"এক বাফের এক হুত,
মরি গেলে টুক্কুরুঊঊঊট্টুক"
-- এরকমই ভীষন নৃসংশ, নিষ্ঠুর আর দয়ামায়াহীন স্লোক শুনে শুনে বড় হতে হয়েছে আমাকে।
মনে আছে, ছোটবেলায় যেখানেই যেতাম, তা সে সুসম্পর্ক বা দুঃসম্পর্কের মামাবাড়িই হোক আর চাচাবাড়িই হোক, যখনই লোকে শুনত আমি বাবামা'র পাঁচসন্তানের মাঝে এক এবং একমাত্র পুত্র, আর যাই কোথায়! এমন করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাত যে নিজেই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে বিব্রতবোধ করতাম। একটু ফাজিল শ্রেনীর চাচা-মামা-বড়ভাই গোছের কেউ হলে একগাল হাসি দিয়ে শুনিয়েই দিত সেই ভয়াবহ স্লোকটা,
'একবাফের এক হুত, মরি গেলে টু্ক্কুরুট্টুক'।
কি ভয়ংকর কথা! আমি তো মরে যাবই, এখন সেটার ভবিষ্যদ্বাণী করে লোকে আবার 'টুক্কুরুট্টুক'ও দেয়!!!
এক বাপের এক ছেলে, তাই যেন বেঁচে থাকতে পেরেই আমার ধন্য হওয়া উচিত। আমাদের ছোটসময়ে বাবা-মারা সুখী পরিবার গড়তেননা, হালিখানেক সন্তান তো থাকতই, একটু সচ্ছল পরিবার হলেই সেটা দুই হালি পেরিয়ে ডজনের দিকে মোড় নিতে চাইত। সেখানে একবাপের একপুত একটা আলোচনার বিষয়ই ছিল, আর সেই একপুতটা যদি হয় ছোটখাট ধরনের দুর্বল টাইপের একশিশু, তাহলে তো আর কথাই নেই। লোকে স্লোক না আউড়ে 'জগত কি', 'জীবন কি', 'আমি কে' এসব ফিলোসফি নিয়ে তো আর ভাবতে বসবেনা! তবে, খালা,ফুপু, মামী বা চাচীশ্রেনীর মায়াবতী মহিলারা, যারা অতটা নিষ্ঠুরভাবে ভাবতে বা কথা বলতে পারতেননা, তারাও মাথায় হাতবুলিয়ে মা'র দিকে করুণার দৃষ্টিতে চেয়ে বলতেন, 'একটা মাত্র ছেলে, আল্লাহ খালি বাঁচায়ে রাখলেই হইল।' মাও গলা মেলাতেন, 'দোয়া কইরেন আপা, যাতে সুস্থ্য থাকে। দেখেননা কি রোগা!'
নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একধরনের বিড়ম্বনার মধ্যে কেটেছে ছোটকাল।
জ্ঞানীলোকেরা বলেন, শিশুরা নাকি আহ্লাদ না করলে বাবা-মারা তাদের এত অত্যাচার সহ্য করতেননা; কথাটা ভাবার মতোও। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাবা-মা'রা সারাদিন কি পরিমাণ কষ্ট করে! সেই ফিরিস্তি দিতে যাচ্ছিনা, তবে এটা ঠিক যে অমন ছোটবাচ্চাটা যখন 'ফিক'করে হেসে তাকায়, বা আহ্লাদে চোখ কুঁচকে তাকায়, তখন বাচ্চার জন্য করা সারাদিনের কষ্টগুলোকে বাবামা'র কাছে পানিভাত মনে হয়। মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় উজ্জীবিত অনেকেই বলবেন, শিশুরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এটা করে, ফাইট ফর সারভাইভাল বলে কথা। এটা তাদের জিনের ভেতরই লেখা আছে, "যতদিন দাঁড়াতে না পারছো, ন্যাকামো করো।"
ঠিক একইরকম কারণে কিনা জানিনা, তবে আমার বাবা-মা'র এই "একবাপের একপুতকে কোনভাবে বাঁচিয়ে রাখা"র আপ্রাণ প্রচেষ্টার জন্য আমি যে আলাদা যে মনোযোগ/আদরটা পেতাম সেটা যাতে হাতছাড়া না হয়ে যায় সেজন্যই হোক, অথবা কাকতালীয়ভাবেই হোক, তাঁদের দুঃশ্চিন্তার সাথে পাল্লা দিয়ে আমিও সেই ছোটবেলা থেকে সমানে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ঝামেলা বাঁধিয়ে এসেছি। সম্ভবতঃ বেচারারা একটা দিনের জন্যও মনোযোগকে একটু অন্যদিকে নিতে পারেনি। আজ এক্সিডেন্ট তো কাল অসুখ, পরশু পাশের বাসার দামড়া ছেলেটার হাতে প্যাঁদানি খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী ফেরা। এসব লেগেই ছিলো, আর সেজন্যই অন্ততঃ সাত-আট বছর বয়েস পর্যন্ত আমি বাবা-মা'র "ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব তো?"-জাতীয় টেনশটাকে একদম টপ সাসপেন্সে ভরপুর করে যে রেখেছিলাম সেটা নিয়ে নিজের খানিকটা গোপন গর্ববোধ করাটাকে আমি দোষ দিচ্ছিনা।
যতদূর মনে করতে পারি প্রথম দুর্ঘটনাটা বাঁধালাম যখন আমার মেঝখালারা বাসায় বেড়াতে আসল। আমার সমবয়েসী খালাত ভগ্নীটার সাথে কে কতবেশী পানি খেতে পারে এই নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে আমি মগের পর মগ পানি গিলেই গেলাম, আর সে আমাকে ফাঁকি দিয়ে মগের পর মগ পানি বেসিনে ফেলে গেল। আমি এতই বোকা যে একবার দেখলামওনা সে কি করছে, ডানে-বাঁয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে গ্লাসের পর গ্লাস পানি গিলে চলছি তো চলছিই! আমার পাকস্থলীটাও বেসিনের মতো ছিলনা তখন, কাজেই খেলায় হারতে বসে বেতাল-বেপরোয়া হয়ে পানি টেনেই গেলাম; কিছুক্ষণের মাথায়ই ধপাস ধরনীতল, মানে জ্ঞান হারালাম! তারপর আর কি, বাবা-মা'র ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি।
সেই চার বছর বয়েসের সময়েই আরেকবার বাবা বাজার থেকে ছোট দেখে একটা লাউ কিনে আনলেন; যতবারই বাবা লাউ আনতেন, আমার টার্গেট ছিল লাউটাকে দুইহাতে ওঠানোর চেষ্টা করা। বলাই বাহুল্য তখন পর্যন্ত একবারও আমি সফল হইনি। তো, সেবার লাউটা ছোট থাকায় আমি একটানেই উঠাতে পারলাম, এই আনন্দ আমি কোথায় রাখি! মনের আনন্দে সেই লাউ হাতে সারাঘর ঘুরতে লাগলাম আর গাইতে লাগলাম, 'মামা-ভাইগ্না যেখানে, আপদ নাই সেখানে।' খানিকপরে আর শুধু ঘুরাঘুরিতেও পোষালনা, লাউ হাতে নিয়ে গান গাইতে গাইতে এবার মা'র মোড়াটার উপর উঠলাম, আর তখনই আবার, ধপাস! পড়েটড়ে মোড়াও ভাংলাম, নিজেও অজ্ঞান হলাম। এবারে উপরি হিসেবে মাথাটাও গেল ফেটে। আবারও বাবামা'র সেই দৌড়াদৌড়ি।
তবে আরো ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটল ছয়বছর বয়েসে রাস্তা পার হতে গিয়ে। তাড়াহুড়োর মাঝে একলোকের সাইকেল বরাবর দিলাম জাম্প, কি বুঝে কে জানে? অথবা এমনও হতে পারে যে আমি রাস্তা পারহচ্ছিলাম ঠিকই, ব্যাটা এসে আমার উপর সাইকেল চাপিয়ে দিলো। যেটাই হোক, তাতে ফালফলটা বদলানোর কথা না, কাজেই, সাইকেলের চাকার একটা স্পাইক আমার মাথায় ঢুকে গেল! কতদূর ঢুকেছিলো জানিনা, তবে মাথা ফেটে রক্তে সয়লাব। সেই রক্তের দৃশ্য এখনও মনে আছে! তার চিহ্ন হিসেবে আমার খুলির বামপাশটা এখনও একটু ফুলে আছে। বাবামা আর কি করবেন, ছুটোছুটি, দৌড়াদৌড়ি। তবে এটাও মনে আছে যে পরদিনই ব্যান্ডেজ মাথায় পাশের বাসার চারবছরের ছেলেটাকে বেদম কিলঘুষি মেরেছিলাম। ওর মা আমার মাথার ব্যান্ডেজ দেখে কিছু বলেননি। তারচেয়েও বড়কথা হলো, আমার মা-বাবা যে কিছু বলবেনা সেটা তো আমি জানতামই। "একবাফের একহুত" বলে কথা!
এতকিছুর পরও আসল ঘটনাটা বলা হয়নি, সেটা আট বছর বয়েসের। বাবা-মাকে সিরিয়াস রকমের টেনশনে ফেলেছিলাম। একদিন সকালে খেলতে নেমে দেখি মতিঝিল কলোনীর পাশে আইডিয়াল স্কুলের সামনের বড় রাস্তায় কোন গাড়ীঘোড়া নেই। 'হরতাল' নামের কি যেন একটা হচ্ছে, একটু পরে নাকি আবার 'কারফিউ' নামের অন্যকিছু একটা শুরু হবে। হরতাল/কারফিউ আমাদের কাছে কোন বড় বিষয় ছিলনা, রাস্তা ফাঁকা এটাই হলো আসল কথা। আমি আর বন্ধু সাবু মিলে রওয়ানা দিলাম আমার মায়ের মামার বাসায়, তাঁরা থাকতেন মৌচাক। যাওয়ার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, সে বাসায় বেড়াতে গেলেই সেই নানু মজার মজার চমচম খাওয়াতেন। সাবুকে এর আগে অনেক শুনিয়েছি সেই চমচমের কাহিনী, কিন্তু রিক্সাভাড়া নেই দেখে নিয়ে যেতে পারিনি। সেজন্যই, সেদিন রাস্তায় গাড়ীঘোড়া নেই, পায়ে হেঁটে মৌচাক চলে যাওয়া যাবে -- এই মোক্ষম সুযোগ কিভাবে ছাড়ি! বড় রাস্তায় ফুটবল খেলে-টেলে আমরা যখন রওয়ানা দিলাম তখন সম্ভবতঃ কারফিউ শুরু হয়ে গিয়েছিল বা হবে হবে করছে। কিন্তু রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে যাবার আগে আমরা বুঝতেও পারিনি আসলে কি হচ্ছে! বরং রাস্তায় মানুষজন কম দেখে আমরা বেজায় খুশী, রাস্তার মাঝখানে জমিদারের মতো হাঁটতে পারাটা তো চাট্টিখানি কথা না!
সবই আমাদের মনমতো চলছিলো, কিছুক্ষণ পরেই নানুর বাসায় চমচম খাওয়ার কথা, কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধল তখনই যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কাছে এলাম। দেখলাম বন্দুক/লাঠি হাতে কয়েকজন নীলশার্ট/খাকিপ্যান্টের ঠোলা ছুটে আসছে, আমাদের দিকেই! পড়িমড়ি করে উল্টোদিকে দৌড় দিলাম দুজনেই, রাস্তার ঐপারে গিয়েই মোমেনবাগের কোন একটা চিপাগলিতে সাঁই করে ঢুকে পড়ে ধাতস্থ হলাম। তারপর, সেখানেই এক বাসার গেট খোলা দেখে সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ি। বিরাট দোতলা বাড়ী, সামনে বাগান। তারওপর, সেযুগে মানুষ তখনও যান্ত্রিক হয়ে যায়নি, সে বাসার খালাম্মা আমাদের যত্ন করে দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। তারপর ঘুমানোর জন্য বকাবকি না করে আমাদের বাড়ীর সামনের বাগানে খেলতেও দিলেন। এ যেন সাক্ষাৎ স্বর্গ!
বিকেল চারটায় যখন কারফিউ শিথিল হলো, মনে আছে সেই বাসার ড্রাইভার আমাদের বাসায় পোঁছে দিয়েছিল। কারফিউ চলেছে ছয়ঘন্টা, আমি বাসায় নেই, বাবা-মা নিশ্চয়ই বাসার আশপাশেও খুঁজেছেন, এবং পাননি। সেই ছয়ঘন্টা তারা কিভাবে কাটিয়েছিলেন আমি কল্পনা করতে পারিনা, তবে এটাও ঠিক যে আমি আজও সেটা জিজ্ঞেস করার সাহসও পাইনি। ঋণের বোঝা আর কত বাড়ানো যায়?
[বছরখানেক আগে সচলায়তনে "আমার ছেলেবেলা" সংকলনে প্রকাশিত, খানিকটা পরিবর্তিত।]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

