১.
কথা ছিলো মে মাসেই আসবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরকারের নীতিমালা আর দিকনির্দেশনা, সত্যিকারের খাঁটি কিছু আশা। মে মাস শেষ হয়ে গেলো, একত্রিশটি দিন এক এক করে চলে গেলো! তবে কি বসে বসে "দিন যায় কথা থাকে ..." গানের সুরটা ভাজতে হবে এখন?
ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্বাবধায়ক সরকারের একের পর এক ব্যতিক্রমধর্মী পদক্ষেপ থেকে উদ্ভুত আশা আর একই সময়ে জামাত-শিবির নেতাদের নির্বিকার স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্য আর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করার মতো স্পর্ধা-প্রদর্শন -- এদুয়ের মিলনে গণমানুষের প্রাণে নতুন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীটি জেগে উঠেছিলো, এখনও আছে। নির্বাচনের সময় জোরগলায় সেই দাবীর পক্ষে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় এসেছে; যুগপৎ, যুদ্ধাপরাধীতে ভরপুর জামাত শিবিরের সাথে সাথে এর স্যাঙাৎ বিএনপির ঐক্যজোটের চরমতম ভরাডুবিও হয়েছে। তাই নির্বাচনের পর আমরা আশায় বুক বাঁধলাম যে গোলাম আজম, নিজামী, সাঈদী থেকে শুরু করে ৭১ এর গণহত্যার এদেশীয় মূল হোতা বা দালালগুলোকে অন্ততঃ এবার সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে দেখবো। কারণ এটা ছিলো মহাজোটের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর টপ প্রায়োরিটি আইটেম।
২.
এখন দেখা যাক বর্তমান সরকার এসে এপর্যন্ত এ বিষয়ে কি কি করলেন। তারা কি আদতে কিছু করছেন, নাকি আমাদের শুধু কিছু মধুর মধুর কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন?
প্রথমে তারা ঘোষনা দিলেন জাতিসংঘে এই বিচারের বিষয়টা তুলবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি একদমই বুঝিনি কেন এই অপ্রয়োজনীয় আয়োজন! এই যুদ্ধাপরাধীরা এদেশের নাগরিক, এরা অপরাধ করেছে এই দেশের মাটিতে, স্বাধীন বাংলাদেশে বসে বিদেশী সেনাবাহিনীর সাথে ষড়যন্ত্রে মেতে গণহত্যাসহ সম্ভব যাবতীয় অপকর্ম চালিয়েছে নয় মাস! এদের শাস্তির জন্য জাতিসংঘের শরণাপন্ন হতে হবে কেন? তাও ভাবলাম, যদি জাতিসংঘের সহযোগিতায়ও বিচারটা হয়ে যায়ই, মন্দ কি? কিন্তু, কিছুদিন পর জানা গেলো, জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে পারে শুধু ১৯৯৭ অথবা ১৯৯৮ (ঠিক মনে নেই) সালের পর সংঘটিত অপরাধের বেলায়! অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখি, জাতিসংঘ পৃথিবীতে ন্যায়-প্রতিষ্ঠার জন্য আছে, না কারো এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত আছে সেটা আমরা গ্লোবাল জনগণ ভালোই জানি, সেজন্যই শুরুতে সরকারের জাতিসংঘ নিয়ে টানাটানিতে অবাক হয়েছিলাম।
এরপর কিছুদিন ধরে এক ধরনের তামাশা দেখা গেলো পত্রিকাগুলোতে। সম্ভবতঃ জনসাধারণেরই কেউ কেউ "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবার হবেই হবে" এরকম আশায় বুক বেঁধে নিজ নিজ এলাকার কুখ্যাত কোন কোন রাজাকার/শান্তিকমিটির লোকের নামে মামলা করেছিলেন। এই যে রাজাকার/শান্তিকমিটির লোক-- এরাও ঘৃণিত, ঠিক আছে; কিন্তু শুধু এদের শাস্তি দিলে কি আদতে কোন ক্ষোভ মিটবে? শুধু এজন্য কি জনতার মনে দাবী উঠেছিলো? অথচ পত্রিকাগুলো "যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পালা শুরু হয়ে গেছে" এমন একটা নিউয়ান্স দেবার চেষ্টা করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার চেষ্টা করলো! পত্রিকাওয়ালারা এটাও খেয়াল করেননি যে এই মামলাগুলো হয়েছে সাধারণ আদালতে, যেটার বিরোধিতা কিনা খোদ সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম (বর্তমান দাবীর মূল প্লাটফর্ম) করে আসছে শুরু থেকেই।
একইসাথে বিডিআর সমস্যা, "খালেদা জিয়া কয়টি রাজপ্রাসাদে থাকবেন টাইপের ফালতু বিতর্ক" -- এরকম নানাবিধ কারণে দেখলাম আমাদের জনগণের মাঝ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীর বিষয়টা কর্পুরের মতো হাওয়া হতে শুরু করছে। তাও খানিকটা টিকে ছিলো, এখানে ওখানে আলোচনায় আসছিলো। আমি ভাবছিলাম এ কাজে এত সময় নিচ্ছে কেন? কিছুটা চিন্তিত ছিলাম।
সেকারণে গত এপ্রিল মাসে সরকার যখন ঘোষণা দিলেন যে মে মাসের মধ্যেই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে কনক্রিট একটা ধারণা আমাদের জনগণকে দিতে যাচ্ছেন, আমরা আশ্বস্ত বোধ করি। আমাদের ধারণা ছিলো 'কারা কারা বিচারের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে', 'কোন রূপরেখার ট্রাইবুনালের অধীনে এদের বিচার হবে' -- এসব তথ্য আমরা জানবো। আসল অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে -- এটুকু নিশ্চয়তা না পেলে জনগণেরই বা মন মানবে কেন? কারণ, আমরা নিশ্চয়ই এই প্রহসন দেখতে চাইবোনা যে, নোয়াখলীর কাঁঠালপুর গ্রামের করিমুদ্দিন আর রাজশাহীর কমলাগঞ্জ গ্রামের রহিমুদ্দিন টাইপের শ'খানেক বুড়োকে ধরে ঝুলিয়ে দিয়ে, "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়ে গেছে" বলে হাত ঝেড়ে ফেলা হয়েছে!
অথচ, মে মাসটা এমনি এমনিই চলে গেলো। গত ক'মাসে যা অবসর পাই ব্লগেই ঢুকতাম, পেপারও পড়া হতোনা। এই মাসটুকু আমি প্রথম আলো চেক করেছি প্রতিদিন। এই আশা নিয়ে যে আজ হয়তো দেখবো, সরকার ঘোষনা করেছে ৭১ এ যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের, কোন ধরনের ট্রাইবুনালের মাধ্যমে এদের শাস্তি হবে সেটা প্রকাশ করেছে, সর্বোচ্চ শাস্তি কি হবে তা জানিয়েছে। পাঠক, বিশ্বাস করুন, মে'র ৩১ তারিখেও আমি আশাটুকু জিইয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছেনা, শুধু "দিন যায়, কথা থাকে।"
৩.
ক্ষমতারোহনের পর গত চারমাসে সরকারের পারফরম্যান্স তেমন ভালো না; সন্ত্রাস আর দূর্নীতি ইতোমধ্যেই জেঁকে বসছে, সাথে আছে বিডিআর সমস্যা, বিদ্যুৎ সমস্যা, আরো কত কি! পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় ভবিষ্যতে এই পারফরম্যান্স আরো খারাপের দিকেই যাবে। দানা বাঁধবে নানান সমস্যা, এরমধ্যেই একের পর এক চলে আসছে, বিশেষ করে ভারত সম্পর্কিত ইস্যু যেটা আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি করে, যেমন, টিপাইমুখ বাঁধ, এশিয়ান হাইওয়ে, করিডোর, গ্যাসবিক্রী -- এটা সেটা! শুরুটা যে বিশাল জনসমর্থমন নিয়ে মিষ্টিমুখে হয়েছে, সেই হানিমুন হানিমুন ভাবটা কিন্তু আর থাকবেনা, কে জানে, হয়তো চলেই গেছে এরমধ্যে।
এদিকে ধুরন্ধর জামাত শিবিরওয়ালারা কিন্তু তক্কে তক্কেই আছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যত পেছাবে, এদের ঝামেলা বাঁধাবার উপকরণ তত বাড়বে। সরকারকে যেটা মনে রাখতে হবে তা হলো, আসল গণদাবী যেসব, সেগুলোতে জামাত এসে সাথে জুটলেও কিন্তু জনগণ সেখান থেকে পিছিয়ে আসবেনা; জামাতীরা সুষ্ঠু বিদ্যুৎপ্রবাহ দাবী করলে কিন্তু জনগণ এদের ঘৃণা করে বলে এটা বলবেনা যে "যেহেতু জামাতীরা বিদ্যুৎ দাবী করছে, আমরা তার উল্টোটা করবো, মানে আমাদের বিদ্যুতের দরকার নেই"। বরং লাভের গুড় জামাতের কোলে যেতে পারে, জনগণের দাবীর সাথে গলা মিলিয়ে তারা ক্যামোফ্লেজ নিয়ে ফেলতে পারে। সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন, জামাতকে সে সুযোগ তারা দেবেন কিনা?
সরকারের স্ট্রাটেজী যদি কপট হয় তাহলে জামাতকে সে সুযোগ দিলে তাদের একটা সুবিধা অবশ্য হয়। যেমন, সরকার এটা ভালোই জানে যে যেহেতু জামাত মহাজোট বিরোধী, তাই সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন সব ইস্যুতেই জামাত আন্দোলন করবে। তখন মানুষের জামাতবিরোধী মনোভাবকে পুঁজি করে সরকারী দল বলবে যে এই আন্দোলনের ইস্যুটা অবান্তর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীকে ম্লান করতেই জামাত এটা নিয়ে মাতামাতি করছে। কিন্তু যেটা সরকারকে মনে রাখতে হবে সেটা হলো, জনগণ এত বোকা না!
৪.
মে মাস শেষ হয়ে গেছে বলে বিচারের সব আশা শেষ, সেটা আমি মনে করিনা। আমি হতাশ সরকারের এই গা ঢিলা ভাবটা নিয়ে। "করি করি করে আর করা হলোনা" -- এটা আমাদের দেশে প্রকট। আমাদের দেশে নিয়মই এটা, যারাই কর্তৃপক্ষ হয়, তাদেরি গায়ে এক ধরনের দুষ্প্রাপ্য চর্বি গজায়। সেই চর্বির প্রভাবেই তাঁদের নড়নে-চড়নে এক অদ্ভুত রকমের ঢিলেমী চলে আসে। এই অনুশীলনটা আমাদের জাতিগত স্বভাব, সবস্তরেই এটা আমি দেখেছি। তাই আমরা ঘরপোড়া গরুরা, এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পাই। "দিন যায় কথা থাকে" টাইপের ঘটনা আমরা এদেশের বিচারকার্যে দেখে অভ্যস্ত; আমাদের সরকারদেরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, টিভির স্বায়ত্বশাসন -- এধরনের অনেক প্রসঙ্গেই একই চালে চলতে দেখা গেছে। সেজন্যই ভয় হয়, আমাদের এই দাবীটা যাতে সরকারি খানদানি দীর্ঘসূত্রিতায় পর্যবসিত না হয়।
একটা ঘটনা বলি, ছোটবেলার। তখন সম্ভবতঃ সিক্স-সেভেনে পড়ি, একবার বাসার ফ্যান নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। মামা নতুন একটা ফ্যান এনে লাগালেন, তাও ঘোরেনা! বোঝা গেল সার্কিটে সমস্যা। গেলাম বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযোগ গ্রহনের অফিসে। কলোনীর পাশেই ছিলো সেটা। রুলটানা ভারী এক খাতায় কলম ঘষে ঘষে একজন তুলে রাখলেন সমস্যাটা, আশ্বাস দিলেন পরদিনই আসবেন। পরদিন সারাদিন গেলো, গরমে কষ্ট পেলাম বাসার সবাই মিলে, ইলেকট্রিশিয়ান এলেননা। ভাবলাম ভুলে গেছে, পরদিন সকালে স্কুলে যাবার আগে আবার গেলাম ঐ অফিসে। এবারও সেই একই ভদ্রলোক, তাও নতুন করে সব খুলে বলতে হলো। এরপর যখন জানালাম যে অভিযোগটা দুদিন আগেই একবার করে গেছি, ব্যস্ত হয়ে খাতা উল্টে দেখলেন, তারপর ততোধিক ব্যস্ততার সাথে আশ্বাস দিলেন যে সেদিনই মেরামত করতে যাচ্ছেন। ভেবেছিলাম ক্লাস থেকে ফিরেই দেখবো ফ্যান ঘুরছে, অথচ সেদিনও ঘোরেনি। পরদিন আবার গেলাম, একই সময়ে, এবং স্কুল থেকে ফিরে দেখি, ফ্যান ঘুরছেনা। পরদিন আবারও, এবং একই ঘটনা। এটা চলতেই লাগলো, আমার অদৃষ্ট হয়ে গেলো প্রতিদিন স্কুলে যাবার আগে ঐ অফিসে হানা দেয়া।
পাঠক হয়তো বিশ্বাস করবেননা, কিন্তু জীবনের বিষাক্ততম একটা অভিজ্ঞতা হবার কারণে এখনও সংখ্যাটা মনে আছে; মোট বারোদিন যেতে হয়েছিলো আমাদের; আমার পর মামা গেলেন দু'চারদিন, তারপর বাবাও গেলেন, কাজ হয়নি। শেষে একদিন এলাকার নেতাগোছের এক আঙ্কেলকে ধরে নিয়ে গেলাম; করিৎকর্মা লোক এই আঙ্কেল, একেবারে রিয়াল টাইম প্রসেসিংয়ের মতো ইলেকট্রিশিয়ানকে ধরে নিয়ে আসলেন বাসায়, ফ্যান ঠিক করিয়ে তবেই ছাড়লেন।
উপরের উদাহরণের ইলেকট্রিশিয়ান কিন্তু কোন রাগ থেকে বা লোভ থেকে যে ফ্যান ঠিক করতে যাননি তা না, তিনি যাননি শুধুই অবহেলার কারণে। যে মুহূর্তে তিনি বুঝলেন আমরা ফ্যানের বাতাস খেতে তার ওপর নির্ভরশীল, দুষ্প্রাপ্য সেই চর্বি তার শরীরে গজিয়ে গিয়েছিলো। আজ যাবো, কাল যাবো করে আর যাওয়াই হয়না। এই চর্বির একমাত্র ঔষধ হলো "নেতাগোছের আঙ্কেল"।
আমরা সাধারণ মানুষেরা সরকারকে বারবার মনে করিয়ে দিয়ে একসময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করিয়েই ছাড়বো -- এই আশাটা এখনও বাঁচিয়ে রাখছে। তবে ভয়টা হলো, যদি এখানেও চর্বি গলাতে একজন নেতাগোছের আঙ্কেল লাগে, তবে সেই আঙ্কেল আমরা পাবো কোথায়?
---------------------------------------------------------------------------------
অফটপিক:
আজ তাজউদ্দিন আহমদের পুত্র সোহেল তাজ পদত্যাগ করেছেন বলে পড়লাম; সোহেল তাজ লোক কেমন জানিনা, শুধু মনে হলো, এটা কি কোন কুলক্ষণ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

