১.
জাপানে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যে শহরে ছিলাম, সেখানে মুসলিমদের জন্য নামাজের কমন স্থান হিসেবে দু'রূমের দুটা ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়া হয়েছিলো, যাকে আমরা বলতাম, ইসলামিক সেন্টার। তবে, ইসলামিক সেন্টারে শুধু নামাজ পড়তেই লোকে যেতোনা, হালাল খাবারের কেনাকাটার জন্যও সেখানে যেতো। তখনও জাপানের প্রায় সব হালাল খাবারের দোকান টোকিওতেই কেন্দ্রীভূত ছিলো, আর আমাদের শহর সেনদাই থেকে টোকিও ছিলো মোটামুটি তিন-চারশ' কিলোমিটার দূরে। তাই মুসলিম ছাত্ররা মিলে ঠিক করল যে ইসলামিক সেন্টারকেই একটি সামান্য লাভজনক হালাল ফুডের দোকানে পরিণত করবে, লাভের অংশটা সেন্টারের ভাড়া-বিলের জন্য ব্যবহার করা যাবে। টোকিও থেকে নিয়মিত হালাল খাবারের অর্ডার দেয়া, বেচাকেনার হিসেব নিকেশ, আর সেন্টারের মেইনটিনেন্স -- এসব কাজের জন্য একজন বাঙালী ছাত্র ছিলেন সেন্টারের তত্ত্বাবধানকারী। যেহেতু ছাত্র তাই সকাল থেকে রাত অবধি ল্যাবে মাথা গুঁজে রিসার্চ করতে হতো তাঁকেও, কাজেই একই সাথে সেন্টারের তত্ত্বাবধানও তিনি কিভাবে করতেন সেটা একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় ছিলো, বিশেষ করে সেন্টারের হালাল খাবার কেনাবেচার সিস্টেমটা ছিলো খুবই মজার।
সেন্টার সাধারনত তালাবন্ধই থাকতো। যখন কেউ খাবার কিনতে যেত, মেইলবক্সের নাম্বার-কোডেড তালা খুলে সে এ্যাপার্টমেন্টের চাবি নিতো মেইলবক্স থেকে। তারপর নিজের প্রয়োজনমতো খাবার ফ্রিজার আর কিচেনের তাক থেকে নিয়ে, কি কি কিনেছে তার হিসেবটা একটা সংরক্ষিত খাতায় লিখতো। দাম শোধ করার সিস্টেমটাও ছিলো খুব সাধারণ, একটা টিনের ক্যাশবাক্সে টাকা রাখতো সবাই; নোট-কয়েন একসাথেই ছিলো, ক্রেতাকে নিজেকেই ক্যাশিয়ারের কাজ করতে হতো। তত্ত্বাবধায়কের কাজ ছিলো কয়েকদিন পরপর খাতা দেখে কেনাবেচার হিসেব, আর ক্যাশবাক্সে যোগ হওয়া টাকার হিসেব মিলানো, এবং নতুন খাবারের অর্ডার দেয়া।
একেবারে নতুন এই সিস্টেম দেখে মনে প্রথমেই যে প্রশ্নটা জেগেছিলো, তা হলো, কেউ কি কখনও জালিয়াতি করেনি? বেশী খাবার নিয়ে কম লেখা, বা খাতায় কিছু না লিখে খাবার নিয়ে কেটে পড়া, অথবা ক্যাশবাক্স থেকে পয়সা হাতিয়ে নেয়া -- কত কিছুই তো করতে পারে! আশ্চর্য হয়েছিলাম যেটা শুনে তা হলো, তখন পর্যন্ত এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। টায়টায় হিসাব মিলে এসেছে সবসময়, যেটা শুনে আমি আসলেই অভিভূত হয়েছিলাম। একসময় বাংলাদেশী তত্ত্বাবধায়ক বড় ভাই পড়াশোনা শেষ করে দেশে চলে গেলেন, আরেকজন বাংলাদেশী বড়ভাই ইসলামিক সেন্টারের দায়িত্ব নিলেন। তাঁর দায়িত্বও একসময় শেষ হলো, এবং এবারে এর দায়িত্বে আসলেন একজন পাকিস্তানি। এই মহাত্মনের ঘটনা বর্ণনার জন্যই এত বড় ভূমিকা।
মোটেও কৌতুক করছইনা, এই পাকি বুজুর্গের লম্বা লম্বা দাড়ি দেখে সুকেশী মেয়েদেরও ঈর্ষান্বিত হবার কথা; গোড়ালীর দু'ইঞ্চি উপরে প্যান্ট ভাঁজ করা থাকে সবসময়। নামাজের সময় কাতার ঠিক করা নিয়ে দুশ্চিন্তার সীমা থাকেনা তাঁর, যে কোন আলোচনায় তাঁর গভীর ধর্মীয় জ্ঞান লোকজনকে পারলে ভক্তিতে শুইয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলে। অর্থাৎ, মোদ্দাকথা হলো, ঈমানদার মুসলিম মাত্রই উনাকে দেখে ঈর্ষা আর অনুপ্রেরণায় ফেটে পড়ার কথা, ভাবার কথা, 'আমাকে ঠিক এরকম একজন মুসলিম হতে হবে!'।
কিন্তু এহেন বুজুর্গেরই সেন্টারের তত্ত্বাবধানে আসার পর একটা বিরাট সমস্যা হলো, আর সেটা আমরা মানে আমজনতা জানতে পারলাম তিনি দায়িত্ব নেবার মাস দশেক পর, যখন ইসলামিক সেন্টারের বাৎসরিক মিটিং হয়। এই মিটিংয়ে সেন্টারের সারা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসেব তুলে ধরা হয়, আর নতুন বছরের বাজেট পেশ করা হয়। এটা করা হতো কারণ, মোটামুটি মুসলিম সবছাত্রই মাসে এক হাজার ইয়েন করে চাঁদা দিতো সেন্টার পরিচালনার জন্য, একটু বেশী দামে হলেও টোকিওতে অর্ডার না দিয়ে সেন্টার থেকেই হালাল ফুড কিনতো -- কাজেই তাদের এই ত্যাগের অর্থগুলো কোথায় ব্যয় হচ্ছে সেটা সবাইকে জানানোর রেওয়াজ ছিলো আমাদের, আমি বলবো আমাদের সেই ইসলামিক সেন্টারের সব নিয়মকানুনই খুব স্বচ্ছ আর জবাবদিহিতামূলকই ছিলো।
অথচ এসব আইনকানুনকে প্রথম বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন জনাব পাকি বুজুর্গ। মিটিঙয়ে আমরা জানতে পারলাম যে হালাল ফুডের লেনদেনের হিসেবে ছয় লাখ ইয়েনএর (এখনকার রেটে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা) হিসেব মিলছেনা। পাকিকে জিজ্ঞেস করা হলো ঘটনা কি, অথচ সে ভীষণ উদ্ধতভাবে এ নিয়ে কোন আলোচনা করতেই রাজী হলোনা! আমরা বাঙালীরা বললাম, "তোমার কাছে অন্ততঃ আমাদের একটা ব্যাখ্যা পাওনা আছে। তোমার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সেন্টারের ফান্ড থেকে এত টাকা গায়েব হয়ে গেলো, তার একটা কৈফিয়ত দেয়া তো তোমার দায়িত্ব!" সে উল্টো আমাদের বাংালীদের উপর ক্ষেপে গেলো, তারপর, ক্যাম্পাস এতো কাছে হওয়া সত্ত্বেও আমরা বাঙালীরা কেন নিয়মিত ফজরের নামাজ তো দূরের কথা, এশার নামাজও পড়তে সেন্টারে যাইনা সেই প্রশ্ন তুলে, সেখান থেকে সেন্টারের প্রতি আমাদের বাঙালীদের কোন দরদ নেই টাইপের উপসংহার টেনে, "এখন মাছের মায়ের পুত্রশোক দেখাতে এসেছে!" -- এসব বালছাল বলে পার পেয়ে যেতে চাইলো। একটা লোক সেন্টারের ছয় লাখ ইয়েনের হিসেব দিতে পারছেনা, সেটা নিয়ে কোন ব্যাখ্যা দিতেও সে রাজী না -- আমাদের আর বোঝার বাকী থাকেনা যে এখানে কি ঘটেছে। রাগে, কষ্টে, আমরা বাঙালীরা মিটিং ওয়াকআউট করলাম। তবে অন্যান্য দেশী মুসলিম ব্রাদারানদেরকেও দেখা গেলো "ফেৎনা" এড়ানোর উসিলায় তাঁরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বিশেষ আগ্রহী হলেননা। তাঁরা চুপচাপ সব মেনে নিলেন। উল্লেখ্য, তসরূপকৃত অর্থে সেন্টারের ১০ মাসের ভাড়া হয়ে যেত।
যাই হোক, ওয়াকআউট করে বের হলাম ঠিকই, কিন্তু বাইরে আসার পরই সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটি ঘটলো। আমরা যখন পাকি বুজুর্গের বদমায়েশী নিয়ে ক্ষিপ্ত, তখনই আমাদের এক বাঙালী ভ্রাতা এতে কোন দোষ দেখলেননা! আমরা বলছিলাম, এত যে ইবাদত বন্দেগী করে লোকটি, অথচ চুরির পয়সা, হারাম পয়সা খেলো, তার ইবাদত কবুল হবে কিনা! তখনই আমাদের সেই বাঙালী ভ্রাতার উত্তর আমাকে স্তব্ধ করে দিলো। তিনি বললেন, "যেহেতু লোকটা খুব ধার্মিক, পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, প্রচুর ইবাদত করে, কাজেই তাকে আমি দোষ দিইনা। বরং আমরা নিজেদের দিকে তাকাই, আসুন প্রশ্ন করি, কয়বেলা ভোরে শীতের মধ্যে ঘুমথেকে জেগে ফজর নামাজ পড়েছি? এই পাকিস্তানি তো নিয়মিত সকালে ফজরের জামাতেও আসেন।" বিস্ময় লুকোতে না পেরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কথাগুলো আসলেই বুঝে বলছেন কিনা, তিনি দৃঢ়ভাবে আবারও নিজের মতের পক্ষেই বললেন।
স্তব্ধ হয়ে গেলাম!
একই সাথে একটা নতুন সত্য আমার কাছে প্রকাশ পেল। বুঝলাম, আকৃতিসর্বস্ব ইবাদতেই সব নিহিত বলে মনে করে এমন বুজুর্গ কম নেই! দেশে প্রায়ই যেটা শোনা যায় সেই ঘুষখোর টুপিদাড়িওয়ালাদের ব্যাপারটাও এতে পরিস্কার হয়ে গেলো। এর আগে আমি ভাবতাম, এইসব টুপিদাড়িওয়ালা ঘুষখোরেরা ভন্ড, বাইরেই বের হয় টুপি দাড়ি পরে, ঘরে নামাজ পড়াতো দূরের কথা পশ্চিমদিকে আছাড়ও খায়না! কারণ, আমি ভাবতাম, আল্লাহর ভয়ে যে লোক দিনে পাঁচবার অলসতাকে জয় করে এত কষ্ট করে নামাজ পড়ে, সে কোনভাবেই অন্যায় পথে পয়সা রোজগারের দিকে যেতে পারেনা -- সেটা কন্ট্রাডিকটরী হয়ে যায়। অথচ সেদিন বুঝলাম, অনেকেই হয়তো এমন করেই ভাবে যে, দুনিয়াবী অন্যায়গুলো ব্যাপারনা, ইবাদত করলেই হলো।
বুঝলাম, ধর্মের আকৃতিসর্বস্ব ব্যাপারগুলো নিয়ে বেশী মেতে থাকার একটা কুফল হতে পারে এমন যে, মানুষ আকৃতিসর্বস্ব ব্যাপারগুলো পালন করেই ভাবতে পারে যে সে তো ধর্মের সবকিছু পালন করছে। তখন আকৃতিহীন অথচ আরো গুরুত্বপূর্ণ এমন দায়িত্বগুলো তার কাছে গৌণ হয়ে দেখা দিতে পারে। মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মপালনের হার বেশী, আবার দূর্নীতির হারও একইভাবে বেশী -- এটাকে হয়তো ধর্মপালনের নামে আকৃতিসর্বস্বতাকে আঁকড়ে ধরার এই যে প্রবণতা, তার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়।
আকৃতিসর্বস্ব ইবাদতের বা উপাসনার আড়ালে চরম অন্যায় কাজটিকেও জাস্টিফাইড মনে করা শুরু করে মানুষ।
২.
আজ মে দিবস, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।
এই দিবসকে সম্মান করে আজ আমাদের দেশে সরকারী ছুটি। শুধু তাই না, আজ শ্রমিকদের নিয়ে সারাদেশব্যাপী অনেক অনুষ্ঠান হবে, টিভি-রেডিওতে টক শো, শিল্পীদের স্টেজ কাঁপানো পারফরম্যান্স, শ্রমিকদের সাথে নিয়ে বর্ণাঢ্য মিছিল -- সব হবে। আমেরিকানদের মতো ইতিহাস না ভুলে আমরা বাঙালীরা যথাযথভাবে শ্রমিক দিবস পালন করছি ও করবো।
অন্যদিকে, জাপানে দেখা যাচ্ছে, কেউ জানেওনা মে দিবসের কথা, ছুটি তো দূরের কথা! শ্রমিক অধিকার নিয়ে সেরকম মাঠঘাট কাঁপাতেও এদের দেখিনা। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই এই অবস্থা হবার কথা।
অথচ মুদ্রার অন্যপিঠে তাকালে দেখা যায়,
আমাদের দেশে শ্রমিকেরা কি পরিমাণ বঞ্চিত সেটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সমাহোয়ারেই এই নিয়ে অনেক পোস্ট এসেছে আজ।
আর জাপানে আমি নিজ চোখে দেখেছি শ্রমিকের অধিকার নিয়ে সবাই কতটা সতর্ক, আইনকানুন কত কঠোরভাবে পালন করা হয় এই ব্যাপারে।
এসব দেখে ভাবি, আকৃতিসর্বস্ব এইসব মেদিবস, ছুটি, সেমিনার পালনের আড়ালেই কি শ্রমিকের বঞ্চনাকে আমরা বছরের পর বছর জাস্টিফাই করে আসছিনা?
এসব করেই কি আমরা আত্মতৃপ্তি পাবার চেষ্টা করছিনা এই ভেবে যে, আহা আমরা কত শ্রমিকের-অধিকার-সচেতন!
আসলে, কী দরকার আছে এসব দিবসে-টিবসের? এর চেয়ে বাসার কাজের বুয়াকে টিভি দেখার সময় সোফায় বসার অধিকার দেয়াটা বেশী জরূরী না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

