somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেখে নিও, একসময় নব্বই হারিয়েই যাবে

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি খুব জড়োসড়ো শংকিত এবং খানিকটা বিব্রত মনে দেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন উল্টে-পাল্টে দেখি, মনে একটা ক্ষীণ আশা কোথাও না কোথাও পেয়ে যাব। কেউ না কেউ ভুলে থাকতে পারবেনা। পাওয়া গেছে, দুচারটা কাটতির বালাই নেই এমন পত্রিকায় ঠিকই পাওয়া গেছে। তবে যাদের কাটতির বড় সুদিন, যারা পরবর্তী প্রজন্মের সংবাদপত্র হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাচ্ছে, তারা কি ভুলে গেল? নাকি তারা আমাদের ভুলে যেতে বলছে।

কারণ, আজ ৬ই ডিসেম্বর, স্বৈরাচারের হাত থেকে আমাদের মুক্তির দিন।

আমরা তখন কিশোর ছিলাম, যা বলা হয় তাতেই সায়, যা কিছু দেখি তাতেই রায়। আমরা ভেবেছিলাম, আমদের বড় ভায়েরা যুদ্ধে জিতেছে; আমরা ভেবেছিলাম আমরাও তাদের মতো অর্জন করতে পারবো। লাশের রাজনীতির এ যুগে সেসময়ের নগণ্য সংখ্যক লাশের কথা শুনে আপনি হয়তো ভাববেন, "এ আর এমন কি?"। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সেদিনের একেকটি যুবকের চোখে-মুখে-নাকে-কানে আমরা যে প্রত্যয় দেখেছিলাম, সেদিনের এককেটি কিশোরের চোখে আর হাত-পায়ের দাপাদাপিতে আমরা যে স্বপ্নের স্ফুরণ দেখেছিলাম -- সেটার মৃত্যু আরো অনেক বড় কিছু। এটা ছিলো আমাদের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন, এমনকি বলা যায় একমাত্র রাজনৈতিক অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি নতুন মুক্তিযুদ্ধ।

আগেও একটা লেখায় লিখেছিলাম, আবারও তুলে দিই, মাঝে মাঝে একটা প্রশ্ন আমাকে ভীত করে তোলে। এই যে বিদেশে আছি, চাকরি বাকরি করছি, অথবা দেশে থাকলেও হয়ত ভাল কোন চাকরী করতাম-- অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে পড়তে হতোনা; তখন হঠাৎ যদি একটা যুদ্ধ লাগত? ঠিক ৭১ এ যেমন দেশ আক্রান্ত হয়েছিল পাক হানাদের দ্বারা, সেরকম কিছু? তাহলে কি এই নিরাপদ/নিশ্চয়তামূলক জীবন ছেড়ে দেশের জন্য লড়ার রিস্কটা নিতাম? এখনই যদি যুদ্ধ লাগে, তাহলে কি দেশে গিয়ে অস্ত্র ধরব, না নিয়মিত অফিস করে রাতে ইন্টারনেটে এখানে সেখানে গনসংযোগ করেই দেশের প্রতি দ্বায়িত্ব শেষ করব? খুব কঠিন প্রশ্ন। ভয় হয়, সাধারন চিন্তায় ভাবলে মনে হয় যে, দেশে ফিরে যাবনা। হয়ত দেশকে ভালবেসে দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা তখন করব, কিন্তু সবটাই এখনকার নিশ্চয়তাটুকুকে অটুট রেখে।

আমি জানিনা এরকম প্রশ্নের জবাবে আপনি পাঠক কি ভাবছেন।

তবে এটা বুঝি যে, সমস্যাটা দেখা না দিলে বলা যায়না কি করব; মানে যুদ্ধ লেগে গেলে তখনই শুধু বলা যাবে কি করব। যুদ্ধ করার জন্য যে ছুটে যাবনা সেটা আমি পুরো নিশ্চিত নই। মনের যে অংশটুকু যুদ্ধে যাবার জন্য সায় দেয়, সেখানে বাস করে এক অদ্ভুত স্মৃতি।

হুমায়ুন আহমেদ তার 'জোছনা ও জননীর গল্প' বইয়ে লিখেছিলেন ৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের খবর যখন তিনি পেলেন, তখন ঢাকার খোলা রাস্তায় তিনি আর তাঁর বন্ধু (সম্ভবতঃ আনিস সাবেত) প্রাণখুলে দৌড়েছিলেন, আর কতক্ষণ পরপরই হেসে উঠেছিলেন। তাঁর বর্ণনাটা যতবার পড়েছি ততবারই মনে হয়েছে 'ইস্, আমি যদি তখন থাকতাম।' পড়তে পড়তে অদ্ভুত অনুভুতি হতো, আনন্দে হাসতে থাকি। আমরা এই প্রজন্ম সেই ১৬ই ডিসেম্বর পাইনি, আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে এরকম ছোটখাটো একটা স্বাদ আমরা পেয়েছিলাম। সেটাই ছিল ৯০ এর ৬ই ডিসেম্বর। সেসময় আমাদের ভয় হতো এই এরশাদকে হয়ত কোনদিনই সরানো যাবেনা গদি থেকে, কিন্তু ৬ই ডিসেম্বর সেই ভয় দূর করে দিয়েছিলো। সাথে সাথে এক আত্নবিশ্বাস দিয়েছিলো আমাদের যে, সামরিক স্বৈরাচার এদেশে আর জাঁকিয়ে বসতে পারবেনা।

আজ, আমাদের সেই ভয় আবার কবরের ঘুম ভেঙে মোটাতাজা তাগড়া হয়ে ফিরে আসছে, আমাদের সেই আত্নবিশ্বাসকে একদল লুটেরা, যাদের হাতে আমরা বিজয়কে ছেড়ে দিয়েছিলাম, তারা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

ভয় থেকে কি স্মৃতিলোপ হয়? হয়, আলবাৎ হয়। শোষিতের মাঝে শোষকেরা নিরন্তর নিত্যনতুন ভীতির জন্ম দেয় এজন্যই, পুরোনো স্মৃতির চেয়ে অনাগত দুঃসময় তাদের সবকিছুকে জেঁকে ধরে। তাদের স্মৃতিলোপ হয়।

আরেকটা কারনেও লোপ হয়, মৃতদের অভিশাপে।

আমাদের বড়ভাই সেসময়ের সেসব তরুণদেরও স্মৃতিলোপ হয়ে গেছে। আমাদের সেসময়ের কিশোরদেরও স্মৃতিলোপ হতে চলেছে।

আমি স্মৃতিকে বড় ভালোবাসি, আক্রোশে ফেটে পড়তে ইচ্ছে হয়, আমি চুপ থাকতে পারিনা।
২৮টি মন্তব্য ২৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×