১.
কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে আমার মনে হচ্ছে, প্রথমে "তিন বছর"কে ফোকাস করে প্রস্তাবটাকে যাচ্ছেতাই রকমের খারাপভাবে উপস্থাপন করে, তারপর এখন তিন বছরকে এক বছরে নিয়ে এসে সাধু সেজে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চলছে। অথচ আসল লূপহোল হলো, এই প্রস্তাবের "প্রশ্ন করা যাবেনা!" অংশটি! মনে হচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর বাহিনী রেড হেরিং খেললেন আমজনতার সাথে।
রেড হেরিং ইফেক্টের কথা এর আগেও লিখেছিলাম কোথায় যেন একবার, সামহোয়ারে ব্যাপক প্রচলিত "রিভার্স খেলা"র মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার অস্ত্র এটা। সোভিয়েত যুগের রাশিয়ায় চিত্রনির্মাতারা রেড হেরিং হিসেবে যে টেকনিকটা ব্যবহার করতেন তা হলো ফিল্মের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ অর্থহীন কিছু সিকোয়েন্স ঢুকিয়ে দিতেন। যেমন ধরুন জমজমাট রোমান্টিক ছবির মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঢুকিয়ে দিলেন একটা ইঁদুরের কলে আটকা পড়ার দৃশ্য বা এক মোটাসোটা লোকের বরফে পিছলে পড়ার দৃশ্য। এর উপকারিতা ছিলো, সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা এরকম আপাত বিমূর্ত দৃশ্যগুলো দেখে বিভ্রান্ত হবার সাথে সাথে সন্দেহ করে বসতেন যে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন বদ মেসেজ আছে! ফলে সেই অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্যগুলোকে তাঁরা কাটছাট করেই ভাবতেন যে "গুড জব" করে ফেলেছেন। ওদিকে হয়ত মূল সিনেমায় মেসেজটি ঢুকিয়ে পরিচালক তাঁর উদ্দেশ্য সফল করার আয়োজন করে রেখেছেন।
আজ সকালের "কালো টাকা সাদা" সংক্রান্ত খবরটা পড়ে সেরকম একটা অনুভূতিই হলো। খবরের কাগজগুলো বেশ ফলাও করে ছেপেছে যে কালো টাকা সাদা করার তিন বছরের সময়সীমার যে অসভ্য প্রস্তাবটি এবারের বাজেটে আনা হয়েছিলো, সেটি নাকি কমিয়ে এক বছরে নামানো হয়েছে; এবং পত্রিকার টোন ধরতে ভুল করলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তবে মনে হলো তাঁরা বলতে চাইছেন যে এতে প্রস্তাবটি সভ্য হয়ে উঠেছে। বাহ্! পারফেক্ট রেড হেরিং!! কিভাবে সেটা বুঝতে হলে আগে একটা বেসিক ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।
কথা হলো "কালো টাকা" কি? ঘুষের মাধ্যমে আয় করা টাকা? কালোবাজারী বা চোরাচালানের মাধ্যমে কামানো টাকা? লুটপাট করা টাকা? বা অন্য যেকোন অসৎ উপায়ে আয় করা টাকা? না, এদের কোনটিই কালো টাকা না। আপনার সৎপথে করা আয়ের যে টাকাটার উপর আপনি যথাযথ ট্যাক্স দেননি, সেটিই কালো টাকা। ধরুন, একজন স্কুল বা কলেজের গণিতের শিক্ষকের কথা। প্রাইভেট পড়িয়ে বছরে কামাই করেন ২০ লাখ টাকা, কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স অফিসে হিসেব দেখান যে তাঁর বাৎসরিক আয় ৪ লাখ টাকা। সেই চারলাখের উপর হিসেব করে ৩০/৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স দিলেন। তখন যে ১৬ লাখ টাকার আয়ের হিসেবটা তিনি লুকোলেন, সেটাই কালোটাকা। এই "কালো রঙের" ১৬ লাখ টাকার ট্যাক্স না দিলে সেজন্য তাঁর ভয়ানক শাস্তি হতে পারে, তবে সেজন্য তাঁর আয় করা ঐ ১৬ লাখ টাকা কিন্তু অসৎ আয় হয়ে যাবেনা। তো, সরকারের এই প্রস্তাবে আপাততঃ যেটা বোঝা যায় যে মাননীয় শিক্ষক সাহেব আগামী এক বছরের মধ্যে ঐ ১৬ লাখ টাকার ট্যাক্স হিসেব করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ইনকাম ট্যাক্স শোধ করলে তাঁকে আর ট্যাক্স প্রদান না করার অপরাধে জেলে পোরা হবেনা।
প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে আর অসুবিধা কি? এটা তো আর তেমন কোন বড় সমস্যা না, কারণ এতে তো অন্ততঃ অসাধু আয়ের লোকজনের কোন লাভ হচ্ছেনা। কিছু কিপ্টে কিসিমের উচ্চ আয়ের লোকের কাফফারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে মাত্র!
এখানেই সমস্যা!! এবারের মুহিত সাহেবের "কালো টাকা সাদা করণের" প্রস্তাবের মূল শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। মূল সমস্যাটি "কালো টাকা"কে নিয়ে মোটেও নয়, এটি হলো এর পরের ক্লজটি নিয়ে, যেখানে তারা বলছেন যে কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা যাবেনা। প্রস্তাবের এই অংশটাই যাবতীয় চোর-ডাকাত-বদমায়েশদের পথ পরিস্কারের চাবিকাঠি। এখন আপনি স্কুলের টিচারের মতোই চেহারা করে বিনা ঝামেলায় চোরাচালান করা ৫০ লাখ টাকাকে "প্রশ্ন করা যাবেনা" ট্যাগ করিয়ে নিতে পারবেন।
মন্ত্রীমহোদয় "কালোটাকা" নামক ভয়ংকর শোনালেও বস্তুতঃ নীরিহ একটি ফ্রেজ আর "তিন বছর" নামের একটা রেড হেরিং সৃষ্টি করে তলে তলে অসৎ পথে কামানো লোকদের সব ব্যাংকব্যালান্সকে "প্রশ্ন করা যাবেনা" স্ট্যাটাসটি প্রদান করার আয়োজন করে ফেললেন বলে মনে হলো।
কাল প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন উনি "মাছ ধরার জন্য আধার" পেতেছেন। খুব জানতে ইচ্ছে করে উনি কি "কিপ্টে কিসিমের উচ্চ আয়ের" কিছু পুঁটি মাছ ধরতে আগ্রহী, নাকি রাঘব বোয়াল? রাঘব বোয়ালদের জন্য তো তাঁর ব্যাটেলিয়ান উল্টো পুকুর পরিস্কারের আয়োজনে নেমেছে, তাও চারপাশে রেড হেরিং ধোঁয়া তৈরী করে।
আরো প্রশ্ন জাগে, খালেদা জিয়ার পুত্রধনদ্বয় যদি আগের পাঁচ বছরের তাঁদের "সত্যযুগে" কামানো কোটি কোটি টাকার ওপর এখন ১০% ট্যাক্স দিয়ে ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটগুলো কিনে ফেলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কাউকে প্রশ্ন করতে দেবেননা? বাহ্, কি দরদ!
মৎস্যবিহারে ক্রীড়ারত আমাদের প্রধানমন্ত্রী/অর্থমন্ত্রী ও তাঁদের ব্যাটেলিয়ানের কাছে আমরা জনগণ কি এই আশা করতে পারিনা যে তাঁরা
অতি শীঘ্রই
১. "কোন প্রশ্ন করা হবেনা বা যাবেনা" অংশটি স্থগিত করবেন
২. আগামী বছর থেকে কালো টাকা সাদা করার আর কোন আইন করা হবেনা -- এই মুচলেকাটুকু জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন।
তা না হলে এ শুধু ভন্ডামীর আরেক নামই হবে, প্রধানমন্ত্রী মনে রাখবেন, একদিন আপনি নিজেও মাছে (রূপকথার মৎস্যকণ্যা নয়) পরিণত হতে পারেন!
২.
প্রকৃতপক্ষে কালোটাকা সাদা করার আইন করে লাভ হয় কিভাবে সেটাই আমার মাথায় ঢুকছেনা। ধরুন দু ধরনের লোক কালোটাকা সাদা করবে।
প্রথমতঃ, যারা সৎ আয় করেছেন কিন্তু সেটা ইনকাম ট্যাক্স রিপোর্টে প্রকাশ করেননি। এটা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে করা হয়, এতটাই ব্যাপক যে প্রতি বছর সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে যাঁদের নাম আমরা শুনি তাঁদের নাম সারা বছরে আর কখনও শোনা যায়না, কারণ তাঁরা সম্ভবতঃ মধ্যম মানের ব্যবসায়ী। এখন কথা হলো, কালো টাকা সাদা করে এদের লাভ কি? কি কারণে একজন টিউশনি জমানো শিক্ষক ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ছেলেমেয়েসহ থাইল্যান্ড ট্রিপ বাদ দিয়ে অযথা সরকারী কোষাগারে টাকা জমা দেবেন তা আমার মাথায় আসেনা। মূল কথা হলো, তাঁর টাকা কালো থাকুক বা সাদা থাকুক -- তাতে তাঁর লাভক্ষতির কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তো দেখা যাচ্ছেনা!
দ্বিতীয়তঃ, যারা অসৎ আয় করছেন তারাই বা কেন জমা দেবেন? তাঁর টাকারও বা সাদা হবার দরকার কি? অথবা তাঁর টাকার "প্রশ্ন করা যাবেনা" এমন স্ট্যাটাস পাবার দরকার কি? তাতে কি তিনি শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছেন? মানে, তা নাহলে কি তিনি শাস্তি পাচ্ছেন এ দেশে?
মূল কথা সেটাই।
ট্যাক্স দেয়নি বলে শাস্তি হয়েছে এমন ঘটনা এদেশে ঘটে?
নাকি ট্যাক্স যাতে না দিতে হয় সেজন্য ইনকাম ট্যাক্স অফিসারের বাসায় বাসায় লোকজনের আনাগোনার ঘটনা ঘটে?
ঘুষ খেয়েছে বলে এদেশে কোনদিন শাস্তি হয়?
নাকি ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য মানুষ ঘুষ দেয়?
সব মিলিয়ে কালোটাকা সাদা করার এই ব্যাপারটিতে আমি কোন অর্থই খুঁজে পাচ্ছিনা। ট্যাক্স না দেয়ার শাস্তি বা অসৎ আয়ের শাস্তির যে আইন, তার কোন প্রয়োগের উদাহরণ যে দেশে নাই, সে দেশে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব অবুঝ বাচ্চাও গ্রহন করবে বলে মনে হয়না। আগে এই আইনের শাসনের যথাযথ প্রতিষ্ঠা না করে কালোটাকা সাদা করার টোপ দেয়া একটা বুজরুকি অথবা ভন্ড আইডিয়া।
সাম্প্রতিক "কালো টাকা সাদা করার" আইন ১৯৯৯ সালে কিবরিয়া সাহেব চালু করেছিলেন, কি বুঝে কে জানে? তার তিন বছর তো গেলোই, এরপর সাইফুর সাহেবও এই আইন চালু রাখলেন তাঁর পাঁচ বছর। এই সাত আট বছরে আসলে কত টাকা সাদা হয়েছে সেই পরিসংখ্যান কি আমাদের আছে? আমি এখনও বুঝছিনা কেন তাঁরা এই আইনটিকে এত ভালোবাসেন? নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে, কেউ বুঝে থাকলে জানাবেন দয়া করে।
তবে এবার হয়তো "প্রশ্ন করা যাবেনা" আশ্বাসটি পেয়ে অনেকে এগিয়ে আসবেন, ব্যাংকে টাকা না লুকিয়ে রেখে নতুন চোরাচালানীর পুঁজিতে ব্যবহার করবেন। কিন্তু সেটা কোনভাবেই "কালো টাকা সাদা করা নয়", এটা পাবলিক বোঝে। তাই এটা যে আমজনতার কাছে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য কোন ব্যাপার হবেনা, সেটা আমাদের এই বড়শীবাহিনী যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।
*আরেকটা কথা মনে হলো, পুরোপুরিই আমার অনূর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। তা হলো, হঠাৎ এ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য ব্যবহৃত টাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবেনা টাইপের আইন করার মানে কি? গত কয়েকবছর ধরেই হাউজিং ইন্দাস্ট্রীতে বাবল চলছে, অবান্তর রকমের দাম বেড়ে চলেছে এ্যাপার্টমেন্ট আর জমির। এই বাবল ফাটবেই। তবে কি ফাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে? বাবল যাতে না ফাটে সেজন্যই কি বাড়তি গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে এই আয়োজন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

