somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রেসক্রিপশন ১: চালের দাম কত হওয়া উচিত?

১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি অর্থনীতি ভালো বুঝিনা, ব্যবসা বানিজ্যও ভালো বুঝিনা, কৃষিকাজ তো বোঝার প্রশ্নই আসেনা, এমনকি রাষ্ট্রনীতিও তেমন একটা বুঝিনা। শুধু গাণিতিক হিসাব-নিকাশটা খানিকটা বুঝি। এরই ভিত্তিতে একটা বিশ্লেষণে যেতে চাই, মানে সোজা বাংলায় বললে হিসেব করে বের করতে চেষ্টা করবো এই পোস্টে যে "চালের দাম কত হওয়া উচিত।" একেবারে সবচেয়ে কমদামী গরীবের মোটাচাল নিয়ে বিশ্লেষণ করবো, কারণ চালের দাম বাড়লে গরীব লোকজনই বিপদে পড়ে। এই ব্লগ পড়বেন যে শ্রেনীর লোক, চালের দাম বাড়লে তাদের হয়তো দু'চারটা বিলাসদ্রব্যঘটিত আমোদ-প্রমোদের খানিক ব্যাঘাত ঘটে। যেমন হয়তো চায়ের চিনিটা খানিকটা কমে যায়।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইদানিংকার "সংসদে প্রথম সারিতে বসতে চাওয়ার দাবীতে আন্দোলন" শুরু করার আগ পর্যন্ত বিএনপি নেতারা মূলতঃ চালের দাম দশ টাকা হচ্ছেনা কেন, সেটা নিয়ে সরকারকে আক্রমণ করে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে সরকারী দল হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ার মতো ভাব নিয়ে বললেন, "কই এমন কিছু তো বলা হয়নি।" সে যাই হোক, দশ টাকায় যে এখন চাল খাওয়া সম্ভব না সেটা আমিও বুঝি, পাঠক, আপনিও বোঝেন। কাজেই সেটা নিয়ে "খেতে চাই, খেতে চাই" বলে লাফানো, বা "এমন কথা বলিনাই, বলবোনা" বলে গা বাণনচানো -- কোনটাতেই আপনার আমার কোন উপকার হবেনা, এটাও নতুন করে বোঝানোর দরকার নেই।

বরং আমরা একটা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি চালের দাম কত হওয়া উচিত। সেখান থেকে হয়তো সরকারের কাছে "এত টাকায় চাল খেতে চাই" টাইপের একটা দাবীনাম তুলে দেখা যেতে পারে। ভূমিকা আমার চিরকালই লম্বা হয়, আর না টেনে সোজা হিসেবে চলে যাই।


প্রথমে কিছু ফ্যাক্টসের দিকে নজর দিই:

১. আওয়ামী লীগ যখন ২০০১ এ ক্ষমতা ছাড়ে তখন মোটাচাল ছিলো ১০ টাকা কে.জি।

২. বিএনপি যখন ২০০৬ এ ক্ষমতা ছাড়ে তখন মোটাচাল ছিলো ২০ টাকা কেজি।

৩. উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ একটা মুদ্রাস্ফীতি থাকে, যেটা আওয়ামী লীগ আমলে মোটামুটি গড়ে ৫% এর আশেপাশে ছিলো। ধরে নেয়া যায় যে , এই মুদ্রাস্ফীতির পেছনে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটিংয়ের হাত নেই, এটাকে নাম দিলাম "প্রাকৃতিক মুদ্রাস্ফীতি"।

৪. বি এনপি'র আমলে শেষ তিন বছরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গিয়েছিলো অনেক বেশী। সেজন্য প্রাকৃতিক মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা বাড়বে স্বাভাবিক, ড্যাটা বলছে ২% থেকে ৩% বেড়ে গিয়েছিলো -- আমরা বেশীটাই হিসেবে নিলাম, মানে বিএনপির শেষ তিন বছর শুধু প্রাকৃতিক মুদ্রাস্ফীতি ধরলাম ৮%।

৫. বিএনপির শাসনের প্রথম ২ বছর ৫% হারে, এবং শেষ ৩ বছর ৮% হারে যদি বাড়ে -- তাহলে ১০ টাকার চালের দাম বেড়ে গিয়ে হয় ১৩ টাকা ৮৮ পয়সা, আমরা এটাকে হিসেবের সুবিধার জন্য ১৪ টাকা ধরলাম।


এখন আসুন কিছু হিসেব মিলাই:

১. বিএনপি'র আমলের শেষে চালের দাম ২০ টাকা কেজি ছিলো, অথচ এটা হবার কথা ছিলো ১৪ টাকা; তাহলে বলা যায়, বাড়তি যে ৬ টাকা, সেটা হয়েছে সিন্ডিকেটিংয়ের কারণে।

২. তারমানে, তত্বাবধায়ক সরকার এসে যদি সাথে সাথে চালের সিন্ডিকেট এবং এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বাকী দুই সিন্ডিকেটের (সার আর তেলের সিন্ডিকেট) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতো, তাহলে ২০০৭ এর জানুয়ারীতে চালের দাম করা যেত ১৪ টাকা কেজি। কিন্তু সেটা তারা পারেননি -- আমরা জানি।


এখন আবার কিছু ফ্যাক্টসের দিকে নজর দিই:

১. তত্বাবধায়কের আমলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম অতিরিক্তরকম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিলো।

২. এর ফলে সেসময় প্রাকৃতিক মুদ্রাস্ফীতিও বেড়ে গিয়ে সব জিনিসের দাম এমনিতেই বাড়ার কথা। পরিসংখ্যান বলে সেটা ছিলো ১০% এর মতো।

৩. কাজেই ১০% হারে বেড়ে তত্বাবধায়কের দুবছরে চালের দাম হবার কথা ২৪ টাকা ২০ পয়সা।

৪. কিন্তু ২০০৭ এর শেষদিকে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট প্রকট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে চালের চাহিদার তুলনায় যোগান অনেক কমে যায়।

৫. তদুপরি বাংলাদেশে সিডর নামক এক ভয়াবহ ঝড় হয়।

৬. শোনা যায় তত্বাবধায়ক সরকারকে ঝামেলায় ফেলার জন্য ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করে সিন্ডিকেটিংকে আরো জোরদার করে তোলে।




আসুন আবার একটু হিসেব মিলাই:
উপরের ১,৪,৫, ৬ -- এই চার প্রভাবকের কল্যাণে মোটা চালের দাম ২০০৮ এর শুরুর দিকে বেড়ে গিয়ে ৩৩ টাকা পর্যন্ত হয়!! যে চালের দাম ২৪ টাকা হবার কথা তার দাম ৩৩ টাকা মানে, ৯ টাকা বাড়ার পেছনে যে চারটি কারণ সেগুলো হলো, সিন্ডিকেট, সিডর, তেলের দামবৃদ্ধি, খাদ্যমন্দা।


এখন আবার কিছু ফ্যাক্টস:

১. আনন্দের বিষয় হলো তত্বাবধায়ক সরকার থাকতে থাকতেই বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটের ঝামেলা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া সিডর টাইপের দুর্যোগ তো যে বছর আসে শুধু সে বছরই প্রভাব ফেলে।
কাজেই বর্তমান চালের দরে এ দুটোর কোন প্রভাব থাকার কথা না।

২. ২০০৮ এর শেষ দিকে হঠাৎ করে তেলের দামও একই বেগে উল্টোপথে কমা শুরু করে। কমতে কমতে অপরিশোধিত তেলের দাম আগের দামের প্রায় ৩০% এ নেমে এসেছে। তেলের দাম কমার সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য জিনিস, বিশেষ করে চালের বেলা প্রযোজ্য সারের দামও চরম গতিতে কমে এসেছে।
কাজেই বর্তমান চালের দরে এটার বাড়তি প্রভাব তো পড়ার কথাইনা, বরং একারণে চালের দাম কিছুটা কমা উচিত।

৩. বলা যায় যে উপরের ১ আর ২ এর কারণেই তত্বাবধায়কের শেষদিকে চালের বাজারদর ২৭ টাকায় নেমে এসেছিলো, মানে উপরের তিন ফ্যাক্টরের প্রভাব ছিলো কেজিপ্রতি ৬ টাকা।


এখন আবার একটু হিসেব মিলাই:

বিএনপি আর তত্বাবধায়ক সিন্ডিকেট দমায়নি। একদল তৈরী করেছে, আরেকদল ভিকটিম হয়েছে। আমরা এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি তারা সিন্ডিকেট দমাবেন।

তাহলে প্রশ্ন থাকে, বর্তমান সরকার তত্বাবধায়কের আমলের ২৭ টাকা কেজির চাল সিন্ডিকেট দমিয়ে কততে নামাতে পারবে?



আবার কিছু ফ্যাক্টস:

১. সিন্ডিকেটিংয়ের প্রভাব -- চালের সিন্ডিকেটিং, তেলের সিন্ডিকেটিং আর সারের সিন্ডিকেটিং। এ তিনটির প্রভাবে তত্বাবধায়কের আমলে চালের দামে প্রভাব পড়েছিলো ৩ টাকা, উপরের ৯ -৬ = ৩।

২. অর্থাৎ সিন্ডিকেটিংয়ের এর প্রভাবে চালের বাড়তি দাম দিতে হয়েছিলো বি এনপি আমলে কেজিপ্রতি ৬ টাকা, আর গত আমলে ৩ টাকা -- মোট ৯ টাকা।

বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশাই সিন্ডিকেটিংয়ের প্রভাব দূর করে গরীব লোককে যাতে আর এই বাড়তি ৯ টাকা দিতে না হয়।


ফাইনাল হিসাব:

২৭ থেকে ৯ বাদ দিলে চালের দাম হওয়া উচিত, ১৮ টাকা। ধরলাম এতদিন পর্যন্ত গেঁড়ে থাকা সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না। ওকে আরো ২ টাকা ছাড় দিলাম।

হিসেব করে দেখলাম, চালের দাম হওয়া উচিত প্রতি কেজি ২০ টাকা।


(ভোটের পরদিন এক সিএনজিওলা আমাকে বলেছিলো, ২০ টাকা হইলেই খুশী)



সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৩:৩৪
৫৮টি মন্তব্য ৪৯টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×