দুপুরে ভাত খেয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে নিচে নেমেছিলাম, তখনই শুনেছিলাম, ডাক্তার মিলন মারা গেছেন। সাথে এও শুনেছিলাম, "এবার আর এরশাদের ছাড় নাই!"। আমি জানিনা আমরা সেদিন মহামান্য এরশাদের ওপর এত খেপেছিলাম কেন? যদি কোন ভুল হয়ে থাকে, ক্ষমা চাই, মান্যবর!
একটা মজার ঘটনা বলি, ২০০৬ এ এরশাদকে নিয়ে দুদিকেই টানাটানি হচ্ছিল, তাই এসব "নূর হোসেন দিবস", "মিলনের মৃত্যুবার্ষিকী", "৬ই ডিসেম্বর"কে কেউ পাত্তা দেয়নি। ২০০৭ এ সামরিক সরকার, দুদলকেই প্যাঁদাচ্ছিলো, পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনা দরকার, মহাসমারোহে পালিত হলো দিবসগুলো। এবৎসর নিশ্চয়ই বিএনপি খুব জাঁকজমকের সাথে ৬ই ডিসেম্বর পালন করবে! অবশ্য বলা যায়না, এরশাদ কাক্কুর ডিগবাজীকান্ড ভূবনবিখ্যাত।
ডাক্তার মিলন সম্পর্কে কিছুটা শুনেছিলাম আমার নানীর কাছে। সেজন্যই হয়ত আলাদা একটা আগ্রহ জেগেছিলো। এখন আর সেই আগ্রহ নেই, হাহুতাশ আছে। প্রথম যেবছর ব্লগ লেখা শুরু করেছিলাম, সেবার জোশ ছিলো, ৬ই ডিসেম্বরে লিখেছিলাম লেখাটা, আজ প্রথম আলোতে মিলনের মায়ের লেখা আর সচলায়তনে ব্লগার ষষ্ঠপান্ডবের লেখা পড়ে মনে হলো, আবারও শেয়ার করি। খানিকটা পরিবর্তন করেছি যদিও। একটা কবিতাই বানিয়ে ফেললাম, নাম দিলাম, "গণতন্ত্র উড়ে যাক"
**************************************************************
গণতন্ত্র উড়ে যাক
প্রোলগ:
কবর থেকে নূর হোসেন ফোন করেছিলো,
অট্ঠাসি হাসতে হাসতে বললো,
তার লাশের গায়ের সেই সাদাকালির লেখাগুলো কালো হয়ে গেছে,
শুধু তাইনা, লেখাগুলো নাকি বদলেও গেছে!
"ক্যামনে কি" জিজ্ঞেস করলাম,
বললো, "বেশী কথা কওন যাইবোনা"
১.
২৭শে নভেম্বর ১৯৯০ ভীড় করলো স্মৃতিতে ...
এমনি এমনি, কোন কারণ নেই, দিব্যি কাটছি -- এমনি এমনি
আমরা তো সে সময়ে নাদান মানুষ ছিলাম...
স্কুলে পড়তাম মাত্র ...
ইউনিভার্সিটির বাঘা নেতাও ছিলামনা ...
রাজনৈতিক দলের ডাকসাইটে কেউওনা ...
কি আর করার ছিল আমাদের?
কলোনীর গেটের কোণে দাঁড়াতাম ...
পুলিশের গাড়ী দেখলে দুএকটা ইট ছুঁড়তাম হয়ত,
অথবা অন্যদের ইট ছোঁড়া দেখতাম ...
পুলিশের গাড়ী কাছাকাছি আসলে দিতাম ভোঁ দৌড় ...
আমরা চিৎকার করতাম, স্লোগান দিতাম ... আমরা স্বপ্ন দেখতাম ... হায়রে স্বপ্ন ... এরবেশী কিছু করার সাধ্য আমাদের ছিলনা ...
তাও!!
আমাদের কাছে সেটাই ছিল এক যুদ্ধের মতো....
কারণ, আমাদের প্রজন্ম তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি!
আমাদের কাছে সেটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রোটোটাইপ ...
২.
যেদিন আমরা জিতলাম,
স্বৈরাচারের পতন হলো,
গণতন্ত্র মুক্তি পেল (!!) ...
আমরা মাথায় লাল সবুজ বেঁধে কাঁধে কাঁধ রেখে দাঁড়ালাম ...
আমরা তারস্বরে চিৎকার করলাম, বললাম, "শহীদের রক্ত, বৃথা যেতে দেবনা" ...
আমরা মনে করলাম নূর হোসেনকে ...
সালাম জানালাম ড. মিলনকে ...
আমরা নাচলাম ...
গাইলাম ...
গদ্য করলাম...
পদ্যও করলাম
আরও কত হাবিজাবি ...
আমাদের অনেক মজা হয়েছিলো নিশ্চয়ই!
৩.
আচ্ছা!
মিলনের কথা কি আমাদের মনে আছে?
নূর হোসেনের চামড়ায় আঁকা সাদা আঁকিবুকিগুলো কি আমরা মনে করতে পারি?
এখন নিজেকে প্রশ্ন করি?
আমাদের কি মনে আছে মিলনের সেই বাচ্চা মেয়েটির নাম ?...
যে প্রতিদিন বাবা যখন অফিসে যাবার জন্য বের হতো তখন বলত, 'বাবা কবে আসবে?' ...
তার মা শুধরে দিতেন, বলতেন, 'কবে না মা, বলো কখন আসবে?' ...
মেয়েটা হয়ত বলত, হয়ত বলতনা ...
কি হবে এসব বিশ্লেষণ করে? ...
কি হবে? কি হয়? কিছু কি হয়?
আচ্ছা, আমাদের কি মিলনের সেই বাচ্চাটার মা'টার কথাই মনে আছে?
যে নিজের স্বামীর দেশপ্রেম নিয়ে গর্ব করত ...
আমেরিকা যাবার, সেটল করার এত সুযোগ থাকতেও তার স্বামী কি এক অজানা কারণে দেশটাকে আঁকড়ে ধরে ছিল!! ...
আচ্ছা, ড. মিলনের মায়ের নামই কি মনে আছে? ...
যে নারী একাই গড়ে তুলেছিলেন এক সৈনিককে গণতন্ত্র এনে দেতে?
দরকার কি? ...
বালের গণতন্ত্রেরই বা দরকার কি? ...
ক্ষমতা হলেই তো হয় ... নামের আগে প্রধানমন্ত্রী জুটলেই তো হয় ...
রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, স্বৈরাচার ... যত্তোসব ফালতু বাত!
চিল্লাও মাত!!
আমরাও "তাঁরা" যাতে তাই পান, গলায় ঝোলান
সেজন্য তাথৈতাথৈ নাচি ...
আমাদের নাচতে খুব ভাল লাগে ...
আমাদের নাচের তালে তালে স্মৃতির অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো মুছে যায় ...
আচ্ছা!
সেই ছোট্ট শামা আজ কত বড় হয়েছে?
সে কি তার বাবার জন্য গর্ব করে হাঁটে, নিঃশ্বাস নেয়? ...
নাকি, সারাক্ষণ ভয়ে থাকে পাছে কেউ তার গর্ব দেখে ফেলে!!
হেসে ফেলে ...
মিলনের কবিতা কি এখনও দুচোখে অশ্রু আর গৌরব নিয়ে বারান্দায় বসে চা খায়? ...
নাকি তাকে বদ্ধ ঘরে চা খেতে হয় যাতে তার গৌরবটুকু লোকের চোখে ধরা পড়ে না যায়!
মিলনের মা সেলিনা হোসেনকে কি রিক্সায় চড়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে মিলনের কথা ভাবার সময় চোখের পানি লুকোতে হয়?
আহা!!
নূর হোসেন! দরিদ্র নূর হোসেন!!! ...
তোমার কাছে ক্ষমা চাইবার যোগ্যতাও আমার নেই ...
তোমার বাবার, মায়ের নামও আমার মনে নেই ...
৪.
আচ্ছা মনে করে দেখি নূর হোসেনের গায়ে কি লেখা ছিল ...!!!
"গণতন্ত্র নিপাত যাক"... উড়ে যাক... যাহ!
যা গণতন্ত্র, উড়ে যা পাখি হয়ে ... আর আসিসনি ফিরে ...
আমরা কিচেনের কফিনে নিপাতিত স্বৈরাচারের দেখভাল করব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

