আসলে পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল ওয়াল্ট হুইটম্যান থেকেই।ঘটা করে না হোক হুইটম্যানেরই ভাষায় ভারসাম্য রক্ষাকারী,বস্তুবাদী এবং স্থূল আমেরিকান গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুদ্ধিকরণের বীজমন্ত্রে উদ্বুদ্ধকরণের সচেতন প্রয়াসের শুরু তো আসলে তাঁর থেকেই।আর পঞ্চাশের দশকে তো এ্যালেন গিন্সবার্গ রীতিমত বিপ্লবই ঘটিয়ে ফেললেন।স্বনামধন্য সমালোচক হ্যালেন
ভ্যান্ডলার খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁর সম্পর্কে বলেছেন-এ যেন ব্ল্যাক(উইলিয়াম ব্ল্যাক),হুইটম্যান(ওয়াল্ট হুইটম্যান),পাউন্ড(এজরা পাউন্ড) আর উইলিয়ামের(উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস) সমন্বিত রূপ।বিট আন্দোলনের পুরোধা এই কবি "হাউল" লিখে তো রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।বিশেষ করে এ গ্রন্থের "হাউল"এবং "আমেরিকা" কবিতা দু'টি তো আমেরিকার গণতন্ত্রের ভ্ন্ডামিকে উলঙ্গ করে ছেড়ে দিয়েছিল সে সময়।
আমেরিকার ভারসাম্যহীন,সকল কল্পনার অতীত অনিশ্চিতিময় পুঁজিবাদ আর মুক্তবাজার অর্থনীতির ঘেরাটোপে বাঁধা প্রকৃত গণতন্ত্রের(গিন্সবার্গদের স্বপ্ন কিংবা ইউটোপিয়া যাই বলা হোক) স্বপ্ন বাস্তবায়িত কবে হবে কে তা জানে।তবু এইসব লিখিয়েদের(কবিরা বিশেষত)সৃষ্টির ভেতর থেকেই কীর্ণ হয়ে পড়েছে যে-উদ্দীপন,তাকে শাসক শক্তি কোনো ক্রমেই আর উপেক্ষা করতে পারেনি।কারণ তারা জানতো কবিরা সরাসরি রাজনীতি বিষয়ে কথা না বললেও তাদের চেয়ে এ বিষয়ে কম অভিজ্ঞ নয়।তবে প্রকৃতি ঐশ্বর্যআর মানব সত্তার পরম সেই বিস্ময়ের উপর নিজেদের সমর্পণও উপেক্ষার নয়,পঞ্চাশের দশক থেকে সাম্প্রতিক আমেরিকার কবিতার ভেতর।
তবে গিন্সবার্গ যেভাবে অন্ধ স্বাদেশিকতার কুসংস্কারকে অদ্ব্যর্থ ভাষায় চুরমার করে দিয়েছেন,দিতে পেরেছেন তা এক কথায় অনবদ্য।তাঁর কবিতায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সম্মিলন ঘটেছে অসাধারণভাবে।তাঁর কবিতায় তাই খুঁজে পাওয়া যায় সংস্কৃত,হিব্রু,আরবী,জাপানী,জার্মানী,চেক ও স্প্যানীশ শব্দাবলী।হরে কৃষ্ণ,দূর্গা মা,তথাগত,মন্ত্র,বুদ্ধং স্মরণং গচ্ছামি,গঙ্গা মা,কালি মা,জয় রাম,জয় শংকর ইত্যাদি ভারতীয় সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট শব্দ যেমন তেমনি এদনই,ইকহাদ(হিব্রু),স্যাতোরাই(জাপানী),উইগ উয়েবলিচ(জার্মান),লা ইলাহা ইল্লাললাহু(আরবী) শব্দাবলীর উপস্থিতি যেভাবে তাঁর কবিতায় লক্ষ করা যায়,সে ভাবে লক্ষ করা যায়না পরবর্তীদের কবিতায়।যদিও কোনো কোনো কবিতায় লক্ষ করা যায় প্রকৃতি ঘনিষ্টতা,বন্ধন মুক্তির আর্তি ও স্বতঃস্ফূর্ততা।
হুইটম্যান,ব্ল্যাক,উইলিয়ামস আর গিন্সবার্গের গূঢ় ও বৈপ্লবিক বীক্ষায় সঞ্চারিত হয়েছিল যে ফল্গু নদী তার যাত্রা এখনো ব্যাহত নয়,বরং তা নানা বৈচিত্রে প্রবহমান।আর যারা এখন আমেরিকান কবিতায় এদের উত্তরাধিকার বহন করে যাচ্ছেন সেসব তরুণ তুর্কীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন--মেলভিন মরডেক উইল্ক,হারমান তুবে,প্যাট্টিসিয়া হিল,কলেট আইনেভা,এলিস জোনস,সুসান স্যানবর্ণ বার্কার,এ্যানী উডহল,জ্যানিস সোরেনসেন,র্যাচেল ফেরিস জ্যানকিনস,আন্দ্রে লাইনস,জ্যাক হেলী,এ্যান কুইন,বিল নিউম্যান,জ্যানেট ল্যাঙ্গ সেডলার,হ্যারিয়েট ব্রিকম্যান,লোরা রডলি,বেটি লকউড,ক্যারি ও ক্যাফি,এলিজাবেথ ব্রাউন,পিটার রিচার্ডস,কেনেথ রোজেন,লিনডা বামবার প্রমুখ।
তবে উত্তরাধূনিক(Post modern),নব্যরীতি(Innovative),অবাস্তববাদী (Fabulist),জাদুবাস্তববাদী(Magical realist),পরিব্যক্তি (Mutations),প্রান্তিক আন্দোলন(Fringe movement) ইত্যাদির নানা প্রভাব ও ভিন্নতা সত্ত্বেও আমেরিকার কাব্যধারা যাবতীয় কৌলিন্যের প্রাপনীয়তা নিমেষে খারিজ করে দিয়ে শাশ্বত শিল্পের বুননের দিকেই অগ্রসরমান।তবু নন্দনতাত্ত্বিক এইসব বিষয়-আশয়কে ঠেলে উঠে আসে যা তার ভেতর থেকেই সেই রশ্মি দীপিত হয়ে উঠে যা কাব্য পিপাসুদের আরাধ্য।একজন বিখ্যাত সমালোচক তার একটি আলোচনায় বলেছেন,"একটি কবিতা সাফল্যের সামগ্র্য নিয়ে যখন আমাদের কাছে পৌঁছায় আমরা ভাবতে বসিনা,কোন ছন্দে তার বিন্যাস ঘটেছে,অথবা শব্দ চয়ন বা চিত্রকল্পের কোন কোন বৈশিষ্ট সেখানে,উপকরণের গরজে উপস্থিত।"আসলে সমস্তটাই অবিভাজ্য এক নিটোল শিল্পের ঐকিকতায় উদ্ভাসিত।
এইসব কবি নগরের শৃঙ্খলাহীন,কদাকার বিস্তার,তার ধূসর নিরানন্দ জীবন,একাকীত্ব,দীর্ঘ দূরত্ব,শহুরে নিষ্ঠুরতা থেকে অবমুক্ত নয়।আর না হওয়াটাই হয়তোবা স্বাভাবিক।তবে শহরকেন্দ্রিকতা কিংবা নাগরিক জীবনের বৈচিত্র্য কিংবা এক ধরণের একঘেয়েমিও পেয়ে বসে কোনো কোনো কবিকে।অনেকেই তাই স্বপ্রণোদিত উদ্বাস্তু হতে চায়।মানুষ ও প্রকৃতির ভেতরে মানব মুক্তির অনাস্বাদিত সুখ চেখে নিতে চায়।উত্তর কাঠামোবাদী ও বিনির্মাণবাদীরা বলেন,শহরকে প্রতীকে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে আধুনিক মানুষ আসলে তার গূঢ় একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে চায়--মুক্ত নিসর্গে,আদিম প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিতে তার প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাকে।শহুরে সকল নির্মাণ আসলে এক ধরণের প্রবঞ্চনা।নিসর্গ থেকে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী থেকে সীমাবদ্ধ ও সীমিত বলয়ের ভেতরে স্থিত হয়ে যাওয়া।তবু নাগরিক কবি এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যেতে পারেনা।যাওবা পারে তাও একটি সীমাকে অতিক্রম করে যায়না।সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা পাঠকরণে এরকম একটি ধারণা জন্মলাভ করে।আপাত সরল প্রকাশভঙ্গির ভেতরে ভেতরে জারিত হয়ে যায় দার্শনিকতা,কখনো কখনো উত্তরাধুনিক বোধের সমন্বয়।
তাই চিরন্তন বোধের মতো কবিতায় রাস্তাঘাট,পার্ক,দেয়াল,মধ্যরাত ও জ্যোৎস্না,বরফ ও শৈত্য যেমন আসে তেমনি আসে জীবজন্তু,চিকিৎসা বিজ্ঞান,অ্যানাটমী ও ফিজিওলজির নানা অনুষঙ্গ।এক কথায় আমেরিকার সাম্প্রতিক কবিতা কোনো প্রচলিত আন্দোলন কিংবা দর্শনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়,কবিতা শিল্প রচনাই তাদের অন্বিষ্ট।যেহেতু কোনো কোনো সমালোচক বলে থাকেন-"একটানা অপরিবর্তন জীবনের চাইতে উচ্চাবচ,সম্পদ সংকটময়,বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ,হর্ষোচ্ছল ও রুধিরাক্ত জীবন ধারা সৃজনশীল শিল্পী ও কবির পক্ষে অনুকূল।কেননা একই জীবনের নানা বাঁকে আকাশ ও পৃথিবী,জগৎ ও জীবন তাদের কাছে অনন্য হয়ে ধরা দেয়।বাইরের জীবন ও আন্তরজীবন একাকার হয়ে থাকে অখন্ড এক বলয়ে,শুভ ও সুন্দর যেখানে হাত ধরাধরি করে আছে ক্ষয়হীন শিল্পে।"একই উপজীব্য বিষয় একজন কবি কলাকারের হাতে বিভিন্ন বয়সে অর্থাৎ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পূর্ণ আলাদা আয়তন বা মাত্রা পায়।আর অপেক্ষাকৃত প্রথম দিকের স্বপ্নাচ্ছন্নতা কেটে গিয়ে পরবর্তীকালে তা কেলাসিত শিল্প সফল রূপ লাভ করে।আর এ মহার্ঘ সত্যটুকু পশ্চিমে যেমন পূর্বেও তেমনি একই মাত্রা পায়।আমেরিকার সাম্প্রতিক কবিতার ক্ষেত্রেও তা আলাদা নয়।
যন্ত্রনির্ভর নগরকেন্দ্রিক সমাজ বলয়ের ভেতর পারিবারিক বন্ধনের ভাঙচুর,যৌন অনুভূতির যথেচ্ছ প্রচার ও প্রসার আমেরিকার সমাজ জীবনকে একটি প্রবৃত্তিতাড়িত সমাজ রূপ দিলেও, চিরন্তন প্রেম কি ভালোবাসা খানিকটা ভিন্ন মাত্রা পেলেও, এখনো অস্তিত্বময়।তরুণ প্রজন্মের কবিতায় তার প্রতিফলনও লক্ষ করার মতো।
নতুন প্রজন্মের সবার নয়,উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের কিছু কবিতার(মৎকৃত)অনুবাদসহ কিছু ধারণা এখানে দেওয়া গেল। (চলবে)।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

