাচ্ছেন হিসেবের খাতায়। সরকারী চাকুরে, রিটায়ারমেন্টের পর একটা ছোট থাকার জায়গা করে নেবেন নিজের আর সন্তানদের জন্য -- এটাই তাঁর স্বপ্ন। শুনেছি ভাইয়া শান্তিনগরে বাসাভাড়া করেছে, খুব সুন্দর। আপুরা দুজনই ভীষন উত্তেজিত, খুব চমৎকার বাসা! মাও খুশী। বাবার সেদিকে কোন খেয়াল নেই, তার একটাই চিন্তা, পেনশনের টাকাটাকে বাড়ীর কাজে লাগিয়ে ফেলতে হবে।
গাড়ী কলোনীর গেট ছেড়ে যায়, গেটের উপরে বিশাল ব্যানার, লেখা "আরশাদ ভাই এলকার সবার ....", আর পড়তে পারিনা, গাড়ী সাঁই করে বেরিয়ে যায়। পুরোটা পড়তে না পারার আক্ষেপটাও যেন অনুভব করি। আসলেই বুঝতে পারছিনা এবার এত খারাপ কেন লাগছে। অথচ এবার তো ভালো লাগার কথা, সাকিবের বড় ভাই নাকি আবারও হাভানা চুরুট এনেছে, ফোনে শুনেছি; সাকিব তিনটা মেরে দিয়েছে। ক্যাডেটের বন্ধুরা সবাই মিলে একটা মাস্তির পরিকল্পনা করেছি গত কয়েকদিন ধরে, উপলক্ষ সেই হাভানা চুরুট।
তবুও জানিনা, কেন মনটা উদাস, বিষন্ন; কিচ্ছু ভাল্লাগছেনা। ধুর!
২.
কলেজে ফিরেও ভাল্লাগছেনা। ব্যাচের বাঁদর গ্রুপের মধ্যমনি আমি, ফিরে আসার পর প্রথম ক'দিন জমজমাট কাটে। অথচ আজ হাভানা চুরুট পার্টিতে গেলামনা। রুমে বসে পড়াশোনার চেষ্টা করছি। সাবেতও আছে রুমে, ও পড়ার পাগল।
হঠাৎ সাবেত জিজ্ঞেস করে, "আঙ্কেলের রিটায়ারমেন্ট কবে রে?"
"এই তো, দু'মাস পর" ঠিক যেন অটোমেটিক মেশিনের মতো উত্তর বেরোয়।
আর তখনই, ঠিক তখনই যেন একটা ব্যাপার বুঝে ফেলি, বুকটা হু হু করে ওঠে। বুঝে ফেলতে না চেয়েও যেন বুঝে ফেলি, কেন মনটা এমন বিষন্ন, কোন জিনিসটা পোড়াচ্ছিল আজ সারাদিন।
ভাইয়া বাসা নিয়েছে, এরপরের ছুটিতে যখন ঢাকায় যাবো, তখনতো শান্তিনগরের নতুন বাসাটায় যাবো, আহা, কলোনীর বাসাটাতে আর যাওয়া হবেনা।
হঠাৎ বাসার কড়াটার কথা খুব মনে পড়তে লাগল। ভাইয়া বীরদর্পে বলছিলো, "শান্তিনগরের বাসায় ওরকম জংপড়া কড়া নেই, কলিংবেল আছে।"
ছবির কৃতজ্ঞতা:
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



