নিন্দুকের অভাব নাই, বিশেষ করে যখন নিন্দার বিষয়বস্তুটা হয়ে যায় বিশ্বজোড়া বড় বড় কর্পোরেটরা। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদঘেঁষা কিছু দুষ্টচক্রের কর্পোরেটের (মূলতঃ তেলব্যবসায় জড়িতরা) কারণে ইনটেলি এ্যারেনাতে জগতের তাবৎ কর্পোরেটওয়ালাদের গালিগালাজ করার একটা জনপ্রিয় রেওয়াজ দেখা যায় ইদানিং। না, তার সবটাই অর্থহীন বা অযথা তা বলছিনা, আবার তার অনেকটাই যে ব্যাখ্যাহীন ক্লিশে আয়োজন না, তাও বলছিনা। যাই হোক, আমার মূল্যায়নে "প্রফিট" ছাড়া কিছু বুঝতে না পাওয়া কর্পোরেটরা কিন্তু তারপরেও কাজ করে যাচ্ছে, সবরকমের খাতেই কোন না কোনভাবে অবদান রাখার একটা প্রচেষ্টা আমি এদের মধ্যে দেখতে পাই। একেবারে রক্টচোষা জোঁকের মতো নির্লজ্জ আমার এদেরকে কখনই মনে হয়নি, অন্ততঃ কর্পোরেট কালচারের ঘোর বিরোধীও এটা মানবেন যে আজকের দুনিয়ায় অন্ততঃ ব্যক্তিপর্যায়ের চাকরীজীবিদের মধ্যে নীতি বা সততা যাই বলুন তার সবচেয়ে চমৎকার বাস্তবায়ন কিন্তু ঘটিয়েছে কর্পোরেটরাই।
পোস্টের মূল উদ্দেশ্য এটা ছিলোনা, তাও লিখেই যখন ফেললাম, থাকুক মিলেমিশে। মূল প্রসঙ্গটা কর্পোরেটদের পরিবেশ সচেতনতার কতগুলো ইন্টারেস্টিং উদাহরণ নিয়ে। এমনিতেই বড় বড় সবকোম্পানীরাই নানানভাবে চেষ্টা করছে এনার্জি সেভিংয়ে অবদান রাখার, "থ্রি আর" (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকল) এরা সবাই বেশ সিরিয়াসলীই মানে। যেমন যে কামরাগুলো ব্যবহার হচ্ছেনা, সেগুলোর বাতি অবশ্যই বন্ধ রাখা, ফটোকপি কাগজের দুপৃষ্ঠেই করা, এরকম অনেক কিছু। বিশেষ করে যখন দেখি কর্মচারীদেরকে আহবান জানানো হয় ঘরে পড়ে থাকা অব্যবহৃত সিডি/ডিভিডি ভলান্টারিলি জমা দিতে যাতে করে ওগুলো থেকে নানান ধরনের ইলেকট্রনিক্সে যন্ত্রপাতির বডির পুনরুৎপাদনে কাজে লাগানো যায় -- তখন কিছুটা হলেও শান্তি পাই। এমনিভাবে সব কোম্পানীই দৈনন্দিন জীবনের নানান ক্ষেত্রে নানানভাবে ইকো বা পরিবেশ সচেতনতাকে বাস্তবায়ন করছে। তেমনি কয়েকটি ইউনিক ইকো আইডিয়া এখানে তুলে ধরবো।
প্যানাসনিকের ইকো প্রোডাক্টস:
হেন ইলেকট্রনিক্স নাই যেটা প্যানাসনিক বানায়না। হোম এন্টারটেইনমেন্টের বিশালাকায় টিভি থেকে শুরু করে কিচেন প্রোডাক্টস ওভেন, ফ্রিজ, টয়লেটের ওয়াশলেট, বাথরুমের ওয়াটারপ্রুফ স্পিকার -- মানে যেখানে যা যা ব্যবহার করা যায় সবরকমের ইলেকট্রনিক্সই এরা বানায়। এর ফলে এনার্জি সেভিংয়ের স্কোপওয়ালা যন্ত্রপাতি বানানোর সুযোগও প্যানাসনিকের অনেক বেশী। যেমন বৈদ্যুতিক বাল্ব থেকে শুরু করে এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন -- সবকিছুর ব্যাপারেই সাধারণ প্রোডাক্টের পাশাপাশি খুব উঁচুমানের বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রোডাক্ট এদের আছে, এবং অবশ্যই এগুলোর দাম একটু চড়া।
তো, এই চড়াদামের প্রোডাক্ট বিক্রীর জন্যই প্যানাসনিকের ইকো ক্যাম্পেইন। এটা হলো প্রত্যেক প্রোডাক্টের জন্য একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছের উল্লেখ থাকে, যেমন ধরুন, এসি কিনলে পাঁচটা গাছ। ফ্রিজ কিনলে তিনটি গাছ, এরকম প্রত্যেক প্রোডাক্ট বিক্রীর জন্য একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ প্যানাসনিক রোপন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।
বলা যায় যে, গাছ যদি রোপনই করবে তবে এমনি এমনি করলেই তো হয়, এত ভংচংয়ের দরকার কি। তাদের উত্তরটা অনেকটা সামহোয়ারের সেই এসএমএস ক্যাম্পেইনের মতো -- ইকোফ্রেন্ডলি কাজের সাথে সাথে জনসচেতনতা বাড়ানো। যুক্তি একেবারে অমূলকনা, পঞ্চাশ হাজারের সাধারণ এসির বদলে দশ হাজার টাকা বেশী দিয়ে ইকো ফ্রেন্ডলি এসি কিনলে মনের মধ্যে সচেতনতা আপনা আপনিই তৈরী হয়ে যাবে।
মোবাইল অপারেটর কে.ডি.ডি.আই'র ক্যাম্পেইন:
কে.ডি.ডি.আই-এ.ইউ জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর কোম্পানী। জমজমাট ব্যবসা করছে, এই রিসেশনের মধ্যেও এরা লাভ করেছে গত বছরের প্রতি কোয়ার্টারে। দিন ভালো গেলে মনও ফুরফুরে থাকে, নানান জনদরদী কাজে উৎসাহটা এমনিতেই বেশী থাকে। এই কোম্পানীর ইকো ক্যাম্পেইন তাই প্যানাসনিকের মতো অতটা ব্যবসায়িক না। একটু রয়েসয়ে ক্যাম্পেইন করছে এরা।
জাপানে প্রত্যেক অপারেটরের নির্দিষ্ট ফোনসেট থাকে, ক্রেতারা সার্ভিস নিলে একই সাথে ফোনসেটও কেনে। কারণ, সেক্ষেত্রে সেটের দাম প্রায় দিতেই হয়না, মাসে মাসে কাটা যায় টাইপের। তো, কেডিডিআইর ফোনসেটে মোবাইল ফোনের নানান ফাংশনের সাথে বাড়তি যোগ হয়েছে আরেকটি ফিচার, যেটা হলো, এই ফোনসেটকে শরীরে সেট করে ফিচারটি অন করে দৌড়ালে বা হাঁটলে সেটা আপনি কতটা পথ হাঁটলেন বা দৌড়ালেন, তা পরিমাপ করবে। প্রতি এক কিলোমিটার হাঁটার জন্য কোম্পানীর "গ্রীন রোড প্রেজক্টে" যোগ হবে এক ইয়েন বা ৭০ পয়সা। এই ক্যাম্পেইনটাকে অতটা নির্লজ্জ বলা যায়না, আপনার একটা কেডিডিআইয়ের ফোন থাকতে হবে সেটা ঠিক, তবে বাকী যে কাজটা করতে হবে সেটা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খারাপনা, গুণীজনেরা বলেন, হাঁটাই সবচেয়ে ভালো ব্যায়াম। জনগণের স্বাস্থ্যও ভালো থাকলো, ফ্রেশবাতাসের জন্য পরিবেশে সবুজের পরিমাণও বাড়লো -- মন্দ কি!
আমি হিসেব করে দেখলাম, অফিসের দিন প্রতিদিন বাসা থেকে স্টেশন, ট্রেন বদল, স্টেশন থেকে অফিস -- দিনে দুবার এই আসা যাওয়াতেই আমার প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটা হয়, যেহেতু জোরে হাঁটি বলা যায় অন্ততঃ চার কিলোমিটার হাঁটি। আর বন্ধের দিন তো বাজার করা, ঘোরাঘুরিতে আরো বেশী। ধরলাম সপ্তায় ৩০ কিলো মিটার হাঁটা হয়। ৫২ সপ্তায় সেটা গিয়ে দাঁড়াবে ১৫৬০ কিলোমিটার। কেডিডিআইর গ্রাহক আছে অন্ততঃ ৩ কোটি। এরা সবাই সিরিয়াসলি এই ক্যাম্পেইনে অংশ নিলে বছর শেষে "গ্রীন রোড প্রেজক্টে"র জন্য তাদের গুনতে হবে ৫ হাজার কোটি ইয়েন, বা সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা!! দেখি আগামী বছর তারা কি বলে!
ইকো স্মোকার : ইলেকট্রনিক সিগারেট
এটা কোন বড় কর্পোরেটের ক্যাম্পেইননা, কোন অতিরিক্ত বুদ্ধিমান মানবমস্তিষ্ক প্রসূত আইডিয়া -- ইলেকট্রনিক সিগারেট। ছবিতে দেখছেন ইলেকট্রনিক সিগারেট দেখতে কেমন দেখায়, নাম "ইকো স্মোকার"।
যারা নিকোটিন এ্যাডিক্ট তাদের জন্য ইকো স্মোকার কাজ করবেননা, তবে বিদ্বানরা বলেন কোনভাবে একুশদিন নিকোটিন ছাড়া কাটাতে পারলে নিকোটিনের প্রতি শারীরিক যে আসক্তি সেটা চলে যায়, বাকী থাকে মানসিকটা। সেই মানসিক অংশ নিয়েই কাজ ইকো স্মোকারের।
এতে সিগারেটের আগায় আগুন জ্বলবে (আসলে ইলেকট্রিক বাল্ব), আর আপনার মুখেও ধোঁয়া ঢুকবে; সেটা তৈরী করা হবে একরকম সুপার ক্রিটিকাল মিস্টিফিকেশন টেকনোলজীর মাধ্যমে কার্ট্রিজের ভেতর থাকা তরলকে ধোঁয়ায় পরিণত করে। নিকোটিন আর টারের ধোঁয়া পরিবেশেও ছড়াবেনা আপনার ফুসফুসেও ঢুকবেনা। অলরেডী জাপানে ২০ হাজার বিক্রী হয়েছে এই ইকো স্মোকার। দাম ১০০ থেকে ১৫০ ডলারের মধ্যে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

