১.
মনে আছে কলেজে পড়ার সময় খুব আড্ডা দিতাম বন্ধুরা মিলে; ঢাকা কলেজে পড়ার সুবাদে দু'বছরে সাকুল্যে কলেজে গিয়েছিই সম্ভবতঃ ত্রিশ/চল্লিশ দিন, বাকী সময়গুলো আড্ডায়ই কেটেছে মূলতঃ।বেশী বেশী আড্ডাবাজ তৈরী হতে পারে এমন সম্ভাবনার আঁচ করা থেকেই সম্ভবতঃ মতিঝিল কলোনীর প্রত্যেক একতলা বাসার সামনেই ঘরে ঢোকার যে সিঁড়ি, তার দু'পাশে দুটো সিমেন্টের বেঞ্চির মতো বসার বেদী তৈরী করা ছিলো। ঠাসাঠাসি করে সেই বেদী-সিঁড়ি দখল করেই চলতো আমাদের মতো উঠতি তরুণদের আড্ডা। সে বয়েসে আমাদের ভব্যতাজ্ঞান ছিলো শূণ্যের কোঠায়, তাই দেখা যেতো যে বাসার মালিকের কোনরকম অনুমতি ছাড়াই ছেলেদের একেকটা আড্ডার গ্রুপ কলোনীর একেক বাসার সামনের সেই বেদী দখল করে রেখেছে। তবে শুধু সেকারণেই যে একতলা বাসা সবচেয়ে কম জনপ্রিয় ছিলো তাও নয়; ড্রেনের গন্ধ, চামচিকার উৎপাত, ছিঁচকে চোরের লুঙ্গি-সায়া চুরি এরকম বহুবিধ অন্যান্য কারণের উপস্থিতির জন্যই হয়তো এ নিয়ে আমাদের অপরাধবোধের মাত্রাটাও তেমন চাগাড় দেয়নি কখনও। কিন্তু এখন বুঝি যে একতলা বাসাগুলোর মালিক, মালকিন আর তাঁদের সন্তানেরা যথেষ্ট বিরক্ত হতেন, ভদ্রতা বা ভীতির কারণেই হয়তো কিছু বলতেননা; যদিও আমাদের কারো পকেটে বা হাতে পিস্তল, কাটা রাইফেল, কিরিচ বা ড্যাগার টাইপের তো দূরের কথা ছোট একটা ফল কাটার চাকুও কেউ কোনদিন দেখেনি -- একেবারে কসম কেটে বলছি।
তবে, পকেটে অস্ত্র থাকুক বা না থাকুক, আমরা যাতে আড্ডা দিতে না পারি সেজন্য কোন একটা ভালো বুদ্ধি পেলে যে বাসার মালিক অবশ্যই সেটা গ্রহন করতেন, সেটা আজ কমনসেন্স না খাটিয়েও বেশ ভালোই বুঝতে পারি। এখনকার তরুণদেরও হয়তো ভব্যতাবোধের মাত্রাটা একইরকম, এখনও হয়তো মতিঝিল কলোনীর বাঁদর ছোকড়াদের দল একইভাবে জ্বালাতন করে যাচ্ছে একতলা-বাসার লোকজনদের; তবে একতলাওয়ালাদের জন্য সুখবর হলো এরকম জ্বালাতনকারীদের কোনরকম বিবাদ বা ঝক্কি ছাড়াই তাড়ানোর এক যুগান্তকারী যন্ত্র দুনিয়ায় চলে এসেছে।
শুধু যে মতিঝিল কলোনীর তরুণরাই লোকজনকে এরকম অকারণ জ্বালাতন করতো বা করে, ঘটনা কিন্তু মোটেও তা না। পুরো বাংলাদেশে তো বটেই, সারা দুনিয়া জুড়ে টিন এজারদের নিয়ে এই একই সমস্যা। রবীন্দ্রনাথের "বলাই"য়ের মতো এদের এক্সিস্টেন্স হয়তো অত হালকা বা অদৃশ্যমান না, তবে "বলাই"য়ের চেয়ে যে অনেক বেশী ঘনঘনই এরা বিরক্তির উদ্রেক করে তা নিশ্চিত। কি জাপান, কি আমেরিকা, কি ইউরোপ -- সবখানেই এই "কোন-বাঁধা-না-মানা" বয়েসের ছেলেমেয়েরা অযাচিত ঝামেলা তৈরী করে। রাস্তায় বা পার্কে হৈ চৈ করে জীবনের নানান হিসেবে ব্যস্ত আর স্বাস্থ্যসচেতন লোকজনদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানো তো আছেই, শপিংমলের দোকানগুলোর সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা গেঁড়ে বসে গপসপ করা, রেস্টুরেন্টে একটামাত্র করে ড্রিংকস অর্ডার করে ঘন্টার পর ঘন্টা হিহিহোহো করে কাটিয়ে দেয়া, গুলটি মেরে পাবলিক সম্পত্তি যেমন ল্যাম্পপোস্টের বাল্ব ফাটানো, দেয়ালে অবান্তর চিকা মারা, দুনিয়ার প্রায় সব জায়গাকে যখন তখন টয়লেট বানিয়ে ফেলানো -- এদের বিরক্তিকর কাজের হিসেব দিয়ে শেষ করা যাবেনা। তাও তো মতিঝিল কলোনীর একতলাওয়ালারা নিজের বাসাবাড়ীতে দোকানপাট বা শপিংমল খুলে বসেননা বলে রক্ষে, আড্ডাবাজদের জন্য আর্থিক ক্ষতির মুখ তাদের দেখতে হয়না; কিন্তু পুঁজিপতি দোকানদার আর রেস্টুরেন্টওয়ালারা কাঁহাতক এদের অত্যাচার সইবে, বলুন?
২.
কাজেই এদের শায়েস্তা করা দরকার! নো হাংকি পাংকি! সেই মোটিভেশন থেকেই দুনিয়ায় এসেছে যুগান্তকারী সেই যন্ত্র, নাম মনে নেই এই মুহূর্তে, তবে এতে শোনা যায় মশার ভনভনের মতো মহাবিরক্তিকর এক শব্দ। টিন এজাররা যেসব জায়গায় আড্ডা মেরে সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করে যেমন, পাবলিক প্লেস, শপিং মলের বিশ্রাম নেবার জায়গাগুলো, অথবা পার্কের টয়লেট -- এসব জায়গায় সেট করে রাখা হয় স্পীকারের মতো দেখতে এই অতিশয় কামেল যন্ত্রটিকে। অনবরত মশার ভনভনের মতো অতিমাত্রায় বিরক্তিকর এই শব্দ একটানা কিছুক্ষণ শুনলে যে কারূরই মাথা ভন ভন করবে বা শরীর গুলিয়ে উঠবে; অতদূর না গেলেও, মানে খুব স্বাস্থ্যসচেতন পাহলোয়ানের ক্ষেত্রেও নিদেনপক্ষে তাতে তাঁর মেজাজখানা যে বেশ খিঁচড়ে যাবে সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। কাজেই জায়গামতো যন্ত্র সেট করে এ্যারোসলে মশা তাড়ানোর মতো ভনভন শব্দে আড্ডাবাজদের তাড়াও -- সহজ হিসেব।
ভাবছেন যে তাহলে তো ঐ যন্ত্র সেট করা জায়গাগুলো সাধারণ কাস্টমারদের জন্যওতো বিরক্তিকর হয়ে যাবে, তাইনা? দোকানে ঢুকতেই বা বেরুতে যদি বারবার ভনভন শব্দ শুনতে হয় তাহলে তো লোকে ওখানে আসা কমিয়ে দেবে, তাইনা? তবে সেখানেই আরেকটা "কিন্তু" আছে। এই যন্ত্রের ভন ভন আপনি তখনই শুনতে পাবেন যখন আপনার বয়েস মোটামুটি বিশের নীচে।
মানুষ যদিও সর্বনিন্ম বিশ হার্জ থেকে সর্বোচ্চ বিশ হাজার হার্জের ফ্রিকোয়েন্সীর শব্দ শুনতে পায় বলে আমরা জানি, তবে বয়েসের সাথে সাথে উপরের লিমিটটা নিচের দিকে নামতে থাকে। ফলে মোটামুটি সাড়ে সতেরো হাজার হার্জের এই বিরক্তিকর ভনভন শব্দটা বিশ পেরিয়ে যাওয়া কাস্টমারদের কানে যাবেনা, তাদের জন্য এটা নীরবতা, একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স! কাজেই সাধারণ কাস্টমারের শপিং, আমোদ, স্বাস্থ্যসচেতনতা কিছুতেই কোন ব্যাঘাত ঘটবেনা। শুধু টিনএজাররা এই শব্দ শুনবে, এবং লম্বা সময় ধরে কোথাও আড্ডা দিতে গেলে এই ভনভনে কান ঝালাপালা হয়ে আর দ্বিতীয়বার এখানে আড্ডা দিতে আসবেনা। একেবারে খাপেখাপ যাকে বলে! আমেরিকায় বেশ আগে আর জাপানে সম্প্রতি সরকার এই যন্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে, ফলাফলও বেশ আশাপ্রদ, অন্ততঃ আমেরিকায়।
৩.
এপর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো, কিন্তু ঝামেলা বাঁধিয়েছে আমেরিকার স্বাস্থ্যবিভাগ। তারা বলছে যে এই যন্ত্র থেকে বের হওয়া একঘেয়ে ভনভন শব্দটি স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, মাথা ধরায়, শরীর গুলায় -- কাজেই জনস্বাস্থ্যের খাটইরেই এটা ব্যবহার করা চলবেনা। আইন-কানুনের কড়াকড়ি নিয়ে আমেরিকার একটা সুনাম আছে। টিন এজারদের আড্ডা যতই অনাকাঙ্খিত হোক সেজন্য তাদের অসুস্থ্য করার আয়োজন করাকে সেদেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবেই দেখা হবে। আরেকটা সমস্যা হলো, শিশুদের নিয়ে। শিশুরা, মানে ধরুন দশের চেয়ে বয়েস কম এমন বাচ্চারাও শপিংমল বা পার্কে প্রায়ই যায়, একঘেয়ে শব্দটা তাদের কানেও ঢুকবে, তাদেরও শরীর খারাপ হতে পারে। সূতরাং, স্বাস্থ্যবিভাগের একদফা একদাবী, এই "যুগান্তকারী" যন্ত্র ব্যবহার করা যাবেনা! সর্বনাশ!!
স্বাস্থ্যবিভাগের যুক্তি ফেলনা নয় বটে, তবে এতগুলো টাকা খরচ করে সরকারমশায় কিনেছেন যন্ত্রগুলো, তাছাড়া সারা দেশে ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই কিনেছেন হয়তো। যে কোম্পানী যন্ত্র বিক্রী করেছে তাদের ব্যবসার ভবিষ্যত তো বটেই, বর্তমানও যুগপৎ ত্রাহিত্রাহি করছে। উদ্ধারের উপায় কি, নতুন বুদ্ধি বাতলাও! বার করো এমন ধরনের শব্দ যেটায় টিনএজাররা বিরক্তবোধ করবে ঠিকই কিন্তু শরীরের ক্ষতি হবেনা, মাথাও ধরবেনা, গাও গুলোবেনা। কোম্পানীর থিংকট্যাংক ভাবতে বসে গেলেন, থিংকট্যাংক বলে কথা -- বুদ্ধিও এসে গেলো শিগগিরই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, সমাধানটি হলো ফোক গান। টিন এজাররা একদমই সহ্য করতে পারেনা এই জিনিস; বয়েসটাই এমন, হার্ড রক, রক বা বড়জোর ফাস্ট পপ এলাউ করা যায়। সেখানে টুনটুন গুনগুন বাজনাওয়ালা ফোক সং, "কান্ট্রি রোড, টেক মি হোম"? কাভি নেহি! সূতরাং ধরো তক্তা, মারো পেরেক! দাও ঢুকিয়ে ফোক গান ঐ "যুগান্তকারী" যন্ত্রে। এখন একটানা বাজবে ফোক গান, শরীর খারাপ করবেনা কারুরই, কিন্তু মেজাজ ঠিকই খিঁচড়ে যাবে চৌদ্দ বছর বয়েসী পল বা পনেরো বছর বয়েসী এলেইনের। মামলা ডিশমিশ। সরকারও খুশী, বাজেটের অপচয় হলোনা।
৪.
তবে মাঝখান থেকে ফেঁসে গেলেন ফোক গানের শিল্পীরা। সরকার এখন এমন কিছু এ্যালাউ করবেনা যা ফোকগানকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে, অন্ততঃ টিন এজারদের কাছে। তাহলে আবার কেঁচে গন্ডুস! নতুন ধরনের শব্দ খুঁজতে হবে। ফোকগানওয়ালাদের টিনএজার মার্কেটটা চিরতরেই গেলো, যদিও কখনও ছিলো কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন!
মতিঝিল কলোনীর টিন এজার বা বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার টিন এজারদের শায়েস্তা করার জন্যও দামে কুলোলে নিশ্চয়ই এই যন্ত্র আমদানী করতে চাইবেন অনেকেই। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়, ফোকগান নিয়ে: বাঙালী তরুণ-তরুণীরা তো আর আমেরিকানদের মতো সংস্কৃতিকে ভুলে যায়নি। এদেশের কোমলমতি টিনএজারদের তো মুখে মুখে ফোকগান। নব্বইয়ের দশকে দিলরূবা খান এক "ভ্রমর কইয়ো গিয়া" গেয়ে, আর চলমান দশকে হাবিবের সম্পাদনায় ইন্সট্রুমেন্টাল লোকগীতি এখন যুব সমাজের মুখে মুখে ঘোরে মার্কেটের বারান্দা, রিক্সা, বাস, একতলার সামনের বেদী টাইপের সব আড্ডাখানায়।
ভাবছি, দিলরূবা খান বা হাবিব ওয়াহিদকে দোষারোপ করার মতো একটা জুতসই কারণ অবশেষে পাওয়া গেলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

