somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবু-উম্মুদের দেশে

১৬ ই এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৯:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আবু করিম, আবু ইরাদ, আবু সাফায়াতের আর দুই মহিয়সী উম্মুর গল্প

না, শিরোনাম পড়ে মরুভূমিতে উট আর তল্পিতল্পাসহ তিন আরব সওদাগর বা মুসাফিরকে কল্পনা করার দরকার নেই, নামের আগে "আবু" থাকলেও এই তিনজন এদেশের, মানে আমাদের সুজলা সুফলা বাংলাদেশেরই লোক; হোমরা চোমরা তো অবশ্যই, তা নাহলে কি লোকের আলোচনায় আসে কেউ? আর উম্মুদ্বয়ের কথা তো বলাই বাহুল্য।

১.
আবু করিমের করিম নামে কোন ছেলে আছে কিনা জানা যায়নি, অথবা আবু করিম লোকটি আসলে কেমন, মানে পেশায় সৎ না দূর্নীতিবাজ, তাও আমি জানিনা। আসলে আবু করিমের গল্প এখানে বললেও, আবু করিম ফোকাসের বাইরেই থেকে যাবেন, ফোকাসের ভেতরে থাকবো আমি, আপনি আর আমাদের মতো পনেরো-ষোল কোটি বাঙালী। আবু করিমের গল্পটা এখানে ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর জন্য।

আবু করিম হোমরা চোমরাই ছিলেন, গত বছরের জানুয়ারীতেই সম্ভবতঃ প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদগুলোর একটি, সচিব পদে চাকুরী করছিলেন। আবু করিম সম্পর্কে আর যেটা জানা যায় তা হলো, তিনি কবিতা লিখেন। তাঁর একটি ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা, যেটা আমি পড়েছি এবং পড়ে নিশ্চিত হয়েছি যে ব্যঙ্গবিদ্রূপে ভদ্রলোকের মোটেও দখল নেই; সেই অবস্থান থেকে এটাও বলা যায় যে তার কবিতাটি যে উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে, সে উদ্দেশ্যটি পুরোপুরিই মাঠেমারা গিয়েছিলো। তবে মাঠেমারা যাওয়া সেই কবিতাই আবার পূনর্জীবন পেয়ে বেঁচেবর্তে উঠে এসেছে, কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জনাব আবু করিমের জন্য, এবং এই কাল হয়ে যাওয়া কারণটি ধীরে ধীরে কলেবরেও বেড়েছে। আবু করিমের ঘটনাটা এজন্যই ইন্টারেস্টিং বেশী, কারণ প্রথমে তাঁর দোষ হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা; পরে সেই দোষের সিরিজটি টেইলর এক্সপ্যানশনের মতোই বেড়েছে, বাংলাদেশকে "বোখারা" নামে সম্বোধন করার জন্য তাঁর দেশদ্রোহীতার দোষও সম্পন্ন হয়েছে, এবং একই সাথে বোখারার লোকজনের ধর্মকে "বোখারী" নাম দেয়াতে আবু করিম নাকি ইসলাম ধর্মকেও অবমাননা করেছেন!

কবিতাটি আমি পড়েছি, পড়ে যেটা বুঝলাম, এতে সবচেয়ে আপত্তিকর যে অংশটি ছিলো, সেখানে আবু করিম মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। এটা নৈতিক অপরাধ -- মানতে আমার কোন দ্বিধা নেই, তবে এজন্য একজনের চাকুরী খাওয়া যায় কিনা বা লেখাটি যে বইয়ে ছাপা হয়েছিলো তা নিষিদ্ধ করে দেয়া যায় কিনা --এ সব প্রশ্নের ব্যাপারে আমি উদার থাকবো, বলবো গায়ের জোর খাটানোটা ফ্যাসিবাদ। তবে আমাদের শেখ হাসিনা ওরফে ম্যাডাম বিনতে শেখ ওরফে উম্মু জয় আর তাঁর সভাসদেরা এসব আমলে নেননা, তাঁরা আবু করিমকে জোরপূর্বক অবসরগ্রহন করানো আর তার বইটি নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে দেখিয়ে দিলেন যে, পরাক্রম কাকে বলে! কেউ টুঁ শব্দটিও করার সাহস পাচ্ছেনা!!

আবু করিমের ঘটনাটি আরো একটি কারণে আগ্রহের সৃষ্টি করে। সাধারণতঃ এরকম বই নিষিদ্ধ হওয়া বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নষ্ট হওয়ার কেইসগুলোকে সরকারের বিরোধী শিবিরের লুফে নেবার কথা, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এক্ষেত্রে মূল বিরোধীদল বিএনপি একেবারেই নিরুৎসাহ। কারণ যে নেই তা না, আবু করিম বঙ্গবন্ধুকে যেমন ব্যঙ্গ করেছেন, জিয়াকে তেমনি তুলোধুনো করতেও ছাড়েননি। মজার ব্যাপারটা শুধু এখানে যে বিএনপির নেতা-মন্ত্রীরা দেশের খাম্বা-টিনের চাল ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলেন যে কোথাকার কোন আবু করিমের কবিতা পড়ার সময় তাদের হয়নি। হলে ভদ্রলোকের আর সচিব হওয়া লাগতনা!


২.
এবার আসি আবু ইরাদের ঘটনায়। নাহ, ভদ্রলোকের নাম সরাসরি আবু ইরাদ না, ইরাদ নামে তাঁর এক সন্তান আছে শুধু। ইরাদ সুসন্তান না কুসন্তান সেটা বিচার করা আমার মতো নাদানের পক্ষে অসম্ভব, তবে এটা ঠিক যে সন্তান যেরকমই হোক, আবু ইরাদ তাকে নিয়ে সমস্যাতেই আছেন। এই আবু ইরাদ লোকটির সৎ হবার কোন কারণ নেই, চারদলীয় জোটের গত শাসনামলে মন্ত্রীত্বের ঝামেলা ছাড়া শুধুই ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিয়োজিত অল্পকয়েকজনের মধ্যে উনার নাম শোনা যায়; তাছাড়া পরিসংখ্যানগতভাবেই তাঁর আমলনামা সম্পর্কে ধারনা করা সম্ভব। যাই হোক, তাঁর অসততা এই লেখার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ না, কারণ সততা থেকে স্খলনের জন্য তাঁর কোন শাস্তি বা সমস্যা হয়নি।

তবে শাস্তি তাঁর হয়েছে। হয়েছে "পূর্বাধিকার" সূত্রে। পিতার সম্পদের মতো পিতার কর্মফলও মানুষ এতদিন উত্তরাধিকার সূত্রে ভোগ করতো, তবে ইরাদের বাবা তানভীর সিদ্দিকী ওরফে আবু ইরাদের বেলায় দেখা গেলো যে, না, পুত্রের কর্মফলও পিতার "পূর্বাধিকার সূত্রে" ভোগ করার ঘটনা ঘটে। গত কয়েকদিন ধরে ট্রেনে আসা-যাওয়ার সময় আরব্য রজনীর গল্পগুলো পড়ছি, যেখানে রাজার কথার অবাধ্য হলে সাথে সাথে উজিরের গর্দান চলে যায়! রাণীর কথা মতো না চললে রাজকুমারের গায়ে পানি ছিটিয়ে দেয়া হয়, সে হয়ে যায় খচ্চর! এরকম অসভ্য ঘটনা যে এখনকার পৃথিবীতেও ঘটতে পারে, বেচারা তানভীর সিদ্দিকীর অবস্থা না দেখে সেটা অনুমান করা সম্ভব হতোনা।

পুত্র ইরাদ সিদ্দিকী আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেনা বুঝে দলের হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে, সেজন্য সেদিন থেকেই ক্ষমা চাওয়া আর ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে করতে গলদঘর্ম অবস্থা আমাদের আবু ইরাদের। তাতে কি? ছেলের বক্তব্যের দোষে পিতার এতদিন ধরে কর্মকান্ড চালিয়ে আসা রাজনৈতিক পদটি কিভাবে মুহূর্তে উধাও হয়ে যেতে পারে -- সেই উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের "ম্যাডাম" ওরফে উম্মু তারেকও দেখিয়ে দিলেন যে রাজ্যের ক্ষমতা হাতে থাকুক বা না থাকুক, পরাক্রমে তিনি উম্মু জয়ের চেয়ে কখনই কম যাবেননা। কখনই না! কাভি নেহি!!

বিএনপির নেতাকর্মীরা হয়তো নির্বাচনে ভরাডুবির পর নিজেদের মনের না বলা কথাগুলো "ম্যাডাম"কে বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; তবে, আবু ইরাদের ঘটনা তাঁদের বুঝিয়ে দিলো যে "আবু"দের সংখ্যা যত কম হয়, রাজ্যের জন্য ততই মঙ্গল।


৩.
তবে সবসময়ই যে আবুদের সংখ্যা কম হলে ভালো তাও আবার না, "আবুর মতো আবু" হতে পারলে অবশ্য সংখ্যাবৃদ্ধিতে উম্মুদের অরুচি নেই! সেখানেই আসে আবু সাফায়াতের কথা।

আবু সাফায়াতকে কি কেউ মনে করতে পারেন? বাজি ধরছি, অধিকাংশেই পারবেননা, আমরা গোল্ডফিশ মেমোরীওয়ালা বাঙালী বলে কথা। আবু সাফায়াতও কারো নাম নয়, এই বাবারও ছেলেটির নামই সাফায়াত, যে কিনা প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ক জটিলতায়ই সম্ভবতঃ, বন্ধুকে খুন করে পার পেয়ে গিয়েছিলো শুধু এই কারণে যে, তার বাবার অনেক টাকা আছে। সেই আরব্যরজনীর গল্পের মতো, মহারাজ পাখি শিকার করতে গিয়ে বাচ্চা ছেলেকে মেরে ফেলেন, তারপর তার মাকে সোনা-দানা-মণি-রত্ন দিয়ে দেন -- সাধু সাধু পড়ে গেলো মহারাজের নামে। লে তামশা!! আবু সাফায়াতও দিয়েছিলেন, বেশী না, মাত্র বিশ/পঁচিশ কোটি টাকা! জাতীয় যুবরাজ আর তাঁর মাথায়-জেলমাখা সেপাইকে। তো একপক্ষে পেলো, আরেকপক্ষ কি চুষে চুষে আঙুল খাবে!

সোনা-দানা-মণি-রত্ন দিলেও যুগ পাল্টেছে, তাই এত দেবার পরেও আবু সাফায়াতকে কিছুদিন আশপাশে দেখা যায়নি। রাজ্যে আবার শান্তি এসেছে, এখন আবু সাফায়াতকে দেখা যায় আবার। গ্রামের পর গ্রাম ভূমি দস্যুর মতো দখল করে, সেখানকার হাজার ভাগের একভাগ জমি স্টেডিয়াম হিসেবে দান করে ধন্য ধন্য রব পড়ে গেছে এই সোবহান সাহেব, থুক্কু আবু সাফায়াতের নামে। ফুটবল একটু জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো কোটি টাকার টূর্ণামেন্টের জেরে, তারই রেশ ধরে দুটো স্টেডিয়াম আর কিছু টাকা আঙুল গলে পড়ে গেলে তাতে যদি দেশবাসী ফুটবলের তালে তালে সব ভুলে যায় আবু সাফায়াত তাতে মাইন্ড করার মতো লোক নন। এটা তো শুধু বাইরের খেলটা আমরা দেখলাম বা দেখছি, ভেতরে ভেতরে কত মণি-রত্নের আচার-পাচার হচ্ছে, কে বলবে!


৪.

শেষমেষ যোগবিয়োগের হিসেব শেষে দেখা যাচ্ছে যে শুধু হোমরা চোমরা হলেই চলেনা, সাথে ভান্ডারটাও পূর্ণ থাকতে হয়; নাহলে উম্মুরা খুশী হতে পারেননা। এসব নিয়ে আবার বেশী কিছু বলাও তো দায়, একদিকে সমস্যা হলো যদি বলতে গিয়ে বেপ্যাঁচে কোনোকিছুর অবমাননা করে ফেলি!
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৯:৩৭
৩৪টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×