somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... প্রধানমন্ত্রীর ভাষন বিষয়ে: সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার কোয়ালিটি বা গুনগত মান আর কোয়ান্টিটি বা পরিমাণগত মানের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হলো, কোয়ালিটি নিয়ে চাপাবাজি করা যায়, কোয়ান্টিটি নিয়ে করা যায়না অথবা করলেও ধরা খাওয়ার চান্স থাকে। যেমন দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি দাবী করেন যে তিনিই এদেশের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেমিক, তখন হাসি পেলেও সেটাকে নাকচ করে দেয়ার প্রত্যক্ষ কারণ আমাদের হাতে থাকেনা। কে জানে? হতেওতো পারে যে তাঁর মতো এত বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই। হয়তো সেটা রোমিও-জুলিয়েট বা শিরি-ফরহাদকেও হার মানায়। সেই প্রেমের দাবীকে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে পারিনা, বড়জোর মুখ চেপে হাসি লুকোতে পারি। পক্ষান্তরে, কেউ যদি বলে এই দেশে আমি সবচেয়ে বেশী করপ্রদান করি, তখন কিন্তু আমরা তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। বলতে পারি যে কাগজ দেখাও।

রাজনৈতিক নেতাদের ভাষনের বেলায় এই কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটির ব্যাপারটা একটা বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়। চতুর রাজনীতিক তাই কোয়ালিটি বিষয়ে হালকার উপর ঝাপসা বক্তৃতা দেয়, উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলে, দেশের মানুষ "সুখে আছে" কথা বলে, "ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে" বলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি "সবচাইতে ভালো আছে"বলে। তবে এসবের পক্ষে কোনো ডেটা বা উপাত্ত নিয়ে সে মাথা ঘামায়না। কিন্তু সমস্যা হয় চতুর রাজনীতিক যখন অতি চতুর হতে চায় তখন। এই অতিমাত্রিক চতুরেরা ভাবে জনগন হলো ভোদাই, চালাক শুধু তারাই। দশটা সত্য সংখ্যার মাঝে বিশটা মিথ্যে সংখ্যা ঢুকিয়ে জনগণকে গেলানো যাবে, এমন বোকার স্বর্গে তারা বাস করে। একটু চোখ মেলে দেখতেও চেষ্টা করেনা যে একটু নাড়া দিলেই আজকের "ভোদাই" জনগণ তাদের চাপাবাজিগুলো ধরে ফেলবে।

২.
কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী সরকারের তিন বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে ভাষন দিলেন। আগ;রহ নিয়ে ইউটিউবে দেখতে বসলাম। প্রথম ছয় মিনিট ভালোই চলছিলো, কিন্তু মোটামুটি আট-ন' মিনিটের মাথায়ই উৎসাহ চলে গেলো, কারণ, এরই মধ্যে গন্ডাখানেক মিথ্যে সংখ্যা তিনি উপস্থাপন করে ফেলেছেন। আর দেখার উৎসাহ বোধ করলামনা, যে কয়টা ডাহা মিথ্যে তিনি বললেন, সেগুলো টুকে রাখার প্রয়োজনবোধ করলাম।

চালের দাম
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা ক্ষমতায় আসার আগে মানুষ যে চাল খেতো কেজি ৪০-৪২ টাকা, এখন নাকি সেই চাল মানুষ খায় কেজি ২৬ থেকে ৩০ টাকায়!

এবার দেখি কথাটা কতটুকু সত্যি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার মাসখানেক পরে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম সিন্ডিকেটিং বন্ধ করতে পারলে চালের দাম কত হতে পারে সেটা নিয়ে আলোচনার জন্য। সেখানে তথ্য উঠে এসেছিলো (শওকত হোসেন মাসুম ভাই জানিয়েছিলেন), ২০০৯ এর শুরুতে ইরি চালের দাম ছিলো ২৫-২৬ টাকা কেজি। এটা গরীবেরা খেতেন। মিনিকেট চাল ৩২-৩৬ টাকা, এটা সাধারণ মধ্যবিত্তরা খেতেন।
পক্ষান্তরে, এখন ২০১১ এর ডিসেম্বরের বাজার দর হলো, মোটা ইরি ৩৬-৩৮ টাকা, মিনিকেট ৫৫-৫৮টাকা!

প্রধানমন্ত্রীর এই কতটা ডাহা মিথ্যা।
নাকি তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে তখন যারা সবচেয়ে দামী চালটা ৪০-৪২ টাকায় খেতো, তারা এখন আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় মোটা চাল খেতে শুরু করেছেন? এতেও তো হিসেব মেলেনা!
তাহলে কি লোকে এখন ৮০০ গ্রাম ইরির সাথে বাকী ২০০ গ্রাম ইট/পাথর মিশিয়ে কেজি ৩৬ টাকার চাল কেজি ৩০ টাকা হিসেবে খাচ্ছেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চালের নিয়ে দাম নিয়ে চাপাবাজি করা মানে গরীবের পেটে সরাসরি লাথি মারা।



দারিদ্র‌্য বিমোচন
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর শতকরা হার নাকি গত তিন বছরে ৪০% থেকে কমে ২৩% এ নেমেছে। এই উপাত্ত তিনি কোথায় পেলেন? একটা সংখ্যা মাথায় এলেই কি সেটা বলে দিতে হবে? তিনি কি মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগেও গোয়েবলসের মতো একটা মিথ্যে সংখ্যা দশবার বললে লোকে সেটা বিশ্বাস করা শুরু করবে?

এবার দেখি পরিসংখ্যান কি বলে?

সিআইএ ফ্যাক্টবুকে ২০১০ সাল শেষে বাংলাদেশে দারিদ্র‌্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের শতকরা হার দেয়া আছে ৪০%! এখানেও আছে । মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী কি বলতে চাচ্ছেন যে গত একবছরে তিনি দারিদ্র্য প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ফেলেছেন? গত বছর কি এমন ঘটেছে যে দেশের গরীব মানুষেরা হঠাৎ অগরীব হয়ে গেছেন? কোথায় পান তিনি এসব সংখ্যা?
আমি তো বরং বলবো তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের হাতে ঘটা শেয়ারবাজার জালিয়াতির ফলে বেশ ভালো সংখ্যক নিন্ম মধ্যবিত্ত ব্যক্তি দারিদ্র‌্যসীমার নিচে চলে গেছেন।
দারিদ্র‌্য কমানোর স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী দেখছেন হয়তো, সাধুবাদ জানাই। তবে কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব সেটা তো বোঝা উচিত, তাইনা?



বিদ্যুৎ উৎপাদন
বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে শেখ হাসিনা মিথ্যাচার করে আসছেন আজ বহুদিন!তাঁর কথাবার্তায় মনে হয় ২০০১ থেকে ২০০৮ এ আমরা বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে বাস করেছিলাম, এবং এখন তাঁর আমলে বিদ্যুতের সাগরে সারা দেশ ভাসছে।
তিনি বলেছেন আগের সাত বছরে এক মেগাওয়াট বিদ্যুতও জাতীয় গ্রিডে সোগ হয়নি, আর গত তিন বছরে আড়াই হাজার থেকে চার হাজারের বেশী মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে।

এবার দেখি পরিসংখ্যান কি বলে:
ইনডেক্সমান্ডির এই পেজে দেখুন। বছরভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপাত্ত দেয়া আছে।
হতাশাজনক হলেও যেটা সত্য, তা হলো, রাজনৈতিক সরকারের আমলে গড়ে প্রতিবছর মাত্র ১ বিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ার উৎপাদন বাড়লেও, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেড়েছে প্রতিবছর ২.৭ বিলিয়ন কিলোওয়াট-আওয়ারের কাছাকাছি।
একইসাথে শেখ হাসিনার জন্য যেটা হতাশাজনক, তা হলো, মুখে যতই মিথ্যাচার করুননা কেন, বাস্তবে তাঁর এই আমলে এই বৃদ্ধির হার বিএনপির গত আমলের চেয়েও কম!!


মাথাপিছু আয়
শেখ হাসিনা বললেন এই আমলে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় সাড়ে ছয়শ থেকে বেড়ে নাকি আটশো আটাশ ডলার হয়েছে!

আবারও আসুন দেখি পরিসংখ্যান কি বলে?
ইনডেক্সমান্ডির এই পেজে পিপিপি পারক্যাপিটার বছরভিত্তিক ডেটা আছে। পেজের ডেটাগুলো দেখলে কষ্ট পাবেন। মাথাপিছু আয় কমছে! কারণ জিডিপি ৬% হারে বাড়লেও, মুদ্রাস্ফীতির গড় হার ৮% এর বেশী।

প্রধানমন্ত্রী অবশ্য যে ৮২৮ ডলারের কথা বলেছেন, সেটা পিপিপি পার ক্যাপিটা ইনকাম না, সেটা হচ্ছে প্রকৃত মাথাপিছু আয়।


এবার আসুন কিছু হিসেব করে বের করি ২০১১ তে আমাদের মাথাপিছু আয় আসলে কত হতে পারে (শকিং!):

সিআইএ ফ্যাক্টবুকে বাংলাদেশের জিডিপির ২০১০ সালের উপাত্ত দেয়া আছে। ইউ এস ডলারে জিডিপি বা মোট আয় (প্রকৃত), ১০৪৯০ কোটি ডলার, এবং এখান থেকে হিসেব করলে,
প্রকৃত মাথাপিছু আয় হবে, (১০৪৯০ কোটি/১৬ কোটি) = ৬৫৫ ডলার।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট ছিলো ৭০.৪৭ টাকা। মানে, বাংলাদেশী টাকায় দেশের জিডিপি দাঁড়ায় (১০৪৯০ * ৭০.৪৭) = প্রায় ৭ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

আইএমএফের উপাত্তে ২০১১ তে প্রবৃ্দ্ধির হার ৬.৪%।
ফলে, ২০১১ তে বাংলাদেশী টাকায় দেশের জিডিপি দাঁড়ায়, ৭৪০০০০*১.০৬৪ = ৭৮৭৩৬০ কোটি টাকা।

এখন এই টাকাকে ডলারে বদল করলে (১ ডলার = ৮২ টাকা) পাই,
৭৮৭৩৬০/৮২ = ৯৬০০ কোটি ডলার।

মাথাপিছু প্রকৃত আয় দাঁড়ায়, ৯৬০০/১৬ = ৬০০ ডলার!!

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপাত্তগুলো শুনতে ভালোই শোনায়, কিন্ত হিসেবগুলো মেলেনা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29518206 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29518206 2012-01-07 21:09:59
ফিকশন: পালাও!
১.
আর সবদিনের মতোই বেশ মনোযোগ দিয়ে চ্যানেল আইয়ের ন'টার খবর শুনছিলেন প্রফেসর সেলিম হায়দার। শুনতে শুনতে অজান্তেই একসময় তাঁর হাত নিশপিশ করে ওঠে; পুরু গোঁফ আর মোটা-ফ্রেম-মোটা-কাঁচের চশমার আড়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়া তৃপ্তির হাসিটুকুও লুকিয়ে রাখতে পারেননা তিনি। অবশ্য এই মুহূর্তে সেটার প্রয়োজনও নেই।

খবর হচ্ছিলো অধুনা জনপ্রিয় কুয়েতের গণতন্ত্রপন্থী নেতা হামিদ তালিবের বাংলাদেশ সফর নিয়ে। উত্তর আফ্রিকার আরব বসন্তের ছোঁয়া এসে লেগেছে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যেও, জনতার আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আগামী বছর নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন কুয়েতের বর্তমান আমীর। একই সাথে অন্যান্য পেট্রোডলারের দেশগুলোর আমীররাও কিছুটা নমনীয় হয়ে গণতন্ত্রায়নের পক্ষে নানান আশ্বাস দিতে শুরু করেছেন। এই আশ্বাস আদায়ের আন্দোলনের প্রধান ভূমিকা যাঁর, তিনিই হামিদ তালিব। আরব বসন্তের ফলশ্রুতিতে ২০১২তে জেগে ওঠা পেট্রো-বসন্তের অবিসংবাদিত নেতা বলা হয় তাঁকে।

হামিদ তালিব তাঁর পনেরো সদস্যের দল নিয়ে আজ বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। পশ্চিমা মাধ্যমের ভ্রূ-কূঁচকানিকে খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে তিনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, "মুসলিম বিশ্বকে গণতন্ত্রের মশাল হাতে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশ"। নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর গত দুই যুগ যে ধীরপদে হলেও গণতন্ত্রের পথে এগিয়েছে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশটি -- বাংলাদেশের সেই যাত্রাপথ থেকে কিছু শেখার জন্যই তালিবের এই ভ্রমন।

মিটিমিটি হাসতে হাসতেই সেলিম হায়দার ঠিক করে ফেলেছেন কি দিয়ে শুরু করবেন তাঁর পরবর্তী "কটূকথা" কলামের প্রথম লাইন। অত বেশী ভাবতে অবশ্য হয়নি এই তুখোড় কলামিস্টকে, সামান্য চেষ্টাতেই পেয়ে গেছেন তার পাঞ্চলাইন, একদম সেটা দিয়েই শুরু করবেন এভাবে -- 'বর্বর আরবের ভীড়ে যৎসামান্য উন্নত মানসিকতার ব্যক্তিটি অন্তত স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে "মিসকিনে"র দেশ বাংলাদেশ থেকে তাদের অনেক কিছু শেখার আছে।' কটূকথার শুরুটুকু এর চেয়ে খাসা আর কি হতে পারে?

লেখা শুরু করার জন্য সোফা ছেড়ে প্রায় উঠেই পড়েছিলেন সেলিম হায়দার, কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্ত্রী সেলিনাকে দুটো চায়ের কাপ হাতে বৈঠকখানায় আসতে দেখায় এ যাত্রা লেখা শুরুর অভিলাস খানিকটা দমাতে বাধ্য হন। চা-টা শেষ করা যাক। এই সিদ্ধান্তে অবশ্য তাঁর শাপে বরই হলো বলতে হবে, কারণ তা নাহলে হয়তো খবরের বাকীটুকু আর দেখা হতোনা, কয়েকঘন্টা ধরে তৈরী করা পুরো লেখাটাই মাঠেমারা যেত।

চা খেতে খেতে স্ত্রীকে আরবদের বর্বরতা নিয়ে ছোটোখাটো জ্ঞান দিচ্ছিলেন সেলিম। তখনই চ্যানেল আইয়ের খবর পাঠিকার কন্ঠের অতিমাত্রিক উদ্বেগ আর উত্তেজনার কারণে টিভিতে চোখ রাখতে বাধ্য হন।
"সামথিং রং?"
ভাবতে না ভাবতেই টেলপে বেশ বড় বড় লাল অক্ষরে লেখা দেখতে পান, "ঢাকায় দুর্বৃত্তের আক্রমণে আরব নেতা হামিদ তালিব নিহত।"
খবর পাঠিকাও বারবার উচ্চারণ করে যাচ্ছেন,
"এইমাত্র পাওয়া খবরে জানা গেল কুয়েতের গণতন্ত্রবাদী নেতা হামিদ তালিব ঢাকার র‌্যাডিসন হোটেলে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হয়েছেন। বিস্তারিত খবর আমাদের হাতে আসামাত্রই প্রচার করা হবে।"

মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ে হা হয়ে যান সেলিম হায়দার। খানিকটা বিমর্ষও বোধ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের এই প্রফেসর। তবে সেটা ঠিক যতটা হামিদ তালিবের মৃত্যুর কারণে, তারচেয়ে অনেকগুন বেশী পাঞ্চলাইনটার কারণে। কত চমৎকার একটা বাক্য দিয়ে শুরু করবেন ভেবেছিলেন! অথচ এখন আর লেখাটিরই হয়তো কোনো মর্ম থাকবেনা। সদ্যমৃত লোককে "বর্বরদের মাঝে সামান্য উন্নত" বলে উল্লেখ করা যায়না। হাজার হোক, পত্রিকার কলাম আর বৈঠকখানার আড্ডা এক না।


২.
র‌্যাডিসন হোটেলের সামনে এয়ারপোর্ট রোড মোটামুটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু বিমানবন্দরগামী আর বিমানবন্দর থেকে আসা গাড়িগুলোর চলাচলের জন্য দু'পাশে একটি করে লেন খোলা। র‌্যাডিসন হোটেল কর্ডন করে ফেলেছে র‌্যাব আর সেনাবাহিনির নয়টি গ্রুপ। তিনটি গ্রুপ হোটেলের তিনটি প্রবেশপথে, আর তাদেরকে কাভার দেয়া হয়েছে বাহিরে ছয়টি গ্রুপ দাঁড় করিয়ে। র‌্যাডিসন হোটেলও সিল করে দেয়া হয়েছে। কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে দেয়া হচ্ছেনা।

দেশের প্রায় সবগুলো টিভি আর সংবাদপত্রের লোকেরা এসে জড়ো হয়েছে র‌্যাডিসনের সামনে এয়ারপোর্ট রোডের ওপর। আর শত শত আমজনতার ভীড়। পুলিশ এর মধ্যেই কয়েক দফা ধাওয়া করে জনতাকে হটানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু যেদেশে হাজার হাজার মানুষ বলতে গেলে রাস্তায়ই জীবন কাটায় তাদের ঠেকাবে কিভাবে। রাস্তার একপাশ থেকে দৌড়ে তারা বড়জোর অন্যপাশে যায়।

শুধু দেশী মিডিয়াই নয়, বিদেশী টিভিগুলোতেও কাভারেজ শুরু হয়ে গেছে। রাত সাড়ে দশটার দিকে চার্টার্ড প্লেনে মুম্বাই থেকে চলে এসেছে সিএনএন, বিবিসিসহ ডজন খানেকের মতো বিদেশী মিডিয়ার প্রতিনিধি।এমনকি রাত একটার দিকে আলজাজিরার করেসপন্ডেন্টও চলে এসেছেন খোদ দোহা থেকে।

বিশ্বজুড়ে টিভি চ্যানেলগুলোর আলোচনায় এখন ঢাকা। হামিদ তালিব বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব, উত্তর আফ্রিকায় জন্ম নেয়া আরব বসন্ত তাঁর হাত ধরে প্রসারিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, নতুন নাম পেয়েছে "পেট্রো-বসন্ত"। আগামী বছর কুয়েতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে যে তিনি জিতে আসছেন, এটা প্রায় সবারই মুখে মুখে। তাঁর উন্মেষের সাথে সাথে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে নতুন নেতৃত্বের জন্ম হবে, এটাও কোনো উচ্চাভিলাষ ছিলোনা। তাঁর দিকে তাকিয়ে সমগ্র বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো বিশ্ব অস্থিরতার হাত থেকে বেঁচে যাবে, এমনটাই ছিলো তাঁকে নিয়ে মোটাদাগে সবার প্রত্যাশা।

সেই ব্যক্তির এমন মৃত্যু বিস্ময়কর। একইসাথে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এ ধরনের বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তার পর্যাপ্ততা, কারা খুনটি করেছে, বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদ প্রায় নির্মূল বলা হচ্ছিলো অথচ তারপরও এমন ঘটনা কিভাবে ঘটলো -- এরকম নানাবিধ আলোচনায় মুখর বিশ্বের সবক'টি গণমাধ্যম।

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29512950 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29512950 2011-12-30 20:40:34
ভূমিকম্পের প্রস্তুতি http://www.sachalayatan.com/tanveer/35227

লেখাটিতে মন্তব্য হিসেবে সাধারণ গৃহস্থের অবস্থান থেকে তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি হিসেবে কি কি পদক্ষেপ নেয়া যায় তার একটা তালিকা তৈরী করেছিলাম। তৈরী করতে গিয়ে দেখলাম, বেশ লম্বা তালিকা হয়ে গেছে। ভাবলাম অন্যান্য ব্লগের পাঠকদের সাথেও তালিকাটা শেয়ার করলে মন্দ হয়না। তালিকাটি মূলত ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে নেয়া যায় এমন কিছু পুর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের। কাজগুলো খুবই সহজ এবং অল্প সময়েই করা সম্ভব। এমন কি চাইলে আজই। কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ, তবে জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবলে এটুকু ব্যয় অর্থপূর্ণ বলে মনে করি।

খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া যায় এমন কিছু পয়েন্ট:

বাসার ডাইনিং টেবিলটিকে ব্যবহার করুন। ভূমিকম্পের সময় দূর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’পদ্ধতি যে বিশেষজ্ঞরা সাজেস্ট করেন তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে তানভীরের লেখাটিতে পড়েছেন। বাসার সবাই মিলে ডাক-কাভারের জন্য ডাইনিং টেবিলটি হতে পারে খুব ভালো একটি আশ্রয়। এজন্য:
১। বাসার ডাইনিং টেবিলটা একটু বড় করে এবং বডি শক্ত করে বানান, দরকার হলে ডাবল লেয়ার কাঠ দিয়ে। ২। ডাইনিং টেবিলের পাতের নিচের দিকে "ভুমিকম্প এইড বক্স" সেট করে রাখুন। এতে টর্চ, রেফারির বাঁশী, শুকনো খাবার (বিস্কুট), সিম্পল ফার্স্ট এইডের জিনিসপত্র থাকতে পারে। ৩। দেখতে খারাপ দেখালেও ডাইনিং টেবিলের আশপাশেই কোথাও ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখা ভালো। বাসার সবাই এটার ব্যবহারবিধি জেনে রাখুন, খুবই সহজ। ৪। বাংলাদেশের বাসাগুলোর ডিজাইনে এটা করা খুব কঠিন, তাও সম্ভব হলে ডাইনিং রুম হিসেবে ঘরের এমন কোন জায়গা বেছে নিন যার অন্ততঃ একটি দেয়াল দালানটির সবচেয়ে বাহিরের দেয়াল হয়। এক্ষেত্রে, ভূমিকম্পের সময় ডাইনিংয়ের নিচে আশ্রয় নিয়ে, পরবর্তীতে ধ্বংসস্তুপ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে।

ভবনধ্বসের ক্ষেত্রে ধংসস্তুপ থেকে বেরুবার মুখ হতে পারে দরজা গুলো। আবার মরণফাঁদও হতে পারে, যদি ধ্বসের সময় দরজা বন্ধ থাকে। দরজার পাল্লা দুমড়ে গিয়ে এমন হয় যে পরে ছিটকিনি আর খোলেনা! ভেতরে আটকা পড়ে যাবার ঘটনা খুব বেশী ঘটে। এজন্য:
৫। যতদূর সম্ভব ঘরের সবগুলো রুমের দরজা খোলা রেখে ঘুমান। ৬। দিনের বেলাতেও প্রয়োজন না হলে ঘরের ভেতরের দরজাগুলো বন্ধ করবেননা। ৭। ভুমিকম্প টের পেলে সাথে সাথে ঘরের সদর দরজা খুলে দিন, অন্যান্য দরজা বন্ধ থাকলে সেগুলোও যত বেশী সম্ভব খুলে দিন। ৮। আমাদের দেশে বারান্দা বা জানালা টাইপের এক্সিটগুলো সাধারনত গ্রিল দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়, নিরাপত্তার জন্য। এটা ভূমিকম্পবান্ধব না, কিন্তু কিছু করার নেই। এজন্য, সম্ভব হলে বাসার সবচেয়ে বড় বারান্দাটির গ্রিলের এক কোনায় গ্রিল কাটার ঝুলিয়ে রাখুন।

৯। ভূমিকম্প শরীরের যে প্রত্যঙ্গটির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক, তা হলো মাথা। এটাকে বাঁচাতে পারলে জীবন বাচার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এজন্য বাসার সব সদস্যর বিছানার পাশে হাতের কাছাকাছি কোথাও একটি করে হেলমেট রাখার ব্যবস্থা করুন।

১০। অনেক সময়েই ভূমিকম্পে ভবনধ্বসে যা ক্ষয়ক্ষতি হয় তার চেয়েও বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয় পরবর্তীতে আগুন লেগে। সবচেয়ে বেশী আগুন লাগে গ্যাস লিকেজের কারণে। এজন্য অবশ্যই রান্না শেষ হলে গ্যাসের মূল সুইচ বন্ধ করার অনুশীলন করুন। শুধু নিজেরা করলে হবেনা, একই বাড়ীর অন্যান্য প্রতিবেশী/ভাড়াটিয়াদেরকেও এই ব্যাপারে সচেতন করুন। তানাহলে নিজের বাড়ীতে আগুন না লাগলেও অন্যের বাড়ীর আগুন আপনার ঘর পোড়াবে।

১১। মোবাইল ফোন চার্জ দেয়ার জায়গাটিকেও ডাইনিং টেবিল থেকে কাছাকাছি কোথাও রাখুন। মোবাইল ফোনে সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর ফোন নম্বর অবশ্যই রেকর্ড করে রাখুন।

১২। সবশেষে, বছরে একবার করে হলেও ঘরের সবাই মিলে প্রকৃত ভুমিকম্পের সময় কি করবেন তার একটা ট্রায়াল দিন। করতে গিয়ে হাসি আসতে পারে তবে এটা ভীষন কাজের।

শুভকামনা রইলো।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29243331 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29243331 2010-09-22 13:34:33
গল্প: নোনা দেয়াল ক.
রিপন, শিপন আর দীপনের পর মনোয়ারা বেগমের কোল আলো করে চতুর্থ সন্তানটিও ছেলে হিসেবেই দুনিয়ায় আসলে কন্যা সন্তানের জন্য সূক্ষ্ম আফসোসটুকুর পাশাপাশি আরো একটা ছোট্ট সমস্যায় পড়ে যায় তাদের বাপ। সেটা নবজাতকের নাম রাখা নিয়ে। রিপন, শিপন আর দীপনের সাথে পুরোপুরি মিলিয়ে আর কোন নামই তার মাথায় আসেনা। তার মেট্রিক পাস বউ মনোয়ারা পেপার-পড়া জ্ঞানের বদৌলতে মিন মিন করে জাপান দেশের প্রতিশব্দ "নিপ্পন" নামটিকে প্রস্তাব করলেও ছেলেদের খুঁতখুঁতে বাপের কিছুতেই ঐ বাড়তি "প"টুকুকে পছন্দ হয়না। শুনতে অদ্ভুত শোনালেও, গোঁয়াড় স্বামীর গায়ের জোরে রাখা নাম "টিপন"কেই অগত্যা মেনে নিতে হয় মনোয়ারার।

তবে মনোয়ারার ভাগ্য ভালো বলতে হবে। কারণ, মনের কষ্ট খুব একটা বেশী দিন চেপে রাখতে হয়নি। "এটা কোনো মানুষের নাম!", "এইটা কোন কিসিমের নাম যেইটার কোনো অর্থ নাই!" -- আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবদের মুখে আড়ালে আবডালে এজাতীয় শ্লেষাত্মক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে অদৃষ্টের বিধানের মতো টিপনের নামটিও শেষমেষ "টিপু"তে এসেই থামে।

মায়ের পেটে কিছুকাল কাটানোর কারণে হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক, ছেলের রুচিও মায়ের রুচির সাথে মিলে যায়। ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে সেভেন পর্যন্ত সব ক্লাসের খাতাগুলোতে তাই আসল নামের পাশে ব্র্যাকেটের ভেতর "টিপু"ই লিখে এসেছিলো সে। বাপের দেয়া নাম কাঁটছাঁট করা যে বাপ পছন্দ করেনা তা সে বুঝতো, এ নিয়ে একটা বিড়ম্বনা বা সূক্ষ্ম অপরাধবোধও তার ছিলো। অবশ্য সৌভাগ্যবশত কিনা বলা কঠিন, তবে মায়ের মতো খুব বেশীদিন সেই বিড়ম্বনার বোঝা তাকেও বইতে হয়নি। পড়াশোনায় কখনো ভালো তো দূরের কথা মোটামুটি মানেরও না হওয়ায় ক্লাস এইটে ওঠার পরই টিপু টের পেয়ে যায় যে তাকে অন্য লাইন ধরতে হবে। কলোনীর বিশালাকায় "পানির টাংকি"র চিপায় দাঁড়িয়ে মাশুক ভাইয়ের কাছ থেকে প্রথম যে "মাল"টি হাতে পায় সে এক বৃহস্পতিবার রাত দশটার দিকে, সেটি ছিলো চকচকে রূপালী একটা চাইনীজ কুড়াল। আকারে একটা হাতুড়ির চেয়েও ছোট হবে, বেল্টের চিপায় গুঁজে রাখা যায়।

গমগমে কন্ঠে মাশুক ভাই তার চরিত্রের বিপরীতে যাওয়া খাঁটি শুদ্ধ বাংলায় মাস্টারদের ভঙ্গিতে বলেছিলো,
"প্রথম প্রথম প্রত্যেকদিনই মনে হবে কাউকে না কাউকে দেই এক কোপ, বুঝলে? তবে হ্যাঁ! সে ইচ্ছেটুকুকে সামলে চলতে হবে। প্রথম দু'মাস কারো উপর প্রয়োগ করা যাবেনা। সবার আগে বেল্টে গুঁজেও কিভাবে দৌড়ে পালানো যায় সেটা শিখবে, কেমন?"
সাম্রাজ্যপ্রাপ্তির অভিষেক হচ্ছিলো যেন টিপুর, চকচকে চোখে বাধ্য শ্রোতার মতো মাশুক ভাইয়ের কথা গিলছিলো।

সম্ভবত উপযুক্ত শিষ্য তৈরী হবার আশু সম্ভাবনার কারণেই, বেশ উৎসাহের সাথেই মাশুক ভাই আরো অনেক সবকই দিয়েছিলো। এবং সবার শেষে যোগ করেছিলো,
"আর একটা কথা বলে রাখি। এই লাইনে যখন এসেছো, তখন প্রেম ভালোবাসা এসবের কথা আপাতত ভুলে যাও, বুঝলে? মিলি না মিনি কি যেন নাম? বুঝলে টিপু, আমরা সব খবরই পাই, হা হা হা।"
মাশুক ভাইয়ের অন্য কথাগুলো যতটা উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিলো টিপুর মনে, ততটা উৎসাহ এই দফা আর দেখাতে পারলোনা সে। এই উপদেশ পালন করতে পারা তো দূরের কথা পালন করার কোন চেষ্টাও সে কোনদিন করেনি।
"প্রেম ভালোবাসা আর মাস্তানি সব আমি একলগে কইরা দেখায়া ছাড়ুম" এই ছিলো তার মাস্তানী ক্যারিয়ারের ইনিশিয়াল মটো।

খ.
মাশুক যাকে "মিলি" বা "মিনি" বলে নিজেকে সর্বজ্ঞ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছিলো তার নাম আসলে মিমি। কলোনীতে টিপুদের কোয়ার্টারের সামনে আরো দুটো বিল্ডিং পেরুলেই মিমিদের বাসা। টিপুর চেয়ে বছর খানেকের ছোট হবে। যখন টিপুর হাতে চাইনিজ কুড়াল ওঠে তখন মিমি ক্লাস এইটে পড়ে, বৃত্তির কোচিং করে। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা। শুধু যে ছাত্রী হিসেবেই খুব ভালো মিমি তা না। আচার আচরণেও ভদ্র, কোন উগ্রতা নেই, অভিভাবকদের চোখে এই বয়েসী ছেলেমেয়েদের উচ্ছন্নে যাবার যেসব লক্ষণ ধরা পড়ে সেসবের কিছুই তার মধ্যে নেই। যেমন, বিকেল থেকে সন্ধ্যা নাগাদ কলোনীর কোয়ার্টারগুলোর ছাদ আর বারান্দায় অনেক উঠতি বয়েসী কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীকে দেখা যেত। হাতের ইশারায়, চোখের ভাষায়, এমনকি মাঝে মাঝে শুধু নিজের উপস্থিতি দিয়েও এরা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। অদ্ভুত এক কমিউনিকেশন সিস্টেম। তবে লক্ষ্মীমন্ত ভদ্র মেয়ে মিমিকে এসবের মধ্যে কেউ কখনও দেখেনি।

শুধু তাই না। দেখতেও অপরূপা, তা নাহলে অবশ্য টিপুর মতো উঠতি মাস্তানের আগ্রহের কারণ হবারও কথা না তার। মিষ্টি চেহারা, টান টানা চোখ, লম্বাটে গড়ন। মিমির চোখে সবসময়েই যেন কাজল থাকে, তবে তা কি কাজলের কারুকাজ নাকি মিমির চোখই অমন সে নিয়েও কিছুটা ধন্দ ছিলো টিপুর মনে। তার ওপর মিমি হাঁটেও খুব সুন্দর করে, যেন এক ধরনের ছন্দের তালে। হাঁটুটাকে খানিকটা উপরে উঠিয়ে সামনে ঠেলে দেয়, অনেক দূর থেকে দেখেও টিপু বুঝে ফেলে মিমি আসছে, অথবা যাচ্ছে। এসব মিলিয়েই, চাইনীজ কুড়াল হাতে নেয়ার কয়েকমাস আগে থেকেই মিমির প্রেমে পড়ে যায় সে।

লিটনের কনফেকশনারীর উত্তর পাশে দাঁড়ালে স্কুলের গেট সরাসরি চোখে পড়ে, বেলা আড়াইটা থেকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা তার প্রতিদিনের রুটিনওয়ার্ক। তিনটা বাজার খানিক পরে মিমি বের হয়, বান্ধবীরাসহ। ছন্দের তালে তালে হাঁটে, লিটনের কনফেকশনারীর কিছু যন্ত্রপাতি, যেগুলো ঠিক কি কারণে ব্যবহৃত হয় জানেনা টিপু, সেসবের শব্দের সাথে সাথে তার বুকের কাছেও কোথাও ভীষন দ্রুততায় ড্রামের শব্দ হতে থাকে, ঢিম্, ঢিম্, ঢিম্! ঢাম্, ঢাম্, ঢাম্!

চাইনীজ কুড়াল হাতে আসার পর শুধু ড্রামের শব্দে সন্তুষ্ট থাকতে চায়না টিপু। প্রায়ই কিছু বলতে ইচ্ছে হয় মিমিকে। কিন্তু সমস্যা হলো, মিমির পরিবার আর টিপুর পরিবারের খুব ভালো পরিচয় ছিলো। কি করতে কি করে ফেলে, তারপর কোন ধরনের কেলেংকারী বাঁধে এই নিয়ে একটা দ্বিধার কারণে কোমরে চাইনীজ কুড়াল গুঁজেও ঠিকমতো সাহস করে উঠতে পারেনা সে। মাঝে মাঝে ভাবে এভাবেই পাহারা দিয়ে রাখবে, তারপর সময় হলে একদিন উঠিয়ে নিয়ে যাবে। এদেশে মাস্তানদের বিয়ে করার এটাই সহজ পথ। কিন্তু এসব ভাবনার মাঝেই মিমির ব্যক্তিত্বটা ভেসে ওঠে তার মনে, কিছুটা হলেও দমে যায়।

চৌদ্দ বছর বয়েসের বাচ্চা মেয়ে হলেও মিমির হাঁটা-চলা, আচার আচরণে একটা গাম্ভীর্যের ছাপ অনুভ করে টিপু। সেটার বাস্তব অস্তিত্ব আসলেই আছে নাকি তার মনের ভেতরে তৈরী হওয়া, তা নিয়ে মাথা অবশ্য সে ঘামায়না। কিন্তু ভয় পায়। বিশেষ করে যখন যে কল্পনা করে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মিমির পাশে হঠাৎ করে গিয়ে থেমে তাকে উঠিয়ে নিতে যাচ্ছে সে, মিমির একটা কড়া চাহনি সে দেখতে পায়। মিমি ওভাবে তাকালে একটু নড়তেও পারবেনা সে -- ঠিক এরকম করে না মনে হলেও কাছাকাছি একটা অনুভূতি হয় তার। অস্বস্তিদায়ক।

মাস্তানদের মুখ সাধারণত আলগা হয়। নিজের বাহাদুরী জারী রাখতেই হয়তো, পঁচিশকে আড়াই হাজার বলে প্রচার করতে হয় তাদের। সেটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই হয়তোবা, টিপুর বন্ধুবান্ধবদের সাবাই জেনে যায় মিমির কথা। প্রথম প্রথম সবাই জানতো মিমিই টিপুর প্রেমে পাগল, চাইনিজ কুড়াল দেখে প্রেমে পড়েছে। পুরোটাই টিপুর বাড়িয়ে বলা। একদিন লিটনের কনফেকশনারীর পাশ দিয়ে যাবার সময় টিপুর সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় মিমির, বুকের ভেতরের ধুপধাপ শব্দের ঝামেলায় যখন টিপু বুঝতে পারছিলোনা কি করা উচিত, তখন মিমিই বলেছিলো,
"টিপু ভাইয়া, ভালো আছেন?"।
উল্লেখ্য, মিমি তখনও টের পায়নি টিপু এখানে কেন দাঁড়ায়।
"হ্যাঁ ভালো। তুমি ভালো আছো? আঙ্কেল আন্টি কেমন আছে?" হড়বড় করে বলেছিলো টিপু।
"ভালো", মিষ্টি হাসির সাথে ছোট্ট করে উত্তর দিয়েছিলো মিমি।
সেই কথা বন্ধু মহলে ফুলে ফেঁপে ছড়ায়। কমনসেন্সটা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু ভিন্ন মাত্রার হওয়ায় এদের এটা ধরতে বেশ সময় লেগে যায় যে মিমির মতো মেয়ের টিপুর প্রেমে পড়ার কোন কারণ নেই। টিপু দেখতে খুবই সাধারণ। এ ধরনের প্রসঙ্গগুলো আসে ঠিকই, তবে এরা অনেক অপটিমিস্টিক। "আল্লার দুইন্যায় কখন কি ঘটে কিছু কওন যায়?" এ ধরনের নানান স্লোক তাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে টনিকের মতো কাজ করে।

গ.
সময়ের সাথে সাথে ব্যাপারটা নিয়ে বন্ধুদের উৎসাহ বাড়ে। টিপু হয়তো কিছু বলেনা বা বলার সাহস পায়না অথবা হয়তো লজ্জা পায়। কিন্তু মিমি যখন লিটনের দোকানের পাশ দিয়ে যায়, বন্ধুদের মধ্যে দু'য়েকজন শিস্ দিয়ে উঠে। মাঝে মাঝে অতিউৎসাহী কেউ একজন সুর করে ডেকে ওঠে,
"টিপুউউউউ, তুমি গ্যালা কই?
আবার কখনও শুধু চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে, "আইলোরেএএএ"।
দু'চারজনের হাসিতে ফেটে পড়ার শব্দও শোনা যায়।

বন্ধুদের এসব আচরণের প্রেক্ষিতে মিমি কি প্রতিক্রিয়া করতে পারে তা নিয়ে টিপু মনে মনে অনেক কিছু ভেবেছিলো। হিন্দী সিনেমার নায়িকাদের মতো হয়তো স্যান্ডেল হাতে তাড়া করবে? অথবা মুখ ঝামটা মেরে গটগট করে হেঁটে যাবে? অথবা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলবে,
"অসভ্য কোথাকার!"
অথবা হয়তো টিপুর বাসায় গিয়ে নালিশ করে আসবে মিমির বাবা-মা।

কিন্তু বছরখানেকের মাথায় টিপু বুঝতে পারে যে তার কল্পনার এসব প্রতিক্রিয়ার কোনটাই মিমি করেনা। তবে কি মিমি তাকে পছন্দ করে? কিছুটা এলোমেলো বোধ করে সে। মিমি কি সাহসী ছেলেদের পছন্দ করে? সিনেমা নাটকের প্রভাবে ঢিসুমু-ঢুসুম টাইপের সাহসী পুরুষের কাছে মেয়েরা নিজেকে সঁপে দেয় এরকম একটা "সত্য" সে নিজেনিজেই আবিস্কার করে ফেলেছিলো। এহেন নানান চিন্তার প্রেক্ষিতেই, টিপুর স্বপ্ন দীর্ঘায়িত হয়। সাথে বাড়ে বুকের ভেতরের দ্রিম দ্রিম, আর একইসাথে মনের অন্য কোণায় বাড়তে থাকে আফসোস। মাঝে মাঝে তার মনে হয় মাস্তানী ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনায় ফিরে যায়। দিনরাত মুখ গুঁজে পড়বে, সারাদিনে আঠারো ঘন্টা করে পড়লে নিশ্চয়ই সেও মিমির মতো ভালো ফলাফল করতে পারবে। দুয়েকবার প্রচেষ্টাও নিয়েছিলো, কিন্তু আঠারো ঘন্টা তো দূরের কথা ঘন্টাখানেকও চালাতে পারেনি। একবার পাশের কলোনীতে কি একটা "ক্যাচাল" (মাস্তানপক্ষদের মধ্যে পারস্পরিক মারামারি বা ঝগড়াবিবাদ) লাগলো, শার্টের নিচে বেল্টের ভেতর চাইনিজ কুড়াল গুঁজে বের হয়ে গিয়েছিলো। আরেকবার সম্ভবতঃ অনেকদিন পর কোন এক বন্ধু বেড়াতে এসেছিলো কলোনীতে। বন্ধুর চেয়ে পড়াশোনা বা অধ্যবসায় কোনকালেই বড় ছিলোনা তার কাছে।

মোদ্দাকথা, মিমির প্রতি আকর্ষণ বোধের কারণে পড়াশোনায় ফেরা উচিত এমন একটা তাগিদ অনুভব করলেও, বাস্তবে টিপুর পক্ষে আর সে পথে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। মনে মনে তাই সে ঠিক করে রেখেছিলো বছর পাঁচেক মাস্তানী করে লাখ পাঁচেক টাকা কামাবে, তারপর বছর তিনেক কন্ট্রাকটারী করবে। তিন বছর কন্ট্রাকটারী করে কিভাবে বাড়ী গাড়ী করে ফেলা যায় মাশুক ভাইর কাছে সেসব গল্প অনেক শুনেছে সে। বাড়ি গাড়ি হয়ে গেলে তবেই মিমিকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে সে, রাজী না হলে সোজা তুলে নিয়ে যাবে -- এই হলো তার অস্টবার্ষিক পরিকল্পণা।

ঘ.
টিপুর অস্টবার্ষিক পরিকল্পণা যে বাস্তবের চেয়ে অনেক দূরে সেটা খুব করুণভাবে প্রথম সে টের পায় আরো বছরখানেক পরে। তখন ক্লাস টেনে পড়ছে মিমি। জাপানী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটা দল এসেছিলো বাংলাদেশে। দেশের শীর্ষস্থানীয় আটটা স্কুল পরিদর্শন করে সবচেয়ে ইম্প্রেসিভ বত্রিশজন হাইস্কুল ছাত্রছাত্রীকে তারা জাপানে নিয়ে যায় পনেরো দিনের এক শিক্ষাসফরে। ছোট্ট কলোনীর পরিমন্ডলে এ ছিলো এক বিরাট খবর। এক ধরনের সাড়া পড়ে যায়। মিমির বাবার নাম আফতাব আহমেদ, লোকের মুখে মুখে আফতাব সাহেবের ছেলেমেয়েদের প্রশংসা। মিমির সাথে সাথে তার বুয়েট পড়ুয়া বড় ভাইয়ের প্রশংসার ব্যাপারটিও নতুন করে চলে আসে লোকের আলোচনায়।

যে মেয়ের প্রেমে গত দুবছর ধরে বুঁদ হয়েছিলো টিপু, তার ব্যাপারে চারদিকে এত প্রশংসা শুনে ভালো লাগার কথা তার। যেমন, যখন তার কোন বন্ধু প্রথমবারের মতো মিমিকে দেখে মিমির রূপের প্রশংসায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে, এক ধরনের গর্ব অনুভব করে টিপু। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটনা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে টের পায় যে তার ভেতরে একটা অংশ এখন প্রাণপণে চাইছে মিমির জাপান যাবার দিনটি আবার ফিরে আসুক। এয়ারপোর্টে গিয়ে প্লেনটাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে আসবে সে।

টিপুর মনে জন্ম নেয়া অদ্ভুত ধরনের এই অনুভূতি, যাকে ঈর্ষা অথবা বাস্তবতার উপলব্ধিজনিত একাকিত্ব যেটাই বলা হোক না কেন, সেটা পরিপূর্ণতা পায় যেদিন কলোনীর এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিরাট আয়োজন করে মিমিকে সংবর্ধনা দেয়া হয় সেদিন। কি স্বতঃস্ফুর্তভাবে বান্ধবীদের একে ওকে জড়িয়ে ধরছে মিমি! ভালো ছাত্র বলে কলোনীতে যে ছেলেগুলোর নাম আছে ওরাও মিমির আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। কারো কারো সাথে খুব হেসে হেসে কথাও বলছে মিমি। কারো হাত থেকে বই, কারো হাত থেকে সিডি নিচ্ছে। সংবর্ধনা মঞ্চের কাছাকাছি জায়গাটা যেখানে মিমিরা ছিলো, সেখানে কি সুন্দর একটা উৎসবমুখর পরিবেশ!

জায়গাটা থেকে মাত্র বিশ-ত্রিশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে হাস্যোজ্জল মিমি আর তার বন্ধু-বান্ধবীদের দেখছিলো টিপু। সব দেখে গা রি রি করতে থাকে মোটামুটি এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত টিপুর। কলোনীর সবচেয়ে "সম্ভাবনাময়" মাস্তান এখন সে। তার "এলাকায়" তার নাকের ডগায় এসব ঘটছে! অবশ্য একইসাথে তারও ইচ্ছে হচ্ছিলো মিমির বন্ধুবান্ধবীদের মধ্যে গিয়ে ওদের একজন হতে, হেসে হসে কথা বলতে, মিমির হাতে একটা সুন্দর ফাউন্টেন পেন তুলে দিতে। সেও তো ওদেরই সমবয়েসী। কিন্তু এসব ভাবতে ভাবতে যখন নিজের মাঝে ব্যাপারটা নিয়ে এক ধরনের অপারগতা আবিস্কার করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রথমবারের মতো সে অনুধাবন করে, সে আসলে এখন আর এদের কেউ হতে পারবেনা। এদের মাঝে তাকে আর মানাবেনা। এক ধরনের অদৃশ্য শেকলে বাঁধা দু'পায়ের অস্তিত্ব অনুভব করে টিপু।

সেদিনই প্রথম, চাইনিজ কুড়াল হাতে নেবার পর সেদিনই প্রথম সে মাথা নিচু করে বাড়ি ফেরে। ড্রয়িং রুমে বসে থাকা বাবা আর বড় ভাইকে পাত্তা না দিয়ে নিজের ছোট্ট খুপরীর মতো ঘরটার দিকে চলে যায়না। সোফায় বসে বাবার দিকে তাকায়, ভাইয়ের দিকে তাকায়। কেউ কিছু একটা বলুক, তীব্রভাবে অনুভব করে সে। অথচ কেউ কিছু বলেনা। একজন প্রায় শব্দ ছাড়াই টিভি দেখছে, আরেকজন মুখ গুঁজে পড়ছে বাসি পেপার। কি অসহ্য রকমের নীরবতা। কোথাও তার কেটে গেছে, অথবা দেয়াল তৈরী হয়ে গেছে, সেদিনই প্রথম টের পায় টিপু।

সেই শুরু। তারপর শুধু ঐ দেয়ালটার অস্তিত্ব পুরুভতে থাকে টিপুর ভেতর। এরমধ্যে বাবা-মায়ের জোরাজুরিতে প্রাইভেটে এসএসসি পরীক্ষা দিতে বসে পরের বছর। মিমিও পরীক্ষা দিচ্ছে, তাই কোনভাবেই পরীক্ষা দেয়ার ব্যাপারে তার উৎসাহ ছিলোনা। কিন্তু বাবা কিভাবে যেন মাশুক ভাইকে ম্যানেজ করে ফেলেন। মাশুক ভাইয়ের কথা ফেলার সাহস হয়না টিপুর, বিশেষ করে যখন সেটা আসে আদেশের সুরে। এসএসসি পরীক্ষা ছেলেখেলা নয়, বিশেষ করে প্রায় বছর তিনেক বইয়ের সাথে কোন যোগাযোগই রাখেনি যে ছেলে, তার জন্য এটা অগ্নিপরীক্ষার মতোই। মিরাকল অপাত্রে ঘটেনা, পরীক্ষায় সাত সাবজেক্টেই ফেল করে সে।

ওদিকে বোর্ডস্ট্যান্ড করে কলোনীতে দ্বিতীয়বারের মতো সাড়া ফেলে দেয় মিমি। পত্রিকায় মিমির নাম আসে, ছবি ছাপায়। মিমিদের বাসায় সাংবাদিকেরা ভীড় করে, এমনকি টিভির এক অনুষ্ঠানেও দেখা যায় মিমিকে। পুরো কলোনী জুড়ে সাড়া পড়ে যায়। টিপুর যে বন্ধুরা কিছুদিন আগেও এমন ভাব দেখাতো যে দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি নেই যা টিপু-মিমির সফল পরিণতি ঠেকাতে পারে, তারাও যেন হঠাৎ এবিষয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। অনেক দেরীতে হলেও তারা টের পায় একটা দেয়াল ঠিকই আছে। মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসলেই সব হয়না। দুয়েকজন ঠোঁটকাটা গোছের বন্ধু টিপুকে বলেও ফেলে,
"তুই হালায় পুরাই আবাল। দুইন্যায় আর মাইয়া ছিলোনা! অহনে আর কি করবি? হার্ট খুইল্যা জাম্বাক ডল।"

ঙ.
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরো করুণ মোড় নেয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে যা হয় তাই। মাস্তানীর সাথে সাথে ফেন্সিডিল ধরে টিপু। নতুন যাত্রা শুরু। নতুন নতুন "মাল" আসে হাতে, পাশাপাশি মাশুক ভাইয়ের পকেট ভারী হয়। টিপু আর তার চ্যালাদের এই পয়সার জন্ম দিতে হয় চিরাচরিত ছিনতাই আর "ডাইলে"র ব্যবসা করে। "মাল" পয়সা আনে, পয়সায় নতুন "মাল" আসে -- অর্থনীতির চিরন্তন চক্র।

এর বছর কয়েকের মধ্যেই পীরবাগ থেকে মোটর সাইকেল চুরির অভিযোগে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় টিপু আর তার স্যাঙাৎ জিসানকে। অবশ্য শাপে বর হয়। এলাকার নেতার নেকনজরে পড়ায় দু'মাসের মাথায়ই হাজত থেকে বের হতে পারে তারা। ফিরে আসে মহাসমারোহে, কয়েক র‌্যাংক উপরের মাস্তানের বেশে। এলাকার বাজারে ব্যানার টাঙানো হয়, "টিপু-জিসান ঘরের ছেলে, থাকবে কেন জেলের সেলে"। নতুন মাত্রায় শুরু হয় চাঁদাবাজি, ড্রাগ, অস্ত্রের ব্যবসা, বস্তিব্যবসা -- সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নেয়া শুরু করে টিপু। এমনকি দু'বছরের মধ্যে মাশুককেও আউট করে দেয় সে সুযোগ বুঝে।

সারাদিন নেশাগ্রস্ত টিপু আর ওর দলের ছেলেপিলেদের পড়ে থাকতে দেখা যেত লিটনের কনফেকশনারীর পাশে তৈরী করে নেয়া চালাঘরে। রাতে চলে চাঁদাবাজী, নতুন মাস্তান তৈরীর প্রশিক্ষণ, মালের আদান-প্রদান, আর ফুটপাতে বসতি গাড়া বস্তিবাসী জোয়ান মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি। প্রথম প্রথম এধরনের মৌজ-ফুর্তির জন্য পয়সা দিতো ওরা মেয়েগুলোকে, অথবা ওদের বাপ-স্বামীকে। ক্ষমতার স্বাদ বলে কথা। পয়সা না দিলেও কিছু করার নেই। এক সময় সেটাও বন্ধ করে দেয়। টিপু বলতো, "গতরও খাটামু, আবার পয়সাও দিমু, এইটা কোন কথা হইলো!" এটা ছিলো ওদের বন্ধুমহলে সবচেয়ে "হিট" ডায়লগ।

মাঝে মাঝে শুধু নেশা যখন খুব চুড়ায় উঠতো, টিপুর মুখে ভারী ভারী দার্শনিক কথার জোয়ার আসতো। চোখের কোণায় বালির মতো চিক চিক করতো শুষ্কপ্রায় জল। মিমির প্রসঙ্গ আসতো, টিপু বলতো, "আমি চোখ বুইঞ্জা কয়া দিবার পারি, এই মাইয়ার লাইগা ল্যাংলা-লুলা জামাইও পাওয়া যাইবোনা। কোন আবুলে এরাম জ্ঞানী বউ চায়, ক? হা হা হা।" টিপুকে খুশী করার জন্যই হোক অথবা "জ্ঞানী"দের উপর একচোট নিতে পারার কারণেই হোক, আশপাশের স্যাঙাৎরাও যোগ দিতো সেই হাসিতে।

অবশ্য মাঝে মাঝে, কদাচিৎই বলা চলে, পিজি হাসপাতালের করিডোরে কোন এক সকালের স্মৃতি মনে পড়লে হাউমাউ করে কেঁদে উঠতো টিপু, চিৎকার করে বলতো, "হারামজাদী, খাংকি, মাগী! আমি তো তরে বিয়া করনের প্রস্তাব দেইনাই। একটা থেংকসও কইতে পারলিনা! ভাবটা এমন চোদাইলি য্যান আমারে চিনবারও পারস নাই! খাংকি মাগির মায়রে বাপ্!"

২.
ক.
টিপুর ঘটনা বা আদ্যোপান্ত আর জানতে পারেনি কেউ। ওদিকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে নৃতত্ববিদ্যায় মাস্টার্স করে পিএইচডি করার জন্য ক্যানাডা চলে যায় মিমি। সদ্য বিবাহিত প্রবাসী বরের সাথে। কলোনীর লোকের মুখে মুখে প্রচন্ড ধুমধামের সাথে হওয়া সেই বিয়ের কাহিনীও ইতিহাস হয়ে ঘোরে। তবে এই ইতিহাসের সাক্ষী টিপু ছিলোনা। সে তখন কোথায় তা কেউ জানতোনা, জানার প্রয়োজনও বোধ করতোনা হয়তো। যদি না সামার ভ্যাকেশনে মিমি ঢাকায় বেড়াতে আসতো। যদি না ঠিক যে সন্ধ্যায় মিমির নানা-নানী দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন, সেই সন্ধ্যায় মিমি নানাবাড়ীতে থাকতো।

গল্পটার শুরুটা এখানেই। খুব ছোট্ট একটা গল্প, যার জন্য টিপুকে নিয়ে এত বড় একটা ভূমিকা করতে হলো।

ছোট ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়া আফসার ভুঁইয়া যখন ফোনে শুনলেন যে তাঁর সবচেয়ে আদরের নাতনী মিমি দেখা করতে এসেছে, তখন বেশ খানিকটা হন্তদন্ত হয়েই বাসায় ফেরার জন্য রওয়ানা দেন। অনেকদিন পর আদরের নাতনীকে দেখার তাড়া। ঐ তাড়াহুড়োটাই গোলমাল বাঁধায়। বাসার গলির মুখের বড় রাস্তার অন্যপাশে রিক্সা থামিয়ে হেঁটেই এপাশে আসার চেষ্টা করেন নানা নানী। একটা প্রাইভেট কার মুহুর্তেই হুস্ করে চলে যায়। বীভৎসভাবে ধাক্কা খান বৃদ্ধ-বৃদ্ধা দুজনেই, খানিকটা উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়েন খোলা রাস্তার ওপর। দু'জন দু'দিকে।

গলির মুখেই সস্তা রেস্টুরেন্ট ধরনের জায়গায় প্রায় সারাদিন ধরে আড্ডা দেয় কয়েকটা ছেলে। এক নজর দেখেই বোঝা যায় এরা সব বখে যাওয়া "ডাইলখোরে"র দল। ওদেরই দু'জন, সাথে সাথে প্রাইভেট কারটিকে তাড়া করে। বাকী তিনজন বিদ্যুতের বেগে দৌড়ে এসে ঘিরে দাঁড়ায় রাস্তার ওপর চিৎ হয়ে থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে। যাতে অন্য কোন যানবাহন তাদের ওপর দিয়ে চলে যেতে না পারে। এদেশে কোন কিছুর নিশ্চয়তা নেই। ওদের দেখাদেখি গলির পাশের ফুটপাতে দাঁড়ানো আরো কিছু লোক এসে জড়ো হয় রাস্তায়। রক্তে ভেসে গিয়েছিলো বৃদ্ধ আফসার সাহেব অর্থাৎ মিমির নানা ভাইয়ের আশপাশটা। তাঁর মাথায় ভীষন আঘাত লেগেছে। নানীরও অবস্থা আশংকাজনক। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এ্যাম্বুলেন্স ডাকলে আসতে যে সময় নেবে অতটা সময় এরা বাঁচবে কিনা সন্দেহ।

বখাটে ছেলেগুলোর একজন নয়ন। হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠে, "আরে ধুর! বালের এ্যাম্বুলেন্সের লাইগা বইয়া থাকলে মুরুব্বীরে বাচান যাইবোনা।"
বলেই সে দৌড়ে যায় গলির মুখের সবচেয়ে কাছের বাসাটিতে। আদেশের সুরে বলে,"গাড়ীটা বাইর করেন, উনাগোরে হাসপাতালে নেওয়া লাগবো।"
প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করা নিয়ে বাড়ীর মালিকের অনীহা ছিলোনা, তবে ড্রাইভার ছুটিতে থাকায় ভদ্রলোক কিছুটা কাঁচুমাচু শুরু করেন। ভদ্রলোককে পাত্তা না দিয়ে অনেকটা গায়ের জোরেই নয়ন বলে, "আরে গাড়ী চালানোর লোকের অভাব নাই, আপনে খালি চাবি লইয়া আসেন, যান!"
গৃহকর্তা কাঁপতে কাঁপতে চাবি আনতে ভেতরে যান। তবে ড্রাইভার নিয়ে ঝামেলা বেঁধে যায় ঠিকই। আশপাশে এতগুলো মানুষ, কেউ গাড়ী চালাতে পারেনা।

শেষমেষ বিশাল ল্যান্ডক্রুজারে রক্তাক্ত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে উঠিয়ে ড্রাইভিং না জানা নয়ন নিজেই গাড়ী চালানো শুরু করে। দূর্ঘটনার ভয়ে দুয়েকজন মিন মিন করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেন, নয়নের ধমকে চুপসে যেতে হয়।
"বিসমিল্লা কইয়া স্টাট দিছি, একটা কিছু হইবোই। বইয়া থাকলে তো কিছু হইতাছেনা, তাইনা আঙ্কেল?" লোকজনকে এরকম আরো কিছু নীতিবাক্য শুনিয়ে দিয়ে গাড়ী নিয়ে দেয় ছুট। বড় রাস্তায় পাগলা হাতির মতো এলোমেলো গতিতে সেটাকে ছুটে যেতে দেখা যায়।

খ.
পরদিন একদম ভোরে যখন মিমি তার বড় মামীর সাথে স্কয়ার হাসপাতালে চলে আসে, তখন আইসিইউর বাইরে অল্প কিছু দর্শনার্থীর মধ্যে নয়ন ছেলেটি তার চোখ এড়ায়না। আগের রাতেও সে এসেছিলো, কিন্তু হাজার মানুষের ভীড়ে সবাইকে তো আর খেয়াল করা যায়না। উনিশ বিশের বেশী বয়েস হবেনা, লম্বা গড়নের,ঋজু দেহভঙ্গী। ছেলেটিকে দেখে খুব খুশী হয়ে পড়েন মামী। বড় মামাকে ফোন করে বলেন, "শোনো, বাঁচা গেলো! তুমি ফাইয়াজকে আসতে মানা করে দাও। কালকের ছেলেগুলোর একটা এখনও আছে, ওকে দিয়েই বাড়তি রক্তের ব্যবস্থা করানো যাবে।"

ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা কাছাকাছি চলে আসায় হলে চলে যাওয়া ছেলেকে মামী জানতে দেননা দুর্ঘটনার কথা। ডাক্তাররা বলে রেখেছে বাড়তি রক্তের জন্য ডোনার ঠিক করে রাখতে। ফাইয়াজের বাবা চেয়েছিলো সকালে ছেলেকে পাঠাবে। কি হবে একবেলা পড়া নষ্ট হলে, তাছাড়া দাদা-দাদী তো নাও বাঁচতে পারে। কিন্তু ছেলের মায়ের এক কথা, দুনিয়া উল্টে যাক, পড়াশোনা নষ্ট হতে দেয়া যাবেনা। এই ইয়ারের রেজাল্টের ওপরই নির্ভর করছে ছেলের ডিপার্টমেন্টে টিচার হবার ব্যাপারটি। এখন হাতের কাছে নয়নকে পাওয়ায় ভদ্রমহিলা আর কোন কথা শুনবেননা।

নয়নের দিকে পাঁচশ টাকার দুটো নোট এগিয়ে দিয়ে বললেন কি কি করতে হবে। এগিয়ে দেয়া নোটদুটো দেখে ছেলেটি খানিকটা সংকোচ দেখায়, মৃদু কন্ঠে বলতে চায় যে ওসবের দরকার নেই। আবার পাশাপাশি "দিলোই যখন নিয়ে নিলে আগামী কয়েকদিন বিনা ঝামেলায় চলা যাবে", এমন চিন্তাও যে তার মাথায় খেলেনা তা না। শেষমেষ হেরে যায় বাস্তবতার কাছে, হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে রওনা দেয় সে।

কিন্তু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মিমি স্পষ্ট দেখতে পায়, ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে এতক্ষণ ঋজু হয়ে থাকা ছেলেটির দেহভঙ্গী। কাঁধের কাছে মাথাটা যেন হঠাৎ করেই কড়াৎ করে ভেঙে ঝুলে গেছে। ধীর পায়ে লিফটের দিকে এগিয়ে যাওয়া ছেলেটির প্রাণহীন হাঁটা দেখে তার মনে হয় করুণ একটা সুর বেজে উঠছে চারপাশে। সেই সুর কাঁধে বয়ে যাচ্ছে ছেলেটি, ধীরে ধীরে লিফটের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায় নয়ন।

ঠিক তখনই মিমি টের পায়, একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি। এক ধরনের অস্থিরতা যে তীব্রভাবে গ্রাস করছে, বুঝতেপারে। তার মনে হয়, ছেলেটিকে আরেকটু সময় ধরে দেখার একটা অদ্ভুত সাধ হচ্ছে তার।

হঠাৎ কেন এমন মনে হচ্ছে সে যেন জানতে চায়না, তাই বিব্রত বোধ করে। তবে তীব্র ইচ্ছেটা টের পায়, বারবার। আর পারেনা মিমি। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি তাকে গ্রাস করতে থাকে। তার মনে পড়ে, পিজি হাসপাতালের করিডোরে এমনই এক সকাল, বাবার হার্ট এ্যাটাক, তাকে পাঁজাকোলে করে চারতলা থেকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একটা ছেলে। মিমির এখনও মনে পড়ে, লম্বাটে শুকনো গড়নের ছেলেটি চলে যাচ্ছে হাসপাতালের করিডোর ধরে বাইরের দিকে, নয়নের মতোই মাথা নিচু করে, ধীর লয়ে, করুণ অসহায় ভঙ্গিতে।

সেদিনের ছেলেটি কে ছিলো সেটা তার এখনও মনে আছে, এবং কোনদিন যে ভুলতে পারবেনা সেটাও সে ঠিকই অনুভব করে।
পিজি হাসপাতালের করিডোরে ডাক্তার টিপুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, "উনি রোগির কি হন?"
জবাবে মিমি বলেছিলো, নির্বিকার মুখে, নিচু স্বরে, "কেউ না"।
টিপু কোন ক্ষোভ দেখায়নি সেদিন। নিরূপায় অসহায়ের মতো একটু একটু করে লিফটের দিকে সরে গিয়েছিলো।

আজ এতদিন পর ঠিক কি কারণে মিমি বুঝতে পারেনা, চোখের কোণায় জল জমে তার, স্বচ্ছ টলটলে হ্রদের জল। সে জানে একটু এদিক সেদিক হলেই এ জলের ধারা বন্ধ করা সম্ভব হবেনা। মস্তিষ্কের ভেতর হন্তদন্ত হয়ে সে খুঁজে বেড়ায় একটি পাথর, এক্ষুণি সবকিছু চাপা দিতে হবে।

তারপরও, অস্থির সেই কয়েকটা মুহূর্তে, তীব্র ইচ্ছে হয় তার, কাউকে ধরে জিজ্ঞেস করে, "টিপু ভাইয়ের কোনো খবর জানেন?"

স্কয়ারের পাঁচতলার করিডোরে টুপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ে মিমি, অন্যদিকে মুখ লুকোয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29240387 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29240387 2010-09-16 09:19:42
ছোটগল্প: জেল বছর পাঁচেক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মৌটুসী এখনও স্বপ্নটা দেখে। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তা সে স্পষ্ট বুঝতে পারেনা। শুধু টের পায় যে চিৎকার করে কিছু বলতে চাচ্ছে সে। ছুরি হাতে এগুতে থাকা ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করেই কি যেন বলতে চায়। কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়না। মনে হয়, কেউ একজন যেন খুব জোরে তার গলা চেপে ধরেছে। আবার মাঝে মাঝে এমনও মনে হয়, গলার ভেতর বড়সড় কিছু একটা দলাপাকিয়ে আটকে গেছে। দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। প্রাণপণ প্রচেষ্টাতেও কিছু হয়না, স্বপ্নের ভেতরই ভীষন অসহায় বোধ করে সে। কিছুক্ষণের মধ্যে আশপাশের কোনো জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্তের জোয়ার। লাল টকটকে রক্ত আলকাতরার মতো ধেয়ে আসে।

স্বপ্নের ঠিক এই জায়গাটাতেই চিৎকার করে জেগে ওঠে মৌটুসী। উঠে বসার ফুরসৎ পায় কি পায়না, তবে নাগালের মধ্যে থাকলে সেলিনার লাথিটা ঠিকই খায়। খানিক দূরে ঘুমুতে থাকা কলিদিও কখনও কখনও খেঁকিয়ে ওঠে, খিস্তি দিয়ে বলে, "ঘুম যা মাগি, আল্লাদ চুদাইসনা!"

গুম হয়ে বসে থাকতে হয় মৌটুসীকে, এখানে তার থাকার কথা না। পাঁচ বছরে যতবার দুঃস্বপ্নটা দেখে ঘুম ভেঙেছে প্রতিবারই এই একই কথা মনে হয়েছে তার, রুটিন করে, এই জায়গাটা তার হবার কথা ছিলো না। এক ধরনের অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। তবে সেই অবসাদগ্রস্ততা দীর্ঘস্থায়ী হয়না, বিশেষ করে যখন তাকে ভাবতে হয়, এ জায়গাটা ছেড়ে আর কোথায় যাবে সে।

মাঝে মাঝে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাতের অন্ধকার হাতড়ে পাতড়ে এগিয়ে যায় মরচে পড়া লোহার গ্রিলগুলোর দিকে। গ্রিলগুলো যেন এক ধরনের নির্মম রসিকতা। আলাদা করে রেখেছে তাদেরকে বাকী সবার থেকে। যেন গ্রিল না থাকলেই এক হয়ে যাওয়া যায়।গ্রিলের কোনো একটা অংশ খুব অকারণেই শক্তভাবে মুঠ করে ধরে। কখনও ঘুমে ঢলে পড়ে, দাঁড়িয়েই ঘুমায়। কখনও লম্বা করিডোরে আঁধারের শেষপ্রান্ত খোঁজে।

আবার কখনও ঘুম ভাঙার সময় বেশী জোরে চিৎকার করে ফেললে সেন্ট্রি মহিলা চলে আসে। অকারণ বুটের শব্দের সাথে সাথে টর্চ জেলে একেকটা সেলে আলো মারতে থাকে আর কি কি যেন পরীক্ষা করে। একবার সরাসরি টর্চের আলো এসে পড়েছিলো চোখে, গ্রিলের শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো মৌটুসী, ঘুম ঘুম চোখে। অন্ধকার ভেদ করে হঠাৎ ভেসে আসা আলোর জোয়ারে সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলো ছেলেটিকে। ছুরি হাতে এগিয়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো সে সেন্ট্রিকে উপেক্ষা করে। পারেনি। গলায় কি যেন দলা পাকিয়ে যাচ্ছিলো, আর সববারের মতোই। তবে সেবার ঘোর কেটেছিলো অন্যভাবে, বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে সেন্ট্রির লাঠির প্রচন্ড আঘাতে। ঠাস ঠাস করে লাঠির আঘাতের সাথে সাথে সেন্ট্রি বলেছিলো, "খানকি মাগি, রাইত দুপুরে নাটক করস্!"। ব্যাথাটা ভুগিয়েছিলো অনেক দিন।

মাঝে মাঝে মৌটুসীর মনে হয় সমস্যাটার কথা ডাক্তারকে বলে। বছরে দু'বার ডাক্তাররা এসে পরীক্ষা করে মহিলা জেলের কয়েদীদের, মূলত শারীরিক সমস্যা নিয়ে। মৌটুসীর বয়েস জেলে কাটানো পাঁচ বছর মিলে সবে বাইশ হলো, এই বয়েসে তেমন কোন সমস্যা থাকার কথা না। ডাক্তাররাও সমস্যা পায়না। একটা কাগজের ওপর সাত-আট জায়গায় নিল কালির স্ট্যাম্পে "স্বাভাবিক" লেখা সিল মেরে দেয় ডাক্তার, সেটা হাতে নিয়ে জেলারের টেবিলে জমা দিতে হয়। পাঁচ বছরে পাঁচ দু'গুনে দশবার। প্রতিবারই একই রকম, কোন হেরফের নেই। মাঝে মাঝে শুধু ডাক্তার বদলায়। গত দু'বছর ধরে ভেবে এসেছিলো মৌটুসী, ডাক্তারকে বলবে স্বপ্নটার কথা। ডাক্তারকে বলবে যে সে এটার হাত থেকে বাঁচতে চায়। বলার সাহস পায়নি। বিশেষ করে তুলির গল্প শোনার পর।

প্রতি বৃহস্পতিবার সকালে সেলাইর কাজ করে যাদের সাথে তাদের একজন তুলি। গ্রামের মেয়ে, চেয়ারম্যানের ছেলের হাতে ধর্ষিত হবার পর বিচার চাওয়ার চেষ্টা করেছিলো মেয়েটির পরিবার, শহুরে শিক্ষিত এক নীতিবাগিশ আত্মীয়ের উপদেশে। কাজের কাজ কিছু হয়নি, বরং কিছু টের পাবার আগেই অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ মাথায় নিয়ে জেলে ঢুকে গেছে মা আর ছোটবোন সহ। তাও তিনজন আলাদা জেলে। শহুরে আত্মীয়ও লাপাত্তা। এই মেয়েটি মাঝে মাঝে একটা শেয়াল দেখতে পায়, হিংস্র ধরনের দাঁতাল শেয়াল, স্প্যানিশ বিশালকায় ষাঁড়গুলোর মতো খুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, আর মনে হয় যেন রক্তাক্ত মাংসের জন্য ছোঁকছোঁক করছে। একবার ডাক্তারকে বলেছিলো সে সমস্যাটার কথা। ডাক্তার কতটা শুনেছে জানতে পারেনি সে, তবে ঘুমের ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে উপদেশ দিয়েছিলো যে এসব কম কম দেখতে। তা না হলে নাকি পাগলা গারদ সেলে পাঠিয়ে দেবে কর্তৃপক্ষ। পাগলা গারদের ভয়ে মেয়ের শেয়াল দেখা কমেনা বরং বেড়ে যায়, তবে মুখ ফুটে সেটা বলার সাহসটুকু ঠিকই কমে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। সেলাইর কাজের সময় সবসময় পাশাপাশি বসে তুলি আর মৌটুসী। প্রায়ই মৌটুসী দেখে, অদৃশ্য কিছু একটার উপস্থিতি টের পাচ্ছে তুলি, আতংকে কেঁপে উঠছে।

২.
মৌটুসীরও শেষমেষ দুঃস্বপ্নের কথা কাউকে আর বলা হয়না। শুধু মাঝে মাঝে যখন আশপাশের সব কিছুকে শূন্য অস্তিত্বহীন মনে হয়, সময়কে মনে হয় থেমে গেছে জেলের সেলের ছোট্ট জানালাটার ওপাশে মেঘের দাপটে, তখন তার ইচ্ছে হয় কাউকে সব খুলে বলে। কাউকে জানায় যে আসলে সে মুক্তি চায়।

এমনই এক মেঘলা দুপুরে ছাদ থেকে ছুটতে ছুটতে নেমে এসেছিলো তার ছোট ভাইটি, দশ-এগারো বছরের শীর্ণকায় কিশোর মিশুক বেহুঁশের মতো চিৎকার করে শুধু বলতে পারছিলো, "আম্মা! আম্মা! আম্মা! আম্মা ..."।

মিশুকের চিৎকারে বাড়ীর সবাই ছুটে গিয়েছিলো ছাদের দিকে, কিন্তু ততক্ষণে বেশ দেরী হয়ে গেছে। মফস্বলের তিনতলা বাড়ীর ছাদ থেকে গাছের ডাল ধরে ঝুলে দুষ্টুমী করা যায়। তবে বাড়ীর ভাড়াটেদের মেয়ে, কলেজে পড়া অস্টাদশী মৌসুমী সেরকম কোন দুষ্টুমীর ছলে গাছের ডালে ঝুলে ছিলোনা। ছাদে দাঁড়িয়েই নারকেলের ডালের সাথে বেঁধেছিলো দড়ির একপাশ, অন্যপাশ দগদগে ঘা তৈরী করে সেঁটে ছিলো তার গলার কাছে। বিস্ফারিত চোখ, বাঁচবার শেষ আশা কি করেছিলো কিছু? শেষ মুহুর্তে এসে? এসব জানেনা মৌটুসী। কারণ, বড়বোনের শবদেহ সে দেখতে পায়নি। ঢাকায় ছোটমামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলো সে এসএসসি পরীক্ষার পর। ফিরে এসে দেখেছে বোনের কবর, তাও দূর থেকে।

অদ্ভুত রকমের ছিলো এর পরের ঘটনা প্রবাহ। যে মাস্তানের যন্ত্রণা আর উপদ্রবের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলো মৌসুমী, সেই মাস্তানের কিছু হয়নি। বরং বাসা ছাড়তে হয় মৌসুমী-মৌটুসীর বাবা শহিদুল্লাহ মিয়াকে। গলায় দড়ি দিয়ে অভিশাপ ডাকানোর দায়ে বাড়িওয়ালাকে দিতে হয় বাড়তি পাঁচ মাসের ভাড়া। জরিমানা হিসেবে, প্রতিবেশী মুরুব্বিদের ফয়সালায়।

এখানেই সব শেষ হলেও বেঁচে যেতেন শহিদুল্লাহ মিয়া আর তার স্ত্রী নাজমুন নাহার। কিন্তু বড় মেয়ের মৃত্যুর মাস দুয়েকের মধ্যেই বাসা বদলে আসা নতুল এলাকার মাস্তান কল্লোলের সাথে যখন তাঁদের ছোট মেয়ে মৌটুসীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা নিয়ে নানান কথা ছড়ায় প্রতিবেশীদের মুখে -- তখন নতুন করে তাঁরা বুঝতে পারেন সব শেষ হয়নি। বড় মেয়ের করুণ পরিণতির কারণেই কি ছোট মেয়েটি পাড়ার মাস্তানকে ফিরিয়ে দিতে সাহস পায়নি? অথবা, বড়বোনের মৃত্যু কি ছোট বোনকে একটুও ছুঁতে পারেনি যে সে ওরকম এক মাস্তানের সাথে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে? এহেন নানান ধরনের হতাশায় আচ্ছন্ন হতে থাকেন তারা, একের পর এক।

বাবা মায়ের মানসিক যন্ত্রণা কিছুটা হলেও টের পেয়েছিলো মৌটুসী, নিদেনপক্ষে এক ছাদের নিচে থাকলে যতটুকু অগ্রাহ্য করা যায়না ততটুকুর কল্যাণে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তা কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরী করেনি। কল্লোলের সাথে তাকে আইসক্রীম খেতে দেখা যায়, কলেজ ফাঁকি দিয়ে সদর জেলার সিনেমায়ও গিয়েছে বলে গুজব ছড়ায়। মৌটুসীর মা যখন মোটরসাইকেলের পেছনে চেপে প্রেমিকের কোমর জড়িয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া মেয়ের গল্প শোনেন প্রতিবেশীদের মুখে, তখন তাঁকে এসব অবিশ্বাস করার জন্য উল্টো গল্প তৈরী করতে হয়। যে বৃহস্পতিবারে সিনেমা দেখা নিয়ে গুজব জমে ওঠে, সে বৃহস্পতিবারে জ্বরের কারণে যে মৌটুসী কলেজেই যায়নি, এ কথা তাকে জনে জনে বলতে হয়, ফিসফিস করে। এমনকি ডাক্তারের সার্টিফিকেট বের করে দেখানোর অভিনয়ও করতে হয়। কেউ হয়তো বিশ্বাস করে, কেউ ঠোঁট ওল্টায়।

লোকের কুৎসা, কৌতুহলী দৃষ্টি বা ঠোঁট বাঁকানি, সবকিছু উপেক্ষা করেই কল্লোলের সাথে প্রেম চলে মৌটুসীর। কল্লোল যেন তার আলাদিনের যাদুর প্রদীপের দৈত্য। রিক্সা ডেকে দেয়া থেকে শুরু করে রাত বারোটার সময় ফ্লেক্সিলোড করে মোবাইলে টাকা ভরে দেয়া, সবকিছুই সে করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে। অবশ্য মৌটুসীর মতো অসম্ভব রকমের আকর্ষণীয়া এবং সুন্দরীর জন্য এসব করতে কল্লোলের কোন সমস্যা হয়না। পুরো সম্পর্কটায় নিজের অবস্থান নিয়ে তার মনে কোন প্রশ্ন জাগেনা। মৌটুসী তার ওপর নির্ভরশীল, এই অনুভূতিটুকুই তার শরীরের যাবতীয় হরমোনকে পর্যাপ্তভাবে উন্মাদনার যোগান দেয়।

এমনি এক সন্ধ্যায়, কমলের রেস্টুরেন্টের পশ্চিমকোণার বুথে মৌটুসীর বিশেষ আলাপ চলে কল্লোলের সাথে। এখানে ওরা প্রায়ই বসে, কথাবার্তা বলে। তবে সেদিনের সন্ধ্যেটা ছিলো ভিন্ন। সন্ধ্যে কেন বেছে নিয়েছিলো মৌটুসী জানা যায়নি, হয়তো যা বলার তার গাম্ভীর্য বাড়ে। অথবা হয়তো একটু বাপ-মা'র অবাধ্য হতে চেয়েছিলো। তবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না, যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই প্রথম কল্লোল জানতে পারে মৌটুসীর মনের গভীরে আটকে থাকা কষ্টের কথা। কথা বলতে গিয়ে বারবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছিলো মৌটুসী। রেঁস্তোরার গোপন খোপে পর্দার এদিক সেদিক দিয়ে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করেছিলো নিষ্কর্মা গোছের উৎসাহী লোকজন। নারীকন্ঠের কান্নার উৎস আর কারণ জানার জন্য।

৩.
এরপরের ঘটনা ঘটে সপ্তাখানেকের মধ্যেই। মৌটুসীদের আগের বাসা বিজয়পুর বাজার থেকে নতুন বাসা নতুনবাজার এলাকা পাঁচ কিলোমিটারের মতো দূর। বিজয়পুর বাজার থেকে একটা টেম্পোতে চেপে বসেছিলো সে, মাঝপথে হাজীর হাটে নেমে রিক্সায় চাপে। আগের দিন কল্লোলের কাছ থেকে নিয়ে রেখেছিলো দু'শো টাকা, বান্ধবীদের আইসক্রিম খাওয়াবে বলে। সেই টাকার অল্প কিছু অংশ খরচ করে সে চলে আসে বিজয়পুর বাজারে, পড়ন্ত বিকেলে। মাকে বলে এসেছিলো জেসমিনদের বাসায় যাবে, রাতটা থাকবে। জেসমিনকেও বলে রেখেছিলো রাত কাটাবে। সে রাত কাটানো হয়নি।

শৈশব থেকে বিজয়পুরেই বড় হয়েছে সে, সবকিছু কত বেশী চেনা। রিক্সা এসে সোজা থামে নির্মল কাকার বইয়ের দোকানের সামনে। মোটামুটি বড়সড় আকারের দোকানটি বাজারের শেষ মাথায়, অর্থাৎ উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত বাজারের দক্ষিণ-পূর্ব মাথায়। নির্মলের বাসাটিও ঠিক দোকানের পেছনেই। বাজারের মুখের উল্টোদিকে মানে, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটা দরজা আছে যেটা দিয়ে ছোটবেলা থেকেই মৌসুমী-মৌটুসীরা কাকীমার ঘরে যেত। ফুটফুটে দুটো বোন, ছোট্ট উপশহরে সবার কাছে রূপকথার রাজকন্যার মতো আদর পেতো তারা। সেদিনও দোকানে দাঁড়িয়ে বই পড়তে পড়তে সেই দরজা দেখে মনে পড়ে যায় মৌটুসীর, কতদিন কাকীমার সাথে দেখা করেনা। হাতে সময় আছে কিছুটা, সময়টুকু কাকীমার সাথে এটা ওটা গল্প করে কাটানো যায়, ভাবতেই চলে যায় পেছনের দরজার দিকে।

সন্ধ্যে সাতটার খানিক পরে কাকীমার ঘর থেকে বের হয়ে নির্মল কাকার দোকানের পেছনে আবার ফিরে আসে মৌটুসী। যদিও প্রস্তুতি ছিলো টার, তাও খুব লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা তাকে করতে হয়না। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টিসীমায় মোটরবাইকে চাপা একটা ছায়ামূর্তি ভেসে ওঠে। এগিয়ে আসছে কল্লোল। সেদিনও আর সব দিনের মতোই সময়মতো এসে পড়ে সে। কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেট, লেদার প্যান্ট।

একটা গাছের আড়ালে থেকে বাইকে বসা কল্লোলের ওপর চোখ রাখে মৌটুসী। তার দু'চোখে ধ্বংসদেবীর আগুন, হাজার বছর ধরে পোড়ানো আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো যেন। কল্লোলকে সে বিশ্বাস করে নি তা নয়। কিন্তু তাও, যে আগুন চোখে নিয়ে কাটিয়েছে গত কয়েকটি মাস, সে আগুনের একটা পিপাসা আছে। সে পিপাসা মেটাতেই নিয়তির মতো চলে আসতে হয়েছে তাকে, খানিকটা অবচেতনভাবেই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাজারের দিক থেকে এগিয়ে যেতে দেখা যায় ছেলেটিকে, লম্বাটে গড়ন। আগের চেয়ে শুকিয়েছে বোধ হয়, হাঁটার ভঙ্গিতেও আত্মবিশ্বাসের ছাপ কমে গেছে বলে মনে হচ্ছিলো মৌটুসীর। অন্ধকারে কল্লোলের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানিক নামের সেই পিশাচটির ছায়ামুর্তিটি দেখে অবধারিতভাবেই ঘৃণায় জ্বলে উঠেছিলো সে। তার ইচ্ছে হচ্ছিলো দৌড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়ায় বদমাশটার। কল্লোলের বেল্টের পেছনে লুকিয়ে রাখা চাইনিজ কুড়ালটি নিয়ে নিজ হাতে কুপিয়ে মারে অমানুষটাকে। কল্লোলের মোটরবাইক থেকে মাত্র বিশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে তাই সাপিনীর মতো ফুঁসতে থাকে মৌটুসী। নিজে না করতে পারুক, নিজ চোখে দেখতে তো অন্তত পাবে।

তারপর কাঁদবে, দিদির ছবি জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদবে মৌটুসী। দিদির কবরে চলে যাবে, কারো কোন কথা শুনবেনা। কবর জড়িয়ে ধরে কাঁদবে। সারাজীবনে কখনও একা একা হাঁটেনি মৌটুসী, সবসময় একটা হাত ধরে ছিলো দিদির হাত, এজীবনে ঐ হাতের তুলনায় বেশী নির্ভরযোগ্য হয়ে আর কিছুই ধরা দেয়নি তার কাছে। দিদি ছাড়া কখনও সে ছিলোনা, স্কুলের খেলার মাঠ, বাড়ীর ছাদ, নানা বাড়ীর পুকুর বা নির্মল কাকার বইয়ের দোকান -- সবখানেই হঠাৎ একা বোধ করলেই যে অবয়বটির উপস্থিতি তাকে স্বস্তি দিতো, সেটি দিদির। সেই দিদি চলে গেলো, কিছু না জানিয়েই।

এ নিয়ে তার অভিমান ছিলো, কষ্ট ছিলো, আর্তনাদ ছিলো -- সব এক হয়ে জন্ম নিয়েছিলো হিংস্রতা, প্রতিশোধপরায়ণতা। সেই হিংস্রতার প্রতিফলন ঘটবে আর কয়েকটি মুহূর্ত পরই, কল্লোলের চাইনীজ কুড়ালের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে মানিকের শরীর -- ভেবে এক ধরনের অসুরীয় সুখ অনুভব করছিলো সে। কল্লোল তাকে বলেছিলো, "অরে আমি গুলি কইরাও মারবার পারি, কিন্তু তুমার ভইনরে যা করছে তার লেইগা অরে আমি কুপাইয়া কুপাইয়া মারুম।"

কল্লোলের মোটরবাইক থেকে মাত্র বিশ গজ দূরে বিশাল কড়ই গাছের পেছনে লুকিয়ে তাই উত্তেজনায় কাঁপছিলো মৌটুসী। আর মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত, তারপর চুপচাপ ঢুকে যাবে নির্মল কাকার বইয়ের দোকানে।

৪.

কল্লোল ধরা পড়েছিলো, একই সাথে ধরা পড়েছিলো পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা মৌটুসীও। চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মানিকের মৃতপ্রায় লাশ কিছুক্ষণ পরপরই ডাঙায় মাছের মতো ফাল দিয়ে উঠছিলো। তবে বেশীক্ষণ টেকেনি।

মাত্র বিশগজ! মুহূর্তের চেয়েও কম সময়। মানিকের কলার চেপে ধরে প্রায় শূণ্যে উঠিয়ে ফেলেছিলো কল্লোল, অসহায় মানিককে শুধু সজোরে মাথা নাড়াতে দেখা গেছে।

তারপরই ঘটে ঘটনাটা, খুব দ্রুত। শূণ্যে তুলে ধরা মানিককে আছড়ে রাস্তার পাশে ফেলে কল্লোল, মুহুর্তের জন্য ল্যাম্পপোস্টের আলোতে দেখা গিয়েছিলো যন্ত্রণায় কাতর একটি মুখ। গালভাঙা, ফর্সা, লম্বাটে মুখ; চোখের ওপর চশমাটা ছিটকে পড়ে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। বোনের হত্যাকারীর মৃত্যযন্ত্রণায় পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার বদলে হঠাৎ করেই কেঁপে উঠেছিলো মৌটুসী সে দৃশ্য দেখে। অদ্ভুত অনুভূতি, ভয়, কষ্ট, মায়া, অনুতাপে মেশানো। বুঝতে পেরেছিলো সে, বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে কোথাও।

মুহুর্তও নেয়নি, চীৎকার করে উঠেছিলো সে, কিন্তু আজও সে বোঝেনা অত জোরে চীৎকার করার পরও কেনো তার গলা দিয়ে সামান্য শব্দটুকুও বের হলোনা।
"কল্লোল থামো, উনি না, উনি না, অন্য একজন!" বলতে চেয়েছিলো সে।

শেষমেষ দু'হাত সামনে বাড়িয়ে এলোপাতাড়ি দৌড়ে কল্লোলকে নিবৃত্ত করতে ছুটে গিয়েছিলো, কিন্তু মাঝে মাঝে বিশ গজও অনেক বেশী দূরত্ব হয়ে যায়। ততক্ষণে একহাতে চাইনিজ কুড়াল আর অন্যহাতে ধারালো নয় ইঞ্চি ছোরা দিয়ে মানিকের শরীর ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছিলো কল্লোল।
শোনা গিয়েছিলো কয়েকটা গগনবিদারী চিৎকার। হত বিহবল দু'জন তরুণ-তরুণী। আর ছুটে আসা লোকজনের কোলাহল।

এরপরের ঘটনা মৌটুসীর মনে নেই, মনে আছে শুধু এক ধরনের শুনশান নীরবতা গ্রাস করে ফেলেছিলো চারদিক। কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছিলোনা সে, চারপাশে কি হচ্ছে বুঝতেও পারেছিলোনা। টের পেয়েছিলো লোকে এসে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে আর কল্লোলকে। আর দেখেছিলো যন্ত্রনায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া একটা নিরপরাধ মৃত মুখ। লোকটির একটি হাত উপরের দিকে তোলা, বাঁচার কি আকুতি!

৫.
মাঝে মাঝে মেঘলা দিনে জেলের গ্রিল সজোরে আঁকড়ে ধরে আকাশ-পাতাল ভাবে মৌটুসী। নিজের জীবনটা নষ্ট হয়েছে, জেলের গারদে এসে আটকে গেছে, এ নিয়ে কেন জানি অতটা কষ্ট হয়না। আসল খুনটা কল্লোল করেও পার পেয়ে গেছে গডফাদারের কল্যাণে, এলাকার এমপির বডিগার্ড হিসেবে এখন সে গাড়ী হাঁকায়, মানুষের সালাম পায়। সেটা নিয়েও তেমন কষ্ট অনুভব করেনা সে। এমনকি কল্লোলের পাপ লঘু করার জন্য তার বিরুদ্ধে "যৌনতার বিনিময়ে প্ররোচনা"র যে মিথ্যে অভিযোগ এনেছিলো কল্লোলের উকিলপক্ষ, তা নিয়েও অত রাগ হয়না তার। প্রতিশোধের বিনিময়ে শরীর দাবী করলে কল্লোলকে হয়তো সে তাও দিতো।

তবে মাঝে মাঝে ভীষন কষ্ট হয়, সবকিছু দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। একটা মুখ আর উপরের দিকে তোলা একটা হাতের কথা মনে পড়ে, তীব্রভাবে মনে পড়ে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একেকটা আঘাতের সাথে সাথে কি ভয়ংকর ভাবে কুঁকড়ে যাচ্ছিলো মানিক নামের ঐ অচেনা নিরপরাধ লোকটির মুখ! কি বীভৎসভাবে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে বেরিয়ে আসছিলো তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে! কি করুণভাবে একটা হাত উঠে আসছিলো উপরে, কিছু একটা ধরার আশায়, বাঁচবার শেষ আশায়।

মৃতপ্রায় লোকটার মুখে, দেহে সে নিরপরাধ দিদির অবয়ব টের পায়। "এসব দেখে দিদি কি খুশী হবে?" প্রায়ই প্রশ্নটা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

অজান্তেই দু'হাত সামনে এগিয়ে যায় তার প্রায়ই। কিছু একটা ধরতে চায়, কাউকে থামাতে চায়, কিছু একটা বলে চিৎকার করে নিজেকে হাল্কা করতে চায়। অদ্ভুত এক কারাগারের অস্তিত্ব অনুভব করে সে চারপাশে। কারাগারের ভেতরে আরেক কারাগার। জেল থেকে হয়তো বেরুতে পারবে কোনদিন, কিন্তু কোথায় গেলে ঐ কারাগার থেকে মুক্তি পাবে তা সে জানেনা।

যেখান থেকে কোন না কোন গন্তব্যে যাবার অপেক্ষায় থাকে সবাই, সেই জেলের সেলে বসেও কোথাও যাবার আর কোন জায়গা থাকেনা তার।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29238468 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29238468 2010-09-11 07:32:28
ছোটগল্প: কে? "পিং পং, পিং পং!"
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খোলার জন্য হাঁটা শুরু করা মাত্র লায়লা বুঝে ফেলে ওটা আসলে কলিংবেলের শব্দ না। বিস্ময়করই বটে। পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটি তার, নিঝুম। খেলার ছলে কিভাবে যেন আয়ত্ত করে ফেলেছে, অবিকল কলিংবেলের মতো শব্দ করতে পারে। তারপর শুরু হয় তার কথার বন্যা।
"কে? কে?"
ওপাশের কথা আর কেউ শোনেনা, শুধু নিঝুম শুনতে পায়।
নিঝুমের অনর্গল কথোপকথন চলতে থাকে,
"ও! নানা ভাই? কতদিন পরে আসলা!"

"আচ্ছা দাঁড়াও নানা ভাই, আম্মুকে বলছি দরজা খুলে দিতে। আমি তো ছোট! আরেকটু বড় হলে, আমিই খুলে দেবো।"
এটুকু বলে সে ঠিকই, কিন্তু দরজা খোলার জন্য আম্মুকে আর ডাকেনা।

নানা ভাইর সাথে হাজার আলাপ জুড়ে দেয়। ঠিক যেন পান খাওয়া ফোকলা দাঁতের বুড়ি, এক নাগাড়ে বলে যায়,
"তারপর বলো, তোমরা কেমন আছো? নানুকে আনলেনা কেন? আচ্ছা, তুমি এত পরপর আসো কেন? ওমা! এত সুন্দর জামা? খালি খালি এত খরচ করলা!"

মাঝে মাঝে কথার স্রোত গতিপথ পাল্টায় দ্রুত, পাল্টায় দরজার ওপাশের মানুষটিও। শোনা যায়, "জানো দাদা ভাই, আব্বু না কালকেও দেরী করেছে। এত কি কাজ তার? সে না তোমার ছেলে? তুমি বকা দিতে পারোনা?"

নিজেকে আড়াল করে পেছনে দাঁড়িয়ে মেয়ের কান্ড-কারখানা দেখে আর মিটিমিটি হাসে লায়লা।

এ এক অদ্ভুত খেলা, সারাদিনে যখন তখন। দরজার কাছে গিয়ে "পিং পং, পিং পং", "কে? কে?"। তারপর শুরু কথার ফুলঝুরি। কখনও ওপাশে নানা ভাই বা দাদা ভাইর সাথে নানু বা দাদুও থাকে, আবার কখনও তার ভীষন প্রিয় চপল মামা, কিটক্যাট চকলেটের প্যাকেট হাতে।

প্রথম প্রথম লায়লার ভয় হতো, মেয়েটা কি অস্বাভাবিক? এমনিতে খুব লক্ষ্মী, শান্তশিষ্ট, পাকা পাকা কথা বলে। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হলো তার ভাবুক প্রকৃতি। অন্য বাচ্চাদের সাথে যে খেলতে খুব অপছন্দ করে তাও না, তবে একা একাও বেশ খেলতে পারে সে -- ঘন্টার পর ঘন্টা। ডাক্তারও দেখিয়েছে তারা, অটিস্টিক সিনড্রোম আছে কিনা জানার জন্য। ডাক্তার হায়দার মাইডিয়ার ধরনের লোক। বেশ কিছুক্ষণ নিঝুমের সাথে কথা বলে তারপর লায়লা আর তার স্বামী সজীবকে মিষ্টি করে বকা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, "শী ইজ পারফেক্ট। একটু ক্রিয়েটিভ প্রকৃতির। বড় হলে হয়তো নামকরা কিছু হয় যাবে।" ডাক্তারের কথার ওপর আর কিছু চলেনা। আশ্বস্ত বোধ সে করেছিলো বটে, তবে একেবারে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি। মেয়ে তো তার নিজের, ডাক্তারের না।

প্রায়ই তাই মেয়ের কার্যকলাপে খেয়াল রাখে লায়লা, ঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে। যেমন ইদানিং সে খেয়াল করেছে, সন্ধ্যার পর নিঝুমের দরজার ওপাশে এসে ভীড় করে আশপাশের ফ্ল্যাটের বন্ধু-বান্ধবীরা। তখন আর নানা-দাদা বা মামা-চাচারা আসেনা। কেন দিনের বেলা বান্ধবীরা আসেনা? ভাবতে গিয়ে সে টের পেয়েছে, দিনের বেলা তো বান্ধবীদের সাথে চাইলেই দেখা করতে পারে নিঝুম। আম্মুকে বললেই আন্টিদের ফোন করে তারপর কাজের মেয়েটির সাথে পাঠিয়ে দেবে। সন্ধ্যার পর যে আর অন্য বাসায় খেলতে হয়না সে নিয়ম নিঝুম জানে।

নিঝুমটা কি খুব একা বোধ করে? ভাইয়াকে স্কুলে দেয়ার পরপরই যে এমন শুরু করেছে তাও না। রাবিদ স্কুলে যায় আজ প্রায় দু'বছর। আগামী জুলাই থেকে নিঝুমও যাবে। এটা ঠিক যে বিদেশী শিক্ষাপদ্ধতির ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের জন্য রাবিদকে সকাল সাড়ে আটটায় ভ্যানে চড়তে হয়, ফিরতে ফিরতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কিন্তু নিঝুমের এই একাকিত্বে মোড়ানো মেহমান মেহমান খেলা শুরু হয়েছে আজ মাত্র পাঁচ-ছ'মাস হলো, সেটার সাথে রাবিদের গত দু'বছরের নিয়মিত অনুপস্থিতি খুব একটা সম্পর্কিত না।

একদিন নিঝুমকে জিজ্ঞেস করেছিলো লায়লা। সেদিন দরজার ওপাশে ছিলো নানু আর শায়লা খালামনি। পটরপটর করে কথা বলেই যাচ্ছিলো। লায়লা চুপিসারে পাশে গিয়ে দুহাতে আলতো করে নিঝুমের কাঁধ ধরে বলেছিলো, "আম্মু, কার সাথে কথা বলছো?"
একটু লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলো নিঝুম, তারপর আহলাদে গলতে গলতে বলেছিলো, "কেন? নানু আর খালাতো।মনি আসছে তো!"
"কোথায়?"
"ঐ যে, বাইরে?"
তখন জিজ্ঞেস করেছিলো লায়লা, "তাহলে দরজা খুলে দিচ্ছোনা কেন? নানুরা বুঝি বাইরে দাঁড়ায়ে থাকবে?"
"ওমা, তুমি জানোনা? দরজা খুললে তো ওরা চলে যাবে!" শেয়াল পন্ডিতের মতো চোখ-মুখ গোল গোল করে নিঝুমের উত্তর।
"তাহলে তো ওরা এখনও ওপাশে নেই।"
"নাতো! দরজা বন্ধ থাকলে থাকে তো! খুললে চলে যায়।" যেন নিউটনের গতিবিদ্যার সূত্র বলছে এতটাই আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে নিঝুম।

এই বাচ্চাকে কে যুক্তি দিয়ে বোঝাবে? তার মাথায় একটা ধারনা ঢুকে গেছে। তবে এতে অতটা আতংকিত হয়নি লায়লা। সে জানে, একসময় চলে যাবে এসব ভুত। তার বান্ধবী নওরিনের ছেলেটিও নাকি দিনরাত ফোন করে কাজিনদের সাথে রাজ্যের কথা বলে। নওরীন বলেছিলো, মাঝে মাঝে সে কনফিউজড হয়ে যায়, ছেলে কি খেলছে না আসলেই কথা বলছে? বাচ্চাদের এরকম পাকনামোর কথা আরো শুনেছে সে, এখানে ওখানে।

তবে যে একটা ব্যাপারে লায়লা নিশ্চিত হতে পারে তা হলো, এক ধরনের একাকীত্বে ভুগছে নিঝুম। হয়তো বাসায় দাদা-দাদী বা নানা-নানীরা থাকলে অতটা একা হতোনা সে। লায়লার নিজের মনে আছে ছোটবেলার কথা; তার মা সারাদিনই সংসারের নানান ঝামেলায় ব্যস্ত থাকতেন। কত সকাল বিকেল সে কাটিয়েছে নানুর কোলের কাছে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থেকে। নানু তাকে গল্প শোনাতেন, ছড়া বলতেন, দোয়াদুরূদ মুখস্থ করাতেন। মাঝে মাঝে হয়তো কিছুই করতেননা, তাও নানুর গা ঘেঁষে শুয়ে পান-শুপুরির ঘ্রান পেতে তার ভালো লাগতো।

হয়তো নিঝুমটাও তার মতোই হয়েছে। যুগ পাল্টেছে, এখন নানা-নানী বা দাদা-দাদীরা শেষ বয়েসটা নিজেরা নিজেরা একা কাটাতে চান। মাঝে মাঝে মন টানলে নাতি-নাতনীদের দেখতে আসেন। কেউ অন্যের সংসারে নিজেকে বোঝা করতে চাননা।

মাঝেমাঝে লায়লা ভাবে, সে নিজেও কি খুব নিঃসঙ্গ নয়? সেও কি একাকীত্বে ভুগছেনা? বিয়ে করেছে দশ বছর হতে চললো, সজীবের সাথে এখন বলতে গেলে সেই অর্থে দেখাই হয়না। রাত বারোটা বা একটার সময় সজীব যখন ফেরে, তখন আর দু'দন্ড অবসর নিয়ে কেউ কারো মুখের দিকে একটু তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেনা। যেন ছায়া বা অবয়ব থেকে পরস্পরের অস্তিত্বের যতটুকু টের পাওয়া যায় সেটা নিয়েই বেঁচে থাকা উচিত। খাবার টেবিল থেকে বিছানা পর্যন্ত।

ব্যাপারটা এমন না যে সজীবের সাথে সম্পর্ক খারাপ তার। ব্যাপারটা যেন প্রাকৃতিক, ধীরে ধীরে সেই তাকিয়ে থাকার দিনগুলো ফিকে হয়ে গেছে। তবে এ নিয়ে তার মনোভাবটুকু জটিল, একমুখী নয়। একদিকে সেই দিনগুলোর জন্য মন কাঁদে, আবার অন্যদিকে নতুন করে সেরকম দিনের সম্ভাবনার কথা ভাবলে মনে হয়, "কত ছ্যাবলামো করেছি। কিভাবে করতে পেরেছি?" একটা ক্ষীণ অসহায়ত্ব টের পায় লায়লা। কি করতে চায়, সেটা না বুঝতে পারার অসহায়ত্ব।

অবশ্য সজীবের ব্যাপারে যে মনে মনে অনেক অভিযোগ তার জমা না, তাও না। মেয়েটার কথাই ধরা যাক, যতবারই প্রসঙ্গটা টেনেছে সে, সজীব পাত্তাই দিতে চায়নি। তার ওপর সেদিন ডাক্তার দেখানোর পর তো এ প্রসঙ্গ আসলে রীতিমতো বিরক্ত হওয়া শুরু করেছে। কিন্তু লায়লার মনে হয় ব্যবসার সময় নষ্ট করতে চায়না সজীব, আকারে ইঙ্গিতে এমনটাও বলতে চায় যে বাচ্চাদের সব দায়িত্ব লায়লারই নেয়া উচিত। অথচ লায়লা চায় সজীবও শেয়ার করুক, তা না হলে বাচ্চারা ওকে কতটুকু আপন ভাববে?

অন্যান্য ব্যাপারেও উদাসীন সজীব। গত কয়েকবছর ধরেই। এমনকি নিজের বাবা-মা'র সাথেও তার দেখা হয় কালেভদ্রে। একদম রুটিন করে প্রতিদিনই রাত এগারোটার পরে বাসায় ফেরে, কখনও কখনও একটা দেড়টা। ইউরোপিয়ান ক্লায়েন্ট তার বেশী, কমিউনিকেশনের জন্য বিকেল তিনটা থেকে রাত বারোটা আদর্শ সময়। এসব হাবিজাবি বলে সে। লায়লা অবিশ্বাসও করতে পারেনা। কারণ গত তিন বছরে তাদের আর্থিক উন্নতি হয়েছে কল্পনারও বাইরে। এমন অবস্থায় সব পুরুষই চাইবে ব্যবসা আরো বাড়ুক। প্রথম প্রথম লায়লাও এতে শুধু সুখই খুঁজে পেয়েছ. কিন্তু সময়ের সাথে ধীরে ধীরে টের পেয়েছে, যুগপৎ এক ধরনের আসহায়ত্ব এসে গ্রাস করতে শুরু করেছে সবকিছু।


২.
এক রাতের গল্প। ভীষন অস্থির বোধ হয় লায়লার। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। রাতের বেলায় এমন ঝুম বৃষ্টি হয়না সাধারণত। তবে তার অস্থিরতার কারণ সেটা না। ঝুম বৃষ্টির রাত নিয়ে এক ধরনের ভালো লাগা তার মধ্যে আছে। এই মুহূর্তে সেই ভালো লাগাটুকু টের পেলেও ঠিক কেন এই ভালো লাগা সেটা মনে করতে পারছেনা সে। বারবার মনে হচ্ছে খুব আনন্দের কোন স্মৃতি আছে ঝুমবৃষ্টিকে ঘিরে। হয়তো নানুর সাথে, অথবা ভাই-বোনদের সাথে, অথবা হয়তো সজীবের সাথে। নাকি অন্যকিছু? অস্থিরতা বাড়ে লায়লার। রাবিদ আর নিঝুম ঘুমিয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে দরজার দিকে যায় লায়লা।

মাঝে মাঝে তারও ইচ্ছে হয় নিঝুমের মতো দরজার ওপাশে দাঁড়ানো কারো সাথে কথা বলতে। এর আগেও দু'য়েকবার দরজার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চেষ্টা করেছে। কিন্তু, প্রত্যেকবারই একই সমস্যা, কার সাথে কথা বলবে? কি বলবে? তার কথা তো নিঝুমের মতো অমন স্বতঃস্ফুর্ত হবেনা। সত্যি বলতে নিঝুমের মতো অমন নিঁখুত করে পিংপংই তো বলতে পারেনা সে, যদিও সেটা কোন সমস্যা না।

আজও তাই হলো। কিছুতেই যেন কাউকে দাঁড় করাতে পারছেনা লায়লা। বারবার মনের ভেতরের একটা অংশ চাইছে সজীব দাঁড়াক দরজার ওপাশে, তারপর বিয়ের পরপরের সেই দিনগুলোর মতো হাজার রসিকতায় ভরা সেরকম কোন কথোপকথন হোক। কিন্তু তখনই মনের অন্য কোন অংশ বাঁধা দেয়, বলে, ন্যাকামোর বয়েস কি আর আছে?
তাছাড়া সজীবকে সে দাঁড় করাবেই বা কেন? সে কি এখন সেভাবে সজীবকে মিস করে যেভাবে তার ছোট্ট নিঝুম নানা-নানী, দাদা-দাদীকে করে। তাঁরা বেড়াতে আসলে যেরকম উল্লাসে ফেটে পড়ে তার মেয়ে, সজীবের উপস্থিতি কি তাকে সেরকম কোন উচ্ছ্বাস এনে দেয়? লায়লা জানে, দেয়না। সে চায় সেরকম উচ্ছ্বাস আবার ফিরে আসুক, কিন্তু বাস্তবতা হলো আসেনা। অথবা আসতে চাইলেও কি মনের অন্য কোন অংশ সেখানে বাঁধা দেয়? লায়লা বুঝতে পারেনা কেন এমন হয়, শুধু তার অস্থিরতা বাড়ে।

এই অস্থিরতা থেকেই হয়তোবা, বৃষ্টির একঘেঁয়ে শব্দের তালে তালে জেগে ওঠা স্মৃতিকাতরতা একসময় সব সংকোচ দূর করে দেয়। অনেকক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে একসময় সে অনুভব করতে পারে যে দরজার ওপাশে সজীব থাকলে তার কোন অসুবিধা নেই। অজান্তেই মুখ ফসকে ফিসফিস কন্ঠে বেরিয়ে আসে,
"এরকম কাকের মতো ভিজে এসেছো কেন?"
আশ্চর্য হয় লায়লা। ওপাশ থেকে সজীবের কন্ঠ ভেসে আসে, সে স্পষ্ট শুনতে পায়, "কাকভেজা হয়েছি বলে তো আর কাউয়া হয়ে যাইনি ম্যাডাম। তাড়াতাড়ি তোয়ালে, গামছা, অথবা এ্যাট লীস্ট ন্যাকড়া টাইপের কিছু একটা নিয়ে এসো।"

হঠাৎ করেই দরজায় গায়ে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে লায়লা। সব মনে পড়ে যায় তার। এক ঝুম বৃষ্টির রাতের কথা। বিয়ের দু'মাস পরই হয়তো এমনই কোন এক সন্ধ্যায়, ভীষন বৃষ্টি হচ্ছিলো। কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরেছিলো সজীব। সারা শরীর ভিজে চুপচুপে, প্যান্টে, জুতোয় যেন ঢাকা শহরের অর্ধেক কাদা-ময়লা মাখিয়ে এসেছে। কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। এর মাঝেও রসিকতা, খুনসুঁটি সবই ছিলো। সেই সন্ধ্যায় তারপর বাড়ীওলার ছেলেকে ফুসলিয়ে ছাদের চাবিও জোগাড় করে ফেলেছিলো সজীব।

অস্থিরতাকে সরিয়ে ফেলে এক ধরনের চাপা উল্লাস। লায়লার ইচ্ছে হয়, আলমিরা থেকে সদ্য ভাঁজখোলা একটা তোয়ালে নিয়ে এসে দরজাটা খুলে দেখে। হয়তো সত্যিই ওপাশে সজীব দাঁড়িয়ে থাকবে।
এটুকু ঘটলে দোষ কি? ভাবতে ভাবতে একটা তোয়ালে নিয়েও আসে সে। অন্যসময় হলে হয়তো সে ভাবতো, এসব আমি কি করছি। কিন্তু আজকের রাতটা অন্যরকম, বর্ষণের একঘেঁয়েমির ঘোরে বাস্তববাদী ভাবনাগুলো পাথর চাপা পড়ে।

তোয়ালে হাতে ধীরে ধীরে আবারও দরজার পাশে এসে দাঁড়ায় লায়লা। ফিসফিস করে বলে, "দরজা খুলে দিচ্ছি, তবে সাবধান, হৈ চৈ করবেনা। বাচ্চারা ঘুমুচ্ছে।" এই প্রথম স্পষ;ট করে কথা বলে লায়লা, এবং সে টের পায়, কথা বলাটা খুব কঠিন কিছু না।

ওপাশ থেকে কি কিছু শোনা যায়?

শোনা যাক বা না যাক, একের পর এক বলে যায় সে,
"আহা একটু দাঁড়াও না, দরজা খুলছিতো!"
"একটা ছাতা কিনে নিলেই তো পারতে! কত আর দাম"
"ইশশ্, ঢং! ছাতা কিনলে বউ তোয়ালে হাতে দরজা খুলতোনা! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।"
"এ্যাই ভালো হবেনা বলছি। আমি কিছুতেই ছাদে যেতে পারবোনা। এমনিতেই ঠান্ডা লেগে আছে।"
হঠাৎ রিনরিনে কন্ঠে হেসে ওঠে লায়লা, বলে, "অসভ্য!"

হাসতে হাসতেই সম্বিৎ ফিরে আসে তার। সত্যিসত্যিই কলিংবেলের শব্দ শোনা যায়, "পিং পং, পিং পং!" খানিকটা স্তব্ধ হয়ে যায় লায়লা, বুঝতে পারেনা আসলেই কেউ এসেছে কিনা। কিন্তু পিপ হোলে চোখ রেখে দেখতে পায় যে ওপাশে ঠিকই সজীব দাঁড়িয়ে আছে।

কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায় লায়লা, সত্যিই সজীব চলে এসেছে? সাড়ে দশটাও তো বাজেনি! নাকি তার মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তার।

এর মাঝেই আবারও বেজে ওঠে, "পিং পং, পিং পং।" আবারও চোখ রাখে পিপহোলে। আশ্চর্য! আবারও সজীবকে দেখা যাচ্ছে।

ধীরে ধীরে দরজার নব ঘুরাতে থাকে লায়লা। আতঙ্কে শিরশির করে ওঠে সে, দরজার ওপাশে কি আসলেই কেউ আছে!

হঠাৎ তার মনে হয় সজীবকে না ভাবলেই হতো। বাবাকে নিয়ে ভাবলেই হতো। এমন সময়ে বাবার আসার কোন সম্ভাবনাই নেই, তাই তার অবচেতন মন হাজার চেষ্টা করলেও দরজার ওপাশে বাবার প্রতিকৃতি দাঁড় করাতে পারতোনা। কিন্তু রাত সাড়ে দশটা সজীবের ফেরার জন্য একটু তাড়াতাড়ি হলেও সম্ভাবনাটাকে শূন্য করে দেয়না।

খুব দ্রুত ভাবতে থাকে লায়লা। আসলে সে কি চায়? ওপাশে সজীব থাকুক? নাকি কেউ না থাকলেই সে খুশী হবে? ভীষন অসহায় বোধ করা শুরু করে সে। বারবার তার মনে হয় মারাত্মক কোন ভ্রমের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে সে।

ধীরে ধীরে প্রশ্নের জবাব মেলে। এই প্রথম সে টের পায় সামান্য নবটুকু ঘুরিয়ে দরজা খোলাটা কত কঠিন! ওপাশে কি ঘটবে সে জানেনা। ঐ মুহূর্তে লায়লার শুধু মনে পড়ে, দশ বছর আগের সেই বৃষ্টির রাতে কাকভেজা সজীব হাত পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলো, ছাদে নিয়ে গিয়ে তারপর লায়লার হাতে তুলে দিয়েছিলো এক গোছা টকটকে লাল গোলাপ।

দরজার নব ঘোরাতে ঘোরাতে সে অনুভব করতে শুরু করে যে তার সমস্ত মন উজাড় করে কি তীব্রভাবে সে চাইছে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকুক সজীব, আর তার হাতে থাকুক একগোছা ফুল। গোলাপ না হলেও চলবে। সেই ফুল হাতে নিয়ে সে চীৎকার করে বলবে, "এরকম একাকীত্বের হাত থেকে আমাকে রেহাই দাও।"

আর পারেনা লায়লা। ধীরে ধীরে নব ছেড়ে দেয়। দরজা আর খোলা হয়না তার।

সে জানে এসব কিছুই বাস্তবে ঘটার নয়। দশ বছরের দাম্পত্য জীবনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে আজ সজীবকে ওপাশে কল্পনা করাটাই একটা ন্যাকামো হয়েছে তার। এক ধরনের অভিমানে ফেটে পড়ে সে। অভিমান, ক্ষোভ আর একাকীত্বের ঘূর্ণি-আবর্তের বিহবলতায় হঠাৎ করেই জঘন্য ধরনের এক নির্মম সত্যের উপলব্ধি হয় লায়লার। তার খেয়াল হয়, নিঝুমের দরজার ওপাশে কখনও তার বাবা-মা থাকেননা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29232172 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29232172 2010-08-30 08:06:29
বিশ্বকাপের কোচেরা
বিশ্বকাপের মাঠে দৌড়োদৌড়ির পরিশ্রমটা মূলতঃ খেলোয়াড়রা করলেও, বিশ্বকাপ আলোচনাকে মাতিয়ে রাখতে খেলোয়াড়দের চেয়েও কম যাননা যাঁরা, সেই কোচেরাই এই লেখার আলোচ্য। নানান ধরনের এই চরিত্রগুলো প্রতিবারই বিশ্বকাপে নানা রকমের আলোচনার জন্ম দেন, কখনও তাঁদের কেউ কেউ হয়ে যান মহান বীর, কখনও মিডিয়ার আক্রমনের মোক্ষম শিকার, আবার কখনও স্রেফ হাসির পাত্র। সব মিলিয়ে খেলোয়াড়দের চেয়ে কোন অংশেই কম রং ছড়াননা তাঁরা। এবারও বিশ্বকাপের বত্রিশটি দলের কোচদের দেখে যা মনে হয়েছিলো, বা তাঁদের সম্পর্কে এখানে ওখানে যা শুনেছি এসব মিলিয়েই একটা জগাখিচুড়ী এই লেখাটি। একেবারে আনাড়ী লেখা, তথ্যের চেয়ে বাকোয়াজই বেশী, আগেই বলে রাখি, সিরিয়াস মুডে না পড়াই ভালো।

কোচদের দেখলে কি আসলেই কোচ মনে হয়?
প্রথমেই বলা যাক খেলার মাঠের পাশেই বেঞ্চ এলাকায় বসে থাকা এই কোচদের চেহারা, পোশাক-আশাক বা আচার আচরণ দেখে যে ইম্প্রেশন আমার হয়েছে সেটা নিয়ে। খেলা দেখতে দেখতে যা লক্ষ্য করলাম তা হলো, এদের অনেককে দেখেই ফুটবলের কোচের চেয়েও অন্য কোন পেশায় বেশী মানানসই বলে মনে হয়েছে। যেমন ফ্রান্সের কোচ রেমন্ড ডমেনেখ। মাঠের বাইরে এই লোককে দেখে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করতে কেউ উৎসাহ বোধ করবেনা আমি কনফার্ম। খেলার গো-হারা হারতে থাকা দলের দিকে কোনরকম রাগ, ক্ষোভ বা বিরক্তি ছাড়া উদাসচোখে তাকিয়ে থাকা এই কোচের উস্কোখুস্কো সাদাকালো চুল দেখলে মনে হয় তিনি অর্কেস্ট্রার মাস্টার, এখনই কোটের ভেতরের পকেট থেকে দুটো কাঠি বের করে নাচাতে শুরু করবেন।
তবে শেষদিনে ব্যাটার আচরণে আমি ভীষন বিরক্ত হয়েছি, খেলা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ পাহেইরার সাথে সে হ্যান্ডশেক করলোইনা! কারণটা নাকি আয়ারল্যান্ডের সাথে প্রস্তুতিপর্বে আনরির হাত দিয়ে করা গোল নিয়ে পাহেইরার সমালোচনা। ভাগ্যিস ব্যাটা মিউজিক লাইনে আসেনি, এমন গোঁয়াড় লোকের কাছ থেকে কিরকম মিউজিকই বা আশা করা যায়?
অথবা ধরা যাক চিলির কোচ মার্সেলো বিয়েলসার কথা! কিরকম শূণ্যদৃষ্টি নিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকান, মনে হয় কাজী নজরুল ইসলাম! তাঁর চলাফেরাও কেমন যেনো এলোমেলো, এই দেখা গেলো বেঞ্চে বসে আছেন, পরের মুহূর্তেই দেখা গেলো বেঞ্চ ছেড়ে এরিয়ার এক কোণায় গিয়ে কি ভাবছেন। আর খেলোয়াড়দের প্রত্যেক মুভেই বিরক্তির প্রকাশ তো আছেই। কবি অথবা চিত্রশিল্পী হলেই যেন তাঁকে বেশী মানাতো। তবে এখনকার যুগের খুব হাতেগোণা কয়েকজন কোচের একজন তিনি যাঁরা এ্যাটাকিং ফুটবলকে ছাড়েননি। প্রি-কোয়ার্টারে বিদায় নিলেও এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে "সুন্দর" ফুটবল খেলেছে আর্জেন্টিনার পর চিলিই।
আবার ধরুন, হল্যান্ডের কোচ, মারউইক নাম সম্ভবতঃ, ভদ্রলোককে দেখে আপনার কি মনে হয়? দেখুন তো একমত হতে পারেনন কিনা? পোশাক, চুলের শেড, ভদ্র, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার এই লোককে দেখে আমার ফার্স্ট ইম্প্রেশনই ছিলো তিনি হল্যান্ড দলের ফ্যাশন ডিজাইনার, মনে হচ্ছিলো এঁর নাম আরমানি, রাল্ফ লরেন বা গুচ্চি টাইপের কিছু। আবার জার্মান কোচ জোয়াকিম লো, বেশ কিছু হলিউড সিনেমার পরিচালকরা কি অলরেডী এই ভদ্রলোককে নায়কের রোলে রেখে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা শুরু করে দেননি?
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের কোচ যিনি, নাম মনে নেই, তাঁকে দেখে ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছাড়া আর কিছুই মনে হবার কোন জো নেই। খেলোয়াড়দের ভুলে বা গোল মিস হলে ভদ্রলোক যে মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখান, সমান্য কপাল চাপড়ে বা দাঁড়ানো অবস্থা থেকে টুক করে বসে পড়ে, তা দেখে মনে হয় এর উপযুক্ত ক্যাপশন হবে, "ইশ্, অংকটা এবারও মিললোনা!" উরুগুয়ের কোচেরও একই দশা, এই ভদ্রলোকের ক্ষেত্রে আবার স্কোপটা একটু বেশী, ইউনিভার্সিটির প্রফেসরের সাথে সাথে তাঁকে হাইস্কুলের ম্যাথ বা সাইন্সের টিচার বলেও চালানো যাবে। চেহারা আর পোশাক আশাকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাঁর ধীরস্থির চালচলনও বাহ্যদৃষ্টিতে তাঁকে ফুটবল কোচের চেয়ে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে।
আরেক সেমিফাইনালিস্ট স্পেনের কোচ দেল বস্কের বেলায় ঘটনা আবার একশো আশি ডিগ্রী মোড় নেয়, প্রথমদিন স্পেনের খেলা দেখতে বসে আমি অনেকক্ষণ স্পেন বেঞ্চে কোচকে খুঁজেছি, কোচ কই, কোচ কই? এই লোককে দেখলে মনে হয় শুঁড়িখানার মালিক, বা বড়জোর মধ্য আমেরিকার রুক্ষ কোন অঞ্চলের পাড়া দাপিয়ে বেড়ানো শেরিফ হিসেবে মেনে নেয়া যায়, তাই বলে কোচ? ভদ্রলোক আবার ডাকসাইটে ফুটবলারও ছিলেন।
আর অতিশয় বৃদ্ধ দুই কোচ মারসেলো লিপ্পি আর ডেনিশ কোচ (নাম মনে নেই), এদের দুজনকে দেখে মনে হয়েছে "ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি", বিশেষ করে ডেনিশ কোচের মনে হয় আসলেই সেই অবস্থা। দশ বছর ধরে জাতীয় দলের কোচ। আর কত? ওদিকে লিপ্পিকে বিড়বিড় করতে দেখলে দেশের নানা-দাদাদের কথা মনে পড়ে যায়, মনে হয়, অবসর সময়ে বসে আছেন, হাতে কাজ নেই, তাই কিছু দোয়া খায়ের করে নেকী বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
কেন জানিনা, সেই ৯০/৯৪ থেকেই ব্রাজিলের দুঙ্গাকে দেখলে আমার মনে হতো এই লোকটার চেহারা নাবিক নাবিক, আর দক্ষিণ আফ্রিকার পোর্ট শহরগুলোতে খেলা চলার সময় ক্যাজুয়াল ড্রেসে বেঞ্চে থাকা দুঙ্গা শুধু সেই ইম্প্রেশনের সম্প্রসারণই করেছেন। হলিডে পোশাকের দুঙ্গাকে দেখে যদি বলি এইমাত্র জাহাজ পোর্টে ভিড়েছে, নাবিক মহাশয় একটু ফ্রেশ হয়েই সরাসরি খেলা দেখতে চলে এসেছেন -- আপত্তি করা যায়?
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের টেন মিলিয়ন ডলার ম্যান ফ্যাবিও ক্যাপেলোকে কি কোনভাবে কোচ বলে চালানো যায়? ভাবসাব যা! এই লোককে একমাত্র কর্পোরেট সিইও'র চেয়ারেই মানায়। আর আমেরিকান কোচ ব্র্যাডলিকে দেখে তো মনে হয় সাক্ষাৎ ব্যাড বয়, বড়জোর রাগবি খেলোয়াড়। তবে স্লোভেনিয়ার ম্যাচে বেচারার দলের শেষ গোলটা অকারণে বাদ হওয়ার পর যেরকম নিরীহ গোবেচারা চেহারা করে তিনি অভিযোগ করছিলেন, তাতে আবারও মেনে নিতে হয়েছে, "যা দেখি সব ঠিক দেখিনা!"

সবার ওপরে ম্যারাডোনা, তাহার ওপরে ....
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে গেছেন একজনই, আমাদের "দ্য ডন", হিজ এক্সেলেন্সী, সুলতান-ই-ফুটবল, সেনিওর ডিয়েগো ম্যারাডোনা। হোয়াট আ শো! ম্যারাডোনা যে আসলেই ম্যারাডোনা, আবারও প্রমাণ করলেন। শুধু ভালো খেলে নয়, সব কিছু মিলিয়েই আলোচনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিলেন তিনি। দুহাতে ঘড়ি, নানারকম তন্ত্র-মন্ত্রে-রুদ্রাক্ষের মালা, কানের দুল, ছাঁটাই করা সাদা-কালো দাড়ি, ঝা-চকচকা স্যুট -- সত্যিকারের মাফিয়ার ডনের আশপাশ থেকেও তো এমন পারফেক্ট অরা বের হবার না। তার ওপর শিশুসুলভ অঙ্গভঙ্গি, বাঁধাভাঙা উল্লাস, কোলাকুলি, কোলে চড়া, ফুটবলের ক্যারিকেচার -- ম্যারাডোনাকে দেখে মনে হয়েছে তিনি আরো শিশুতে পরিণত হয়েছেন।
শুধু আচার আচরণেই নয়, কথাবার্তাতেও তাই। আগের ম্যাচে গ্রীসকে দুই গোলে হারানো কোরিয়াকে নিয়ে খানিকটা টেনশনে ছিলেন, খেলা শেষে তাই ভীষন আনণ্দিত। ফুরফুরে মেজাজে প্রেস কনফারেন্সে এসেছিলেন একটা আপেল হাতে। আপেলে কামড় বসাতে বসাতেই সেরকমই স্বাদযুক্ত উত্তর দিলেন সাংবাদিকদের। যেমন মেসির প্রসঙ্গ আসায় বললেন, মেসির পা থেকে বল কেড়ে নেয়া ক্ষুধার্ত আমার কাছ থেকে এই আপেলটি কেড়ে নেয়ার চেয়েও কঠিন! আবার খেলোয়াড়দের প্রত্যেককে ধরে ধরে চুমু খাওয়ার প্রসঙ্গে হঠাৎই গোল গোল চোখ করে নিজেকে পরিস্কার স্ট্রেইট বলে ঘোষনা দিলেন, এমনকি তাঁর বর্তমান প্রেমিকার চুল যে সোনালী সেটা বলতেও ভুললেননা। তবে এসব মিলিয়ে মনে হয়েছে ম্যারাডোনাকেই আসলে ফুটবল মাঠে মানায়।

কোচ কেন ব্যাজার?
কোন সিনেমার ট্রেইলার না, ঘানার কোচের কাহিনী। ভদ্রলোকের নামের উচ্চারণ সম্ভবতঃ রাজেভাক। যারা ঘানা-সার্বিয়ার ম্যাচটি দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও বিস্মিত হয়েছেন সারাক্ষণ গোমড়ামুখ করে থাকা এই কোচকে দেখে। ঘানা গোল দিলো, তাও গোমড়া মুখ, যেন রামগড়ুড়ের ছানা। পরে অবশ্য দেখা গেছে যে ভদ্রলোক সবসময়েই গোমড়ামুখে থাকেন, কেমন একটা কাঁদো কাঁদো চেহারা। হঠাৎ দেখে কেউ যদি ভেবে বসে যে এইমাত্র তাঁর কোম্পানীটির দেউলিয়া হবার খবরটা ফোনে শুনতে পেয়ে তাঁর এই অবস্থা, আশ্চর্য হবোনা।
তারপরও, সার্বিয়ার সাথে ম্যাচের দিন তাঁর আচরণ ছিলো রীতিমতো অস্বাভাবিক। খেলা শেষ, তাঁর দল ঘানা জিতেছে, সবাই আনন্দ করছে, আর তিনি বিমর্ষ মুখে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফিরে যাবার জন্য রওয়ানা দিয়েছেন! যেখানে আর্জেন্টিনার মতো দলের ক্ষেত্রে নাইজেরিয়ার সাথে জিতেও প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে "আদর" করে দিয়েছিলেন কোচ ম্যারাডোনা, সেখানে সার্বিয়ার মতো শক্ত ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জিতেও সন্তুষ্ট নন তিনি!
কোন খেলোয়াড়কে তো অভিবাদন জানালেনই না, এমনকি যখন ঘানা দলের একজন আনন্দে লাফাতে লাফাতে তাঁকে আলিঙ্গন করতে এলো, হাত ঝামটা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলেন। পুরো দৃশ্য দেখে তো আমি হতবাক, নানান প্রশ্ন মনে, "এই লোক কয় গোলে জিততে চাইছিলো?" , "ব্যাটা কি বর্ণবাদী নাকি?", "ঘানা সরকার তার বেতন বকেয়া রেখেছে নাকি?" -- প্রশ্নের তো আর শেষ নেই। পরে অবশ্য জানা গেলো ওসব কিছুইনা, ভদ্রলোকের মন খারাপের কারণ হচ্ছে পারজিত পক্ষ সার্বিয়া হচ্ছে তাঁর নিজের দেশ। সেজন্যই নাকি তাঁর মন এতটাই খারাপ হয়েছে যে সেটা লুকোনোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলেন।
ঘটনা এখানেই শেষ না, এমনকি, খেলা পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে তা স্বীকারও করেছেন রাজেভাক, বলেছেন, অনুভূতিটা খুব জটিল। জাতীয়তাবাদের কাছে প্রফেশনালিজমের হেরে যাওয়া সম্ভবতঃ এই প্রথম দেখলাম ফুটবল খেলায়।

জোড়ায় জোড়ায়
এবারের বিশ্বকাপে বাবা কোচ ছেলে খেলোয়াড় এমন জোড়া এসেছেন দুটি দলে -- যুক্তরাষ্ট্র আর স্লোভাকিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যাডলি বাবার মান রেখেছেন, শুধু মাঝমাঠে দুর্দান্ত খেলাই খেলেননি, যে অসামান্য গোলটির কারণে তাঁর দল পরের রাউন্ডে উঠেছে, সেটি তিনিই করেছেন। অন্যদিকে স্লোভাকিয়ার কোচের নাবালক পুত্রটির খেলা এবার অত চোখে পড়েনি, মাঝখানে এক খেলায় বসিয়েছেনও সম্ভবতঃ। জানিনা এখন দেশে ফিরে গিয়ে বাপ-বেটা কোনো রকম তোপের মুখে পড়েছে কিনা।
পুত্র পিতার মুখ রক্ষা করলেও, হবু শ্বশুরের মুখ রক্ষা করতে পারেননি কুন আগুয়েরো, অবশ্য জার্মানীর সাথে ম্যাচে সম্ভবতঃ তিন গোল খাওয়ার পর শ্বশুরমাশইয়ের জামাইর কথা মনে পড়েছে, তাই ঐ সময়ে নেমে কিছু করতে না পারার জন্য বেচারাকে তেমন দোষও দেয়া যায়না। নিদেনপক্ষে কোরিয়ার বিরুদ্ধে তো একটা এ্যাসিস্ট তার আছে।

কোচদের বেতন
আমরা সবাই জানি এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশী বেতন কে পাচ্ছেন। ফ্যাবিও ক্যাপেলো, চেহারা সুরতেও বলে দেয়, কেমন কর্পোরেট সিইও সিইও ভাব! বছরে এক কোটি ডলার তাঁর পারিশ্রমিক!!!!!!! এই "!"গুলোর গুরুত্ব বুঝতে হলে যে তথ্যটা জানতে হবে তা হলো বেতনের র্যাংকিংয়ে তাঁর পরেই আছেন যিনি, মেক্সিকোর কোচ, তিনি পান ত্রিশ লাখ ডলারের ঘরে। তিন গুণেরও বেশী হয়তো গুনছেন ক্যাপেলো। ইংলিশ ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন অবশ্য এরকম জুয়ার দান খেলে এখন ফেঁসে গেছে। প্রায় কোন অর্জন ছাড়াই ফিরে এসেছেন কোটি-ডলার ম্যান ক্যাপেলো এবং তাঁর কোটি-ডলার ম্যানদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ড দল। কিন্তু দু'বছরের চুক্তির পুরো টাকাই দিতে হবে বলে অমন বিশাল টাকা গচ্চা দেবার চেয়ে ক্যাপেলোকে বহাল রাখারই সিদ্ধান্ত এ্যাসিসিয়েশন নিয়েছে। চাল্লু একটা ম্যানেজার বাগানোর কৃতিত্বটা যে অন্ততঃ ক্যাপেলোর প্রাপ্য সেটা অস্বীকার করার জো নেই।
দুনিয়ার সব কিছুতেই টুইস্ট বা পেঁচগী খোঁজা আমার একটা বদঅভ্যাস। এই বেলা ইংল্যান্ডের পরাজয় বিষয়ে একটা টুইস্ট খুঁজে পেলাম। উরুগুয়ের রেফারীর ভুল ডিসিশনে সেদিন জার্মানীর সাথে খেলায় ল্যাম্পার্ডের গোলটি বাতিল হওয়ার সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী কে? এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখলাম, মহান ফ্যাবিও ক্যাপেলোই এর সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারী। সেদিন ইংল্যান্ড এমনেও হারতো, আর তখন প্রি-কোয়ার্টারে বিদায় নেয়ায় সব দোষ গিয়ে পড়তো ক্যাপেলোর ঘাড়েই। ভাগ্য শালার বড়লোকদের পক্ষেই কাজ করে, এখন সব দোষ সামলাচ্ছেন বেচারা উরুগুইয়ান গরীব রেফারীটি, আর ক্যাপেলো তাঁর আলীশান ড্রয়িংরুমে দুষ্প্রাপ্য কোন পাখির সুস্বাদু মাংস চিবোতে চিবোতে ঠিক করছেন এরপর হাঙ্গেরী ম্যাচে কাকে বাদ দিয়ে কাকে দলে নিলে মিডিয়ার কাছ থেকে চোস্ত ধরনের একটা হাততালি কপালে জুটবে।
পশ্চিম ইউরোপের সব দলের কোচরাই কয়েক মিলিয়ন ডলার করে বেতন পাচ্ছেন, হল্যান্ড, জার্মানী, স্পেন, পর্তুগাল সবাই। এর মধ্যে ব্যাতিক্রম বেচারা রেমন্ড ডমেনেখ, তিনি পাচ্ছেন পাঁচ লাখ ডলারের ঘরে, ক্যাপেলোর বিশ ভাগের একভাগ! অথচ পাশাপাশি দেশ ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স, লোকজনের আয়ও মোটামুটি কাছাকাছি। এক ব্লগে দেখলাম "ডমেনেখের এই বেতনে এর বেশী আশা করা উচিত না ফ্রান্সের" বা "ডমেনেখের উচিত ম্যানেজার বদলানো" এরকম মন্তব্য এসেছে। সেসব পরে নিজে যা ভাবছিলাম, দেখা গেলো পাশাপাশি সে মন্তব্যটাও ব্লগার করে ফেলেছেন, তিনি বলেছেন, "হয়তো খুব ভালো ম্যানেজার আছে বলেই এখনও ডমেনেখের মতো ভুয়া কোচ "এত বেতনে" এখনও টিকে আছে"।
কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য পেয়েছি কোচদের বেতনে চোখ বুলাতে গিয়ে। আমেরিকা, জাপান, ডেনমার্কের মতো উচ্চ আয়ের দেশেও কোচদের বেতন ইউরোপিয়ান কোচদের ধারেকাছেও না! জাপানী কোচ ওকাদা, দুঙ্গা, ম্যারাডোনা -- এঁরা সবাই পাচ্ছেন বছরে আট লাখ ডলার করে। এতে অবশ্য ওকাদা মশায়ের খুশীই হবার কথা, ম্যারাডোনা আর দুঙ্গার মতো জগৎজয়ী কোচ তাঁর চেয়ে বেশী পায়না। তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী আয়ের দেশ আমেরিকার কোচ পাচ্ছেন মাত্র তিন লাখ ডলারের কাছাকাছি, ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকে চাকুরী করা আমাদের বয়েসী অনেক পোলাপানও নাকি আমেরিকায় এর চেয়ে বেশী আয় করে! সর্বনাশ! ডেনিশ কোচও দুই আড়াই লাখের ঘরে পান, তার থেকে নিশ্চয়ই আবার অর্ধেকের বেশী ট্যাক্স কেটে নেয়! অথচ এই দেশের গড় আয় চোখ ধাঁধানো। সাধে তো আর দশ বছরে ধরে বেচারা কোচকে আটকে রাখেনি!
তবে আরো সর্বনাশা অবস্থা হচ্ছে বেচারা নিউজিল্যান্ডের কোচের। নিউজিল্যান্ড সরকার তাঁকে বেতন দিচ্ছে পার্ট-টাইমার হিসেবে, যেহেতু সারাবছর জাতীয় দলের দেখভাল করতে হয়না। আর এ বাবদ তাঁর পারিশ্রমিক নাকি মাত্র পঞ্চাশ হাজার ডলার!

ব্লগারদের অনেকেও হয়তো এর চেয়ে বেশী আয় করেন বা অদূর ভবিষ্যতেই করবেন। বিশ্বকাপ দলের কোচ, তাও আবার নিউজিল্যান;ডের মতো মোটামুটি উন্নত দেশের, সেই কোচের চেয়েও বেশী কামাই করছি বা অচিরেই করবো -- এই অনুভূতি নিশ্চয়ই বেশ স্বস্তিদায়ক?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29201235 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29201235 2010-07-16 20:27:27
পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তির গল্প (শেষ অংশ)
মুসাফিরগণের এহেন নিদারূণ শারীরিক অবস্থা দেখিয়া গৃহস্বামী আঁচ করিতে পারিলেন যে উহাদিগকে শীঘ্রই খাদ্য আর পানীয়ের সরবরাহ করিতে হইবে। একই সঙ্গে আরব দেশের রীতির লংঘন ঘটাইয়া মুসাফিরগনের আমীর কাজী আল মকসুদ মুখ ভাঙিয়া বলিয়াও ফেলিলেন, "জনাব, তিনরাত্রি আর চার দিবস ধরিয়া উপবাস করিতেছি। গৃহে খাদ্য যাহাই থাকে, সত্ত্বর উহা দিয়াই আমাদের চলিয়া যাইবে।" অন্য কোনসময় হইলে মুসাফিরগণের এহেন বায়নার প্রেক্ষিতে প্রয়োজনমতো যথাযথ খাদ্যের যোগান দিতে ইহুদী গৃহস্বামীটির কোন অসুবিধা হইতোনা। কিন্তু ঐদিনটি ছিলো আর দশখানা দিন হইতে আলাদা। যাহার জন্য নতুন করিয়া আরেকখানা সমস্যা দেখা দিয়া বসিলো। কোন ধরনের সমস্যা তাহা ব্যাখ্যা করিবার পূর্বে ইহুদীর জীবিকানির্বাহের উপায় সম্পর্কে খানিকটা পরিচয় করিয়া দেওয়া যাক।

ইহুদী পশুপালন করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। ছোট্ট মরূদ্যানে ফসল ফলাইয়া পোষায়না, নানা রকমের পশু পালন করিয়া, দূরের লোকালয়ে নিয়া উহাদের বিক্রয় করিয়া খাদ্যশস্য ক্রয় করিয়াই তাহাকে জীবিকা নির্বাহ করিতে হইতো। দূর্ভাগ্যবশতঃ তাহার অতিশয় ক্ষুদ্রাকৃতি মরূদ্যানে যেই পরিমাণ উদ্ভিজ্জ জাতীয় খাদ্যশস্য জন্মাইতো তাহা দিয়া খোঁয়াড়ের পশুদিগের যথেষ্ট পরিমাণ আহার্যের সংস্থান হইতোনা। ফলতঃ ইহুদীর দুইপুত্র কিছুদিন পরপর খোঁয়াড়ের উট আর দুম্বাদিগকে লইয়া কয়েকক্রোশ দূরের আরেকখানা বড় মরূদ্যানে চলিয়া যাইতো, ঐখানে কয়েকখানি দিবস ধরিয়া যথেষ্ট পরিমাণ আহার করাইয়া তবেই আবার পশুর পাল লইয়া ফিরিয়া আসিত।

বস্তুতঃ মুসাফিরেরা যেইদিন অপরাহ্নে আসিয়াছিলেন, সেইদিন প্রভাতেই ইহুদীর পুত্রদ্বয় পশুর পাল লইয়া দূরের বৃহদাকার মরূদ্যানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইয়া পড়িয়াছিলো। যেহেতু পুত্রদ্বয় রুটি খুব পছন্দ করিত, সেইহেতু তাহাদিগের মাতা ঘরের যবের রুটিগুলিকে পোটলায় বাঁধিয়া তাহাদের সহিত দিয়া দেয়। ঐদিকে উট আর দুম্বারাজি লইয়া যাইবার ফলে ইহুদীর খোঁয়াড়ে সেইদিন শুয়োর ছাড়া আর কোন প্রাণী অবশিষ্ট থাকিলোনা। বাস্তবে সেই দিন দ্বিপ্রহরেই একখানা শুয়োর জবাই করিবার ফলে তাহার হেঁশেলে পাঁচ অতিথিকে কয়েকদিন ধরিয়া আপ্যায়ন করিবার মতো অঢেল পরিমাণ মাংস মজুত ছিলো। এমতাবস্থায় ত্বরিৎ খাবারের আয়োজন করিতে হইলে শুয়োরের মাংস ঝলসাইয়া দেওয়া ছাড়া ইহুদী গৃহস্বামীটির আর কোন উপায়ন্তর ছিলোনা।

গৃহস্বামী নিজে ইহুদী হওয়ায় ইহুদীদের মতো মুসলমানেরাও যে শুয়োরের মাংস খায়না তাহা সম্পর্কে তাহার সম্যক ধারনা ছিলো। শুধু তাহাই নহে, জীবনের দায় পড়িলে মুসলমানদিগের ধর্মে যে শুয়োরের মাংস খাওয়া দুরস্ত, তাহাও সে জানিতো। সেইজন্য, মৃতপ্রায় মুসাফিরদিগকে শুয়োরের মাংস দিয়া আপ্যায়ন করিলে যে মুসলমানের শাস্ত্রমতে কোন অসুবিধা হইবেনা এই ভাবিয়া ইহুদীটি শুয়োরের মাংস দিয়াই পাঁচ মুসাফিরকে আপ্যায়ন করিবার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এইখানে তাহার অতিথিপরায়ণ সজ্জন মননের কারণে সে ভাবিলো, যদি ইহাদিগকে আমি বলিয়া দিই যে ইহাদিগকে শুয়োরের মাংস দিয়া আপ্যায়ন করা হইতেছে, তাহা হইলে উহাদের মধ্যে কেহ কেহ হয়তো উত্তেজিত হইয়া আহারই করিবেনা। আবার কেহ কেহ হয়তো আহার করিলেও জান বাঁচানোর নিমিত্তে সামন্যই আহার করিবে, তৃপ্তি মিটাইয়া খাইবেনা। এহেন ভাবনার উদয় হইবার পর তাহার মনে হইলো, কম বা বেশী যেই পরিমাণই গ্রহন করুকনা কেনো, যেহেতু ইহাদিগকে শুয়োরের মাংসই খাইতে হইতেছে, সেহেতু ইহাদিগকে শুয়োর সম্পর্কে আর কিছু না জানানোই ভালো। তাহা হইলে উহারা তৃপ্তি মিটাইয়া আহার করিয়া দ্রুত সূস্থ্য-সবল হইয়া উঠিবে। পাপ যদি কিছু হইয়া থাকে তবে তাহার ভার সে নিজেই লইবে।

স্বীয় পরিকল্পনা মোতাবেক গৃহস্বামী আর তাহার স্ত্রী মিলিয়া পাঁচ পরহেজগার মুত্তাকীর যথাযথ আপ্যায়ন করিলেন। ঝলসানো মাংসের পর রান্না করা মাংসের ঝোল আসিলো, সাথে আসিলো তুরস্ক দেশের মসলায় ঝলসানো সুস্বাদু কাবাব, কালিয়া, কোফতা, রেজালা এবং আরো নানাবিধ মাংসের পদ। বহুদিন পর এহেন রাজভোগ পাইয়া মুসাফিরেরা একটু বেশী করিয়াই তৃপ্তি মিটাইয়া পানাহার করিলেন। তাঁহাদের তৃপ্তির মাত্রা এতই বেশী ছিলো যে, ইহুদীর গৃহেও মহান আল্লাহ তায়ালা তাহাদের জন্য এইরূপ আতিথেয়তার তকদীর রাখিয়া দিয়াছেন বলিয়া খোদার দরবারে কৃতজ্ঞতা জানাইতে জানাইতে প্রচুর অশ্রুবিসর্জনও দিয়া ফেলিলেন। শেখ তাজাম খাস দিলে খোদাতালার দরবারে এই বলিয়া প্রার্থনা করিলেন যে এহেন সৎ চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে যেন তিনি খাস হেদায়াত দান করেন। অনেকদিন পর যেন রাত্রিরে তাহাদের নিশ্ছিদ্র নিদ্রা সম্ভব হইলো।

পরদিন প্রভাতে সূস্থ্যসবল হইয়া ওঠা পাঁচ মুসাফির আবারও মরূর পথে রওয়ানা হইবার সিদ্ধান্ত লইলেন। গৃহস্বামীর সহিত মুসাবিদা করিয়া তাহারা জানিতে পারিলেন যে ঈষাণ বরাবর দশ ক্রোশ হাঁটিলেই মরূভূমি শেষ হইয়া যাইবে, তাহার পর তাঁহাদের নিজ শহর রামহান আর বেশী দূর নহে। ফলতঃ আর একদিবস এক রাত কষ্ট করিয়া হাঁটিলেই তাহারা নিজ শহরে পৌঁছিয়া যাইবেন বলিয়া অনুমান করিলেন। এক্ষণে গতরাত্তিরের সুস্বাদু ভোজনের সুখস্মৃতি আর তাহার পূর্বের কয়েকদিবসের অনাহারের তীব্র ভয়ংকর স্মৃতির যুগপৎ রোমন্থন করিয়া শেখ তাজাম কহিলেন, "আমীর ছাহেব, সকলে অনুমতি দিলে গৃহস্বামীটিকে আমি এই অনুরোধ জানাইতে চাহি যে, আমাদিগের সহিত একখানা পোটলা করিয়া কিছু গোশ্ত দিয়া দেওয়া হউক। তাহা হইলে অদ্যকার পথচলার ক্লান্তিখানিও কিছুটা লাঘব হয়।"
ইহুদীর আতিথ্য যখন গ্রহন করিয়া ফেলিয়াছেনই, তখন তাহার নিকট হইতে কিছু মাংসগ্রহনে আর কি সমস্যা হইবে এই ভাবিয়া বাকীরাও শেখ তাজামের বক্তব্যে সায় দিলেন।

কাজী আল মকসুদ গৃহস্বামীটিকে ডাকিয়া কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনপূর্বক তাঁহাদের মনোবাঞ্ছার কথা ব্যক্ত করিলেন। কিন্তু উহা শুনিয়া গৃহস্বামীর মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করিলো। গৃহস্বামী ভাবিয়াছিলেন যে গতকাল সন্ধ্যায় ইহারা মৃতবৎ ছিলো, আহার না করিলে ইহাদের মৃত্যুও হইতে পারিত। এমতাবস্থায় ইহাদিগকে শুয়োরের মাংস খাওয়ানো দুরস্ত হইলেও, এক্ষণে এহেন তরতাজা মুসলিমদিগকে শুয়োরের মাংস খাওয়ানো অনুচিত হইবে। সে মুসাফিরদিগের নিকট ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক শুয়োরের মাংসবিষয়ক যাবতীয় সত্য তুলিয়া ধরিলো।

সব শুনিয়া আবু উবিলা রাগে উন্মাদপ্রায় হইয়া পড়িলেন। উত্তেজনার আতিশয্যে তাঁহার মুখ হইতে কথা সরিতেছিলোনা, পাশবিক ক্রোধে তাঁহার শশ্রূরাজীর চারিপার্শ্ব ফেনায়িত হইয়া যাইতে লাগিলো। শেখ তাজামের অবস্থা আরো করুণ রূপ ধারণ করিলো। তাঁহার রাগ কম, কিন্তু কুসংস্কার বড়ও তীব্র। হঠাৎ করিয়াই তাঁহার পাকস্থলীতে তীব্র বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন, ঘড়ঘড় করিয়া বমি করিয়া ইহুদীর উঠানের একাংশ ভাসাইয়া দিলেন। ইবনে আআ'মের চেহারায় কোন ক্রোধের অভিব্যক্তি না দেখা দিলেও মনে মনে তিনি আল মকসুদের উপর ভীষন ক্রোধ অনুভব করিতে লাগিলেন, একই সাথে তাঁহার মুজাকারা আমলে না লইয়া ইহুদীর গৃহে আশ্রয় লইবার ফয়সালা দেয়ার কি খেসারত এক্ষণে দিতে হইতেছে তাহা ভাবিয়া মনে মনে আল মকসুদের উদ্দেশ্যে "এক্ষনে বাহাদুর, সামলাও!", বলিয়া খানিকটা আনন্দও অনুভব করিলেন। সাইয়িদ নাজা'ককে দেখিয়া মনে হইয়াছিলো যে তিনি খানিকটা বিব্রত বোধ করিতেছিলেন, সম্ভবতঃ গতরাত্তিরে ঐভাবে পেট ভরিয়া তৃপ্তির সহিত খাদ্যগ্রহনের স্মৃতি তাঁহাকে বিব্রত করিয়া তুলিয়াছিলো।

আবু উবিলা রাগে কাঁপিতে কাঁপিতে কহিলেন, "আমি তো আগেই বলিয়াছিলাম মুহতারামগণ, এই ইহুদী বদমাশকে খানিকও বিশ্বাস করা ঠিক হইবেনা। খোদার কসম, এই মুহূর্তে ইহার গৃহে অনুসন্ধান করিলে উষ্ট্র আর দুম্বার গোশতও মিলিবে। আমি নিশ্চিত এই পাপিষ্ঠ ইচ্ছা করিয়াই আমাদিগকে শুয়োরের মাংস খাওয়াইয়া, এক্ষণে আবার তাহা বলিয়া দিয়া মজা লুটিতেছে। কসম খোদার, ইহুদীরা এইভাবেই আমাদিগের মুসলমানদের সরলতার সুযোগ লয়!" আবু উবিলার রুদ্রমূর্তি দেখিয়া ইহুদী গৃহস্বামী ভয়ে এইটুকুন হইয়া পড়িলেন। কাজী আল মকসুদ ইশারায় তাহাকে আশ্বস্ত করিলেন, নির্ভয় দিলেন।

কিন্তু কাজীর এহেন ইশারাকে ইঙ্গিত করিয়াই খানিকটা শ্লেষের সহিত শেখ তাজাম কহিতে লাগিলেন, "আমাদিগের আমল আকীদা সব ভাসাইয়া দিলো, আর আপনি উহাকে সাহস দিতেছে!" বলিতে বলিতে তাঁহার উত্তেজনা খানিকটা বাড়িয়া গেলো, তিনি কহিতে লাগিলেন, "হাদীস শরীফে আছে শরীরের যেই অংশ হারাম খাইবে উহার ইবাদত কবুল হইবেনা। এক্ষণে আপনি আমাকে বলেন আমার এই শরীরের রক্তে ছড়াইয়া পড়া অভিশপ্ত শুয়োরের মাংস লইয়া আমি কিরূপে খোদার নবীর সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইবো?" বলিতে বলিতে তাঁহার আবারও বমির উদ্রেক হইলো, তাহা সামলাইতে সামলাইতে ইহুদীর দিকে তাকাইয়া কহিতে লাগিলেন, "আতিথ্য গ্রহনের পরও তোমাদিগকে মুখ ফুটাইয়া ধন্যবাদ জানাইনাই, মনে মনে খানিকটা সংকোচ ছিলো তাহা লইয়া। এক্ষনে তাহা তো নাই-ই, বরং তোমাকে লা'নত দিতেছি। হে পাপিষ্ঠ ইহুদীর সন্তান, তোমার হেদায়াতের জন্য খাসদিলে যে মোনাজাত করিয়াছি তাহা আবার ফিরাইয়া লইলাম! তোমার ওপর অভিশাপ বর্ষিত হউক।"

শেখ তাজামের মতো বিনয়ী সজ্জন ব্যক্তির মুখে এহেন বক্তব্য শুনিয়া কাজী আল মকসুদ বিস্ময়ে বিমূঢ় হইয়া ভ্রূ কুঁচকাইয়া তাহার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। উহা অবলোকন করিয়া এইবার মুখ খুলিলেন ইবনে আআ'ম, কহিলেন, "কাজী সাহেব, আপনার মতো বিচক্ষণ ব্যক্তিও যে ভুল করিতে পারে এই ঘটনা আমাদিগকে সেই শিক্ষাই দিলো। আপনি যেইভাবে চক্ষুগরম করিয়া আমার ভ্রাতা শেখ তাজামের দিকে তাকাইয়া আছেন, তাহাতে বুঝিয়া লওয়া যায় যে এই মগদুব ইহুদীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইয়াছে। আমাদিগের উপকার অথবা জান বাঁচানো, এইসব কোন উদ্দেশ্যে সে আমাদিগকে আপ্যায়ন করেনাই, শুরু হইতেই সে চাহিয়া আসিয়াছে আমাদিগের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির। আর এক্ষণে তাজামের প্রতি আপনার রুদ্র দৃষ্টি তাহাই প্রমাণ করে।"

এক্ষণে সাইয়িদ নাজা'কও বুঝিলেন যে আর কাজী মকসুদ বা ইহুদীর পক্ষে থাকা ঠিক হইবেনা, তিনি কহিতে লাগিলেন, "বুঝিলাম, জান বাঁচানোর জন্য শুয়োরের মাংস আহারেও নিষেধ নাই; কিন্তু জনাবেরা, আপনারা কেহ কি নিশ্চিত করিয়া কহিতে পারেন যে গতরাত্তিরে আমরা যদি শুধু পানি পান করিয়াই নিদ্রা যাইতাম তাহলে আমরা মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িতাম?" খানিকটা দম লইয়া তিনি আবারও বলিতে থাকেন, "বস্তুত হায়াত মউত তো আল্লাহর হাতে, তাহলে আমরা কিসের ভিত্তিতে শুয়োরের মাংস খাইতে পারি? আর তাহা ছাড়া এই ইহুদী পাষন্ড যে ইচ্ছা করিয়া আমাদিগকে শুয়োরের মাংস খাওয়ায়নাই তাহার প্রমাণ কি? সে কেন আমাদিগকে খাওয়া আরম্ভ করিবার পূর্বে জানাইলোনা?"

এক্ষনে দুরুদুরু বক্ষে ইহুদী মুখ খুলিলো, কহিলো, "জনাবেরা, আমি ভাবিয়াছিলাম শুয়োরের মাংসের কথা জানাইয়া দিলে আপনারা খাদ্যগ্রহনে আগ্রহ দেখাইবেননা।"

এক্ষনে কাজী তাহার দিকে তাকাইয়া কহিলেন, "আপনার সদুদ্দেশ্যকে আমি অস্বীকার করিতেছিনা, কিন্তু তাহার পরেও জানাইয়া রাখিলে এহেন অহেতুক পরিস্থিতি হইতোনা।" বলিতে বলিতে তিনি স্বীয় কাফেলার লোকদিগের দিকে তাকাইলেন, কহিলেন, "যাহাই হউক, যেহেতু আমার সিদ্ধান্তেই আমরা এই ইহুদীর আশ্রয় গ্রহন করিয়াছি, তাই সমস্যা সমাধানের দায়ও আমার। আগে আমরা নিজ শহরে ফিরি, তাহার পর সকলে মিলিয়া সিদ্ধান্ত লইবো যে কি করা যায়।" এই বলিয়া পরিস্থিতি আপাততঃ শান্ত করিয়া কাজী আল মকসুদ মুসাফিরদিগকে শহর অভিমুখী করিতে সক্ষম হইলেন বটে, তবে শহরে ফিরিবার পর যে আরেকখানা জটিলতর পরিস্থিতিতে তাঁকে পড়িতে হইবে সে বিষয়ে তাঁহার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলোনা।

প্রভাতে রওয়ানা দিয়া সেই রাত্তিরেই তাঁহারা নিজ শহর রামহানে আসিয়া পৌঁছান। কপালগুণে রাত্তিরের অন্ধকারে শহরে প্রবেশের ফলে তাঁহাদের জীর্ণশীর্ণ চেহার লোকের নজরে পড়েনাই, সফরের ভয়াবহতা সম্পর্কে শহরের লোকের কোন ধারনাই হয়নাই। পরবর্তীকালে তারিখ আল সফর লিল সিনদাদে লিপিবদ্ধ না করিলে হয়তো এই সম্পর্কিত অনেক কিছুই লোকের অজানা থাকিয়া যাইতো।

পরদিন প্রভাতে বহুদিন পর দরবারে আসিয়া কাজীর চক্ষু চড়কগাছ হইয়া যায়। তাঁহার দরবারমহলের সম্মুখের সড়কখানি লোকে লোকারণ্য। ভীড় ঠেলিয়া স্বীয় দরবারে প্রবেশ করিয়া তিনি অবলোকন করেন যে চার গোত্রপতি সেইখানে ভোর হইতেই আসিয়া উপস্থিত। সাধারণ সম্ভাষনপূর্বক কাজী তাহাদিগকে বলিলেন, "এত তাড়ার তো কিছু আছিলোনা, মুহতারামগণ। আপনারা খানিকটা বিশ্রাম লইয়া তবেই আসিতে পারিতেন।"
"জনাব, আপনার কাছে উহার গুরুত্ব না থাকিলেও আমাদের কাছে উহা জীবনের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!" বলিয়া ইবনে আআ'ম বাকী সভাসদদের পানে চাহিলেন। সকলেই একসাথে ইবনে আআ'মের কথায় সায় দিলেন। তবে তাহাদের সায় ঐ পর্যন্তই ছিলো। তাহার পর ইহুদীর শুয়োরের মাংসভক্ষন বিষয়ক ঘটনার দফারফা হিসেবে চার গোত্রপ্রধানের তরফ হইতে চার ধরনের ফয়সালার দাবী আসিলো, এবং দ্বিপ্রহরের আহারের নিমিত্তে যখন কাজী দরবার ছাড়িয়া নিজ গৃহের পানে রওয়ানা হইলেন, তখন বাহিরে দাঁড়ানো কাতারে কাতারে মানুষের মুখেও তিনি ঐ চার ধরনের দাবীর কথা শুনিতে পান।

আবু উবিলা ও তাঁর গোত্রের দাবী হয় এই যে, ঐ অভিশপ্ত ইহুদীর মৃত্যুর পরোয়ানা জারী করা হউক। তাহার পর তাহাকে ও তার স্ত্রীকে বাঁধিয়া শহরে লইয়া আসিয়া, শহরবাসীর সম্মুখে মৃত্যদন্ড দেয়া হউক। তবে এই প্রস্তাবের সাথে আবু উবিলা এও জানাইয়া রাখেন যে, তাঁহার প্রস্তাব কাজী সাহেব গ্রহন করেন তো ভালো। তা না হইলে যাহা ব্যবস্থা লইবার তাহা লইবার মতো লোক, অর্থ আর অস্ত্রবল তাঁহার নিজেরই আছে।

ইবনে আআ'ম বলিলেন, শুধু একজন ইহুদী বা তার পরিবারকে হত্যা করিলে এই সমস্যার কোন সমাধান হইবেনা। যেহেতু ইহুদীর বাসস্থান ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে পড়েনা, সেহেতু সবার আগে যাহা করিতে হইবে তাহা হইলো শহর হইতে সৈন্য পাঠাইয়া ঐ মরূদ্যান আর তাহার আশেপাশের সবকয়টি মরূদ্যান দখল করিয়া ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা। তাহর পরের কর্মটি হইবে ঐসব অঞ্চলে শুয়োরের খোঁয়াড়গুলি সব পুড়াইয়া নষ্ট করিয়া ফেলা। তাহার পর ইহুদীকে শাস্তি দেয়া, তবে মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধেই তাহার মত। বরং, এইখানে ইবনে আআ'ম এই দাবী জানাইয়া রাখেন যে, ইহুদীর কূটচালের চাইতেও কাফেলার আমীর কাজী আল মকসুদের ব্যর্থতাকেই তিনি বড় বলিয়া মনে করেন। ফলতঃ কাজী সাহেবের পদত্যাগপূর্বক তাঁহার নিজগোত্রের আবু নিমরকে কাজী নিয়োগের দাবীখানাও তিনি পেশ করিতে ছাড়েননাই। পরবর্তিতে আবু নিমরের ফয়সালা অনুযায়ী বর্তমান কাজীকে যে কোন প্রকারের শাস্তি মাথা পাতিয়া লইতে হইবে।

অন্যদিকে শেখ তাজামের দাবীতে কোন ফয়সালার চাইতে আক্ষেপই বেশী ছিলো। বিশেষ করিয়া যদ্দিন পর্যন্ত এই শুয়োরের মাংসের একটি কণাও তাহার শরীরে অবশিষ্ট থাকিবে তদ্দিন পর্যন্ত তাঁহার কোন আ'মলই গৃহিত হইবেনা, তাহার শরীর হইতে তাহার স্ত্রী-সন্তানদের শরীরেও যে ঐ অপবিত্র খাদ্যকণা ছড়াইবেনা তাহার নিশ্চয়তা লইয়াও তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি আরো দাবী করিয়াছিলেন যে, অপবিত্র খাদ্য গ্রহনের লা'নত হিসাবে তাঁহার নিজের গোত্রের লোকদের যদি শরীর খারাপ করে, রোগ-ব্যাধি ছড়াইয়া পড়ে তবে তাহার দায় ঐ অভিশপ্ত ইহুদীর সম্পদ হইতে ব্যবস্থা করিয়া দিতে হইবে। আর সকলে যদি মনে করে এহেন অপকর্মের জন্য ইহুদইিকে মৃত্যদন্ড দেয়া উচিত তবে তাহাতে তাঁহার গোত্রের কোন আপত্তি নাই।

সবশেষে জ্ঞানী সাইয়িদ নাজা'কও স্বীয় মতামত পেশ করেন, দাবী জানান যে ইহুদীকে তাহার কৃতকর্মের শাস্তি হিসাবে সসম্মানে মুসলিম হইবার আহবান জানানো হউক, এবং তাহার পাপের তওবা হিসাবে শহরের রাস্তায় প্রকাশ্যে জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়ানো হোক। তিনি জানান যে, যেহেতু শুয়োরের মাংস আহার করিলে নানবিধ রোগব্যধি হয়, সেইহেতু উহা ভক্ষণ করানোর জন্য ইহুদীকে শাস্তি দেয়া দুরস্ত। তবে ইহুদী যদি ইসলাম গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায় তবে অবশ্যই তাহার শাস্তি বাড়াইয়া দিতে হইবে।

সব শুনিয়া কাজী আল মকসুদ ভীষন মুষড়াইয়া পড়েন। স্বীয় ইনসাফের বিচারে ইহুদী যে সদুদ্দেশ্যেই তাহাদিগকে শুয়োরের মাংসের কথা না পাড়িয়া আপ্যায়ন করিয়াছে তাহা বুঝিতে তাঁহার কোন অসুবিধা হয় নাই। বস্তুতঃ পরদিন প্রভাতে শেখ তাজাম যদি সঙ্গে লইবার জন্য কিছু মাংস না চাহিত, তাহলে তো ইহারা ঘুণাক্ষরেও টের পাইতোনা যে আগের রাত্তিরে তাহার কি খাইয়া আসিয়াছে। ইহাদের ইনসাফ দেখিয়া তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হইয়া পড়েন, খানিকটা রাগন্বিতও হন। তবে দরবারের বাহিরে তাহাদের নিজ নিজ গোত্রের কাতারে কাতারে লোকের সমাগমে খানিকটা ভীত বোধ যে তিনি করেননাই তাহা নহে। ফলতঃ সেইদিন সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরিয়া তিনি বুঝিতে পারেন যে ইহার একখানা শাস্ত্রসম্মত ইনসাফমূলক ফয়সালা না করিলে ভীষন বিপদ হইবে। এমনকি সারা শহরে মারামারিও ছড়াইয়া যাইতে পারে, কারণ সেইদিন বিকালেও তিনি দেখিয়াছেন যে গোত্রসদস্যরা নিজ নিজ গোত্রপতির ফয়সালার পক্ষ লইয়া পরস্পর ভীষন বিতর্কে লিপ্ত। বিতর্ক হইতে যুদ্ধ শুরু হইতে কতক্ষণ!

শহরে ফিরিবার পর এইরূপ কঠিন সমস্যা যে খোদাতালা তাঁহার জন্য রাখিয়া দিবেন -- তাহা জানিলে হয়তো সফর আরো লম্বা করিতেই তিনি পছন্দ করিতেন। এহেন বড়মাত্রার সমস্যা না হইলেও, নানাবিধ মামলার ফয়সালা লইয়া মাঝেমাঝে তাঁহাকে উদ্বিগ্ন হইতে হয়, সবচেয়ে ইনসাফের ফয়সালা কি হইতে পারে তাহা লইয়া। এইরূপ ক্ষেত্রে কাজী সাহেব দশ রাকাত নফল নামাজ পড়িয়া আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন যাহাতে খোদাতা'লা স্বপ্নে তাহাকে সঠিক ফয়সালার পক্ষে কোন ইশারা দেন। পরবর্তীতে খোদাতালার ইশারা অনুযায়ী তিনি ফয়সালা জারি করেন।

সেইদিন সন্ধ্যায় গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া বিবিকে সমস্যার কথা অবগত করিয়া কাজী সাহেব নিজস্ব ব্যক্তিগত অন্দরে প্রবেশ করিলেন। কথিত আছে, সেইরাত্রি সারাটা সময় তিনি নফল নামাজ পড়িয়াছিলেন। ভোররাত্তিরে তাহাজ্জুদ পড়িবার পর তাঁহার বেগম যখন কাজী সাহেবের ব্যক্তিগত অন্দরে ঢোকেন, তখনও তিনি নামাজে। পরবর্তীতে শুইতে যাইবার আগে তিনি বেগমকে কহিয়াছিলেন যে, "বিবি সাফিনা, আমার মন বলিতেছে মহান রাব্বুল আলামীন আজ অবশ্যই একখানা ইনসাফের দিকনির্দেশনা দিবেন।"

তবে আক্ষেপের বিষয় এই যে, পরদিন প্রভাতে দরবারে কাজী আল মকসুদ কি ফয়সালা দিয়াছিলেন তাহা আর জানা যায় নাই।

(শেষ)

পরিশিষ্ট:
১। তারিখ আল সফর লিল সিনদাদের যেই একমাত্র কপিখানা বাগদাদের উপকন্ঠের একখানা লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়, তাহা দেখিয়া বোঝা যায় যে উহার শেষ কয়েকখানি পাতা ছিঁড়িয়া ফেলা হইয়াছে। ইহুদীর ব্যাপারে কাজী আল মকসুদের ফয়সালার অংশটুকু যে ঐ ছেঁড়া পৃষ্ঠাসমূহের শুরুর দিকেই ছিলো, তাহা সহজেই অনুমেয়।

২। বাগদাদীয় সুলতান আল মুদীরের লাইব্রেরীতে তারিখ আল সফর লিল সিনদাদ সংরক্ষিত ছিলো। উপযুক্ত সাক্ষীসাবুদ না থাকিলেও বর্ণিত আছে যে আল মুদীরের বড়পুত্র শাজাদা ইবনে তামীর ঐ তারিখের শেষ কয়েকখানি পাতা ছিঁড়িয়া নৌকা বানাইয়া খেলিয়াছিলো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29160998 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29160998 2010-05-23 11:57:10
পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তির গল্প (২য় অংশ)
তিনদিন তিনরাত একটানা চলিল সেই নিদারুণ পথচলা, পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তি প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের সাথে সাথে মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করিয়া কাঁদিয়া কাটিয়া শেষ অশ্রুবিন্দু পর্যন্ত ঝরাইয়া ফেলিলেন একখানা আশ্রয়ের প্রার্থণায়। অবশেষে চতুর্থ দিন দ্বিপ্রহরের কিয়ৎ পর সূর্য্য যখন পশ্চিমে বেশ খানিকটা হেলিয়া গিয়াছে, এবং যক্ষণে কাজী আল মকসুদ স্বদেশে ফিরিবার আশা মোটামুটি ছাড়িয়া দিয়া মনে মনে এই নিয়তি মানিয়া নিয়াছেন যে ধূধূ-মরূতে মৃত্যবরণ করানোর উদ্দেশ্যেই আল্লাহতায়ালা তাহাদের এহেন সফরের ইশারা দিয়াছেন, তক্ষুণি বহু দূরে মরূর বুকে ক্ষুদ্র দানার মতো কিছু একটা অবলোকন করিলেন, যাহা একখানা লোকালয় বলিয়া তাহার কাছে প্রতীয়মান হইয়াছিলো। বাস্তবেও তাই, উহা ছিলো ছোট্ট একখানা মরূদ্যান। আশায় বুক বাঁধিয়া মৃতপ্রায় পাঁচ মুসাফির নতুন উদ্যমে তপ্তমরূ পাড়ি দিয়া যখন সেই কাঙ্খিত মরূদ্যানের উপকন্ঠে আসিয়া উপনীত হইতে পারিলেন, তখন তাঁহাদের মনে হইলো, অবশেষে খোদাতা'লা তাঁহার বান্দাদিগকে খাস তাওয়াক্কুলের প্রতিদান দান করিলেন।

মরূদ্যানটি অত্যন্ত ক্ষুদ্রায়তন। একজন মাত্র ব্যক্তি তাহার স্ত্রী আর দুই পুত্রকে লইয়া ওইখানে বসবাস করিত। এই লোকটির নিকট আশ্রয় গ্রহন মুসাফিরদের বাঁচিয়া উঠিবার সর্বোত্তম পন্থা হইতে পারিত, কিন্তু এইখানে একখানা নতুন সমস্যা দেখা দিলো।

বাস্তবে ঐ গৃহস্বামীটি আছিলেন একজন ইহুদী। যদিও যথেষ্ট পরিমাণে সজ্জন ও পরোপকারী এই ইহুদীটি অত্যন্ত আদবের সহিতই মৃতপ্রায় পাঁচ মুসাফিরকে দেখিয়া আগাইয়া আসিয়াছিলো, এবং যুগপৎ উদাত্তকন্ঠে নিজগৃহে আশ্রয় গ্রহনের অনুরোধও জানাইয়াছিলো, তথাপি মুসাফিরেরা যখন জানিতে পারিলেন যে গৃহস্বামী ব্যক্তিটি ইহুদী, তখন মনে মনে তাহারা কমবেশী সংকোচ বোধ করিতে শুরু করিলেন। ইহুদী গৃহস্বামীটি অবশ্য বলিয়াছিলো যে, "হুজুরান, আমি জাতে ইহুদি বটে, আর মুসলিমদিগের সহিত যে ইহুদীদিগের সম্পর্ক ভালোনা তাহাও আমি অবগত আছি। তবে কাজেকর্মে আমি বিন্দুমাত্র ইহুদী নই, নামেই মাত্র, তাই আপনারা নিশ্চিন্তে আমার গৃহে বিশ্রাম লইতে পারেন।"

ইহুদীর এহেন সদ্ব্যবহারে মুগ্ধ কাজী সাহেব কিছুটা ইতস্তত করিয়া কহিলেন, "জনাব, আমাদিগকে এক গামলা পানি দেয়া যাইবে কি? আগে জানটা বাঁচাই, তাহার পর মুজাকারা করিয়া ঠিক করা যাইবে যে কি করা যায়।"

পানি পান করিয়া খানিকটা সঞ্জীবিত হইবার পর পাঁচ মুসাফির মুজাকারায় বসিলেন, ইহুদীর গৃহে আশ্রয় নেওয়া কতটুকু ঠিক হইবে এই বিষয়ে সবাই নিজ নিজ মত তুলিয়া ধরিলেন। তাহার বিশদ বিবরণ তারিখ আল সফর লিল সিনদাদ গ্রন্থে পাওয়া গিয়াছে, যাহা হইতে এইখানে কিছু উদ্ধৃত করা হইলো।

গোত্রপতিদের একজন ছিলেন আবু উবিলা, যেমন তাহার আল্লাহভীতি তেমনই তাহার সাহস আর শৌর্য্যবীর্য। হঠাৎ করিয়াই ফাল দিয়া দাঁড়াইয়া উঠিয়া চকিত নিজ তলোয়ারখানি বাহির করিয়া তিনি উদ্ধত কন্ঠে কহিলেন, "হুজুর, আজ যদি এই ব্যক্তি ইহুদী না হইয়া পৌত্তলিক হইতো, তাহা হইলে খোদার কসম, আমি উহাকে এই তলোয়ার আর কোমরে বাঁধা এই ধারালো ছোরা দিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিতাম!" এইটুকু বলিতে বলিতে সকলের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টির জবাবেই যেন বলিলেন, "আপনারা ভুলিয়া যাইবেননা, আমার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, প্রত্যেককেই পৌত্তলিকের দল হত্যা করিয়াছে!"

তাহার পরও আবু উবিলার কথায় বাঁকিদের ভ্রূতে ভাঁজ পড়িলো, আরেকজন গোত্রপতি ইবনে আআ'ম, যাহার সুনিয়ন্ত্রিত বাচনভঙ্গি অত্যন্ত সহজেই মজলিশে লোকের মনোযোগ কাড়িয়া থাকে, তিনি কহিলেন, "ওহে, আবু উবিলা, আপনার কষ্ট আমি বুঝি, তথাপি এইখানে তো পৌত্তলিক প্রাসঙ্গিক নহে!"

আবু উবিলা তলোয়ার খাপে ঢুকাইতে ঢুকাইতে কহিলেন, "হে ইবনে আআ'ম, আমার মতামত আমি দিয়াছি, আপনি বরং আপনারখানাই পেশ করুন!"

অবস্থা জটিলতর রূপ লইতেছে ধারনা হওয়ায় এইবার খানিকটা নম্রস্বভাব আর শান্ত প্রকৃতির শেখ তাজাম কহিলেন, "আফসোস! এই বিপদে খোদাতালা আমাদিগকে একজন নেককার বান্দার আতিথ্য গ্রহনের তকদীর কবুল করিলেননা! হয়তো ইহা আমাদিগেরই কোনো না কোনো পাপের ফল। ভাইসব, আমি বুঝিতেছি, এই ইহুদী মাগদুবের ঘরে আতিথ্য গ্রহনের এই কয়েকখানি দিন হয়তো আমাদের প্রত্যেক আ'মলের নেকী কমিয়া যাইবে; কিন্তু ভাবিয়া দেখুন, আমরা যদি আমাদের আ'মলের সৌন্দর্য্য দিয়া এই বাতিল বেপথ ইহুদীকে আল্লাহর রাহে আনিতে পারি, তবে আল্লাহ আমাদের নেকী কতগুণ বাড়াই দিবেন! বলেন, সুবহানাল্লাহ!"

শেখ তাজামের বক্তব্য শ্রবনপূর্বক কাজী আল মাকসুদ ও আরেকজন গোত্রপতি সাইয়িদ নাজা'ক সম্মতিসূচক মাথা নাড়িলেন। বস্তুত যেহেতু তাহারা দুইজনই আতিথ্য গ্রহনের পক্ষে ছিলেন, অতএব ভীষন ক্ষুধার্ত অবস্থায় বেশী কথা বলিয়া সময় নষ্ট করিবার কোন ইরাদা তাহাদের ছিলোনা।

উপসংহার টানিবার উদ্দেশ্যে সাইয়িদ নাজা'ক, যিনি ইসলাম শাস্ত্রে বিশেষ পান্ডিত্যের কারণে সর্বত্র সমাদৃত হইতেন, তিনি তাঁহার জোব্বার পকেট হইতে একখানা ছোট তারিখ বাহির করিয়া উহার পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে কহিলেন, "যেহেতু এই ব্যক্তিটি স্বীকার করিয়াছে যে সে কাজেকর্মে অর্থাৎ আ'মলে মোটেও ইহুদী নহে, অতএব তাহার আতিথ্যগ্রহনে আমি কোন বাঁধা দেখিতেছিনা। আর তাহা ছাড়া খেয়াল করুন সকল বেরাদারগণ, ইহুদী-নাসারাদের বন্ধুত্বগ্রহনের বারণ শুধু যুদ্ধরত অবস্থাতেই পক্ষ-বিপক্ষ হিসাবে। আমরা তো এই ব্যক্তি বা তাহার গোত্রের সহিত কোন যুদ্ধে লিপ্ত নহি।"

এক্ষণে সুবক্তা ইবনে আআ'ম আবার মুখ খুলিলেন, কহিলেন, "মুহতারাম সাইয়িদ, আপনার জ্ঞানের উপরে তো আমি কোন কথা কহিতে পারিনা। তবে অধমের একখানা মতামত পেশ করিতে চাই।" বলিয়া সকলের চোখ তাহার দিকে কিনা তাহা নিশ্চিত হইয়া বলিতে শুরু করিলেন, "যুদ্ধরত অবস্থার যে তত্ত্ব দিয়াছেন জনাব, তাহা মানিয়া লইলেও, এই সারা জাহানের কোনো না কোনো স্থানে হয়তো এই মুহূর্তেও মুসলিমের সাথে ইহুদীরা যুদ্ধে লিপ্ত রহিয়াছে। দুনিয়ার কোথাও যে যুদ্ধ চলিতেছেনা ইহা তো আমরা নিশ্চিত হইয়া বলিতে পারিনা, তাই নহে? মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই, মুসলিম উম্মাহর সাথে এত বড় বেঈমানী আমরা কিভাবে করি?"

ইবনে আআ'মের কথায় কাজী আল মকসুদ খানিকটা মুষড়ে পড়ে, শেখ তাজামকে দ্বিধান্বিত দেখায়, আর আবু উবিলা আবারও উৎফুল্ল হইয়া ওঠেন, উত্তেজিত কন্ঠে বলিতে থাকেন, "ঠিক বলিয়াছেন মুহতারাম ইবনে আআ'ম। আমার মতামত হইলো, আমরা পাঁচজন ব্যক্তি যথেষ্ট ক্লান্ত হইলেও, এখনও চেষ্টাচরিত্র করিলে ঐ ইহুদী বদমায়েশ আর তার পরিবারকে এই খেজুর গাছখানার সহিত বাঁধিয়া রাখিতে পারিবো। তাহার পর উহার গৃহের খাবার আর পানীয় গ্রহনে আমাদের কোন বাঁধা থাকিবেনা, কারণ উহা আতিথ্যগ্রহন বলিয়া বিবেচিত হইবেনা।"

এতক্ষণে কাজী আল মকসুদ আর চুপ থাকিতে পারিলেননা, বিরক্ত কন্ঠে কহিলেন, "হে আবু উবিলা, উহা কি তবে লুট করা হইবেনা? লুট করা কি জায়েজ?"

আবু উবিলা কহিলেন, "এক্ষণে আমাদের জান বাঁচানো ফর্জ। এক্ষণে লুট করা কোন পাপ হইতে পারিবেনা।"

আল মকসুদ কহিলেন, "আর ইহুদীর ঘরে আতিথ্য গ্রহনে পাপ হইবে? বিশেষ করিয়া যখন দেখিতে পাইতেছো যে লোকটি সজ্জন, তাহার পরেও?" এই বলিয়া সকলের দিকে তাকাইয়া আল মকসুদ কহিতে লাগিলেন, "মুহতারামগণ, আপনারা কেন ভুলিয়া যান, আমাদের পেয়ারের নবীজি তাঁর নিজগৃহে মুসাফির ইহুদীকে আশ্রয় দিয়াছেন, মেহমানদারী করিয়াছেন, এমনকি ঐ দুষ্কৃতিকারী ইহুদী তাহার গৃহ নষ্ট করিয়া চলিয়া যাইবার পরও নিজ হস্তে সমস্ত বর্জ্য পরিস্কার করিয়াছেন। নবীজি তাহাকে সামান্য ঘৃণা তো করেনই নাই, বরং খাসদিলে তাহার হেদায়াত কামনা করিয়াছেন। আর আজ আমরা একজন সজ্জন ইহুদীর আতিথ্য গ্রহনে কুন্ঠাবোধ করিব? এই কি আপনাদিগের ইনসাফ?"

আল মকসুদকে সকলে সমীহ করিত, তাহার এই কথা শ্রবন করিবার পর আর কোন কথা কেউ কহিতে পারিলোনা। তাহাছাড়া, বস্তুত প্রাণ ওষ্ঠাগত মুসাফিরগণের আতিথ্য গ্রহনের বাহিরে অন্য কোন পথও খোলা ছিলোনা। তাই অবশেষে সকলে সম্মত হইলো যে ইহুদীর ঘরে আশ্রয় লইবেন। তাহারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করিতে লাগিলেন, "যাহাই হউক না কেনো, সবার আগে জান বাঁচানো ফরজ। আর কাহারও মনে যদি কোনপ্রকার কুন্ঠা রহিয়া যায় তবে পরবর্তীতে আল্লাহর দরবারে খাসদিলে তওবা করিয়া লইবেন।"

এহেন সুন্দর মুজাকারার পরও রক্তগরম আবু উবিলা ইহা কহিতে ছাড়িলেননা যে, "মুহতারাম কাজী আল মকসুদ, আপনার কথায় রাজী হইলাম বটে। এক্ষণে নতুন কোন মুসিবত হাজির হইলে তাহার দায়ও জনাব আপনাকেই লইতে হইবে।"

'এক সাধারণ সজ্জন ইহুদীর ঘরে আশ্রয় নিয়া আর নতুন কি মুসিবত হইবে' -- এই ভাবিয়া কাজী সহাস্যে মাথা নাড়িয়া আবু উবিলার অনুযোগ গ্রহন করিলেন।
একই সাথে আতিথ্যের আহবান জানানো ইহুদী ব্যক্তিটির উদারতার বিপরীতে তাহার মনে কোন কষ্ট না দেওয়ার হাত হইতে বাঁচিয়া গিয়াছেন -- এই ভাবিয়া মনে মনে সামান্য খুশীও হইলেন।

কিন্তু সেই মুহূর্তে আল মকসুদ কল্পনাও করিতে পারেননাই, তাঁহার এই কুসংস্কারহীন সৎকর্মটির জন্য কিরূপ কাফফারা খোদাতালা তাঁহার জন্য প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন।

তবে সেই গল্প আবার আরেকদিন করা যাইবে।

(চলবে ...)

#কাল্পনিক গল্প
#স্টাইল ধার করা

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29156961 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29156961 2010-05-17 20:42:27
পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তির গল্প (প্রথম অংশ) নামজাদা কাজী সাহেব বলিয়া কথা, মুহূর্তেই শতে শতে লোক আসিয়া হাজির হইলো, সকলের মুখে একই প্রার্থনা, "হুজুর, আমাকে সঙ্গী করিয়া লন।"

সামান্য সফরের ডাকে যে এহেন অবস্থার সৃষ্টি হইতে পারে, কাজী সাহেব তাহা কল্পনাও করেন নাই। করিতে পারিলে হয়তো নিজগৃহের বৈঠকখানায় বসিয়াই আর দশজনার সহিত শলা-পরামর্শ করিয়া সফরসঙ্গী ঠিক করিতে পারিতেন। এক্ষনে এত বেশী সংখ্যক প্রার্থী দেখিয়া কাজী সাহেব বলিলেন, "খোদাতালা সামর্থ্যদান করিলে তোমাদের সকলকে লইয়াই সফরে রওয়ানা হইতাম; কিন্তু তাহা তো সম্ভব হইতেছেনা। অতএব, হে শহরবাসী, তোমরা নিজ নিজ গোত্রের প্রধানদের নিকট যাইয়া মুজাকারা করিয়া ঠিক করো যে কে কে আমার সহিত যাইবে। সফরসঙ্গী ঠিক হওয়া পর্যন্ত আমি শহরের মূল ফটক হইতে এক পাও নড়িবনা -- এই জবান আমি তোমাদিগকে দান করিলাম।"

কাজী সাহেবের উপদেশ অনুযায়ী শহরের মূল ফটকে ভীড় করা শত শত লোক নিজ নিজ গোত্রপ্রধানদের গৃহের সম্মুখে গিয়া জড়ো হইলো। এখানে বলিয়া রাখা প্রয়োজন যে ঐ সময়ে ঐ শহরে মোট চারটি গোত্রের লোকেরা বসবাস করিত। চার গোত্রের লোকজনই আচার-আচরণে অত্যন্ত পরহেজগার ছিলো। গোত্রপতিদেরকেও তাহারা বিশেষভাবে মান্য করিত। তাহার ফলশ্রুতিতেই হয়তোবা, লম্বা সময় ধরিয়া অপেক্ষা করার মানসিক প্রস্তুতি লইয়া ফটকের পাশে বসিয়া থাকা কাজী সাহেবকে অবাক করিয়া, মাত্র আধাঘন্টার মধ্যেই দেখা গেলো যে চার গোত্র থেকে চারজন ব্যক্তি নির্বাচিত হইয়া তল্পিতল্পাসহ কাজী সাহেবের বরাবরে আসিয়া হাজির হইয়াছে। বলাইবাহুল্য, এই চারজন হইলেন চার গোত্রের গোত্রপ্রধানেরা। সকাল দশটার মধ্যেই আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করিয়া পাঁচ মুসাফির স্বীয় স্বীয় গাধার পিঠে চড়িয়া মোটামুটি অজানার পথে রওয়ানা হইয়া গেলেন।

তাহাদের সফর অত্যন্ত ফলপ্রসু হইলো, বিশেষতঃ গোত্রপতিদের জন্য। শহরে এবং এর আশেপাশের দু'চার-দশখানা শহরে বানিজ্য করিয়া সারাজীবনে তাহারা যতটুকু দেখিয়াছেন বা শিখিয়াছেন, এক সিনদাদের পথে সফর করিয়াই তাহারা এর চাইতে অনেক বেশী অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন। পাহাড় হইতে শুরু করিয়া, ঘন জঙ্গল, গভীর অরণ্য, খরস্রোতা নদী -- কি পাড়ি দিতে হয়নাই তাহাদের? তাহার উপর, একেক অঞ্চলের মানুষের চাল-চলন, কথাবার্তা একেকরকম, কেউ হয়তো তাহাদের মতোই দ্বীনদার, আবার কেও হয়তো শুধু নামেই মুসলমান, দ্বীনের আলো এখনও দেখিয়া উঠে নাই। অভিজ্ঞতার সাথে মুফতে খোদাতালার পথে প্রচুর নেকীও রোজগার হয়েছে -- এরূপ আত্মবিশ্বাস লইয়াই তাহারা সিনদাদ হইতে আবার নিজ শহরে ফিরিয়া আসার প্রস্তুতি লন।

সেইকালে আরবদেশে সফরের ক্ষেত্রে এক অলিখিত নিয়ম জারি ছিলো, যাহাতে করিয়া, দুইদিন-দুইরাত্রির বেশী সময় লাগে এহেন সফরের বেলায় যেই পথে কেহ গমন করিবে, অবশ্যই তাহা হইতে ভিন্নপথে তাহাকে প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে। ইহা লইয়া কাজী সাহেবের মনে খানিকটা পেরেশানি ছিলো, কারণ, ফিরিবার জন্য বাকী যেই পথখানা তাহারা বাছিতে পারিবেন ঐ পথে একখানা বিশালাকায় মরূভূমি আছে। এমনিতেই মরূপথ বিষয়ে তাঁহারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাহার ওপর মরূপথে উপনীত হইবার পূর্বের রাত্তিরেই কোনো এক পাহাড়ী রাস্তার পাশে বিশ্রাম লইবার সময় যখন তাঁহাদের গাধাগুলি মালসামানা সহ নিরুদ্দেশ হইয়া গেলো, তখন তাহারা সকলেই ভীষন ভয় পাইয়া গেলেন। কিছু দিনার ছাড়া আর কিছুই তাহাদের হাতে রহিলোনা। "নিশ্চয়ই আল্লাহ-তায়ালা আমাদিগের ওপর নারাজ হইয়াছেন!" মুখে কিছু না বলিলেও পাঁচজন পরহেজগার ব্যক্তিই একই কথা ভাবিতেছিলেন।

তবে সকলই খোদাতালার লীলাখেলা, কারণ, গাধাগুলি হারাইয়া যাইবার মাত্র একদিন পরেই মরূঅঞ্চলে উপনীত হইবার কিয়ৎ পূর্বে যখন কাজী আল মকসুদ তাঁহার সফরসঙ্গীদের লইয়া ছোটখাটো এক গ্রাম্যবাজারে থানকুনি পাতার চা পান করিতেছিলেন, তক্ষণে কোথা হইতে এক উষ্ট্রবিক্রেতা আসিয়া অত্যন্ত কমদামে পাঁচখানা উষ্ট্র তাঁহাদের কাছে বিক্রী করিতে চাহিলেন। নামমাত্র মূল্যে উষ্ট্র খরিদ করিবার সম্ভাবনায় চার গোত্রপতিই অত্যন্ত খুশী হইয়া পড়িলেন, যদিও সেইজন্য খোদাতালার শুকরিয়া আদায় না কারিবার মতো পাপ তাহারা করেননাই।

এইদিকে উষ্ট্র ক্র্য়ের বিষয়ে আল মকসুদ খানিকটা চিন্তিত হইয়া পড়েন, তাঁহার মনে এক অজানা সন্দেহ আসিয়া বাসা বাঁধে, "না জানি খোদার তরফ হইতে কি নতুন ইশারা আছে ইহাতে?"।
তাহার ওপর চা পান করিবার প্রাক্কালে তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট এক কুষ্ঠরোগী যুবক অথবা বালক যখন তাহাকে ফিসফিস করিয়া কহিলো যে, "আল্লাহর কসম, উহা খরিদ না করাই উত্তম", তখন তাঁহার সন্দেহ আরো গাঢ় হইয়া ওঠে।
এইখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঐটুকু বলিয়াই কুষ্ঠরোগীটি সেই যে কোথায় চলিয়া গেলো, তাহাকে আর খুঁজিয়া পাওয়া যায়নাই। কাজী আল মকসুদের ভীতির পেছনে তাহার এই চকিত নিরুদ্দেশ হইয়া পড়াও কাজ করিয়াছিলো বলিয়া বিশেষজ্ঞগন মনে করিয়া থাকেন।

যতই কাজী অথবা সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হোননা কেনো, সমষ্টির দাবী অবহেলা করা বড়ই কঠিন। বিশেষ করিয়া চার গোত্রপতি যখন কহিলো, "কাজী সাহেব, যেহেতু এখনও সামান্য দিনার হাতে আপনার আছে, তাই আপনিও উটখানা ক্রয় করিলে আমাদের ভ্রমনখানি আরামদায়ক হয়। কাউকে আপনার দায় লইতে হয়না।", তখন মনেপ্রানে পরহেজগার কাজী আল মকসুদ আর মানা করিতে পারিলেননা। কারণ, অন্যের বোঝা হওয়াটা আল্লাহ বা তাঁর রসুল কেউই পছন্দ করেননা, তাহা কাজী ভালোই জানেন।

স্বল্পমূল্যের উষ্ট্রক্রয়ের কারনে কোন ধরনের বালা-মুসিবতে যে তাঁরা পড়তে পারেন, তাহা লইয়া বিন্দুমাত্র ধারণা থাকিলেও তাহারা ঐ উষ্ট্ররাজির দিকে ফিরিয়াও তাকাইতেননা।



তবে, মূল গল্পের শুরু এইখান হইতে।

প্রথম কয়েকদিন মরূপথে উষ্ট্ররাজি ভালোই কাজ করিতেছিলো, বলটে গেলে সাধারণ উষ্ট্রের চাইতে উহারা কিছুটা দ্রুতই চলিতেছিলো বলিয়া পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তি পরস্পরকে মন্তব্য করিয়াছিলেন। ইহার বিশদ বর্ণনা কাজী আল মকসুদের ব্যক্তিগত ডায়েরী "তারিখ আল সফর লিল সিনদাদ" গ্রন্থে পাওয়া যাইতে পারে।

সমস্যার শুরু হয় মরূতে সফর শুরু হইবার চতুর্থ দিন বৈকালে, অর্থাৎ মহররমের সটেরো তারিখ রোজ রবিবারে, যখন হঠাৎ করিয়াই উস্ট্রবহর এক মাঝারী মানের ঝড়ের মুখে পতিত হয়। মরূর ঝড় প্রলয়ংকরী হইলে ভীষন বিপজ্জনক, বালুর বিশাল বিশাল ঢিবিকে এক অঞ্চল হইতে অন্য অঞ্চলে নিয়া ফেলে এই ঝড়, তাহার নিচে চাপা পড়িয়া যায় সবকিছুই। কিন্তু এহেন মাঝারী ঝড়ে উস্ট্রের পিঠে একটু সাহস লইয়া বসিয়া থাকিলেই হয়। পাঁচ মুসাফির তাহাই করিবেন বলিয়া ঠিক করিয়াছিলেন, কিন্তু উষ্ট্রকুল তাহাদের কথা শুনিলনা।

জানোয়ারের প্রলয় বুঝিবার ক্ষমতা বেশী বলা হইয়া থাকিলেও, এইক্ষেত্রে তাহার বিপরীতটি ঘটিলো। প্রলয়ংকারী ঝড় হইবে ভাবিয়াই হয়তোবা, মালিকদিগকে পিঠে লইয়াই তাহারা দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হইয়া অজানার পানে ছুটিতে লাগিলো। তাহাদের গতি ছিলো অশ্বের চাইতেও বেশী, যাহার ফলে মালিকগণ লম্বা সময় ধরিয়া তাহাদের পৃষ্ঠদেশে নিজেদের আঁকড়াইয়া রাখিতে পারেননাই। ফলশ্রুতিতে সন্ধ্যার অব্যবহিত পূর্বে উষ্ট্রের পিঠ হইতে পড়িয়া যাওয়া পাঁচ পরহেজগার মুসাফিরের পূনর্মিলন সম্ভব হইলেও, উষ্ট্রদিগকে আর কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যায়নাই।

সফরের আমীর কাজি আল মকসুদ কহিলেন, "সকলই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ইচ্ছে। তিনি যখন চাহেন নাই, তখন আমাদিগেরও আর উষ্ট্রের পিঠে চড়া হইলোনা। অতএব ভাইসকল, আসুন আমরা পদব্রজেই পশ্চিম অভিমুখে রওয়ানা দিই। নিশ্চয়ই ইহাতেও আল্লাহর কোন ইশারা আছে।"

মরূর ঝড়ের চাইতেও আরো বড় কোনো সমস্যায় যে পড়া সম্ভব, বরাবরের মতোই সেই মুহূর্তে পাঁচ পরহেজগার ব্যক্তি তাহার সামন্যও আঁচ করিতে পারেননাই।

(চলবে ...)
#পুরো গল্পটাই কাল্পনিক
#ছোটকালে পড়া নীতিগল্পের আদলে লেখার অপচেষ্টা

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29154235 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29154235 2010-05-13 16:07:42
সর্ষে ভাবনা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিলোনা। এর আগের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছিলোনা। কিন্তু সেসময় হয়তো "ঠ্যাডা" কিছু বিচারক ছিলেন। "ঠ্যাডা" শব্দটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যবহৃত হয়, মানে হলো, "ঘাড়ত্যাড়া", তবে প্রায়ই কিছুটা ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়, বিশেষ করে কাউকে যখন টলানো যায়না তখন।

মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আগের টার্মে পরাধীন বিচার বিভাগের এক ঠ্যাডা বিচারক ঠিকই কাগজে কলমে প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্ব এবং বাস্তবে প্রশাসনের সর্বেসর্বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কথাবার্তা বলার সময় "সামলে" বলার উপদেশ দেয়ার মতো সাহস দেখিয়েছেন।
আবার গত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়েও আরেকজন ঠ্যাডা বিচারক সরকারের মূল অংশীদার দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা যাকে পারলে বিএনপির লোকজন পুজা করে, সেই জিয়াউর রহমানের ১৯৭৫ সালের ক্ষমতারোহনকে "অবৈধ" বলে রায় দেয়ার মতো সাহস দেখান।

সে হিসেবে বর্তমানের স্বাধীন বিচার বিভাগের কাছ থেকে আমরা আরো সাহসী রায় আশা করতে পারি। অথচ কি দেখা গেলো?

পরাধীন বিচার বিভাগ বিএনপির শাসন আমলের মতো সময়ে জিয়ার ক্ষমতারোহনকে অবৈধ ঘোষনা করলেও, স্বাধীন বিচার বিভাগ কয়েকমাস আগে এরশাদের অবৈধ ক্ষমতারোহনের মামলাটি খালাস করে দিয়েছেন।

পরাধীন বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বুঝে শুনে কথা বলার উপদেশ দেয়ার গাট্স রাখলেও স্বাধীন বিচার বিভাগ তাঁর নামে করা মামলা দিনে পাঁচবার দশবার করে বহুমূত্র রোগীর মতো একের পর এক শুধু খালাসই করে যাচ্ছেন। যে দেশে একটা সামান্য জমির মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে কয়েক পুরুষ পেরিয়ে যায়, সে দেশে প্রশাসনের সর্বেসর্বার নামে করা মামলা আঙুলের তুড়ি বাজানোর মতোই স্বল্পসময়ে খারিজ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে কেন এসব খালাস হয়, কেউ জানেনা।

শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, স্বাধীন বিচার বিভাগের অধীনে দেখা যায় ১৩ বছর করে সাজাপ্রাপ্ত সব রাজনৈতিক নেতারা খালাস পান, কারো কারো শাস্তি মওকুফ হয়ে জলজ্যান্ত লোকটি জেল থেকে বের হয়ে আসেন;সেদিন আবার দেখা গেলো হাজী সেলিম আরেকজন "মহামানবে"র একশো সাঁইত্রিশটি মামলার মধ্যে একশোটিই খারিজের আয়োজন চলছে। বলি, বাকী সাঁইত্রিশটিকেও সাঁই করে উড়িয়ে চাঁদে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়।

ভাবেচক্রে মনে হচ্ছে, বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ায় এখন পোয়াবারো জ্যোতিষীদের। মামলা কোর্টে ওঠার আগেই উনারা একশোভাগ গয়ারান্টিসহ বলে দিতে পারবেন মামলার রায় কি হতে যাচ্ছে। এদেশের জ্যোতিষীরাও বলদ প্রকৃতির, একটা বেকুবও এখনও সুযোগটা কাজে লাগানো শুরু করেনি!

সব দেখে মনে হচ্ছে, বিচার বিভাগ আসলে স্বাধীন হলো কার হাত থেকে? প্রশাসনের হাত থেকে? নাকি "ঠ্যাডা" কিছু বিচারকের হাত থেকে?

বাংলাদেশকে নিয়ে আমার তেমন কোন উচ্চাভিলাসী স্বপ্ন নেই, ব্যক্তি আমি আসলে সেই অর্থে জাতীয়তাবাদী না।

আমি শুধু চাই এই দেশে সঠিকভাবে আইনের শাসনটুকু প্রতিষ্ঠিত হোক, আইনের যথাযথ প্রয়োগের পরিবেশ, চর্চাটুকু চলা শুরু হোক। সেটা না হলে এদেশ শুধু অধঃপতনের দিকেই ছুটে যাবে, প্রতিবছর যতই ধনাত্মক মানের জিডিপি বৃদ্ধির হার দেখানো হোক না কেন।


লেখাটি আমরাবন্ধু'র স্বাধীনতা দিবস সংকলনে পূর্বপ্রকাশিত]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29135829 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29135829 2010-04-16 08:45:39
আবু বকরের মৃত্যুর স্ট্যাটিসটিকাল পোস্টমর্টেম আবু বকরের মৃত্যুর খবরটি আমি দেখি ব্লগে, রাতে খাবার পর ব্লগ খুলে প্রথম পাতার পোস্টগুলোর শিরোনাম দেখছিলাম, সেখানেই এক বা একাধিক পোস্ট ছিলো ঢাবি'র "মেধাবী" ছাত্রের মৃত্যুর খবর নিয়ে। নিজের ক্ষুদ্রতা স্বীকার করেই শিরোনাম দেখে কি মনে হলো সেটা বলি। "ছাত্রলীগের তান্ডব"ই যেহেতু কারণ, তাই ভিকটিমের নামের আগে ঐ শিরোনামগুলোতে যখন "মেধাবী" শব্দটির ব্যবহার দেখলাম, ভেবে ফেললাম যে ছাত্র নিহত হলেই তো "মেধাবী" হয়ে যায় এদেশে, এটাও নিশ্চয়ই তাই হবে। স্বভাবগত স্কেপটিসিজমের কারণেই কৌতুহল হলো, পোস্টের ভেতরে ঢুকে জানা গেলো ইসলামিক ইতিহাস বিভাগের প্রথম বিভাগ দ্বিতীয় বা তৃতীয় রেজাল্টের অধিকারী নিহত আবু বকর। বোঝা গেলো, নাহ, এই ভিকটিম "সত্যিকারের মেধাবী"। মনের পঙ্কিলতাকে আরেকটু স্বীকার করে নিই। প্রথম বিভাগ দ্বিতীয় বা তৃতীয় ছাত্র -- তথ্যটা মাথায় ঢোকার পর নিহত আবু বকরের জন্য বাড়তি কষ্ট অনুভব করলেও একই সাথে এটা মনে করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারিনি যে, 'এমন মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু তো একটা "রাজনৈতিক ইস্যু"তে পরিণত হবে!।'

ব্লগের সবকিছু পড়ে তখন কেন জানি মনে হলো, "আহারে, বাবা-মা কত আশা করে ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠায়!" তখনও জানা যায়নি আবুবকরের পিতা-মাতা হতদরিদ্র, তাও মাথায় ভেসে উঠলো সহজ-সরল এক গ্রাম্য মা-বাবার চেহারা, যারা খুব আশা করে ছেলেকে ঢাকায় পড়তে পাঠিয়েছেন, দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত শিক্ষাঙ্গনে পাঠিয়েছেন। আমি জ্যোতিষী নই, তাও রাজনৈতিক ইস্যুর প্রভাবে মনের সংকীর্ণতা চাড়া দিলো, ভাবলাম, "এই ছেলে যদি মাঝে মাঝে পেপারে যে দেখি সেরকম হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে হয়, তাহলেতো বাড়তি সহানুভূতিতে ইস্যুটা আরো জোরেসোরে চাড়া দেবে!" কল্পনাও করিনি যে পরদিন সকালে আসলেই পত্রিকায় দেখতে পাবো যে আবু বকরের বাবা একজন হতদরিদ্র দিনমজুর! তখন অবশ্য আর মনের সংকীর্ণতাকে পাত্তা দেইনি, ভীষন কষ;ট লাগলো, মনে হলো, "আল্লাহ, এই দরিদ্র পরিবারটির বাবা-মা দু'জন হয়তো সারাজীবনের কষ্ট শেষে তোমার প্রতি পরম কৃতজ্ঞতায় মগ্ন থেকে অপেক্ষা করছিলো অভাবের দিন শেষ হবে বলে। এদের সন্তানটিকেই তোমার বেছে নিতে হলো?"

ভাগ্য জিনিসটাকে ভীষন নিষ্ঠুর মনে হলো!

কিছুদিন পর আবারও পত্রিকার শিরোনাম হলো আবু বকর, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পরে যখন মূলতঃ তার কথা কাছের লোকজন ছাড়া বাকী সবার ভুলে টুলে যাবার কথা তখনই। জানা গেলো, আবু বকর ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছে, সম্ভবতঃ বেঁচে থাকলে আর কিছুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সে নিয়োগ পেতো। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিলো, ভাগ্যের কি নিষ্ঠুর পরিহাস, আল্লাহর কিরকম লীলাখেলা।


২.

মানতে পারলাম না, বারবার মনে হলো এত কাকতালীয় কিভাবে হয় একটা ঘটনা?
একজন প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় ছাত্র কিভাবে মারা যায়? এদের তো সেভাবে "ক্যাডারগিরি"তে জড়িত থাকার কথা না!
তার ওপর, তাকেই কেনো হতে হবে একেবারে হতদরিদ্র দিনমজুরের মেধাবী ছেলে?
তারও ওপর, তাকেই কেনো সবাইকে কাঁদিয়ে মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ফলাফলে দ্বিতীয় থেকে প্রথম হতে হবে?

এতসব কাকতাল একসাথে এই আবু বকরের বেলায় এসে জড়ো হয়েছে কেন? এটা কি কোন অভিশাপ? এটা কি শেখ হাসিনার সরকারের উপর কোন অশুভ ইংগিত?

অনেক আবোল তাবোল চিন্তা মাথায় আসতে লাগলো। আবু বকরের মৃত্যু নিয়ে স্ট্যাটিসটিকাল পোস্টমর্টেমের শুরুটাও ঠিক তখন থেকেই। (তেমন আহামরী কোন পোস্টমর্টেম না, সবাই হয়তো এমনিই টের পেয়ে গেছেন।)

পরিসংখ্যান নিয়ে খুব সহজমাত্রার একটা হিসেব করলাম। টপ লেভেলের মেধাবী ছাত্র, হতদরিদ্র বাবা-মা, মৃত্যুর পর আরো ভালো রেজাল্ট -- এই তিনটা কাকতালের সম্ভাবনা যাচাই করলাম (এটা একেবারেই নিজের মনগড়া কিছু সংখ্যা দিয়ে করা হিসেব, আসল হিসেব হয়তো এর চেয়ে অনেক আলাদা হবে)

ক. আবু বকরের মতো রেজাল্ট হবার সম্ভাবনা একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের কতটুকু? ধরি ৫% বা ২০ ভাগের এক ভাগ (১/২০)।

খ. এরকম একজন মেধাবী ছাত্রের একটি হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসার সম্ভাবনা কতটুকু? বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের অভিভাবকদেরকে তাঁদের আয়ের হিসেবে দশটি ক্যাটাগরীতে ভাগ করা যায় ধরলাম। তাহলে, এ সম্ভাবনা ১০% বা ১০ ভাগের এক ভাগ (১/১০)।

গ. সেকেন্ড থেকে শেষ পরীক্ষায় ফার্স্ট হবার সম্ভাবনাকে ধরলাম ৫০% বা ২ ভাগের এক ভাগ (১/২)।

তাহলে উপরের (১/২০ * ১/১০ * ১/২) হিসেব করে পাই, নিহত একজন ছাত্রের আবু বকরের মতো এতো কাকতালসমৃদ্ধ হবার সম্ভাবনা ৪০০ ভাগের একভাগ।

এই পরিসংখ্যানের বক্তব্যটি খুব কঠোর! এর মানে হলো,
এ দেশে ৪০০ জন ছাত্র নিহত হলে এর মধ্যে ১ জন আবুবকর থাকা বিচিত্র না।

আবু বকরের মৃত্যুটা আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেলো যে আসলেই আমরা অনেক ছাত্রকে মরতে দিয়ে ফেলেছি, ছাত্ররাজনীতির নামে অসুস্থ একটা সিস্টেমকে নির্বিবাদে দাঁড়াতে দিয়ে। কারণ, হিসেবটা করার পরই মনে হলো, এ দেশে কি এখনও ৪০০ জন ছাত্র ছাত্ররাজনীতির বলি হয়নি? রগ কাটা, ড্যাগার বসিয়ে দেয়া, বোম ফাটানো, আগুন লাগানো, কাটা রাইফেল, চাইনীজ কুড়াল -- এসবের নানাবিধ ব্যবহারে কি এদেশে এখনও ৪০০ ছাত্র মরেনি? মরেছে আরো অনেক বেশী! আবু বকরের মৃত্যুর পরদিনই রাজশাহীতে মারা গেলো ফারুক, জামাত শিবিরের প্রত্যক্ষ আক্রমনে। তার দু'দিন পরে চট্টগ্রামে মারা গেলো আরেকজন, এর মধ্যে আরো হয়তো খুন হয়েছে। ইদানিং তো এসব খবরই পড়িনা, পালিয়ে বেড়াই!

মেনে নিতে হলো যে, আবু বকরের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিলো, আমরাই দায়ী, এই অবশ্যম্ভাব্যতা আমাদের তৈরী। ছাত্র রাজনীতির নামে অস্ত্রভিত্তিক পান্ডামী আর অসভ্যতামীই এ ধরনের মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে। আজ হোক কাল হোক, আবু বকরের মতো এরকম হতদরিদ্র পরিবারের একজন মেধাবী ছাত্র নিহত হয়ে বাবা-মা, ভাইবোনকে সারা জীবনের জন্য আর খবর পড়া মানুষকে কিছু সময়ের জন্য কাঁদিয়ে যেতোই।

বোঝা গেলো, বিধাতার কাছে অভিযোগ করে, বা কাকতাল খুঁজে কোন লাভ নেই। আমরা নিজেরাই কাকতাল তৈরী করি!

শেষকথা:
মন্ত্রী-মিনিস্টার-এমপি টাইপের রাজারাজড়ারা আর তাঁহাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো সাধারণ প্রজাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননা, বা ঐ এলাকা দিয়ে তেমন চলাফেরা করেননা; তাই হয়তো তেনাদের বেলায় সংখ্যাটা ১/৪০০ এর চেয়ে অনেক কম, ধরেন সেটা ১/৫০০০। তারপরও, তারা যেভাবে ছাত্রদের ব্যবহার করছেন এবং করেই যাবেন এমন ভাবই দেখিয়ে যাচ্ছেন, তাতে জানায়া রাখা প্রয়োজন যে সময় আসলে পরিসংখ্যান কিন্তু কাউকে ছাড়বেনা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29123071 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29123071 2010-03-25 14:02:16
১০ ই মার্চের গণহত্যা
***********************************************************
ছবিটিই হয়তো সব কথা বলে। তাও বলি।

টোকিওর কিনশিচো স্টেশন থেকে কয়েকশো মিটার দূরে সরু নদীর ওপরে একটি ব্রীজ, ব্রীজের নাম মনে পড়ছেনা, অবশ্য নাম জানাটা জরূরীও না। প্রায়ই এই ব্রীজের ওপর দিয়ে আসা যাওয়া করেন কিনশিচো এলাকার অধিবাসী এক বৃদ্ধা, ৮৫ বছর বয়েস। তবে অদ্ভুত এক কারণে যখনই তিনি ব্রীজের ওপর ওঠেন, চোখ বন্ধ করে ফেলেন; ব্রীজ থেকে যখন আবার সাধারণ রাস্তার ফুটপাথে নেমে আসেন, শুধু তখনই আবার চোখ খুলে হাঁটা ধরেন। কিছুতেই ঐ ব্রীজের ওপরে চোখ খোলা রেখে হাঁটতে পারেননা বৃদ্ধা। কেন?

কারণ অবশ্য আছে, রীতিমতো ভয়াবহ কারণ। ৬৫ বছর আগে ওই ব্রিজটির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি শুধু মানব ইতিহাসের নৃসংশতম ও ভয়াবহতম গণহত্যাটিরই সাক্ষী হননি, একই সাথে দেখেছেন জ্বলন্ত আগুনে পুড়তে পুড়তে কুঁকড়ে-পুঁকড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে নিজ পিতা-মাতার মরে যাবার দৃশ্য। মাত্র কয়েক মাস বয়েসী সন্তানটিকে কোলে করে ব্রীজ থেকে লাফ দিয়ে নিচের আরাকাওয়া নদীতে পড়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন সেদিন তিনি আর তাঁর সন্তান। তবে তাঁর বৃদ্ধ পিতা-মাতা ব্রীজ থেকে লাফ দেয়ার সাহস পাননি বলে, নাকি ঠিক সে সময়ের বাঁচার একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠা সেই আরাকাওয়া নদীতে অন্য যাদের লাফিয়ে পড়ার পরও বাঁচার সম্ভাবনা বেশী তাদেরকে জায়গা করে দেয়ার জন্য আগুনেপোড়া মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন -- তা জানা যায়নি, আজ ৬৫ বছর পর টিভি নিউজের লোকদের সে নিয়ে কিছু বলেননি তিনি।


কি হয়েছিলো সেদিন?
উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত আরাকাওয়া নদী আর কিছুদূর পশ্চিমে তার সমান্তরালে বহমান সুমিদা নদীর আশপাশের এবং এই দুই নদীর মধ্যবর্তী জনবহুল এলাকাটি বেশ জনবহুল ছিলো। টোকিও শহরের ২৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে এ এলাকাটি দখল করে রেখেছে ৩ টি ওয়ার্ড। প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

১৯৪৫ সালের মার্চের ১০ তারিখ, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বললে, মার্চের নয় তারিখ পেরিয়ে সবে রাত বারোটা বেজেছে। এর ঘন্টা দুয়েক আগে লোকজন ফাইটার প্লেনের ওড়ার শব্দ শুনেছে, অন্যান্য আর দশটি দিনের মতোই। তবে ১০ ই মার্চের সেই রাতটি ছিলো ভিন্ন; ঘন্টা দুয়েক আগে শোনা যুদ্ধবিমানের গর্জন আর ফিরে না আসায় লোকজন যখন স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলতে যাবে, তখনই হঠাৎ রাত ১২টা পেরিয়ে কয়েক মিনিট যেতেই এলাকার লোকজন দেখতে পেলো আকাশ থেকে নেমে আসছে বিশাল বিশাল আকৃতির সব জ্বলন্ত আগুনের দানব। একটা-দুটো না, পাঁচটা-দশটা না, এমনকি হাজার-হাজারও না! সংখ্যাটা ছিলো লাখে লাখ!!

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দশ লাখ আগুনের গোলা নিক্ষিপ্ত হয় টোকিওর সেই অংশে, পুড়িয়ে কয়লা করে ফেলে ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

অভিযানে অংশ নেয় তিনশো' চুয়াল্লিশটি বি-২৯ যুদ্ধবিমান, একযোগে। রাত ১২টা ৮ মিনিট থেকে শুরু করে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে এই তিন শতাধিক বি-২৯ ছারখার করে ফেলে আরাকাওয়া-সুমিদা অববাহিকা। গড়ে একেকটি প্লেন থেকে ৭০-৮০ টি বোমা ফেলা হয়, এলোপাথাড়ি। পুড়িয়ে দেয়া হয় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। একেকটি সিলিন্ডার দখল করেছে ৩০ বর্গমিটার এলাকা।৩০ বর্গমিটার, ৫ মিটার বাই ৬ মিটার। ১৫ ফুট বাই ১৮ ফুট, মোটামুটি আকারের একটা ড্রয়িংরুমের সমান। কল্পনা করা সম্ভব কিনা জানিনা, সে রাতে গড়ে এরকম প্রতিটি ড্রয়িংরূম সমান এলাকায় পড়েছে একটি করে সিলিন্ডার বার্নার, কেরোসিনে ঠাসা অমন বার্নার সত্যি বলতে একটা পুরো বাড়ি পুড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে! বিশেষ করে যখন বাড়িটি তৈরী হয় কাঠ আর কাগজ দিয়ে।

দুই ফুটের বেশি উচ্চতা আর চার/পাঁচ ইঞ্চি ব্যসের সিলিন্ডার আকৃতির অনেকগুলো বার্নারের সমন্বয়ে তৈরী হয়েছিলো বিশেষ ফায়ার বম্ব বা আগুন-বোমা। বি-২৯ এ বহন করে মাটির খুব কাছাকাছি পর্যন্ত নেমে এসে ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো ওগুলো, যাতে মেঘ কোন ঝামেলা না করে এই মানুষ হত্যার উৎসবে।

মূলতঃ জাপানী "কাগজ আর কাঠের তৈরী ঘরবাড়ী"কে উদ্দেশ্য করেই আমেরিকান সেনাবাহিনীর গবেষণায় উদ্ভাবিত হয় ঐ বিশেষ আগুনের গোলা; এর পরীক্ষা চালানো হয়েছিলো বিশাল আমেরিকার কোন এক মরূভূমিতে, জাপানী আদলের ঘরবাড়ী বানিয়ে, সেগুলোর উপর বোমা ফেলে ফেলে। সে যুগে জাপানী বাড়ী-ঘরের উপাদানের মধ্যে কাঠ আর কাগজের প্রাধান্য ছিলো বেশী। এদের পোড়ানো সহজ, কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিলেই হয়। সেভাবেই ডিজাইন করা হয়েছিলো বিশেষ ধরনের এই আগুন বোমার সিলিন্ডার বার্নার; তাতে ভরে দেয়া হয়েছিলো জেলের মতো অবস্থায় আধাশক্ত ধরনের কেরোসিন।

মধ্য আকাশে একেকটি বোমা ফাটে, সেখান থেকে বের হয়ে আসে ৪০ টি করে সিলিন্ডার বার্নার, প্রচন্ড তাপে আগুন ধরে যায় যেটা সান্দ্র কেরোসিনকে তরল করতে থাকে, কেরোসিন তরল হতে হতে বার্নারশুদ্ধ সেটা এসে পড়ে মাটিতে; দাউ দাউ আগুন জ্বলে ওঠে, আগুনের হোলিউৎসব চলে!



কিভাবে মানুষ মারা হয়েছিলো সেদিন?

প্রথমে বোমা ফেলে আগুন লাগানো হয় দুই নদী আরাকাওয়া আর সুমিদার তীর বরাবর। আগুন-বোমার ভয়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষ যাতে নদী পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় না নিতে পারে সেজন্য এভাবে তাদের পালানোর পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। দু'নদীর মাঝখানে যখন আটকে যায় লাখ লাখ মানুষ, তখন তাদের ঘরবাড়ীর ওপর শুরু হয় অনল-বৃষ্টি, আক্ষরিক অর্থেই। দশ লাখ সিলিন্ডারকে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফাটিয়ে আগুন ধরাতে হলে বৃষ্টির মতো করে ঝরানো ছাড়া আর কিই বা করা থাকে পাইলটের? হ

কেরোসিন সহ দশলাখ বার্নার সেদিন এসে পড়ে আরাকাওয়া-সুমিদা অববাহিকার মানুষগুলোর কাগজ-কাঠের ঘরবাড়ীগুলোতে। কিচ্ছু থাকেনি! সব পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তারাই বাঁচতে পেরেছে যারা নদীতে ঝাঁপ দিতে পেরেছে, বাকীরা মরে কয়লা।

পুড়ে মরে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে মাত্র ২০ হাজারের লাশ পরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকী ৮৮ হাজার মানুষ হারিয়ে গেছে চিরতরে, ছাই হয়ে; অথবা পোড়া কাঠ, গলিত লোহার আসবাব, দগদগে মাটি আর অন্যান্য গলন্ত সব জিনিসের সাথে গলে-পুড়ে একাকার হয়ে গেছে ৮৮ হাজার মানুষের দেহ। সাধারণ মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা -- কেউ বাদ থাকেনি।

মাত্র কয়েক মিনিটে এক লাখ মানুষ পুড়ে মরে গেছে টোকিও শহরে, বেশীদিন না, মাত্র ৬৫ বছর আগে।

৬৫ বছর আগের সেই রাতে যখন মায়ের কাছ থেকে আগুন থেকে বাঁচার টুপি পরে নিজ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে লাফ দিতে যাচ্ছিলেন কিনশিচোর অধিবাসী ঐ বৃদ্ধা, তখন তিনি দেখতে পান দাউদাউ করে আগুন লেগে যাওয়া চুলের হাত থেকে বাঁচতে কিভাবে আছড়ে-পিছড়ে ব্রিজের ওপর মারা যাচ্ছেন তাঁরই আপন মা। কিভাবে ওখানে তিনি চোখ খুলে হাঁটেন? কি ভেসে ওঠে তাঁর চোখে?

এরকম ঘটনা এই একবারই ঘটেনি টোকিওতে বা জাপানে, বারবার ঘটেছে ১৯৪৫ সালে, যুদ্ধের নামে। নানান হিসেবের সূত্রে, ৫ থেকে ১০ লাখ সাধারণ মানুষ মারা গেছে শুধু আগুনে পুড়ে।


কি দোষ ছিলো আরাকাওয়া-সুমিদা তীরের লোকদের?
এই অঞ্চলেই ছিলো জাপানীজ সেনাবাহিনীর অস্ত্র তৈরীর কারখানা। সেই কারখানার কাছাকাছি থাকার শাস্তি হিসেবে তাদের পুড়িয়ে মারা যেতেই পারে -- এমন মনোভাব এখনও এপৃথিবীতে অনেক নরপশুর আছে।


তারপর?
সংক্ষিপ্ততম সময়ে বর্বরতম ইতিহাসের এই গণহত্যার হোতার নাম কার্টিস লুমেই, আমেরিকার বিমান বাহিনীর জেনারেল।

মাত্র কয়েকমিনিটে লক্ষাধিক মানুষ পুড়িয়ে মারার পর এই নরপশু বলেছিলো তাদের হাতে সংঘটিত সেই গণহত্যা যৌক্তিক। তার যুক্তি ছিলো আরাকাওয়া-সুমিদা পাড়ের প্রতিটি সাধারণ মানুষের বাড়িই জাপানী সেনাবাহিনীর অস্ত্র তৈরীর কারখানা হিসেবে কাজ করেছিলো!

এই গণহত্যা নিয়ে ঠাট্টা-মস্করাও করে গেছে এই নরপিশাচ লুমেই, কোন এক সাক্ষাৎকারে সে হাসতে হাসতে বলেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের বাহিনী হারলে হিটলারের স্থানটা হতো তার।

আশ্চর্যের ঘটনা ঘটে ১৯৬৩ সালে; মেরুদন্ডহীন জাপান সরকার জাপানী বিমানবাহিনীতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য গণহত্যার হোতা কার্টিস লুমেইকে বিশেষ পুরস্কারে ভুষিত করে।


পরিশেষে:
৮৫ বছরের বৃদ্ধা এখন কাগজের তৈরী বক নিয়ে ঘুরে বেড়ান, তরুণ প্রজন্মের যারা তার গল্প শুনে উৎসাহ বোধ করে, তাদেরকে একটি করে কাগজের বক উপহার দেন। কাগজের বকেরও দুটো পাখা থাকে, তারা উড়তে পারে, তারা মুক্ত। সেদিনের সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলো এরকম মুক্ত ছিলোনা, তাদের হাত পা ছিলো বাঁধা। বৃদ্ধার বকেরা হয়তো তরুণ প্রজন্মকে সে কথাটি না ভুলে যাবার অনুরোধ করে যায়।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29114358 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29114358 2010-03-11 18:07:37
দু-হাজার দশের এই সকালে করেছো কেউ কল্পনা?/ ভাবতে হবে আবার তোমায়, জুলুমগুলো গল্প না
"ঐ পাহাড়ে জুলুম চলে এই কথা আর গল্প না পাই না খুঁজে কোথায় আছে পাহাড়ি বোন কল্পনা।"

সকাল থেকেই "বাংলা"য় লেখা এই লাইন দুটো শান্তি দিচ্ছেনা ...


আমার দেশের সেনাবাহিনীর আরেকটি জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29103014 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29103014 2010-02-22 10:00:06
বইমেলা, বই কেনা ও বাইয়ের দাম বিষয়ক ছাইপাশ ভাবনা তখন শক্ত বাঁধাইয়ের "ঝকঝকে তকতকে" অফসেটে এক-দেড়শো পৃষ্ঠার হুমায়ূন আহমেদীয় বই বা কোলকাতার অনুবাদগুলোকে অনেক উঁচু শেলফের পাঠ্য মনে হতো, বিষয়বস্তুর কারণে যতটা তার চেয়ে বেশী দামের কারণে, ওগুলোর দাম থাকতো কমসেকম ত্রিশ টাকা! কাজেই দশ টাকা সেরের চাল খেয়ে দশ টাকা দামের বই পড়েই সুখে থাকতে হতো।

এসব সুদূর কৈশোরের কথা, সেই ছিয়াশি/সাতাশি/আটাশি'র সময়ের কথা। এরপর অনেক জল গড়িয়েছে অনেক নদীতে, অনেক পাহাড়েরও বরফ গলেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে, চালের দাম, কৈ মাছের দাম, মায়ের বাজারের বাজেট, মেরে দেয়া টাকার পরিমাণের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বইয়ের দামও। আজ পাইজামের দাম চল্লিশ টাকা (নাকি আরো বেড়ে গেছে!!), সে হিসেবে সেবার দু'শো পৃষ্ঠার পেপারব্যাক বইয়ের দামও হওয়া উচিত চল্লিশ টাকাই। জানিনা দাম কতো এখন। আবার, হার্ড কাভারের ঝকঝকে অফসেটের দেড়শো পৃষ্ঠার বইয়ের দামও হওয়া উচিত একশো বিশ টাকার কাছাকাছিই। যদিও নিশ্চিত করে বলতে পারছিনা যে বই প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বিশ বাইশ বছরে চালের দামের মতোই চারগুণ বেড়েছে কিনা। হিসেব করে দেখা যায় অবশ্য, কারণ এটুকু বলতে পারি যে, তখন সাদা কাগজের দিস্তা ছিলো বারো টাকা, নিউজপ্রিন্টের দিস্তা ছিলো তিন টাকা। এখন এসবের দিস্তা কত করে?

আরেকটা তথ্য, তখন খবরের কাগজগুলো এখনকার মতো ত্রিশ পৃষ্ঠাসমৃদ্ধ স্ফীত কলেবরে বের হতোনা, বড়জোর ষোল পৃষ্ঠা, দাম দু'টাকা।

ইন্টারপোলেশনের সুবিধার জন্য আরো কিছু উপাত্ত মনে করার চেষ্টা করি। সাতাশি/আটাশি থেকে একলাফে দুঝাজার দশে চলে আসলে গাণিতিক হিসেবে ব্যাড়াছ্যাড়া লাগতে পারে, তাই পঁচানব্বই ছিয়ানব্বইয়ের দিকের দামগুলোও মনে করার চেষ্টা করি। তখন পাইজাম চালের কেজি ছিলো পনেরো-ষোল টাকা (সাত আট বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছিলো), সাদা কাগজের দিস্তা ছিলো বিশ টাকা, নিউজপ্রিন্ট চার/পাঁচ, আর ইকোনো কলমের দাম অপরিবর্তিত -- তিন টাকা (কলমের কালির দাম বাড়েনি মনে হয় অনেকদিন, ছাপার কালির দাম?). খবরের কাগজের বপুও স্ফীত হওয়া শুরু করে, দামও ছিলো চার বা পাঁচ টাকা মনে হয়।


কিন্তু ব্লগে বিচরণ করে বইমেলার নানান খবরের ভীড়ে যেটা খচ্ করে লাগছে আজকাল, তা হলো, কোনভাবেই সাদা কাগজে হার্ড কাভারের দেড়শো পৃষ্ঠার উপন্যাস (এখন কেউ এত বড় উপন্যাস লেখে কিনা সেটাও প্রশ্ন) মনে হয় একশো বিশ টাকায় পড়া যাবেনা, মনে তো হচ্ছে আড়াইশোতে যেতে হবে।

বোঝা যাচ্ছে যে এখানে স্ফীতির হারটা অনেক বেশী, অন্য জিনিসের দাম যেখানে চারগুণের মতো বেড়েছে, সেখানে এসব বইয়ের দাম সাত-আটগুণ বেড়েছে।

প্রশ্নটা জাগে কেন? কাগজের দাম বেশী? নাকি হার্ড কাভারের? নাকি প্রিন্টিং কস্ট? নিশ্চয়ই বই প্রকাশে প্রয়োজন এমন কোন একটা উপাদানের খরচ অনেক বেড়ে গেছে!

আলোচনা চলুক, হয়তো একটা গ্রহনযোগ্য হিসেব কেউ তুলে ধরতে পারবেন।


(মানুষের আয় কেমন বেড়েছে? ৮৭/৮৮ এর দিকে বিসিএস অফিসাররা ঢুকতো ৩৫০০ এর কাছাকাছি স্কেলে মনে হয়, এখন কি ১৪ হাজারে গেছে?)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29098370 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29098370 2010-02-15 16:56:05
ছাগল বিষয়ক গাণিতিক সমস্যা " style="border:0;" />

একলোক কোরবানী উপলক্ষে দুটো ছাগল কিনেছে। একটা সাদা, একটা বাদামী। রাতভর তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সিনক্রোনাইজড চিৎকার করে যায়, যেটা দেখে আপনার ধারনা হতে পারে যে এদের মধ্যে বহুত মিল মহব্বত! তবে সেই মহব্বতের মাত্রা যে খুব বেশী না সেটা বোঝা যায় যখন তাদের খাবার দেয়া হয়। ভদ্রলোক উঠোনে গোল বৃত্তাকার একটা জায়গায় সমবন্টনে হাজার হাজার কাঁঠালপাতা ছড়িয়ে রাখেন (উপরের ছবিতে Y কেন্দ্রের লাল বৃত্ত), কিন্তু মাননীয় ছাগলদ্বয়কে সেখানে এনে খাবার জন্য ছেড়ে দিলে দেখা যায় যে, স্বীয় উদরপূর্তির চেয়ে অপরের শরীরের নাজুক নাজুক অংশগুলোতে শিং দিয়ে গুঁতোগুঁতিতেই তাদের আগ্রহ বেশী। ফলাফল, দুজনেই মারামারি করে আহত হয়, মাঝখানে কাঠালপাতা ছাগলের ইয়েতে ছেয়ে যায়।

এই ভয়ানক সমস্যা দূর করার জন্য ভদ্রলোক এক কাজ করলেন। ঠিক করলেন যে ছাগলদ্বয়কে দুটো ভিন্ন ব্যাচে কাঁঠালপাতা খাওয়াবেন। প্রথমে সাদাটিকে বৃত্তের অর্ধেক কাঁঠালপাতা খাইয়ে তারপর বাদামীটিকে বাকী অর্ধেক খাওয়াবেন। তবে মনে রাখতে হবে প্রাণীটি ছাগল, কাঠালপাতার রাজ্যে প্রথমে সাদাটিকে ছেড়ে দিলে সে সব খেয়ে সাবড়ে ফেলবে। অর্ধেকটা তো সে আর অন্যের জন্য রেখে দেবেনা!

এজন্য ভদ্রলোক একবুদ্ধি করলেন, ছবির মতো করে X কেন্দ্রবিশিষ্ট নীল বৃত্তটির কেন্দ্রতে একটি লাঠি গেঁথে, সেটার সাথে নীল বৃত্তের ব্যাসার্ধের সমান একটি দড়ি দিয়ে সাদা ছাগলটিকে বেঁধে দিলেন। এতে সাদা ছাগল শুধু ছবির শেড দেয়া অংশটিতে বিচরণ করতে পারবে আর শুধু ওটুকু অংশের কাঁঠালপাতাই খেতে পারবে।

প্রশ্ন হলো,
১.
লাল বৃত্তের ব্যাসার্ধ যদি ১০০সে.মি. হয়, তবে দড়ির দৈর্ঘ্য, মানে নীল বৃত্তের ব্যাসার্ধ কত?


বাড়তি দুটি প্রশ্ন:
২.
ছাগলকে বাঁধতে গিয়ে ভদ্রলোক যদি দেখেন যে দড়ির ইফেক্টিভ বা কার্যক্ষম দৈর্ঘ্যে কোনভাবেই ১০০ সে.মি'র বেশী হয়না, মানে X কেন্দ্রবিশিষ্ট নীল বৃত্তটির ব্যাসার্ধ সর্বোচ্চ ১০০ সে.মি হতে পারে, তখন কি করলে সাদা ছাগলটি অর্ধেকের বেশী কাঁঠালপাতা খেতে পারবেনা?
এক্ষেত্রে দুটো বৃ্ত্তের কেন্দ্রগুলোর অবস্থান কেমন হবে, কেন্দ্রদুটোর মধ্যে দূরত্ব কত হবে?

৩.
দড়ির ইফেক্টিভ বা কার্যক্ষম দৈর্ঘ্য সর্বনিন্ম কতটুকু হলে ভদ্রলোক তাঁর কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29029060 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29029060 2009-10-20 16:45:54
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স - পর্ব ১০(শেষ পর্ব) পর্ব ১, ২(Click This Link)..পর্ব ৩, ৪ (Click This Link)..পর্ব ৫, ৬(Click This Link)..পর্ব ৭(Click This Link)..পর্ব ৮, ৯ (Click This Link)

১০
হাসনাইনের তড়িঘড়ি করা আচরণের আকস্মিকতায় কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া রাজু, তাও সবসময়ের মতো হাসনাইনের পিছু পিছুই তাকে কাউন্টারের দিকে যেতে হয়, এ এমনই এক অনুসরন যেন এটাই তার চিরন্তন নিয়তি। হিলপরা মেয়েটিও এইমাত্র সেদিকেই গেছে বলে মুহূর্তের জন্য হলেও রাজুর মনে শংকা জাগে, 'হাসনাইন ভাই কি শেষমেষ এই উর্বশীর মাঝে খুনীকে খুঁজে পেলেন!', এবং সঙ্গত কারণেই সে মুহূর্তটুকু সে কিছুটা বিব্রতবোধও করে।
তবে রাজুর অনুমান যে ভুল তা বলাই বাহুল্য! কাউন্টারে গিয়ে কোন ভূমিকা ছাড়াই চ্যাংড়া ছেলেটি, কামালকে হাসনাইন প্রায় নির্দেশের কন্ঠে বলতে থাকে, "তোমার ক্যাফের ম্যানেজারকে ডাকো।"
"স্যার, উনিতো আজ ছুটিতে।" হাসনাইনের উদ্ধত নির্দেশে স্বতঃস্ফূর্ত গোয়ার্তুমি ভর করে ছেলেটির ওপর, কারণ দেখা যায় যে ছেলেটি একথা বলতে না বলতেই ভেতরের অফিসমতোন একটি কামরা থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে ছেলেটির দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন, তারপর হাসনাইনের দিকে মনোযোগ দেন, বলেন, "বলুন স্যার, কি করতে পারি আপনাদের জন্য। আমিই রেইনবোর ম্যানেজার।"
হসনাইন আর রাজু দু'জনই বিস্ময় আর ক্ষোভমেশানো চোখে তাকায় কামালের দিকে, কামালের মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে, তবে সেটা যতটা না এই ভদ্রলোকদ্বয়ের কারণে তার চেয়েও অনেক বেশী পাশেই দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা দেখা ঊর্বশীটির রিনরিনে কন্ঠে 'হি হি হি হি'লয়টুকু বেজে ওঠার কারণে।

"আমি ডিটেকটিভ হাসনাইন, আর উনি আমার কলিগ রাজু" হাসনাইন তার আইডি মেলে ধরে ম্যানেজারের সামনে।
মুহূর্তেই কামালের লজ্জা আতংকে রূপ নেয়, তার মুখ প্রায় ছাইভস্ম হয়ে যায়, রোবটের মতো পেছনে সরে যেতে যেতে হঠাৎকোথায় যেন লাপাত্তা হয়ে পড়ে সে। একই সাথে দেখা যায় পাশে দাঁড়ানো উর্বশীও খানিকটা আলোড়িত হয়ে ওঠেন, কি যেন একটা খোঁজার ভান করে ধীরে ধীরে একপাশে সরে গিয়ে তারপর তাড়াহুড়ো করে নিজের টেবিলের দিকে "দে ছুট" অবস্থা। দু'দিকে দু'জন মানুষের দুটো সম্পূর্ণ ভিন্নস্বাদের 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি'টাইপের কান্ডকারখানা দেখে রাজুর হাসি পায়, তার ইচ্ছে করে হাসনাইনকে বলে, "দেখলেন হাসনাইন ভাই, পুলিশের লগে টাংকি মারতে গিয়া কেমন ডরটা খাইলো, হা হা হা"।
কিন্তু ম্যানেজার আর হাসনাইন -- দুজনেরই সিরিয়াস ভাবের চেহারার সামনে কিছু বলার সাহস বা উৎসাহ হয়না তার।

বেশ আপ্যায়নের ভঙ্গিতেই দুই ডিটেকটিভকে ডেকে নিয়ে ভেতরের অফিসে বসান রেইনবোর ম্যানেজার জনাব খায়রুল বাশার। খানিকটা ভীত কন্ঠেই বলেন, "স্যার কোন অভিযোগ?"
"না না, ভয় পাবেননা। আমরা শুধু আপনার ক্যাফের ক্যাশিং সিস্টেম সম্পর্কে জানার জন্য এসেছি।" হাসনাইন উদার গলায় বলার চেষ্টা করে যাতে ভদ্রলোক কিছুই না লুকায়।
"স্যার, আমরা ভ্যাট ফাঁকি দিইনা, একেবারে হালাল বিজনেস স্যার। প্রত্যেক অর্ডারের জন্য আলাদা রিসিপ্ট দিই আমরা, এমনকি স্যার একই লোক দু'বার জিনিস কিনলে দুটা রিসিপ্ট, দশবার কিনলে দশটা।" খায়রুল বাশারের গলার কাতরতা বৃদ্ধি পায়।
"আহা! আপনি আগেই এত ভয় পাচ্ছেন কেন?" রাজুর বিরক্ত উচ্চারনে খানিকটা সাহস পাবেন নাকি আরো দমে যাবেন বুঝে উঠতে পারেননা খায়রুল বাশার।
হাসনাইন স্মিত চেহারায় বলে,"মিঃ ম্যানেজার, আমরা শুধুই কিছু তথ্য জানতে চাই, এবং নিশ্চিত করছই যে এই তথ্যের জন্য আপনাকে কোনভাবেই কোনরকম আইনি সমস্যায় পড়তে হবেনা। বড়জোর একটা সাক্ষ্য দিতে হতে পারে, অথবা একটা স্টেটমেন্ট। আমি যা জানতে চাচ্ছি, বলি, আপনার ক্যাফের বেচাকেনার হিসেবটা যেমন রিসিপ্টের মাধ্যমে ক্রেতাকে দেয়া হয়, তাইনা?'
'অবশ্যই স্যার, অবশ্যই স্যার। যে কোন বেচাকেনাই হোক রিসিপ্ট দেয়া হবেই!'
খায়রুল বাশারের ওকালতিতে আগ;রহ পায়না হাসনাইন, তার কথার মধ্যেই একটু গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ''তেমনি একটা রেকর্ড তো আপনার কম্পিউটারেও থাকে, তাইনা?'
"জি স্যার, অবশ্যই স্যার। কম্পিউটারে প্রত্যেকটা বেচাকেনার লগ রেকর্ড করা আছে আমাদের নিজেদের ডাটাবেজে।"
"সেই রেকর্ডটা আপনারা কতদিন ধরে রাখেন? মানে গতবছরের হিসেব চাইলেও কি পাওয়া যাবে?"
একটু ভাবেন খায়রুল বাশার, তারপর বলেন, "অবশ্যই যাবে স্যার। অরিয়ন ক্লাবের মেইন সার্ভারে সম্ভবতঃ তিনবছরের রেকর্ড ব্যাক-আপ রাখা হয়।"
"গ্রেট! তিন বছর আমার দরকার নেই, আমার দরকার গত তিনমাসের। আরো খুলে বললে, দু'মাস বিশদিন আগের মানে এপ্রিল ১১'র সন্ধ্যাছ'টা থেকে ন'টা পর্যন্ত সময়টুকুতে রেইনবো ক্যাফে অরিয়নের বেচাকেনার রেকর্ড।" পকেট থেকে মোজাম্মেলের এ্যালিবাইর রিসিপ্টটা বের করতে করে দেখতে দেখতে বলে হাসনাইন।

খায়রুল বাশার আশ্বস্ত হয়, এবার তাঁর সাহস করে বুকভরে দম নিয়ে কথা বলার পালা, তিনি বলেন, "কোন সমস্যাই হবেনা স্যার, আপনি শুধু বলেন কবে লাগবে। আমি পাঠিয়ে দেব। আমার স্যার এক নম্বর ব্যবসা, আমার কোনকিছু লুকোনো লাগেনা!"
"হ্যাঁ, সেটা আমি অস্বীকার করছিনা" হাসতে হাসতে বলে হাসনাইন, "আপনি কি আজই দিতে পারবেন?"
আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের চেয়েও দ্রুত গতিতে মুহূর্তেই চট করে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে কোথায় যেন ফোন করেন খায়রুল বাশার, ওপাশে ফোনধরা লোকটি কিছু বলার সুযোগ পাবার আগেই বলতে থাকেন, "সাকিব, এক্ষুণি চলে আসো অফিসে, বিশেষ জরূরী প্রয়োজন। দেরী করা চলবেনা ... না না ... চিন্তা করোনা, একেবারে ঘন্টা মিনিট মেপে ওভারটাইম দেয়া হবে। কিছু ভীষণ জরূরী কাজ করা লাগবে।" তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, 'আরে মিয়া, পুলিশ আসছে!'। যদিও ফিসফিসানিটুকু বুঝতে হাসনাইন বা রাজুর কোন অসুবিধাই হয়না।

ফোন কেটে দিয়ে দুই ডিটেকটিভের দিকে তাকিয়ে আকর্ণবিস্তৃত হাসি হাসেন খায়রুল বাশার, বলেন, "আমাদের কোম্পানীর আইটি অফিসার। খুব ভালো ছেলে স্যার, নাম সাকিবুজ্জামান, কাজেকর্মে একদম এক্সপার্ট, গুরু যাকে বলে। আর আমরা স্যার কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এসবও ঠিকমতো দেইতো, কেউ কখনও কোন সমস্যা বা অবহেলা করে না কাজে। দেখছেননা বলার সাথে সাথেই রওয়ানা দিয়ে দিলো!"
হাসনাইন আর রাজুর মুখ থেকে মৃদুহাসিটুকু আর সরেনা। একই সময়ে তারা দুজনেই মনে মনে ভাবে, বিএসটিআইর ইন্সপেক্টর হতে পারাটা কত ভাগ্যের! সারাদিন জমিদারের খাতির। এরমধ্যেই চা নাস্তা সহ ম্যানেজারের ঘরে এসে হাজির হয় কামাল, ক্যাশকাউন্টারের ছোকড়াটি। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতের ট্রে প্রায় ফেলে দেবার জোগাড় তার, কোনভাবে হাসনাইনদের সামনের টেবিলে রেখে ট্রে-টুকু রেখে যেন উর্ধশ্বাসে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। খায়রুল বাশার বলেন,"নতুন নিয়োগ দিয়েছি তো স্যার, একটু বেয়াদব আছে ছেলেটা, কিছু মনে করবেননা স্যার। ভেবেছিলো পুলিশ ম্যানেজারকে খুঁজতে এসেছে, কি না কি বিপদ, তাই বেশী বুদ্ধিমানের মতো বলে বসেছে ম্যানেজার নেই। আজকালকার ছেলেদের নিয়ে আর পারা গেলোনা!"
রাজুর একবার বলতে ইচ্ছা হয়, "তখনও সে কিন্তু জানতোনা আমরা পুলিশ না বাসকন্ডাকটর।" কিন্তু আর কথা বাড়ায়না সে, ভাবে আবার কত লম্বা কি কৈফিয়ত দেয়া শুরু করে এই খায়রুল বাশার, কে জানে।

রাত ন'টা পঁচিশের দিকে ঢাকা ক্লাব থেকে বের হয় হাসনাইন আর রাজু। মুখে দুজনেরই বিজয়ের হাসি, সে হাসি আর কিছুতেই সরেনা করো মুখ থেকে। মোটামুটি পুরো কেইসটি গুছিয়ে এনেছে তারা, কাজ আর অল্প কিছুই বাকী, সব মিলে গেলে তারপরই ধরা পড়ে যাবে মোজাম্মেল। সবার আগে যা করতে হবে তা হলো মোজাম্মেলের বাড়ীতে তল্লাশীর ওয়ারেন্ট ইস্যু। রিক্সায় বসে আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকা গোয়েন্দা হাসনাইনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সে আকাশের তারা গোণার মতো অসাধ্য কাজটি করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তারদিকে তাকিয়ে মনে মনে রাজু বলে, "গুরু, ঠিকই বলেছিলেন, ওয়াই ম্যাক্স, সবই ওয়াই ম্যাক্সের খেলা!"

তারপর মুখ খোলে সে, জিজ্ঞেস করে, 'হাসনাইন ভাই, ঐ সুন্দরীকে পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখার সাথে সাথেই আপনি যেভাবে ইউরেকা বলে উঠলেন, আমার তো মনে হয়েছিলো সুন্দরীর মধ্যেই ক্লু পেয়েছেন!'
'অবশ্যই, ঐ সুন্দরী আজ কোমর বাঁকিয়ে হেঁটে হেঁটে আমাদের কি উপকার করেছে তুমি জানো!'
'মানে, ঠিক কিভাবে?'
'আগে চিন্তা করো, সুন্দরীকে ওভাবে হাঁটতে হয়েছিলো কেন?'
'ঢং করে হাঁটছিলো তো বটেই, তবে ঐ একফুটি হিল পরলে যে কেউই একবার সামনে একবার পেছনে ঝুঁকে হাঁটতে বাধ্য হবে।'
'ঠিক! হান্ড্রেড পার্সেন্ট ঠিক!' হাসনাইনের মধ্যে লেকচারার লেকচারার ভাব চলে এলো,'মনে করে দেখো, সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজের লোকটাকে আমরা মোজাম্মেলের সাথে মেলাতে পারছিলামনা মূলতঃ উচ্চতার কারণে। আর তুমি নিজেই বলেছ রেডড্রাগনের সেই খুনী তোজাম্মেলের মতো দৃঢ় ঋজুভঙ্গিতে না হেঁটে সামনের দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছিলো।'
'মানে বলতে চান খুনী হিল পরে হাঁটছিলো?' উত্তেজিত শোনায় রাজুর কন্ঠ।
'সেটাই!' ধীরস্থির ভঙ্গিতে বলতে থাকে হাসনাইন, 'তখনই বুঝলাম খুনটা আসলে মোজাম্মেলই করেছে, নতুন কোন হিটম্যানকে আর সে জড়ায়নি এই কেইসে। কিন্তু তখনই তো সমস্যাটা হয় তার এ্যালিবাই, রাইট? এ্যালিবাই নিয়ে আমি আগেই ভেবে নিয়েছিলাম যে এমন কিছু হয়েছে, রেইনবো ক্যাফের ডেটাবেস হ্যাক করতে পারলে কিছুক্ষণের জন্য সার্ভারের সময় পিছিয়ে দিয়ে, কফির অর্ডার শেষ করে, আবার সার্ভারের সময় ঠিক করে দিলে, এ্যালিবাই হিসেবে দাঁড় করানো যায় এমন রিসিপ্ট হাত করা সম্ভব।'
'তারমানে, খুনের সময় মোজাম্মেল রেডড্রাগনেই ছিলো, এবং সোয়া আটটার দিকে সে রেড ড্রাগন ছেড়ে অরিয়ন ক্লাবে আসে, আসার পথে রেইনবোর সার্ভার হ্যাক করে সময় করে দেয় সাতটা পঞ্চাশ, তার পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফি কিনে সাতটা পঞ্চান্ন'র রিসিপ্ট হাতিয়ে নেয়, রাইট?'
'ঠিক, তারপর সে আবার সার্ভারের টাইম ঠিক করে দেয় যাতে পরে কেউ সমস্যাটা খেয়াল না করে। এজন্যই দেখলেনা, রেইনবোর লগের রেকর্ডে দেখা গেল সেদিন রাত আটটা সতেরোতে একজন কফি কিনেছে, তারপর সাতটা পঞ্চান্নতে মোজাম্মেল কফি কিনছে, তারপর আবার আটটা ঊনত্রিশে একজন কি যেন কিনেছে। মানে মাঝখানের সময়টা মোজাম্মেল হ্যাক করে গড়বড় করেছে।'

'এখন তাহলে মোজাম্মেলের বাসা রেইড করে দেখতে হবে বুটের ভেতরে পরে হিল বানানো যায় এমন কিছু পাওয়া যায় কিনা।' রাজু নিজেই নিজেকে বলে।
'হ্যাঁ শুধু বাসা না, মোজাম্মেলের ডেরা আর কোথায় কোথায় থাকতে পারে, সে লিস্টটাও করে ফেলতে হবে', হাসনাইন যোগ করে 'আমার ধারনা সিসিটিভি ফুটেজের ওভারকোট, হ্যাট আর বুট -- সবই পাওয়া যাবে। আমাদের এখন যেটা করতে হবে, তা হলো কাউকে জানতে দেয়া যাবেনা যে মোজাম্মেলকে আমরা গুছিয়ে এনেছি। শুধু শাহাদাৎ স্যারকে বলে একটা ওয়ারেন্ট ইস্যু করাতে হবে।'
'শালার ওয়াই ম্যাক্স! রেস্টুরেন্টে বসে বসে ডেটাবেস হ্যাক করে ফেলে! সাহস কত!' গত দু'মাসে জমে থাকা সব রাগ যেন ঝরে পড়ে রাজুর কন্ঠে।
'দাঁড়াওনা, ওয়াই ম্যাক্সের খেলা তো এখনও শেষ হয়নি!' মিটিমিটি হাসে হাসনাইন।
'তাইতো!' রাজুও যোগ দেয় সেই হাসিতে,'জামশেদ ভাইকে কি এখন পাওয়া যাবে?'
'দেখা যাক! জনাব তো আবার তীব্র মোবাইল ফোনবিরোধী! ল্যাবে যাবার আগ পর্যন্ত তো কিছু বোঝার উপায় নেই।'
'হাসনাইন ভাই, আপনি উত্তেজিত। কেন ভুলে যাচ্ছেন যে জামশেদ ভাইয়ের ওখানে যাবার আগে আমাদের যেতে হবে তোজাম্মেলের আস্তানায়।' হাসতে হাসতে বলে রাজু।
হাসনাইনও হাসিতে যোগ দেয়।

পুলিশের সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন ল্যাবের তিনতলায় একমনে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন জামশেদ, কিছু ইমপোস্টর বা জাল বায়োমেট্রিক ডেটা ইন্টারপোলের ডেটাবেস থেকে রিলিজ করা হয়েছে রিসেন্টলি; এসব ডেটাকে কিভাবে জাল হিসেবে প্রমাণ করা যায়, মানে সত্যি সত্যি লিভিং অবজেক্ট বা জীবিত মানুষের ডেটা থেকে আলাদা করা যায় সে নিয়ে এখন কাজ করছে সে। নানান প্রিপ্রসেসিং এ্যালগরিদম প্রয়োগ করে দেখছে, সামান্যতম সন্তুষ্টিজনক ফলাফলও আসছেনা গত দু'সপ্তা ধরে নিরলস কাজ করার পরও। এই মুহূর্তে তিনি শুধু শুধুই মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন, নতুন কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখার কথা আর ভাবতেও ইচ্ছে করছেনা তাঁর।

এমন সময়েই পেছন থেকে হন্তদন্ত পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো, এই আওয়াজ শুধু তার প্রফেসর ড. আবু নাজিমেরই হতে পারে ভাবেন তিনি, তবে শুক্রবার রাতে দুনিয়ার কোন শক্তিই যে আবু নাজিমকে এখানে আনতে পারবেনা তাও জানেন জামশেদ। তাহলে কে আসলো? নিতান্ত অনিচ্ছায় পেছন ফিরে তাকান তিনি। জামশেদ বোঝেন যে তাঁর অনুমান ঠিক, হন্তদন্ত পায়ে নাজিম স্যার আসছেননা। আসছে হাসনাইন আর তার চ্যালাটা, কি যেন নাম, মনে আসছেনা এই মুহূর্তে। শুধু তাই নয়, তৃতীয় আরো একজনকে দেখা যাচ্ছে এদের সাথে। 'আবার কোন অনুরোধে কত বড় ঢেঁকি গিলতে হয় কে জানে!' ভেবে খানিকটা বিরক্ত হন জামশেদ। এর আগে শুধু হাসনাইনের নাছোড়বান্দা অনুরোধের কারণে দুজন বড় বড় বিজনেস ম্যাগনেটে জনাব বক্স আর খন্দকারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটা তিনি "মিসেস খন্দকার এন্ড বক্স" কেইসের খুনীর ডেটার সাথে মিলিয়ে দেখেছেন। এ খবর উপর মহলে গেলে পারসোনাল ইনফরমেশন মিসহ্যান্ডলিংয়ের দায়ে তাঁর চাকরীও চলে যেতে পারতো, যদিও এসব ধরতে পারার মতো অভিজ্ঞ হতে উপরের মহলের লোকদের আরো দশবার জন্মাতে হবে বলে তার ধারনা, যেকারণে ব্যাপারটা নিয়ে খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও সেটা যতটা না শাস্তির ভয়ে তার চেয়ে অনেক বেশী নৈতিকতার দায়ে।

যাই হোক, হাসনাইন আর রাজুর আবারও এই আচমকা উপস্থিতিকে খুব ভালোভাবে গ্রহন করতে না পারলেও, মুখে একটি ভদ্রতার হাসি ঝুলিয়ে তাদেরকে বসার জায়গা করে দিতে হলো তাঁর। হাসনাইন মরিয়া ভাব করে বললো, 'জামশেদ ভাই, এবার অসম্ভব কোন অনুরোধ নিয়ে আসিনি, আপনি শুধু ঐ কেইসের খুনীর হাতের আঙুলের ছাপের সাথে এই ভদ্রলোকের হাতের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখবেন।'
'আরে! ইনিই কি সেই তোজাম্মেল না? যার সাথে আগে বারবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটা ময়াচ করেছিলো?' আশ্চর্য চেহারায় বলে যান জামশেদ।
'জ্বি বড়ভাই, ইনিই সেই ব্যক্তি। তবে এতদিন তো আমরা ম্যাচ করে এসেছি পুলিশের ডেটাবেসে তাঁর নামে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ড করা আছে সেটার সাথে, আজকে একদম ভদ্রলোকের আঙুলের থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে আবার ম্যাচ করবো।'
'কেন হাসনাইন? একই পরীক্ষা কয়বার করতে হবে তোমার?'
'এটা একই পরীক্ষা না, জামশেদ ভাই! চিন্তা করুন, যদি খুনী পুলিশের ডেটাবেস হ্যাক করতে পারে, তাহলে কিন্তু সে ডেটাবেস থেকে অদলবদল করে নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলো অন্য কারো নামে রেকর্ড করে ফেলতে পারে।'
'তা ঠিক, তা ঠিক।'
হাসনাইনের অনুমানকে সঠিক প্রমাণ করেই দেখা যায় যে খুনীর হাতের আঙুলের ছাপের সাথে তোজাম্মেলের আসল আঙুলের ছাপ কোনভাবেই মেলেনা। তারমানে, তোজাম্মেলের নামে এতদিন যে আঙুলের ছাপগুলো পুলিশের ডেটাবেসে রেকর্ড করা ছিলো সেগুলোর কোনটিই তোজাম্মেলের আসল আঙুলের ছাপ না, সেগুলো সব আসলে মিসেস বক্স আর মিসেস খন্দকারের খুনীর আঙুলের ছাপ। কয়েকটি মাত্র ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংয়ের ফলাফল দেখে মুহূর্তেই হাসনাইন, রাজু , জামশেদ আর তোজাম্মেলের -- চারজনের কাছেই পুরো রহস্যটি পানির মতো পরিস্কার হয়ে যায়।
যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং শুরু থেকেই পুরো মামলাকে ঘোলাটে করে রেখেছিলো, সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিংই আবার মামলাটিকে টলটলে পরিস্কার করে দিলো। এখন শুধু মোজাম্মেলকে ধরে এনে তার হাতের আঙুল থেকে আরকবার সরাসরি ছাপ নিয়ে খুনীর ছাপের সাথে মিলিয়ে দেখলেই হবে -- এবং হাসনাইন নিশ্চিত যে সেটা মিলে যাবে।

হাসনাইনের দলের সাথে সাথে কেন যেন জামশেদেরও খুব ভালো লাগা শুরু করে, অমন নামকরা একটা রহস্যের এত সহজ একটা সমাধান তাঁর কম্পিউটারেই হলো! তীব্র আনন্দে তিনি বাকীদের উদ্দেশ্যে বলেন, 'এখানকার একতলায় টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স ক্যাফেতে অমৃতের মতো চা বানায়, চলো খেয়ে আসি।'




পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ:

'খুনী মোজাম্মেল পুলিশের ডেটাবেস হ্যাক করে নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলো তোজাম্মেলের নামে রেকর্ড করে রেখেছিলো' নিজের এই চমৎকার সঠিক অনুমান থেকে হাসনাইন অনুমান করে যে তাহলে নিশ্চয়ই একই সময়ে তোজাম্মেলের আসল ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলোকে মোজাম্মেল তার নিজের নামে রেকর্ড করে রেখেছে। হাসনাইনের সে হিসেব মিললে দেখা যেত যে একটু আগে নতুন করে নেয়া তোজাম্মেলের আসল আঙুলের ছাপের সাথে পুলিশের ডেটাবেসে সাসপেক্ট মোজাম্মেলের নামে রেকর্ড করা আঙুলের ছাপগুলো মিলে গেছে। সেক্ষেত্রে সাসপেক্ট মোজাম্মেলকে আবার ধরে না এনেও বলে দেয়া যেত যে সেই তোজাম্মেলের সাথে নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলো অদলবদল করে রেখেছে।
তবে হাসনাইনের এই অনুমানটি ভুল হয়। যতটা কাঁচা সে মোজাম্মেলকে ভেবেছিলো ততটাই ধুরন্ধর সে। অর্থাৎ, পুলিশের ডেটাবেস হ্যাক করে সে শুধু তোজাম্মেল আর নিজের আঙুলের ছাপেরই করেসপন্ডেন্স বদল করেনি, সে এখানে আরো অনেক মজার একটি খেলা খেলেছে। তোজাম্মেলের নামে সে নিজের আঙুলের ছাপ রেকর্ড করে রেখেছে ঠিকই, তবে উল্টোপথে নিজের নামে তোজাম্মেলের আঙুলের ছাপ রেকর্ড করে রাখেনি। তোজাম্মেলের আসল আঙুলের ছাপ সে রেকর্ড করে রেখেছে নুরুন্নবী নামে এক ব্যক্তির ডেটা হিসেবে। পরদিন সকাল ছ'টার সময় নুরুন্নবীকে কিছু বুঝতে না দিয়েই নিয়ে আসা হয় থানায়, সাতটার সময় যখন নুরুন্নবী ছাড়া পেয়ে বাসায় ফিরছিলো তখন সে এটাও জেনে যায় যে তার নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্টগুলো ন্যাশনাল বায়োমেট্রিক ডেটাবেসে গত কয়েকমাস ধরে রেকর্ড করা ছিলো ছ'মাস আগে মারা যাওয়া জনৈক ভদ্রলোক জনাব ওলিউজ্জামানের নামে। ওলিউজ্জামান সাহেবকে যেহেতু আর ধরে এনে হাতের আঙুলের ছাপ নেয়া সম্ভব হয়না, তাই মোজাম্মেলের সৃষ্ট এই জালিয়াতির লাইন আর ট্রেস করা সম্ভব হয়না জামশেদের পক্ষে। কারণ, ওলিউজ্জামান সাহেবের আসল হাতের ছাপ পাওয়া না গেলে বলা যাবেনা যে তাঁর আসল আঙুলের ছাপ এখন কোন ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা আছে, এবং সেই ব্যাক্তিকে ট্রেস না করা গেলে এই অদলবদল কতদূর পর্যন্ত ঘটেছে সেটাও বের করা সম্ভব হবেনা।
জামশেদ ধারনা করেন যে, মোজাম্মেল শুধু প্রথম ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ডেটার অদলবদলটা ম্যানুয়ালি করে, যাতে তার নিজের ছাপগুলো ঠিকঠাকমতো তোজাম্মেলের নামে রেকর্ড হয়; বাকী অদলবদলগুলো হ্যাকার মোজাম্মেল করেছে দৈবচয়নে। হতে পারে সে শ'খানেক ডেটা ওলটপালট করেছে, আবার হতে পারে হাজার। এমনকি সব ডেটারও ওলটপালট হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। পরবর্তীতে পরিসংখ্যানিক জরিপ করে দেখা যায় যে প্রায় লাখ দশেক ডেটা সে ওলটপালট করে রেখেছিলো। তারমানে, মোজাম্মেলকে যদি কোনভাবে কেউ সন্দেহের তালিকায় না রাখতো, তাহলে ডেটাবেস কেলেংকারী ধরা পড়লেও সব ওলটপালট ট্রেস করে মূল অপরাধীকে ধরা সম্ভব হতোনা -- এতটাই পরিকল্পিত ছিলো মোজাম্মেলের খুনটি।
'ভাগ্যিস, সেদিন হোটেলে মোজাম্মেল ছিলো! খন্দকারের সেক্রেটারী জিনাতকে একটা বিশেষ ধন্যবাদ দিতেই হবে।' সব রিপোর্ট পেয়ে মনে মনে ভেবেছিলো হাসনাইন। মামলার রায়ে মোজাম্মেলের কপালে শুধু ডাবল মার্ডারের কারণে না, এরই সাথে নিরপরাধ লিককে ফাঁসানোর অপচেষ্টা আর কয়েকশো কোটি টাকা খরচে তৈরী রাষ্ট্রীয় তথ্যভান্ডার নষ্ট করার শাস্তিও জুটে যায় -- সব মিলিয়ে তিনটি ফাঁসির আদেশের সাথে সাথে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেয় আদালত। নিদেনপক্ষে ওয়ালীবক্স আর নাজমুল খন্দকারের দেয়া বিশ বিশ মোট চল্লিশলাখ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা হয়।


মোজাম্মেলের বাসা আর অফিস সার্চ করে কিছু পাওয়া না গেলেও, তার গাড়ীর ট্রাংকে বুটের ভেতরে হিলের মতো করে পরার জন্য কাঠের তৈরী বিশেষ বস্তুটি পাওয়া গেলো। যদিও কোথাও ফেলে দেবার প্রস্তুতিতেই গাড়ীর ট্রাংকে রেখেছিলো, তবে মামলার মোড় অভাবনীয় দিকে ঘুরে যাওয়ায় ফেলি ফেলি করেও আর ফেলা হয়নি!


ঘটনার কিছুদিন পরে একদিন অফিস ক্যান্টিনে গলা ছেড়ে দিয়ে পুলিশের আইটি সিকিউরিটির কাজল ভাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে রাজু বলে, 'বেশী বেশী ডিএনএ ব্যাংক আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেটাবেস তৈরী করার আগে আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্টের যেটা করা লাগবে সেটা হলো ওয়াইম্যাক্স দিয়ে কেউ যেন যখন তখন সেই ব্যাংক বা ডেটাবেসে না ঢুকে পড়তে পারে সেই ব্যবস্থা করা।' জুনিয়রদের সাথে এ নিয়ে হাসতে হাসতে রাজু প্রত্যক্ষ করে ডাইনিংয়ের এক কোণায় করজোড়ে হাসনাইনের হাত ধরে রেখে কৃতজ্ঞতায় গদগদ চেহারায় কি যেন বলছে বদমেজাজী স্পেশাল ফোর্স অফিসার আজগর হোসেন; 'চামে চামে তিনটা মাস খাইস্টা লোকটা ছুটি কাটাইয়া নিলো!' ঊষ্মার সাথে বলতে বলতে আবার আসর মাতিয়ে তোলে রাজু।


মোজাম্মেলের সাথে চাঁদাবাজী বিষয়ক মিথ্যে গল্প ফাঁদার কারণে ধরা পড়ে যান নাজমুল খন্দকার, স্ত্রী হত্যার ইন্ধন যে তিনি জুগিয়েছেন সেটা পরবর্তীতে প্রমাণ হয়ে যায় তাঁর নিজের দেয়া অসংলগ্ন জবানবন্দীতেই, সব স্বীকার করে নেন তিনি; তাঁর পঁচিশ বছরের জেল আর দশ কোটি টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরো ত্রিশ বছরের জেল) হয়। তবে ওয়ালী বক্সকে কোনভাবেই দোষী প্রমাণ করা যায়নি। হাজার জেরা, নির্যাতন, অত্যাচার আর শাস্তি কমানোর লোভের মুখেও সেই কেইসের ইন্ধন নিয়ে সামান্যও মুখ খোলেনি মোজাম্মেল; বারবারই সে বলেছে যে, অবশ্যই সে হিটম্যান হিসেবে খুনটি করেছে, তবে কার নির্দেশে সে খুনটি করেছে তা সে কোনভাবেই বলতে পারবেনা। সে দাবী করে যে, এটা তার প্রফেশনাল এথিক্স, যতই শাস্তি বাড়ুক এখানে সে কম্প্রোমাইজ করবেনা। তবে এই সহযোগিতাটুকু না করার কারণে যে তার শাস্তির পরিমাণ বেড়েছে তাও নয়, তার আগের পাপগুলোই একজীবনে যথেষ্ট শাস্তি পাবার জন্য যথেষ্ট।


তোজাম্মেলকে কেন ফাঁসাতে গেলো মোজাম্মেল -- এই রহস্যের কোন কুল কিনারা করতে পারেনি হাসনাইন বা অন্যেরা অনেকদিনই। এই ব্যাখ্যা সহসা জানাও যায়না, হাসনাইন তা জানতে পারবে আরো বছর দশেক পরে, যখন মৃত্যদন্ডের আগের সন্ধ্যায় তার সাথে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করবে ডাবল মার্ডার আসামী মোজাম্মেল হক।
তবে দশ বছর অনেক লম্বা সময়, আপাততঃ সে মোজাম্মেলের সে গল্প তোলা থাকুক; তার আগে গোয়েন্দা হাসনাইনের আরো অনেক রহস্য সমাধানের গল্প আমরা শুনতে পারবো।


(সমাপ্ত)

সচলায়তন ব্লগে সুহান রিজওয়ানের লেখা গল্প 'ডিটেকটিভ'(http://www.sachalayatan.com/shu77han/26532)র প্লটটির উপর ভিত্তি করে লেখার একটা প্রচেষ্টা ।

বরাবরের মতো এ গল্পটিতেও নানান বিদেশী গল্পের ছায়া পাওয়া যাবে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29023025 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29023025 2009-10-09 17:18:58
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স - পর্ব ৮, ৯ পর্ব ১, ২ (Click This Link)
পর্ব ৩, ৪ (Click This Link)
পর্ব ৫, ৬(Click This Link)
পর্ব ৭(Click This Link)


৮.
সপ্তপুরী হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট থানা থেকে হেঁটে দশ মিনিটও হবেনা। অথচ এই অল্প সময়টুকুতেই হাসনাইনের মাথার ভেতরে রীতিমতো যুদ্ধ চলতে থাকে, পুরো ঘটনার চর্বিত চর্বন তাকে অস্থির করে ফেলে যেন। নিজের অনুমানগুলোর সূতো ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে একটার সাথে আরেকটি মেলানোর চেষ্টায় রত হাসনাইনকে দেখে হঠাৎ অন্য কোন মানুষ বলে ভ্রম হয় হয় রাজুর। যদিও তোজাম্মেল ছাড়া পাবার পর পুরো কেইসটি প্রায় জিরোপয়েন্টে ফিরে আসে এবং সেখান থেকে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখে একটি ভৌতিক ব্যাখ্যায় রূপ নিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলো, তবুও হাসনাইনের কাছে কেইসটি কিন্তু কখনোই একেবারে শূণ্যে ফিরে যায়নি। বরং খুনী বা খুনীচক্র সম্পর্কে একটি খুব নিশ্চিত সিদ্ধান্তে সে পোঁছাতে পেরেছিলো, যেটা হলো, 'অপরাধীরা অত্যাধুনিক টেকনোলজীর বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির সাথে খুব ভালোভাবে পরিচিত'। কারণ, বাংলাদেশে যা তা ধরনের অপরাধীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নকল আইপি ফোন নাম্বার তৈরী করে দেশী মোবাইল নেটওয়ার্কে ফোন করতে যে পারবেনা -- এব্যাপারে সে নিশ্চিত।

হাসনাইনের ভাবনাটা ছিলো এরকম -- খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেলের দাবী করা চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব যদি সত্যিই থেকে থাকে, এবং সে চাঁদাবাজরাই যদি খুন করে থাকে ভদ্রমহিলাদ্বয়কে, তাহলে এটা নিশ্চিত যে অপরাধীরা আই টি টেকনোলজীর সাথে আপডেটেড। আর যদি চাঁদাবাজদের কাহিনীটি খন্দকার-মোজাম্মেল চক্রের বানানো কোন ঘটনা হয়, তাহলে যা বুঝতে হবে তা হলো, খন্দকার-মোজাম্মেল চক্র নিজেরাই টেকনোলজীর সাথে আপডেটেড। কারণ খন্দকারের মোবাইলে আসলেই এমন সব নাম্বার পাওয়া গেছে যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তাই চাঁদাবাজরা বাস্তবে থাকুক আর না থাকুক, অপরাধী যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে কোন বাঁধা থাকার কথা না। এই সিদ্ধান্ত থেকেই খুনের ঘটনার কুশীলবদের মাঝ থেকে হাসনাইন মনে মনে খুঁজছিলো সেই লোকটিকে যে হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি ও সমমানের টেকনোলজীর সাথে খুব বেশী আপডেটেড।

কুশীলবদের সবাইকে তাই এক এক করে ব্যবচ্ছেদ করে চলেছে গত দেড়মাস ধরে, শহরের চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক ব্যুৎপত্তির ওপর তথ্য সংগ্রহ করেছে, মামলার ফাইলপত্র বারবার ঘেঁটে দেখেছে, কোন ক্লু বের হয় কিনা তা দেখার জন্য। কোন ক্লু না পেয়ে হাল ছেড়ে দেবার মতোই যখন অবস্থা, তখনই ভেসে উঠলো ছোট্ট সেই কাগজের টুকরো, যেটি পকেটে পুরে রাজুকে নিয়ে এক কাপ চা খেয়ে মাথা ঠান্ডা করার জন্য সে এখন সপ্তপুরী হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের পথে। গত কয়েকসপ্তাহ ধরে কিছু একটা খুঁজছিলো সে মনে মনে, কিন্তু বুঝতেও পারছিলোনা যে আসলেই সে কি খুঁজছে। সেই জিনিসটি এভাবে নিজে নিজেই ধরা দেয়ায় নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে করতেই হঠাৎ মামলাটির সমাধানের ব্যাপারে সে বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

রাজুকে নিয়ে সপ্তপুরীতে ঢুকতে দেখা যায় সেই আত্মবিশ্বাসী (যদিও চিন্তামগ্ন) হাসনাইনকে। সপ্তপুরী নামটিতে বেশ কাব্যিক বা সাহিত্যিক আমেজ থাকলেও, মূল নামকরণের পেছনে সেরকম কোন ইতিহাস নেই। স্রেফ সাত ধরনের স্বাদের পুরী তৈরী হয় এখানে, আর সেখান থেকেই এই নামকরণ। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গোটা দশেক পুরী আর দুই মগ চা অর্ডার করে বিল না দিয়েই টেবিলে চলে আসে হাসনাইন, ল্যাপটপ খুলে বসে, কিছুক্ষণ পর বয়কে ডেকে বিরক্তকন্ঠে বলে, 'তোমাদের রেস্টুরেন্টগুলোতে ওয়াইম্যাক্স ব্যবহার করা যায়না?'

'যাইবো, আগামী মাস থেকা যাইবো।' হেঁয়ালী উত্তর বয়ের।

'ঐ ব্যাটা, ওয়াইম্যাক্স কি বুঝস?' বলতে ইচ্ছে হয় হাসনাইন, বলেনা, পাছে ছেলেটি আবার বলে বসে, 'আমি না বুঝলে আমারে জিগান ক্যা?'। বিনিময়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি ফেরত দেয় হাসনাইন।

ছেলেটি কি বুঝে কে জানে, টেবিলে রাখা অন্ততঃ সাত-আটটা পানির গ্লাস মুহূর্তের মধ্যে একহাতে চমৎকার কায়দায় সরিয়ে নিয়ে বলে, 'স্যার দাঁড়ান, ফিল্টার করা ঠান্ডা পানি আনতাছি।'

হাসনাইনের বিল না দিয়ে চলে যাওয়ার আচরণে খানিকটা বিরক্ত হয় রাজু, মাস-শেষের এই টানাটানির সময়েও পঞ্চাশ টাকার বিল তাকেই মেটাতে হয় এবারের মতো। 'যত ছোটখাটো আহারপর্বই হোক, খেতে ডেকে এনে বিল দিলেননা হাসনাইন ভাই, এটা কেমন আচরণ হলো' ভাবতে বাধ্য হয় রাজু। তবে সাথে সাথে এটাও চিন্তা করে, যেরকম এক রহস্যময় মামলা নিয়ে বেচারা হাসনাইন ভাই উঠে পড়ে লেগেছেন, তাতে বেশ স্ট্রেসের মধ্য দিয়ে যে তিনি যাচ্ছেন তা তো বলাবাহুল্য। হয়তো খাবার অর্ডার দেয়ার পর বিল নামক একবস্তু দিতে হয়, সেটাই তাঁর মাথায় নেই। তারপরও টেবিলে এসে হাসনাইনকে একটু খোঁচা দেবার জন্যই তার চোখের সামনে বিলের রিসিপ্টটি মেলে ধরে রাজু, বলে, "দেখেন সামান্য নাস্তায়ও এখন পঞ্চাশ টাকা লাগে"।

'হুমম, বেশী তো না', বলে নির্বিকারভাবে রিসিপ্টের কাগজটি হাতে নেয় হাসনাইন; ছোট্ট একটা কাগজ -- ছাপার অক্ষরে সুন্দর করে কেনাকাটার যাবতীয় তথ্য তাতে সাঁটা; কি কি কেনা হয়েছে, কত টাকা জমা নেয়া হয়েছে, কত ফেরত দেয়া হয়েছে -- সব। একটু উপরের দিকে তারিখও লেখা আছে।
কৌতুহলী চোখে রাজুকে জিজ্ঞেস করে হাসনাইন, "আচ্ছা, রাজু, এই যে কোন কিছু কিনলে আমরা একটা রিসিপ্ট পাই, সেটাতে যে কেনাকাটার দিনতারিখ, সময় এসব লেখা থাকে তা কি তুমি খেয়াল করেছ কখনও?"

"জানি যে লেখা থাকে, তবে কে খেয়াল করে বলেন? এত পিচ্চি একটা কাগজ! আমার তো মনে হয় অধিকাংশ মানুষ এটা জানেও না যে রিসিপ্টের মধ্যে কেনাকাটার তারিখ বা সময়কাল লেখা থাকে।"

"ঠিক, যেমন এই সপ্তপুরী হোটেলের রিসিপ্টে তারিখ লেখা থাকলেও, ক'টার সময় কেনাকাটা হয়েছে সেটা লেখা নেই। এখানে ওয়াইম্যাক্সও ব্যবহার করা যায়না।"

রাজু ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা হাসনাইন কেন হঠাৎ রিসিপ্ট নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, আর ওয়াইম্যাক্স দিয়েইবা উনি এই দশ মিনিট এখানে কি করবে! যদিও হাসনাইনের কথায় কথায় ওয়াইম্যাক্সকে টেনে আনার অভ্যাসের সাথে সে ইতোমধ্যে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

হঠাৎরাজুকে চমকে দিয়ে বুকপকেট থেকে ভিনাইল প্যাকেটের ভেতর জব্দ করা একটি কাগজের টুকরো বের করে আনে হাসনাইন, রাজুর সামনে টেবিলের ওপর রেখে বলে, "কিন্তু দেখো মিঃ রাজু আহাম্মেদ, এই রিসিপ্টে, এটা অরিয়ন ক্লাবের লাউঞ্জক্যাফের রিসিপ্ট, নাম রেইবো, এ্যান্ড ইউ সি, এতে কিন্তু সময়ও উল্লেখ করা আছে।"

"হুমম, তাইতো দেখা যাচ্ছে", রাজু আর কথোপকথনে আগ্রহ পায়না।

"এখন আমাকে বলো", হাসনাইন রীতিমতো উত্তেজিত, "কেউ যদি তার এ্যালিবাই হিসেবে এরকম একটি রিসিপ্টকে উপস্থাপন করে, তার সম্পর্কে আমরা কি ধারনা করতে পারি?"

"কত কিছুই তো ধারনা করা যায়! যেমন সে হয়তো ঐ রেস্টুরেন্টে আগে চাকুরী করতো, তাই রিসিপ্টে সময়ের উল্লেখের ব্যাপারটা সে জানে। অথবা গিয়ে দেখুন সেই হয়তো সফটওয়্যারটা বানিয়েছে।"

"সেটাই!" হাসনাইন লুফে নেয় রাজুর কথা, "সেই লোক সফটওয়্যারটা বানাক বা না বানাক, এটা বলা যায় যে এসব আইটি সিস্টেম বা তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে তার মোটামুটি জানাশোনা আছে, ঠিক?"

"হুমম, এটা ঠিক। কারণ আই.টি সম্পর্কে ভালো আইডিয়া না থাকলে এটা মাথায় আসার কথা না। যেমন আমি নিজেও এরকম সমস্যায় পড়লে এই রিসিপ্ট দেখিয়ে যে এ্যালিবাই দাঁড় করানো যায় তার কথা ভাবতে পারতামনা হয়তো।" রাজুর কথায় সমর্থনের সুর।

"তুমি কি জানো অরিয়ন ক্লাবের এই রিসিপ্টটা কার এ্যালিবাই?"

"না"

"এই তোমার সমস্যা! তুমি কেইসফাইল থরোলি পড়োনা! মোজাম্মেল, বুঝলে, মহান গোয়েন্দা মোজাম্মেলের এ্যালিবাই এটা।" হাসনাইন গলার স্বর নীচু করে আনে, বলে যায়, 'দুই মিসেস হত্যাকান্ডের আশপাশের কুশীলবদের মধ্যে এই একজনকেই আমার কাছে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে পারদর্শী বা মোটামুটি জানে এমন মনে হচ্ছে।"

"কিন্তু স্যার, মোজাম্মেলকে নিয়েও তো সমস্যা তো সেই আঙুলের ছাপই! তারওপর সিসিটিভির ফুটেজে দেখেছেন, আমি তো দিব্যচোখে দেখেছি, খুনীর উচ্চতা পাঁচফিট দশের কম না। সেখানে মোজাম্মেল তো পাঁচফিট চার বা বড়জোর পাঁচ হবে!"

"হ্যাঁ সেটা ঠিক। তারপরও! মোজাম্মেলকে আমি সন্দেহের বাইরে রাখছিনা। হতে পারে সে থার্ডপার্সন হিটম্যানকে মূল খুনের কাজে লাগিয়েছে। তবে কুশীলবদের মধ্যে আইটি বিষয়ে তাকেই যেহেতু আমাদের সবচেয়ে জ্ঞানী মনে হচ্ছে, তাই এখন থেকে আমাদের কাজ হবে মোজাম্মেলের ওপর চোখ রাখা। চলো অরিয়ন ক্লাবে চলো।"

"অরিয়ন ক্লাব?"

"হ্যাঁ, মোটামুটি প্রায় প্রতিদিনই মোজাম্মেল অরিয়ন ক্লাবে আসে, এখবর আমি পেয়েছি। এখন চলো আমার সাথে, আর এক মুহূর্তও দেরী করা যাবেনা!"


একরকম টেনেহিঁচড়ে রাজুকে নিয়ে চলে হাসনাইন, রিক্সায় করেই যায় তারা, এবং অবশ্যই সিভিল ড্রেসে; মিনিট চল্লিশের মধ্যেই পৌঁছে যায় অরিয়ন ক্লাবে। সরাসরি একতলার রেইনবো ক্যাফেতে গিয়ে আশেপাশে সতর্কভাবে চোখ বুলায় হাসনাইন; নাহ, কোথাও মোজাম্মেল বা দেখতে তার মতো কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। দিনটি ছিলো শুক্রবার, এদিনের সন্ধ্যায় ক্লাব সদস্যরা অনেকেই সপরিবারে ক্লাবে আড্ডা দিতে আসেন; সে হিসেবেই হয়তোবা, ক্যাফের যেদিকে চোখ যায় শুধু সুদর্শনা তরুণীদের ছড়াছড়ি। নানান ঢংয়ের সুন্দরীদের দেখতে দেখতেই একটি খালি দুইসীটের টেবিল পেয়ে বসে পড়ে হাসনাইন আর রাজু, চেয়ারে ব্যাগ রেখে দুজনই উঠে আসে কাউন্টারের দিকে। এসব ক্যাফেতে সপ্তপুরী টাইপের "হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টে"র মতো বয় বা ওয়েইটার থাকেনা, কাউন্টার থেকে নিজেদেরই খাবার আনতে হয়। রাজু আর হাসনাইন একটি করে ম্যাঙ্গো জুসের অর্ডার দেয়, কাউন্টারের বিশ বছর বয়েসী ছেলে কামাল বেয়াদবের মতো করে বলে বসে, "স্যার আর কিছু নিবেননা? এখানে তো সবাই ড্রিংকসের সাথে কমবেশী খাবারটাবারও নেয়।"

রাজুর ইচ্ছে হয় কাউন্টারের ওপাশ থেকে ছোকড়াকে টেনে বের করে এনে চটাশ চটাশ দুটো থাপ্পড় লাগায়, তবুও কোনমতে রাগ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে সে।

অবশ্য দমন করতে পারার আরো কারণ ছিলো; প্রথমতঃ আশি টাকার বিলটা এবার হাসনাইন ভাই দিয়েছেন, আর দ্বিতীয়ত ঠিক সেমুহূর্তেই কামালের দৃষ্টি অনুসরণ করে রাজু ডানদিকে কয়েকফুটের মতো দূরত্বে এক চপলা উচ্ছলা সুন্দরীর অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক হয়ে পড়ে, যার সামনে কামালের মতো একটা সামান্য ছোকড়াকে পিটিয়ে 'ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ' না করাই ভাল বলে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় সে। বলাবাহুল্য, শুধু রাজুই নয়, ক্যাশের কাজের ফাঁকে ফাঁকে কোনভাবেই নিজের দৃষ্টিকে সামলাতে না পারা কামালের চোখ অনুসরণ করার ফলাফল হিসেবে যুগপৎ হাসনাইনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলে সেই উদ্ভিন্নযৌবনা ঊর্বশী।

এ নারীর সৌন্দর্য্যের বর্ণনা হাসনাইনের মতো কাঠখোট্টা গোয়েন্দার পক্ষে দেয়া সম্ভবনা, এবং সে কারণেই গল্পের লেখকও সে বর্ণনার সাহস করছেননা এখানে। রবিঠাকুর বা নিদেনপক্ষে আহমদ ছফাকে এখানে লাগতো যথাযথ বর্ণনার জন্য। হাসনাইন শুধু এটুকু বলতে পারে যে আশপাশের আর চৌদ্দজনের চেয়ে এ নারীর সৌন্দর্য যে আলাদা একটি আবহ বা চার্ম তৈরী করেছিলো তার কারণ সম্ভবতঃ তরুণীর ঈর্ষণীয় উচ্চতা আর শরীরের অসামান্য বাঁকগুলো, বিশেষ করে যখন তিনি হাঁটেন, যেন রূপসাগরে ঢেউ ওঠে। এটুকু বোঝার পরই হাসনাইন মেঝের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে নেয়, উচ্চতা ও বাঁকের বিস্তৃতির রহস্য সমাধান হয়ে যায় নিমিষেই, দেখা যায় যে মেয়েটির পায়ের হিলের উচ্চতা নিদেনপক্ষে ছয়ইঞ্চি; যদিও পরবর্তীতে নানান সময়ে এ নারীকে নিয়ে সংঘটিত আলোচনা বা আড্ডায় রাজু সবসময়ই দাবী করেছে যে ঐ হিলের উচ্চতা আট ইঞ্চির চেয়ে এক মিলিমিটারও কম তো হবেইনা, এমনকি কেউ যদি দাবী করে ওটা একফুট হলেও হতে পারে, তার কথাকেও সে এমনি এমনি উড়িয়ে দেবেনা। তবে উচ্চতা যাই হোক, এই সুউচ্চ হিলই যে তরুণীর প্রতিটি পদক্ষেপে শরীরের বাঁকগুলোকে অনেক বেশী আকর্ষণীয় করে তুলছিলো সেটা হাসনাইনের সাথে সাথে রাজুরও বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি।

পুলিশের ডিটেকটিভ হোক আর যাই হোক, প্রথমতঃ তারা দুজনই মানুষ। অল্পসময়ের জন্য হলেও অরিয়ন ক্লাবে এসে মোজাম্মেলকে না পাওয়ার দুঃখ ঘোচে মূলতঃ ঊর্বশী-দর্শনে এই দু'যুবকের, মাথা ঠান্ডা করে একমাত্র অর্ডার করা ম্যাঙ্গোজুসও পান করে ফেলে তারা। এর মধ্যে দুজনই যে বারকয়েক আড়চোখে বা খানিকটা ঘাড় হেলিয়ে-দুলিয়ে-বাঁকিয়ে তরুণীটিকে দেখেনি বা দেখার চেষ্টা করেনি, তাও না। অজ্ঞাত কারণেই বারবার হাতঘড়িতে সময় চেক করতে দেখা যায় রাজুকে, হাতঘড়ির ডায়ালটিকে মুখের সামনে ধরে অদ্ভুত কায়দায় এত সময় দেখার কি আছে, আশপাশের টেবিলা বসা কোন ভাবুক খদ্দের হয়তো চিন্তিতও হয়ে পড়ে। মেয়েটিও যেন বুঝতে পেরেছে যে সুদর্শন এই দু'জন যুবক ঠিক এমুহূর্তে কোন কারণে এতটা আলোড়িত, কেন হাতঘড়ি চোখের সামনে তুলে ধরাটা এত প্রয়োজন এই সময়ে, এবং সত্যি বলতে কি, দুই সুদর্শনের কান্ডকারখানা সে মুহূর্তে যথারীতি সুদর্শনার জন্য উপভোগ্যও ছিলো বটে। সম্ভবতঃ সেজন্যই, তাকেও বারবার দেখা গেলো যে কারণে অকারণে নিজেদের টেবিল ছেড়ে হাসনাইনদের টেবলের পাশ দিয়ে কাউন্টারের দিকে হেঁটে চলে যেতে; কখনও বাড়তি সস আনতে যায় তো, কখনও গার্বেজে টিস্যু পেপার ফেলতে! আর প্রত্যেকবার যখন সে পাশ দিয়ে যায়, তখন ঝুঁকে ঝুঁকে ঢেউ তোলা তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপই দুই গোয়েন্দার হৃদকম্পনে বাড়তি ঢেউ তুলে ৎসুনামীর আয়োজন করে ফেলে যেন। তবে এরকম ৎসুনামীতে সব দিশা হারাতে হারাতেও ঠিক কিভাবে যেন সেই দিশাকে আবার হাতের মুঠোয় ধরে রাখতে পারে হাসনাইন, এবারও তার ব্যতিক্রম তো হলোইনা, বরং দিশা যেন জাগ্রত হলো। কোমরে ঢেউ তুলে মেয়েটি টেবিলের পাশ দিয়ে চলে যাবার মুহূর্তেই মাথায় যে শব্দটা খেলে গেলো তা 'ঢেউ', 'এই ঢেউয়ের উৎস কোথায়?' এহেন কাব্যিক প্রশ্নও জাগলো মনে; এবং পরমুহহুর্তেইএই প্রশ্নজনিত ভাবালুতা থেকে যখন বাস্তবে প্রবেশ করলো পেশায় গোয়েন্দা হাসনাইন, তরতর করে খুলে গেলো আরেকটি জট; 'হালেল্লুয়া' হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে হাসনাইন, "রাজু, রাজু, ইউরেকা! সব মিলে যাচ্ছে। চলো দেরী করা যাবেনা! ওয়াই ম্যাক্স, বুঝলে সবকিছুর মূলে ঐ ওয়াই-ম্যাক্স!"

কাউন্টারের দিকে ছুটে যেতে যেতে রাজুর হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁজে দেয় হাসনাইন, ফিসফিস করে বলতে থাকে, 'সপ্তপুরীর বিল।'

(চলবে)

(চলবে)
*********************************************
সচলায়তন ব্লগে সুহান রিজওয়ানের লেখা গল্প 'ডিটেকটিভ'(http://www.sachalayatan.com/shu77han/26532)র প্লটটির উপর ভিত্তি করে লেখার একটা প্রচেষ্টা ।

বরাবরের মতো এ গল্পটিতেও নানান বিদেশী গল্পের ছায়া পাওয়া যাবে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29022463 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29022463 2009-10-08 15:50:18
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স - পর্ব ৭ পর্ব ১, ২ (Click This Link)
পর্ব ৩, ৪ (Click This Link)
পর্ব ৫,৬(Click This Link)



কার্পেটে পড়ে থাকা রিমোট কন্ট্রোলারের ব্যাটারীর খাপ আর মেঝেতে পড়ে থাকা ব্যাটারীকে সংযোগ করে যেদিকে চলে যাওয়া যায় সেপথে ইঁদুরের আনাগোনা খেয়াল করে এতক্ষণ ধরে অজানা কারণে মনের ভেতর কুটকুট করতে থাকা 'রিমোট কন্ট্রোলারটির অবস্থান' সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্য অনুমান হাসনাইন করতে পারে, যেটিকে সঠিক প্রমাণ করে সিংকের নীচেই পড়ে থাকতে দেখাও যায় রিমোট কন্ট্রোলারটিকে, যদিও ক্ষতবিক্ষত; প্লাস্টিকের বোতামগুলোর প্রত্যেকটির ওপর যথারীতি ইঁদুরকুলের সরু সরু ধারালো দাঁতের নানাবিধ আঁচড়ের স্পষ্ট সাক্ষ্যও সহজে মিলে যায়। তবে এই কেঁচো খুঁড়তে গিয়েই যে অত বড় একটা সাপ বের হয়ে আসবে সিংকের নিচ থেকে, তা হাসনাইন বা রাজু, দু'জনের কেউই কল্পনাও করতে পারেনি; আর হাজতকক্ষে বসে দূর্ভাগ্যের কষাঘাতে বিমূঢ় হয়ে যাওয়া তোজাম্মেল নামের লোকটির বেলায় সেরকম কোন কল্পনা যে আরো দুরূহ ছিলো সেটাও আর ভেঙে বলার দরকার নেই। তবে এখানে উল্লিখিত কেঁচো খুড়তে গিয়ে পেয়ে যাওয়া সাপটি কোনভাবেই ইঁদুরখেকো কোন জীবিত সাপ নয়, সেটা শুধুই একজোড়া জুতো, আরো ভেঙে বললে একজোড়া কালো বুট, মামলা আর তোজাম্মেলের জন্য যেটা এইমূহুর্তে প্রায় অমূল্য এক বস্তু।

সেই অমূল্য বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হাসনাইন ভাইকে চা খেতে যেতে বলবে কি বলবেনা, এই নিয়ে রাজুর মনের ভেতর যতক্ষন খানিকটা ইতস্তঃত চলছিলো, ততক্ষণে হাসনাইনের হাতে ধরা তোজাম্মেলের সেই ট্রেডমার্ক বুটজোড়া থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে অন্ততঃ পাঁচটি ইঁদুর বেরিয়ে নিচে নেমে যায়। টুপ করে মেঝেতে পড়েই হাওয়া হয়ে যাবার একটা অসাধারণ ক্ষমতা এদের। জুতোর সামনে পিছনে এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ইঁদুরে কাটার দাগ দেখা যায়না; ওদিকে সেন্ট্রির নিয়ে আসা টর্চলাইটের কল্যানে বুটের ভেতরটা দেখে যা বোঝা যায়, তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায় যে সুখের সংসার ইঁদুরেরা গড়ে আসছে অনেকদিন ধরেই। জোড়া কালোবুট হাতে ধরে রাখা অবস্থাতেই হাসনাইন রাজুকে বলে ক্যামেরা নিয়ে আসতে, আর সেন্ট্রীকে বলে জুতোজোড়াকে ভেতরের ইঁদুরকুলসহই জব্দ করার ব্যবস্থা করতে। ইঁদুরেরা মানুষের কথা বুঝতে পারে কিনা জানা যায়না, তবে হাসনাইনকে অবাক করে দিয়েই তার কথা শেষ হতে না হতেই কালোবুটজোড়ার মুখ থেকে বেরিয়ে এক পলকে কিচেনের মেঝেতে টুপ করে পড়ে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায় ভেতরে আটকা পড়ে থাকা শেষ দুটো বাচ্চা ইঁদুর।

তোজাম্মেলের বুটজোড়া পুলিশের সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন টিমের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয় সাথে সাথেই; তারা নিশ্চিত করে যে, ওগুলোতে অন্ততঃ বছরখানেক ধরেই ইঁদুরের নিরুপদ্রব বসবাস চলে আসছে, এবং জেরার সময় তোজাম্মেলের দাবীমতে গত বছর বৈশাখী মেলার পর থেকে যে সেটা তার আর পরা হয়নি এ তথ্যটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। এখন এই ক্লুতে এসে তোজাম্মেলের অপরাধী হবার সম্ভাবনা অনেক কমে গেলেও তার আঙুলের ছাপের ব্যাপারটা নিয়ে অনিশ্চয়তাটা জিইয়েই থাকে। তাকে পুরোপুরি নিরপরাধ ঘোষনা দেয়া যায়না, এমনতো হতে পারে কারো থেকে ধার করে বুট পরে সে খুন করতে গিয়েছিলো, যদিও সেক্ষেত্রে ঐ বুট পরার এমন কি প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব ছিলো তা বিতর্কের বিষয় হিসেবে চলে আসতে পারে। তবে পুলিশের তদন্ত সবসময় যুক্তিতর্কের ওপর চলেনা, তাদের নিশ্চিত তথ্য চাই। সেজন্যই পরের তিনদিন ধরে তোজাম্মেলের ঘরে বেশ কয়েকবার তল্লাশী চলে তার ট্রেডমার্ক কালো রঙের সেই বুটের মতো আর কোন বুটজোড়া পাওয়া যায় কিনা সেটা দেখার জন্য, এবং নিশ্চিতভাবেই সেরকম আর কোন বুটজোড়া পুলিশ বের করতে পারেনি।

তাছাড়া তোজাম্মেলের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে শুধু হাসনাইন আর রাজু নয়, বরং পুরো পুলিশ টিমেরই যে ধারনা হয়েছে, তাতে এটা বোঝা যাচ্ছিলো যে শখ করে অমন দামী বিদেশী বুট আরেক জোড়া কেনার বা কিনিয়ে আনানোর কোনটিরই সামর্থ্য তোজাম্মেলের বেশ কয়েকবছর ধরেই ছিলোনা। তারপরও আরো বেশী নিশ্চিত হবার জন্য পুলিশের সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন টিমের লোকজন এসে ওয়াজী লেনের তোজাম্মেলের ভাড়াবাড়ীর সিঁড়ি আর সামনের গলির পথ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে একইরকম বুটের ছাপ পাবার জন্য; যথারীতি সেখানেও তারা কিছুই পায়নি।

তোজাম্মেলকে মোটামুটি নিরপরাধ হিসেবে ধরে নেয় হাসনাইন আর রাজু, তবে শুধু ইঁদুরে কাটা বুটজোড়া আঙুলের ছাপকে ছাপিয়ে ততবেশী জোরালো প্রমাণে পরিণত হতে পারেনা। সেজন্য হাতের আঙুলের ছাপ মিলে যাওয়ার ব্যাপারটা সমস্যা হিসেবে থেকেই যাচ্ছিলো, সেটার কোন কিনারা বা ব্যাখ্যা করতে পারছিলোনা পুলিশের কেউই; সবার কথা বুট পাওয়া যাক বা না যাক, অন্ততঃ আঙুলের ছাপের ব্যাপারটা তো স্পষ্টই বলে দিচ্ছে খুনী হচ্ছে তোজাম্মেল।

এসব আলোচনা আর তর্কের প্রেক্ষিতেই তোজাম্মেলের মুখ থেকে কিছু বের করা যায় কিনা সেব্যাপারে শেষ চেষ্টা চালায় ডিবির অন্য অফিসাররা। তিনদিন ধরে মুখ খোলানোর যাবতীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করে যায় তারা। বুটজোড়া আবিস্কার করে হাসনাইন নিশ্চয়ই কল্পনাও করেনি তোজাম্মেলের জন্য 'কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বের হয়ে আসা সাপ'ধরনের এই ত্রাতাবস্তুটি আসলেই সাপ হয়ে অবতীর্ণ হবে, আগামী তিনদিনের যাবতীয় নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে! তবে নির্যাতন যতই করা হোক, কোনো লাভ হয়নি আদতে, কারণ, মারের চোটে গোটা কয়েকবার তোজাম্মেলকে "খুন করেছি" বলে স্বীকার করতে হলেও, তার পরপরই যখন কি জন্য খুন করেছে বা কিভাবে এবং কার নির্দেশে খুন করেছে বা খুন করে কত পেয়েছে এসব জিজ্ঞেস করা হয়েছে তখন বেচারার একেকবার একেক জবাব দিয়ে আপাততঃ সে সময়কার হাড়ভাঙা পিটুনির হাত থেকে রেহাই পাবার প্রচেষ্টার বাইরে কিছু করার ছিলোনা।

যেমন একবার পিটুনির চোটে বলেছিলো মিসেস খন্দকারকে খুন করার জন্য পেয়েছে দশ কোটি টাকা, যদিও সেই দশকোটি টাকা কি করেছে তার জবাবে তার 'মনে নাই' বলা ছাড়া আর কিছু করার ছিলোনা। আরেকবার সকালে বলেছে সাত লাখ পঁয়তাল্লিশহাজার চুরাশি টাকা নিয়েছে, এবং বিকেলেই সেই একই লোকের জেরায় বলছিলো যে মোট টাকা থেকে দশ লাখ সে নিজের ব্যাংকে রেখেছে (যদিও ব্যাংকের নাম সে সেমুহূর্তে কোনভাবেই মনে করতে পারছিলোনা), বাকী পাঁচলাখ তেত্রিশ হাজার উনত্রিশ টাকা দিয়ে দেনা শোধ করেছে। তার দেয়া এসব এলোমেলো আর অসংলগ্ন জবানবন্দীর সবকিছুই নির্ভর করছিলো ঠিক সে সময়ে চরম নির্যাতনের মুখে যেসব শব্দ সে স্মৃতি খুঁড়ে বের করতে পেরেছে সেসবের ওপর। সবমিলিয়ে মূলতঃ কোন ক্লুই সে দিতে পারছিলোনা পুরো খুনের পরিকল্পনার ব্যাপারে। প্রথমে এসবকে মস্করা হিসেবে ধরে নিয়ে পুলিশ পাটানোর মাত্রা বাড়িয়ে দিলেও, ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে যে আসলে লোকটা কোন সংখ্যাই জানেনা, একেবার মার খেতে খেতে যখন আর পারেনা তখন একটা সংখ্যা বলে মার খাওয়ার হাত থেকে বাঁচে। এমনকি মারধোর আর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে পুলিশ এটাও মোটামুটি ধারনা করতে পারে যে তোজাম্মেল আসলে নিহত মিসেসদ্বয়ের কাউকেই কখনও দেখেনি।

এদিকে খুনের মোটিভ বা উদ্দেশ্য বের করার জন্য পুলিশ খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেলের জবানবন্দী আবারও নেয়। সেই পুরোনো কথাই তারা বলেছেন, কে বা কারা খন্দকার সাহেবকে হুমকি দিয়ে আসছিলো কয়েকদিন ধরে, এবং সেজন্য তিনি পুলিশের ওপর ভরসা না করে গোয়েন্দা মোজাম্মেলকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন; কিন্তু এরমধ্যেই খুনীরা তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করে ফেলেছে! খন্দকার সাহেবের মতে তোজাম্মেলই খুনীচক্রের সন্ধান দিতে পারবে, এবং পুলিশ যে ঠিকমতো ইনভেস্টিগেশন করছেনা এ নিয়ে তিনি বারবার সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।
খুনীরা যে নাম্বারগুলো থেকে খন্দকার সাহেবকে ফোন করেছিলো সে নাম্বারগুলোরও খোঁজ নিয়েছে পুলিশের সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন টিম; দেশের প্রধান ছয়টি মোবাইল অপারেটরের সবার কাছে খোঁজ নিয়ে যেটা তাঁরা জানতে পেরেছেন তা হলো ঐ নম্বরগুলোর কোনটিরই বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই, সবগুলো কম্পিউটারের মাধ্যমে জেনেরেট করা নকল ফোন নাম্বার। খুনীরা সম্ভবতঃ ইন্টারনেটে আইপি ফোনের মাধ্যমে একাজটি করেছে, এমনটাই তাদের বক্তব্য। এই অত্যন্ত বুদ্ধিমান একটি কাজই যে খুনীকে উল্টো ধরিয়ে দিতে পারে, তা সে কস্মিনকালেও ভাবেনি, তবে এই হত্যারহস্যের শেষদিকে এসে আমরা দেখবো গোয়েন্দা হাসনাইন কিভাবে এই তথ্যটির সূত্র ধরে খুনী মোজাম্মেলের সাথে ঘটনার সম্পর্ক বের করে ফেলেছে।

শুধু একজন মাত্র ব্যক্তি ঠিকই বুঝেছেন যে কাজটি গোয়েন্দা কাম হিটম্যান মোজাম্মেলের, তবে বিশেষ টেকনিকাল অসুবিধার কারণে তিনি টুঁ শব্দটিও করতে পারেননি। এই ভদ্রলোকটি হলেন জনাব ওয়ালী বক্স। কারণ, কিছুদিন আগে এই তিনিই মোজাম্মেলকে দিয়ে নিজ স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন, এবং সেবারও সে একই সাজপোশাকে গিয়েছিলো রেডড্রাগনে; খুনের পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও দুক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে মোজাম্মেল কোন না কোনভাবে তোজাম্মেলের হাতের ছাপকে একটি প্রমাণ হিসেবে রেখে আসছে ঘটনাস্থলে। আপাতঃ প্রেমিকার মৃত্যুতেও ওয়ালী বক্স এব্যাপারে মুখ খুলতে পারছেননা সঙ্গত কারণেই, মোজাম্মেল ফেঁসে গেলে সে শুধু মিসেস খন্দকাররের খুনী হিসেবে না, বরং তার নিজ স্ত্রীর মিসেস সিনথিয়া বক্সের খুনী হিসেবেও ফাঁসবে, এবং তখন খন্দকারের সাথে সাথে তাঁর নিজেরও যুগপৎ ফেঁসে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশী। এমনকি মোজাম্মেলকে ধরিয়ে দেবার জন্য পরোক্ষভাবে পুলিশকে কোন তথ্য দিয়েও তিনি সাহায্য করতে পারছিলেননা, মূলতঃ একই কারণে। সেজন্য ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেলের ফাঁদা গল্পটিই প্রতিষ্ঠা পাক সেটা তাঁকে কামনা করতে হয়। তবে কয়েক সপ্তাহ আগে স্ত্রী হত্যার পরপরই চাঁদাবাজদের নিয়ে কোন গপ্প তিনি ফাঁদেননি, আপাতঃ বখে যাওয়া স্ত্রীর মৃত্যুতে নির্ভেজাল কষ্ট পাবার অভিনয় করেছিলেন মাত্র। সেজন্য মোজাম্মেল আর খন্দকার সাহেবের ফাঁদা চাঁদাবাজের গল্পের সাফল্য কামনা করলেও তাতে বাড়তি কোন মাত্রা তিনি যোগ করতে পারেননি এযাত্রায়। অর্থাৎ, চাঁদাবাজরা তাঁকেও ফোন করে হুমকি দিয়েছিলো এমন কোন দাবী করে খন্দকারের গল্পে আলাদা শক্তিবর্ধনের ব্যবস্থা তিনি করতে পারেননি। তারপরও খন্দকার আর মোজাম্মেলের গল্পকে সাপোর্ট দিতে গিয়ে খন্দকারের সাথে সাথে তিনিও তোজাম্মেলকেই মূল আসামী হিসেবে দাবী করে এসেছেন পুলিশের সামনে, এবং খন্দকারের সাথে গলা মিলিয়ে পুলিশ যে ঠিকমতো তদন্ত করছেনা এবিষয়ে একমত প্রকাশ করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করে গেছেন।

এ সবকিছু মিলেই মিসেস ওয়ালী আর মিসেস খন্দকারের হত্যারহস্য ধীরে ধীরে ভিন্ন একটি দিকে মোড় নিতে শুরু করে, নানান ঘোরপ্যাঁচে শেষমেষ শহরে এটি একটি ভুতুড়ে ঘটনা হিসেবে প্রচার পেতে শুরু করে। জামিন বা বেকসুর খালাসের বদলে শুধু বেদম মার কপালে জুটলেও তোজাম্মেল যে এই খুনের আসামী না এধরনের একটা সিদ্ধান্ত পুলিশের ভেতরের লোকদের সাথে সাথে শহরের সবাইও ধীরে ধীরে মেনে নেয়। আর সেখানে যেহেতু আঙুলের ছাপের রহস্যের সমাধান হয়না, তাই বেশীরভাগ লোকে ধরে নেয় যে ভুতুড়ে কোন সত্ত্বাই তোজাম্মেলের আঙুলের ছাপ দখল করেছে; আর সেখান থেকে ধারনা করা শুরু হয় যে আসলে কোন মানবসন্তান না, বরং ভৌতিক কোন সত্ত্বাই এ হত্যাকান্ডগুলো ঘটিয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা আরো ঘটতে পারে এমন আশংকায় শহরের অভিজাত পাড়ার লোকদের, বিশেষ করে মিসেসদের চলাফেরায় সতর্কতার মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে থাকে।

এধরনের গুজব ছড়াতে শুরু করলে তার ডালপালা গজায় খুব দ্রুত, এসব বিষয়ে নানান ব্যাখ্যা হাজির করার লোকেরও অভাব হয়না। সেসবের জোরে এবং তোড়ে জানা যায় যে গত বছর সিনথিয়া বক্সের প্রায় অন্ধ শাশুড়ী তাদের ছয়তলা এ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে নিচে পড়ে মারা যান, রোজার মাসে সেহরী খাবার পরপরের ঘটনা। বৃদ্ধার ঘরে এয়ারকন্ডিশনার না থাকায় তিনি গরমের কারণে বারান্দায় ঘুমোতেন। পুলিশের ধারনা, সেহরী খেয়ে বারান্দায় ফিরে এসে একবার খাটে উঠে বসে পান খাবার পর বৃদ্ধা ভুলে যান যে তিনি খাটের ওপর বসে আছেন। তখন অন্ধ বৃদ্ধা বারান্দার রেলিংকেই খাটের কিনারা মনে করে আবারও খাটে উঠতে যান, আর সাথে সাথেই ছ'তলা থেকে একেবারে শক্ত নিচের সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে সাথে সাথেই মারা যান। তবে সমস্যা হলো বক্স সাহেবের প্রতিবেশীদের অনেকেই এই করুণ গল্পটিকে ঠিক এভাবে মেনে নেননি বা বিশ্বাস করেননি; তাঁরা ধারনা করেছেন যে ওয়ালী বক্স আর তার বউ ইচ্ছে করে বুড়ি মাটাকে মেরে ফেলেছে, অযথা এই অথর্ব বৃদ্ধার বোঝা টানা তাদের পক্ষে কুলোয়নি; তাছাড়া শাশুড়ীর সাথে সিনথিয়া বক্সের বাসায় ও বাইরে ভয়ানক দূর্ব্যবহারের কথা প্রতিবেশীদের মুখে মুখেই ঘুরত। তাদের অনেকেরই মতে আজ কয়েকমাস পর সে ঘটনার প্রতিশোধ নেয়া হয়েছে।

ওদিকে গত বছরের রোজার শেষ দিকে শপিংমলে একজন দু'পা-হারানো গড়িয়ে গড়িয়ে চলা বৃদ্ধ ভিক্ষুককে কষে লাথি মেরেছিলেন মিসেস আলমা খন্দকার, তাঁর হাঁটার পথ আঁকড়ে ভিক্ষা চাইবার জন্য। সে ঘটনা অবশ্য মার্কেটে অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আজ মিসেস খন্দকারের আপাতঃ রহস্যময় ভৌতিক খুনের ঘটনা জানার পর সেদিনে মার্কেটের প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের মুখেই নতুন করে শোনা যায় সেই গল্প, আরো সম্পাদিত আর পরিবর্ধিত রূপে। শোনা যায়, বৃদ্ধকে লাথি মেরে আলমা খন্দকার গটগট করে যখন গাড়ীর দিকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর সেই হেঁটে যাওয়া দেখতেই লোকে ব্যস্ত ছিলো মূলতঃ; মারকুটে নারী এদেশে এমনিতেই দূর্লভ্য। লোকে যখন মিসেস আলমাকে দেখতেই মগ্ন, তারই ফাঁকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বৃদ্ধ ভিক্ষুক নাকি খোদ মার্কেট কমপ্লেক্স থেকেই উধাও হয়ে যায় এই গল্পটি এখন নতুন করে চাউর হয়ে গেছে, এবং এও বলা হচ্ছে যে এরপর থেকে সেই বৃদ্ধকে শহরের আর কোথাও দেখা যায়নি।

হত্যারহস্যের এহেন নানাবিধ ভৌতিক ব্যাখ্যা ছড়ানোর সাথে সাথে এভাবে মিসেস বক্স আর খন্দকারের এসব আমলনামারও চুলচেরা বিচার শুরু হয়ে যায় শহরে; তাঁদের মৃত্যুতে খুশী হওয়া উচিত না দুঃখিত হওয়া উচিত এনিয়ে শহরের লোকের মধ্যে বিভেদ দেখা দিলেও, যে ব্যাপারটায় মোটামুটি কোন বিভেদ থাকেনা সেটা হলো, সবাই নিশ্চিত হয়ে পড়ে যে রেডড্রাগনের খুনগুলো অলৌকিক ঘটনা না হয়েই যায়না। রেডড্রাগন বার আগে ছিলো হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, দু'তিন পুরুষ আগ পর্যন্ত এর মালিকেরা ছিলো পীর-আউলিয়া, তাঁদের মহৎআত্মারাই ভদ্রমহিলাদের রেডড্রাগনে ডেকে এনে এমন নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছেন এমন ব্যাখ্যাও বাজারে চলতে দেখা যায়। অলৌকিক ব্যাখ্যাটা কতটুকু বাজার পেয়েছে তার আরো একটা উদাহরণ দেয়া যাক। খোদ হাসনাইনের বস শাহাদাৎ সাহেবও এতে কাবু হয়ে পড়েন। আলমা খন্দকার হত্যাঘটনা ঘটার সপ্তা পেরুতে না পেরুতেই তিনি হাসনাইন আর রাজুকে ডেকে নিয়ে পরামর্শ দেন যে কেইসটি ছেড়ে দিতে। যখন কোনভাবেই ওদের রাজী করানো গেলোনা, তখন শাহাদাৎ সাহেব এই বলে হুঁশিয়ার করে দেন যে, এই কেসের পেছনে লেগে থাকার কারণে যদি হাসনাইন বা রাজুর ওপর ব্যাখ্যার অযোগ্য কোন ব্যক্তিগত সমস্যা এসে পড়ে, বা তাদের পুলিশ বিভাগের ওপর ব্যখ্যাতীত কোন সামষ্টিক দূর্যোগ নেমে আসে তাহলে তার দায় নিতে যেন তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। বলাই বাহুল্য, পুলিশ বিভাগের অধিকাংশই শাহাদাৎ সাহেবের মতো ভাবনা থেকে কেইসটির ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

শুধু যে পুলিশের সদস্য বা শহরের লোকেরাই এরকম ভাবছিলো তা না; এ হত্যাঘটনা দুটো নিয়ে মিডিয়াতেও রীতিমতো আলোড়ন তৈরী হয়। টিভির টকশোতে আলোচকরা গমগমে কন্ঠে নিজ নিজ জীবনে ঘটা ব্যাখ্যাতীত ঘটনার বর্ণনা শুরু করেন। এমনকি জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক জামিউন আহমেদ সাপ্তাহিক কর্ণকুহরে তাঁর জনপ্রিয় সৃষ্টি তাসির আলীকে মূল চরিত্র করে "তাসির আলী - ব্যাখ্যার অতীত" সিরিজের একটি গা হিম করা জমজমাট পর্বও লিখে ফেলেন মিসেস খন্দকার আর মিসেস বক্স হত্যাকান্ডের এই রহস্যময় ঘটনা নিয়ে।

ওদিকে তোজাম্মেলের নিরপরাধিতার ব্যাপারেও পুরো পুলিশ বিভাগ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে পড়ে। সে যে খুনী না তার আরো কিছু প্রমাণ বের হয়, যেমন, তোজাম্মেলের ওভারকোটটির বাঁহাতের কব্জির কাছে প্রায় দু'ইঞ্চি পূরণ চার ইঞ্চি এলাকা জুড়ে আলাদা কাপড়ের টুকরায় প্রিন্ট করা আছে "ভ্যালেন্টিনো মরিনো", কোটের ব্র্যান্ডের নাম। কিন্তু সিসিটিভির ফুটেজে অনেক চেষ্টা করেও খুনীর কোটের হাতায় সেরকম কিছু বের করতে পারেনি, এমনকি এ ফুটেজ বিদেশের কয়েকটি ল্যাবে পাঠিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছে, সবাই নেগেটিভ বলেছে। সব দেখেশুনে প্রথম শুনানীতেই আদালত তোজাম্মেলকে জামিন দিয়ে দেয়, এবং সাইন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন ল্যাবের ইমেজ প্রসেসিংয়ের অধ্যাপক ডঃ আবু নাজিমের "প্রতি পঁচিশ লাখ জনে একজনের বেলায় ভুল ম্যাচ করতে পারে আমাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথেনটিকেশন মেশিন, যে হিসেবে বাংলাদেশে তোজাম্মেলের মতো একই রকম বা কাছাকাছি ফিঙ্গারপ্রিন্টওয়ালা লোক জনা পঞ্চাশের বেশী থাকতে পারেন" -- এহেন সাক্ষ্যের প্রেক্ষিতে পুলিশকে আবারও পুরো ইনভেস্টিগেশন ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেয়। যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া এরকম স্পর্শকাতর মামলা নিয়ে মাননীয় আদালত বেশী বাড়াবাড়ি না করারও পরামর্শ দেন পুলিশকে। ধারনা করা যায় যে ভৌতিক ব্যাখ্যাকে মাননীয় আদালতও একেবারে ফেলে দিতে বিব্রত বোধ করেছিলেন।

এভাবে ঘটনার মোটামুটি পনেরো দিনের মাথায় পুরো কেইসটি আবারও তার শুরুর অবস্থানে চলে আসে; অর্থাৎ কোন সাসপেক্ট নেই! দু'জন ভদ্রমহিলা খুন হয়েছেন, এবং পুলিশের বড় বড় কর্তা, আদালত থেকে শুরু করে দেশের জনপ্রিয় সাহিত্যিক -- সবাই ধরে নিয়েছেন যে এটি কোন সাধারণ খুনের ঘটনা নয়, বরং অলৌকিক কিছু হবার সম্ভাবনা বেশী। হাসনাইনরা এও জানতে পারে যে তার বস শাহাদাৎ সাহেবকে পুলিশের বড়কর্তারা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নিজের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা দিয়ে এরকম রহস্যময় সমস্যা সমাধান করা এফবিআই'র তালিকাভুক্ত ভদ্রমহিলা মিসেস বারবারা হুইটস্মিথকে যেন ঘটনাটি জানানো হয়। বিশ্বমানের ভুত বিশেষজ্ঞ মিঃ জুরি গেলান তার ব্লগে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেন যে, রহস্যটির সমাধান তিনি শহরে এসে সশরীরে করে দিতে পারবেন, তবে সেটা সবার জন্য হিতকর হবে না উল্টো আরো ক্ষতি বয়ে আনবে -- সে নিশ্চয়তা তিনি দিতে পারবেননা।

অরিয়ন ক্লাবের রেইনবো ক্যাফেতে বসে প্রায়ই খবরের কাগজে এসব পড়তে পড়তে মুচকি মুচকি হাসে মোজাম্মেল, যদিও ঘটনার বর্তমান মোড়ে সে পুরোপুরি খুশী না, তার ইচ্ছে ছিলো এঘটনার মাধ্যমে তোজাম্মেলকে চিরতরে শ্রীঘরে পাঠিয়ে দেবে অথবা জাহান্নামে। তারপরও দুদু'টো খুন করে বেঁচে যাওয়াটা বড় আনন্দের বিষয়, সেই আনন্দপ্রসূত হাসি খানিকটা হলেও অবসর মুহূর্তে সঙ্গী হয়ে যায় তার আপনা আপনিই। ক্যাফের কাউন্টারে দাঁড়ানো বিশ বছর বয়েসী ছেলে কামাল, সে ঠিক বুঝতে পারেনা এ লোকটি প্রতিদিন এত মজা করে কি পড়ে পেপারে! তবে এই আপাত পাগলাটে লোকটির আচরণ অনেক ইন্টারেস্টিং হলেও তার এই দূর্বোধ্য আচরণের কারণেই কামাল সবসময় তাঁকে প্রত্যক্ষ করেনা। মাঝেমাঝে তার চোখ চলে যায় আশপাশের হাই হিল পরা সুন্দরীদের দিকে। চাকরী বাঁচানোর জন্য সুন্দরীদের দিকে এরকম বারবার চোখ যাবার এ অভ্যাসটি বদলানো দরকার কিনা সেটা অবশ্য সে বুঝতে পারেনা, বা তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিতও হয়না।

ওদিকে শহরের অভিজাত এলাকার দুটো শোবার ঘরেও ঘটনার এমন মোড় আপাতঃ স্বস্তির বাতাস বয়ে নিয়ে আসে। যদিও এদের একজন, অর্থাৎ ওয়ালী বক্স বয়সকালের পরকীয়া প্রেমিকার মৃত্যুতে খানিকটা হলেও আহতবোধ করছেন, তারপরও পুরো ঘটনার অন্য কোন মোড় তাঁর নিজের জীবনকেও যে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে এ ভয়টুকু থেকে ঘটনার বর্তমান অবস্থা তাঁকে যথেষ্ট স্বস্তি এনে দেয়। ভৌতিক কোন কারণে স্ত্রীদের মৃত্যু এদের দুজনকেই আরো বেশী ধার্মিক করে তোলে; একদিকে যেমন ঘনঘন মায়ের কবরে যেতে দেখা যায় ওয়ালী বক্সকে, তেমনি পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষুকদের জেয়াফত দিতে দেখা যায় খন্দকার সাহেবকে। আর নিজনিজ স্ত্রীদের মৃত্যুকে তাঁরাই যখন অধিভৌতিক কিছু হিসেবে মেনে নিয়েছেন, তখন একইভাবে সেটাকে মেনে নিতে পুলিশ বিভাগ, জনগণ, টক-শোর লোকজন বা সাহিত্যিক -- কারো তেমন কষ্ট হয়না। এভাবে মাস দুয়েকের মাথায় সবাই মোটামুটি ভুলে যায় ঘটনাগুলো, সবাই অধিভৌতিক ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

শুধু শান্তি পায়না হাসনাইন, গোয়েন্দা হাসনাইন মাহমুদ। সেজন্য তার এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে রাজুকেও রাতের পর রাত জেগে তার সাথে নানারকম ঘাঁটাঘাঁটিতে কাটাতে হয়, যদিও মাঝেমাঝে রাজুর কাছে ভুতুড়ে ধরনের ব্যাখ্যাকেই বেশী গ্রহনযোগ্য বলে মনে হয়ে ওঠে। সে নিশ্চিত খুনী তোজাম্মেল না, তাই তোজাম্মেলের হাতের ছাপ মিলে যাওয়াটার আর কোন ব্যাখ্যা তার কাছে থাকেনা। তবে হাসনাইন কোনভাবেই ঘটনাকে ভুতুড়ে ভাবতে পারেনা মূলতঃ একটি কারণে, যেটা বাকী কারো চোখে না পড়লেও তার চোখ এড়াচ্ছেনা এ মুহূর্তে। এই একটি কারণই তার মনে বারবার সন্দেহ ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে এ ঘটনা কোনভাবেই ভৌতিক না, এবং আরো পরিস্কার করে বললে, তার যে ধারনাটা আরো দৃঢ় হয় তা হলো, এঘটনা দুটো কাউকে দিয়েই ঘটানো, যেখানে পেছন থেকে নিহত ভদ্রমহিলাদ্বয়ের পতিদ্বয় নিশ্চিতভাবেই কলকাঠি নেড়েছেন। কারণ, যতদিন পুলিশের সম্ভাব্য আসামী হিসেবে তোজাম্মেল বন্দী ছিলো ততদিন খন্দকার আর বক্সের দুজনেই হারানো স্ত্রীদের শোকে তোজাম্মেলের যথাযথ বিচার দেখে নেয়ার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন; অথচ যখন ঘটনাটির ব্যাখ্যা ভৌতিক দিকে মোড় নিলো তখন তোজাম্মেলের ব্যাপারে তাঁদের আর কোন অভিযোগ রইলোনা বা স্ত্রী হারানোর বিচার চাওয়ার ব্যাপারেও তাঁদের আর উৎসাহী হতে দেখা গেলোনা। সাধারণত এমন ক্ষেত্রে পুলিশের এহেন গাঁজাখুরী বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে তাঁদের আরো সোচ্চার হবার কথা, বিশেষ করে খন্দকার সাহেবের তো আদালতে গিয়ে পুলিশের বদলে মোজাম্মেলকে নিয়োগের আবেদন করার কথা!

তবে হাসনাইনের এই সন্দেহও ঠিক সেভাবে তার নিজের কাছেই পানি পায়না মূলতঃ ঐ আঙুলের ছাপের কারণে। যেহেতু অধ্যাপক আবু নাজিমের সাক্ষ্য অনুসারে তোজাম্মেল খুনী নাও হতে পারে -- এব্যাপারে সে কনভিন্সড, তাই ঘটনাস্থলের আঙুলের ছাপ তার সন্দেহের তালিকার লোকদের, মানে মোজাম্মেল, খন্দকার আর বক্স-- এদের আঙুলের ছাপের সাথে মেলে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্তও সে নিয়েছিলো। খন্দকার আর বক্সকেই সে সন্দেহ করেছে মূলতঃ, তাই সম্ভাব্য হিটম্যান হিসেবে প্রথমেই তার তালিকায় এসেছে খন্দকারের চিরন্তন সহচর আর ওয়ালীর সাথেও ইন-গুড-টার্মস ব্যক্তিত্ব গোয়েন্দা মোজাম্মেল। সে হিসেব থেকেই উপরের বসদের কাউকে না জানিয়েই পুলিশের সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন টিমের পরিচিত বড়ভাই কাম বন্ধু জামশেদ ভাইকে দিয়ে সে এই তিনজনের আঙুলের ছাপের সাথে খুনীর আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখেছে। যথারীতি মেলেনি! তাহলে খুনের স্থলে ছিলো কে?

আঙুলের ছাপ না মেলায় হতাশ হয় সে ঠিকই তারপরও মনের ভেতরের খচখচটাকে সে দূর করে দিতে পারছেনা। বারবার তার মনে হয়, কি একটা বিষয় যেন মনে পড়ছেনা, কি একটা যেন দেখার বাকী আছে!

এমন অবস্থাতেই ঘটনার প্রায় দু'মাস বিশদিন পর একরাতে যখন সে রাজুকে নিয়ে মামলার ফাইলগুলো ঘাঁটছিলো, তখন হঠাৎকরেই সেই মনে মনে খুঁজতে থাকা "অজানা অধরা কি যেন দেখার বাকী বস্তু"টি তার কাছে ধরা দেয় সন্তর্পণে, এবং ফাইলের স্তুপে পাওয়া সেই অধরা বস্তুটিও নিশ্চিতভাবেই একটুকরো কাগজই ছিলো। যেন হাতে চাঁদ পায় সে, অনেকক্ষণ ধরে কাগজটির দিকে তাকিয়ে থাকে হাসনাইন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে, তারপর মিটিমিটি হেসে রাজুকে বলে, "কমরেড রাজু, চলো চা খেয়ে আসি।"
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29021949 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29021949 2009-10-07 16:06:54
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স - পর্ব ৫, ৬ পর্ব ১, ২ (Click This Link)
পর্ব ৩, ৪ (Click This Link)



৩৭, ওয়াজী লেনের জীর্ণ-শীর্ণ একটি তিন তলা বাড়ী, চার ইউনিটের ছোট ছোট খুপরীর মতো ঘর প্রত্যেক তলায়। বাইরের দেয়ালের যেটুকু অংশে শ্যাওলা বা জংলা পাতা জন্মায়নি, সেটুকু অংশের পুরো পলেস্তরা খসে গেছে, এমনও হতে পারে আসলে পুরো বাড়িটিরই পলেস্তরা খসে গেছে অথবা কখনও সেটা ছিলোইনা, তবে সেটা নিয়ে ভাববার বা চিন্তিত হবার অবকাশ হাসনাইন বা রাজুর এ মুহূর্তে নেই। এই বাড়ীরই তিনতলার দক্ষিণ-পূর্বকোণের ঘরটিতে থাকে গল্পের বর্তমান আসামী, তথাকথিত ডিটেকটিভ তোজাম্মেল। বাড়ীতে দারোয়ান নেই, বাড়ীর সামনেই লাল লাল ইটবিছানো ভাঙা রাস্তার একপাশে বসে গুল্লি খেলছে কতগুলো বাচ্চা, ন'দশের বেশী বয়েস হবেনা কোনটিরই।

আজ সকাল থেকে বারবার আসা পুলিশের লোকদের অবশ্য এই গলিতে ঢুকতেই কষ্ট হয়েছিলো খুব, মূলতঃ পাবলিকের ভীড়ের কারণে; "পুলিশ এসেছে" এই তথ্যটি এদের মাঝে আলোর বেগের চেয়েও বেশী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিলো বারবার, এবং হাসনাইনের কলিগদের ভাষ্যমতে তারচেয়েও বেশী বেগে যেন লোকজন সবাই দলবেঁধে এসে গলির মুখে হাজির হয়ে উপচে পড়ছিলো। এসব তথ্য হাতে নিয়েই ওয়াজী লেনের বাসাটির সামনে এসে দাঁড়ায় হাসনাইন আর রাজু, তবে জনগণের অপ্রয়োজনীয় মনোযোগের হাত থেকে তারা বেঁচে যায় শুধুমাত্র ডিবির লোক হবার কারণে; সিভিল ড্রেসের পুলিশে পাবলিকের তেমন রুচি নেই, বুঝতে পারে দু'জনই, তবে এনিয়ে তারা হতাশ না আনন্দিত সেটা বোঝা যায়না।

গুল্লি খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোকে জিজ্ঞেস করে জানা যায় যে এবাড়ীর মালিক এখানে থাকেনা বহুদিন, সবাই ভাড়াটিয়া। বাড়ীর চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, এদিক সেদিক, উপর নিচে তাকিয়ে হাসনাইনের এও মনে হলো যে বাড়ীটির সবগুলো ফ্ল্যাটে হয়তো মানুষ থাকেওনা; বেশ কয়েকটি ঘরের জানালায় পর্দা নেই, ভেতর থেকে ছাদ দেয়াল দেখা যায়, নোংরা যদিও। তাছাড়া আশপাশটা কেমন নীরব শুনশান, বাড়ীর চারপাশে গজিয়ে ওঠা জংলা পরিবেশের কোনরকম যত্ন নেয়া হয়নি অনেকদিন, বোঝা যায়। একতলার একটি ফ্ল্যাটের জানালায় দেখা যায় কালোপর্দার এপাশে বেশ কয়েকটি নানান ধরনের সাহেবী টুপি ঝোলানো, একপাশে একটি ছড়ি; কমেন ভুতুড়ে, রহস্যময় একটা আবহ।

তিনতলার দক্ষিণ-পূর্বকোণের তোজাম্মেলের ফ্ল্যাটের জানালায়ও পর্দা একটা ঝুলতে দেখা যায়, এবং একতলা থেকে দেখেও মোটামুটি আন্দাজ করা যাচ্ছে যে কেনার পর আর কখনই ধোয়া হয়নি ওটাকে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে ডানহাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁহাতের নখে মৃদু আঘাত করতে করতে হাসনাইন জিজ্ঞেস করে, 'আচ্ছা রাজু, হোয়াট ওয়াজ সো রং?'

নড়েচড়ে ওঠে রাজু, বলে, 'স্যার, খুব ক্ষীণ একটা সন্দেহ, তাও মনে হচ্ছে তোজাম্মেল খুনী নাও হতে পারে। প্রথমত দেখুন, তোজাম্মেলের পেটে কোন আঘাত বা কোমরে কোন ব্যথা নেই যেটা ডাক্তার বললেন, আর দ্বিতীয়ত সে সবসময়ই একদম তালগাছের মতো সোজা হয়ে হাঁটে, হাজতে আজ আমি কয়েকবারই খুব খেয়াল করে পর্যবেক্ষণ করেছি।'

হঠাৎ সতর্ক হয়ে যাবার দৃষ্টি হাসনাইনের, রাজুর দিকে তাকিয়ে বলে, 'বলতে চাচ্ছো যে, সিসিটিভিতে দেখা আসামী যেভাবে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছিলো তাতে অবশ্যই তার পেটের কাছে কোথাও আঘাত থাকার কথা?'

'জ্বি স্যার, হয় আঘাত বা কোন সমস্যা থাকবে, না হয় তার স্বাভাবিক হাঁটার ঢংটাই হবে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটা। কিন্তু এর কোনটিই তোজাম্মেলের বেলায় মিলছেনা।'

'হুমম, তোমার পয়েন্টটা ফেলে দেবার মতো না। কিন্তু এমন কি হতে পারেনা যে রেডড্রাগনে তোজাম্মেল ইচ্ছে করেই ওভাবে হেঁটেছে।'

'স্যার, আমি সেখানে পিয়ানো বাজাচ্ছিলাম, কালো চশমার আড়ালে খুব ভালো করেই হ্যাটপরা লোকটির হেঁটে যাওয়া লক্ষ্য করেছি, চোখে পড়ার মতো হাঁটার ঢং। আমার মোটেও মনে হয়নি যে অভিনয় করে হাঁটছে, যদিও এটাকে কোন প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব না। তাছাড়া ভাবুন স্যার, যে লোক নিজের ট্রেডমার্ক হ্যাট, জুতো, ওভারকোট সব পরে একেবারে নিজেকে মেলে ধরতে এসেছিলো, আর এমনকি আঙুলের ছাপও রেখে গেছে বিষের গ্লাসে, সে শুধু বেছে বেছে নিজের হাঁটার ঢং বদলাবে কি কারণে?'

'হ্যাঁ, তোমার কথাটা ঠিকই আছে,তবে দেখো ভায়া, সব সমস্যাই বা সন্দেহইতো ঐ ফিঙ্গারপ্রিন্টে এসে আটকে যাচ্ছে! এভাবে খাপেখাপ ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলে গেছে, এখন আমাদের কিন্তু তোজাম্মেলের অপরাধী না হবার সম্ভাবনার চেয়ে অপরাধী হবার সম্ভাবনা যে অনেক বেশী সেটা ধরে নিয়ে সাপোর্টিং তথ্য-প্রমান খোঁজার চেষ্টা করতে হবে।' খানিকটা দম নিয়ে আবার বলা শুরু করে হাসনাইন, 'আর তাছাড়া পুলিশের ডেটাবেসে আমরা খুঁজে দেখেছি, তোজাম্মেলের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে মোটামুটি মিল আছে এমন আর কেউ আছে কিনা যাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা যায়। একজনও পাওয়া যায়নি!'

"হুমম স্যার, সেটাও কথা। তবে স্যার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট কিন্তু এখন নকল করে বানানো যায়। ন্যাশনাল ট্রেজার মুভিটাতে দেখেছিলেন, মনে আছে?'

'জানি সেটা রাজু, তবে তোমার কি ধারনা সেই প্রযুক্তি এরই মধ্যে বাংলাদেশে চলে এসেছে? আর তাছাড়া তোমার কথা সত্য হলে সেটার মানে দাঁড়াচ্ছে যে তোজাম্মেলকে কেউ ফাঁসিয়ে দিতে চেয়েছে।' যুক্তির ক্রমাগত প্রবাহে হাসনাইন খানিকটা উত্তেজিত, বলে যায়,'অথচ দেখো, তোজাম্মেল এমন কোন শত্রুর নামও বলতে পারছেনা যে কিনা তাকে ফাঁসাতে পারে। বরং যতটুকু খোঁজ নিয়ে দেখেছি তাতে তোজাম্মেলের গোয়েন্দা ক্যারিয়ারের বারোটা বাজিয়েছে খন্দকার সাহেবের এ্যাপয়েন্ট করা লোকটা, নাম কি যেনো, ওহ, মোজাম্মেল, রাইট? লোকটাকে দেখে আসলেও বুদ্ধিমান মনে হয়। তবে সেক্ষেত্রে, ফাঁসালে তো বরং তোজাম্মেলেরই প্রতিশোধ নেবার লক্ষ্যে মোজাম্মেলকে ফাঁসানোর চেষ্টা করার কথা!" একটানে বলে যায় হাসনাইন, একটু থেমে তারপর কিছুটা নমনীয় গলায় বলে, "তাও তোমার সন্দেহের কারণে এখন তল্লাশীর সময় দেখবো তোমার সন্দেহের পক্ষে কিছু পাওয়া যায় কিনা।"

রাজু আর কিছু বলতে পারেনা, শুধু মনের ভেতরে জন্ম নেয়া সামান্য খটকাটাকে বয়ে নিয়েই হাসনাইনের সাথে এগিয়ে যায় সিঁড়ি বেয়ে। ওয়ালী বক্সের স্ত্রী সিনথিয়া বক্স হত্যার রহস্য উদঘাটনের জন্য রাজুকে স্পেশাল এ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে রেডড্রাগনে পাঠানো হয়, অন্ধ পিয়ানিস্ট সেজে সে একসপ্তাহ ধরে রেড ড্রাগনের কাস্টমারদের গতিবিধি লক্ষ্য করেছিলো। অথচ তার চোখের ওপরই এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেলো, সে টেরও পেলোনা, যেজন্য এক ধরনের অপরাধবোধ তার মধ্যে কাজ করে যাচ্ছিলো গতকাল থেকেই। 'সেজন্য কি হাসনাইন ভাই আমার কথাবার্তাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছেনা?' ভাবতে ভাবটে এ সন্দেহটাকেও সে ঠিক বাতিল করে দিতে পারেনা; এনিয়ে কিছুটা মনোক্ষুন্নও সে বটে এমুহূর্তে, তাও কর্তব্যের খাতিরে হাসনাইনকে অনুসরন করা আর সহযোগিতা করা ছাড়া অন্যকোন পথ থাকেনা তার।
'স্যার, কোন কারণে আপনার কি মনে হয় এটা সাইকো কিলিং হতে পারে?' রাজু জিজ্ঞেস করে।

'আরে নাহ! যেখানে দু'বারই ফিমেইল ভিকটিম, সেখানে সাইকো কিলিংয়ে কোন শারীরিক নির্যাতন থাকবেনা সেটা হয়না। আর সাইকো কিলিংয়ে সাধারনত খুনীরা কিছু সাইন ব্যবহার করে, মেসেজ রেখে যায়। যেটা অনেকটা পুলিশের বা ডিবির প্রতি চ্যালেঞ্জের মতো। এখানে তো তেমন কিছু নেইই, বরং তোজাম্মেল তো একদম সেধে সেধেই আমাদের হাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তুলে দিয়ে রেখেছে। সাইকো কিলাররা অনেক ঘাঘু।'

'তা, ঠিক।'

'আমার ধারনা তোজাম্মেল হিটম্যান হয়ে কাজ করেছে। অনেকদিন ধরেই তার আয় রোজগার প্রায় নেই বললেই চলে, সে নিজেও স্বীকার করেছে সেটা। চলো দেখা যাক, ফ্ল্যাট তল্লাশি করে কিছু পাওয়া যায় কিনা।' বলতে বলতে কর্তব্যরত পুলিশের গার্ডকে আই.ডি দেখিয়ে ভেতরে ঢুকে যায় দু'জন।

তোজাম্মেলের ফ্ল্যাটটি পুলিশ সীল করে রেখেছে আগের রাত থেকেই, সেখানে এখনও দু'চারজন পুলিশের গার্ড দায়িত্বে আছেন। প্রতিদিন তিন শিফটে কয়েকজন করে থাকছেন, পুলিশের তল্লাশী শেষ হওয়া পর্যন্ত বেচারাদের এভাবে পালা করে পাহারা দিয়ে যেতে হবে। গতরাতে আর আজ সকালে দুটো ভিন্ন দল দু'দফা তল্লাশী চালিয়েছে, তবে এখনও হত্যাকান্ড দুটোর সাথে সম্পর্কযুক্ত কোন আলামত তারা উদ্ধার করতে পারেননি। বেশ কিছু গোয়েন্দাগল্প, রহস্য উপন্যাস, সাইকো কিলিংয়ের বই অবশ্য পাওয়া গেছে; ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের দুই জুনিয়র অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বইগুলো পড়ে কোন ক্লু বের করার, তবে এখনও সেগুলোর সাথে রেডড্রাগন ডাবল মার্ডার ঘটনার কোন সাদৃশ্য বা অন্তর্নিহিত সম্পর্ক থাকার আভাস মেলেনি।



৬.
ঘরে ঢুকতেই এক ধরনের ভয়াবহ বোঁটকা গন্ধে প্রায় বমি আসবার জোগাড় হাসনাইন আর রাজু, দুজনেরই। শুধু গন্ধ থেকেই বোঝা যায় যে এটা প্রচন্ড অনিয়মে চলা কোন ব্যাচেলরের বাসা, যে কিনা কোনভাবে জীবনের কোন এক সুসময়ে কেনা ঘরের আসবাবপত্রগুলো নিয়ে টিকে আছে, বা বেঁচে আছে কোনরকমে। মোটামুটি একটা বড় ড্রয়িংরুমের ডানপাশে ছোট্টখুপরীর মতো একটা বেডরুম, বেডরুমের সাথেই ড্রয়িংরূমের একই পাশে কিচেনের মতো একটু জায়গা, তা আবার দরজা দিয়ে আলাদা করাও। ড্রয়িংরুমের বাঁদিকের কিছুটা জায়গা নিয়ে বাথরুম-টয়লেট, দুর্গন্ধে সেদিকে যাওয়ার উপায় নেই।

গম্ভীর মুখে তোজাম্মেলের বসার ঘরের টেবিলের ওপরের জিনিসগুলোকে উল্টে পাল্টে দেখে হাসনাইন। বেশ কয়েকটা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, বেশীরভাগই স্পোর্টস ম্যাগাজিন। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে সে কয়েকটা, তারিখ দেখে বোঝা যায় অনেক পুরোনো পত্রিকা, বারবার পড়া হয়েছে সেগুলো। স্পোর্টস নিউজ বারবার পড়ার মধ্যে কি আনন্দ আছে তার বোধগম্য হয়না। তবে এতসব পুরোনো কাগজপত্রের ভীড়েও গতকালের খবরের কাগজটিও পাওয়া যায়; নেড়েচেড়ে দেখা যায় পত্রিকার বেশ কয়েকটি জায়গায় আবার তোজাম্মেলের হাতেই সম্ভবত, লাল কালিতে হিজিবিজি দাগ টানা। ক্রাইম রিপোর্টগুলো যে সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে বোঝা যায়। তবে আশপাশের আর কোন পত্রিকা দেখা যায়না, হাসনাইন বোঝে, কোন দোকানদার বা প্রতিবেশী থেকে ধার করে এনে পত্রিকা পড়ে তোজাম্মেল। 'টাকা-পয়সার বেশ টানাটানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে লোকটা' মনে মনে বলে হাসনাইন।

টেবিলের মাঝামাঝি অংশে একটি টেবিলঘড়িও দেখা যায়, তবে সেটার চলা তো দূরের কথা কাঁটাগুলোর কোনটিও যথাস্থানে নেই! একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে যে এই শখের গোয়েন্দার সেটা বুঝতে হাসনাইনের কষ্ট হয়না, আবারও। এছাড়া অন্ততঃ ছ'সাতটি গ্লাস এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের ওপর, দেখে মনে হচ্ছে কোনটিতে বহুযুগ আগে খাওয়া চায়ের দাগ, কোনটিতে দুধের শেষঅংশটুকু শুকিয়ে সাদা সাদা গুড়োর মতো হয়ে লেগে আছে। টিভির রিমোটকন্ট্রোলারের পেছনের ব্যাটারীর খাপটিকেই শুধু পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে টেবিলেরা পাশে কার্পেটের ওপর, বেশ অযত্নে;এদিক ওদিক মেঝে আর সোফার নিচে হাতড়ে দেখে হাসনাইন, রিমোট কন্ট্রোলারটিকে কোথাও পাওয়া যায়না। কোথায় গেলো রিমোট কন্ট্রোলার? একটু খটকা লাগে হাসনাইনের। সোফার আশপাশ ছেড়ে কিচেনের দিকে এসে খুঁজতে থাকে, কোথাও নেই, শুধু সোফা থেকে একটু দূরে একটা ব্যাটারী পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সোফার ওপর তেল চিটচিটে রঙের নানান নকশায় রাঙানো দুটো বালিশ, একটি কাঁথা। কাঁথাটি যথেষ্ট পুরোনো হয়ে গেছে, বেশ কয়েক জায়গায় ছেঁড়া, তবে মেলে ধরে হাসনাইন দেখতে পায় অদ্ভুত সুন্দর সূতোর কারুকাজ এ কাঁথায় ছিলো কোন এক কালে, সোনালী রঙের সূতোয় কতগুলো চিত্রা হরিণ ছুটছে! কে বানিয়ে দিয়েছিলো? সে কি কোন এক তরুণী যে হয়তো নিজেও গোয়েন্দা গল্পের একনিষ্ঠ পাঠক ছিলো? যে হয়তো ভাবতো তোজাম্মেলের মতো অমন বুদ্ধিমান ছেলে আর দ্বিতিয়টি নেই, যে হয়তো স্বপ্ন দেখতো যে তোজাম্মেল একদিন দেশের সবচেয়ে নামকরা গোয়েন্দা হবে। অথবা কোন মায়ের হাতের করা নক্সা? যিনি কিনা সন্তানের শখের গোয়েন্দাগিরির নামে পাগলামীর কথা মনে করে মিটিমিটি হাসতে হাসতে গড়ে তুলেছেন এরকম সুন্দর কারূকাজ সুদূর কোন অতীতে?হঠাৎ তোজাম্মেল নামের এই লোকটার প্রতি হাসনাইনের একধরনের মায়া হয়, একটু শ্রদ্ধামিশ্রিত অনুভূতিও জন্মায়; লোকটার ঘরদোর নোংরা হলেও ব্যবহৃত জিনিসগুলোর মধ্যে একটা রূচির ছাপ আছে বলতে হবে। তাছাড়া জেরার সময় দেখেছে, কথাবার্তাতেও বেশ সম্ভ্রান্ত একটা ছাপ আছে তোজাম্মেলের। এমন একটা লোক কেন এরকম ধারাবাহিক খুনে জড়িয়ে পড়লো সেটা নিয়ে খানিকটা চিন্তিতও সে হয়ে ওঠে।

টেবিলের এক কোণায় দেখা যায় একটি টেলিফোন সেট, টিএন্ডটিরই সম্ভবতঃ। সোফা আর তার আশপাশের জিনিসগুলোর মধ্যে এই টেলিফোনেই ধুলো সবচেয়ে কম, হাসনাইন খেয়াল করে। বোঝা যায়, অভাবের কারণে বাসায় থাকা অবস্থায় কাউকে ফোন করলে টিএন্ডটি থেকে ফোন করতো তোজাম্মেল। হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে হাসনাইন, বেশ আধুনিক ফোনসেট, এ্যানসারিং মেশিনও আছে সাথে। খানিকটা আশ্চর্যই হয় সে। হয়তো কোন এককালে পসার ভালো ছিলো, অনেক বিলাসিতাও করতো লোকটি। এই মুহূর্তে তদন্তের কারণে প;রাইভেসীর কেয়ার না করলেও চলে, ফোনের মেসেজ বাটন টিপে মেসেজ শোনার চেষ্টা করে হাসনাইন, কোন ক্লু পাওয়াও যেতে পারে। মোট ছয়টি মেসেজ, এর মধ্যে জনৈকা তসলিমা খাতুনের আহ্লাদী কন্ঠের মেসেজ প্রথমটি যেখানে তিনি তাঁর মুর্গীর ডিম চোরের ধরা পড়ার খবর বেশ উচ্ছাসের সাথে জানাচ্ছেন, এবং একই সাথে খানিকটা অভিমানের সাথে এও বলেছেন যে তোজাম্মেল কাজটা না নেয়ায় তার ওপর তিনি খানিকটা ক্ষুব্ধ; তবে সেই ক্ষোভপ্রকাশের মধ্যে বিরক্তি আবিষ্কার করতে পারেনা হাসনাইন। অবশ্য তসলিমার মেসেজ ঐ একটিই, কারণ পরের পাঁচটি মেসেজই হেড়েগলার বিভিন্ন পাওনাদারদের তাগাদা। কথাবার্তার ঢং আর ভাষা শুনে বোঝা গেল যে পাওনাদাররা সবাই পাড়ার মুদি দোকানদার বা বাজারের ব্যাপারী গোছের লোকজন, এবং আশ্চর্য কারণে এদের সবাই তোজাম্মেলকে "তুজাম্মেল(Tuzammel) বাই" বলে সম্বোধন করছে।

সোফা থেকে ফুট পাঁচেক দূরে সনির ট্রিনিট্রন টিভি, ২৪ ইঞ্চির বিরাট টিভি। আবারও বুঝতে পারে হাসনাইন, একসময় ভালোই পসার ছিলো এই শখের গোয়েন্দার। টিভির সাথে এ্যাটাচড একটি ভিসিআর, তার আশপাশে বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্যাসেট ছড়িয়ে আছে, শিরোনামগুলো সব হিন্দি সিনেমার; পুলিশ একবার সার্চ করেছে বোঝা যায়, সন্দেহজনক কিছু পায়নি বলে জব্দ করেনি। ভিডিওগুলো চালিয়ে দেখতে হতে পারে, কাছে থাকা পুলিশের গার্ডকে ক্যাসেটগুলো জব্দ করার নির্দেশ দেয় হাসনাইন।

তোজাম্মেলের বেডরুম তল্লাশীর দায়িত্ব পড়ে রাজুর ওপর, কিন্তু সে যে কিছুটা অনিচ্ছুক এটা তার শারীরিক গতিপ্রকৃতি দেখেই বলে দেয়া যাচ্ছিলো। কারণ এখনও রাজু কিছুতেই তার খটকা থেকে বের হয়ে আসতে পারছেনা। রেড ড্রাগনের খুনীর ওরকম ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটাটা নিয়ে তার সন্দেহ এত সহজে কাটার কথা না, খুনী দ্রুত পায়ে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছিলো, মনে হচ্ছিলো খুব তাড়া আছে তার। তোজাম্মেলের হাঁটার গতি কচ্ছপের মতো, সোজা লম্বা হয়ে হাঁটা। তারপরও হাসনাইন কেন কনভিন্সড হচ্ছেনা বা অন্য কোন সম্ভাবনার কথা আমলে নিচ্ছেনা, সেটা ভেবে সে খানিকটা বিরক্তই এমুহূর্তে। তাছাড়া কেন তোজাম্মেল খুন করবে সেটাও সে ঠিক ভেবে পাচ্ছেনা; এই মুহূর্তে তার মাথায় অনেকগুলো সম্ভাব্য কারণ খেলছে, কিন্তু কোনটিকেই তেমন যুৎসই মনেও হচ্ছেনা। তাও এ নিয়ে হাসনাইনের মতামত জানা দরকার, তার সাথে কথা বলা দরকার -- এই ভেবে ড্রয়িংরূমের দিকে এগিয়ে যায় সে।

সোফার পাশে রাখা চেয়ারের ওপর বসা হাসনাইনের কাছে এসে কৌতুহলী কন্ঠে বলে, "স্যার? আপনার কি মনে হয়? খুনীর মোটিভ কি?'

'অনেক কিছুই তো হতে পারে, তবে কোন ডেফিনিট কারণ তো এখনও বের করতে পারছিনা।'

'এমনকি হতে পারে যে, মিসেস খন্দকার তোজাম্মেলকে দিয়ে মিসেস বক্সকে খুন করিয়েছে, তারপর ঠিকমতো পয়সা দেয়নি। সেজন্য হয়তো রাগের মাথায় তোজাম্মেল তাঁকেও খুন করেছে।"

'না', নিশ্চিতভঙ্গিতে বলে হাসনাইন, 'মিসেস খন্দকারের ব্যাগে খামের ভেতর লাখখানেক টাকা পাওয়া গেছে, জেনেছো নিশ্চয়ই। তার মানে লেনদেন নিয়ে অন্ততঃ খুনোখুনি হবার কথা না।'

'হুমম, কিন্তু এমনকি হতে পারেনা যে তোজাম্মেল যা ভেবেছিলো তার চেয়ে অনেক কম টাকা নিয়ে এসেছিলেন মিসেস খন্দকার। মানে ধরুন, পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে, কিন্তু খুনের পর হয়তো মিসেস খন্দকার বললেন যে একলাখ টাকার বেশী দেবেননা।'

'উঁহু, সেটিও সম্ভবনা।' বলে হাসনাইন,'এই ঘরে ঢুকে বুঝতেই পারছো যে লোকটা কত অভাবে ছিলো? ফোনের মেসেজ চেক করে দেখো, শুনতে পাবে, পাওনাদার তার কম ছিলোনা। চালের দোকানদার থেকে শুরু করে তরকারীওয়ালা, সবার কাছ থেকে বাকীতে কিনে চলতো। এমন অবস্থায় এক লাখ টাকা পেলে তো তার লুফে নেয়ার কথা!'

'কিন্তু এমন যদি হয় পাঁচ লাখ দেবে বলে ডেকে এনেছে মিসেস খন্দকার, তারপর একলাখের বেশী দেয়া যাবেনা এমন কিছু বলেছে, যেজন্য হঠাৎসে ক্ষেপে গিয়ে খুন করে ফেলেছে তোজাম্মেল?'

হাসনাইন ক্রুর হাসি হাসে, বলে, 'রাজু, তোমার কি মনে হয় তোজাম্মেল রাগের মাথায় মিসেস খন্দকারকে খুন করেছে?'

'হতেও তো পারে স্যার!'

'তুমি খুনীর পুরো প্ল্যানটা দেখতে পাচ্ছোনা এখানে? প্রথমতঃ সায়নাইড বিষ তো সেই টেবিলে সে হঠাৎ পেয়ে যায়নি, আগে থেকেই কিনে পকেটে করে নিয়ে এসেছে। তাছাড়া দেখো, ডিএনএ টেস্টে দুটো গ্লাসেই শুধু মিসেস খন্দকারের ডিএনএ পাওয়া গেছে গ্লাসে। তার মানে কি?'

'মিসেস খন্দকারই দুটো গ্লাসের মদ খেয়েছেন?'

'তা তো বটেই, আরেকটু ঘুরিয়ে বললে, তোজাম্মেল মদের গ্লাসে একটি চুমুকও দেয়নি! এবং, মজার কথা হলো, সেটাও তার প্ল্যানেরই একটি অংশ। এটা নিশ্চিত যে খুনটি প্ল্যান করে করা হয়েছে। রেডড্রাগনের টেবিলে বসে মিসেস খন্দকার টাকা দিতে অস্বীকার করেছেন বা নামমাত্র একলাখ টাকা সেধেছেন আর তাতে খুনী রেগেমেগে তাঁকে খুন করেছে এমনটা হবার কথা না।'

'হুমম, তা বটে। তারমানে ঘটনা হয়েছে এরকম, বলি?', উত্তেজিত কন্ঠ রাজুর, 'সায়নাইড মেশানো ছিলো কিন্তু খুনীর গ্লাসে, তারমানে খুনী নিজেই গ্লাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একফাঁকে মিশিয়ে ফেলেছে, আর সেজন্যই গ্লাসে চুমুক দেয়া তারপক্ষে সম্ভব হয়নি, তাইনা?'

'হ্যাঁ, ঠিক ধরেছো। মিসেস খন্দকার যে খুব বুদ্ধিমান মহিলা তা খুনী জানতো,যেজন্য সে ভদ্রমহিলার গ্লাসে বিষ ঢেলে দেয়ার রিস্ক নেয়নি। ধরা পড়ার চান্স ছিলো অনেক বেশী। সে এখানে একটা সাইকোলজিকাল গেম খেলেছে।'

'কি রকম?'

'চিন্তা করো, খুনী কিভাবে নিশ্চিত হলো যে মিসেস খন্দকার তাঁর নিজের গ্লাস শেষ হলে খুনীর গ্লাসেও চুমুক দেবে?'

'সেজন্যই তো আপনার ব্যাখ্যাটা মিলছেনা।'

'আরে সবুর করো ভায়া, সেটাইতো সাইকোলজিকাল গেমের অংশ। এজন্যই তো শুরু থেকে আমি ধরে আসছি যে খুনটি পরিকল্পিত, এবং আমার ধারনা খুব উঁচুমানের হিটম্যান দ্বারা খুনটি করা হয়েছে।'

'ঠিক বুঝলামনা স্যার।'

'মানে হলো, মিসেস খন্দকার যে পাগলের মতো হুইস্কী ভালোবাসেন, সেটা খুনী জানতো। যেজন্য সে নিশ্চিত হয়েছে যে, সে যদি গ্লাসে চুমুক না দেয়, তাহলে সে চলে যাবার পর মিসেস খন্দকার তার গ্লাসের মদটুকুও খেয়ে ফেলার লোভ সামলাতে পারবেননা।'

'এত হুইস্কির পাগল ছিলেন?'

'হ্যাঁ, বারটেন্ডার কাবিল খুব ভালো করে জানে। এজন্যই দেখো, গ্লাসে তোজাম্মেলের হাতের ছাপগুলো এসেছে ক্রিসক্রসের মতো। রিপোর্টে দেখবে বলা আছে, একটা জায়গায় অনেকগুলো আঙুলের ছাপ একটি আরেকটির ওপর এলোমেলোভাবে ছড়ানো আছে। আর কিছু জায়গায় আলাদাভাবে একেকটা আঙুলের ছাপ আছে। মানে গ্লাস হাতে নিয়ে সে বারবার নেড়েচেড়ে মিসেস খন্দকারকে বোঝাচ্ছিলো যে সে ড্রিংক করছেনা, শুধু নেড়ে যাচ্ছে। হয়তো মিসেস খন্দকার একদু'বার জিজ্ঞেসও করেছেন যে কেন সে খাচ্ছেনা, কে জানে?'

'চিন্তার কথা!'

'আরো মজার ব্যাপার খেয়াল করো, মিসেস খন্দকার যে হুইস্কী এত ভালোবাসেন সেটা কি হিটম্যানের এমনি এমনি জানার কথা?"

'কাবিলের কাছ থেকে জেনেছে?'

'বারটেন্ডাররা খুব প্রফেশনাল। প্রত্যেক কাস্টমারের অনেক গোপন কথা তারা জানেনা, এর কথা ওকে লাগালে ব্যবসা চালানো টাদের পক্ষে সম্ভব না।'

'ওকে, তাহলে সেটা জানার কথা, দাঁড়ান, হ্যাঁ, জানার কথা মিসেসের কাছের লোকজনের।'

'সেটাই!এক্সাক্টলি! সেজন্যই আমার ধারনা মিসেস খন্দকারকে তাঁর কাছের কেউই হিটম্যান দিয়ে খুন করিয়েছে, আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট বলে দিচ্ছে সেই খুনীটা হলো তোজাম্মেল।'

ব্রেইনস্ট্রমিং থামে কিছুটা সময়ের জন্য। তারপর রাজু আবার শুরু করে, বলে, 'এমনকি হতে পারে স্যার, যে, শহরেরই অন্য কোন অভিজাত ভদ্রমহিলা মিসেস খন্দকার আর মিসেস বক্সের দুজনকেই খুন করিয়েছেন।'

"হতেই পারে", বলতে বলতেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে হাসনাইনের, "একটু দাঁড়াও" বলে তার চোখ চলে যায় তোজাম্মেলের কিচেনের দরজার দিকে, হাসনাইনের সাথে সাথে রাজুও তাকিয়ে দেখে যে একটা কিচেন থেকে একটা ইঁদুর বেরিয়ে এসে ছুটে যাচ্ছে এলোমেলোভাবে কোনদিকে। হঠাৎহাসনাইন লাফ দিয়ে ওঠে, কার্পেটের ওপরের রিমোট কন্ট্রোলারের খাপটিকে তুলে নিয়ে সেখান থেকে খানিকটা সামনে মেঝেতে পড়ে থাকা রিমোটকন্ট্রোলারের ব্যাটারী বরারবর একটা সরলরেখা কল্পনা করে এগিয়ে যায়। হাসনাইনের অতিরিক্ততায় খানিকটা বিরক্তবোধ করে রাজু, কিন্তু তাকে পাত্তা না দিয়ে কল্পিত সরলরেখা বরাবর হাঁটতে হাঁটতে কিচেনের ভেতরে ঢোকে হাসনাইন। সিংকের সামনে একটু থামে, এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে তারপর মুখের হাসি প্রসারিত করে বলে, "তবে এখন আমার মনে হচ্ছে তোজাম্মেলকে আর কোনভাবেই আমাদের হিটম্যান হিসেবে সনদেহ করা যায়না। সামথিং ইজ ডেফিনিটলি রং, রাজু, ইউ ওয়্যার ড্যাম রাইট!"

বলতে বলতে সিংকের দিকে এগিয়ে যায় হাসনাইন, হাসিমুখে সিংকের নীচ থেকে বের করে আনে এমন এক বস্তু যা দেখে রাজুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার মুখজুড়ে ফুটে ওঠে বিজয়ীর হাসি। তার সন্দেহটা যে অমূলক না, এটা অন্ততঃ প্রমাণ হলো -- এই আনন্দে সে রেডড্রাগনে হত্যাকান্ড ঠেকাতে না পারার গ্লানি থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেয় নিজেকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলা হাসনাইনকে দেখেও বোঝা যায় একটা বিশাল বোঝা তার বুক থেকে নেমে যাচ্ছে।

আনন্দে চায়ের তৃষ্ণা পায় রাজুর, তবে এই মুহূর্তে হাসনাইন ভাইকে চা খেতে যাওয়ার কথা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝে উঠতে সে পারেনা।

(চলবে)
*********************************************
সচলায়তন ব্লগে সুহান রিজওয়ানের লেখা গল্প 'ডিটেকটিভ'(http://www.sachalayatan.com/shu77han/26532)র প্লটটির উপর ভিত্তি করে লেখার একটা প্রচেষ্টা ।

বরাবরের মতো এ গল্পটিতেও নানান বিদেশী গল্পের ছায়া পাওয়া যাবে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29021298 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29021298 2009-10-06 10:54:45
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স - পর্ব ৩, ৪ পর্ব ১, ২ (Click This Link)



ঘুম ভাঙার সাথেসাথেই সারা শরীরের ভয়ানক ব্যাথা টের পায় তোজাম্মেল , কিন্তু এত ব্যাথা কেন তা ঠিক মনে করে উঠতে পারেনা। ধীরে ধীরে ঘুমভাব কাটে, টের পায়, পেরিয়েছে একটি বিশেষ রাত -- জীবনের প্রথম হাজতবাসের প্রথম রাত। গতকাল রাতের কথাও মনে পড়ে, রাতের খাবার খাওয়ার পর সোফায় বসে বসে টিভির বস্তাপচা টাইপের কোন নাটক (যথাযথ কারণেই নাম মনে নেই) দেখতে দেখতে নেতিয়ে পড়া মুড়ি চিবুচ্ছিলো সে। আধঘন্টাও পেরোয়নি, এমন সময়েই ডিবির দুই দশাসই ধরনের লোক এসে প্রায় কিছু না বলে কয়েই তাকে ধরে নিয়ে গেলো বাসা থেকে। ওয়ারেন্ট নামে কি একটা কাগজ তারা কোন একফাঁকে তাকে একনজর দেখিয়েছিলো বটে, তবে সেখানে কি লেখা আছে বা সেটা আসলেই তার নামের ওয়ারেন্ট কিনা সেটা ভালোমতো পড়ে দেখার কোন সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি বা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। কিল, ঘুষি, কলারে আর মাথায় অবশিষ্ট পাতলা চুলে পুলিশের গব্দা সাইজের হাতের পর্যায়ক্রমিক টান খেতে খেতে গাড়ীতে ওঠার সময় রাজ্যের খিস্তিখেউড় থেকে মোটামুটি যা সে পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলো তাতে বোঝা যায় যে তাকে কোন এক খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, এবং পরিপাটিভাবে খুনের কাজটি সম্পন্ন করে বাসায় এসে কোন সাহসে সে আরামে মুড়ি চিবুচ্ছিলো এর কৈফিয়তটাও পুলিশের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণই। যতবারই "স্যার আপনারা কি বলছেন কিছুই বুঝতে পারছিনা" বলার নিয়ত বা চেষ্টা করেছে সে, ততবারই ক্রুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ পুলিশ অফিসারের ডান ও বাঁহাতের যুগপৎ চাটি সেটাকে অংকুরেই বিনষ্ট করে ফেলেছিলো।

পুরো ঘটনাকে মোটামুটি কয়েক মিনিটের আকস্মিক এক টর্ণেডো বলে চিন্তা করা যায়, কি থেকে কি হচ্ছে কিছুই বোঝার উপায় নেই। পুলিশের গাড়ীতে আরো কি কি ঘটেছিলো, ঘটনার আকস্মিকতায় তার বিশেষ কিছু আর তোজাম্মেল হকের মনেও নেই। শুধু মনে আছে, হাজতে এনে ঢোকানোর আধঘন্টার মধ্যেই ডিবির লোকদুজন এসে তাকে ধরে নিয়ে গেছে এক বিশেষ অন্ধকার রূমে, যেখানে প্রায় কিছুই দেখা যায়না, এবং সেই অন্ধকারের মধ্যেই ঈর্ষনীয় দক্ষতার সাথে তাদের একজন, অথবা দুজনও হতে পারে তবে সেটা বোঝার মতো আলোও সেখানে ছিলোনা, মোটাসোটা ওজনদার একটি লাঠি দিয়ে ক্রমাগত তার পশ্চাৎদেশ আর দুহাঁটুর কাফ-মাসলে পিটিয়ে গেছে। এই মুহূর্তের অনুভূত ব্যাথা যে মূলত সেই পিটুনী খাওয়া অঞ্চল থেকেই উৎসরিত, এটাও সে এখন মোটামুটি নিশ্চিত। তাও সব কেমন যেন ঘোলা ঘোলা অনুভব হয়।

সকালের নাশতা করার পর ধীরে ধীরে সমস্ত স্মৃতি ফিরে আসে তোজাম্মেলের। গতরাতে রেড ড্রাগন বারে এক কোটিপতির স্ত্রী, আলমা খন্দকার নাম, পানীয়তে সায়নাইড ধরনের বিষের প্রতিক্রিয়ায়খুন হয়েছেন ; যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে তাকে। শুধু তাই না, সপ্তাহখানেক আগে রেড ড্রাগনেই খুন হওয়া আরেকজন কোটিপতির স্ত্রী মিসেস সিনথিয়া বক্সের মৃত্যুর পেছনেও তার হাত রয়েছে বলে পুলিশ বিশ্বাস করছে। যেজন্য সেই মামলার আলামতও আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে তারা। এই পরিস্থিতিতে গতকাল রাতে তাকে পেটাতে পেটাতে পুলিশ শুধু একটিই দাবী করেছে যে, সে যে খুনী তা স্বীকার করে নিতে। কেবল তাহলেই নাকি তার খুনের মোটিভ নিয়ে তারা নিরুপদ্রবে দ্রুত কাজ করতে পারবে। পুলিশ এও বলে রেখেছে যে যদি সে সব স্বীকার না করে তাহলে যে পিটুনি তার কপালে আছে সেটার একটা ভগ্নাংশের ভগ্নাংশই নাকি গতকাল তার কপালে জুটেছিলো। সেকথা মনে হতেই আতংকে সংকুচিত হয়ে পড়ে (আক্ষরিক অর্থেই) তোজাম্মেল, যদিও লম্বায় সে পাঁচ ফুট দশের কম না!

তোজাম্মেলের কিছু পরিচয় দেয়া যাক। প্রথমতঃ সে একা থাকে, বিয়ে থা করেনি, বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় সে ইচ্ছেও তার আর নেই। দু'চারবার যে বিয়ের কথা এগোয়নি তা না, তবে যেই পাত্রীপক্ষ শুনেছে যে পাত্রের পেশা শখের গোয়েন্দা, অমনি মেয়ে বিয়ে দেবার শখও তাদের মিটে গেছে। তবে এ নিয়ে বিশেষ একটা দুঃখ তোজাম্মেলের নেই, যতটা না দুঃখ আছে তার শখের গোয়েন্দাগিরি ক্যারিয়ারের ক্রমাগত পতন নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে পারা নিয়ে। বিশেষ করে গত মাসে যখন এক ভদ্রমহিলা খুব শংকিত মুখে তাঁর কাছে রহস্যউদঘাটনের অনুরোধ করলেন, এবং বিনিময়ে সম্মানী হিসেবে এক হালি মুরগীর ডিম তাও আবার পঁচা ডিম পড়লে পাল্টে দেবেননা এই শর্তে প্রদানের অঙ্গীকার করলেন, তখন তোজাম্মেল হোসেনের কিছুক্ষণের জন্যও মনে হয়েছিলো যে এর চেয়ে বিয়ে করলেই বেশী ভালো হতো। তবে ভদ্রমহিলাকে সে দোষ দেয়না, কারণ, পরপর চার-পাঁচদিন খোঁয়াড়ের মুরগীর ডিম উধাও হয়ে যাবার রহস্য সমাধানের জন্য এর চেয়ে বেশী আর কিইবা দিতে পারতেন তিনি।

তোজাম্মেলের গোয়েন্দা ক্যারিয়ারের পতন হঠাৎ করে না। একসময় ঝানু গোয়েন্দা হিসেবে তার খ্যাতি ছিলো, বিশেষ করে তার বুদ্ধিবৃত্তীয় উৎপাতে শহরের ধনিকশ্রেনীর ভদ্রলোকদের সময় থাকতেই রাতে বাড়ী ফিরতে হতো এবং সে কারণে ধনিকশ্রেনীর নারীমহলে তার একধরনের জনপ্রিয়তাও ছিলো। কিন্তু সেই সুনাম সে ধরে রাখতে পারেনি, একের পর এক আপডেট এসেছে অপরাধজগতে, শার্লক হোমস বা ফেলুদা পর্যায়ের জ্ঞান দিয়ে এযুগের অপরাধীদের আর বাগে আনা যায়না। তারওপর মোজাম্মেল হকের মতো চতুর এবং একই সাথে নিষ্ঠুর লোক যখন একই শহরে গোয়েন্দাগিরিতে নাম লেখালো, তখন ধীর ধীরে সে দেখতে পেলো যে এ শহরের গোয়েন্দাবৃত্তিতে একদা স্বগর্বে বিরাজমান তোজাম্মেল নামের 'ত' অক্ষরটি ক্রমেই 'ম'-এ রূপান্তরিত হচ্ছে।

তবে এটা সত্য যে, ঠিক এই মুহূর্তে সে যে সমস্যায় পড়েছে তাতে তার গোয়েন্দা ক্যারিয়ার অধঃপতনে কেন, গোল্লায় গেলেও তার কিছু যায় আসেনা। পুলিশ ঠিক কি কারণে তাকে সন্দেহ করেছে তা সে জানেনা, তবে কোন কারণ ছাড়া যে দৈবচয়নের ভিত্তিতেও তাকে পুলিশ ধরে আনতে পারে এ সম্ভাবনাটিকেও সে নাকচ করে দিতে পারছেনা। সেজন্যই এখন তার করণীয় হচ্ছে আসলে কি ঘটেছে তা জানা, তারপর কোনভাবে উকিল-টুকিল ধরে জামিন নেয়া, আর সবশেষে এই সমস্যার হাত থেকে তাকে রক্ষার জন্য মোজাম্মেল হক বা সেরকম কারো দ্বারস্থ হওয়া। যদিও মোজাম্মেলকে এখনও সে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীই ভাবতে পছন্দ করে, তবে হাজতে এহেন পিটুনী খাওয়ার পর মাথা কাজ না করাটাই স্বাভাবিক এমন কোন অজুহাতের ভিত্তিতে মোজাম্মেলের কাছে যাওয়াটাকে সে মনে মনে সিদ্ধ করে নেয়। 'লোকে কি ভাববে' এধরনের দুশ্চিন্তা যে তার মাথায় আসেনি তা না, তবে সেটাকে এই মুহূর্তে পাত্তা না দেয়ার সিদ্ধান্তেই সে অটল থাকে।

হাজতকক্ষে উবু হয়ে বসে এহেন নানারকম চিন্তায় যখন মশগুল ছিলো তোজাম্মেল, তখনই পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। আবারও ডিবি, তবে আজ ভিন্ন দু'জন। এদের চেহারা দেখে ঠিক এই মুহূর্তে বোঝার উপায় নেই যে গতকাল রাতের দুই সীমারের চেয়ে এরা বেশী নাকি কম নিষ্ঠুর । তবে দুজনের মধ্যে বস্ বা সিনিয়র গোছের যে লোকটি সে যখন নিজেকে হাসনাইন মাহমুদ এবং তার সহযোগীকে রাজু আহাম্মেদ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো সৌজন্য দেখালো তখন বুকে কিছুটা হলেও বল ফিরে পায় তোজাম্মেল। মনে মনে ভাবে, পুলিশের ছত্রিশ ঘা যাতে কাল রাতেরটাই হয়, আজ যেন আঠারো, না দশ ঘাতেই পার হয়। বিধাতার লীলা বোঝা বড়ই কঠিন, এতদিন যখন সে একটা স্ট্যান্ডার্ড কেসের জন্য বসে বসে প্রার্থনা করতো তিনি মুখ ফিরিয়ে চাননি, আর আজ এই হাজতেই যেন তিনি মুখ ফিরিয়ে দেখলেন! কারণ, তোজাম্মেলকে অবাক করে দিয়ে ডিটেকটিভ হাসনাইন শুধু নিজেদের পরিচয় দেবার সৌজন্যতাই দেখায়নি, ইনভেস্টিগেশন রুমে নিয়ে যেতে যেতে সে এও বলে রেখেছে যে, 'তোজাম্মেল সাহেব, আপনার কোন ভয় নেই, আমরা আপনাকে প্রশ্ন করবো, আপনার ইচ্ছে হলে উত্তর দেবেন, ইচ্ছে না হলে দেবেননা; তবে একটা কথা, কোন মিথ্যা বলবেননা, মিথ্যে ধরা পড়লে শাস্তি অনেক বেড়ে যাবে'। ডিবি ইন্সপেক্টরের মুখে 'সাহেব', 'আপনি' এসব সম্বোধন শুনে কিছুটা অপটিমিস্টিক হবার সাহস পায় তোজাম্মেল, সহসা পিটুনি খেতে হবেনা নিজেনিজেই এরকম একটি সম্ভাবনা কল্চনা করে নিয়ে ভেতরে ভেতরে খুশীতে সে আটখানা, তবে সে আনন্দ তো আর প্রকাশ করা যায়না তাই খানিকটা ভয়মিশ্রিত মূলতঃ নির্লিপ্ত মুখেই থাকতে হয় তাকে। দড়ি ধরা সেন্ট্রির পাশে তাই দীর্ঘদেহী তোজাম্মেলকে ঋজুভঙ্গিতে হেঁটে যেতে দেখা যায়, পেছন পেছন আসে হাসনাইন রাজুকে নিয়ে আর ভাবতে থাকে কিভাবে প্রশ্ন করলে দ্রুত কথা আদায় করা যেতে পারে তা নিয়ে।

গতকালের অন্ধকার কামরার তুলনায় অনেক পরিপাটি আজকের জেরাকক্ষ। একটি টেবিল আর তিনটি চেয়ার ঘরের ভেতর, টেবিলের দরজার দিকটায় ইন্সপেক্টরের বসার জায়গা, পাশে আরেকটি চেয়ার আর তার সামনে একটি টাইপরাইটার। টেবিলের অন্যপাশের চেয়ারের পেছনেই বিশাল জানালা, এই জানালার শিকেই তোজাম্মেলকে বেঁধে রাখা দড়ির আরেকপ্রান্ত বেঁধে তাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে চেয়ারে। দরজার ওপাশেই করিডোরে সারাক্ষণ দুজন সশস্ত্র গার্ড পায়চারী করছে, মোট আটটি কক্ষে চলা জেরার আসামীরা যাতে কোন অঘটনা না ঘটায় তার দায়িত্ব এদু'জনের। এসবই তোজাম্মেলকে দেখিয়ে নিয়েছে হাসনাইন, যাতে নিজের ক্ষতি বাড়ে এরকম কোন কুমতলব তার মনে উঁকি না দেয়।

চেয়ারে বসে থিতু হয় দুই গোয়েন্দা, হাসনাইন নিজে একটি সিগারেট ধরিয়ে আরেকটি বাড়িয়ে দেয় রাজুকে, তারপর তাকায় তোজাম্মেলের দিকে, বলে, 'সিগারেট খান?খাবেন?'
বিস্ময়ে দুচোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হয় তোজাম্মেলের! দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, 'দিন স্যার, খাই। তবে স্যার বীয়ার হলে কিন্তু জমতো!'
'কি জমতো?'থতমত খায় হাসনাইন।
'এই যে এই আলোচনাটা।' তোজাম্মেল যেন হঠাৎ অনেক সাহস পেয়ে বসে।
'আপনি কি মস্করা করছেন?' স্মিতহাসি ঝুলিয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করে হাসনাইন। রাজুর দু'চোখ বিস্ফারিত হয়ে থাকে তোজাম্মেলের দিকে, আগুণ বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন প্রায়।
বেশী বলে ফেলেছে বুঝতে পারে তোজাম্মেল, ডিবির মুড যাতে নষ্ট না হয়ে যায় তাই তাড়াতাড়ি বলতে থাকে মোজাম্মেল, 'না স্যার, ঠিক তা না। তবে গতকালের চেয়ে আজ অনেক ফ্রেন্ডলি পরিবেশ তো, সেজন্যই সাহস করে বলে ফেললাম। ঠিক আছে স্যার, অসুবিধা নেই, সিগারেটেই হবে।'
'ওহ, সেটা বলুন। ইনভেস্টিগেশনের সময় এ্যালকোহল নিষিদ্ধ। আর হাজতেও।' হাসনাইন গুছিয়ে বলার চেষ্টা করে।
'তাই নাকি! জানতামনা তো!!' তোজাম্মেলের কন্ঠে আড্ডাবাজির সূর।
'ঐ ব্যাটা তোরে কি জামাই আদরে রাখবো হাজতে!'পাশে বসা রাজু আহাম্মেদ আর দমিয়ে রাখতে পারেনা নিজেকে, ক্ষেপে গর্জে ওঠে; হাসনাইন হাতের ইশারায় থামায় তাকে, বুঝতে পারে, শীগগিরই আসল কাজ শুরু করা দরকার।



'মিঃ তোজাম্মেল, আপনি জানেন তো আপনাকে কেন গ্রেফতার করা হয়েছে।' হাসনাইন জেরার কাজ শুরু করে।
'স্যার শুধু জানি যে আলমা খন্দকার নামে এক কোটিপতির স্ত্রীকে হত্যা করার দায়ে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তিনি কে ..'
'আমি সেটা জানতে চাইনি। আপনাকে যা যা প্রশ্ন করবো সেটার উত্তর দেবেন।'
'স্যরি স্যার, ঠিক আছে, যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে।'
'গুড! এখন বলুন এই খুন সম্পর্কে আপনি কি কি জানেন।'
'আমি! আমি স্যার কিছুই জানিনা!'
'একটু আগেই না আপনি ভদ্রমহিলার নামধাম বললেন! এখন বলেন কিছুই জানেননা? হাউ ফানি!' মিটিমিটি হাসে হাসনাইন।
'না স্যার, মানে গতকাল রাতে পিটুনী খেতে খেতে যা যা শুনেছি তাই জানি।'
'বলুন, সেটুকুই বলুন।'
'স্যার, গতকাল সন্ধ্যায় রেড ড্রাগনবারে আলমা খন্দকার খুন হয়েছেন। তাঁর ড্রিংকসে নাকি সায়নাইড জাতীয় বিষ মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। এবং আমাকে বলা হয়েছে সপ্তাখানেক আগে সিনথিয়া বক্স নামের আরেকজন ভদ্রমহিলা যে খুন হয়েছেন রেডড্রাগনে সেজন্যও পুলিশ আমাকেই সন্দেহ করছে।'
'সিনথিয়া বক্স কিভাবে খুন হয়েছে আপনার মনে আছে?'
'হ্যাঁ স্যার, টিভিতে অনেকবারই রক্তাক্ত ছুরি, খুনের স্পট দেখানো হয়েছে। আর যেহেতু রেড ড্রাগনে আমি মাঝেমাঝে যাই, সেখানকার বাথরুমটি ছবি দেখেই চিনে ফেলেছি।'
'বাহ, আপনি তো একেবারে গোয়েন্দাদের মতো করে কথা বলছেন! ওহ তাইতো, আপনি নিজেও তো ফ্রিল্যান্স গোয়েন্দা ছিলেন।'
'ছিলাম না, এখনও আছি।' কন্ঠস্বর দৃঢ় হয় তোজাম্মেলের।
'ওহ স্যরি স্যরি, তা আপনাদের ফ্রিল্যান্স গোয়েন্দাদের অপরাধ দমনের সুনামের পাশামপাশি হিটম্যান হিসেবে ভাড়া খাটার বদনামটাও যে ছড়িয়ে পড়ছে, তা থেকে আপনাকে আলাদা করে দেখবো কোন হিসেবে, মিঃ তোজাম্মেল?'
'স্যার, আলাদা করার তো উপায় নেই। তবে এটুকু বলে রাখি স্যার, এই গোয়েন্দাগিরির জন্য আমি আমার পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করেছি স্যার, বিয়ে করতে পারিনি, চাইলে চাকুরী একটা যে যোগাড় করতে পারতামনা অতটা নিষ্কর্মা আমি নই। তারওপর, বাবাও ত্যাজ্য করেছেন আমায় আজ পনেরো বছর, কাছের এক বন্ধুর অপরাধ ফাঁস করে দিতে হয়েছে নৈতিকতার দায়ে, কাজের কাজ যা হয়েছে, পুরো বন্ধুমহলই হারিয়েছি। আমার গোয়েন্দা ক্যারিয়ারের রেকর্ডই স্যার আমার পক্ষে কথা বলে। আমি মোজাম্মেলদের মতো পেশাদার নই।'
'পেশাদার মানে!'
'পেশাদার মানে পেশাদার, সে যেমন টাকার জন্য রহস্য উদঘাটন করে তেমনি টাকা পেলে রহস্য চাপাও দিয়ে ফেলতে। কাহিনীর মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেয়। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত একটা!'
'হিটম্যানের কাজ করেনা?'
'না স্যার, সেরকম কখনও শুনিনি।'
'আচ্ছা, একটা প্রশ্ন আমার মনে খচখচ করছে, জিজ্ঞেস করেই ফেলি, আপনারা শহরের দুজন সবচেয়ে বিখ্যাত গোয়েন্দা, ঠিক আছে, তা আপনাদের নামের এত মিল হলো কিভাবে?' হাসনাইন কথা ঘোরায়।
'সেটা আমি কিভাবে বলবো?' বিরক্তি প্রকাশ করে তোজাম্মেল, 'নিশ্চয়ই আমার নাম নকল করে রেখেছে, আপনি লোকজনকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, ওর অনেক আগে থেকেই আমি এ শহরে গোয়েন্দাগিরি করি। আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকেই কিশোরগোয়েন্দা ছিলাম, ত্রিশ বছর আগের কথা!'
'কিন্তু মোজাম্মেল যে বলে ও আপনার চেয়ে বয়েসে বড় ...' হাসনাইনের কথা শেষ না হতেই রীতিমতো গর্জে ওঠে তোজাম্মেল, 'বললেই হলো নাকি! বয়েসে ও আমার কমসেকম দশ বছরের ছোট হবে, সেদিনের পিচ্চি ছোকড়া! আমার নাম শহরের লোক আগে জেনেছে।'
জেরা কক্ষে বসে ইন্সপেক্টরকে যেভাবে ঝাড়ি দিয়ে কথা বলে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরে হঠাৎনিজেই অবাক হয়ে যায় তোজাম্মেল! একবার ভাবে নিজেকে চিমটি দিয়ে দেখে এ কি স্বপ্ন কিনা। অবশ্য অতদূর যেতে হয়না, ইন্সপেক্টরের পাশে বসা সহযোগীর হিংস্র-ক্ষুব্ধ চেহারা দেখে পরমুহূর্তেই সে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায়।

'যাই হোক নামের মিল বড় কথা না' বলে হাসনাইন আবারও জেরা শুরু করে। জিজ্ঞেস করে, 'আর কিছুই জানেননা?'
'না স্যার!'
'কাল রাতে রেড ড্রাগনে মিসেস খন্দকার আর তার খুনী যে একসাথে ড্রিংক করছিলো সেটা জানেন?'
'স্যার কি করছিলো তা তো বিশদ শুনিনি, তবে যেহেতু ড্রিংকসে বিষ মিশিয়ে দেয়া হয়েছিলো তাই ধরে নেয়া যায় যে পাশাপাশি বসেই ড্রিংক করছিলেন হয়তো। অবশ্য ডান্সের সময়ও হাতে গ্লাস থাকা রিস্কি। সহজেই পাশের কেউ বিষ মিশিয়ে দিতে পারে।' বলেই নিজেকে থামিয়ে ফেলে তোজাম্মেল। 'কি বলতে কি বলে ফেলি!গাধাগুলো সেখান থেকে কোন ধরনের ক্লু বের করে কে জানে!' মুহূর্তের ভাবনা কাজ করে তোজাম্মেলের, হাসনাইনদের আচরণ যতই ভদ্র হোক, তাদের বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে এখনও তোজাম্মেলের সন্দেহটা থেকেই যায়।
'থেমে গেলেন যে!' ক্রুর হাসি হাসে হাসনাইন।
'না, স্যার, এমনি।' আমতা আমতা করে তোজাম্মেল, 'না জেনে আন্দাজে আন্দাজে আর কি বলবো বলুন!'
'আচ্ছা এখন বলুন খুনের সময় আপনি কি করছিলেন?' প্রসঙ্গ পাল্টায় হাসনাইন।
'স্যার খুনের সময়টা আমি আসলে প্রিসাইজলি জানিনা। কাল রাতে হয়তো শুনেছিলাম, কিন্তু আকস্মিক এই বিপদে এতটাই বিস্মিত হয়ে পড়েছি যে অনেক কিছুই মনে করতে পারছিনা।'
'বাহ্, অভিনয় তো ভালোই পারেন মনে হচ্ছে। আচ্ছা বলছি, গত রাত আটটা বিশ থেকে আটটা পঁয়ত্রিশের মধ্যে।' বলতে বলতে হাসনাইন তার ল্যাপটপ খোলে, ওয়াইম্যাক্সের কল্যাণে খুব দ্রুত থানার ডেটাবেসে ঢোকে।
'স্যার, গতকাল পুরো সন্ধ্যেটাই আমি বাসায় ছিলাম, টিভিই দেখেছি শুধু, আর রাতের খাবার রেঁধেছি। ঠিক কোন সময়ে কি করছিলাম খুঁটিনাটি তো মনে নেই, তবে সম্ভবতঃ ঐ সময়টায় রান্না করছিলাম।'
'আপনার কোন এ্যালিবাই বা প্রমাণ আছে? কেউ সাক্ষী দিতে পারবে?'
'স্যার, আমি তো একা থাকি। কে সাক্ষী দেবে?'
'এই ধরুন বাসার দারোয়ান বা পাশের বাসার লোক।'
'আমার বাড়িওলার তো দারোয়ান নেই স্যার, পাশের বাসার লোকজনের সাথেও আমার তেমন জানাশোনা নেই।'
'কারো সাথে ফোনে কথা বলেছেন?'
'না স্যার, আমি কোথাও ফোন করিনি। ওহ, তবে এক ভদ্রমহিলা ফোন করেছিলেন, তাঁর মুরগীর ডিমচোর ধরা পড়েছে এই খবর জানাতে, আমি তাঁকে অভিনন্দনও জানিয়েছি।'
রাজুর বাড়িয়ে দেয়া চার্জশিটের খসড়ায় চোখ বুলায় হাসনাইন, গতরাতেই তোজাম্মেলের মোবাইল ফোনে আসা একমাত্র কলের কলার আইডি থেকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ, মুরগীর ডিম চুরি হওয়া নিয়ে বিপদগ্রস্ত জনৈকা মহিলাই ফোন করেছেন তোজাম্মেলকে, তবে সেটা সোয়া সাতটার দিকে। সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে হাসনাইন।

'স্যার একটা কথা বলি?' ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে তোজাম্মেল।
'করুন'
'আমাকে আপনারা সন্দেহ করছেন কিসের ভিত্তিতে?'
'মিঃ তোজাম্মেল, আপনাকে এই শহরে ডিটেকটিভ তোজাম্মেল ছাড়াও আরো একটি নামে চেনে সবাই, বলুনতো সেটা কি?'
'হ্যাটপরা ডিটেকটিভ! এতে সন্দেহের কি আছে?'
'আর আপনার কালোরঙের বিশালাকায় বুটজুতোটিও লোকে চেনে, জানেননা হয়তো।'
'জানবোনা কেন স্যার, আমার জুতোটি যথেষ্ট বিখ্যাত। ওটা নিয়ে তিন বছর আগে দক্ষিণ ঠাটারিপুরের নিউজলেটারে আর্টিকেলও ছেপেছিলো ছেলেরা। কিন্তু আমার হ্যাট আর জুতো কি করেছে স্যার?'
'তোজাম্মেল সাহেব, অভিনয় করবেননা, ওটা আমি পছন্দ করিনা। খুনীকে আমরা সিসিটিভির ফুটেজে সনাক্ত করেছি। যদিও তার চেহারা মোটেও দেখা যাচ্ছিলোনা অন্ধকারে, তবে তার হ্যাট আর জুতোর আদল এবং বড় বড় গোঁফ -- এসবের ছায়া কিন্তু স্পষ্টই ধরা পড়েছে।' হাসনাইনের কন্ঠ গম্ভীর হতে থাকে। সে ল্যাপটপ টেবিলে রেখে ওয়াইম্যাক্সের মাধ্যমে তোজাম্মেলকে দেখায় ভিডিও ফুটেজের কিছু অংশ, কত সহজ হয়ে গেছে জেরা করা এই ওয়াইম্যাক্সের কল্যাণে -- ভাবে হাসনাইন। রাজুর দিকে তাকিয়ে বলে, 'ওয়াই-ম্যাক্স জিনিসটা অসাধারণ? এই খুপরীর মতো জেরার ঘরেও কাজ করে!'
রাজু সাথে করে আনা ছবির হার্ডকপি প্রিন্টও বাড়িয়ে দেয় তোজাম্মেলের দিকে। কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে একটি ছায়ামূর্তি, তার মতোই পাঁচফুট দশ ইঞ্চির কাছাকাছি লম্বা। বিস্ময়ে নীল হয়ে যায় সে, মুহূর্তেই সব ভুলে নির্লিপ্ত হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তোজাম্মেলের; ছবিতে যে ছায়াটা দেখা যাচ্ছে তা তো অবিকল সে নিজেই!

হাসনাইন গভীরভাবে লক্ষ্য করে তোজাম্মেলকে, যদি সে অপরাধী না হয়, তাহলে ছবিগুলো দেখার মুহুর্তেই ক্ষুব্ধ হবার চেয়েও অনেক বেশী অসহায় বোধ করার কথা তার। ক্ষোভটা আসার কথা প্রাথমিক বিস্ময়টুকু কাটবার পরে। আর, সে অপরাধী হলে ভিন্ন কথা, তখন নিজের বোকামীর জন্য নিজের ওপর রাগ হবে শুরু থেকেই। তোজাম্মেলর চেহারায় ক্ষোভের প্রকাশ পায় অনেক দেরীতে, এবং সেটাই স্বাভাবিক কারণ হাসনাইন আর রাজু না জানলেও আমরা জানি যে সে খুনী নয়। যাই হোক, তোজাম্মেলের সেই মুখোভঙ্গি হাসনাইনকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করে যে হয় সে নিরপরাধ, না হলে সে অপরাধী এবং একই সাথে বিরাট অভিনেতা। তবে এই মুহূর্তে তার হাতে যে প্রমাণ আছে তাতে যে দ্বিতীয়টির সম্ভাবনাই তার কাছে অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়।

আবারও তোজাম্মেলই নীরবতা ভাঙে, বলে, 'স্যার, এমন হতে পারেনা যে কেউ আমাকে ফাঁসিয়ে দেবার জন্য এরকম সাজ নিয়ে খুন করেছে?'
'অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু সেটা কেন করবে? আপনার সাথে কি কারো মনোমালিন্য আছে?'
'সেরকম তো কিছু মনে পড়ছেনা স্যার।'
'তাহলে বলুন, শুধু শুধু আপনাকে কেউ ফাঁসাতে যাবে কেন কেউ?'
'তাও বটে!' অজান্তেই বলে ফেলে তোজাম্মেল।
চিন্তার গোলকধাঁধায় পরে যায় তোজাম্মেল, তবে সে ধাঁধা কাটতে না কাটতেই হাসনাইনের কন্ঠ শোনা যায়,
'আচ্ছা তোজাম্মেল সাহেব, আপনি কি ডান হাতি না বাঁহাতি?'
'ডানহাতি, স্যার।'
'গ্লাস ধরলে ডানহাতেই ধরেন?'
'অবশ্যই!' জিজ্ঞাসাবাদের ঢংয়ের দীর্ঘসূত্রিতায় খানিকটা অধৈর্য্য বোধ করে সে।
'আপনি কি জানেন, যে গ্লাসটি থেকে মিসেস খন্দকার সায়নাইড বিষযুক্ত পানীয় খেয়েছেন, সেটিতে আপনার হাতের ছাপ আছে?'
'কী! কি বললেন স্যার? উনার গ্লাসে সায়নাইড মেশানো হয়নি?'
'না, এবারের খুনী একটি চমৎকার সাইকোলজিকাল গেম খেলেছে, এবং সেটা খুব বুদ্ধিমান লোকের পক্ষেই করা সম্ভব। তোজাম্মেল সাহেব, ঘটনাস্থলে পাওয়া সবগুলো প্রমাণই বলছে খুনী আপনিই। আপনার কোন এ্যালিবাইও নেই, খুনীর পোশাক আর দৈহিক গড়নের যতটুকু ধরা পড়েছে সিসিটিভিতে, এবং বারটেন্ডার কাবিলের ভাষ্যতেও আমরা যতটুকু জেনেছি তাতে সন্দেহের তীরটা আপনার দিকেই যায়। তারপর যখন সায়নাইডযুক্ত হুইস্কির গ্লাসে পাওয়া আঙুলের ছাপগুলো আমাদের ডেটাবেসে মিলিয়ে দেখা গেলো যে সেগুলো হয় মিসেস খন্দকার অথবা আপনার আঙুলের ছাপের সাথে মিলে যাচ্ছে, তখন আর সন্দেহের উর্ধ্বে আপনি থাকেন কি করে?'
'স্যার আমি কিছুই বুঝছিনা! কিভাবে এটা সম্ভব? আমি কিছুই জানিনা স্যার! আমার গোয়েন্দা ব্যবসা গত তিনবছর ধরে খুব খারাপ যাচ্ছে। আগের কেইসগুলোতে যাদের উপকারে এসেছিলাম তাদের কাছে হাত পেতেটেতে খুব নিদারুণ দিন যাচ্ছে আমার স্যার! আমি এসবে এখন আর উৎসাহিতও নই।'
'আপনার অভাব আছে দেখেই তো আমরা আপনাকে আরো বেশী সন্দেহ করতে পারি, তাইনা তোজাম্মেল সাহেব?' মিটিমিটি হাসে হাসনাইন, বলে, 'একজন গোয়েন্দা যিনি অপরাধের খুঁটিনাটি জানেন তিনি অভাবে পড়লে প্রথমেই কোন কাজটি করতে পারেন বলে ভাবা যায়, বলুনতো?'
'আগের ক্লায়েন্টদের কাছে হাত পাতা।' নির্লিপ্ত জবাব তোজাম্মেলের।
'আমি তা মনে করিনা' গলাখাকারি দিয়ে বলে হাসনাইন, 'আমার মতে সে খুব সূক্ষ্ম কোন অপরাধের পরিকল্পনা করবে, কারণ ওসব নো-হাউ তার খুব ভালো জানা থাকার কথা।'

দ্বিমতের ভঙ্গি করে তোজাম্মেল, বলে,'স্যার, একটা কথা বলি। আপনি যা বললেন, সেটা নির্ভর করবে সে গোয়েন্দাটি কি মানুষ হিসেবে ভালো না খারাপ তার ওপর। স্যার, শুধুই রোবটের মতো কোন ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রহস্য উদঘাটনের ক্ষমতা থাকলেই একজন গোয়েন্দা হওয়া যায়না। গোয়েন্দা হতে হলে যেটা সবচেয়ে বেশী জরূরী তা হলো একটা হৃদয়, যে হৃদয় সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্য মরিয়া, যে হৃদয় নিরপরাধ মানুষকে বাঁচানোর এবং একই সাথে অপরাধীকে ধরার জন্য মরিয়া। সত্যিকারের গোয়েন্দা অপরাধ করতে পারেনা স্যার।'
খানিকটা বিব্রত হয় হাসনাইন, সত্যি বলতে কি, এই মুহূর্তে তোজাম্মেল নামের এই ভদ্রলোকের কথাগুলো তাকে ভীষনভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আসলেই তো! শুধু বুদ্ধি থাকলেই তো গোয়েন্দা হওয়া যায়না, সত্য প্রকাশিত হবার আগ পর্যন্ত সে বুদ্ধিটুকু যাতে নিরলস কাজ করে যেতে পারে সে অনুপ্রেরণাটা আরো বেশী দরকার, এবং সেটার জন্য হৃদয় বা মনের তাড়না থাকা চাই।

তোজাম্মেলের জন্য খানিকটা মায়াই হয় হঠাৎ হাসনাইনের, লোকটা সম্পর্কে সে খোঁজ নিয়ে এসেছে জেরার আগে। অনেকদিন ধরে শখের গোয়েন্দা সে বটে, তবে তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে শহরে এখন অনেক সংশয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে অপরাধীরা যেভাবে নিজেদেরকে যন্ত্রপাতির ব্যবহার, যুগের হাওয়ার সাথে আপডেট করে নিয়েছে সেটা করে নিতে পারেনি তোজাম্মেল। ফলে তার পসারও কমতে কমতে প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সত্যি বলতে কি, খুনের আলামতগুলো দেখার পর হাসনাইন প্রথম যখন জেনেছে যে ধরা পড়া অপরাধী একজন শখের গোয়েন্দা, তখন তার পেট ফেটে হাসি পাচ্ছিলো এই ভেবে যে একজন শখের গোয়েন্দা কিভাবে এরকম জায়গায় জায়গায় প্রমাণ রেখে আসবে। পরে যখন তোজাম্মেল সম্পর্কে সে বিশদ জেনেছে, তখন সে বুঝেছে যে তোজাম্মেলের মতো বোকা গোয়েন্দা হলে এটা সম্ভব হতেও পারে। হয়তো সিসিটিভির ব্যাপারটিই তার মাথায় আসেনি; হয়তো পুলিশ ডেটাবেস যে খুব সহজেই হাতের আঙুলের ছাপ থেকে সম্ভাব্য অপরাধী সনাক্ত করতে পারে -- এটাই সে জানেনা অথবা কখনও শুনে থাকলেও ভুলে গেছে। সে হয়তো ধারনা করে আছে, এখনও পুলিশ একজন একজন করে সাসপেক্ট ধরে নিয়ে হাতের আঙুলের ছাপ নিয়ে নিয়ে পরীক্ষা করে মেলাবে ঘটনাস্থলে পাওয়া ছাপের সাথে।

এমন সময়েই দরজায় নক হয়, নতুন রিপোর্ট দিয়ে যান থানার সাব ইন্সপেক্টর আসলাম আলী মৃধা। মুখে বলেও যান, 'হাসনাইন ভাই, কেইসে আপডেট আসছে। মিঃ ওয়ালী বক্সের স্ত্রী সিনথিয়া বক্সের ওভার কোটের হাতাতেও আসামী তোজাম্মেলের হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। তবে মিসেস আলমা খন্দকার কেইসের ডিএনএ টেস্টের ফল নেগেটিভ। হুইস্কীর গ্লাসে মিসেস খন্দকার ছাড়া আর কারো ডিএনএ পাওয়া যায়নি।' আসলাম দ্রুত চলে যায়।
'তার মানে আপনি শুধু আলমা খন্দকার না, সিনথিয়া বক্সকেও খুন করেছেন' শান্ত কন্ঠে বলে হাসনাইন।
হাসনাইনের কথায় চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসার উপক্রম হয় তোজাম্মেলের। যতই আকস্মিক হোক, এতক্ষণ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ছিলো একটিমাত্র খুনের অভিযোগ-প্রমাণ, আর একরাতের মধ্যেই আরো একটি খুনের প্রমাণ জোগাড় হয়ে গেলো! একসপ্তার মধ্যে কি হবে! সে কি সিরিয়াল কিলার হিসেবে ঘোষিত হবে! পুলিশের এরা আসলে কি করে, এদের পারফরম্যান্সের এত করুণ অবস্থা! প্রায় কাঁদোকাঁদো কন্ঠে সে বলে, 'স্যার আপনারা এসব কি বলছেন? আমি তো কিছুই জানিনা!'
'চোপ!' এতক্ষণে ওপাশ থেকে গর্জে ওঠে রাজু আহাম্মেদ, টেবিলে সজোরে আঘাত করে বলে 'আগে বল কেন খুন করেছিস! কার প্ররোচনায়, কত নিয়ে খুন করেছিস!' হাসনাইন থামাতে চেষ্টা করে রাজুকে। তোজাম্মেল কিছু বলেনা, হা হয়ে তাকিয়ে থাকে, বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেছে সে। তবে সেটা দেখে হাসনাইন মনে মনে ভাবে, 'এ লোক গোয়েন্দা হিসেবে এখন ব্যাকডেটেড হয়ে গেলেও, অভিনেতা হিসেবে খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। কোথাও সিনেমা-থিয়েটার করতো কিনা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।'

সময় যায়, কিন্তু খুনের মোটিভ বা নেপথ্যের কারণ কি সেটা আর বের হয়না। ঘন্টাদুয়েক নানাভাবে তোজাম্মেলকে বোঝানো হয় যে পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসে কেইস ওঠার আগেই অপরাধ স্বীকার করে নিলে কি কি ভাবে সাজা কমে আসতে পারে। তবে সেগুলোর কোনটিতেই কোন কাজ হয়না, 'তোজাম্মেল লোকটা যেরকম নিরপরাধের অভিনয় করে যাচ্ছে তাতে তো মারধোর ছাড়া এই কারণ বের করতে বেশ ঝক্কি পোহাতে হবে', ভাবে হাসনাইন। কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতেই আবার প্রশ্ন করা শুরু করে হাসনাইন,
"মিঃ তোজাম্মেল, আপনি ড্রিংক করেন?"
খানিকটা ইতস্ততঃ করে তোজাম্মেল, তারপর ধীরে ধীরে মৃদুগলায় বলে "জ্বী স্যার।"
"পছন্দের ড্রিংকস কি?"
"স্যার, বীয়ার। দু'বছর জার্মানীতে ছিলাম স্যার, তখন থেকেই হেইনিকেন আর বাডওয়েইজার।"
"তাই?"
"জ্বী স্যার" একটু লজ্জিত হয় তোজাম্মেল, একটু আগে সিগারেট চাওয়ায় এই ডিটেকটিভ অফিসার তাকে সিগারেট দিয়েছিলো, এই মুহূর্তে বীয়ারের নাম শুনে হঠাৎ তার প্রচন্ড বীয়ারের তৃষ্ণা পায়, বিশেষ করে বরফঠান্ডা চিল্ড বীয়ার। তবে অতটুকু সাহস সে আর করেনা এবার, একটু আগেই একবার বীয়ার চেয়ে বকা খেয়েছে, এখন আবার চাইলে পাছে পরের সিগারেটটুকু পাবার সুযোগ হারায় কিনা; পুলিশের জাত, একবার ক্ষেপলে আর কোনভাবেই তাদের মন গলেনা।

হাসনাইন জিজ্ঞেস করে যায়, "তাহলে সেদিন রেডড্রাগনে মিস খন্দকারের টেবিলে মদের গ্লাসে চুমুকই দিলেননা কেন? হুইস্কী পছন্দ করেননা?"
"স্যার, আপনি কি বলছেন আমি কিছুই বুঝছিনা!"
"অভিনয় ছাড়ুন, অভিনয় ছাড়ুন!!" গর্জে ওঠে হাসনাইন এই প্রথম, "দেখুন, অনেকক্ষণ ধরে আপনার সাথে ভালো ব্যবহার করে যাচ্ছি, কিন্তু আপনি চটুল অভিনয় দিয়ে সেটার মূল্যটাই নষ্ট করে দিচ্ছেন! সময় থাকতেই স্বীকার করে ফেলুন, তা নাহলে কিন্তু আমি আপনাকে দাঙ্গা পুলিশের হাতে তুলে দেবো।"
"স্যার সত্যি বলছি! আমি হুইস্কি খুবই পছন্দ করি, টাকার অভাবে খেতে পারিনা। কিন্তু সেদিন আমি রেড ড্রাগনে ছিলামনা।" প্রাণপণ জবাব তোজাম্মেলের।

টুকরো টুকরো জেরা চলে আরো কিছুক্ষণ, কোন অবস্থাতেই তোজাম্মেলের মুখ থেকে বাড়তি কোন তথ্য বের করা যায়না। 'এমন ঘাঘু অপরাধী!' ভাবতে ভাবতে সেদিনের মতো হাল ছাড়ে হাসনাইন, নিরূপায় মুখে রাজুর দিকে তাকিয়ে বলে, 'রাজু, তোমার যে পরীক্ষাটা করার কথা সেটা করে ফেলো। আজ আর কথা বাড়াইনা।'

সেন্ট্রিকে ডেকে বিশেষ এ্যাপয়েন্টমেন্টে অপেক্ষমান ডাক্তারের কাছে আসামীকে নিয়ে যেতে বলে রাজু, আগের মতোই ধীরপায়ে একইরকম ঋজুভঙ্গিতে হেঁটে যায় তোজাম্মেল, তার নির্লিপ্ততা যেন আরো বাড়ে, অদৃষ্টের কোন খেয়ালের বশে আজ সে এমন বিপদে পড়েছে আর ভাবতেও ইচ্ছে করেনা তার। হাসনাইন আর রাজু দু'জনের চোখেই তোজাম্মেলের চেহারার সেই অসহায়তা ধরা দেয় ঠিকই তবে তার অনুবাদ দাঁড়ায় সম্পূর্ণ উল্টো, কারণ দুজনেই এখনও পুরো নিশ্চিত যে আসামী তোজাম্মেলই। তবে ঠিক সেমুহূর্তেও তারা জানতোনা যে একটু পরেই তাদের একজনের মনে এ নিয়ে কঠিন সন্দেহের বীজ ঢুকে যাবে।

ডাক্তারের ঘরের বাইরেই অপেক্ষায় ছিলো হাসনাইন আর রাজু; ডাক্তারকে দিয়ে যা যা পরীক্ষা করানোর কথা তা হলো তোজাম্মেলের পেটের কাছে, অথবা পাঁজরের আশেপাশে বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীন কোন ক্ষত বা আঘাত আছে কিনা সেটা খুঁজে বের করা। প্রায় মিনিট বিশেক পর ডাক্তার বের হয়ে যা রিপোর্ট দিলেন তাতে বোঝা গেল অমন কোন আঘাত তোজাম্মেলের শরীরে নেই। জিজ্ঞাসাবাদ সেদিনের মতো শেষ করে দেয়া হয়, সেন্ট্রীর বাঁধা দড়ির সাথে সাথে দীর্ঘদেহী লোকটি একইরকম বিষন্ন পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে থাকে হাজতঘরের দিকে।

ঋজুপায়ে হেঁটে চলা বিষন্ন তোজাম্মেলের চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎনিজের অজান্তেই রাজু আহাম্মেদ হাসনাইনের কব্জি চেপে ধরে, বলে উঠে, 'হাসনাইন ভাই, সামথিং ইজ ডেফিনিটলি রং!'
'মানে?'
'সেটা পরে বলা যাবে, আগে চলুন সপ্তপুরীতে গিয়ে এককাপ চা খেয়ে আসি।'

(চলবে)
*********************************************
সচলায়তন ব্লগে সুহান রিজওয়ানের লেখা গল্প 'ডিটেকটিভ'র প্লটটির উপর ভিত্তি করে লেখার একটা প্রচেষ্টা ।

বরাবরের মতো এ গল্পটিতেও নানান বিদেশী গল্পের ছায়া পাওয়া যাবে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29020751 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29020751 2009-10-05 12:26:30
ডিটেকটিভ গল্প: ওয়াইম্যাক্স (WiMAX) - পর্ব ১, ২ ১.
হোটেল লন্ডন টাওয়ার। চল্লিশ তলার রুমের জানালা আর পর্দার প্রাচীর ভেদ করে অবিরত নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে রাত দশটার ব্যস্ত শহরের অগুণতি গাড়ীঘোড়া। কিছুক্ষণের জন্য হলেও সে শব্দের ভীড়ে আলাদা করে যে বিশেষ একটি শব্দ শুনতে পাবার জন্য অকারণে বারবার অধীর হয়ে উঠছেন নাজমুল খন্দকার, সেটি হন্তদন্ত এ্যাম্বুলেন্সের 'প্যাঁ--পোঁ, প্যাঁ--পোঁ'। তবে তা শুধু খানিকটা মানসিক তৃপ্তি বা নিশ্চয়তার খোঁজেই, কারণ, খন্দকার সাহেব ভালোই বোঝেন যে রেডড্রাগন থেকে শহরের সবচেয়ে কাছের হাসপাতালে যেতে এ্যাম্বুলেন্স কোনভাবেই এই হোটেলের এক-দু'কিলোমিটার এলাকা দিয়ে যাবেনা। সেজন্যই মনের গভীরে কোথাও শব্দ শোনার আকুতি অনুভব করলেও, আদতে শব্দ শুনতে পাবেন কি পাবেননা তা নিয়ে তিনি তেমন একটা চিন্তিতও তিনি নন। নিশ্চিন্ত থাকার কারণও আছে; বেশ কিছুক্ষণ আগেই এ ব্যাপারে, অর্থাৎ তাণনর স্ত্রীকে যে বিনাঝামেলায় খুন করে ফেলা হয়েছে সে বিষয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ডিটেকটিভটি; যদিও এই ঠান্ডামাথার খুনে আর অর্থলোলুপ মোজাম্মেল হক নামের লোকটিকে ডিটেকটিভ না হিটম্যান বলা ঠিক হবে তা তিনি নিশ্চিত হয়ে উঠতে পারছেননা।

হোটেলরূমে আসার পরপরই মোজাম্মেল লোকটি শান্তভঙ্গিতে বেশ দৃঢ়তার সাথেই জানিয়ে রেখেছেন যে রেডড্রাগনের মোড়ে তিনি "ফেক আই" হিসেবে জুন্নুনকে রেখে এসেছিলেন যে কিনা ঠিক পৌণে ন'টার সময় তাঁকে একশোভাগ নিশ্চিত করেছে যে মিসেস খন্দকার খুন হয়েছেন। অবশ্য জুন্নুনের ভাষায় সেটা ছিলো 'রেড ড্রাগনে আরেকটি খুন হয়েছে, এবং ভিকটিম আবারও একজন মহিলা!' কারণ মোজাম্মেল নিজেই যে এ খুনের হোতা সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারনাও তার ছিলোনা। অবশ্য মোজাম্মেল খন্দকার সাহেবকে এটা নিশ্চিত করে রেখেছে যে, জুন্নুন ঘটনার আর কিছুই জানেনা, অর্থাৎ জুন্নুনের কাছে মোজাম্মেল নিজেকে পরিচিত করে রেখেছে শুধুই একজন অভিজ্ঞ আর তীক্ষ্ম মেধাবী ফ্রিল্যান্স গোয়েন্দা হিসেবে, যে কিনা এক সপ্তাহ আগে ঐ রেড ড্রাগনেই ঘটা মিসেস ওয়ালী বক্স হত্যারহস্যের উপর কাজ করছে।

যারা রেড ড্রাগনের কথা ভুলে গেছেন তাদের জন্য, এটি এখন শহরের সবচেয়ে জমজমাট বার, রাত ন'টা থেকে গভীর রাত মানে প্রায় তিনটা-চারটা পর্যন্ত ধুমধাড়াক্কা পার্টি, নাচ, গান, আনন্দ-স্ফুর্তি চলে এখানে। আর মোজাম্মেলকে অর্থলোলুপ ভাবারও যথেষ্ট কারণ আছে খন্দকার সাহেবের, একটিমাত্র খুন, তার জন্য গুণে গুণে বিশ লাখ টাকা দিতে হয়েছে তাঁকে! দশ লাখ এ্যাডভান্সড, বাকীটা কাল রাতের মধ্যেই দিতে হবে। চল্লিশ তলার জানালা থেকে ঘোড়েলটাকে ঘাড়ধরে নিচে ফেলে দেয়ার তীব্র যে ইচ্ছেটা খন্দকার সাহেবের হঠাৎ হঠাৎ করে উঁকি দিচ্ছে, সেটা এমনি এমনি না, এবং সে ইচ্ছেগুলোকে বারবার বেশ ঠান্ডা মাথায় দমন করার জন্য নিজেই নিজেকে বাহবাও দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আরো এলবার জেগে ওঠা ইচ্ছে দমন করতে করতেই টেবিলের ওপর রাখা মদের বোতল থেকে গ্লাসে খানিকটা ঢালতে ঢালতে সরু চোখে মোজাম্মেলের দিকে তাকান খন্দকার, শান্তভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, 'চলবে?'
মোজাম্মেল খানিকটা বিব্রত হয়, বলে, 'স্যার, আমি এ্যালকোহল খাইনা, আপনি জানেননা বোধহয়?'
'তুমি এ্যালকোহল খাও কি খাওনা সেটা জেনে আমি কি করবো বাপধন!' মনে মনে বলেন খন্দকার; তবে মুখে কিছু বলেননা। কারণ, এখন এসবের চেয়েও তাঁর কাছে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার আছে; সেটি একটি ফোন, যা তিনি আশা করছেন যে রেডড্রাগন বারের আশপাশের কোন হাসপাতাল থেকে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। রিনরিনে কন্ঠে আধুনিক হাসপাতালের রিসিপশনিস্ট তাঁকে স্ত্রীর মৃত্যুর অথবা নিদেনপক্ষে খুব জরূরী অসুস্থতার খবর দেবে। তখন তাঁকে নিঁখুত অভিনয় করতে হবে; রাতের ঘুমুবার পোশাকেই হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে যেতে হবে, বেসমেন্টের পার্কিং থেকে গাড়ী নিয়ে একটানে হাসপাতালের দিকে। সেসবের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করে রেখেছেন তিনি। রাতে সম্ভবতঃ পুলিশও আসবে হাসপাতালে, তাদের সাথে কি কি করবেন বা কি কি কথা বলবেন তাও মোটামুটি রিহার্সেলসহ ঠিক করে রেখেছেন। এখন সবার আগে যেটা করতে হবে তা হলো এই মোজাম্মেল নামের খুনেটাকে বিদায় করে দেয়া। সেজন্যই কাল বিকেল চারটার সময় কে কোথায় কিভাবে টাকা হস্তান্তর করবে মোজাম্মেলের কাছে, কাগজের ওপর পেন্সিলে এঁকে খুব দ্রুত সেসব বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন খন্দকার। কিন্তু সবকিছু ইচ্ছেমতো বা পরিকল্পনা মতো ঘটেনা সবসময়, এবং হয়তো সেজন্যই ঠিক এ সময়টাতেই হঠাৎ তাঁর সেলফোনটি বেজে ওঠে। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে খন্দকার বলেন, 'হ্যালো, নাজমুল খন্দকার স্পীকিং!'

'হ্যালো, স্যার। পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের ইন্সপেক্টর আজগর হোসেন বলছি।'
'পুলিশ! স্পেশাল ফোর্স!!' বিস্ময় চাপতে বিরক্তভাব করতে হয় মিঃ খন্দকারকে।
'জ্বি স্যার। আপনি কি এখন হোটেল লন্ডন টাওয়ারে আছেন স্যার? আমরা খানিক আগে আপনার অফিসে ফোন করে জানতে পারলাম যে আজ আপনার হোটেল লন্ডন টাওয়ারে এ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকার কথা।'
সতর্ক হয়ে পড়েন খন্দকার, খুব দ্রুত ধাতস্থ হবার চেষ্টা করেন। পুলিশ! তার ওপর আবার সরাসরি তাঁর হোটেলে! তাঁর নিজের ছক বা পরিকল্পনা অনুযায়ী এটা তো কোনভাবেই হবার কথা না! তাও নিজেকে সামলে নেন দ্রুত, বলেন, 'হ্যাঁ, আজ রাত দু'টায় এখানে এক ডেলিগেটকে রিসিভ করতে হবে, তাই আজ এখানেই থাকছি। কিন্তু পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ আমার কাছে কি চায়!'
'স্যার, আমরা এখন লন্ডন টাওয়ার মানে আপনার হোটেলের নিচতলাতেই আছি। আমরা এখুনি চলে আসছি আপনার রূমে, তারপর বিস্তারিত সব জানাবো। এই মুহূর্তে শুধু এটুকুই বলছি স্যার, আপনি স্যার কোনভাবেই রূম থেকে বের হবেননা। আর আরেকটা কথা, রূমের দরজা জানাল সব দয়া করে বন্ধ রাখুন। তা নাহলে আপনার বিপদ হতে পারে। আমরা আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসেছি, স্যার।' আজগর হোসেন একটানে বলে যায়। ওপাশ থেকে উত্তেজিত কন্ঠে "কেন! কেন!!" শোনা যায়, কিন্তু এর মাঝেই আজগর হোসেন ফোন কেটে দিয়ে বিরক্তির সাথে হোটেল লবির স্মোকিং ক্যাপস্যুলের দিকে তাকায়।

সিগারেট হাতে সেখানে নির্বিকারভাবে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের নতুন সেনসেশন, গোয়েন্দা হাসনাইন মাহমুদ; তীক্ষ্ম মেধাবী গোয়েন্দা হিসেবে খুব নাম করে ফেলেছে কজে যোগ দেবার কয়েকমাসের মধ্যেই, বিশেষ করে এক নামকরা গায়িকা আর একজন জনপ্রিয় অভিনেতার অপরাধ রহস্য সমাধান করে ফেলার পর তো দেশের সবাইই তার নাম জেনে ফেলেছে বোধ হয়। 'এখন আর হয়তো মাটিতেই পা পড়ছেনা হতচ্ছাড়ার', ভাবে আজগর হোসেন; যদিও আচার-আচরণে হাসনাইনকে মোটেও সেরকম অহংকারী বা বুদ্ধিমান কিছু মনে হয়না। একটু পাগল পাগল ভাব আছে ছেলেটার মধ্যে। হোটেল লাউঞ্জে স্মোকিং ক্যাপস্যুল দেখেই একটা সিগারেট শেষ করার জন্য চার মিনিট সময় চেয়ে নিয়েছে সে, আর পুরো সময়টুকু একেবারে তারিয়ে তারিয়ে ব্যবহার করে নিচ্ছে যেন!

অথচ একে কে বোঝাবে যে এরকম ক্রাইসিসে একেকটা মুহূর্ত কত জরূরী! মিসেস খন্দকার খুন হয়েছেন, এখন যদি মিঃ খন্দকারের ওপরও আক্রমণ আসে তবে সেটা তো ঠেকাতে হবে! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাই আজগর হোসেনের বিরক্তি বাড়তে থাকে, তবে সেটাকে একটা সীমা অতিক্রম করতে না দিয়ে মিনিট খানেকের মধ্যেই ক্যাপস্যুল থেকে বের হয়ে আসে হাসনাইন। অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে আজগর হোসেন, তবে কিছু বলটে পারেনা, সম্ভবতঃ অতিরিক্তমাত্রার বিরক্তিতে তার মুখের কথাই আটকে গেছে। হাসনাইন সেটা খেয়াল করে কিনা বোঝা যায়না, কাছে এসে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে, 'স্যার, জানেন এই হোটেলটা ফাটাফাটি। স্মোকিং ক্যাপস্যুলেও ওয়াইম্যাক্স ব্যবহার করা যায়।'
'হোটেলের লাউঞ্জে ওয়াইম্যাক্স ব্যবহার করা গেলে ধুমপানকক্ষে না যাবার কোন কারণ নেই, কক্ষটাতো আর দুইফুট পুরু লোহা দিয়ে মোড়ানো না!' বলতে ইচ্ছা হয় আজগরের, তবে অযথা কথা বাড়ানোর লোক সে নয়। তাই চেপে যায়, তবে রাগের মাত্রা তার ঠিকই চড়তে থাকে। তবে সেটা টের পেয়েই হোক বা অন্য কারণেই হোক, হঠাৎ করেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে হাসনাইন, বলে, 'ওকে স্যার, চলুন যাওয়া যাক।'


২.
পুলিশের ফোন পেয়েই ব্যস্তসমেস্ত হয়ে উঠেছিলো চল্লিশ তলার চৌত্রিশ নম্বর রূম, বিশেষ করে জনাব নাজমুল খন্দকার; পুলিশের সাথে আজ রাতেই কথা বলতে হবে এ ব্যাপারে সবরকমের মানসিক প্রস্তুতি খন্দকার সাহেবের থাকলেও, সেই দৃশ্যে যে তাঁর পাশে এই অর্থলোলুপ হিটম্যানটিকেও থাকতে হবে সেটা তাঁর ছক বা প্ল্যানের কোন অংশে কোনভাবেই ছিলোনা। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার নিয়েও তিনি বিরক্ত, সেটা তাঁর অফিস সেক্রেটারী জিনাতের ওপর। তিনি যে হোটেল লন্ডন টাওয়ারে আছেন সেধে সেধে এ তথ্য পুলিশকে দেয়ার দরকার কি! পুলিশ বলে কথা! এদের কতটুকু তথ্য দেয়া উচিত বা কতটুকু না, তা নিয়ে মহিলাকে নতুন করে এ টু জেড ট্রেনিং দিতে হবে -- মনে মনে ভাবেন খন্দকার, খানিকটা অস্থিরও হয়ে উঠতে দেখা যায় তাঁকে। পুলিশ মোজাম্মেলকে তার রূমে দেখলে কি ভাববে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় এক মুহূর্তের জন্য এও ভেবেছিলেন যে মোজাম্মেলকে বলবেন বের হয়ে চলে যেতে, সিঁড়ি দিয়ে তলা দশেক নামার পর ত্রিশ তলার স্কাই-লাউঞ্জ ক্যাফেতে গিয়ে বসে থাকলেই তো ঝামেলাটা চুকে যায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই তাঁর মনে পড়লো এই হোটেলে অন্ততঃ শ'খানেক সিসিটিভি ক্যামেরা আছে, মোজাম্মেল যে তাঁর রূমে ঢুকেছিলো এটা কোথাও না কোথাও ধরা পড়ে আছেই, কাজেই এখানে লুকোছাপা করার চেষ্টা না করাই ভালো, তার চেয়ে খুঁজেপেতে অন্য কোন পন্থা বের করতে হবে।

অস্থিরতা বাড়ে খন্দকার সাহেবের, একচুমুকে গ্লাসের সবটুকু পানীয় মুখে ঢেলে দেন ত্বরিৎ কোন বুদ্ধি আসার আশায়। কিন্তু বিধিবাম! কিছুই খেলেনা মাথায়, হতাশ বোধ করেন তিনি। তবে ভাগ্য ভালো তাঁর এটা বলতেই হবে, কারণ যখন তিনি বুঝলেন এই মুহূর্তে মাথায় কিছু আসবেনা, কিছুতেই কিচু হবেনা বা সব শেষ, ঠিক তখনই যেন মুখটা খুললেন পাশেই দাঁড়ানো ধীমান গোয়েন্দা মোজাম্মেল হক, ধীরস্থির শান্ত ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করেন, 'স্যার, আমার নিজের নম্বর ছাড়াও অন্য যে চারটি নম্বর থেকে আপনাকে আমি ফোন করেছি, ওসব কি আপনার মোবাইলের কল লিস্টে এখনও সংরক্ষিত আছে?'
'আছে তো মনে হয়?' কিছুটা আশান্বিত দেখায় খন্দকারকে।
'তাহলে স্যার সমস্যা হবেনা। পুলিশকে বলবেন যে গত কয়েকদিন আপনাকে কে বা কারা নানান হুমকি দিয়ে আসছিলো; কিন্তু ঘটনা যে এতদূর গড়াবে সেরকম হিন্টস আপনি পাননি।' এক ঢিলে দু'পাখি মরবে।
'মানে?'
একটু বিনীতভাবেই বলা শুরু করে মোজাম্মেল, 'যত যাই বলুননা কেন স্যার, এ শহরে আমার একটা ভালো পরিচয় আছে, আপনি সেটা জানেন। সো, আপনি বলবেন যে আমাকে হায়ার করেছেন ফোনে হুমকির সমস্যাটি খতিয়ে দেখার জন্য; আপনার স্ত্রী হত্যার মোটিভ, আর আমি এখানে আপনার হোটেলঘরে কেন-- দুটো ঘটনাই ব্যাখ্যা করা যাবে।'
'হুমম, সেটা কাজ করতে পারে।' খানিকটা আস্বস্ত শোনায় খন্দকারকে,'তারচেয়েও বড় কথা সেরকম কিছু বলেই বুঝ দিতে হবে, আমার হাতে বেটার কোন অপশন নেই।'
'যা ব্যবস্থা করে রেখেছি স্যার, তাতে আপাততঃ এতেই কাজ হবে।' আত্মবিশ্বাসী শোনায় মোজাম্মেলকে।

ইন্সপেক্টর আজগর হোসেনের দলে মোট ছ'জন, ডিটেকটিভ হাসনাইন বাদে বাকীরা অস্ত্রসজ্জিত, মূলতঃ খন্দকার সাহেবের নিরাপত্তার জন্যই তারা এসেছেন। অস্ত্রধারী চারজনকে বাইরে পজিশনে দাঁড় করিয়ে রেখে শুধু হাসনাইনকে নিয়ে খন্দকারের রূমের ভেতর প্রবেশ করে আজগর হোসেন। ঢুকেই সেখানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মোজাম্মেলকে দেখে খানিকটা ধাক্কা খায় আজগর হোসেন, হাসনাইনের কর্মকান্ডে বিগড়ে থাকা মেজাজটা অজান্তেই আরো খানিকটা খিঁচড়ে ওঠে। এমনিতে মুখোমুখি কোন শত্রুতা তাদের নেই, তবে অনেক আগে এক কোটিপতি খুনের মামলা, যেটা কিনা তার হাতে ছিলো, সুনিপুণভাবে উড়ে এসে জুরে বসে সেই মামলার সুরাহা করে হিরো বনে গিয়েছিলেন এই মোজাম্মেল হক। সেই থেকে লোকটার অতিরিক্ত শান্তভঙ্গি মানে "কূল গাই"মেজাজের চাল-চলন একদমই সহ্য করতে পারেনা আজগর।

তবে মেজাজ যতই খিঁচড়ে থাকুক, দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে, খন্দকার সাহেবকে সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচাতে হবে এতটুকু প্রফেশনাল দায়িত্ববোধ তার আছে। খুব সাবধানে, যাতে খন্দকার সাহেব উত্তেজিত হয়ে না পড়েন সেভাবে ধীরে ধীরে আজগর হোসেন তাঁকে স্ত্রী হত্যার খবরটি জানায়। আর তারা যে খন্দকার সাহেবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসেছেন সেটা জানিয়েও আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেল হকের সুনিপুণ অভিনয় দেখে বোঝার কোন উপায়ই থাকেনা যে এই তথ্য তাঁরা অনেক আগে থেকেই জানেন। মোজাম্মেলের পরিকল্পনা ধরেই খন্দকার জানান যে, দিন দশেক হলো কে বা কারা তাঁকে উড়ো ফোনে হুমকী দিচ্ছিলো যে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিতে হবে, না হলে তাঁর ভীষণ ক্ষতি করবে ওরা। কিন্তু ফোনের হুমকী যে এতদূর গড়াতে পারে সেটা তিনি কস্মিনকালেও ভাবেননি! প্রসঙ্গক্রমে এও জানা যায় যে বেশ কয়েকবার ফোনে হুমকী পাবার পর প্রাইভেট গোয়েন্দা মোজাম্মেল হকের সাথে তিনি যোগাযোগ করেছেন, আজ সন্ধ্যায় একটু অবসর পাওয়ায় মোজাম্মেলকে হোটেলে ডেকেছেন বিস্তারিতভাবে এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্বটি বুঝিয়ে দেবার উদ্দেশ্যেই। 'অথচ সে রাতেই ঘটনা ঘটে গেলো, এ কোন ধরনের কাকতাল!' কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজমুল খন্দকার, তাঁর নিপুণ অভিনয়ে পাষাণ সীমারের হৃদয়ও কেঁপে উঠতে বাধ্য।

সবকিছু খন্দকার সাহেবদের পরিকল্পনা মতোই এগুচ্ছিলো, তবে সমস্যা তৈরী হলো তখনই যখন আজগর হোসেন একটু চড়া গলাতেই খন্দকার সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলো যে এমন একটি সমস্যার কথা পুলিশকে না জানিয়ে কেন তিনি একজন প্রাইভেট গোয়েন্দার উপর ভরসা করতে গেলেন? মুখ ফসকে আজগর হোসেন এও বলে ফেলে যে এহেন "অর্বাচীন" সিদ্ধান্ত না নিলে হয়ত তাঁর স্ত্রীকে পুলিশ বাঁচাতেও পারতো। আজগর হোসেনের উদ্ধত ব্যবহার স্বভাবতই পছন্দ করেননি খন্দকার, বিশেষ করে তাঁর মতো এরকম প্রতাপশালী ব্যক্তিকে সামান্য এক পুলিশ অফিসার মুখের ওপর "অর্বাচীন" বলে ফেললে সেটা হজম করা বেশ কঠিনই তাঁর জন্যে। তবে খন্দকার সাহেবের ক্ষেত্রে ঠিক সেমুহূর্তে মস্তিষ্কের ক্রোধ উৎপাদনকারী অংশের চেয়ে নিজেকে বাঁচানোর অভিনব সব বুদ্ধিউৎপাদনকারী অংশটিই বেশী তৎপর ছিলো। তাই সুযোগের সদ্ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই বেশ রূঢ় বাচনভঙ্গিতে দাবী করে বসলেন যে স্ত্রীহত্যার এই কেইসে তিনি পুলিশের চেয়ে, বিশেষ করে আজগর হোসেনের মতো "মুখরা গোছের অপদার্থ"দের চেয়ে মোজাম্মেল হকের মতো ঠান্ডা মাথার ফ্রিল্যান্স গোয়েন্দার উপরই ভরসা বেশী করেন। সূতরাং তিনি মোজাম্মেলকে দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ইনভেস্টিগেশন করাবেন, এবং সে কাজে পুলিশ যাতে মোজাম্মেলকে সহায়তা করে সেটা আজগর হোসেনকেই নিশ্চিত করতে হবে -- এটুকু বলে রাগ সংবরণের অভিনয় করতে হয় তাঁকে।

যথাযথ কারণেই খন্দকার সাহেবের এরকম উদ্ভট আবদারে আরো বেশী বিরক্ত হয়ে ওঠে আজগর হোসেন, তবে সেটা যথাসাধ্য চেপে রেখেই সে খন্দকার সাহেবকে যারপরনাই বোঝানোর চেষ্টা করে যে খুনটা যেহেতু পাবলিক প্লেসে হয়েছে, তাই মামলার দায়িত্ব সরকারই নেবে প্রথমে, পুলিশকেই প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশন করতে দিতে হবে; খন্দকার সাহেব ব্যক্তিগত পর্যায়ে শুধু ইচ্ছেমতো উকিল নিয়োগ করতে পারবেন, তবে সেটা আদালতে মামলা গড়ানোর পর। তার আগ পর্যন্ত ইনভেস্টিগেশনের যে দায়িত্ব সেখানে পুলিশ বাইরের কাউকে নাক গলাতে দিতে চায়না বা রাজীও হবেনা। আজগর হোসেন তাঁকে এও জানায় যে যদি তিনি মনে করেন যে পুলিশ আসামী সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে তিনি আদালতে আবেদন করে দেখতে পারেন ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগের জন্য; তবে খুনের ঘটনার পরদিনই যদি তিনি আদালতে এমন মামলা নিয়ে হাজির হন, তাহলে সেখানে সেটা শুধু "হাস্যকর" একটি ব্যাপার হিসেবেই পরিচিত হবে।

বলাইবাহুল্য আজগর হোসেনের ব্যবহৃত এই "হাস্যকর" বা এ ধরনের আরো কিছু শব্দ ক্রমশঃ খন্দকার সাহেবের রাগের মাত্রা বাড়িয়ে চলছিলো, যার ফলে যদিও সে এরকম আরো বেশ কিছু সুন্দর যুক্তি দিয়ে খন্দকার সাহেবকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে এখনই প্রাইভেট গোয়েন্দাকে সাথে নেয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব না, কিন্তু তার যুক্তিগুলোর কোনটিই কোন কাজে আসলনা। বরং, পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দাদের উপর ভরসা করতে উপদেশ দিয়ে যখন সে খন্দকার সাহেবকে উদ্দেশ্য করে হাসনাইনকে একজন পোটেনশিয়ালসমৃদ্ধ ব্রাইট গোয়েন্দা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলো, তখন খন্দকার সাহেব আর চুপ থাকতে পারলেননা; প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে গর্জে উঠলেন এই বলে যে 'এসব সেদিনের চ্যাংড়া আর অপদার্থ ছেলেপেলের ওপর আমি ভরসা করবো কেন? আপনি জানেন আমি কে?'। সহকর্মীর অপমান হজম করতে পারেনি আজগর হোসেন, সেও তখন আর নিজের রাগ সামলাতে পারলনা, বলেই বসলো,'স্যার, আপনি কোথাকার কোন হরিদাস পাল অথবা কেমন বালস্য বাল সেটা আমার জানার দরকার হবেনা ' ।

ব্যস ওটুকুই, আরো ভয়ানক তেজে গর্জে উঠলেন খন্দকার, চীৎকার করতে করতে বললেন, 'তুমি জানো তোমাদের আর্মির প্রধান আর আমি এক কাপে কফি খাই, গলাগলি করে গলফ খেলি!! তুমি জানো তুমি কার সাথে কথা বলছো!! কালই তোমার চাকরি চলে যাচ্ছে, মনে রেখো গর্দভ!! তুমি এক্ষুণি বাসায় ফিরে গিয়ে আঙুল চোষা শুরু করো, যাও, বেরিয়ে যাও!!'
সমানতালে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আজগর হোসেনও, তার ইচ্ছা হয় বলে যে 'আর্মির প্রধানও তো আরেক ... ' তবে সেটুকু আর সাহস করতে পারেনা সে। হাসনাইনের হস্তক্ষেপে নিজেকে সামলে নেয়, তারপর শুধু ক্রুর চেহারা করে বলে, 'স্যার, আঙুল চুষতে হলে কাল থেকে চুষবো, আজ তো আর চাকুরী খেতে পারছেননা, আজ আমিই খেলা দেখাবো!'
'কি বলতে চাও তুমি?' রাগে কাঁপতে থাকেন খন্দকার সাহেব, গলার তেজ সামান্যও কমে আসেনা।
'স্যার, আপনাদের জেরা করাবো, জবানবন্দী নেয়াবো এখন, দেখি কি করেন। কেইস যেহেতু হাতে নিয়েছি, জেরা করার অধিকার কাল চাকুরী যাবার আগ পর্যন্ত তো আমার আছে, তাইনা? হাসনাইন, এদের দুজনের জবানবন্দী নাও, দুটো আলাদা ফাইলে। প্রিসাইজলি জিজ্ঞেস করবে, দে আর নট বিয়ন্ড ডাউট!'
'কত্ত বড় সাহস! কত্ত বড় সাহস!!' খন্দকার সাহেবের চিৎকারের মাত্রা আরো বাড়তে থাকে, তবে এরই মাঝে হাসনাইন মোটামুটি জোর করেই টেনেহিঁচড়ে আজগর হোসেনকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে, তারপর নিজে একা আবার প্রবেশ করে।

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে যাওয়া পরিবেশ দেখে থতমত হয়ে গিয়েছিলো হাসনাইন। বিশেষ করে এই বদরাগী ইন্সপেক্টর আজগর হোসেনের উপর বেশ বিরক্ত সে এই মুহূর্তে। এমনিতেই বেচারা খন্দকার সাহেবের স্ত্রী খুন হয়েছেন, কোথায় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁকে সান্ত্বনা দেয়াটা তাদের কর্তব্য, সেখানে যা তা বলে গালাগাল করা -- এ কেমন দায়িত্বপালন! পরিস্থিতি নিজ নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগেই ছিলো সে, ঠিকমতো জবানবন্দী নেবে এই আশ্বাসে আজগর হোসেনকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রূমের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পেরে একটু আশ্বস্তই হয়। তারপর রূমের দুই ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলে, 'স্যার আমি ভীষন লজ্জিত যে আমাদের ইন্সপেক্টর আপনার মতো সম্মানিত ব্যক্তির সাথে এরকম রূঢ় আচরণ করেছেন।'

হাসনাইনের নমনীয়তার সুযোগ নেয় মোজাম্মেল, বলে, 'ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু যেখানে ভিকটিম আমরাই সেখানে আমাদের জেরা করবেন কেন?এসব তো পুলিশের বাড়াবাড়ি, তাইনা?'

হাসনাইন বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মোজাম্মেলের দিকে, বলে, 'বোঝেনই তো স্যার, মাথা গরম করে অর্ডার দিয়েছে; তবে, নিশ্চিত থাকুন আমি শুধুই ফর্মালিটিজগুলো পালন করবো এখানে, পরে আপনারা নিজেদের সময়মতো যা বলতে চান আবারও বলতে পারবেন স্যার।' বলতে বলতে নিজের নোটবইটি খুলে একটা চেয়ারে বসে পড়ে হাসনাইন, মোজাম্মেলের দিকে তাকিয়ে বলে, 'শুধু একটিই প্রশ্ন করবো স্যার, মার্ডারের সময় হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে আজ সন্ধ্যা আটটা বিশ থেকে আটটা পঁয়ত্রিশ, সেসময়টা আপনারা কোথায় ছিলেন সেটাই বলতে হবে শুধু।'

খানিকটা চিন্তা করার সময় নেয় মোজাম্মেল, তারপর দম নিয়ে বলে 'সম্ভবতঃ অরিয়ন ক্লাবে ছিলাম আমি, দাঁড়ান' বলতে বলতে মানিব্যাগ খোলে সে। মানিব্যাগ থেকে কিছু পাঁচশো আর একশো টাকার নোটের সাথে বেরিয়ে আসে একটি রিসিপ্ট, অরিয়ন ক্লাবের রেইনবো ক্যাফের রিসিপ্ট। সেখানে লেখা সময়টা দেখে যেন একেবারে নিশ্চিত হন মোজাম্মেল, বলে ওঠেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, সন্ধ্যা সাতটা পঞ্চান্নতে আমি কফি কিনেছি সেখান থেকে, আর বের হয়েছি ক্যাফে বন্ধ হবার পর, মানে ধরুন একেবারে ন'টারও পরে। এই দেখুন' বলে রিসিপ্টটা বাড়িয়ে দেন হাসনাইনের দিকে।

মোজাম্মেলের দিকে অবাক চোখে তাকান খন্দকার সাহেব, সন্ধ্যা সাতটা পঞ্চাশ থেকে ন'টা পর্যন্ত সে অরিয়ন ক্লাবে ছিলো, তার এ্যালিবাইও আছে! তাহলে খুনটা সে করলো কখন? তার মানে খুনটা সে করেনি? অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছে? ভেতরে ভেতরে দিশেহারা বোধ করেন খন্দকার সাহেব, তবে সেটা তাঁর মুখের ভাবে প্রকাশ পায়না; ভীষণরকম বিরক্ত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকেন হাসনাইনের দিকে।

সেই রাগী রাগী চেহারা দেখে হাসনাইন ঠিক সাহস করতে পারেনা একই প্রশ্ন আবার খন্দকার সাহেবকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করতে। কিভাবে কি করা যায় এই চিন্তায় কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করতে করতে যখন তার ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা, তখনই মানীর মান স্রষ্টা বাঁচান, অর্থাৎহাসনাইনের সেলফোনটি বেজে ওঠে, এবং ফোনের ওপাশ থেকে মোটামুটি ঘরের তিনজনকেই শুনিয়ে দরাজ কন্ঠে হাসনাইনের বস শাহাদাৎসাহেব বলতে থাকেন , 'আরে এই হাসনাইন, তোমরা এখনও কি করছো ওখানে? তাড়াতাড়ি অফিসে এসো। আমরা তো অপরাধী সনাক্ত করে ফেলেছি, এমনকি হাজতেও পুরে ফেলেছি!'

অদ্ভুত দক্ষতার সাথে অজান্তেই বের হতে যাওয়া স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু সামলে ফেলেন খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেল হক দুজনেই। ঝানু অভিনেতা, বলতেই হবে। ঘাঘু গোয়েন্দা হাসনাইনেরও চোখ এড়িয়ে যায় সে অভিনয় বা প্রচেষ্টা যেটাই বলা হোক না কেন। সেখানে সে দেখে শুধু দুজন পাকা অভিনেতার জ্বলন্ত অগ্নিদৃষ্টি, যে দৃষ্টি দাবী করছে কেন তাঁদের জবানবন্দীর আদেশ দিলো পুলিশ ইন্সপেক্টর আজগর!

শাহাদাৎ সাহবের কথার জবাবে কিছুটা বিব্রত হাসনাইন বলে, 'তাই নাকি স্যার?'
'আরে হ্যাঁ, ব্যাটা এখন হাজতেই আছে। নাম তোজাম্মেল হক'
'কি বললেন স্যার!' চমকে ওঠে
'হ্যাঁ, তোজাম্মেলই তো নাম'
ভ্রূ কুঁচকে মোজাম্মেলের দিকে তাকায় হাসনাইন, তাকেও বিব্রত দেখায়।
হাসনাইন আবারও বলে, 'তো-জা-ম্মে-ল!'
'আরে হ্যাঁ! কেন? এটা মানুষের নাম হতে পারেনা? মোজাম্মেল যদি মানুষের নাম হয় তোজাম্মেলে তোমার সমস্যা কি? গোজাম্মেল বা গোঁজামিল তো আর না!! একটা অক্ষরই তো এদিক ওদিক! '
হাল ছেড়ে দেয় হাসনাইন, শাহাদাৎ সাহেবের সাথে কথা বাড়ানো অর্থহীন, সবকিছু তর্কে পরিণত হয়।

অভিনেতাযুগল অর্থাৎ খন্দকার সাহেব আর মোজাম্মেলের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাসনাইন বলে, 'আমাদের করিৎকর্মা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তো অলরেডী আসামীকে ধরে ফেলেছে; চলুন আমরা আপনাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিই।'

'জ্বী, আমরা শুনেছি' বলতে ইচ্ছা হয় মোজাম্মেলের, তবে পরপর ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনায় টেনশনে গলা প্রায় শুকিয়ে আসায় তার বদলে তিনি বললেন, 'তার আগে চলুন নিচে কোথাও বসে একটু চা খেয়ে নেওয়া যাক।'

(চলবে)
*********************************************
সচলায়তন ব্লগে সুহান রিজওয়ানের লেখা গল্প (http://www.sachalayatan.com/shu77han/26532) 'ডিটেকটিভ'র প্লটটির উপর ভিত্তি করে লেখার একটা প্রচেষ্টা । বরাবরের মতো এ গল্পটিতেও নানান বিদেশী গল্পের ছায়াদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাবে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে নিচ্ছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29020140 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29020140 2009-10-04 10:36:15
বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: ডাকাতি-লুট না অত্যাচারিতের অধিকার আদায়? প্রাককথা:
ব্লগে বদরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে একচোট হয়ে গেছে বলে শুনলাম, পড়লাম এবং এটা নতুন কোন বিষয় নয়; শতাব্দী ধরে পাশ্চাত্যের পন্ডিতদের একদল ইসলামের ইতিহাস বইগুলো থেকে সুবিধাজনক চুম্বক অংশটুকু টুকে নিয়ে মুহাম্মাদ (সাঃ) কেন নবী বা আরো সরাসরি বললে স্বর্গীয় পুরুষ হতে পারেননা সে যুক্তি দেখিয়ে চলেছেন। তাদের এসব উপস্থাপনায় অনেক সময়েই উপস্থাপিত ঘটনার আগের বা পরের কনসিকোয়েন্সগুলো উপেক্ষিত হয়। বদরের যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে ব্লগে উত্থাপিত আলোচনার বেলায়ও সেরকমটি ঘটেছে বলে মনে হলো, সেটুকু ধরিয়ে দেয়ার জন্যই মূলতঃ এই পোস্ট। ব্লগে হয়তো ইসলামের ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রী কেউ থাকলে এপ্রসঙ্গে লেখা লাগতোনা, কারণ তাঁদের তুলনায় এবিষয়ে আমার নিজের জ্ঞান যৎসামান্যই। তাও নিজে যতটুকু জানি বুঝি, সেটা তুলে দেয়ার প্রয়োজনবোধ থেকেই এ লেখা।


মদীনায় এসে কি মুসলিমরা পুরো নিরাপদ হয়ে গেলেন?
একথা সত্য যে মদীনায় হিজরত করার পর মুসলমানেরা মক্কায় অতিবাহিত আগের তের বছরের পুরোপুরি অনিশ্চিত শ্বাপদসংকুল জীবনের তুলনায় মোটামুটি একটি নিরাপদ ও নিরুপদ্রব জীবন যাপনের সম্ভাবনায় উপনীত হয়েছিলেন, এবং তখন থেকেই মদীনায় একটি ইসলামিক সমাজব্যবস্থা গঠনের দিকে তারা মনোনিবেশ করেন। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি ঠিক ফুলসজ্জার মতো ছিলোনা, কঠিন সত্য যেটা, তা হলো তারা তখনও ছিলেন সংখ্যায় অনেক কম, নিজেদের প্রায় সমস্ত সম্পত্তি মক্কায় ফেলে রেখে শুধু নিজেদের জীবনটুকু নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন মদীনায় তাদের প্রায় সবাইই। এরকম দূর্বল অবস্থায় যে কোন সময় মক্কার কুরাইশদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সদলবলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার ভয় তাঁদের ছিলো।

প্রশ্ন আসতে পারে তারা তো মক্কায় সবকিছু ছেড়ে মদীনায় চলেই এসেছিলেন, তারপরও মক্কার কুরাইশরা তাদের হত্যা বা নিশ্চিহ্ন করবে কেন? এখানে এর আগের ইতিহাসের দিকে খানিকটা তাকাতে হবে, যখন মুহাম্মাদ(সাঃ) ও তার অনুসারীদের ক্রমাগত বয়কট করে অনাহারে অর্ধাহারে একঘরে করে ফেলা হয়। উল্লেখ্য, এই সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মক্কার কুরাইশদের অত্যাচার আর অবিচারে মুসলমানেরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সেসময়ই মক্কার এলিটদের সভায় মুহাম্মাদ(সাঃ)কে নিয়ে কি করা যায় বিষয়ে আলোচনা চলছিলো। প্রথমে প্রস্তাব আনা হয় যে মুহাম্মাদ (সাঃ)কে লোহার খাঁচায় বন্দী করে জনসমক্ষে রেখে দেয়া হবে এবং না খাইয়ে না খাইয়ে একসময় মেরে ফেলা হবে। আরেকটি প্রস্তাব আসে যে মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ধরেবেঁধে দূরের কোন শহরে পাঠিয়ে দেয়া হবে এই শর্তে যে তাঁরা যাতে আর কখনও মক্খায় ঝামেলা করতে না আসে। হয়তো আরো প্রস্তাব ছিলো, তবে এদুটোই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়, যদিও নাজদ নামক এক অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী পাদ্রী (সম্ভবতঃ, ভুলে গেছি) দুটো প্রস্তাবই নাকচ করে দেন এই বলে যে এগুলোতে মুহাম্মাদ(সাঃ)এর ব্যাপারে তাঁর অনুসারীদের ভালোবাসা শুধু বাড়বেই, যা একসময় প্রতিশোধ হিসেবে ফিরে আসতে পারে। তাই যা করতে হবে তা হলো, মুহাম্মাদ(সাঃ)কে একদানে হত্যা, নিশ্চিহ্ন। একইসাথে তাঁর অনুসারীদেরও সদলবলে নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে যে এজন্য মুহাম্মাদ(সঃ) তাঁর বিছানায় আলী(রাঃ) কে ক্যামোফ্লাজ করে পালিয়ে গিয়েছিলেন মদীনায়, এবং এতে সবাই একমত যে সেদিন সে বিছানায় মক্কার বড়সর্দার আবু তালিবের পুত্রের বদলে অন্য কেউ থাকলে তাঁকেও মরতে হতো। এতটাই মরীয়া ছিলো মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ(সাঃ) আর তাঁর অনুসারীদের নির্মূল করতে। কাজেই মদীনায় পালিয়ে এসেও তাঁদের নিশ্চিত হবার কোন কারণ ছিলনা যে কুরাইশদের সেই জিঘাংসা দমিত হয়েছে।

এই অনিশ্চয়তার পেছনে আরো কারণ ছিলো। মুহাম্মাদ(সাঃ) মদীনায় এসে সবচেয়ে বেশী যেটা চেয়েছিলেন তা হলো স্থিতি আর নিরাপত্তা। সেজন্য মুসলিমরা মদীনার আশপাশের গোত্রগুলোর সাথে নানারকম নিরাপত্তা চুক্তি করে, যা করাটা সেসময় একটা সাধারণ ব্যাপার ছিলো। কিন্তু মুসলিমদের সাথে এরকম কোন চুক্তি করতে কুরায়শরা কোনভাবেই রাজী হয়নি, বরং সবসময় তাদের মনোভাব এমন ছিলো যে এসব চুনোপুঁটিদের সাথে আবার কিসের চুক্তি?


দস্যুতা না অত্যাচারিতের সম্পত্তির হিসাব
কিন্তু যে কথা মক্কার কুরায়শরা ভাবারও প্রয়োজন বোধ করেনি তা হলো মক্কায় মুহাম্মাদ(সাঃ)এর অনুসারীরা প্রায় সবাই নিজের সমস্ত সম্পত্তি ফেলে রেখে প্রাণভয়ে মদীনায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন। সাধারণ চিন্তাতেই উপরে উল্লিখিত নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি এই ফেলে আসা সম্পদ ফেরত পাবার জন্যও একটি চুক্তি মুসলিমরা আশা করেছিলেন। তবে সেটাকে কোনভাবেই আমলে নেয়নি মক্কার কুরায়শরা।

বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে এভাবে বলা যায়, ধরুন একটি গ্রামে বাঙালী নব্বই ভাগ আর অন্য পাহাড়ি দশ ভাগ। এখন বাঙালীরা যদি পাহাড়িদের উপর অত্যাচার করে এমন অবস্থা করে যে পাহাড়ীরা নিজেদের সমস্ত সম্পত্তি ফেলে রেখে শুধু জান বাঁচিয়ে দূরের আরেকটি গ্রামে যেতে বাধ্য হয়, এবং এরপর সরকারীভাবে বা দুই গ্রামের মাতব্বরদের পর্যায়ে পাহাড়ীদেরকে তাঁদের হারানো সম্পত্তি ফেরৎ দেবার কোন উদ্যোগ নেয়া না হয়, তাহলে সেই পাহাড়ীরা কি অত্যাচারিত বা দলিত নন? তাঁরা যদি এখন নিজেদের সম্পদের অধিকার আদায়ের জন্য বাঙালী এলিটদের আক্রমণ করে, সেটাকে কি দোষ দেয়া হবে না অত্যাচারিতের সংগ্রাম হিসেবে দেখা হবে? বাঙালী-পাহাড়ী উদাহরণে বুঝতে কষ্ট হলে গার্মেন্টসের মালিক- শ্রমিক সম্পর্কটা দেখুন। তখন কি আমরা শ্রমিকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাইনা?

মদীনার মুসলিমদেরও নিজেদের সম্পত্তির পুনোরোদ্ধারের জন্য এ ছাড়া আর কোন পথ ছিলোনা। সে হিসেবে তাঁরা মক্কার ধনী এলিট বনিকদের ক্যারাভান আক্রমণ করতেন, উল্লেখ্য অন্য কোন গোত্রের ক্যারাভান তারা আক্রমণ করতেননা। এখানে যে একটা অত্যাচার ভার্সেস অধিকার সম্পর্ক আছে, কেনো জানিনা, তবে সেটা কোনভাবেই তথাকথিত ইসলাম ব্যাশারদের দৃষ্টিগোচর হয়না। আবার এঁদেরই অনেকে পাহাড়ী বা শ্রমিকদের অধিকারের বেলায় ব্যাপারটা ঠিকই শতভাগ অনুধাবন করতে পারেন!


বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কি শুধুই সম্পত্তির অধিকার নাকি নিরাপত্তার নিশ্চিতকরণ
বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট হিসেবে 'মুসলিমদের দ্বারা আবু সুফিয়ানের বাণিজ্যবহরে আক্রমণের চেষ্টা' কে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারটিও সুপরিকল্পিতভাবে চালানো হচ্ছে, যদিও যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছিলো আরো অনেক আগেই। ব্যাখ্যা করছি নিচে।

ইসলামের ইতিহাস পাঠকারী মাত্রই জানেন আবু সুফিয়ানের সেই বিশাল বাণিজ্যবহর, যেটিকে মুসলিমরা আক্রমণ করেছিলেন, সেটির উদ্দেশ্য কি ছিলো। এখানে উল্লেখ্য, মক্কা থেকে ইরাক সিরিয়া রুটে সেসময় বছরে যেপরিমাণ বাণিজ্য হতো (সংখ্যাটা আড়াই লাখ দিরহাম বা এরকম কিছু হবে), আবু সুফিয়ানের ঐ এক বাণিজ্য বহরেই তার চেয়ে বেশী বাণিজ্য হয়েছিলো। প্রশ্ন হলো, কেন একটি মাত্র কাফেলা এত বিশাল বাণিজ্যে বের হয়েছিলো? এই প্রশ্নের উত্তরই বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে খোলাসা করে। সে বাণিজ্য বহরে ইনভেস্ট করেছিলো পুরো মক্কার কুরাইশদের সবাই, এর বিশালত্ব বোঝাতে যে ফ্রেজটা ব্যবহার করা হয় তা হলো, 'মহিলারা সবাই এসে নিজেদের গয়নাগাঁটি সব তুলে দিয়েছিলেন আবু সুফিয়ানের কাফেলার হাতে'। প্রশ্ন জাগার কথা, কেন এই বিশাল সামষ্টিক আয়োজন? পরের অংশে সে আলোচনা।


কুরায়শদের সবার চাঁদায় বিশাল সামষ্টিক বাণিজ্যবহরের মূল উদ্দেশ্য কি ছিলো?
এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে আরেকটু পেছনে তাকাতে হবে, নাখল নামক এক স্থানে টহলরত মুসলিমদের সাথে কুরায়শদের সংঘর্ষের কাহিনীর দিকে। সে সংঘর্ষে মুসলিমরা জর্জ বুশের "প্রিএম্পটিভ এ্যাক্টে"র মতোই আক্রান্ত হবার আগেই আক্রমণ করে বসেন এবং কুরায়শদের কয়েকজন মারা যায়। পরে অন্যান্য গোত্রের মধ্যস্থতায় মুহাম্মাদ(সাঃ) কুরায়শদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করেন। কিন্তু সে সংঘর্ষে কুরায়শদের কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে মদীনায় গিয়ে মুসলিমদের শক্তি বেড়েছে এবং বাড়ছে, এবং সেজন্যই মুসলিমদের নিশ্চিহ্ণ করার প্রস্তুতি মক্কায় শুরু হয়ে যায়।

এখানে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, মদীনার মুসলিমরা একটি আদর্শে উজ্জীবিত এবং একই সাথে মক্কার কুরায়শদের তুলনায় তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে ছিলো বেশী। কাজেই যুদ্ধের ডাকে তাঁরা নিজ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নেবেন এই নিশ্চয়তা মুহাম্মাদ(সাঃ) এর ছিলো। কিন্তু কুরায়শ নেতাদের বেলায় মক্কার যুবসমাজকে মুসলিম নিধনে উজ্জীবিত করার জন্য 'নতুন চমকদার আদর্শবাদ' বা 'অস্তিত্বের সংকটজনিত সমস্যা' এসব কিছুই ছিলোনা। এজন্যই যুদ্ধ চালাতে তাদের দরকার ছিলো বিশাল ফান্ড যা আকৃষ্ট করবে যুবকদের। তাই বাণিজ্য আয়োজনের পাশাপাশি মক্কায় শুরু হয় সৈনিক সংগ্রহের ক্যাম্পেইন, আবু সুফিয়ানের বিশাল বাণিজ্যবহরের ভাগিদার হওয়া যাবে এই আশ্বাসে কুরায়শরা প্রচুর সংখ্যক সৈন্য যোগাড় করে ফেলতে পারে। সে সংখ্যা এতই বেশী হয় যে পাশ্ববর্তী পাহাড়ের যোদ্ধাগোত্র হাবশদের থেকে সৈনিক ভাড়া করাটাকেও তারা অপ্রয়োজনীয় মনে করে, পরে অবশ্য এই ভুল নিয়ে তারা অনুতাপ করেছিলো।

যাই হোক, মূল ঘটনা হলো, যুদ্ধের জন্য এই বিশাল ফান্ড সংগ্রহেই নেমেছিলেন আবু সুফিয়ান, সবার দেয়া চাঁদায় বিরাট পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতে যাচ্ছিলেন ইরাক বা সিরিয়ায়। তাঁর সে কাফেলা মদীনা হয়ে বা মদীনার কাছ দিয়ে যায়, মুসলিম গুপ্তচরদের সন্দেহ হয়। তাছাড়া মক্কার হিতাকাঙ্খীদের কাছ থেকেও তাঁরা আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার খবর পান।

এই ঘটনাটি এখনকার দুনিয়ায় টেররিস্টদের ব্যাংকএ্যাকাউন্ট ফ্রিজিং করে দেয়ার সাথে এ্যানালজিক। আপনি যখন জানবেন যে একটি ফান্ড তৈরী হচ্ছে যা আপনার নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে, আপনাকে নিশ্চিহ্ন করবে, তখন আপনি অবশ্যই সেই ফান্ডগঠন প্রক্রিয়াকে বাঁধা দেবেন, তাইনা? মদীনার মুসলিমরা ঠিক এই উদ্দেশ্যেই আবু সুফিয়ানের কাফেলা আক্রমণ করেছিলেন।

কাজেই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কোনভাবেই এই আক্রমণ নয়, যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিলো মূলতঃ এর আগে থেকে কুরাইশদের নিতে থাকা 'মুসলিম নির্মূল প্রজেক্টে'র প্রস্তুতি -- এ কথা জলের মতোই স্বচ্ছ।

অস্বীকার করবেন? তাহলে বলুন, কুরায়শদের যদি পূর্বপ্রস্তুতি নাই থাকে, তাহলে কাফেলা পাল্টিয়ে মক্কার উপকূলে গিয়ে আবু সুফিয়ান যখন যুদ্ধের ডাক দিলো তখন এত অল্প সময়ের মধ্যে কুরায়শরা কিভাবে এত বিশাল সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হতে পারলো?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29007918 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29007918 2009-09-10 10:46:54
রোজার কথা ২
এখনও এই সিস্টেম আছে কিনা জানিনা, তবে আমাদের সময়ে রোজার মাসে স্কুল বন্ধ থাকাটা ছিল কমনসেন্সের মতো! রোজার মধ্যে আবার কিসের স্কুল!! আমি জানিনা সে যুগে স্কুল বন্ধ বেশী থাকত কিনা, তবে রোজার একমাস পুরো বন্ধ, গ্রীষ্মের ছুটি, এসএসসি পরীক্ষার ছুটি (পরে অবশ্য এসএসসি আর গ্রীষ্মের ছুটি এক করে ফেলা হয়), আরো কত বন্ধ যে ছিলো! এসব শুনলে এযুগের স্কুল-থেকে-ফিরে-দুটা-প্রাইভেট-পড়া-আর-একটা-পিয়ানো-লেসনে-দৌড়ানো বাচ্চাদের কাছে তো স্রেফ রূপকথা মনে হবে। মনে আছে কিভাবে একেকটা বন্ধের জন্য মুখিয়ে থাকতাম। পরিসংখ্যানের খেলা ক্রিকেট পছন্দ করি, সংখ্যা টংখ্যা মাপতে ভালো লাগে, সেটা সম্ভবতঃ সেই ছোট বয়েসেও ছিলো। সেজন্যই হয়তোবা, স্কুলের ক্যালেন্ডারে রোজার বন্ধের এক দুসপ্তাহ আগে থেকেই গোনা শুরু করতাম আর কয়দিন বাকী স্কুল বন্ধ হতে? কাউন্টডাউন করতে করতে হয়ত একটু ধৈর্য্যই হারিয়ে ফেলতাম, যেজন্য রোজা শুরু হবার আগের দিন আমরা ভাইবোনেরা সবাই মিলে নানান ফন্দি করে হলেও স্কুল কামাই করতামই।

যেবার ক্লাস ফোরে উঠি, সেবার খালাতো ভাইটি রায়পুর থেকে ঢাকায় এলো আমাদের বাসায় থেকে পড়বে বলে। জগতের যাবতীয় বাঁদরামি আমরা দুজন মিলে করেছি সেসময়, আমি তো বাঁদর ছিলামই, ওব্যাটা ছিলো আমার চেয়ে কয়েককাঠি বাড়া। রীতিমতো স্মার্ট পিচ্চি যাকে বলে। ছোকরা সে বয়েসেই কিভাবে যেন জেনে গিয়েছিলো যে বগলের নীচে রসুন রেখে দিলে গা গরম হয়ে যায়, স্কুল মারার অব্যর্থ ঔষধ। আর পায় কে? সেবছরের রোজা শুরুর আগের দিন স্কুল কামাই করবোই করবো, আমরা দুজনেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রান্নাঘরের টিন হাতড়ে কয়েক কোয়া রসুন নিয়ে রেখে দিলাম ব্যাগের ভেতর, রাতের বেলা আমরা দুজনেই বগলের নীচে রসুন রেখে মহা আনন্দে জ্বরের আসার অপেক্ষায়। কতক্ষণ গেলো সেটা তো এখন আর মনে নেই, তবে এটা মনে আছে যে হতচ্ছাড়া জ্বর আর আসলোনা কি ভয়ানক বিপদরে বাবা। এদিকে মাথায় চেপেছে স্কুল কামাই করবই করব! উপায়ন্তর না পেয়ে উর্বর মস্তিষ্কে (!) যে চিন্তাটা এলো সেটাই করলাম। পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আলনা থেকে নিজেদের স্কুলের শার্টদুটো নিয়ে চুপিচুপি বাথরুমের বালতিতে ভেজা কাপড়ের সাথে চুবিয়ে রেখে এসে আবার দিলাম ঘুম।

সাতটার দিকে মা যখন ডেকে ওঠালেন স্কুলে যাবার জন্য, আমরা তো আর স্কুলের শার্ট খুঁজে পাইনা! বড় আপার মনে হয় স্কুল এমনিতেই ছুটি ছিলো, মা ওকে লাগিয়ে দিলেন শার্ট খোঁজার কাজে। বেচারী সারা ঘর খুঁজেও কোন হদিস করতে পারেনা। এভাবে যখন স্কুলে যাবার সময় পেরিয়ে গেল, তখন আর আমাদের পায় কে, আমরা দুই বান্দর বারান্দায় গিয়ে বাঁদরনাচ নেচে বিজয় উদযাপন করতে লাগলাম। তবে সে নাচ বেশীক্ষণ টেকেনি, দুপুর এগারোটার দিকেই মা কাপড় কাচতে গিয়ে বের করে ফেললেন কি ঘটেছিল; তবে মা আমার চিরকালই অতিমাত্রায় মমতাময়ী, কোনদিন মনে হয় বকাও দেননি। ঝামেলাটা হলো যখন বড় আপা জানলো, তখন। বাজখাঁই গলার "এক্ষুণই হাতমুখ ধুয়ে খাতাপেন্সিল নিয়ে আয়!", শুনে গুটিগুটি পায়ে আমরা দ্বিরত্ন খাতাপেন্সিল নিয়ে এসে বসলাম সামনের রূমে। সেদিন মনে হয় এক হাজারবার "জীবনে কোনদিন স্কুল কামাই করবনা" বাক্যটি লিখতে হয়েছিলো, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ছোটখাটো-শুকনো আমি বড়বড় চোখে চিওয়াওয়ার মতো কুঁইকুঁই করেও রেহাই পাইনি!

রোজার কথা বলতে গিয়ে কি বলছি? যাক, আবার রোজায় ফিরি। কত বছর বয়েসে মনে নেই, তবে মনে আছে যে এক সময় এটা কমনসেন্সের মতো হয়ে গেল যে, যেহেতু সেহরী খেতে ভোররাতে একবার উঠতে হয় সেহেতু সকালে একটু বেশী ঘুমানো যাবে। সে হিসেবেই বাসার সবাইই রোজার মাসে সকালে একটু দেরীতে উঠত। তবে একদিন সকালে টের পেলাম রোজা হোক বা যাই হোক বাবাকে ঠিকই সকালে উঠে জামাকাপড় পরে অফিসে ছুটতে হয়। বাবার এই কষ্টটা দেখে সে বয়েসেও আমার কাছে একটা ব্যাপার আজব লাগত, একে ওকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, রোজা রাখে বড়রা, আর স্কুল ছুটি হয় ছোটদের -- কেন? তবে সেটা কখনই এই অর্থ বহন করতনা যে আমাদের স্কুল ছুটি দেয়া বন্ধ করে দাও, বরং সেটার মানে এটাই ছিলো যে বাবাদেরও অফিস ছুটি দিয়ে দাও। বাবার একটা জিনিস ভালো ছিলো যে ছুটির দিন তিনি উদার হয়ে যেতেন। সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরলেই হতো, সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ালেও কিছু বলতেননা। কাজেই ছুটির দিনে বাবার বাসায় অবস্থানটা তেমন কোন সমস্যা তৈরী করতনা। বরং, বাবার কারণে একটা ঢাল তৈরী হয়ে যেত, আপারা অত মাতব্বরি ফলাতে পারতনা।

এবার আসি বন্ধুবান্ধবদের কথায়। সেহরীর সময় সবচেয়ে মজার যে ব্যাপারটা ঘটত সেটা হলো ফজর নামাজ পড়তে যাওয়া। আলো আঁধারীর মধ্যে বন্ধুরা সবাই মিলে বের হতে পারছি, সে বয়েসে এটা একটা বিরাট মজা! এমনকি বন্ধুদের বাসার সামনে গিয়ে, "ঐ সাবু, নামাজ পড়তে নাম!!" বলে ডাক দিলেও কেউ বকা দিতে পারতনা। গার্জিয়ানদের জন্য সেটা এক বিব্রতকর ব্যাপারই ছিলো বৈকি! ভোররাত হোক আর যাই হোক, কেউ "নামাজের জন্য ডাকছে" যখন, তখন মুখের ওপর সেখানে বকাবাদ্য করাটা লোকলজ্জার বিষয় ছিলো বলেই মনে হচ্ছে। এক রোজার সময়, সম্ভবতঃ ক্লাস ফাইভে, যখন প্রাইমারী স্কুলের সবচেয়ে উঁচু ক্লাসে পড়ার কারণে একটু সেয়ানা সেয়ানা ভাব আসলো নিজেদের মধ্যে, তখন আর নামাজ পড়েই সাথেসাথে বাসায় ফিরে আসাতে আর পোষাচ্ছিলনা। এমনই একদিন হঠাৎ কয়েকবন্ধু মিলে ঠিক করলাম, নামাজ শেষে হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কে যাবো। কিন্তু একথা যেহেতু বাসায় জানানো যাবেনা, তাই ফন্দি আঁটতে হলো যে নামাজ শেষে কি করেছিলাম সেটা একটা নিয়ে একটা কিছু তো বলতেই হবে। সবাই মিলে ঠিক করলাম যে বলবো, রেলওয়ের রেস্টহাউসে শিউলি ফুল তুলতে গেছি, আর সমস্যা কোথায়! ইজি, ইজি!

যাক, শুরু হলো আমাদের অভিযান। ফজরের নামাজ শেষে আমরা চারবন্ধু মিলে রওয়ানা দিলাম রমনা পার্কের দিকে। আমাদের মধ্যে সাবু একটু গায়ে গতরে বড়সড় ছিলো, সেয়ানা সেয়ানা ভাবটাও বেশী ছিলো ওর। সে রমনার রাস্তা চিনত। আর চিন্তা কি! সেই সকালে যে কিরকম থ্রিলিং একটা সময় পার করেছি, আজো ভাবলে মনটা এক ধরনের উত্তেজনায় ভরে যায়। হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হচ্ছিলো, "আরে! আমি তো বড় হয়ে গেছি!", আর শিউরে উঠছিলাম। একটা শিশুর চিরন্তন আরাধনা -- বড়দের মতো হবো, কোন বাঁধা থাকবেনা, কেউ বকবেনা, কেউ ভয় দেখাবেনা -- সেরকম দিনগুলো যে খুব কাছাকাছি সেটা মনে হয় সেদিনই প্রথম অনুভব করতে পেরেছিলাম। এটা ছিলো একটা বিরাট মুক্তির মুহূর্ত, এরকম একটা মুহূর্তে অনাগত ভবিষ্যত নিয়ে কোন আশংকা বা অনিশ্চয়তা জন্মায়না, অনাগত ভবিষ্যতের যা কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার পুরোটাই শতভাগ সম্ভাবনায় টইটুম্বুর। এজন্যই হয়তো শৈশবটা এত সুখের, সব বিস্ময়ই সেখানে সুন্দর, হাতের নাগালে থাকে, বিপন্ন হয়না। আমরা অন্ততঃ দিশেহারা বোধ করিনা। বড় হয়ে কি সেজন্যই আমরা বারবার শৈশবে ফিরে যেতে চাই?

যাই হোক, আমার "বড় হয়ে গেছি" অনুভূতিটা যেভাবে নিজের মধ্যে চেপে বসার কথা ছিলো কপালের দোষে সেটা কিন্তু সেদিন হয়নি। কারণ, আর কি? যথারীতি আরেকটা অঘটন। রমনা পার্কে গিয়ে অনেক লাফঝাঁপ করলাম, স্লিপার (আমরা বলতাম পিছলা), সী-স্য, দোলনা -- আরো যতরকমের দুষ্টামির উপকরণ ছিলো কোনটিই বাদ রাখলামনা। আর সেখানেই শেষমেষ কাল হয়েছিলো। সী-স্য চড়তে গেলাম সাবুর সাথে, ও ব্যাটার ওজন ছিলো মারাত্মক, ও বসতেই এমন এক ঝাঁকুনি খেলাম যে ভয়ে আমি সী-স্য থেকে নেমে দাঁড়িয়ে যাই, আর তখনই ঘটে "হতে পারত চরম ভয়াবহ" ঘটনাটা। নিজে সী-স্য'র যে প্রান্তে বসেছিলাম সেপ্রান্তটা এসে আঘাত করল ঠিক চিবুকের নীচে! সেদিন আসলে বাঁচার কথা ছিলোনা। ভাগ্য ভালো যে লোহার রডের খুব সামান্য অংশই এসে লেগেছে চিবুকে, ভালোমতো হলে সেখানেই সব শেষ হয়ে যেত। কি ভয়ানক ব্যাপার!!! এখন লিখতে লিখতেও যা ঘটতে পারতো তা ভেবে শিউরে উঠলাম, একবার আলহামদুলিল্লাহ বলে ফেললাম, কৃতজ্ঞতা, কৃতজ্ঞতা। কতবার যে কানের পাশ দিয়ে গুলী গেলো জীবনে! এগুলোকে কি "ফাঁড়া কাটা" বলে?

যা হোক, এখন বুঝলেও সেদিন সেমুহূর্তে বুঝিনি বা কেয়ারও করিনি যে কত বড় বাঁচা বেঁচেছি! বরং আঘাতের ফলে চিবুকের কতটুকু কাটা গেছে, কেউ দেখলে বুঝে ফেলবে কিনা, কিভাবে কি করলে বাসায় কেউ টের পাবেনা -- এসব নিয়েই চিন্তিত ছিলাম বেশী। বন্ধুদের একজন সকালের সতেজ দুর্বা ঘাস এনে চিবিয়ে লাগিয়ে দিলো ক্ষতে, টেনশনে কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ফিরলাম। "আজ তো একটা কিলও মাটিতে পড়বেনা!" তবে, বাবমা'র একমাত্র পুত্র হবার মজাটাই এখানে, সেদিন মার খাবো কি, বরং আমার চিবুকের কাটাটা দেখে আমার বাপ-মা দুজনেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন, বাবা স্যাভলন নিয়ে ছোটেন তো মা ডেটল নিয়ে -- এমন অবস্থা।
আমি আর কি ভাববো, আপাততঃ বেঁচে গেলেও বাবা-মা'র উদ্বিগ্নতা শুধু এই মেসেজটাই দিয়েছিলো যে, "তুই এখনও বড় হসনাই রে গাধা!"।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29000926 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/29000926 2009-08-28 13:40:26
যানজট নিরসন নিয়ে কিছু আবোল-তাবোল 'ডিজিটাল' ভাবনা
যানজট নিরসন নিয়েও এমন কিছু ভাবনা মাথায় এসেছে, একেবারে যে ভিত্তিহীন তা অন্ততঃ আমার নিজের মনে হচ্ছেনা, তবে প্রয়োগ কিভাবে করবো সেটা ভাবলে একটু কি বেশ জোরেই হোঁচট খেতে হচ্ছে; সে বিচারে এগুলোকে "পাগলা আইডিয়া" বলাই হয়তো যুক্তিযুক্ত, তাও এখানেই শেয়ার করি। আফটার অল ব্লগই তো এসব এ্যালাউ করে, অন্য কোথাও হলে তো সম্পাদকের সম্পদ কাঁচির তলায় পড়বে জানা কথা। তাছাড়া, আফটার অল, কারো বিব্রত বা আতংকিত চেহারা দেখতে হচ্ছেনা, মন খুলে লিখতে পারছি, সেও বা কম কিসে।


*****************************************************

আলোচনার প্রথম অংশটা সারা ঢাকা শহরজুড়ে মানুষের প্রবাহকে কিভাবে অপটিমাইজ করা যায় তা নিয়ে।


অফিস- আদালতের পূনর্বিন্যাস
যেসব পরিবারে একাধিক সদস্য চাকুরী করেন সেখানে এরকম একটা সমস্যা দেখা দেয়। দেখা যায় যে স্ত্রীর অফিস হলো মতিঝিল বা টিকাটুলী, আর স্বামীর অফিস মীরপুর বা মহাখালী। এই পরিবারটি এখন মীরপুরের কাছাকাছি থাকলে স্ত্রীকে প্রতিদিন লম্বা সময় রাস্তা ব্যবহার করতে হবে, যাত্রাবাড়ী বা বাসাবো থাকলে স্বামীটিকে লম্বা সময় রাস্তা ব্যবহার করতে হবে। এজন্য এদের অফিসের লোকেশনের অপটিমাইজেশন করতে হবে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ডিজিটাল উপায়ে। যাতে করে দুজনই অফিসে যেতে যতটুকু সম্ভব কম সময় রাস্তা ব্যবহার করেন। কিভাবে?
সমাধান:
ন্যাশনাল ডেটাবেসের মাধ্যমে প্রত্যেক পরিবারের কোন সদস্যর অফিস কোথায় এই তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি পরিবারের সদস্যদের কাছাকাছি অফিসে প্লেসমেন্ট করা যায় তবে তাদের কোম্পানীকে সেভাবে সাজেশন/ এমনকি বাধ্যও করা যেতে পারে। যেমন ধরুন স্ত্রী চাকুরী করছেন একটি ব্যাংকের যাত্রাবাড়ী ব্রাঞ্চে আর স্বামী আছেন সরকারী অফিসে মহাখালীতে। এখন এরা যদি যাত্রাবাড়ীতে বসবাস করেন তাহলে দেখা যেতে পারে যে স্বামীটিকে যাত্রাবাড়ীর সবচেয়ে কাছে কোন অফিসে পোস্টিং দেয়া যেতে পারে। এটা শুধু যেসব পরিবারে একাধিক সদস্য চাকুরী করেন তাদের জন্য প্রযোজ্য না, একজন চাকুরের বেলায়ও প্রযোজ্য। যেমন ধরুন বাচ্চাদের স্কুলের কাছে বা নিজেদের বাড়ী হওয়াতে কেউ অফিস থেকে অনেকদূরে থাকে, যেমন অফিস মতিঝিলে আর বাবার বাড়ী মীরপুরে। এমন অবস্থায় একজন নিশ্চয়ই কাছাকাছি থেকে অফিস করার জন্য পুরানা পল্টনে বাড়তি দশ হাজার টাকা খরচ করে বাসা ভাড়া করবেননা! কাজেই এ ব্যক্তিকে যদি মীরপুরের কাছাকাছি বদলী করে দেয়া যায়, তাতে সকাল বিকাল একটি যানের চলাচলটা কমে যেতে পারে।


মাল্টিলেয়ার ওয়ার্কিং আওয়ার
অনেক আগে সেই দুহাজার সালের দিকে একবার ভেবেছিলাম যে সারা বাংলাদেশকে দিন আর রাতে, টাইম-এক্সিস বরাবর দু'ভাগে ভাগ করে ফেলে একভাগ উনাকে আর একভাগ তেনাকে শাসন করতে দিয়ে দিলেই তো আরা আমাদের জাতিটাকে এত ঝামেলা পোহাতে হয়না! এমনকি একজন যদি বলে "কেন আমি শুধু রাত, ও শুধু দিন?", তখন মাসে মাসে অলটারনেট করার ব্যবস্থাও ভাবা যায়। অনেকটা সেরকম সূত্র ধরে আরো পরে ভেবেছিলাম, ঢাকা শহরের কর্মকান্ডকে যদি এরকম রাত আর দিনে দু'ভাগ করে দেয়া যায়, বিশেষ করে যেসব অফিসে পশ্চিমের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশী তারা যদি অফিস আওয়ারটা রাতে নিয়ে যায়, তাহলে পুরো শহরে দিনের বেলা যে চাপটা পড়ে তা অর্ধেক হয়ে যাবে। গতবার দেশে গিয়ে বুঝলাম সেটি আর হবার উপায় নেই, এই শহরে এখন রাত এগারোটার সময়েও ফার্মগেটে আনন্দ হলের সামনে যে পরিমাণ মানুষ বাসের অপেক্ষা করে সেটা দেখে শুধু জেমসের ভাষায় এটাই বলা যায়, "দিনরাত এখানে থেমে গিয়েছে", পার্থক্য বোঝার কোন উপায়ই আর
বাকী নেই! এমন অবস্থায় আরেকটু "হাইটেক" <img src=" style="border:0;" /> ভাবনা মাথায় এলো, যেখানে টাইম সিস্টেমটা হবে মাল্টিলেয়ারের। শুনতে যতটা জটিল, কাজটা মোটেও সেরকম জটিল কিছুনা। যে কোন অফিসের কর্মচারীদের কাজের সময়ের একটা অপটিমাইজড বিন্যাস। তার আগে সমস্যাটায় ফোকাস করি, কেন এরকম ভাবলাম।

ধরুন ঢাকার মতিঝিলের একটি ব্যাংক। এখানে যদি শ'তিনেক লোক কাজ করেন, তাহলে খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে যে এদের বসবাসের স্থান মোটামুটি পুরো ঢাকা শহরে ছড়িয়ে আছে; যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুর পর্যন্ত এই বসবাসের স্থানের বিন্যাস ইউনিফর্মও হতে পারে, মানে যাত্রাবাড়ী থেকে মিরপুরকে বিশটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রত্যেক অঞ্চলে ঐ তিনশ জনের মধ্যে ক'জন বাস করে এটা হিসেব করলে দেখা যাবে যে মোটামুটি প্রত্যেক অঞ্চলেই গড় মানে ১৫ জনের মতো করেই বাস করছেন। কথা হচ্ছে অফিস আওয়ার যদি ন'টা থেকে পাঁচটা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে প্রতিটি অঞ্চল থেকে ১৫ জন করে রওয়ানা দিয়েছেন, আবার পাঁচটার সময় মতিঝিল থেকে প্রত্যেক অঞ্চলেই ১৫ জন করে ছুটছেন। এই ছবিটাকে এখটু বড় করে দেখলে আমরা যা পাই তা হলো ঢাকার প্রত্যেক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলেই একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ সকালের অফিস শুরু হবার আগে আর অফিস শেষে ছুটছেন। এটা একটা প্যাঁচ খাওয়া জালের মতো, যা দিয়ে মাছ ধরার আগে প্যাঁচ ছাড়াতে ছাড়াতেই দিন শেষ!

সমাধান:
আমরা এখন যেটা করতে পারি তা হলো প্রত্যেক অফিসের জন্য একটা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বা "ডিজিটাল" ওয়ার্কিং আওয়ার ডিজাইন। মানে কর্মচারী/কর্মকর্তাদের বাসস্থানভেদে অফিস শুরু হবে আটটা থেকে দশটার মধ্যে। যেমন সহজ উদাহরণে ধরুন, মীরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মীরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, পল্টন আর মতিঝিল এই ছয়টি অঞ্চলে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করলাম। এখন মীরপুর থেকে সকালে সবচেয়ে আগে অফিসে রওয়ানা দেবে মোহাম্মদপুরে যাদের অফিস তারা, এর পনেরো মিনিট পর রওয়ানা দেবে ধানমন্ডিতে যাদের অফিস তারা, এভাবে, সবার শেষে মানে প্রায় ন'টার সময় রওয়ানা দেবে যাদের অফিস মতিঝিলে, তারা। এখানে যে মজাটা হবে, তা দেখুন, মীরপুর থেকে মতিঝিলগামী লোকটি ন'টায় রওয়ানা দিলে পথে মীরপুর থেকে মোহাম্মদপুরগামী, ধানমন্ডিগামী ... পল্টনগামী কাউকেই পাবেনা, একইভাবে মোহাম্মদপুর থেকে ধানমন্ডিগামী, শাহবাগগামী,...,পল্টনগামী এদেরকেও পথে পাবেনা। অর্থাৎ, তাত্ত্বিকভাবে তার জন্য রাস্তা ফাঁকা থাকবে, বা ন'টার সময় যারা মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে তাদের দ্বারা রাস্তায় যতটুকু ভীড় হওয়া সম্ভব ততটুকুই ভীড় থাকবে। একই কথা অন্যান্য স্থানের অধিবাসীদের বেলায়ও খাটে।
এই সিস্টেমের ফলে একই অফিসের সব যারা সকালে তাড়াতাড়ি মানে আটটায় আসবে অফিসে তারা বিকেলে চারটায়, যারা দূর থেকে দেরীতে মানে দশটায় আসবে তারা সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস ছাড়বে। সব কর্মচারীর অফিসে একসাথে থাকতে পারবে দশটা থেকে চারটা পর্যন্ত, পারস্পরিক কমিউনিকেশনের জন্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোতে সাধারণত দশটা-তিনটা কোর টাইম ডিফাইন করা থাকে, তাই কোন অসুবিধা হবার কথা না।


স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীর বিন্যাস
ঢাকা শহরে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে এ্যালার্মিং তা হলো সরকারী বিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই কম। প্রথমেই এটি বাড়াতে হবে, তবে সেটা ডিজিটাল পদ্ধতি না হয়ে ভৌত পদ্ধতি বলে এখানে আলোচনায় আসবেনা। প্রতি বছরের শুরুতে বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করার ব্যাপারে লোকজনের ভয়াবহ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। তাছাড়া সরকারী বিদ্যালয়গুলোর মানও হয়তো ভালোনা, তা নাহলে এত বেশী মানুষ বছর বছর নামকরা কিছু স্কুলের পেছনে কেন ছুটবে? এই জায়গায় উন্নতি করলে যানজটের একটা ভালো সুরাহা করা যায়। জাপানে সরকারী বিদ্যালয়ের বেলা এটা লিখিত নিয়ম যে আপনার বাচ্চাটিকে বাসার সবচেয়ে কাছের সরকারী স্কুলটিতে ভর্তি করাতে হবে, এবং তাকে স্কুলে যেতে হবে পায়ে হেঁটে। এটা ঠিক যানজট এড়ানোর জন্য না, এর আরো অন্যান্য দার্শনিক দিক আছে, তবে আজ সেটা নিয়ে আলাপ করছিনা। কথা হলো, আমরা যানজট সমস্যাটাকে কিছুটা হলেও এভাবে সামাল দিতে পারি। এদেশে এখন আইডিয়াল/ভিকারুন্নেসা টাইপের বেসরকারী স্কুলগুলোর দাপট, এসব স্কুলে সারা শহর থেকে বাচ্চারা পড়তে আসে। মীরপুর থেকে যেমন মতিঝিলের আইডিয়ালে বাচ্চারা পড়তে আসে, মতিঝিল থেকে তেমনি হয়তো মীরপুরের হারমেন মেইনারে বাচ্চারা পড়তে যায়। এটা থামাতে হবে, স্কুলগামী বাচ্চাদের গড় ট্রাফিক ফ্লো যাতে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের বেশী না হয় সেরকম নিয়মকানুন বানাতে হবে।

সমাধান:
প্রথমতঃ, ভালো মানের সরকারী স্কুলের নিশ্চয়তা সারা শহরে দিয়ে দিতে পারলে, তখন প্রত্যেক স্কুলে ভর্তির জন্য ছাত্র-ছাত্রীর বাসস্থানের দূরত্বের শর্ত জুড়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আর একটা উপায় হতে পারে যে -- প্রত্যেক বেসরকারী স্কুলের জন্য তার আশপাশের একটা নির্দিষ্ট র‌্যাডিয়াসের ভেতর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাত্র-ছাত্রী নিতে হবে -- এমন আইন করা। যেমন আইডিয়াল স্কুলের জন্য যদি এর মোটামুটি এক কিলোমিটার র‌্যাডিয়াসের এলাকা চিহ্নিত করে সে এলাকা থেকে মোট ছাত্রের ৭০% নিতে হবে এমন আইন করা হয়, তাহলে এই স্কুলের ৭০% ছাত্র-ছাত্রীর হেঁটে স্কুলে আসা নিশ্চিত।
আরেকটা যেটা করা যায়, প্রাইভেট স্কুলগুলোকে সারা শহরে সমবিন্যাসে শাখা তৈরীতে উৎসাহিত করা, সরকারী ইনসেনটিভ দেয়া। যেমন ধরা যাক, কথার কথা, মগবাজারে একটি সরকারী স্কুলের পড়াশোনার খুব বেহাল দশা। মগবাজার এলাকার লোকজনের কেউই সেখানে বাচ্চাকে পড়াতে চাননা, ফলে আশপাশের আরো দশটা জায়গায় যেসব বাচ্চারা আর কোথাও টেকেনা তারা এসে এখানে ভর্তি হয়। এখন এই স্কুলভবনটিকে সরকার যদি আইডিয়াল স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে বলে যে তোমরা এখানে নতুন শাখা খোল, তাহলে দেখা যাবে মগবাজার/ইস্কাটনের বাচ্চারা দূরে না গিয়ে এখানেই ভর্তি হচ্ছে।
সারা শহরের স্কুলগুলোর বিন্যাস, মান, ছাত্রছাত্রীর বিন্যাস -- এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে একটি পরিকল্পনা গ্রহন করা যায়।


দোকানপাটের বিকেন্দ্রীকরণ
জানিনা কিভাবে এই অদ্ভুত সংস্কৃতির উদ্ভব আমাদের দেশে হয়েছে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে। এখানে কোন এক এলাকা একটি নির্দিষ্ট জিনিস কেনার জন্য বরাদ্দ হয়ে যাচ্ছে, মানে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের বিক্রেতারা একেকটি এলাকায় জড়ো হয়ে পড়ছেন। কাপড় বললে নবাবপুর, বই বললে নীলক্ষেত, জুতো বললে এ্যালোফেন্ট রোড, ইলেকট্রনিক্স বললে স্টেডিয়াম মার্কেট, এ্যাকুইরিয়ামের জন্য কাঁটাবন, এমনকি ডাক্তার বললেও আপনাকে ছুটতে হবে গ্রীণরোডের দিকে। শুধু তাই কেন, এদেশের কবিরাও কেন্দ্রীভূত শাহবাগের আজিজে, নতুন লেখকদের বই পেতে হলে আপনাকে ওখানেই যেতে হবে! যে বাঙালীর জন্য নরকে প্রহরী লাগবেনা বলে কথিত আছে, কেউ পালাতে চাইলে হিংসায় আরেকজন নাকি আটকে দেবে -- সে বাঞালীর হঠাৎ এহেন একতা খানিকটা বিস্ময়েরও! এই কেন্দ্রীভূত হবার সমস্যা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মানুষ, যাত্রাবাড়ী বলুন, খিলগাঁও বলুন আর উত্তরা বলুন, রেসনিক হ্যালিডের ফিজিক্স বই কিনতে আপনাকে নীলক্ষেত পর্যন্তই আসতে হচ্ছে। এক কাঁচাবাজার আর পোশাকের বাজার ছাড়া সবার কমবেশী একই অবস্থা! যদি পণ্যের দোকানগুলোর বিন্যাস শহরের সব অঞ্চলে কাছাকাছি রকমের হতো, তাহলে আর বইয়ের জন্য আপনাকে উত্তরা হতে নীলক্ষেত আসতে হতোনা।
সমাধান:
অবশ্যই কর্পোরেটাইজেশন একটা সমাধান, তবে সেটা ঠিক "ডিজিটাল সমাধান" তো আর না, আমি এখানে ডিজিটাল উপায়ে কিছউ করা নিয়ে ভাবতেই আগ্রহী। ভেবে দেখলাম, সরকার এক্ষেত্রে ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম চালু করতে পারে। অর্থাৎ সারা ঢাকা শহরকে মনে করুন বিশটি বানিজ্যিক অঞ্চলে ভাগ করে, প্রত্যেক ভাগে একেকটি উপাদানের দোকানের ডিস্ট্রিবিউশন কেমন সেটা হিসেব করে ইনসেনটিভ প্রোগ্রাম চালু করা। আবার কোন অঞ্চলে যদি একটি উপাদানের দোকান অতিরিক্ত পরিমাণ থাকে তাহলে সেখানে নতুন দোকানের লাইসেন্স দেয়ার সময় বাড়তি কর ধার্য্য করা। যেমন দেখা গেলো যে রামপুরা এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের দোকান নেই, আবার মিষ্টির দোকান অতিরিক্ত বেশী। তাহলে এখানে কেউ নতুন মিষ্টির দোকান চালু করতে গেলে তার ওপর বাড়তি ট্যাক্স ধরা হবে, আবার ইলেকট্রনিক্সের দোকান চালু করতে গেলে তার ট্যাক্সের একটা অংশ ছেড়ে দেয়া হবে। আর এই দোকানের সংখ্যা, ট্যাক্স বাড়াবে নাকি কমাবে -- পুরো কাজটা ডেটাবেস মেইনটেইনের দ্বারা একেবারে খাঁটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা যাবে।


সারকথা হলো ঢাকাশহরের ব্যবস্থাপনাকে এমন একটি ডিরেকশনে ধাবিত করতে হবে যাতে অল্প চলাচলের মাধ্যমেই দৈনন্দিন সব প্রয়োজন মানুষ মেটাতে পারে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, যা শহরটিতে সমস্যা সৃষ্টি করছে তা বরং প্রস্তাবিত এই যথাযথ বিন্যাসের কাজটিতে সহায়ক হবে, সে হিসেবে বাড়তি জনসংখ্যার একটা ইউটিলাইজেশনও একে বলা যায়।


**************************************************************

পরের অংশটি ঢাকার প্রাইভেট গাড়ীগুলো নিয়ে কি করা যায় তা নিয়ে।

যানজট বাড়ার কারণ হিসেবে এখনকার হট টপিক হলো প্রাইভেট কারের সংখ্যাবৃদ্ধি, আনিসুল হক সেদিন প্রথম আলোর কলামে লিখলেন যে আর কিছুদিনের মধ্যেই বছর দশেক আগে বোম্বের ছবিতে দেখানো "জ্যামে আটকা পড়া রাস্তায় নায়িকাকে বাঁচাতে রাস্তার গাড়ীগুলোর উপর দিয়ে বানরের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া নায়কের" মতো নাকি ঢাকার লোকেও গাড়ীর ওপর দৌড়াতে পারবে, তা সে নায়িকাকে বাঁচানোর জন্যই হোক অথবা ছাপোষা চাকুরীটা বাঁচানোর জন্যই হোক।

কথা হলো প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়ছে সন্দেহ নেই, এবং ঢাকায় প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসা-বৃদ্ধির সাথে সাথে বাঙালী মধ্যবিত্তের একাংশের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে এই ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশী। তদুপরি, একেকটা গাড়ীর আমদানীতে মোটা অংকের ট্যাক্স পাচ্ছে সরকার ; যদিও সেই মোটা অংকটা এখনও মোটাসোটা সরকারী আমলার পশ্চাৎদেশের ডান বা বাঁপাশের একটি অংশকেই মোটাসোটা করে তুলে ধরছে; তবে এই বাস্তবতাকে বেশী পাত্তা দিলে দুনিয়ার কোন উপায়ই এদেশে কোন কিছু করতে পারবেনা বলে সেদিকে আর গেলামনা। কথা হলো, দেশের স্বার্থেই হোক, আমলার স্বার্থেই হোক বা মধ্যবিত্তের জীবনের মানোন্নয়নের স্বার্থেই হোক, ঢাকা শহরে গাড়ীর সংখ্যা বাড়বেই।

যেহেতু গাড়ীর সংখ্যা কমানো কঠিন, তাই উপায় বাকী থাকে আর একটা! সেটা হলো, গাড়ী কিনতে দাও ঠিক আছে, তবে রাস্তায় বের করাটা কঠিন করে দাও। তাতে যার পোষাবে সে গাড়ী কিনবে, যার পোষাবেনা সে কিনবেনা। মানে একটা পুঁজিবাদী স্ট্যান্স থেকে গাড়ী ক্রয়কে কঠিন করে তোলা আর কি! প্রশ্ন হলো, গাড়ীর নিয়ে পাবলিকের রাস্তায় বের হওয়াকে কমিয়ে দেওয়ার জন্য কি কি পদক্ষেপ নেয়া যায়? এখানেই কিছু পাগলা চিন্তাভাবনা।


ক. একাধিক গাড়ীর ব্যবহার কমানোর উপায়
আমাদের দেশে পরিচিত প্যাটার্ণ, বিশেষ করে যাদের একাধিক গাড়ী আছে তাদের বেলায়-- সকালে বাড়ীর কর্তাটি তাঁর মার্সিডিজ নিয়ে বেরুবেন, দশ মিনিট পর বাড়ীর আহ্লাদী কন্যাটি নিজস্ব ঢঙের নৃত্যের সাথে সাথে র‌্যাভ-ফোরে চেপে বেরিয়ে যাবেন ইউনির পথে। এরপর হয়তো বাড়ীর কর্ত্রী সকাল সাড়ে ন'টার দিকে বেরুবেন বিএমডব্লুটি নিয়ে, বসুন্ধরা, আড়ং, সমাজসেবা-জাতীয় আড্ডাখানাসহ আরো নানান জায়াগায় বেহুদা ঘোরাঘুরি করে বেড়াবেন। বেলা এগারোটার দিকে বাড়ীর একমাত্র পুত্রধনটি হয়ত বাবার অফিস থেকে ফেরত আসা গাড়ীটি নিয়ে আড্ডা বা ডেটে বেরুবে, দুপুরে বাবাকে কিছুক্ষণের জন্য বাসায় আনতে বসুন্ধরা শপিং থেকে বিএমডব্লুটি আসবে, তারপর ... ... উদাহরণ আর বাড়ালামনা, বাড়াতে থাকলে শেষ হবেনা -- মোদ্দাকথা এভাবে সারাদিনই চারজন মানুষের জন্য তিনটি গাড়ী ঢাকার রাস্তার জায়গা দখল করে চর্কির মতো ঘুরতে থাকবে। কথা হলো, এদেরকে দিয়ে একটি গাড়ী ব্যবহার করাতে হবে।
সমাধান:
এই বিশেষ শ্রেণীর কথা মাথায় রেখেই এমন আইন করতে হবে যেন কোন পরিবারের মালিকানায় দ্বিতীয় গাড়ীটি থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি গাড়ীর জন্য উচ্চমাত্রার ভ্যাট, রোডট্যাক্স আদায় করা যায়। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীদের জন্যও নিয়ম করা হবে যে ২য় গাড়ী থেকে উচ্চমাত্রায় ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম ধার্য্য করতে হবে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করা হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে, যেখানে ফ্যামিলি ডেটাবেসের বিপরীতে কেনা গাড়ীর সংখ্যার হিসেব রেখে, সংখ্যাটা একের বেশী হলেই উড়াধুড়া লেভেলের ট্যাক্স বসানো হবে; আবারও বলি, ট্যাক্সগুলো হলো (১)কেনার সময়ের ভ্যাট, (২) বাৎসরিক রোডট্যাক্স, (৩) ২য় গাড়ী থেকে শুরু প্রত্যেক গাড়ীর জন্য আবশ্যিক উচ্চমাত্রার ইনস্যুরেন্স (এতে ইন্স্যুরেন্সওয়ালারাও খুশী হবেন<img src=" style="border:0;" />)।


খ. একটি গাড়ীর অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর উপায়
যাদের একটি গাড়ী আছে তাদের বেলায় ঘটনা আরো জটিল। এদের এই একটি গাড়ীই হয়তো ভোরে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে আসে, তারপর বাবাকে অফিসে, তারপর ছেলেটিকে প্রাইভেট টিউটরের বাসায়, এরপর মোটামুটি দুপুরের দিকে মাকে শপিংয়ে আর বাচ্চাদের স্কুল থেকে ফেরত আনতে -- গাড়ী যায়, গাড়ী আসে। এই নিরলস যাওয়া আর আসার মধ্য দিয়ে এই গাড়ী যে ঢাকা শহরের কত জায়গা দখল করে নিচ্ছে সেটা হিসেব করতে গেলেও আঁতকে উঠতে হয়। এই পুরো পরিবারকে সকালে একবারে গাড়ীতে ভরে বাচ্চার স্কুলে, বাবার অফিসে, মার শপিং কমপ্লেক্সে নামতে বাধ্য করতে হবে। প্রশ্ন হলো, কিভাবে?
সমাধান:
গাড়ীর মাইলেজের/তেল-গ্যাসের ব্যবহারের উপর পরের বছরের রোডট্যাক্স ধার্য্য হবে। একটা নির্দিষ্ট মাইলেজের বেশী হলে ট্যাক্স অনেক বাড়িয়ে দেয়া হবে। মাইলেজ ট্র্যাক করা এবং তার উপর ভিত্তি করে রোডট্যাক্স বাড়ানো হবে "ডিজিটাল পদ্ধতিতে"। এর জন্য সরকার সব গ্যাসস্টেশনকে বিক্রী হওয়া তেল-গ্যাসের সাপেক্ষে করেসপন্ডিং গাড়ীর নাম্বারের রেকর্ড কম্পিউটারে লগ করে রাখতে বাধ্য করবে -- পুরা ডিজিটাল কারবার। মাইলেজ কম রাখার জন্য তখন পইপই করে পুরা পরিবার একসাথে বের হয়ে পড়বে।


গ. ড্রাইভারের ব্যবহার কমানো
কিছু আনাড়ী ড্রাইভারের এতে চাকুরী চলে যাবে, তবে প্রাইভেটকারজনিত যানজট বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো ড্রাইভারের সহজলভ্যতা। পৃথিবীর আর কোথাও মনে হয়না এত ব্যপকহারে সাধারণ জনগণ ড্রাইভার এ্যাফোর্ড করতে পারে। এই প্রায় ফ্রী ড্রাইভার পাবার কারণেই দেখা যায় একটু পর পর বাড়ীর একেকজন বেচারাকে নিয়ে একদিকে বেরিয়ে পড়ছে, সেখানে পৌঁছে আবার তাকে বাসায় ফেরত পাঠাচ্ছে, পথে আবার ড্রাইভারও একটা দুটা খ্যাপের ব্যবস্থা করে ফেলছে! মানে একটা গাড়ীর দইনে যতটুকু সময় রাস্তায় থাকা উচিত তার তুলনায় অনেক বেশী সময় সে রাস্তায় কাটাচ্ছে! ড্রাইভার নিয়োগ খরচসাপেক্ষ হয়ে গেলে পাবলিক নিজেই নিজের গাড়ী চালাতে শুরু করবে, তখন মেয়েকে বাধ্য হয়েই বাবার সাথে একটু সকাল সকাল বের হতে হবে, মাকেও, ছেলেকেও তাই।
প্রশ্ন হলো কিভাবে ড্রাইভার নিয়োগকে কঠিন করে দেবেন?একটু আগের সমাধান ছিলো পুঁজিবাদী স্ট্যান্স থেকে, তাতে আবার যাতে সমাজবাদীরা নাখোশ না হন, সেজন্য এক্ষেত্রে চিন্তা করছি খানিকটা সমাজতান্ত্রিক স্ট্যান্স থেকে। ধরুন, ড্রাইভারদের জন্য বেতন বাড়িয়ে দেয়ার আইন করা হলো, এমন আইন যে একজন ড্রাইভারকে মিনিমাম বিশ হাজার টাকা বেতন দিতে হবে। আঁৎকে ওঠার কিছু নেই, যেভাবে সকাল সাতটা থেকে রাত ন'টা-দশটা পর্যন্ত বেচারারা নিরলস "ওনলি এ্যাট ইওর সার্ভিস" দিয়ে যান, তাতে এটুকু বেতন খুব একটা বাহুল্য না। কিন্তু কথা হলো এমন কেইসে অনেকেই পয়সা বাঁচানোর জন্য আনাড়ী-ফানাড়ী লোককে ধরে কম বেতনে ড্রাইভার হিসেবে রাখার চেষ্টা করবে। এই অপচেষ্টার হাত থেকে রেহাই দিতে পারে আরেক সমাজতান্ত্রিক "ডিজিটাল সমাধান"।
সমাধান:
যে কোন গাড়ীর ড্রাইভারদের নিয়োগ হতে হবে কয়েকটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত (এমনকি সরকারীও হতে পারে) প্রতিষ্ঠানের অধীনে-- এমন আইন করতে হবে। একজন ড্রাইভার সর্বোচ্চ একটি গাড়ীর ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতে পারবে (একাধিক গাড়ীর মালিকদের এখানে প্রচুর খসে যাবে)। এই ড্রাইভারদের বেতন দেয়া হবে ঐ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদেরকে গাড়ীর মালিক মাসে মাসে ধরুন বাইশ হাজার টাকা (বিশ হাজার ড্রাইভারের বেতন, দুহাজার প্রতিষ্ঠানের মেইনটিন্যান্স ফি) করে প্রদান করবে। গাড়ীপ্রতি মাসে বাইশ হাজার খরচ করে ড্রাইভার রাখা যাদের পোষাবে তারা ড্রাইভার রাখবে। পুরো কাজটি করা যাবে "ডিজিটাল উপায়ে"। প্রত্যেক ড্রাইভারের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান দ্বারা ইস্যু করা আইডি কার্ড তো থাকবেই, কার্ডে তার জন্য বরাদ্দকরা গাড়ীর নম্বরও লিখিত থাকবে। রাস্তায় জ্যাম লেগেই থাকে, তাই যখন তখন আইডি চেক করা শুরু করলে এনিয়ে জালিয়াতইর সাহস গাড়ীর মালিকেরা পাবেনা।


ঘ. ব্যস্ত এলাকায় গাড়ীর ব্যবহার কমানোর উপায়
পৃথিবীর ব্যস্ত শহরগুলোতে গাড়ীর মালিকেরা গাড়ীর বাদ দিয়ে পাবলিক যানবাহনে করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে যাওয়া আসা করেন; কারণ আর কিছুইনা, পয়সা সবাইই বাঁচাতে চায়। কেন গাড়ী ব্যবহার করলে পয়সা খরচ হয়, কারণ সহজ, খুবই উচ্চমাত্রার পার্কিং ফী। টোকিওর সাব-আরবান অঞ্চলে যেখানে ঘন্টায় পার্কিং ফী ২০০ ইয়েন, ব্যস্ত অঞ্চলে সেটা তি থেকে চারগুণও হয়। ঢাকা শহরে গাড়ী ব্যবহারকারীদের অন্যতম মূল আনন্দ হচ্ছে এই পার্কিং ফি দিতে না হওয়াটা। এখন আছে কিনা জানিনা, তবে গত ডিসেম্বরেও দেশে গিয়ে দেখেছি ব্যস্ত এলাকার প্রায় সব রাস্তারই ফুটপাথের কাছ থেকে রাস্তার প্রথম লেনটা গাড়ী দিয়ে অধিকৃত। এমনিতেই রাস্তা কম, তারওপর দুই লেনের রাস্তা হয়ে যাচ্ছে একলেনের।
সমাধান:
অবৈধ পার্কিং যদি থামানো নাই যায়, তাহলে এই লেনগুলোকে পার্কিং (খোলা আকাশের নীচে) ঘোষনা দিয়ে দেয়া হোক। প্রত্যেক ফুটপাথের সাথে যে বিল্ডিংটা থাকবে, তারা পার্কিং ফীর মূল অংশ পাবে, সরকার কিছুটা নেবে। শর্ত একটাই, পার্কিং ফী হতে হবে চড়া মূল্যের। এভাবে বছর পাঁচেক চললে এসব এলাকায় গাড়ী পার্ক করার সংস্কৃতিটাই হয়ত বিলুপ্ত হবে।


সরকথা একটাই, গাড়ী ব্যবহার করতে হলে খরচ করাও, গাড়ীর ব্যবহার এমনিতেই কমবে। কে না চায় পয়সা বাঁচাতে?


*****************************************************

সবশেষে আরেকটা ফাউ আইডিয়া:

হাঁটা বাড়ানোর হাইটেক ক্যাম্পেইন
দুষ্টুলোকে বলে ঢাকা শহরে হাঁটার উপযোগী রাস্তা নাই! আমি প্রতিবার দেশে গেলে কাফরুলের চিপাগলি থেকে পূবে বাড্ডা পর্যন্ত আর পশ্চিমে ধানমন্ডি পর্যন্ত আরামসে হাঁটি, কোন সমস্যাই হয়না! ঢাকা শহরের ফুটপাথ খুব সরু, এটা সত্য, তবে হাঁটতে চাইলে হাঁটা যায়। সমস্যা হইলো সস্তায় রিক্সা, বাস এসব পাওয়ায় আমরা হাঁটিনা। কথা হলো শুধু স্বাস্থ্যসচেতনতা, দেশের জন্য কষ্ট করা -- এসব শুকনো কথায় চিড়া ভিজবেনা। আপনি আমাকে হাঁটাতে চান ভালো কথা, এর বিনিময়ে কি লাভ আমার হবে সেটাও তো দেখতে চাই! মানে পাবলিক হাঁটবে, বিনিময়ে কি পাবে? এজন্য কর্পোরেটদের উদ্যোগে একটা "ডিজিটাল ব্যবস্থা" নেয়া যায়, নাম দেয়া যায়, "ডিজিটাল ওয়াকিং ইনসেনটিভ", অথবা ডিজ্যসু স্টাইলে নাম দেয়া যায় "হাঁটো আর কথা বলো"
সমাধান:
মোবাইল ফোন কোম্পানীগুলো এখানে কর্পোরেট সোশ্যাল রেপন্সিবিলিটির একটা উদাহরণ রাখতে পারে। ইদানিং স্টেপ মাপার যন্ত্রযুক্ত মোবাইল ফোন দেখা যায়, এসব ফোন কোমরে সেট করে হাঁটলে আপনি কত স্টেপ হাঁটলেন সেটা কাউন্ট হবে। মোবাইল ফোনওয়ালার এমন ইনসেনটিভ দিতে পারে যে প্রতি ১০০০/২০০০ কদম হাঁটার জন্য আপনাকে একমিনিট ফ্রি কথা বলার সময় দেয়া হবে। কে কত কদম হাঁটলেন সেটা ফোন থেকে সরাসরি মোবাইল কোম্পানীর সিস্টেমে ইনপুট হবে, এবং সে অনুযায়ী সেই ফোনমালিকের সিমের ব্যালান্স বাড়বে। অন্যান্য কোম্পানীও মোবাইল ফোনের সাথে কোলাবোরেশনে এই প্রজেক্টে অংশ নিতে পারে। আলটিমেইটলি, পাবলিক বেশী হাঁটলে যানজট কমবে, ব্যবসার গতি বাড়বে, আয়-উন্নতিও বাড়বে। সরকার এক্ষেত্রে প্রদত্ত ইনসেনটিভের উপর ট্যাক্স মাফ করে দেবে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28999950 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28999950 2009-08-26 13:52:20
রোজার কথা
আমাদের সেসময়ে ছোটবয়েসে রোজা রাখলে পেপারে "অমুক সোনামণি মাত্র অত বছর বয়সে রোজা রেখেছে" টাইপের খবর আসার সুযোগ ছিলোনা, তারপরও বাচ্চাদের রোজা রাখতে চাওয়ার হিড়িক সেযুগে কিছু কম ছিলোনা। সবারই মনে হয় ছোটবেলায় বাবা-মা বা বাসার অন্যদের দেখাদেখি "রোজা রাখতে চাই, রাখতে চাই দিতে হবে" টাইপের আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা আছে। সবার গল্পই মোটামুটি একই রকম, তাও আমরা সবাই অন্যদের কাছে সেই গল্প করি। অন্যেরটা শুনি বা না শুনি, নিজেরটা বলে ছাড়ি। কারণ, ছোটবেলার খুব এ্যাডভেঞ্চারাস কিছু অভিজ্ঞতার একটি হলো মনে হয় সেই প্রথম রোজা রাখা; খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে, গ্লাসের ভেতর টলটল করা স্বচ্ছ পানি দেখা যাচ্ছে, রান্নাঘর থেকে ঘ্রাণ বের হয়ে আসছে, বড়মামার আনা জিলিপি বা দই স্বচ্ছ পলিথিন প্যাকেটের ভেতর থেকে ডাক দিচ্ছে, সন্ধ্যার আগে আগে বাবার আনা বরফ ছোঁয়া যাচ্ছেনা-- এতসব বাঁধা অতিক্রম করে শেষমেষ সন্ধ্যের সাইরেণ বাজার পর বিজয়ীর হাসি হেসে খাবার মুখে দেয়া -- এটা বেশ বড় রকমের এ্যাডভেঞ্চারই!

আমি প্রথম রোজা রেখেছিলাম পাঁচ বছর বয়েসে। এমনিতে খুব দূর্বল ছিলাম, ছোটখাটো আর কাঠির মতো শুকনো (আমার বর্তমান চেহারা দেখে যে কারো পক্ষে এটা মেনে নেয়া অবশ্য বেশ কঠিন হতে পারে)। তারওপর জন্মানোর পর অলরেডী বেশ কয়েকটা ফাঁড়া কাটিয়ে মানে বেশ কবার অজ্ঞান-ট্যান হয়ে "ও রোজা রাখবে কি!" এর তকমাটা খুব ভালোভাবেই গায়ে লাগিয়ে ফেলেছিলাম। তারপরও রোজা কিভাবে রাখতে পারলাম সেটা ভাবলে আজো অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলি।

১৯৮২ সালের কথা, সেদিন সন্ধ্যায় মেজোমামার বিদেশ যাবার কথা। এখন আর সেই কালচার আছে কিনা জানিনা, সেই আশির শুরুতে কারো বিদেশ যাওয়া ছিলো বিরাট ব্যাপার, বিশেষ করে আমাদের নোয়াখালীর লোকদের জন্য। বিদেশে যেতে পারাটা যতোনা বড় ব্যাপার, তার চেয়ে এলাহী ব্যাপার হয়ে যেতো তাকে বিদায় জানানোর আয়োজনটা। বিদেশগামী লোকটার সাথে জীবনে দেখাও হয়নি এমন লোকদেরও দেখা যেতো বিদায় দিতে এসে জড়ো হয়েছে, কান্নাকাটি করছে (এটা অবশ্য একটু বেশী বলে ফেললাম মনে হয়)। তো, মামাকে বিদায় জানানোর জন্যও যথারীতি ঢাকা শহরে আমাদের যত আত্মীয়স্বজন আছে সবাই এসে আমাদের বাসায় হামলে পড়লো। সারা বাসা জুড়ে একটা উৎসব উৎসব ভাব। রাত দশটায় ফ্লাইট বলে সন্ধ্যার পরপরই আমরা সবাই মিলে বের হয়ে গেলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

এয়ারপোর্টে গিয়ে কি কি ঘটলো ভালো মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে যে কোন এক ঘাপলার কারণে মামাদের ফ্লাইটটা কয়েকদিন পিছিয়ে গেলো। পেছালো তো পেছালোই, সেটা জানা গেলো অনেক পরে, রাত দশটা এগারোটার দিকে। মানে আবার বিশালবাহিনী নিয়ে বাসায় প্রত্যাবর্তন! বাসায় মনে হয় সেদিন বিশ-পঁচিশজন মানুষ ছিলেন, সারা বাসাজুড়ে হট্টগোল! আমাকে আর পায় কে? এমন দিনে ঘুমটুম সব বাদ দিয়ে আমি একবার এদের দলে গিয়ে কিছুক্ষণ গল্পসল্প শুনি, আবার ওদের দলে যাই। রোজা শেষ হবার আগেই যেন ঈদ চলে আসল। শুধু আমি না, আমাদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে মনে হয় শুধু পিচ্চিটা ছাড়া আর সবাই জেগে ছিলাম। এভাবে ফুর্তির মধ্যেই কোনফাঁকে রাত তিনটা বেজে গেলো টেরও পেলামনা।

তিনটার দিকে বড়আপা হঠাৎ রেডিওটা ছাড়ল। সম্ভবতঃ মুরুব্বীরা কেউ বলেছিলেন ছাড়তে। রেডিও ছাড়ার সাথেসাথেই যে সুরটা কানে আসল, তাতে আমি পুরোপুরি মুগ্ধ হয়ে গেলাম! অসম্ভব সুন্দর সুরের একটা গান, সম্ভবতঃ হামদ, গানটা আমি পরেও অনেক শুনেছি, এবং আমার ধারনা যে লোকটি গেয়েছেন তাঁর মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে গাওয়ার কারণেই গানটা এমন শুনিয়েছে। গানের কলির কিছুই মনে নেই, শুধু মনে আছে প্রথম দুলাইনে সুর করে "আল্লাহু, আল্লাহু, আল্লাহু, আল্লাহ" বলে গায়। মুগ্ধ হয়ে গান তো শুনলামই, গান শেষ হলে বড় আপাকে "আবার ছাড়ো, ঐ গানটা" বলে বেশ জালালামও। সেদিনই রেডিওতে আরেকটা গান শুনেছিলাম, এটা অত ভালো লাগেনি, কিন্তু কেন জানি এখনও মনে আছে। গানটা ছিলো এরকম, "আল্লাহু, আল্লাহু, তুমি জাল্লে জালালু, শেষ করাতো যায়না কেন তোমার গুণগান"। এ গানটার "জাল্লেজালালু"র মানে কি এটা নিয়ে অনেকদিন মনে খচখচ করত, অবশ্য এখনও জানতে পারিনি।

সে রাতের মুগ্ধতা সেখানেই শেষ না। কিছুক্ষণ পর শুনি বাহির থেকে আওয়াজ আসছে, গমগমে ভরাট গলায় একদল ছেলে গাইছে, "তোমরা ওঠো মমিন সকলে, ঘুমিয়ে থেকোনারে, সেহেরীর সম চলে যায়, এই রাত খোদাকে ডাকার"। পাঠক বলুনতো দেখি এটা কোন গানের সুর নকল করে গাওয়া হয়েছে? হিন্টস, সাবিনা ইয়াসমিনের হিট একটা গান। তো, রেডিওর গানের চেয়ে আরো কয়েকগুন বেশী মুগ্ধ হলাম আমি রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে আসা এই গান শুনে। সেই মুগ্ধতা অনেকদিন কাটেনি, অনেক বড় হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি শুধু ভোররাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বের হয়ে আসা সেই গান শোনার জন্যই সময়মতো জেগে যেতাম, অনেকদিন এমনও হয়েছে, গান শুনে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। হয়ত নিজের চোখে দেখা একটা হত্যাকান্ড না হলে সে মুগ্ধতা আরো অনেকদিন ধরে রাখার সুযোগ হতো, তবে সে গল্প আজ করবনা। আজ আবার ফিরি সেই প্রথম গান শোনার রাতে।

ভোররাতে সম্ভবতঃ একটু টেনশনে ছিলাম, সেহরী খেতে দেয় কিনা সেটা নিয়ে। কিন্তু আমার সব ভয় দূর হয়ে গেল যখন মা নিজেই আমাকে জাপতে ধরে বেশ কয়েক ন্যালা ভাত খাইয়ে দিলো, আবার খানিক পরে বাবাও দেখলাম মিষ্টিআমের মোরব্বার সাথে দুধমাখা ভাত সাধছে। পেটপুরে খেয়ে দেয়ে লাফাতে লাগলাম, "কালকে রোজা রাখবো, কালকে রোজা রাখবো।" কেউ পাত্তা দেয়নি অথবা অন্য যেকোন কারণেই হোক, খুব একটা বাঁধা আসেনি সেসময়। এমনও হতে পারে যে, যথাযথ কর্তৃপক্ষ মানে মা তখন ভেবেছে যে "সকালে উঠে খিদে পেলেই তো রোজার কথা ভুলে যাবে।"

কিন্তু মায়ের যাবতীয় অনুমানকে মিথ্যা করে দিয়ে পরদিন সকালে আমাকে আর বাগে পাওয়া গেলনা। এখনও মনে আছে, সামনের রুমে অনেক লোকজন ছিলো, সেই সুযোগে সেরুমের খাটের নীচে অনেকক্ষণ লুকিয়ে ছিলাম, যাতে মা খুঁজে না পায়। এরমধ্যে সম্ভবতঃ মেঝোখালা খেজুর নিয়ে আসলেন, সেই খেজুর দেখে এমন লোভ লাগলো যে কয়েকদফা নিজের সাথে (মানে নফসের সাথে <img src=" style="border:0;" />) রীতিমতো যুদ্ধ করতে হলো! আজো যে আমি খেজুর এত পছন্দ করি তার পেছনে সম্ভবতঃ সেই দিনের সেই না পাবার কষ্টটা কাজ করে।

দুপুরে গোসল টোসল করে হৈ হৈ রৈ রৈ করে নামাজ পড়ে আসলাম। সেই ফিরে আসার পর টের পেলাম খিদে কাকে বলে! বেশ কয়েকবার মনে হচ্ছিলো মাকে গিয়ে চুপিচুপি খাবার দিতে বলি, আবার আত্মসম্মানবোধেও লাগল। কারণ, আপারাও সবাই তখন পিচ্চি পিচ্চি আর আমি যেহেতু সেদিনই জীবনে প্রথম রোজা রাখছি তাই সবার আগ্রহের একটা কেন্দ্রতেও পরিণত হয়ে গেছি। এমন অবস্থায় তো হাল ছেড়ে দেয়া যায়না। দুপুরে মার দেখানো অনেক রকম খাবারদাবারের লোভ এড়িয়ে কোনভাবে পার করে দিলাম।

বিকেলে বাবা অফিস থেকে এলে বেশ খানিকক্ষণ আহ্লাদও করলাম, আমার দাবী অনুযায়ী সেদিন বেশী করে বরফ আনা হলো, স্পেশাল জিলিপী আনা হলো। বিকেলের ইফতারীর আয়োজন দেখতে দেখতে এতই ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে রোজার কষ্টের কথাও ভুলে গেলাম মনে হয়। তবে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, কারণ এটা মনে আছে সন্ধ্যার কিছু আগে সেই যে খাটের উপর গিয়ে গেঁড়ে বসলাম, আর নামিনি। মনে তখন ভীষন রোমাঞ্চ, আর খানিক পরেই তো খেতে পারবো; তবে তখন খেতে পারার চেয়েও বড় আনন্দ হলো আর খানিক পরেই তো আমার রোজা রাখা হয়ে যাবে! কি সাংঘাতিক কথা!!

দেখতে দেখতে সময় ঘনিয়ে এলো, আর পাঁচ দশ মিনিট আছে। একগ্লাস লেবুর শরবত, একটা প্লেটে শসা, ছোলাভাজা, পিয়াজু আর মুড়ি (এটা আমাদের বাসার চিরন্তন ইফতার) নিয়ে বাবার সামনাসামনি খাটে বসে আছি আমি। ঠিক তখনই অঘটনটা ঘটলো! কি অঘটন সেটা আমার আর মনে নেই, কারণ অঘটনটাই হলো ইফতারের কয়েকমিনিট আগে আমার যথারীতি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ঘটনা! যথারীতি বলছি কারণ ছোটবেলায় এই কাজটার জন্য আমি বিখ্যাত ছিলাম, অন্ততঃ দশবার জ্ঞান হারিয়েছি, একবার হারিয়েছি মোড়ার ওপর লাউ তুলতে গিয়ে লাউসহ ধপাস করে পড়ে।

তারপরের কথা আর আমার মনে ননেই, শুধু মনে আছে পাঁচ দশ মিনিট পর যখন জাগলাম, তখন খালি জিজ্ঞেস করছিলাম সাইরেন দিয়ে ফেলেছে কিনা। যখন জানলাম সাইরেন দিয়ে ফেলেছে, মনটা এতো খারাপ হলো! তবে তারচেয়েও আরো চমকে গেলাম যখন জানলাম আমার মুখে পানি দিয়ে রোজা ভাঙানো হয়েছে। রোজাটা কি পুরো করতে পারলাম? জিজ্ঞেস করতেই বাবা-মা সমস্বরে (সম্ভবতঃ) বললেন, "অবশ্যই, অবশ্যই"।

তারপর অনেকদিন মাকে জালিয়েছি শুধু এটা জানার জন্য যে আসলেই সেদিন রোজাটা পুরো রাখতে পেরেছিলাম কিনা। ছোটবেলায় মা সবসময় ঐ প্রশ্নের জবাবে বলত, "কতবার বলবো? রেখেছিস তো!!"

তবে এখন জিজ্ঞেস করলে কিছু বলেনা, খালি মুখ টিপে হাসে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28998472 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28998472 2009-08-23 14:20:32
সম্পর্কের গভীরতা

নিজের কিছু স্মৃতি:
শামীম তার লেখায় যে বিষয়টির অবতারণা করেছেন সেটি আমাদের সমাজে নতুন না বলেই মনে করি, অর্থাৎ, পরিবারের আপনজন বা কাছের মানুষদের সাথে গ্রিটিংস বা অভিবাদন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি। যেমন, জন্মদিনের দিন সন্তান ফোন করলো, কিন্তু বাবা-মা মুখ ফুটে "হ্যাপি বার্থ ডে" বা "শুভ জন্মদিন" বললেন না। আমার নিজের বেলায়ও একইরকম হয়। বিদেশে আসার পর প্রথম কয়েকবছর নিজের প্রতিটি জন্মদিনেই বাসায় ফোন করতাম, ওপাশে সাধারণত মা-ই ধরতেন, গলার স্বরে আলাদা আবেগটুকু টের পেয়েই বোঝা যেত যে ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন এদিন, কিন্তু মুখ ফুটে বলতেননা, "হ্যাপী বার্থ ডে" বা "শুভ জন্মদিন, বাবা" ধরনের কিছু। বড়জোর হয়ত কথার ফাঁকে একবার হঠাৎ করেই প্রসঙ্গ তুলে বলতেন, "কি রে, বয়স কত হলো?" সেটাও যে প্রতিবারই করতেন তা না। তবে সত্যি বলতে কি, মা যে এই আনুষ্ঠানিকতাটুকু করতেননা, এতেই আমি বেশী খুশী হতাম; কারণ, 'মার মুখে "শুভ জন্মদিন বাবা" শুনে আবার সেটার উত্তরে "ধন্যবাদ, আম্মা" বলা' -- এটাকে কেমন যেন ন্যাকা একটা ব্যাপার মনে হতো, বড় লজ্জা বা অস্বস্তি অথবা এর কাছাকাছি এক ধরনের অনুভূতির ব্যাপার ছিলো সেটা। আমি জানিনা পাঠকদের মাঝেও অনেকের এমনটা হয় কিনা। এখনতো গুণে গুণে নিজের জন্মদিনে দেশে ফোন করাটাকেই ন্যাকামি মনে হয়! "ত্রিশ পেরিয়েছে সেই কবে, বুড়ো হাবড়ার আবার জন্মদিন!" -- এরকম কোন অনুভূতি? হতে পারে।

ব্যাপারটা আমাদের পরিবারে ব্যাপক; যেমন উপরে যে বলেছি জন্মদিনে ফোন করলে মা মাঝেমাঝে বয়েস কত হলো জিজ্ঞেস করতেন, বাবা সেটাও করতেননা। বাসায় ফোন করলে মা'র সাথে সবসময়ই কথা হয়, বাবার সাথে প্রতিদিন না; তবে জন্মদিনে ফোন করলে বাবার সাথে কথা হতো। তিনি নিশ্চয়ই সেদিন মা কথা বলার সময় ফোনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন, হয়তো জন্মদিনের দিন যে তিনি আবশ্যিকভাবে কথা বলতেন এতেই তাঁর শুভকামনাটি আমার কাছে পৌঁছে যেত। এর বেশী প্রকাশটাই বরং অস্বস্তির -- এরকমই মনে হয়। যেমন স্মৃতিকে আরেকটু পেছনে টেনে বলা যায়, আমাদের সব ভাইবোনের বেলাতেই বাসায় কেকে কেটে জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে গেছে প্রত্যেকে দশ পেরুবার আগেই। তারপরও যখন বয়েস তেরো চৌদ্দ, মনে আছে দেখতাম, জন্মদিনের দিন মা ঠিকই আমার পছন্দের কোন একটা খাবার রেঁধেছে; এটুকুই, খুলে বলতেও হতোনা "বাবু, তোর জন্মদিন দেখে এটা রাঁধলাম!" সত্যি কথা! টেবিলের মেন্যু দেখেই বুঝে ফেলতাম, "ওহ! আজ তো আমার জন্মদিন।" কৃতজ্ঞতাবোধের জন্য না, বরং পছন্দের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সে খাবার হাপুস হুপুস করে খেতাম, যেমন গরুর মাংসের কাবাব একটি খেয়ে কোনদিন আমার হয়নি, তিন-চারটা তো মিনিমাম। সেই কামলা স্টাইলের খাওয়া দেখেই কৃতজ্ঞতাটুকু বুঝে নিতেন মা নিশ্চয়ই, আলাদা করে "থ্যাংক্যু মাম" <img src=" style="border:0;" /> বলার দরকার হতোনা। এ এক অদৃশ্য যোগাযোগ, টেলিপ্যাথি না হোক, কাছাকাছি, কিছু বলা লাগছেনা, সবাই বুঝে নিচ্ছে "হি/শী ইজ দেয়ার ফর মি"।

এরকম ব্যাপার আমাদের সবার জীবনেই কমবেশী আছে। কলেজে পড়া মাদার ইন ম্যানভিলের সেই অংশটুকুর সাথে এর খুব মিল। যেখানে লেখিকা ছোট্ট-বালক জেরীর উপকার করায় (কি উপকার ছিলো কিছুতেই মনে করতে পারছিনা, ত্রিশের পর মেমোরীর এই ত্রাহিত্রাহি অবস্থা দেখে আমি খানিক চিন্তিত), জেরী লেখিকার দিকে শুধু তাকিয়েছিলো। কৃতজ্ঞতাভরা সে দৃষ্টি লেখিকার কাছে মুখ ফুটে বলা "থ্যাংকসের" চেয়ে অনেক বেশী গভীর মনে হয়েছিলো।

এসব মিলিয়েই ভাবনাটা প্রায়ই হামলা দেয়, ভাষায় যখন প্রকাশ করা হয় তখন কি অনুভূতি বেশী গভীর থাকে, নাকি যখন প্রকাশ করা যায়না, তখন?


সম্পর্কের গভীরতা আর আবেগের প্রকাশ:
উপরে যে বলেছি অনুভূতির গভীরতা, এখানে "অনুভূতি" শব্দটা হয়তো ঠিক অর্থ বহন করছেনা, বা বলা যায় যে এই অনুভূতিটা হলো কিছুটা গ্রে অর্থের। উদাহরণ দিই জন্মদিন নিয়েই। যেমন বন্ধুকে যখন আপনি "হ্যাপি বার্থডে" বলছেন তখন হয়তো সে অর্থে আপনার মধ্যে বড় কোন অনুভূতি কাজ করছেনা, প্রিয় বন্ধুর জন্য একধরনের শুভকামনাই শুধু কাজ করছে। এসব কিছুকে অনুভূতি হিসেবে ধরেই এই আলোচনা।

প্রশ্নটা হলো, কখন সম্পর্কটাকে আমরা গভীরতর ভাববো। যখন অনুভূতির প্রকাশ ঘটছে সহজে তখন, নাকি, যখন প্রকাশ করা কঠিন হচ্ছে তখন। যেমন মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকে মায়ের সাথে খুব ফ্রী বা সাবলীল থাকে, প্রায় বান্ধবীর মতো; মাকে মেয়ে নিজের সব কথা বলে, নিজের প্রেম বিষয়ক ব্যাপারগুলো স হজেই শেয়ার করে। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যে মা-মেয়ের মাঝে এই শেয়ারিংয়ে একটা দূরত্ব আছে। এখান থেকে কি আমরা বলতে পারি যে যে মা-মেয়ের জুটিটি সহজেই শেয়ার করতে পারে পরস্পরকে, তাদের মাঝে সম্পর্কটি গভীরতর, অর্থাৎ তাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসাটা বেশী? উল্টোভাবে বললে, মায়ের সাথে সব কথা শেয়ার করতে পারেনা, সংকোচ আছে, কিন্তু মাকে পৃথিবীর অন্য যে করো চেয়ে বেশী ভালোবাসে এমনটি হওয়া কি অসম্ভব?

যেমন উপরের উদাহরণটিকে কেন্দ্র করেই আরেকটি সিনারিও কল্পনা করি, এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটে আমাদের আশপাশে। ধরুন, মেয়ে চাইছে বন্ধুদের সাথে একত্রে নেপাল ঘুরতে যাবে, কিন্তু বাবাকে কিছুতেই রাজী করানো যাচ্ছেনা, এখন মেয়ের মন খুব খারাপ। মা বিষয়টি লক্ষ্য করলেন, এবং বাবাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজী করালেন। মেয়ে এখন মহাখুশী। এক্ষেত্রে যে মেয়েটি মা'র সাথে সাবলীলভাবে সব শেয়ার করে যে হয়তো বাবার রাজী হবার খবর জানার পর দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরবে, বেশী আহ্লাদী হলে "থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, সুইট মাম্মি" বলে কেঁদে ফেলবে, আরো আহ্লাদী হলে পাপ্পি দেবে -- অর্থাৎ তার আনন্দ আর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে সবরকমে। অন্যদিকে যার ভাবপ্রকাশে কিছুটা সংকোচ আছে সেও খুশী হবে, মার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে, হয়তো তার ইচ্ছে হবে মাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরে একটুক্ষণ বসে থাকতে। হয়তো সে এসব কিছুই করবেনা, চুপচাপ গিয়ে মায়ের খাটের পাশে বসে ঘন্টাখানেক মা'র সাথে এটা ওটা গল্প করবে, হয়তো একটু হাতটা ছুঁয়ে দেবে অথবা দেবেনা। আবার এককাঠি বাড়া অনেকে হয়তো উল্টো কৃতজ্ঞতা ঢাকার জন্য এমনভাব করবে যেন বাবাকে রাজী করানোর ব্যাপারটায় সে বিন্দুমাত্র আলোড়িত হয়নি, নেপাল ঘুরতে না গেলেও তার তেমন ক্ষতি হতোনা (এরকম চরিত্র সাধারণত আমরা নাটক-সিনেমায় দেখি, বাস্তবেও হয়তো আছে)।

এখন উপরের উদাহরণে কোন মেয়েটির সাথে মায়ের সম্পর্ক বেশী গভীর বা বেশী ভালোবাসার? এই জায়গায় এসে একটা ধাক্কা খাই।

পুরো ব্যাপারটাই হয়তো যার সাথে সেমন আচরণ করে এসেছি তারই একটা কন্টিনিউয়েশন। যে বাবার কাছ থেকে হাজারবার উপকৃত হবার পরও কখনও "ধন্যবাদ" বলা হয়নি, তাঁকে হঠাৎ করে একদিন "ধন্যবাদ" বলা কঠিন। ধন্যবাদের মতো সুন্দর, মসৃণ, চমৎকার একটি কথাও তখন অস্বস্তিকর হয়ে দেখা দেয়, মনে হয়, এই সম্পর্ক এমনই গভীর যে এখানে "ধন্যবাদ" বড় ন্যাকা হয়ে যায়। বন্ধুদের বেলায়ও তাই। খুব কাছের বন্ধুকে যত সহজে "ঐ হারামজাদা আমার এসখ টাকা ফেরৎ দেসনা কেনো?" বলা যায়, গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ জানাতে "ধন্যবাদ" বলাটা ততই কঠিন হয়ে পড়ে। হয়ত "ধন্যবাদ" বললে সাথে সাথে সে হো হো হো হো করে ফেটে পড়বে, বলবে, "শালা পুরা জাপানী হয়া গেছস!"


ভাষার সাংস্কৃতিক বিবর্তন:
উপরে আলোচিত আবেগ প্রকাশ/অপ্রকাশের ব্যাপারটি যে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ঘটে তা না, বরং এর একটি সাংস্কৃতিক চেহারাও আছে। যেমন, আমি এখানে এসে প্রথম বছরটি যখন জাপানী ভাষা শিখেছিলাম, তখন আমাদের ডর্মে প্রায় চল্লিশটি দেশের ছেলেমেয়ে থাকতো। এদের মধ্যে আলোচনার একটা প্রধান বিষয়ই ছিলো পরস্পরের ভাষার অভিবাদন আর গালমন্দগুলো জানা। তখন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি আমাদের বাংলা ভাষায় অভিবাদনের কত অভাব! তাও পুস্তকে যতটা আছে, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অভিবাদন বাংলা ভাষায় বা আরো নিঁখুতভাবে বললে বাঙালীর মুখে যে তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি সেটা বুঝেছিলাম। এটা হয়তো সরাসরি আমাদের সাংস্কৃতিক আচারের সাথে জড়িত, আমরা অনুভূতিকে সরাসরি প্রকাশ করিনা। কারো বাসায় বেড়াতে গিয়ে খাবার টেবিলে প্রত্যেক পদে কামড় বসিয়েই "উহু, আহা" করে খাবারটি যে কত মজা হয়েছে তার প্রকাশ আমরা করিনা। অধুনা বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় এর চল হলেও, আমি এখনও কল্পনা করতে পারিনা যে খালাদের বা ফুপুদের কারো বাসায় গিয়ে খেতে খেতে বলছি, "রান্না দারুণ হয়েছে!" নিশ্ছিত উনারা ভাববেন যে "ছোকরা দুপাতা জাপানীজ পড়ে ফরমাল ফুলবাবু হয়েচেন!!"

এটা নিয়ে পশ্চিম আর পূবের বিতর্কও চলছে অনেকদিন। পশ্চিমা সিনেমা, নাটক নভেল তো বটেই, বাস্তবজীবনে বন্ধুবান্ধবদেরও দেখি যখন তখন স্ত্রী বা প্রেমিকাকে "লাভ ইউ হানি" বা এরকম কাছাকাছি কোন বাক্যে মনের ভাব জানাচ্ছে। পূবের লোকেরা এটা দেখে অনেক হাসে, বলে, এটা কি রকম কথা! প্রতিদিন বলে বলে নিশ্চয়তা দিতে হবে নাকি? পূবের লোকেরা হয়তো জীবনে একবার/দূবারই বলে এমন "লজ্জা-শরমের"(ব হুব্রীহির কাদেরের ভাষা ধার করলাম) কথা, অনেকে হয়তো কখনই বলেনা। জামালউদ্দিন হোসেন আর রওশন আরা বেগমের এরকম একটা নাটকও একবার বিটিভি দেখিয়েছে, যেখানে ভদ্রলোক কোনদিন স্ত্রীকে "সুন্দর লাগছে" বলার মতো অস্বস্তিতে পড়তে চাননি।


শেষকথা:
যাই হোক, তথ্যপ্রযুক্তির লাগামহীন ঘোড়ার তালে পৃথিবীতে যে জিনিসটা খুব দ্রুত ঘুচে যাচ্ছে তা হলো সাংস্কৃতিক ব্যবধান। আমি কল্পনাই করতে পারিনা যে মামার বাসায় ফোন করে বলবো, "হ্যাপি বার্থ ডে, মামা"; কনফার্ম ওপাশ থেকে চীৎকার শোনা যাবে, "হারামজাদা, ফাজলামী করস!" অথচ আমার ভাগ্নী-ভাগ্নেরা কি সাবলীলভাবে এসব অভিবাদন আয়ত্ব করে নিচ্ছে, জন্মদিনে ফোন করে সমস্বরে "শুভ জন্মদিন" জানায়, কথায় কথায় "থ্যাংক ইউ" বলে।
এমনকি নিজের বেলায়ও দেখতে পাই, বাসার লোকের সাথে যে ভদ্রতা বা সৌজন্যতাটুকু কোনদিন করবোনা, বন্ধুদের সাথে সেরকম সৌজন্যতা হরহামেশা করছি। কারো বাসায় দাওয়াত খেতে গেলে দু'চার ডিগ্রী বাড়িয়েই খাবারের প্রসংশা করি, অভিবাদনের ব্যবহার এই পরিমন্ডলে অনেক সাবলীল। এখানেও হয়তো সম্পর্কের গভীরতার প্রশ্নটা চলে আসে, যাই হোক সেদিকে আর না গিয়ে যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো, আমরা পূবের লোকেরা কি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছি?

আলোচনার বিষয় হতে পারে,
বদলানো কি উচিত? এরকম কড়ায় গন্ডায় প্রকাশবাদী হয়ে যাওয়া উচিত আমাদের? না ভাববাদী যে অনুভূতির প্রকাশ, যা অদৃশ্য এবং অনেকের কাছে ভাবনার অতীত সেটাকে আঁকড়ে রাখা উচিত? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28996997 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28996997 2009-08-20 16:22:45
আশরাফুলের ফিউচার
সাবাশ বাংলাদেশ
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের মান যেমনই হোক, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়টি হয়েছে বেশ রাজকীয়, মানে চুনোপুঁটি কোন জয় নয়, একেবারে নিখাঁদ "হোয়াইট ওয়াশ" যাকে বলে। তার ওপর খেয়াল করলে দেখা যাবে যে সিরিজের প্রত্যেকটি ম্যাচই (দুটো বললে কেমন কম কম শোনায়) বৃষ্টি দ্বারা বিঘ্নিত হবার পরও বাংলাদেশ সবগুলো ম্যাচ থেকেই জয় বের করে এনেছে। সেজন্য হলেও প্রতিপক্ষ যেমনই হোক, হোয়াইট ওয়াশের জন্য একটা কড়া গরম সাধুবাদ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে দিতেই হচ্ছে! সাবাশ বাঘের বাচ্চারা!!

তবে এবারের প্রতিপক্ষটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বি টিম মতান্তরে সি টিম বলে একটা পরিচিতি পাওয়ায় এই জয়ের আনন্দেই সবকিছু ভরে ফেলাটা আমাদের আম-সমর্থকদের জন্য ঠিক ততটা জুতসই হচ্ছেনা, আরেকটু প্লাস আলফা কিছু একটার প্রয়োজন পড়ছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে সিরিজ শুরু হবার আগেই সমালোচনার হটকেকে পরিণত হওয়া বর্তমান দলের সবচেয়ে বড়সড় কালো ভেড়া মানে ব্ল্যাকশীপটির, ওরফে মোহাম্মদ আশরাফুলের পিন্ডি চটকানোর উপকরণও সিরিজের পরতে পরতে পাওয়া গেছে হরদম। হোয়াইটওয়াশে জেতা সব খেলোয়াড়ের মতো নিশ্চয়ই মন খুলে আনন্দ করতে পারছেননা এই তথাকথিত "মেধাবী" খেলোয়াড়।


আশরাফুলের অবস্থা
হোয়াইট ওয়াশ সিরিজে তো বটেই, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সি টিমের মতো দলের সাথেও নিজের একমাত্র স্পেশালাইজড ডিপার্টমেন্ট "ব্যাটিং"য়ের চার ইনিংসে মাত্র ২৪ রান তোলা, ৮০ বল খেলা এবং সর্বোচ্চ মাত্র ২৯ রানের পার্টনারশীপে ব্যাট করতে পারা -- সবগুলো উপাত্তই বলছে যে এটা কিছুতেই একজনের স্পেশালাইজড ডিপার্টমেন্ট হতে পারেনা!

আশরাফুলের এই দূরবস্থা আজ প্রথম নয়, দিনের পর দিন এটা হয়ে আসছিলো। হঠাৎ হঠাৎ একদিন দৈবক্রমে তার ব্যাটে-বলে হয়, মানে টাইমিংটা খুব ভালো হয়; স্ট্রোক তার বরাবরই ভালো, যোগে বিয়োগে চোখ ধাঁধানো একটা ইনিংস খেলে সবাইকে চমকে দেয় সে। এর একটিমাত্র ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে যেটা হলো আশরাফুলের ভিজ্যুয়াল পারসেপশনের ডিলে টাইমটা পিরিওডিক এবং সেই পিরিওডও মাশাল্লাহ ভালোই লম্বা -- দুতিনবৎসর ঘুরে একবার শূণ্যতে আসে। সেজন্যই হয়তো এমন লম্বা সময়ের গ্যাপে গ্যাপে তার টাইমিংটা হঠাৎ একদিন পারফেক্ট হয়ে চার-ছয়ের ফুলঝুরি ছোটে।

তাছাড়া ক্রিজে দাঁড়িয়ে বারবার উপরদিকে তাকানো আর সাথে সাথে বিড়বিড় করে দোয়াদুরূদ পড়ার যে অভ্যাস তার দেখেছি (জানিনা এখনও এ অভ্যাস তার আছে কিনা), তাতে তার স্রষ্টাভক্তি নিয়ে যতটা নিঃসন্দেহ হওয়া যায় ততটাই সন্দিহান হতে হয় তার আত্মবিশ্বাস নিয়ে । খোদ ইসলাম ধর্মের শিক্ষক বা মাদ্রাসার মাওলানাও ক্লাশে পড়াতে ঢোকার আগে এত দোয়াদুরূদ পড়েননা, কারণ সম্ভবতঃ স্রষ্টাবিশ্বাসের পাশাপাশি তাঁদের আত্মবিশ্বাসটাও থাকে, আমাদের আশরাফুলের যেন শুধু সেটাই নেই।


আশরাফুলের বিকল্প
সেদিক দিয়ে আশরাফুলকে খানিকটা গোবেচারাই মনে হয়; মনে হয় যে শুধু শুধুই আমরা এর উপর এত প্রত্যাশা করি। এরকম একজন খেলোয়াড় কোনভাবেই একটা দলের কান্ডারী হতে পারেনা। সেখান থেকেই আশরাফুলের বিকল্প কে হতে পারে সেটা ভাবতে গিয়ে বুঝলাম দলের কান্ডারী নয়, বরং মোটামুটি ভালো খেলে বাকীদেরকে সাপোর্ট দেবে এমন একজন ব্যাটসম্যান হলেই তো আশরাফুলের বিকল্প হওয়া যায়।

মেহরাব জুনিয়র কি এখন ইনজুরিতে? সে কেন দলে নেই জানিনা! এই ছেলেটি আর রাকিবুলের ব্যাটিংয়ে টেস্ট মেজাজ আছে, বল বেছে খেলার একটা ভালো প্রবণতা এদের দেখেছি যেটা নান্নু, বুলবুল, গুল্লুর পর হয়তো আর তেমন কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের মধ্যে দেখিনি। বাংলাদেশে কি আসলেই আর ব্যাটসম্যান নেই? শামসুর রহমান নামে একজন এবার লীগ কাঁপিয়ে ফেলছে শুনলাম। আরো অনেকেই থাকার কথা, কিছু কিছু নাম শুনি হঠাৎ হঠাৎ, যেমন নাদিফ চৌধুরী, জুনায়েদ ইমরোজ, ইমতিয়াজ -- এরা আসে, জ্বলে ওঠে, আবার মুহুর্তেই হারিয়েও যায় -- ভিনি, ভিডি, ভিসি, ভি-উধাও!

এটাও মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো আশরাফুলকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে দলে ঢুকালেই সমস্যার সমাধান হবেনা; মানে বদলি খেলোয়াড়টিও আশরাফুলের-কাছে-সবার -যে-প্রত্যাশা (যেমন আমার ছিলো, সিরিজে অন্ততঃ ৩৫ এ্যাভারেজে একটা হাফ বা ফুল সেঞ্চুরী করা) সেটা পূরণ করতে পারবেনা। তারপরও এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ৪ বা ৫ নং পজিশন আটকে রাখার মতো যোগ্যতা আশরাফুলের আর কোনভাবেই নেই।


বাংলাদেশ দলের লাইনআপ যেমন হওয়া উচিত
এখন একটু বাংলাদেশ দলের লাইনআপ কেমন হওয়া উচিত দেখি -- রকিবুল, মেহরাব আর সাকিবকে দিয়ে ৩, ৪, ৫ এ নিয়মিত খেলানোর চিন্তা শুরু করা উচিত এখনই, সাকিবের মেজাজ যদিও এখনও পরিণত না, তাও নিজেকে গড়ে তোলার লম্বা সুযোগ পাবার দাবী সে রাখে। এ তিনজনের কেউ ব্যর্থ হলে মুশফিককে উপরে উঠিয়ে আনা যায়।

ওপেনার পজিশনে তামিম থাকবে, "তাউড়া বাড়ি"র খেলোয়াড় হলেও সব ম্যাচেই মোটামুটি ২০এর কাছাকাছি বা এর উপরে একটা স্কোর করে তবেই সে আউট হয়, যেটাকে এখনকার দলের পরিস্থিতিতে "ভালোই" বলতে হবে। তামিমের সাথে "ফি সাবিলিল্লাহ" হিসেবে জুনায়েদ/শাহরিয়ার নাফিস/ইমরুলকে রাখতে হবে হয়তো, যদিও এদের কাউকেই কখনই টেস্ট ব্যাটসম্যান মনে হয়না।

৬,৭ এ অবধারিতভাবে আসে মুশফিক (ঠান্ডা মেজাজ প্রমাণিত) আর মাহমুদুল্লাহ -- এই ছেলে ব্যাটিংয়েও ভালো করবে, ফার্স্ট ক্লাস এ্যাভারেজ অন্যদের তুলনায় বেশ ভালো। ৮/৯ এও অবধারিতভাবেই নাঈম/মাশরাফি; স্পেশালিস্ট বোলার বেশী দরকার হলে হয়তো নাঈমকে বসিয়ে বাড়তি বোলার নেয়া যেতে পারে। ১০/১১ তে দুজন স্পেশালিস্ট বোলার থাকবে -- বর্তমানের শাহাদাৎ/রাসেল/রুবেল/এনামুল/রাজ্জাককে যথেষ্ট পরিণত মনে হয়, তবে এর চেয়েও ভালো কেউ আসলে "সারভাইভল অভ দ্য ফিটেস্ট" থিওরী কাজ করবে। স্পিনার বা পেসারের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এই ব্যাংক থেকে ১০/১১ তে প্লেয়ার নেয়া যাবে।


আশরাফুলের সম্ভাবনা বা ফিউচার:
কাজেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, দলে থাকতে হলে আশরাফুলের স্পেশালিস্ট বোলার হিসাবে নিজেকে গড়েপিটে তোলা ছাড়া আর কোন গতি নেই। স্পিনে সে সেটা হতে পারে নাই আজ দশ-বারো বছর, তাই বেচারার শেষ ভরসা ফাস্ট বোলিং প্র্যাকটিস। এতে অবশ্য তার অধুনা স্ফীতিপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যেরও ব্যাপক পরিশোধন হবে বলা আশা করা যায়।

অবশ্য এবারের উইন্ডিজ সিরিজের পরিসংখ্যানে দেখা গেলো যে আশরাফুলের নাম উপরের দিকে আছে মাত্র দুটো জায়গায়। একটি হলো বোলিং স্ট্রাইক রেটে (অর্থাৎ, গড়ে উইকেট প্রতি কত বল করতে হয়েছে বোলারকে) আর আরেকটি হলো ক্যাচে -- দূ' দুটো ক্যাচ ধরেছে সে।
বোলিং স্ট্রাইক রেট ভালো হবার অবশ্য অন্য কারণ আছে। আশরাফুল রেগুলার বোলার না, ব্রেক থ্রুর জন্য অল্প কয়েক ওভার কাজে লাগানো হয়েছে তাকে, সেই অল্প কয়েক ওভারেই একটি করে উইকেট পেয়ে পরিসংখ্যানের বিচারে উপরে চলে এসেছে সে। এটা কিছুদিন আগে প্রচলিত হয়ে আবার বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ম, মানে সেই দ্বাদশ খেলোয়াড়ের (ব্যাটিং লাইনআপ থেকে একজনকে বদলায়ে বোলার নেয়া যাবে) ক্যাটেগরীতে খুব ভালো ম্যাচ করতো। আশরাফুলের কপাল খারাপ, সেই নিয়ম বাতিল হওয়ায় এই ক্যাটেগরীতেও তার দলে থাকার আর সুযোগ থাকলোনা।

বাকী থাকে ফিল্ডার পজিশন, সে উদ্দেশ্যে দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে আশরাফুলকে দলে রেখে "ঝিকে মেরে বউকে শেখানো"র কাজে ব্যবহার করা যায়। কিভাবে সেটা হয়তো ব্যাখ্যা করার দরকার নেই, তাও বলি, ভাবতে চেষ্টা করুন যে প্যাভিলিয়নে শুকনা মুখে ব্যাটসম্যানদেরকে প্যাড-গ্লাভস-গার্ড এগিয়ে দেয়া আশরাফুলকে দেখে বাকীরা বুঝে নিবে যে "পারফর্ম না করলে আশুর মতো প্লেয়ারের যখন এই দশা হইতারে, তখন আমগোর ...."

আরো কিছু উপায় অবশ্য আছে আশরাফুলের। যেমন, আমাদের বর্তমান উইকেট কীপারটির গলায় বেশ জোর থাকলেও উইকেটের পেছনের কাজের পটুতা নিয়ে তার গলার জোরের সমানুপাতেই বদনাম আছে। ধীমান ঘোষ আইসিএল কলঙ্কে কলঙ্কিনী(!) না হলে হয়তো আশরাফুলের এই সুযোগটাও যেতো -- তাও যেহেতু সুযোগটা আছেই তাই সে উইকেট কীপিং শেখাতেও মনোযোগ দিতে পারে। রাহুল দ্রাবিড় পেরে গেছে, আশরাফুল তো কোন ছার্!

আর সবশেষ উপায় হলো, তাবিজ-তুমার করে দুচারজন ব্যাটসম্যানের ইনজুরির অপেক্ষায় থাকা, দুধভাত হিসেবে যদি সুযোগ মেলে! নাহ, বেচারাকে আর নিচে নামাইনা।


আসল কথা
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সি টীমের সাথে জেতায় মন ভরেনি, তাই উপরে মূলতঃ মজা করেই এটা সেটা লিখলাম। আশরাফুলের খেলা দেখে একসময় মুগ্ধ হয়েছিলাম, কম্পিউটারের ওয়ালপেপারে "অন ষ্ট্রাইক আশু"কে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম বলেই হয়তো আজ এই মজা করার অধিকারটুকু নেয়া। মজা তো অনেক হলো, এখন বেচারা আশরাফুলকে নিয়ে একটু সিরিয়াসলি ভাবার চেষ্টা করি।

আমার মতে এখন বড়জোর ৬ বা ৭ নম্বর পজিশনে কিছুদিন খেলতে দিয়ে নিজেকে প্রমাণের একটা সুযোগ আপাততঃ দেয়া যেতে পারে আশরাফুলকে। যে খেলোয়াড়ের সারা ক্যারিয়ারের কোথাও কনসিস্টেন্সী বলে কিছু নেই তাকে দিয়ে ৪ নং পজিশনের কাফফারা আর কতকাল টানবে দল? এই পজিশনে দলের সবচেয়ে রিলায়েবল ব্যাটসম্যানটি খেলে থাকেন, যিনি টপ অর্ডারের ব্যর্থতার ধকল যেমন সামলাতে পারেন, তেমনি টপ অর্ডারের গড়ে দেয়া পাহাড়কে পর্বত বানিয়েও ছাড়তে পারেন। আশরাফুলের সেই গুণ কোনকালেই ছিলোনা। তার সব কীর্তিই দৈব, উপরদিকে তাকিয়ে ক্রমাগত দুরূদ পড়ার ফল বলা যেতে পারে বড়জোর।

তবে তার স্ট্রোক এখনও বাংলাদেশ দলের আর যে কোন খেলোয়াড়ের চেয়ে ভালো, এটা স্বীকার করতে কোন আপত্তি আমার নেই। কিন্তু তার জন্য আরো বেশী দরকার হলো ধৈর্য্যের সাথে ক্রিজে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন, বল বাই বল দেখে খেলার যোগ্যতা অর্জন, যেটা সে কখনই আয়ত্ত করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে। অন্ততঃ টেস্ট ক্রিকেটে এই গুণটি যে সুন্দর স্ট্রোকের চেয়ে অনেক বেশী প্রয়োজনীয় সেটা যে কেউ বোঝে। আশরাফুল নিজেও যে সেটা বুঝেছে তা প্রমাণের মাধ্যমেই কেবল টেস্ট ক্রিকেটে তার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।

বেশী বেঁধে দিচ্ছিনা, আগামী পাঁচটা টেস্টের দশটি ইনিংসের অন্ততঃ পাঁচটিতে শতাধিক বলের ইনিংস (রান ১০০ বলে ১ রান হলেও অসুবিধা নেই) যদি সে খেলতে পারে তাহলেই হয়তো কেবল সে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারে বলে মনে করবো। তা না হলে আইপিএলে বাংলাদেশী দর্শক টানার "টুলকিট"হিসেবে ব্যবহার হওয়াই হয়তো তার সর্বশেষ নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28983358 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28983358 2009-07-25 10:49:06
প্রধানমন্ত্রী কি রেড হেরিং খেললেন নাকি? আমরা হাইকোর্ট চিনিনা!! কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে আমার মনে হচ্ছে, প্রথমে "তিন বছর"কে ফোকাস করে প্রস্তাবটাকে যাচ্ছেতাই রকমের খারাপভাবে উপস্থাপন করে, তারপর এখন তিন বছরকে এক বছরে নিয়ে এসে সাধু সেজে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চলছে। অথচ আসল লূপহোল হলো, এই প্রস্তাবের "প্রশ্ন করা যাবেনা!" অংশটি! মনে হচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর বাহিনী রেড হেরিং খেললেন আমজনতার সাথে।

রেড হেরিং ইফেক্টের কথা এর আগেও লিখেছিলাম কোথায় যেন একবার, সামহোয়ারে ব্যাপক প্রচলিত "রিভার্স খেলা"র মাধ্যমে বিভ্রান্ত করার অস্ত্র এটা। সোভিয়েত যুগের রাশিয়ায় চিত্রনির্মাতারা রেড হেরিং হিসেবে যে টেকনিকটা ব্যবহার করতেন তা হলো ফিল্মের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ অর্থহীন কিছু সিকোয়েন্স ঢুকিয়ে দিতেন। যেমন ধরুন জমজমাট রোমান্টিক ছবির মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঢুকিয়ে দিলেন একটা ইঁদুরের কলে আটকা পড়ার দৃশ্য বা এক মোটাসোটা লোকের বরফে পিছলে পড়ার দৃশ্য। এর উপকারিতা ছিলো, সেন্সর বোর্ডের সদস্যরা এরকম আপাত বিমূর্ত দৃশ্যগুলো দেখে বিভ্রান্ত হবার সাথে সাথে সন্দেহ করে বসতেন যে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন বদ মেসেজ আছে! ফলে সেই অপ্রাসঙ্গিক দৃশ্যগুলোকে তাঁরা কাটছাট করেই ভাবতেন যে "গুড জব" করে ফেলেছেন। ওদিকে হয়ত মূল সিনেমায় মেসেজটি ঢুকিয়ে পরিচালক তাঁর উদ্দেশ্য সফল করার আয়োজন করে রেখেছেন।

আজ সকালের "কালো টাকা সাদা" সংক্রান্ত খবরটা পড়ে সেরকম একটা অনুভূতিই হলো। খবরের কাগজগুলো বেশ ফলাও করে ছেপেছে যে কালো টাকা সাদা করার তিন বছরের সময়সীমার যে অসভ্য প্রস্তাবটি এবারের বাজেটে আনা হয়েছিলো, সেটি নাকি কমিয়ে এক বছরে নামানো হয়েছে; এবং পত্রিকার টোন ধরতে ভুল করলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তবে মনে হলো তাঁরা বলতে চাইছেন যে এতে প্রস্তাবটি সভ্য হয়ে উঠেছে। বাহ্! পারফেক্ট রেড হেরিং!! কিভাবে সেটা বুঝতে হলে আগে একটা বেসিক ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।

কথা হলো "কালো টাকা" কি? ঘুষের মাধ্যমে আয় করা টাকা? কালোবাজারী বা চোরাচালানের মাধ্যমে কামানো টাকা? লুটপাট করা টাকা? বা অন্য যেকোন অসৎ উপায়ে আয় করা টাকা? না, এদের কোনটিই কালো টাকা না। আপনার সৎপথে করা আয়ের যে টাকাটার উপর আপনি যথাযথ ট্যাক্স দেননি, সেটিই কালো টাকা। ধরুন, একজন স্কুল বা কলেজের গণিতের শিক্ষকের কথা। প্রাইভেট পড়িয়ে বছরে কামাই করেন ২০ লাখ টাকা, কিন্তু ইনকাম ট্যাক্স অফিসে হিসেব দেখান যে তাঁর বাৎসরিক আয় ৪ লাখ টাকা। সেই চারলাখের উপর হিসেব করে ৩০/৪০ হাজার টাকা ট্যাক্স দিলেন। তখন যে ১৬ লাখ টাকার আয়ের হিসেবটা তিনি লুকোলেন, সেটাই কালোটাকা। এই "কালো রঙের" ১৬ লাখ টাকার ট্যাক্স না দিলে সেজন্য তাঁর ভয়ানক শাস্তি হতে পারে, তবে সেজন্য তাঁর আয় করা ঐ ১৬ লাখ টাকা কিন্তু অসৎ আয় হয়ে যাবেনা। তো, সরকারের এই প্রস্তাবে আপাততঃ যেটা বোঝা যায় যে মাননীয় শিক্ষক সাহেব আগামী এক বছরের মধ্যে ঐ ১৬ লাখ টাকার ট্যাক্স হিসেব করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার ইনকাম ট্যাক্স শোধ করলে তাঁকে আর ট্যাক্স প্রদান না করার অপরাধে জেলে পোরা হবেনা।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে আর অসুবিধা কি? এটা তো আর তেমন কোন বড় সমস্যা না, কারণ এতে তো অন্ততঃ অসাধু আয়ের লোকজনের কোন লাভ হচ্ছেনা। কিছু কিপ্টে কিসিমের উচ্চ আয়ের লোকের কাফফারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে মাত্র!

এখানেই সমস্যা!! এবারের মুহিত সাহেবের "কালো টাকা সাদা করণের" প্রস্তাবের মূল শুভংকরের ফাঁকিটা এখানেই। মূল সমস্যাটি "কালো টাকা"কে নিয়ে মোটেও নয়, এটি হলো এর পরের ক্লজটি নিয়ে, যেখানে তারা বলছেন যে কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করা যাবেনা। প্রস্তাবের এই অংশটাই যাবতীয় চোর-ডাকাত-বদমায়েশদের পথ পরিস্কারের চাবিকাঠি। এখন আপনি স্কুলের টিচারের মতোই চেহারা করে বিনা ঝামেলায় চোরাচালান করা ৫০ লাখ টাকাকে "প্রশ্ন করা যাবেনা" ট্যাগ করিয়ে নিতে পারবেন।

মন্ত্রীমহোদয় "কালোটাকা" নামক ভয়ংকর শোনালেও বস্তুতঃ নীরিহ একটি ফ্রেজ আর "তিন বছর" নামের একটা রেড হেরিং সৃষ্টি করে তলে তলে অসৎ পথে কামানো লোকদের সব ব্যাংকব্যালান্সকে "প্রশ্ন করা যাবেনা" স্ট্যাটাসটি প্রদান করার আয়োজন করে ফেললেন বলে মনে হলো।

কাল প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন উনি "মাছ ধরার জন্য আধার" পেতেছেন। খুব জানতে ইচ্ছে করে উনি কি "কিপ্টে কিসিমের উচ্চ আয়ের" কিছু পুঁটি মাছ ধরতে আগ্রহী, নাকি রাঘব বোয়াল? রাঘব বোয়ালদের জন্য তো তাঁর ব্যাটেলিয়ান উল্টো পুকুর পরিস্কারের আয়োজনে নেমেছে, তাও চারপাশে রেড হেরিং ধোঁয়া তৈরী করে।

আরো প্রশ্ন জাগে, খালেদা জিয়ার পুত্রধনদ্বয় যদি আগের পাঁচ বছরের তাঁদের "সত্যযুগে" কামানো কোটি কোটি টাকার ওপর এখন ১০% ট্যাক্স দিয়ে ঢাকা শহরের ফ্ল্যাটগুলো কিনে ফেলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কাউকে প্রশ্ন করতে দেবেননা? বাহ্, কি দরদ!

মৎস্যবিহারে ক্রীড়ারত আমাদের প্রধানমন্ত্রী/অর্থমন্ত্রী ও তাঁদের ব্যাটেলিয়ানের কাছে আমরা জনগণ কি এই আশা করতে পারিনা যে তাঁরা
অতি শীঘ্রই
১. "কোন প্রশ্ন করা হবেনা বা যাবেনা" অংশটি স্থগিত করবেন ২. আগামী বছর থেকে কালো টাকা সাদা করার আর কোন আইন করা হবেনা -- এই মুচলেকাটুকু জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন।

তা না হলে এ শুধু ভন্ডামীর আরেক নামই হবে, প্রধানমন্ত্রী মনে রাখবেন, একদিন আপনি নিজেও মাছে (রূপকথার মৎস্যকণ্যা নয়) পরিণত হতে পারেন!


২.
প্রকৃতপক্ষে কালোটাকা সাদা করার আইন করে লাভ হয় কিভাবে সেটাই আমার মাথায় ঢুকছেনা। ধরুন দু ধরনের লোক কালোটাকা সাদা করবে।

প্রথমতঃ, যারা সৎ আয় করেছেন কিন্তু সেটা ইনকাম ট্যাক্স রিপোর্টে প্রকাশ করেননি। এটা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে করা হয়, এতটাই ব্যাপক যে প্রতি বছর সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে যাঁদের নাম আমরা শুনি তাঁদের নাম সারা বছরে আর কখনও শোনা যায়না, কারণ তাঁরা সম্ভবতঃ মধ্যম মানের ব্যবসায়ী। এখন কথা হলো, কালো টাকা সাদা করে এদের লাভ কি? কি কারণে একজন টিউশনি জমানো শিক্ষক ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় ছেলেমেয়েসহ থাইল্যান্ড ট্রিপ বাদ দিয়ে অযথা সরকারী কোষাগারে টাকা জমা দেবেন তা আমার মাথায় আসেনা। মূল কথা হলো, তাঁর টাকা কালো থাকুক বা সাদা থাকুক -- তাতে তাঁর লাভক্ষতির কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তো দেখা যাচ্ছেনা!

দ্বিতীয়তঃ, যারা অসৎ আয় করছেন তারাই বা কেন জমা দেবেন? তাঁর টাকারও বা সাদা হবার দরকার কি? অথবা তাঁর টাকার "প্রশ্ন করা যাবেনা" এমন স্ট্যাটাস পাবার দরকার কি? তাতে কি তিনি শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছেন? মানে, তা নাহলে কি তিনি শাস্তি পাচ্ছেন এ দেশে?

মূল কথা সেটাই।
ট্যাক্স দেয়নি বলে শাস্তি হয়েছে এমন ঘটনা এদেশে ঘটে? নাকি ট্যাক্স যাতে না দিতে হয় সেজন্য ইনকাম ট্যাক্স অফিসারের বাসায় বাসায় লোকজনের আনাগোনার ঘটনা ঘটে? ঘুষ খেয়েছে বলে এদেশে কোনদিন শাস্তি হয়? নাকি ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার জন্য মানুষ ঘুষ দেয়?

সব মিলিয়ে কালোটাকা সাদা করার এই ব্যাপারটিতে আমি কোন অর্থই খুঁজে পাচ্ছিনা। ট্যাক্স না দেয়ার শাস্তি বা অসৎ আয়ের শাস্তির যে আইন, তার কোন প্রয়োগের উদাহরণ যে দেশে নাই, সে দেশে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব অবুঝ বাচ্চাও গ্রহন করবে বলে মনে হয়না। আগে এই আইনের শাসনের যথাযথ প্রতিষ্ঠা না করে কালোটাকা সাদা করার টোপ দেয়া একটা বুজরুকি অথবা ভন্ড আইডিয়া।

সাম্প্রতিক "কালো টাকা সাদা করার" আইন ১৯৯৯ সালে কিবরিয়া সাহেব চালু করেছিলেন, কি বুঝে কে জানে? তার তিন বছর তো গেলোই, এরপর সাইফুর সাহেবও এই আইন চালু রাখলেন তাঁর পাঁচ বছর। এই সাত আট বছরে আসলে কত টাকা সাদা হয়েছে সেই পরিসংখ্যান কি আমাদের আছে? আমি এখনও বুঝছিনা কেন তাঁরা এই আইনটিকে এত ভালোবাসেন? নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে, কেউ বুঝে থাকলে জানাবেন দয়া করে।

তবে এবার হয়তো "প্রশ্ন করা যাবেনা" আশ্বাসটি পেয়ে অনেকে এগিয়ে আসবেন, ব্যাংকে টাকা না লুকিয়ে রেখে নতুন চোরাচালানীর পুঁজিতে ব্যবহার করবেন। কিন্তু সেটা কোনভাবেই "কালো টাকা সাদা করা নয়", এটা পাবলিক বোঝে। তাই এটা যে আমজনতার কাছে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য কোন ব্যাপার হবেনা, সেটা আমাদের এই বড়শীবাহিনী যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।





*আরেকটা কথা মনে হলো, পুরোপুরিই আমার অনূর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত। তা হলো, হঠাৎ এ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য ব্যবহৃত টাকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবেনা টাইপের আইন করার মানে কি? গত কয়েকবছর ধরেই হাউজিং ইন্দাস্ট্রীতে বাবল চলছে, অবান্তর রকমের দাম বেড়ে চলেছে এ্যাপার্টমেন্ট আর জমির। এই বাবল ফাটবেই। তবে কি ফাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে? বাবল যাতে না ফাটে সেজন্যই কি বাড়তি গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্যে এই আয়োজন?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28971700 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28971700 2009-06-30 15:57:22
যে কারণে দিলরূবা খান বা হাবিব ওয়াহিদকে দায়ী করা যায় মনে আছে কলেজে পড়ার সময় খুব আড্ডা দিতাম বন্ধুরা মিলে; ঢাকা কলেজে পড়ার সুবাদে দু'বছরে সাকুল্যে কলেজে গিয়েছিই সম্ভবতঃ ত্রিশ/চল্লিশ দিন, বাকী সময়গুলো আড্ডায়ই কেটেছে মূলতঃ।বেশী বেশী আড্ডাবাজ তৈরী হতে পারে এমন সম্ভাবনার আঁচ করা থেকেই সম্ভবতঃ মতিঝিল কলোনীর প্রত্যেক একতলা বাসার সামনেই ঘরে ঢোকার যে সিঁড়ি, তার দু'পাশে দুটো সিমেন্টের বেঞ্চির মতো বসার বেদী তৈরী করা ছিলো। ঠাসাঠাসি করে সেই বেদী-সিঁড়ি দখল করেই চলতো আমাদের মতো উঠতি তরুণদের আড্ডা। সে বয়েসে আমাদের ভব্যতাজ্ঞান ছিলো শূণ্যের কোঠায়, তাই দেখা যেতো যে বাসার মালিকের কোনরকম অনুমতি ছাড়াই ছেলেদের একেকটা আড্ডার গ্রুপ কলোনীর একেক বাসার সামনের সেই বেদী দখল করে রেখেছে। তবে শুধু সেকারণেই যে একতলা বাসা সবচেয়ে কম জনপ্রিয় ছিলো তাও নয়; ড্রেনের গন্ধ, চামচিকার উৎপাত, ছিঁচকে চোরের লুঙ্গি-সায়া চুরি এরকম বহুবিধ অন্যান্য কারণের উপস্থিতির জন্যই হয়তো এ নিয়ে আমাদের অপরাধবোধের মাত্রাটাও তেমন চাগাড় দেয়নি কখনও। কিন্তু এখন বুঝি যে একতলা বাসাগুলোর মালিক, মালকিন আর তাঁদের সন্তানেরা যথেষ্ট বিরক্ত হতেন, ভদ্রতা বা ভীতির কারণেই হয়তো কিছু বলতেননা; যদিও আমাদের কারো পকেটে বা হাতে পিস্তল, কাটা রাইফেল, কিরিচ বা ড্যাগার টাইপের তো দূরের কথা ছোট একটা ফল কাটার চাকুও কেউ কোনদিন দেখেনি -- একেবারে কসম কেটে বলছি।

তবে, পকেটে অস্ত্র থাকুক বা না থাকুক, আমরা যাতে আড্ডা দিতে না পারি সেজন্য কোন একটা ভালো বুদ্ধি পেলে যে বাসার মালিক অবশ্যই সেটা গ্রহন করতেন, সেটা আজ কমনসেন্স না খাটিয়েও বেশ ভালোই বুঝতে পারি। এখনকার তরুণদেরও হয়তো ভব্যতাবোধের মাত্রাটা একইরকম, এখনও হয়তো মতিঝিল কলোনীর বাঁদর ছোকড়াদের দল একইভাবে জ্বালাতন করে যাচ্ছে একতলা-বাসার লোকজনদের; তবে একতলাওয়ালাদের জন্য সুখবর হলো এরকম জ্বালাতনকারীদের কোনরকম বিবাদ বা ঝক্কি ছাড়াই তাড়ানোর এক যুগান্তকারী যন্ত্র দুনিয়ায় চলে এসেছে।

শুধু যে মতিঝিল কলোনীর তরুণরাই লোকজনকে এরকম অকারণ জ্বালাতন করতো বা করে, ঘটনা কিন্তু মোটেও তা না। পুরো বাংলাদেশে তো বটেই, সারা দুনিয়া জুড়ে টিন এজারদের নিয়ে এই একই সমস্যা। রবীন্দ্রনাথের "বলাই"য়ের মতো এদের এক্সিস্টেন্স হয়তো অত হালকা বা অদৃশ্যমান না, তবে "বলাই"য়ের চেয়ে যে অনেক বেশী ঘনঘনই এরা বিরক্তির উদ্রেক করে তা নিশ্চিত। কি জাপান, কি আমেরিকা, কি ইউরোপ -- সবখানেই এই "কোন-বাঁধা-না-মানা" বয়েসের ছেলেমেয়েরা অযাচিত ঝামেলা তৈরী করে। রাস্তায় বা পার্কে হৈ চৈ করে জীবনের নানান হিসেবে ব্যস্ত আর স্বাস্থ্যসচেতন লোকজনদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানো তো আছেই, শপিংমলের দোকানগুলোর সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা গেঁড়ে বসে গপসপ করা, রেস্টুরেন্টে একটামাত্র করে ড্রিংকস অর্ডার করে ঘন্টার পর ঘন্টা হিহিহোহো করে কাটিয়ে দেয়া, গুলটি মেরে পাবলিক সম্পত্তি যেমন ল্যাম্পপোস্টের বাল্ব ফাটানো, দেয়ালে অবান্তর চিকা মারা, দুনিয়ার প্রায় সব জায়গাকে যখন তখন টয়লেট বানিয়ে ফেলানো -- এদের বিরক্তিকর কাজের হিসেব দিয়ে শেষ করা যাবেনা। তাও তো মতিঝিল কলোনীর একতলাওয়ালারা নিজের বাসাবাড়ীতে দোকানপাট বা শপিংমল খুলে বসেননা বলে রক্ষে, আড্ডাবাজদের জন্য আর্থিক ক্ষতির মুখ তাদের দেখতে হয়না; কিন্তু পুঁজিপতি দোকানদার আর রেস্টুরেন্টওয়ালারা কাঁহাতক এদের অত্যাচার সইবে, বলুন?


২.
কাজেই এদের শায়েস্তা করা দরকার! নো হাংকি পাংকি! সেই মোটিভেশন থেকেই দুনিয়ায় এসেছে যুগান্তকারী সেই যন্ত্র, নাম মনে নেই এই মুহূর্তে, তবে এতে শোনা যায় মশার ভনভনের মতো মহাবিরক্তিকর এক শব্দ। টিন এজাররা যেসব জায়গায় আড্ডা মেরে সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করে যেমন, পাবলিক প্লেস, শপিং মলের বিশ্রাম নেবার জায়গাগুলো, অথবা পার্কের টয়লেট -- এসব জায়গায় সেট করে রাখা হয় স্পীকারের মতো দেখতে এই অতিশয় কামেল যন্ত্রটিকে। অনবরত মশার ভনভনের মতো অতিমাত্রায় বিরক্তিকর এই শব্দ একটানা কিছুক্ষণ শুনলে যে কারূরই মাথা ভন ভন করবে বা শরীর গুলিয়ে উঠবে; অতদূর না গেলেও, মানে খুব স্বাস্থ্যসচেতন পাহলোয়ানের ক্ষেত্রেও নিদেনপক্ষে তাতে তাঁর মেজাজখানা যে বেশ খিঁচড়ে যাবে সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়। কাজেই জায়গামতো যন্ত্র সেট করে এ্যারোসলে মশা তাড়ানোর মতো ভনভন শব্দে আড্ডাবাজদের তাড়াও -- সহজ হিসেব।

ভাবছেন যে তাহলে তো ঐ যন্ত্র সেট করা জায়গাগুলো সাধারণ কাস্টমারদের জন্যওতো বিরক্তিকর হয়ে যাবে, তাইনা? দোকানে ঢুকতেই বা বেরুতে যদি বারবার ভনভন শব্দ শুনতে হয় তাহলে তো লোকে ওখানে আসা কমিয়ে দেবে, তাইনা? তবে সেখানেই আরেকটা "কিন্তু" আছে। এই যন্ত্রের ভন ভন আপনি তখনই শুনতে পাবেন যখন আপনার বয়েস মোটামুটি বিশের নীচে।

মানুষ যদিও সর্বনিন্ম বিশ হার্জ থেকে সর্বোচ্চ বিশ হাজার হার্জের ফ্রিকোয়েন্সীর শব্দ শুনতে পায় বলে আমরা জানি, তবে বয়েসের সাথে সাথে উপরের লিমিটটা নিচের দিকে নামতে থাকে। ফলে মোটামুটি সাড়ে সতেরো হাজার হার্জের এই বিরক্তিকর ভনভন শব্দটা বিশ পেরিয়ে যাওয়া কাস্টমারদের কানে যাবেনা, তাদের জন্য এটা নীরবতা, একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স! কাজেই সাধারণ কাস্টমারের শপিং, আমোদ, স্বাস্থ্যসচেতনতা কিছুতেই কোন ব্যাঘাত ঘটবেনা। শুধু টিনএজাররা এই শব্দ শুনবে, এবং লম্বা সময় ধরে কোথাও আড্ডা দিতে গেলে এই ভনভনে কান ঝালাপালা হয়ে আর দ্বিতীয়বার এখানে আড্ডা দিতে আসবেনা। একেবারে খাপেখাপ যাকে বলে! আমেরিকায় বেশ আগে আর জাপানে সম্প্রতি সরকার এই যন্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে, ফলাফলও বেশ আশাপ্রদ, অন্ততঃ আমেরিকায়।


৩.
এপর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো, কিন্তু ঝামেলা বাঁধিয়েছে আমেরিকার স্বাস্থ্যবিভাগ। তারা বলছে যে এই যন্ত্র থেকে বের হওয়া একঘেয়ে ভনভন শব্দটি স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, মাথা ধরায়, শরীর গুলায় -- কাজেই জনস্বাস্থ্যের খাটইরেই এটা ব্যবহার করা চলবেনা। আইন-কানুনের কড়াকড়ি নিয়ে আমেরিকার একটা সুনাম আছে। টিন এজারদের আড্ডা যতই অনাকাঙ্খিত হোক সেজন্য তাদের অসুস্থ্য করার আয়োজন করাকে সেদেশে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবেই দেখা হবে। আরেকটা সমস্যা হলো, শিশুদের নিয়ে। শিশুরা, মানে ধরুন দশের চেয়ে বয়েস কম এমন বাচ্চারাও শপিংমল বা পার্কে প্রায়ই যায়, একঘেয়ে শব্দটা তাদের কানেও ঢুকবে, তাদেরও শরীর খারাপ হতে পারে। সূতরাং, স্বাস্থ্যবিভাগের একদফা একদাবী, এই "যুগান্তকারী" যন্ত্র ব্যবহার করা যাবেনা! সর্বনাশ!!

স্বাস্থ্যবিভাগের যুক্তি ফেলনা নয় বটে, তবে এতগুলো টাকা খরচ করে সরকারমশায় কিনেছেন যন্ত্রগুলো, তাছাড়া সারা দেশে ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই কিনেছেন হয়তো। যে কোম্পানী যন্ত্র বিক্রী করেছে তাদের ব্যবসার ভবিষ্যত তো বটেই, বর্তমানও যুগপৎ ত্রাহিত্রাহি করছে। উদ্ধারের উপায় কি, নতুন বুদ্ধি বাতলাও! বার করো এমন ধরনের শব্দ যেটায় টিনএজাররা বিরক্তবোধ করবে ঠিকই কিন্তু শরীরের ক্ষতি হবেনা, মাথাও ধরবেনা, গাও গুলোবেনা। কোম্পানীর থিংকট্যাংক ভাবতে বসে গেলেন, থিংকট্যাংক বলে কথা -- বুদ্ধিও এসে গেলো শিগগিরই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, সমাধানটি হলো ফোক গান। টিন এজাররা একদমই সহ্য করতে পারেনা এই জিনিস; বয়েসটাই এমন, হার্ড রক, রক বা বড়জোর ফাস্ট পপ এলাউ করা যায়। সেখানে টুনটুন গুনগুন বাজনাওয়ালা ফোক সং, "কান্ট্রি রোড, টেক মি হোম"? কাভি নেহি! সূতরাং ধরো তক্তা, মারো পেরেক! দাও ঢুকিয়ে ফোক গান ঐ "যুগান্তকারী" যন্ত্রে। এখন একটানা বাজবে ফোক গান, শরীর খারাপ করবেনা কারুরই, কিন্তু মেজাজ ঠিকই খিঁচড়ে যাবে চৌদ্দ বছর বয়েসী পল বা পনেরো বছর বয়েসী এলেইনের। মামলা ডিশমিশ। সরকারও খুশী, বাজেটের অপচয় হলোনা।


৪.
তবে মাঝখান থেকে ফেঁসে গেলেন ফোক গানের শিল্পীরা। সরকার এখন এমন কিছু এ্যালাউ করবেনা যা ফোকগানকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে, অন্ততঃ টিন এজারদের কাছে। তাহলে আবার কেঁচে গন্ডুস! নতুন ধরনের শব্দ খুঁজতে হবে। ফোকগানওয়ালাদের টিনএজার মার্কেটটা চিরতরেই গেলো, যদিও কখনও ছিলো কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন!

মতিঝিল কলোনীর টিন এজার বা বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গার টিন এজারদের শায়েস্তা করার জন্যও দামে কুলোলে নিশ্চয়ই এই যন্ত্র আমদানী করতে চাইবেন অনেকেই। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়, ফোকগান নিয়ে: বাঙালী তরুণ-তরুণীরা তো আর আমেরিকানদের মতো সংস্কৃতিকে ভুলে যায়নি। এদেশের কোমলমতি টিনএজারদের তো মুখে মুখে ফোকগান। নব্বইয়ের দশকে দিলরূবা খান এক "ভ্রমর কইয়ো গিয়া" গেয়ে, আর চলমান দশকে হাবিবের সম্পাদনায় ইন্সট্রুমেন্টাল লোকগীতি এখন যুব সমাজের মুখে মুখে ঘোরে মার্কেটের বারান্দা, রিক্সা, বাস, একতলার সামনের বেদী টাইপের সব আড্ডাখানায়।

ভাবছি, দিলরূবা খান বা হাবিব ওয়াহিদকে দোষারোপ করার মতো একটা জুতসই কারণ অবশেষে পাওয়া গেলো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28971209 http://www.somewhereinblog.net/blog/lubdhokblog/28971209 2009-06-29 13:27:09