somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতিশয় ছোটগল্প: টান

২৬ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[লেখাটা সচলায়তনে অমিত আহমেদের সম্পাদিত অণুগল্পের সংকলণে ছাপা হয়েছিলো, সে প্রায় চার-পাঁচমাস আগে। ভাবলাম, সামহোয়ারে শেয়ার করি।]
**************************************************************
১.
প্রতিবারই ঢাকা থেকে যেদিন ক্যাডেট কলেজে ফিরে যাই, মনটা ফুরফুরে থাকে। কারণ অবশ্যই আছে, একেকটা ছুটি এতবেশী লম্বা থাকে যে, যদিও বাবা-মা জানতে পারলে রাগ করবে, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, ছুটি কাটাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠি। কলোনীর বন্ধুবান্ধবদের এখন আর অত ভালো লাগেনা, কলেজের বন্ধুদের মতো "পশ" না ওরা।

কিন্তু এবার কেমন যেন সকাল থেকেই মনটা ভালো নেই। একটু পরেই ভাইয়ার গাড়ী আসবে, মালিবাগ চৌরাস্তায় সোহাগের টার্মিনালে নিয়ে যাবে। আজ বাবাও আমাদের সাথে বেরুবে, বাবার মাথায় বাড়ী করার ভুত চেপেছে, রিটায়ারমেন্টের পর এলপিআরের সময় লোকের যা হয় আর কি! কোথায় কোথায় যেন যাবে, ইট, সিমেন্ট, রডের খোঁজখবর নিতে। প্রত্যেকবারের মতো আজও মা সকাল থেকে ব্যস্ত, আমার পছন্দের কিছু খাবার বানাচ্ছে, বিশেষ করে গরুর মাংসের কাবাবের ঘ্রাণ পাচ্ছি রান্নাঘর থেকে।

ব্যাগ হাতে বেরুতে বেরুতে হঠাৎ চোখ গিয়ে পড়ে দরজার কড়াটার উপর; আনমনা হয়ে যাই। ছোটবেলায় রোজ দুপুরে বাবার আসার অপেক্ষায় থাকতাম, কড়া নাড়া শুনেই বুঝে ফেলতাম বাবা এসেছে। মা'র কড়া নাড়াটাও বুঝতে পারতাম, আপুদেরটাও, ভাইয়ারটাও। অদ্ভুত! একেকজন এককেভাবে দরজার কড়া নাড়ে। আমারটাও নিশ্চয়ই অন্যেরা বোঝে। আচ্ছা প্রতিবার আমি কলেজে যাবার সময় যে মা সিঁড়ির নীচ পর্যন্ত গিয়ে এগিয়ে দিয়ে আসে, মা'র চোখ ছলছল করে; মাও নিশ্চয়ই আমি কলেজ থেকে ফিরে আসলে কড়া নাড়া থেকেই বুঝে ফেলে, "বাবু এসেছে"। মা নিশ্চয়ই অনেক খুশী হয়। নিজের কড়া নাড়ার শব্দটা রেকর্ড করা গেলে ভালো হতো।

দরজার কড়াটাকে ধরে আমি আনমনে নাড়াতে থাকি, আমার বেরুতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। হঠাৎ মেঝো আপু মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলে, "কিরে পাগলা, কড়া নাড়ছিস কেন?"। আমি লজ্জা পাই, নাহ্, এখন বেরুতে হবে।

ভাইয়া বড় হয়ে গেছে, বাবার সামনেই এখন সিগারেট কেনে, ডাইনিংয়ে বসে সিগারেট খায়। ও যখন সিগারেট খায়, বাবা তখন ডাইনিংয়ে আসেনা। কলোনীর গেটের কাছে আজিজ মিয়ার দোকানের সামনে ভাইয়া গাড়ী থামায়, সিগারেট কিনবে। গাড়ীর কাঁচ ভেদ করে চোখ পড়ে আজিজ মিয়ার দোকানের সামনে সাজানো ছোট ছোট বয়ামগুলোর উপর। এই বয়ামগুলোকে ঘিরে কেটেছে আমার শৈশব, পালা করে একেকবার একেকটা বয়ামের জিনিস কিনতাম। নামও ভুলে গেছি, বাবুল বিস্কুট, সুপার বিস্কুট, চিনির গোল্লা, সন্দেশ, বাবল গাম, আরো কত কি! বুকটা কেন জানি হু হু করে উঠে। বুঝতে পারছিনা, কেন এবার এত খারাপ লাগছে। আজিজ মিয়ার ছেলেটা দোকানদারি করছিল, আমাকে দেখে হাত জাগিয়ে বলে, "বাইয়া, আবার যাইতেছেন?"। ভিআইপিদের মতো হাতটাকে একটু উঠিয়ে মুচকি হাসি।

সামনের সীটে বাবার দিকে চোখ পড়ে, একমনে লিখে যাচ্ছেন হিসেবের খাতায়। সরকারী চাকুরে, রিটায়ারমেন্টের পর একটা ছোট থাকার জায়গা করে নেবেন নিজের আর সন্তানদের জন্য -- এটাই তাঁর স্বপ্ন। শুনেছি ভাইয়া শান্তিনগরে বাসাভাড়া করেছে, খুব সুন্দর। আপুরা দুজনই ভীষন উত্তেজিত, খুব চমৎকার বাসা! মাও খুশী। বাবার সেদিকে কোন খেয়াল নেই, তার একটাই চিন্তা, পেনশনের টাকাটাকে বাড়ীর কাজে লাগিয়ে ফেলতে হবে।

গাড়ী কলোনীর গেট ছেড়ে যায়, গেটের উপরে বিশাল ব্যানার, লেখা "আরশাদ ভাই এলকার সবার ....", আর পড়তে পারিনা, গাড়ী সাঁই করে বেরিয়ে যায়। পুরোটা পড়তে না পারার আক্ষেপটাও যেন অনুভব করি। আসলেই বুঝতে পারছিনা এবার এত খারাপ কেন লাগছে। অথচ এবার তো ভালো লাগার কথা, সাকিবের বড় ভাই নাকি আবারও হাভানা চুরুট এনেছে, ফোনে শুনেছি; সাকিব তিনটা মেরে দিয়েছে। ক্যাডেটের বন্ধুরা সবাই মিলে একটা মাস্তির পরিকল্পনা করেছি গত কয়েকদিন ধরে, উপলক্ষ সেই হাভানা চুরুট।

তবুও জানিনা, কেন মনটা উদাস, বিষন্ন; কিচ্ছু ভাল্লাগছেনা। ধুর!

২.
কলেজে ফিরেও ভাল্লাগছেনা। ব্যাচের বাঁদর গ্রুপের মধ্যমনি আমি, ফিরে আসার পর প্রথম ক'দিন জমজমাট কাটে। অথচ আজ হাভানা চুরুট পার্টিতে গেলামনা। রুমে বসে পড়াশোনার চেষ্টা করছি। সাবেতও আছে রুমে, ও পড়ার পাগল।

হঠাৎ সাবেত জিজ্ঞেস করে, "আঙ্কেলের রিটায়ারমেন্ট কবে রে?"

"এই তো, দু'মাস পর" ঠিক যেন অটোমেটিক মেশিনের মতো উত্তর বেরোয়।

আর তখনই, ঠিক তখনই যেন একটা ব্যাপার বুঝে ফেলি, বুকটা হু হু করে ওঠে। বুঝে ফেলতে না চেয়েও যেন বুঝে ফেলি, কেন মনটা এমন বিষন্ন, কোন জিনিসটা পোড়াচ্ছিল আজ সারাদিন।
ভাইয়া বাসা নিয়েছে, এরপরের ছুটিতে যখন ঢাকায় যাবো, তখনতো শান্তিনগরের নতুন বাসাটায় যাবো, আহা, কলোনীর বাসাটাতে আর যাওয়া হবেনা।

হঠাৎ বাসার কড়াটার কথা খুব মনে পড়তে লাগল। ভাইয়া বীরদর্পে বলছিলো, "শান্তিনগরের বাসায় ওরকম জংপড়া কড়া নেই, কলিংবেল আছে।"



ছবির কৃতজ্ঞতা:
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৮
৩৩টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×