somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... বর্ণমালার দেশে : মঞ্চ নাটক ছোটবেলায় ২১শে ফেব্রুয়ারীর আগের রাতে আমাদের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম, আর্ট কলেজের ছেলেমেয়েরা রাত জেগে জেগে আলপনা আঁকছে ফুলার রোডের উপরে। ওরা আঁকতো গান গাইতো, কথা বলতো । আমরা উঁকিঝুকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম কেমন হচ্ছে আলপনা। মাঝে মাঝে ছোটমামা অথবা আমার খালাতো ভাই বারান্দা থেকেই কথা বলতো ওদের সাথে। ওরাও জবাব দিত। যেন সম্পুর্ণ অচেনা কিছু মানুষের ছিটেফোঁটা কথার টুকরো নয়, বরং অনেক অনেক আগে থেকে একটা চলমান কথোপকথনের অংশ। ওই বিশেষ রাতে আমাদের বারান্দাটা সারা রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে যেত। ভীষণ আপন লাগতো সবাইকে আর একটা পবিত্রতা মিলেমিশে সময়টা ভরে উঠতো। ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভোরবেলায় ঘুম ঘুম চোখে বারান্দায় দাঁড়াতাম - বাতাসে তখন ধুলা, কুয়াশ আর নতুন রোদ মিলেমিশে একটা সকাল সকাল গন্ধ। গতরাতের এঁকে যাওয়া আল্পনার উপর দিয়ে খালি পায়ে এগিয়ে যেত প্রভাত ফেরী। মেয়েরা সব সাদা শাড়ী, কালো পাড়, কখনো গান - আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী...আর কখনো চুপচাড় ধীর পায়ে পথ হাঁটা। তখন ইতিহাস জানা ছিলনা, তবুও দিনটা আমাদের উদ্দীপিত করতো। আমরা তিনবোন ভোর হওয়ার অনেক আগেই একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে জেগে উঠতাম - অনেকটা ঈদের দিনের মতো। এক অপরকে জিজ্ঞাসা করতাম 'মনে আছে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী!' এই নাটকটা লেখা হয়েছে কয়েক বছর আগে। মেলবোর্ণে একবার সারাদিনব্যাপী একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল ২১শে ফেব্রুয়ারীতে। সেখানে বাচ্চাদের অভিনয়ের জন্য লেখা। ভাবলাম আজকে তুলি ব্লগে।
চরিত্র

লতা: বয়স ৫ - ৭। ঢাকার একটা ফ্ল্যাট বাড়ীতে বাবা মা আর বড় দুই ভাই বোনের সাথে থাকে। লাবনী: লতার বড় বোন। ক্লাস ৮/৯ এর ছাত্রী। নঈম: লতা ও লাবনীর বড় ভাই। কলেজে পড়ে। রহমান সাহেব: লতার বাবা লতিফা বানু: লতার মা এবং বর্ণমালা দেশের অধিবাসীগন


দৃশ্য ১:

ছোটখাটো সাজানো বসার ঘর। সোফায় বসে টেবিলের ওপর হারমোনিয়াম রেখে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটা তোলার চেষ্টা করছে। তার চোখে মুখে গভীর মনোযোগ। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় প্রথম লাইনটা তুলতে পেরে পাশে বসে থাকা নঈমকে চোখের ইশারায় গাইতে বলবে। তারপর হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে দুইজন মিলে গাইতে থাকবে, খানিকটা বেসুরো। বারে বারে বাজনা থামিয়ে সুর ঠিক করবে। এমন সময় লতা ঘরে ঢুকবে। কিছুটা অবাক হয়ে আস্তে আস্তে লাবনীর পাশে এসে দাঁড়াবে।


লতা: তোমরা কি করো?

লাবনী: গাধারাম! দেখছিস না গান তুলছি? সব সময় পিছে পিছে ঘুরিস কেন? যা আম্মার কাছে যা।

নঈম: আহা, বকিস কেন? আপু তুমি আমাদের কাছে আস। গান গাইবে?

লতা: (খুশী হয়ে ঘাড় কাত করবে) হুমমমমম! কিন্তু এই গান পারিনাতো! আপু 'ডোলা রে ডোলা' গানটা গাও। ওইটা আমি পারি। নাচ ও পারি! একদম ঐশ্বরিয়ার মত।

লাবনী: (ভীষন রাগ করে) ভাইয়া এইটাকে কোলের থেকে নামা তো! ২১শে ফেব্রুয়ারীর দিন 'ডোলা রে ডোলা' নাচ দেখাতে গেলে মানুষজন মাইর লাগাবেনা ধরে?

লতা: কেন? এইটাত ভালো গান। তুমিই না টিভির সামনে দাঁড়িয়ে মাধুরীর নাচ প্র্যাকটিস কর?

লাবনী: (মুখ ভেংচিয়ে) একটা থাপ্পড় খাবি কিন্তু এখন। ২১শে ফেব্রুয়ারী আর অন্য ফাংশান এক হলো নাকি? এটা হলো গিয়ে ভাষা আন্দোলন দিবস। খালি বাংলা ছাড়া আর কিছু গাওয়া যাবে না। এখন অতো বকর বকর না করে গান গাইতে চাইলে গা। ঠিক মতো গাইতে পারলে তোকেও কোরাসে চান্স দিব। ওকে ওয়ান টু থ্রি...'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো'...(নঈমও শুরু করবে সাথে সাথে। লতা গাইতে গিয়ে মুখ খুলেও খুব চিন্তিত মুখে চুপ করে থাকবে।

লতা: কিন্তু আপু। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' কেন? নঈম ভাইয়ার কোথায় কেটেছে? আর ভাইয়া তুমি সেভলন না লাগিয়ে গান গাও কেন? আম্মা শুনলে খুবই বকা দিবে। আর আমার যে ওইদিন দাঁত পড়লো, তোমরা তো কেউ ফাংশান করলা না!

(নঈম জোরে হেসে উঠবে। লাবনী রাগ করতে গিয়েও হাসি সামলানোর চেষ্টা করবে। )

লাবনী: নারে বেকুব। অনেক অনেক দিন আগে যখন আব্বা আম্মাও জন্মায় নাই, তখন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলা নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে মারা গেছে। এইজন্য এখন এই দিনে ফাংশান হয়। আর খালি বাংলা বলতে হয়। বুঝলি কিছু?

লতা: (কিছুটা বোকা বোকা চেহারায়) মানে......মানুষজন সব মরে গেছে বলে আমরা গান গাই?

নঈম: (হাসতে হাসতে লতার মাথার চুল এলোমেলো করে দেবে) নারে লতাপাতা। মানুষ মরে গেছে বলে গান গাই না। আমরা গান গাই ওদেরকে সম্মান দেখানোর জন্য। সেলিমদাদু আসে না আমাদের বাসায়? ওইযে তোর জন্য কত চকলেট নিয়ে আসে সবসময়? উনিও তো এই আন্দোলনে ছিলেন ১৯৫২ সালে।

লতা: (প্রবল বেগে ঘাড় নাড়তে নাড়তে, যেন এতক্ষণে সব রহস্য পরিষ্কার হলো) ওহ তাই বলো! তাহলে তো তোমরা দুইজন ভুল ভাল গান গাচ্ছিলা এতক্ষণ। গানটা আসলে হবে 'আমার দাদুর রক্তে রাঙানো..'

(লাবনী এবার চেয়ার থেকে উঠে তেড়ে যাবে লতাকে মারতে।) স্টুপিডের চুড়ান্ত! গেলি এইখান থেকে? সবকিছুতে একটা ঝামেলা করতেই হবে।

লতা দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাবে। লাবনী আবার হারমোনিয়াম বাজাতে থাকবে। স্টেজ খালি করে আবার নতুন করে সাজানোর সময় এই বাজনাই বাজতে থাকবে।



দৃশ্য ২ :

খানিকটা অগোছালো পড়ার ঘর। একপাশে একটা বুক শেলফ। আর অগোছালো টেবিলের ওপাশে চিন্তিত রহমান সাহেব বসে। পাঞ্জাবী পায়জামা পরনে। একপাশে চায়ের কাপ থেকে ঘন ঘন চুমুক দিচ্ছেন। কখনো মাথা তুলে চিন্তিত চোখে দর্শকদের দিকে তাকাচ্ছেন। নিজের মনেই বিড় বিড় করে দুই একটা শব্দ উচ্চারণ করছেন আর খসখস করে সামনের কাগজে লিখছেন। কাটছেন। কাগজ ফেলে দিচ্ছেন।

(এইবার গলা তুলে লতিফা বানুকে ডাকবেন)
: কি হলো? এইদিকে একটু শোন।

লতিফা বানু: (সালোয়ার কামিজ পড়া। ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে। তাঁর পেছন পেছন লেজুড় হয়ে লতাও ঢুকে পড়েছে চুপচাপ। টেবিলের পাশে দাঁড়াবে আর মা বাবার কথা শুনতে থাকবে)
: কি ব্যাপার? চেচায়ে তো বাড়ি মাথায় তুলে ফেললা! যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমার অনেক কাজ।

(রহমান সাহেব কিছু বলার আগেই লতা হাসতে শুরু করবে)
: হি হি! আম্মা, আব্বা এই বাড়ি মাথায় নিলে তো ফ্ল্যট হয়ে যাবে! আব্বা কি ইনক্রেডিবল হাল্ক?

লতিফা বানু : (মেয়ের মাথায় হালকা চাঁটি মেরে) উফ চুপ কর্ তো! যা বস্ ওইখানে।

(লতা একটা চেয়ারে বসবে। মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাবা মায়ের আলাপ শুনবে।)

রহমান সাহেব: (উৎসাহের সাথে) হুম এখন শোন। বক্তৃতা টা লিখে ফেললাম। একটু পড়ি। কমেন্ট করো।

লতিফা বানু: (অনিচ্ছুক ভাবে) শোনাও, তবে তাড়াতাড়ি পড়। আমার আবার বিজুরি ভাবিকে ফোন করতে হবে। এই পাড়ার থেকে একটা প্রভাত ফেরি করবো ভাবতেছি। কিভাবে শাড়ি টাড়ি পড়া হবে। আর সাজসজ্জা নিয়েও আলোচনা করতে হবে। মিছিল যেহেতু করবোই খানিকটা ধুমধামই করা দরকার। এমন একটা করা দরকার যেইটা মানুষ তাকায়ে দেখবে। কি বলো?

রহমান সাহেব: তাতো ঠিকই। তবে ওইগুলা তোমাদের ব্যপার। ভালই হবে। তুমি যখন আছো। এখন এইটা শোন দেখি। ব্যাটারা আবার ঘড়ি ধরে দুই মিনিট সময় দিলো। আরে এত আবেগের ব্যাপার কত কিছু বলা লাগে! দুই মিনিটে হয় নাকি?

লতিফা বানু: আরে তবুও তো তুমি একটা বক্তৃতা দেয়ার চান্স পাইছো। আব্দুল করিম সাহেব তো প্রতি বছর বক্তৃতা দিতে চায়। উনারে চান্স দেয়া হয় না।

রহমান সাহেব: (খুশী হয়ে) আরে সবার তো আর এক স্টেটাস না সমাজে। তবে আমাকে ছাড়াও এই পাড়ার থেকে হরিপদ বিশ্বাসকে বক্তৃতা দিতে বলেছে । তবে উনার কেস অন্য, সংখ্যা লঘু তো, সুযোগ দিতেই হয়।

লতিফা বানু: (তাড়া লাগবে) পড়তো জলদি। আবার স্টার টিভিতে 'কাল হো না হো' দেখাবে।

রহমান সাহেব: (গলা খাঁকারি দিয়ে, গলা কাঁপাতে কাঁপাতে) বন্ধুরা ২১শে ফেব্রুয়ারীর কথা মনে হলেই আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। সালাম, জব্বার, বরকত, রফিক নাম গুলি আমার ধমনিতে রক্তস্রোতের মতন অনুভব করি। এখনো মুজিবের সেই আওভান শুনে শিহরিত হই - 'এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম! এবারের...'

লতিফা বানু: (মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে) : কি বলো? ৭১এর সাথে ৫২ জোড়া দিছ কেন? মানুষ কি মদন?

লতা: হিহি। আম্মা মদন কি?

লতিফা বানু: তোমার জানতে হবে না, চুপ থাকো।

(লতা মাথা নিচু করে হাতের নখ খুঁটবে)

রহমান সাহেব: (একটু বোকা হেসে) আরে তাইতো! এই দেখো। বক্তৃতাটা আসলে গত বছর বিজয় দিবসে লিখেছিলাম। পরে তো আর পড়ার চান্স পেলাম না। বোমা মারা শুরু হয়ে গেল, তাই ওটাই ঝালাই করে নিতেছি। এই লাইনটা যে রয়ে গেছে টের পাই নাই।

লতা: (অবাক হয়ে) আব্বা তুমি এক বক্তৃতা সব সময় দাও, মানুষ তবু শোনে?

রহমান সাহেব: (হঠাৎ রেগে গিয়ে) এই মেয়েটা এইখানে কি করে লতিফা? সব সময় বড়দের ব্যপারে নাক গলাতে হবে। বই কই? যাও বর্ণমালার বই কিনে দিলাম না? সব মুখস্থ করো বসে বসে। লতিফা , একে কান ধরে পড়তে বসাও।

লতিফা বানু: (লতার হাত ধরে টানতে টানতে): আসলেই খুব লাই দেয়া হয় তোমাকে। চল পড়তে বস।

লতা: (কান্না কান্না মুখে) বই পড়বো না আম্মা। বর্ণমালা আমার ভালো লাগে না। বোরিং!

(হাত ধরে টানতে টানতে স্টেজের বাইরে নিয়ে যাবে)

দৃশ্য : ৩

(সেট বদলাতে হবে না। একই চেয়ার টেবিল ব্যবহার করা যায়। তবে স্টেজের একপাশে সরানো থাকবে। শেলফে বইয়ের বদলে কিছু স্টাফড এনিমেলস থাকলে ভালো হয়। লতা দুলে দুলে বই পড়বে। ঘন ঘন হাই তুলবে।)

স্বরে অ -- তে অ জ গ র

স্বরে আ - তে আম ....

'ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে
ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাব পেড়ে......'

(হাই তুলতে তুলতে বইয়ের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়বে)



দৃশ্য ৪:

(একটা বড় বোর্ডে 'বর্ণমালার দেশ' লিখে টেবিলটা ঢেকে দিতে হবে। যাতে ঘুমন্ত লতাকে দর্শকের সারি থেকে না দেখা যায়। স্টেজের অন্য প্রান্তে একটা বিশাল গাছের ছবিওয়ালা বোর্ড বা আসল বড় গাছ থাকলেও হয়, যার তলায় গোল হয়ে বসা যায়। বর্ণমালার অধিবাসীরা স্টেজের মাঝখানে জড়ো হবে, ঘুরে ঘুরে খেলবে, হাসবে, লাফালাফি করবে। লতা বোর্ডের সামনে দিয়ে আসবে। দলটার কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়াবে। আর সবাই ওর কাছে এগিয়ে আসবে। একজনের পর একজন লতাকে স্বাগত জানাবে। এটা খেয়াল রাখতে হবে যেন সবার কথা মিলেমিশে একটা বাক্যের মত শোনায়। )

স্বাগতম!

সুস্বাগতম!

ভালো আছো?

কাইফা হালুক?

কিয়োরা!

বনজুর!

আইয়ে জনাব।

সালাম আলাইকুম!

নামাস্তে।

ওয়েলকাম!

সাত স্রিয়া কাল।

লতা: (হকচকিয়ে যাবে): আরে আরে কি মুশকিল! কে তোমরা?

(এক এক জন এগিয়ে এসে পরিচয় দেবে। যে বলবে সে সব সময় দর্শকের দিকে ফিরে থাকবে।)

- আমি কবি কবুতর

- আমি কোনঠাসা কাকাতুয়া

- আমি ক্লান্ত কাক

- আমি কর্মী কাঠবেড়ালী

- খেয়ালী খরগোশ

- খাদক খচ্চর

- গায়ক গাধা

(কবি কবুতর কথা বলবে) : এহ হলো না। বোলো না। গাধা আর গায়কে যে মেলেনা! অন্য কিছু বলো না!

গাধা : তবে তাই হোক। আমি জ্ঞনী গর্দ্ধব।

গন্ডার: ওহ! গায়কের পোষ্টটা যখন খালি। আমি তাহলে গায়ক গন্ডার।

- আমি গাণিতিক গরু।

- চামচা চামচিকা

- জবরদস্ত জিরাফ

- দয়ালু দোয়েল

- টগবগ টাট্টু

- উন্মাদ উট

- তেলানী তেলাপোকা

- হাঁপানী হাতি

-ব্প্লিবী বেড়াল

- বিদ্রোহী বাঘ

-ভাবালু ভাল্লুক

- প্রামান্য পেঁচা

-মেঘলা ময়ূর

-স্বতেজ সিংহ

- স্বাধীন শুয়োর

লতা : (অবাক হয়ে) সেকি ! এত গর্ব নিয়ে শুয়োর বলছো কেন? এইটা না গালি?

স্বাধীন শুয়োর: তাই নাকি? আমাদের দেশে অবশ্য কেউ খারাপ কাজ করলে আমরা গালি দেই 'মানুষের বাচ্চা' বলে।

লতা: হায় হায়! কেন?

স্বাধীন শুয়োর: কে জানে। এই রকমই করে সবাই।

জ্ঞানী গর্দ্ধভ: আমি বলি - আসলে তুমি যা, তার চেয়ে অন্যরকম কিছু যদি দেখাতে চাও, সেইটাই গালি। মানুষ কি আর শুয়োর? আর শুয়োর কি মানুষ?

লতা: (একটু ভেবে নিয়ে) বাহ! ঠিকই তো বলেছ গর্দ্ধভ। আসলেই তুমি জ্ঞানী।

তেলানী তেলাপোকা: (বিগলিত হেসে): গর্দ্ধভ ভাই সবসময় খাঁটি কথা বলেন।

চামচা চামচিকা: এই জন্যই তো আমি উনার সাথে উঠা বসা করি!

প্রামান্য পেঁচা: লতা, তবে একটা ব্যপার নিয়ে কি ভেবেছ?

ভাবালু ভাল্লুক: আরে আরে! বলো কি প্রামান্য পেঁচা! আসলে বুড়া হয়ে তুমি সব ভুলে যাইতেছ! আমি ভাবালু ভাল্লুক বসে আছি। আর তুমি ওই পিচ্চি মেয়েটার মাথা খাইতেছ?

খাদক খচ্চর: কে কি খায়? আমারে রেখে? আমি খাবো! আমি খাবো!

মেঘলা ময়ূর: উফ! কি আনরোমান্টিক! সব সময় খাওয়ার কথা। দেখো কি সুন্দর মেঘ আকাশে, কবি কবুতর! আজ কিছু শোনাবে না?

কবি কবুতর: (মাথা চুলকাতে চুলকাতে): আসলে আমি তো তারই তৈয়ারী করছিলাম, তবে তোমরা সবাই মিলে এমন হৈ চে শুরু করলে -

কোনঠাসা কাকাতুয়া : আমার একটা কথা ছিল.....

সবাই মিলে: (শুধু বিপ্লবী বেড়াল আর দয়ালু দোয়েল বাদে): এই চুপ চুপ!

চামচা চামচিকা: তোমার নাম দেখসো? কোনঠাসা! এক কোনে চুপ চাপ ঠেসে থাকো। তোমার কোন কথা কেউ শুনবো না।

দয়ালু দোয়েল: আহা! এমন করো কেন? (কাকাতুয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে) আসো আমি তোমার কথা শুনবো।

ব্প্লিবী বেড়াল: না না! কাউকে কোনঠাসা করে রাখা যাবে না। বিপ্লবের ডাক দিতে হবে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!

বিদ্রোহী বাঘ: বলো বীর! চীর উন্নত মম শির!

উন্মাদ ঊট: হা! হা! আমি উন্মাদ! আমি উন্মাদ! আমি চিনেছি আমারে সহসা, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।

খেয়ালী খরগোশ: আমি ভাই চলি আমার আপন খেয়ালে। আমি বিপ্লব বিদ্রোহে নাই। তার চেয়ে দেখ ওই প্রান্তে একটা কি সুন্দর গর্ত! চলো সবাই দৌড়াতে দৌড়াতে ওইখানে যাই।

টগবগ টাট্টু: (টগবগিয়ে) কি দারুণ ! চলো চলো!

হাঁপানী হাতি: (হাঁপাতে হাঁপাতে) থামো থামো! খরগোশ। তুমি আর মানুষ হলা না। আর এই দিকে এই টাট্টুটাও খালি টগবগ করে সারাক্ষন। ওইখানে দৌড়াইয়া যাইতে হলে তো আমি হাঁপাতে হাঁপাতে মরে যাবো।

গায়ক গন্ডার: (গান গাবে: ওরে ভোলামন এর সুরে, বিবেকের মত) : ওরে...হাতি মন...জ্ঞানী গর্দ্ধভ কি বল্লো একটু আগে? শোন নাই? খরগোশ কেন মানুষ হবে? লতা হলো মানুষ। আমাদের বর্ণমালার দেশে, দুইটা এক জিনিষ কোথাও নাই। আমরা সবাই নিজের নিজের মত।

ক্লান্ত কাক: (হাই তুলতে তুলতে): কত রকম প্যঁচাল যে পাড়তে পারো তোমরা। কো জানালার কার্ণিশে একটু ঝিমাইতে পারলে বাঁচি।

লতা: (এতক্ষন সবাইকে অবাক হয়ে দেখছিল)..কিন্তু

সমস্বরে: কিন্তু?

সমস্বরে: কিন্তু?

সতেজ সিংহ: (গর্জন) সব চুপ! একটা বিষয়ে ভাবা হচ্ছিল। সবাই মিলে হাঙ্গামা করে সব মাটি করে দিলা।

কর্মী কাঠবিড়ালী: সিংহ মামা রাগী হলেও, খাঁটি কথা বলছে। আসো সবাই কাজে নেমে পড়ি।

আবার সমস্বরে: কাজ টা কি?

খাদক খচ্চর: আসো খই ভাজি! কতদিন খাই না!

মেঘলা ময়ূর: আবার!

লতা: আমি বলি কাজ কি .. আসলে আমি একটা কথা ভাবতে ভাবতে কুল কিনারা পাইতেছি না।

ভবালু ভাল্লুক: তাহলে তো তুমি বিলকুল ঠিক জায়গায় এসে পড়ছো! আমরাও তোমার সাথে ভাবি।

কবি কবুতর: এক মিনিট এক মিনিট। আমি ভাল্লুক ভাই কে নিয়ে একটা কবিতা লিখছি। একটু পড়ে শোনাই সবাই কে - 'রতনে রতন চেনে ভাল্লুক চেনে শাকালু। তিনি বড় ভাবালু। '

সমস্বরে: ওয়াহ! ওয়াহ! ওয়াহ!

কর্মী কাঠবেড়ালি: খালি কথা, খালি কথা! লতা তোমার প্রবলেম টা কি বলো।

লতা: কালকে ২১শে ফেব্রুয়ারী। বাসার সবাই দেখি খুব ফুর্তিতে আছে। কিন্তু হিসাব মিলতেছে না।

গানিতিক গরু: হিসাব! বলো বলো আমাকে। আমি মিলায়ে দেই।

লতা: না না গাণিতিক গরু। অংকের হিসাব না। এইটা আলাদা ব্যপার। সবার কাছে যা শুনলাম, অনেকদিন আগে মানে সেই ১৯৫২র ২১শে ফেব্রুয়ারীতে নাকি অনেক মানুষ আন্দোলন করতে করতে মারা গেছে। এই জন্য সবাই গান গায় আর বক্তৃতা দেয়। কেউ মারা গেলে গান গাইতে হয় নাকি?

ভাবালু ভাল্লুক: হুম, কঠিন সমস্যা। তো আন্দোলনটা কি ছিল?

লতা: ওইটাই তো ঠিক মতন বুঝলাম না। 'ভাষা আন্দোলন' বলে সবাই।

প্রামান্য পেঁচা: তুমি ৫২র ভাষা আন্দোলনের কথা বলছো? আমি তো ছিলাম ওই সময়ে। তখন কত তরুন ছিলাম, আহা!

লতা: ওমা! তুমি জানো? আমাকে বলো না শুনি!

অন্যরাও একসাথে: আমাদেরও বলো । আমরাও তো জানি না।

প্রামাণ্য পেঁচা: তাইলে বলি, আসো, ওই গাছটার তলায় বসি। (সবাই গাছের ছায়ায় গোল হয়ে বসবে)

প্রামাণ্য পেঁচা: সে অনেক অনেক দিন আগের কথা...

কোনঠাসা কাকাতুয়া: এমন ভাবে বলছো, যেন রূপকথার গল্প এটা।

ভাবালু ভাল্লুক: তা এক দিকে ভাবো যদি, রূপকথার মতই তো বলতে গেলে। এখন তো আর সেই রকম মানুষ কেউ নাই।

প্রামাণ্য পেঁচা: তখন বাংলাদেশ নামে কোন দেশ ছিল না..

লতা: (বিস্মিত হয়ে) কি বলো? বাংলাদেশ তো সব সময় ছিল।

প্রামাণ্য পেঁচা: তা ছিল। তবে তার পরিচয় লুকায়ে ছিল। সেই সময় ভারত থেকে নতুন নতুন আলাদা হয়ে পাকিস্তান নামে একটা দেশ হলো। তার আবার দুই ভাগ। পশ্চিম আর পূর্ব। পশ্চিম পাকিস্তানের লোক কথা বলতো উর্দু ভাষায় আর পূর্ব পাকিস্তানের লোক বাংলা।

লতা: জানি তো! আব্বা বলে উর্দু খুব খারাপ ভাষা। এই জন্য আমার আপাকে গজল শুনতে দেয় না।

কবি কবুতর: কিন্তু সেইটা কি করে হয়? কো ভাষা তো খারাপ নয়।

ক্লান্ত কাক: এই ভাষা নিয়ে মানুষের লেকচার শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত।

জবরদস্ত জিরাফ: ঠিকই। লতা, তোমার আব্বা ঠিক বলেন নাই। ভাষা খারাপ না, গজল ও খারাপ না। তবে কিনা, এই ব্যপারটা ছিল অন্য।

ভাবালু ভাল্লুক: এইটা একটা জবরদস্ত ভাবের কথা বলছো জিরাফ। ভাবের মধ্যে কি যে 'অ' ভাব!

প্রামাণ্য পেঁচা: আহা বাকিটা শোনই না। এই দুই পাকিস্তানের মধ্যে বাংলায় কথা বলা মানুষ ছিল অনেক বেশী। কিন্তু দেশ শাসন করতো উর্দু কথা বলা লোকরা। একদিন ঘোষনা হলো, পাকিস্তানের ভাষা হিসাবে শুধু উর্দু চলবে। বাংলা না।

লতা: কিন্তু এইটা তো unfair। তাইলে বাংলা কথা বলা লোকদের তো খুব অসুবিধা হওয়ার কথা। ওরা যা না, সেই মতো থাকতে হতো তাহলে। তোমরা তো বললা সেটাই গালি।

প্রামাণ্য পেঁচা: Exactly! এটাই মনে হলো তখন অনেক ছেলেমেয়েদের, এর জন্যই তো আন্দোলন।

গায়ক গন্ডার: (গান গেয়ে উঠবে): মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রান হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে।

লতা: তখন কি হলো?

প্রামাণ্য পেঁচা: কি আর হবে। অনেক ছেলে মেয়ে মারা গেল । কারণ তারা চাইছিল, যাতে অনেক দিন পর যারা আসবে, তারা নিজেদের মত বাঁচতে পারে।

লতা: আমার খুব কান্না পাচ্ছে জানো? ওরা এত কিছু করলো, কিন্তু বেঁচেই তো নাই। আবার ভালোও লাগতেছে। ওরা এত ভালো ছিল তাই। আবার ওদের মতন হতেও ইচ্ছা হয়। আমার যা ভালো মনে হবে তাকে বাঁচাবো। যা খারাপ, তাকে বাঁধা দেব।

স্বাধীন শুয়োর: এই তো লতা বুঝেছে। এরকমই লাগার কথা এই দিনে। এইটুকুই যদি সবাই করতো, কি ভালো হতো না?

লতা: হতো তো! কিন্তু ২১শে ফেব্রুয়ারীর কথা তো আমি কোনদিন শুনি না তেমন। শুধু একদিনই সবার ছুটি থাকে, আর সবাই এক কিছু করে। অন্যদিন কিছু করে না।

ভাবালু ভাল্লুক: তবে লতা, একটা জিনিষ ভেবে দেখলাম। এই দিনটা পালন করাও খারাপ না। কি বলো? যেমন তুমি লতা। তুমি সব সময়েই লতা থাকবা, তবে তোমার জন্মদিনটা তবুও একটা বিশেষ দিন, না? ওই রকমই ২১শে ফেব্রুয়ারী ও বলতে পারো, আমাদের নিজের মত করে বাঁচতে শেখার জন্মদিন।

সতেজ সিংহ: বাহ! সাবাশ ভাবালু ভাল্লুক। এত ভাবের কথা তো তুমি আগে বলো নাই!

প্রামাণ্য পেঁচা: একটা কথা কিন্তু এখনো বাকি রয়ে গেল লতা।

লতা: কি?

প্রামাণ্য পেঁচা: বলতো কেন আমরা তোমার কাছে এসেছি?

লতা: কেন?

বিদ্রোহী বাঘ: কারণ তুমি আমাদের বর্ণমালাকে বোরিং বলেছো! মানি না মানি না!

কবি কবুতর: বর্ণমালা, আমার দুঃখিণী বর্ণমালা

খেয়ালী খরগোশ: এই দেখ আমাদের দেশ। কি সুন্দর। আর কি রঙীন। আমাদের নিজেদের খেয়াল মতো আমরা জীবন সাজাই।

জ্ঞানী গর্দ্ধভ: আজ তোমাকেও আমাদের দেশের অংশ করে নিলাম। এবার তোমার কাছে ও বর্ণমালা আছে। একে নিজের মতন করে সাজাবে।

বিপ্লবী বেড়াল। কমরেড! সময় হয়েছে, নতুন সূর্য আনার...

কর্মী কাঠবেড়ালী: আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।

ক্লান্ত কাক: সব ক্লান্তি মুছে ফেল। এই এরকম ডানা ঝাপটিয়ে । (ডানা ঝাপটাবে) কোনঠাসা কাকাতুয়অ! আসো ভাই তুমিও। সবাইকে জাগিয়ে দাও এবার..জাগো জাগো, ওঠো ওঠো....

(বলতে বলতেই সবাই স্টেজ ছাড়বে। লতা বোর্ডের পেছনে গিয়ে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাবে আবার। সেট বদল হয়ে, আবার লতার ঘর। লতিফা বানু ভেতরে আসবেন। দেখবেন লতা ঘুমিয়ে আছে চেয়ারে বসে। )

লতিফা বানু: (নিজের মনে): ইস! মেয়েটাতো বসে বসে ঘুমিয়েছে দেখি! (লতার পাশে এসে আস্তে আস্তে ঠেলা দেবে) লতা.. ওঠো ..ওঠো..

লতা: (ঘুম ঘুম চোখে) : ওঠো ওঠো , জাগো জাগো...(তারপর অবাক হয়ে চারদিকে দেখবে) ওমা! আমি তো আমার ঘরে।

লতিফা বানু: (হেসে) স্বপ্ন দেখছিলি না ? ওই দেখ প্রভাত ফেরী শুরু হয়ে গেছে, আয় দেখি।

(স্টেজের সামনে দিয়ে মিছিল যাবে। নঈম, লাবনী, রহমান সাহেব ও এসে দাঁড়াবে লতার সাথে, ব্যকগ্রাউন্ডে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' বাজবে। )

লতা: বর্ণমালা খুব ভালো!

(নঈম ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেবে, লাবনী হাত ধরবে, লতিফা বানা আর রহমান সাহেব হাসবেন। মিছিলটা স্টেজ এর সামনে দিয়ে ঘুরে উপরে উঠে আসবে, দর্শকদের সামনে দাঁড়াবে)














]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28915330 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28915330 2009-02-23 17:56:32
হেলেন কেলার - দ্য স্টোরি অভ মাই লাইফ থেকে ........................................

আশা করি বই নিয়ে লেখা আগের অধ্যায় দেখে পাঠকেরা ধ’রে নেবেন না যে কেবল পড়াশোনাতেই আমার একমাত্র আনন্দ। আমার আনন্দ আর বিনোদনের উপাদান অনেক এবং বৈচিত্র্যময়।

গল্পে আমি বহুবার গ্রাম আর বাইরে খেলাধুলার উল্লেখ করেছি। ছেলেবেলায় নৌকা বাইতে আর সাঁতার কাটতে শিখেছিলাম। আর গ্রীষ্মে ম্যাসাচুসেট্স্-এর রেনহ্যামে যখন আসি, সারাটা সময় আমার নৌকাতেই কাটে। আমার বন্ধুরা যখন দেখা করতে আসে, তাদের নিয়ে নৌকায় ঘুরে বেড়াবার আনন্দের তুলনা নেই। অবশ্য বলা বাহুল্য আমি খুব-একটা নিশানা ঠিক রাখতে পারি না। সচরাচর অন্য কেউ পাছ-গলুই সামলায় আর আমি দাঁড় ফেলি। হামেশা আমি হাল ছাড়াই যাই নৌকা বাইতে। তখন জলডোবা ঘাস, শাপলা আর পাড়ের ঝোপঝাড়ের গন্ধে গন্ধে দিক ঠিক করতে হয়, দারুণ মজার ব্যাপার। আমার দাঁড়গুলায় চামড়ার ব্যান্ড লাগানো আছে, যার কারণে পিছলে যাবার ভয় থাকে না। বৈঠা ঠেলতে কতটা জোর লাগছে তার উপর নির্ভর করে আমি বুঝতে পারি দাঁড় ঠিকমতো পড়ছে কীনা। একইভাবে, স্রোতের বিপরীতে কখন চলেছি তাও টের পাই। বাতাস আর ঢেউয়ের সাথে পাল−া দিতে আমার ভালো লাগে। এমন উদ্দীপক আর কী আছে, যখন তোমার ছোট্ট, টেকসই নৌকাটা, তোমার ইচ্ছা আর পেশীর হুকুমে, দোলায়িত, ঝকঝকে ঢেউ এর উপর দিয়ে পিছলে চলে, আর জলরাশির সবল, প্রবল, তোড় অনুভব করতে করতে তুমি ভেসে যাও!

ডিঙি নৌকায় চ’ড়ে বেড়াতেও ভালো লাগে আমার। আর শুনলে হয়তো হাসবেন আপনারা, চাঁদনি রাতে নৌকা চড়তে সবচেয়ে ভালোবাসি আমি। যদিও চাঁদ যখন পাইন গাছের আড়াল থেকে আলো ছড়াতে ছড়াতে উঠে এসে আলগোছে আকাশ পার হ’য়ে আমাদের জন্য তৈরি ক’রে আলোকিত পথ, তাকে দেখতে পাই না আমি, কিন্তু নৌকায় তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে শুয়ে পানির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে কল্পনা করি যেন তার ঝলমলে জামার কাঁপন ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে। কখনও কখনও কোনো সাহসী মাছ আমার আঙুলের ফাঁক গ’লে ঢুকে পড়ে, অথবা কোনো লাজুক শাপলার স্পর্শ পাই। প্রায়ই কোনো সরু উপনদী বা খাঁড়ির আশ্রয় ছেড়ে বা’র হবার পর হঠাৎ টের পাই যেন চারপাশের বাতাসটুকু অনেক চওড়া হ’য়ে গেছে। একটা উদ্ভাসিত উষ্ণতা যেন জড়িয়ে ধরে আমাকে। এটি রোদ-তাতা গাছ নাকি পানির থেকে আসছে আমি বুঝতে পারি না। এই অদ্ভুত অনুভূতি একদম শহরের মাঝখানেও আমার হয়েছে। এমনকি শীতের দিন কি ঝড়ের রাতেও কখনও। আমার মুখে কারো উষ্ণ ঠোঁটের চুমুর মতো এই অনুভব।

পালতোলা নৌকায় বেড়ানো আমার সবচেয়ে পছন্দের। ১৯০১ সালের গ্রীষ্মে নোভা স্কশিয়া-তে গিয়েছিলাম আমি, সেইসময়েই সমুদ্রের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। কয়েকদিন ইভানজেলিনের গ্রামে কাটাবার পর, লংফেলো যাকে নিয়ে জাদুর জাল বুনেছেন তাঁর কবিতায়, মিস সালিভান আর আমি হ্যালিফ্যাক্সে গিয়ে প্রায় পুরোটা গ্রীষ্ম সেখানে কাটিয়ে আসি। বন্দরটা ছিল আমাদের স্বর্গ! কী যে সুখের ছিল সেইসব নৌকা ভ্রমণ - বেডফোর্ড বেসিন, ম্যাকন্যাব’স আইল্যান্ড, ইয়র্ক রিডাউট আর নর্থওয়েস্ট আর্ম! আর ঐসব বিরাট্, নীরব মানোয়ার জাহাজের ছায়ায় আমাদের রাতগুলো ছিল কী যে শান্তিময়। ইস্! কী দারুণ ভালো আর সুন্দর ছিল সব! এই স্মৃতিটুকু সারাজীবন আনন্দ দেবে আমাকে।

বেশ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হ’ল একদিন। নর্থওয়েস্ট আর্মস্-এ একটা নৌকাবাইচ (রেগাটা) হবার কথা ছিল সেদিন যাতে রণতরীর নৌকাগুলি অংশ নেবে। অন্য অনেকের সাথে আমরাও ছোট্ট পালের নৌকা নিয়ে গিয়েছি রেস দেখতে। শ’য়ে শ’য়ে ছোট-ছোট নৌকা দুলছিল আশেপাশে, সমুদ্রও ছিল শান্ত। রেস-শেষে আমরা ঘরমুখী হলাম যখন, দেখা গেল একটা কালো মেঘ ঘন আর বড় হ’তে হ’তে সারা আকাশ ছেয়ে ফেলছে। জোর বাতাস দিল সাথে সাথে, ঢেউগুলি ফুঁসে উঠে কোনো অদৃশ্য বাঁধ ভেঙে ফেলবার পাঁয়তারা করতে লাগল। আমাদের ছোট্ট নৌকা সাহসের সাথে মোকাবিলা করলো ঝড়ের, তার ছড়ানো পাল আর টানটান দড়িতে সে যেন বাতাসে ভর দিয়ে চলছিল। এই সে ঘুরে গেল ঢেউয়ের তোড়ে, এই আবার চড়ে বসল কোন বিশাল ঢেউয়ের মাথায়, ঠিক তখনই গর্জাতে গর্জাতে আর হিস্ হিস্ করতে করতে ঢেউগুলো তাকে টেনে নামালো নীচে। বড় পালটা খুলে পড়ল ধুঁকতে ধুঁকতে, যখন আমরা দড়িদড়া পাঁকড়াতে পাঁকড়াতে, এদিক ওদিক পিছলে পড়তে পড়তে যুঝছি ঘুর্ণি বাতাসের পাগলা রাগের সঙ্গে। আমাদের হƒৎস্পন্দন দ্রুততর হচ্ছিল আর হাত কাঁপছিল, ভয়ে নয়, উত্তেজনায় । কেননা ভাইকিংদের রক্ত আমাদের শরীরে, আর এও আমরা জানতাম যে আমাদের কাণ্ডারী ছিল তার কাজে সেরা। তার ছিল সমুদ্র-অভিজ্ঞ চোখ আর ঝড়ের কবল থেকে বেরিয়ে এসেছে সে বহুবার। গোলন্দাজ জাহাজ আর বিশাল রণতরীগুলি আমাদের পেরিয়ে যাবার সময় তাদের নাবিকেরা চিৎকার করে বাহ্বা জানাচ্ছিল আর স্যালুট করছিল আমাদের কান্ডারীকে, কারণ আমাদের মতো আর কোনো ছোট পালের নৌকা সেই ঝ’ড়ো সমুদ্রে নামতে সাহস করে নাই। অবশেষে ক্ষুধার্ত, শীতার্ত, ক্লান্ত আমরা ঘাটে ভিড়লাম।

গতবছর গ্রীষ্মকালটা আমার কেটেছে নিউ ইংল্যান্ডের বড় মনোরম একটা গ্রামে। ম্যাসাচুসেট্স্-এর রেনহ্যাম আমার জীবনের প্রায় সবটুকু আনন্দ আর বেদনা জুড়ে আছে। জে.ই.চেমবারলিন এবং তাঁর পরিবারের সাথে কিং ফিলিপস্ পন্ড-এর পাশে, রেড ফার্মে তাঁদের বাড়িতে আমি ছিলাম অনেককাল। আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় আমার এই প্রিয় বন্ধুদের আন্তরিকতা আর তাদের সাথে কাটানো সুখের দিনগুলোর কথা স্মরণ করি। তাঁদের সšতানদের মধুর সাহচর্য্য আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে। আমরা বনের মধ্যে কিংবা পুকুরে খেলতাম, দুষ্টামি করতাম। আমার বলা হুরপরি-ভূতপ্রেতের গল্পে বাচ্চাগুলোর কিচিরমিচির-আনন্দের কথা মনে করতে এখনও খুব ভালো লাগে আমার। চেমবারলিন সাহেব আমাকে প্রথম গাছ আর বুনোফুলের রহস্য বুঝতে শিখিয়েছিলেন, তারপর ভালোবাসার কানে আমি শুনেছি ওক গাছের শিরায় ব’য়ে যাওয়া রসের স্পন্দন, দেখেছি পাতা থেকে পাতায় লাফিয়ে বেড়ানো রৌদ্রের ছটা। এরকমই সব।

যেমন করে একটা গাছের শেকড় মাটির নীচের অন্ধকারে থেকেও টের পায় তার উপরের অংশের আনন্দ, রোদ আর হাওয়া আর পাখির পরশ, প্রকৃতির অনুগ্রহে আমিও তেমনই দেখেছি অনেক অদেখাকে।

আমার মনে হয় আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এমন একটা ক্ষমতা আছে যার বলে সৃষ্টির আদি থেকে যা কিছু অনুভুতি আর অভিজ্ঞতার ছাপ পড়েছে মানুষের মনে তার একটা ধারণা আমরা করতে পারি । প্রতিটা মানুষেরই মনের অতলে রয়ে গেছে সবুজ মাটি আর রিনরিনে পানির স্মৃতি । অন্ধত্ব কিংবা বধিরতা আমাদের পূর্ব পুরুষের দেয়া এই অধিকার লুঠ করে নিতে পারে না । উত্তরাধিকার সুত্রে লব্ধ এই ক্ষমতা অনেকটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মত - আত্মার ইন্দ্রিয় যা একই সাথে দেখে, শোনে অনুভব করে ।

.................................

নাহ্ এ কথা ভুললে চলবে না যে আমি গতবছরের গ্রীষ্মকালের কথাই লিখতে চেয়েছিলাম বিশেষ করে । আমার পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই মিস্ স্যালিভান আর আমি তড়িঘড়ি চলে এসেছি এই সবুজ প্রান্তে । এখানে রেনহ্যামের বিখ্যাত তিন ঝিলের একটার পাশে আমাদের কটেজ আছে ছোট । এই দীর্ঘ রৌদ্রজ্জ্বল দিনগুলির মধ্যে থেকে মনে হয় আমার কাজ, কলেজ আর শহুরে কোলাহল অনেক দূরে ফেলে এসেছি । রেনহ্যামে থেকেই বিশ্ব যুদ্ধ, মিত্র দেশ আর সামাজিক উথাল পাথালের কিছু কিছু খবর পাচ্ছিলাম। সমুদ্রের অন্য পারের নৃশংস এবং অদরকারী যুদ্ধের কথা আমরা শুনেছি আর জেনেছি পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যকার দ্বন্দের কথা । আমরা জানতাম আমাদের এই স্বর্গোদ্যানের বাইরেই মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ইতিহাস তৈরীতে লেগেছে, যে সময়ে তারা আরাম করে ছুটি কাটাতে পারতো । তবে এই নিয়ে ভাবতাম না তেমন । এসবই ক্ষণস্থায়ী । অথচ এখানে ছিল ঝিল আর বন আর ডেইজি ফুলের মাঠ এবং সুগন্ধী প্রান্তর, এরাই টিকে থাকবে চীরকাল ।

যাদের ধারণা শুধু চোখ আর কানের মাধ্যমেই মানুষের সমস্ত বোধ অনুভুত হয়, তারা অবাক হয় শুনলে যে আমার কাছে শহরের রাস্তা আর গ্রামের রাস্তা একেবারেই আলাদা মনে হয় । তারা ভুলে যায় যে আমি আমার সমস্ত শরীর দিয়েই চারপাশকে অনুভব করি । নগরের হৈ হল্লা গোলমাল আমার মুখের স্নায়ুকে বিদ্ধ করে । আর আমি অনুভব করি জনতার এক অনিঃশেষ পদদলন । সেই কর্কশ শোরগোল আমার চেতনাকে বিক্ষুব্ধ করে । শক্ত পিচের রাস্তায় ভারী যানবাহন ঘষটানোর শব্দ আর মেশিনপত্রের একঘেয়ে আওয়াজ আরও বেশী অসহনীয় মনে হয় যদি না একইসাথে চারপাশের দৃশ্যাবলী চোখে পড়ে, যে সুবিধাটুকু চক্ষুষ্মানদের কাছে সবসময়েই থাকে ।

......................

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় হাত হয়তো চোখের চাইতেও স্পষ্ট করে বুঝতে পারে কোন ভাস্কর্যের সৌন্দর্য্য । ওদের ছন্দময় রেখা আর বাঁকগুলি হয়তো চোখের চাইতেও নরম করে অনুভব করা যায় ছুঁয়ে দেখলে । সে যাই হোক না কেন, আমি জানি যে পাথরের দেবদেবীর মুর্তির ভেতর আমি গ্রীসিয় পুর্বপুরুষের হূদস্পন্দন অনুভব করি ।

.......................

আমার শিক্ষিকা সারা সকাল ধরে আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন যে একটা মগ আর তার ভেতরে রাখা দুধ, এরা আলাদা বস্তু । কিন্তু আমি বোকার মতন বারেবারে মগ লিখতে দুধ লিখছিলাম, আর দুধ লিখতে মগ । হয়তো শেষমেষ আমার এ ভুল শুধরে দেবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন তিনি । শেষ পর্যন্ত তিনি উঠে আমাকে নিয়ে গেলেন বাইরের পাম্প হাউসে । সেখানে কে যেন পানি পাম্প করছিল, যখন সেই ঠান্ডা পানির ধারা উপচে পড়ছিল, শিক্ষিকা আমাকে মগটা রাখতে বললেন নলের নীচে আর বানান করলেন
“পানি”, পানি!

এই একটা শব্দই আমার আত্মাকে নাড়া দিয়ে গেল, আর সে জেগে উঠলো, ভোরের সঞ্জীবনি আর আনন্দমুখর গানে ভরপুর হয়ে । ঐ দিনটা পর্যন্ত আমার মনটা ছিল একটা অন্ধকার কুঠুরির মত, অপেক্ষায় ছিল শব্দেরা ঢুকে বাতি জ্বালাবে...

সেইদিন অনেক শব্দ শিখেছিলাম আমি । এখন মনে নেই কি কি শব্দ, তবে এটুকু মনে আছে যে - মা, বাবা, বোন, শিক্ষিকা তার মধ্যে ছিল । আমার মত আনন্দিত আর একটা শিশুও খুঁজে পাওয়া মুশকিল হত নিশ্চয়ই, সেইরাতে যখন আমি আমার ছোট্ট বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাস্যজ্জ্বল দিনটার কথা ভাবছিলাম, জীবনে প্রথমবারের মত আমি অপেক্ষায় ছিলাম নতুন একটা দিনের ।

পরদিন সকালে জেগে উঠলাম একরাশ খুশী মনে নিয়ে । যা কিছুই ছুঁয়ে দেখছিলাম, যেন জীবন্ত । কারণ আমি সবকিছুই নতুন পাওয়া অদ্ভুত আর সুন্দর এক দৃষ্টিতে দেখছিলাম । এরপর আর কোনদিন আমার রাগ হতোনা, কারণ আমার বন্ধুরা কি বলছে আমি বুঝতে পারতাম, আর নিজেও শিখছিলাম নতুন সব কিছু ! আমার নতুন পাওয়া স্বাধীনতার প্রথম দিনগুলোতে আমি চুপচাপ থাকতেই পারতাম না । আমি ক্রমাগত বানান করতাম শব্দের আর তাই নিয়েই মেতে উঠতাম । আমি দৌঁড়াতাম, লাফাতাম, ঝাপাতাম, দোল খেতাম যে খানেই যাই না কেন । সবই যেন অঙ্কুরিত হচ্ছিল আর ফুটে উঠছিল । মধুমালতী লতা ঝুলতো মালার মত, মিষ্টি সুগন্ধ নিয়ে, আর গোলাপ যেন কখনোই এত সুন্দর ছিল না । আমার শিক্ষিকা আর আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে বাইরেই কাটাতাম, আমি উল্লসিত ছিলাম ভুলে যাওয়া আলো আর রোদ ফিরে পেয়ে....

...........

সেখানে পৌঁছানোর পরদিন আমি ভোর ভোর উঠলাম । গ্রীষ্মের এক সুন্দর সকাল, সেদিন আমার পরিচয় হবে এক গম্ভীর রহস্যময় বন্ধুর সাথে । আমি তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নিয়ে দৌড়ে নীচে নামলাম । আমার শিক্ষিকার দেখা পেলাম হলেই আর তাঁকে ধরে বসলাম তখনই সমুদ্রে নিয়ে যাবার জন্য । তিনি হাসতে হাসতে বললেন “আগে নাস্তা করতে হবে তো আমাদের!” নাস্তা শেষ হতেই তাড়াহুড়া করে বেল হলাম । পথে ছোট ছোট বালির পাহাড় পরছিল । মাঝে মাঝেই লম্বা ঘাসে আমার পা জড়িয়ে যাচ্ছিল আর আমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলাম, উষ্ণ চিকচিকে বালির উপরে । সেই সুন্দর উষ্ণ বাতাসে বিশেষ একটা সুগন্ধ ছিল, সমুদ্রের যত কাছে যাচ্ছিলাম, বাতাসটা আরো ঠান্ডা আর মনোরম হয়ে উঠছিল ।

আমরা থামলাম হঠাৎ, আর আমাকে বলে দেবার আগেই বুঝতে পারলাম আমার পায়ের কাছে সমুদ্র । আমি এও বুঝলাম যে সমুদ্র অগাধ, অবাধ, ভয়াল! হঠাৎই যেন দিনটা খানিক ম্লান লাগছিল আমার কাছে । তবে ভয় হয়তো আমি পাই নাই । কারণ কিছুক্ষণ পরেই যখন আমার সাঁতারের পোশাক পরে তীরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর ঢেউগুলি ছুটে এসে চুমু খাচ্ছিল আমার পায়ে, আমি খুশীতে চিৎকার করেছি, আর দ্বিধাহীন দাপাদাপি করেছি ঢেউএর ওপর। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, একটা পাথর আমার পায়ে ধাক্কা দেয়ায় আমি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম সামনের ঠান্ডা পানিতে ।

তখন একটা অদ্ভুত ভয়ের অনুভুতি আমাকে অবশ করে দিচ্ছিল । সমুদ্রের লোনা পানিতে আমার চোখ ভরে যাচ্ছিল, নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না আমি, আর বিশাল এক ঢেঊ আমাকে যেন ছোট্ট পাথরের নুরির মত ছুড়ে ফেলেছিল তীরে । এরপর বেশ কিছুদিন একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম আমি, অনেক বলে বলেও আমাকে পানির আশেপাশে নেয়া যেতনা । তবে আস্তে আস্তে আবার সাহস ফিরে পেয়েছিলাম । আর সেই গ্রীষ্ম ফুরাবার আগেই ভাবতে শুরু করেছিলাম সমুদ্রের ঢেউএর তোড়ে ভেসে বেড়াবার মত আনন্দের আর কিছুই না...
..........................

গাছের বেড়ে ওঠা দেখতে পাওয়া একটা চমৎকার ব্যাপার, নিজেকে মনে হয় সৃষ্টির অংশীদার । বাইরেটা যখন ঠান্ডা আর সাদা, যখন বনের পশুরা ফিরে গেছে মাটির নীচে তাদের উষ্ণ আশ্রয়ে আর তুষার ঢাকা পত্রহীন গাছের শাখায় ঝুলছে শূণ্য পাখির বাসা, আমার জানালার বাগান হাসে, ঝলমল করে, ভিতরে গ্রীষ্ম রচনা করে বাইরে যখন শীত । তুষার-ঝড়ের মাঝখানে ফুল ফুটতে দেখা কি যে বিস্ময়কর! যখন আমার জানালার কাঁচে তুষারের ঠান্ডা বরফ আঙুল করাঘাত করছিল ঠিক তখনই আমি অনুভব করেছি একটা কলিকে ‘লাজুক সবুজ ঘোমটা তুলে ফুটে উঠতে রেশম কোমল শব্দে’ । কোন গোপন ক্ষমতার কারণে, এই যাদুকরী প্রস্ফুটন? কোন রহস্যময় শক্তি একটা বীজকে, অন্ধকার মাটির ঘেরাটোপ পার করে নিয়ে চলে আলোর কাছে, পাতা, ডাল আর কলির মাধ্যমে একটা সম্পুর্ণ ফুল হয়ে উঠবার পরিপূর্ণতায়? কে স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল ওই অন্ধকার মাটির গর্ভে এত সৌন্দর্য্যরে অবস্থান আর তা ধারণ করেছিল আমাদেরই রোপন করা ছোট্ট একটা বীজ? সুন্দরী ফুল, তুমি আমাকে দৃষ্টির বাইরের গভীরতাকে দেখতে শিখিয়েছো । এখন আমি বুঝতে পারি চারপাশের এই অন্ধকার হয়তো কোন সম্ভাবনা লালন করছে যা এমনকি আমার আশার চেয়েও ভালো ।

(অনুবাদ: লুনা রুশদী)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28910135 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28910135 2009-02-12 12:49:37
উৎপল কুমার বসুর কবিতা ও আমার আলোচনা উৎপল কুমার বসু কয়েকটি সামপ্রতিক কবিতা

1.

গাছে উঠে বসে থাকি। ফল খাই। ব্যক্তিমানুষের দিকে
আটি ছুঁড়ে মারি। নিচে হাহাকার পড়ে যায়। বেশ লাগে।
মাঝে মাঝে ধ্রুপদী সংগীত গাই। ওরা শোনে। বাদ্যযন্ত্র
নিয়ে আসে। তাল দেয়। বোধ হয় ছবিও তুলেছে। সেদিন
এক গবেষক বাণী চাইল। ভাবলাম বলি : আমার জীবনই
আমার বাণী। কিন্তু এটিও নাকি বলা হয়ে গেছে। অতএব
নিজস্ব ভঙ্গিতে, কিছুটা বিকৃত ভাবে, বিড় বিড় করি-
"দেখেছি পাহাড়। দেখে জটিল হয়েছি।"



2.

চলো মর্মরসাথী, চলো ভ্রমণে, কান্তারে,
চলো বিদেশীর বেশে কেউ যেন কাউকে না চিনি-

ফলিত জ্যোতিষরূপী, তুমি গানের দেবতা, তুমি জানো
আমার লেখার খাতা অজ্ঞান অনিশ্চয়তায় ভরে গেছে,
এসো নতুন প্রজন্ম হয়ে, এই ভুলভ্রান্তিময়
লেখাগুলি পাঠ করো, অর্থ করো, পর্বতবাসীদের মতো
বিশাল প্রান্তর প্রথম দেখায় অভিভূত হও।
এ-অববাহিকা, বস্তুত জমির ঢাল, ধীরে ধীরে নদীতে নেমেছে।




3.

ভোরবেলা পার্কে বেড়াতে গিয়ে কী দেখব কে জানে, এই ভয়ে
রাত থেকে কাঁপি, ভুল পায়ে জুতো পরি, ছাতা নিতে মনেই
থাকে না, হায় সেই দুর্ঘটনার জীপ-গাড়ি থানার সামনে তেমি্নই
পড়ে আছে, মরচে ধরেছে, চাকায় বাতাস নেই, গাছ থেকে
ঝুলন্ত দড়িটা ওখানে কীভাবে এল, ফাঁস নাকি, লকআপ-য়ের
জানলা থেকে উড়ে আসে দুটো পাখি, ভাঙাচোরা এঞ্জিনে ওদের
বাসা, আপাতত ডিমহীন, নীড়ে শাবক আসে নি, আজ ঝড়ের
আঁধার মেঘে দিন শুরু, এলোমেলো বৃষ্টি নামছে।



4.

চলো নামি দুর্গের বাগানে, খেলা করি। সূর্য
বসে পাটে। বিকেলের ভ্রমণকারীরা অস্তলীন।
ঐখানে অবিনাশী পাথর রয়েছে-মূর্তি আছে
যোদ্ধাদের এবং অনেক ঝুলে-থাকা টায়ার-দোলনা।
ফিরে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে বনটিয়া শহরের দিক থেকে।
আরো নিচে বধ্যভূমি, ফাঁসিকাঠ, লোহার কয়েদ।
শুনি আর্তনাদ-হাহাকার-পাখির উল্লাস। ঐখানে আজ
আমাদের খেলা ও খেলার গান। আমাদের খেলার লড়াই।



5.

কত-না রুদ্ধ ক্রোধ বাক্সে লুকানো থাকে, বাঁধা থাকে বিছানায়।
চেকিঙে পড়েনি ধরা, বৈদু্যতিন কৌশল এড়িয়ে গিয়েছে,
বিমানবন্দর তারা অকাতরে পার হয়, এমনকি দেহরক্ষীদের
বেষ্টনী এড়িয়ে বহু হতবাক প্রেসিডেন্ট-মুখ্যমন্ত্রী-নগরপালের
সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, বলে-'অ্যাই, তোরা ভেবেছিসটা কী?'
সৈন্যরা বৃথাই বন্দুক ছোঁড়ে, কৃপাণ নিজেরা লড়াই করে।
ক্রোধ অদৃশ্যই থেকে যায়।

../../4
. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
উৎপলকুমার বসু : জন্ম. কলিকাতা 3 আগস্ট 1937; কলিকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ইন্ডিয়া
.........
কবিতা সঞ্চালন উদযোগ: কিস্তি3: 12 নভেম্বর 2004
-------------------------------------

উৎপল কুমার বসুর কবিতা

এই কবিতাগুলাতে রাজনৈতিক অসহায়তার কথা আছে মনে হয় । কবিতার নাম 'কয়েকটি সামপ্রতিক কবিতা' হওয়ার ফলে পড়ার সময় সামপ্রতিক পৃথিবীতে ঘটতে থাকা ঘটনা মনে আসে । যেমন প্রথম কবিতাতে আছে :

গাছে উঠে বসে থাকি। ফল খাই। ব্যক্তিমানুষের দিকে আঁটি ছুঁড়ে মারি। নিচে হাহাকার পড়ে যায়। বেশ লাগে।

প্রথমেই মনে আসে আমেরিকার 'ওয়ার এগেইনস্ট টেররিজম'-এর কথা । বিশেষ করে 'ব্যক্তিমানুষ' আর 'হাহাকার' শব্দগুলা যুৎসই। এই অংশে ছোট ছোট শব্দের ছোট ছোট বাক্য থাকার ফলে একটা দৃঢ়তা প্রকাশ পায়-যা ক্ষমতার সাথে সমপর্কিত। মনে হয় নিচের সমস্ত কার্যকলাপ গাছের উপরে আসীন ব্যক্তির কর্মকান্ডের ওপর নির্ভরশীল। এই জন্য সে যখন আঁটি ছুঁড়ে মারে যে কোনো এক ব্যক্তির নাম করে, নিচে ওই নিয়েই হাহাকার পরে। সে ধ্রুপদী সংগীত গাইলে অন্যদের শোনা ছাড়া উপায় নাই, তাই শোনে। কেউ কেউ আরেকটু কৃপা দৃষ্টি প্রার্থনা করার কারণে বাদ্যযন্ত্র সাথে এনে তাল দেয়। গাছের উপরে থাকলে এই সবই উপভোগের বিষয়। আবার 'গাছে উঠে বসে থাকি' কথাটার মধ্যে একটা কৌতুক আছে। বানরের কথা মনে আসে।

1 থেকে 5 নাম্বার কবিতায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরেকটা ব্যাপার দেখলাম। প্রত্যেক স্তরে স্তরে স্বর পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথম কবিতার কর্তৃত্বের স্বর দ্বিতীয়টাতে বদল হয়ে হয় আহ্বানের, অপেক্ষার। প্রথম লাইন :

চলো মর্মরসাথী, চলো ভ্রমণে, কান্তারে, চলো বিদেশীর বেশে কেউ যেন কাউকে না চিনি-

এইখানে মর্মর শব্দটার কারণে একটা বাদশাহী সময়ের কথা মনে আসে। মনে আসে মর্মর প্রাসাদ, মর্মর মূর্তি। অতীত থেকে উঠে আসা সুখী আর অভিজাত অনুভূতি। বর্তমানে যার সমৃতিটুকুই অবশিষ্ট আছে কেবল। বর্তমান-যা অনিশ্চয়তা এবং ভুলভ্রান্তিতে ভরা, যে অপেক্ষা করে নতুন প্রজন্মের জন্য। আবার দ্বিতীয় বাক্যের কারণে একটা কুয়াশা বা ধুলার আস্তরণের মতন অসপষ্টতা আসে। মনে হয় পূর্বজন্মের কোনো সমৃতি মনে আসতে আসতেও আসছে না। অথচ এই আধাআধি মনে হওয়ার কারণে অচেনা সময় ও চেনা চেনা লাগে আবার চেনাও কেমন অচেনা। সব মিলিয়ে নষ্টালজিক। কবিতার শেষ বাক্য :

এ-অববাহিকা, বস্তুত জমির ঢাল, ধীরে ধীরে নদীতে নেমেছে।

সময় এবং যে কোন অবস্থানের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা মনে করায়। এই লাইনটা পড়তে পড়তে একটা নজরুলগীতি মনে পরছিল আমার 'চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়...'

তৃতীয় কবিতার স্বর ব্যক্তিগত। পুরা কবিতায় একটাই বাক্য আর মাঝে মাঝে কমা থাকার কারণে মনে হয় একজন কেউ আস্তে আস্তে চোখ খুলতে খুলতে পারিপার্শি্বক বোঝার চেষ্টা করছে।

হায় সেই দুর্ঘটনার জীপ-গাড়ি থানার সামনে তেম্নিই পড়ে আছে, মরচে ধরেছে, চাকায় বাতাস নেই,

এই কথাগুলাতে একটা উদাসীন স্থবিরতা সপষ্ট । 'হায়' শব্দটার কারণে বোঝা যায় এই সহবিরতা কষ্টের-ব্যক্তিমানুষের কাছে ।

চতুর্থ কবিতার স্বর সমালোচকের, পর্যবেকের। যদিও প্রথম লাইনে বলা হয়েছে :

চলো নামি দুর্গের বাগানে, খেলা করি।

'চলো' শব্দে আহ্বান আছে। 'খেলা করি'-তে ক্রিয়া। তবু 'দুর্গ' শব্দটার কারণে একটা নিরাপত্তার ভাবও আসে। দুর্গের বাগানে খেলা করাকে তাই সক্রিয় অংশগ্রহণ বলে মনে হয় না। মনে হয় এই আহ্বানে গোষ্ঠিবদ্ধ পর্যবেক্ষণের কথা আছে।

আরো নিচে বধ্যভূমি, ফাঁসিকাঠ, লোহার কয়েদ। শুনি আর্তনাদ-হাহাকার-পাখির উল্লাস।

এই বাক্যগুলিতে কোনো অনুভূতির প্রকাশ নাই। শুধু যা আছে আর যা হচ্ছে তার খতিয়ান-বাইরে থেকে ।

শেষ কবিতায় প্রথম কবিতার একদম উল্টা অনুভূতি। প্রথম কবিতার স্বর কর্তৃত্বের, এইখানে গ্রহিতার। যা কিছু অন্য কেউ ঘটাচ্ছে, যে ঘটনার উপর গ্রহিতার কোনো হাতই নাই, তারই ফলশ্রুতিতে মেনে নিতে হয় বিমানবন্দরের কড়াকড়ি, সন্দিহান দৃষ্টি। আর তাই, বাক্সে এবং বিছানায় বাঁধা লুকানো রূদ্ধ ক্রোধ।

সৈন্যরা বৃথাই বন্দুক ছোঁড়ে, কৃপাণ নিজেরা লড়াই করে। ক্রোধ অদৃশ্যই থেকে যায়।

শেষের এই কথাগুলার ভেতরে কবিতার অদৃশ্য ক্রোধের আড়ালে লুকানো অসহায়তা, হতাশা এবং কষ্ট সপষ্টতা পায়।

লুনা রুশদী
অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, 23/1/5
কবিসভা]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909897 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909897 2009-02-11 23:33:57
গোয়িং ব্লাইন্ড : রিলকের কবিতা, আমার অনুবাদ অনুবাদের নীচে ইংরাজীটাও দিলাম।

---------------------------------------------------

অন্ধ প্রায়

সেই আসরে, নৈশাহারে, সেও ছিল সবাই যেমন।
ঠিক তখনই দেখেছি তার চায়ের কাপের ওঠানামায়
সবার সঙ্গে একটা ভীষণ অমিল ছিল যেন কোথায়
একবারই সে হেসেছিল, বেজেছিল ব্যথার মতন।

ক্রমে ক্রমে অবশেষে আসর ভেঙে এল যখন
উঠল সবাই আস্তেধীরে, তবুও কথা বাকি ছিল
হাসতে হাসতে বলতে বলতে কয়েক ঘরে ছড়িয়ে গেল,
তখন দেখি, সেও চলেছে অন্য সবার পেছন পেছন।

একটুখানি আত্মমগ্ন, এমন, যেন তাকে এখন
কোনো সভায় গাইতে হবে, সভার সবাই শুনবে তাকে
যেমন করে পানির গায়ে আলোর আভা ভাসতে থাকে
তারও চোখে তেমনি একটা ঝিলিমিলি খুশির ত্বরণ।

অনেকটা পথ উঠতে যেন বাকি ছিল, কিংবা বাধা
ছিল কোনো, কিংবা সামনে সিঁড়ি আছে মস্ত চড়া,
যেন একটু কষ্টেছিষ্টে পেরিয়ে এলেই গোলকধাঁধা,
হাঁটতে তাকে আর হবে না, তখন থেকে যাবে ওড়া।

- রাইনার মারিয়া রিলকে
(অনুবাদ : লুনা রুশদী) ০৪ এপ্রিল ২০০৫


Going Blind

She’d sat just like the others there at tea.
And then I’d seemed to notice that her cup
was being a little differently picked up.
She’d smiled once. It had almost hurt to see.

And when eventually they rose and talked
and slowly, and as chance led, were dispersing
through several rooms there, laughing and conversing,
I noticed her. Behind the rest she walked

Subduedly, like someone who presently
will have to sing, and with so many listening;
on those bright eyes of hers, with pleasure glistening,
played, as on pools, an outer radiancy.

She followed slowly and she needed time,
As through some long ascent were not yet by;
and yet; as through, when she had ceased to climb,
she would no longer merely walk, but fly.


- Rainer Maria Rilke.
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909668 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909668 2009-02-11 15:50:49
পঁচিশ বছর পরে (জীবনানন্দ দাশরে কবিতা, আমার অনুবাদ) পঁচিশ বছর পরে

শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে - বলিলাম: ‘একদিন এমন সময় আবার আসিও তুমি আসিবার ইচ্ছা যদি হয়! পঁচিশ বছর পরে।’ এই বলে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে; তারপর, কতবার চাঁদ আর তারা, মাঠে-মাঠে মরে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা জ্যোৎস্নায় ধানক্ষেত খুঁজে এল-গেল! - চোখ বুজে কতবার ডানে আর বাঁয়ে পড়িল ঘুমায়ে কত-কেউ! - রহিলাম জেগে আমি একা - নক্ষত্র যে বেগে ছুটিছে আকাশে, তার চেয়ে আগে চলে আসে যদিও সময়, - পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়!- তারপর - একদিন আবার হলদে তৃণ ভরে আছে মাঠে- পাতায়, শুকনো ডাঁটে ভাসিছে কুয়াশা দিকে-দিকে, - চড়–য়ের ভাঙা বাসা শিশিরে গিয়েছে ভিজে, - পথের উপর পাখির ডিমের খোলা, ঠান্ডা - কড়কড়! শসাফুল, - দু একটা নষ্ট সাদা শসা, - মাকড়ের ছেড়া জাল, - শুকনো মাকড়সা লতায়-পাতায় ফুটফুটে জ্যেৎস্নারাতে পথ চেনা যায়; দেখা যায় কয়েকটা তারা হিম আকাশের গায়, - ইঁদুর পেঁচারা ঘুরে যায় মাঠে মাঠে, ক্ষুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজো মেটে, পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!
ধুসর পান্ডুলিপি - জীবনানন্দ দাশ



After Twenty-Five Years


Amidst a vast meadow the last time when I met her
I said: ‘Come again a time like this
if one day you so wish
twenty five years later.’
This been said, I came back home.
After that, many a time, the moon and the stars,
from field to field have died, the owls and the rats
searching grains in paddy fields on a moonlit night
fluttered and crept! – shut eyed
many times left and right
have slept
several souls! – awake kept I
all alone – the stars on the sky
travel fast
faster still, time speeds by.
Yet it seems
Twenty-Five years will forever last.

Then, again – one day
the field is filled
with withered grass ,
fog sets on leaves, on dried out stems
and floats around -
upon the road – dew-drenched
the sparrow’s broken nest
lies the bird’s egg-shell, cold – lifeless!
Cucumber-blossoms, some rotten white cucumber
a torn cob-web, - dry and dead a spider
sticks to the creepers and the leaves
illuminating the night, the moon shines bright.
a few stars twinkle
upon the wintry sky – rats and owls
roam from field to field – broken grains still quench their thirst
twenty-five years have long gone past!

Translated by: Luna Rushdi
Auckland, New Zealand
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909189 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28909189 2009-02-10 14:16:29
রূপকথা
- দেখিস আবার ভান করতে করতে আসলেই খাইয়া ফেলতে পারোস।
খালাম্মা বললো।

আমরা শুক্রবারের সকাল বেলায় বসার ঘরে বসে ছিলাম। মানে আমি, আম্মা, ছোট মামা, রাজু ভাই, খালাম্মা আর দাদী। আব্বা নিজের ঘরে কাজে। রিমা আর লিমা পাড়ার মাঠে। ওদের ততদিনে অনেক বন্ধু হয়েছে । স্কুলের দিন প্রতি বিকালে খেলতে যায় আর ছুটির দিন সকাল বিকাল।

রাজু ভাই কোত্থেকে যেন কাগজের টুকরায় করে কাকের গু ধরে নিয়ে আসছে। এখন জনে জনে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ভান করছে সেই জিনিষ খাওয়ার। এইবার মোটামুটি সারা বসার ঘর রাউন্ড দেয়ার পর ছোটমামার সামনে দাঁড়ালো। ছোটমামা আর রাজু ভাই প্রায় এক বয়সী, দুইজনই কলেজে পড়ে তখন। রাজুভাই মাথা নিচু করে জিভ বের করে ঢং আরম্ভের সাথে সাথেই মামা হঠাৎ রাজুভাইয়ের কাগজ ধরা হাত ধরে উপরে তুলে দিল। সাথে সাথে কাগজের জিনিষ মুখে ট্রান্সফার। আমরা কিছুক্ষণ হতভম্ব থাকার পরে হাসতে হাসতে শেষ । বেচারা রাজু ভাই তখন প্রবল আক্রোশে মামার কর্ডের প্যান্টে জিভ মুছছে আর আ আ জাতীয় শব্দ করছে। মামা পরম আদরে তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলছে
- কেমন লাগে বাপধন? মা-বাবার কথা সাথে সাথে ফলে!

এমন সময় কলিংবেল। এক মিনিটের মধ্যেই তিনবার বাজাতে বুঝলাম নিশ্চয়ই রিমা-লিমা ফিরলো। আম্মার সাথে সাথে আমিও উঠে গেলাম। দরজার ওপাশ থেকেই কি নিয়ে যেন ওদের বেশ উত্তেজিত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল। দুইজন একইসাথে কথা বলছিল বলে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। আম্মা দরজা খুলতেই তার দুইহাতের তল দিয়ে দুজন ঢুকে দৌড় লাগালো আব্বার পড়ার ঘরে।

- অ্যাই কি হইছে? তোর আব্বার ঘরে এখন ঢুকলে কিন্তু রাগ করবে!
বলতে বলতে আম্মা ওদের পিছন পিছন গেল। আর তার পিছন পিছন আমি। প্রায় একই সাথে চারজনকে ঘরে ঢুকতে দেখে আব্বা মুখ তুলে আম্মার দিকে তাকালো। আম্মা একটা বেচারা বেচারা আধা হাসি শুরু করতে করতেই আব্বা বললো
- তুমি এইরকম কুইচা মুরগির মতন সবসময় ছানাপোনা সঙ্গে নিয়ে ঘুরঘুর কর কেন, কি সমস্যা?
- আরে ওরাই তো তোমার ঘরে আসলো মাঠ থিকা আইসাই। আমি দেখতে আসলাম কি হইছে।

আম্মার প্রম্পট পাওয়ার সাথে সাথেই দুইজন একসাথে মুখ খুললো।
আব্বা বললো - আরে আরে থামো থামো। একজন একজন করে .. হুম বল রিমা।

- আচ্ছা আব্বা একমন তুলার ওজন বেশী না একমন লোহার ওজন বেশী?
- আব্বা লোহার ওজন বেশী না? আমি রিমারে বললাম যে লোহা বেশী ভারী! কিন্তু গাধাটা দৌড়াইয়া বাসায় আসছে। এতক্ষণে ওরা বোধহয় নিয়া গেল।

- কি নিয়া গেল?
আমি বললাম।

- দিদাস ভাই একটা মাটির হাতি বানাইছে। ওইটা..

- দিদাস ভাই কে?
আব্বার প্রশ্ন।

- ওইযে আসছে না? লাল বিল্ডিংয়ের ছবি আঁকতেছে।

লাল বিল্ডিং মানে ইংরেজ আমলের একটা বাংলো বাড়ী লাল ইটের । দোতলা। পাড়ার এক কোনায়। একসময় ইউনিভার্সিটির এককেয়ারটেকার থাকতো পরিবার সহ। শুধু একটা ঘর নিয়ে। বাকী ঘরগুলি ব্যাবহার যোগ্য না। নীচতলায় বড় একটা হলঘরের ভিতর থেকে ঘোরানো সিড়ি উঠে গেছে, তার মাঝখানে মাঝখানে আবার ভাঙা। এখন আর কেউ থাকে না। দেয়াল ভেদ করে বটগাছের শিকড় নেমেছে।

- লাল বিল্ডিং আঁকতেছে কেন?
আমি বললাম।

- কি জানি। আর্টিষ্ট তো।

আম্মা বললো - তো এর সাথে লোহা আর তুলার কি সম্পর্ক?

- আমরা দোলনার কাছে গেছিলাম লুকাইতে। তখন দেখি দিদাস ভাই ছবি আঁকতেছে। আমাদের সবারই ছবিটা দেখতে ইচ্ছা হইতেছিল কিন্তু বেশী কাছে যাইতে ভয় পাইতেছিলাম। তখন উনিই ডাইকা ছবি দেখাইলো। খুবই ভালো উনি। এখনো পুরাটা আঁকে নাই, কিন্তু খুবই সুন্দর হইতেছে!

- হ্যাঁ, আমাদের সাথে অনেক কথাও বললো। ওই সময় মাটির হাতিটা দেখাইলো। উনার পাঞ্জাবীর পকেটে ছিল। একদম ছোট্ট হাতিটা, কালো রঙের। উপরে আবার সোনালী কাজ করা। সব উনি নিজে বানাইছে!

লিমা দম নেয়ার জন্য থামলে রিমা শুরু করলো

- আমাদের সবারই খুব ইচ্ছা হইলো হাতিটা নেয়ার। তখনই ধাঁধাঁটা দিল দিদাস ভাই। সবাই শুধু একবার উত্তর দিতে পারবে। যে সবচেয়ে আগে বলতে পারবে, তারে দিবে হাতি। তাড়াতাড়ি বলো আব্বা!

- উত্তর তো প্রশ্নের মধ্যেই আছে। আব্বা বললো হাসতে হাসতে।

ওদের দুইজনকেই মাথা চুলকাতে দেখে আমার দিকে তাকালো আব্বা - রিনা, তোমার তো পারার কথা। ক্লাস ফাইভে উঠছো, বড় মেয়ে তো তুমি ।

এতক্ষণ প্রশ্নটা নিয়ে আমিও দিশাহারা ছিলাম একটু। কিন্তু আব্বার কথাতেই মাথা খুলে গেল। তাই তো! - দুইটারই সমান ওজন। দুইটাই এক মন।

- বাহ্! আমার মেয়েটার অনেক বুদ্ধি!

উত্তর পাওয়ার সাথে সাথে আবার দৌড় লাগালো ওরা। একই ভাবে ওদের পিছনে আম্মা আর তার পিছনে আমি।

মামা আর রাজু ভাই বাইরে গেছে। খালাম্মা আর কল্পনা রান্নাঘরে, আম্মাও সেদিকে গেল। আমি বসার ঘর পার হয়ে সামনের বারান্দায় চলে আসলাম। দাদী বেশীর ভাগ সময়েই এই বারান্দায় বসে থাকে। সামনে ফুলার রোড আর তার ওইপাশে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুল। আজকে ছুটি, কিন্তু ছায়ানটে ক্লাস হচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তার রিক্সা, গাড়ী, মানুষের শব্দ ছাপিয়েও গানের সুর ভেসে আসছে।

- কি করেন বুবু?
আমি জিজ্ঞেস করলাম দাদীকে।
- মানু দেহি। কত মানু যাইতেয়াছে রাস্তা দিয়া।

- সব সময়েই তো যায়

- একই মানু তো আর সব সময়ে যায় না।

দিদাস নাম টা যেন কেমন। আমার মনে হলো। দাস কি তার পদবী? তাহলে হিন্দু। মানে তার নাম শুধু ‘দি’? এইটা কেমন আবার। ঞযব-দাস! হি হি। দাস মানে তো চাকর। মানে একমাত্র চাকর।
ঞযব-দাস!
কৃতদাস!
কি চাস.
কই যাস?
কাছে আস। হি হি হি।

আমারও একবার গিয়ে ছবি আঁকা দেখে আসতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু একা একা যেতে কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে।

এই পাড়ায় মেয়েদের তিনটা দল হয়ে গেছে। একদম কচিকাঁচা থেকে ক্লাস থ্রি/ফোর পর্যন্ত এক দল। ফোর/ফাইভ থেকে নাইন/টেন আরেকটা দল আর কলেজ ইউনিভার্সিটির মেয়েরা মিলে আরেকটা।

ছোটমেয়েদের দলটা বেশীর ভাগ সময় খেলে পাড়ার এক প্রান্তে করা পার্কে - মুখে মুখে যার নাম হয়েছে ‘দোলনা’। অথচ কোন দোলনা নাই সেখানে। একসময় ছিল, দুইটা। এখন স্মৃতি হিসাবে লোহার শিকলটুকু রয়ে গেছে। তবে অন্য অনেক কিছু আছে - দুইটা স্লিপার, দুইটা ঢেকি, একটা তালগাছ আর একটা বাঁদর ঝোলা। এরমধ্যেই সারাদিন ব্যস্ত থাকার অনেক মালমশলা জুটে যায়।

মেয়েদের দুই নম্বর দলটা খেলে পাড়ার মাঝখানের খেলার মাঠে। মাঠের অর্ধেকটা মেয়েদের দখলে আর অর্ধেকটা ছেলেদের। গরমকালে ইচ্ছা মতোন যা খুশী খেলা, শীতকালে কোর্ট কেটে ব্যাডমিনটন। মাঠের কোন ঘেসে ঘেসে ছোট ছোট ফুলের কেয়ারী - দোপাটি, ডালিয়া, কসমস আরো কি কি যেন।

কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেয়েদের দল খেলে না। ওরা মাঠের চারপাশ ঘিরে পাকা রা¯তায় দল বেঁধে হাঁটে আর অনেক গল্প করে, হাসে। মাঝে মাঝে কোন বাড়ীর সামনে রিকশা বা গাড়ী থামলে জায়গা করে দেয়ার জন্য সবাই একপাশে সরে দাঁড়ায়।

পাড়ায় খেলে ছেলেদের একটাই দল। বেশীর ভাগ সময় দৌড়াদৌড়ি ধরনের খেলা থাকে ওদের। মাঝে মাঝে অন্য পাড়ার ছেলেরাও আসে খেলতে। তবে কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেরা সাধারণত পাড়ায় থাকে না বেশীর ভাগ সময়। ওদেরকে শুধু যেতে-আসতে দেখি।

এই অলিখিত নিয়ম অনুসারে আমার থাকার কথা ছিল মাঝারী মেয়েদের দলে। কিন্তু কেন যেন আমার সাথে কেউ খেলতে চাইতো না। আরেকটু ছোটবেলায় যখন রিমা-লিমার তেমন বন্ধু হয় নাই পাড়ায়, আমরা তিনজন একসাথে ঘুরতাম মাঠে। ‘দোলনা’য় খেলতাম। সেইসময় লালবিল্ডিংয়ে রোমেল-সোহেলরা থাকতো। লালবিল্ডিংয়ের গাড়ী বারান্দা ছিল একটা, তার সামনে থেকেই দোলনার শুরু। সেই গাড়ী বারান্দার দুই ইটের থাম জড়িয়ে বাগান বিলাসের ঝোপ উঠে গেছে অযতেœ। জংলা ঝোপ একদম। উপরে উঠতে উঠতে বিল্ডিংয়ের খানিকটা আড়াল করে ফেলেছে। তাতে কাগজের মতন গোলাপী গোলাপী বাগান বিলাস ফুটতো, দেখতাম।

রোমেল ছিল পাগল। সে গাড়ীবারান্দার এপাশ ওপাশ পায়চারী করতো আর নিজের মনে বিড়বিড় করে কি সব বলতো। একটা হাত সবসময় উঠতো-নামতো যেন অদৃশ্য বল নিয়ে খেলছে। মাঝে মাঝে একা একাই হাসতো। সবাই ভয় পেতাম আমরা, কেউ লালবিল্ডিংয়ের খুব কাছে যেতামনা তাই। মানুষের মুখে মুখে রটে গিয়েছিল রোমেলকে জ্বিনে ধরেছে। তার থেকে আমার ধারণা হলো ‘দোলনা’র মাটির তলায় নিশ্চয়ই আলাদ্বীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ আছে। আমরা তিনজন সুযোগ পেলেই দোলনার মাটি খুঁড়তাম। আমার ইচ্ছা ছিল মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে যে মাটি পাওয়া যাবে, তা দিয়ে দোলনার পাশেই একটা ঘর বানিয়ে আমি একা একা থাকবো। আম্মা মাঝে মাঝে খুব বকাবকি করে, একা থাকলে এইসব আর সহ্য করতে হবে না।

তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই রিমা-লিমা স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল। যমজ বোন হওয়ার কারণে দুই-জন এক ক্লাসে। তারমধ্যে ওদের স্কুলের কয়েকজন ব›ধু আমাদের পাড়াতেই থাকে। তাই এখানের দলে জমে যেতেও কোন সমস্যা হয় নাই। আমি কিছুদিন ওদের দলের সাথে সাথে ঘুরেছি, কিন্তু সবাই আমাকে আপা বলে। আর এদের মধ্যে নিজেকে কেমন বেখাপ্পা লাগায় আস্তে আস্তে ছেড়ে এসেছি। রিমা-লিমা খেলাধুলাতেও খুব ভালো। যে কোন কম্পিটিশানে কিছু না কিছু একটা প্লেস তো থাকেই ওদের। আবার লিমা তো ক্লাস ওয়ানের বছরই ‘নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ’ কবিতাটা নির্ভুল আবৃত্তি করতে পারতো! তাই পাড়ায় ওদের ভক্ত অনেক। আমি আবার বাসার ভিতরে যে রকম ডাকাত সর্দারের মতোন চলতে পারি, বাসার বাইরে সেইরকমই লাজুক আর বোকা-বোকা।

এর আগের বছর শীতের সময় মাঠের মাঝখানে কাটা চারটা ব্যাডমিন্টন কোর্টের একটাতে বিপাশা, মিথিলা, কামিনী আপা আর লিপি আপা খেলছিল। আমি আমাদের তিনতলার বারান্দার গ্রীলের আড়াল থেকে খেলতে দেখতাম ওদের, রোজ। শুধু ওরা চারজনই না, নয়-দশজন মেয়ে সব মিলে। চারজন করে খেলতো, বাকীরা কোর্টের পাশে বসে গল্প করতো অথবা ‘বি কুইক’ কিংবা ‘বন্ধুগণ’ খেলতো। প্রতিদিনই ওদের দলে ঢুকতে ইচ্ছা হতো আমার, কিন্তু সেরকম সাহস করে উঠতে পারতাম না। সেদিন অসীম সাহস সঞ্চয় করে মাঠে গেলাম আম্মাকে বলে। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে নামলেও কোর্টের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চলার গতি ধীর হলো। অনেক ইতস্তত করে দাঁড়ালাম নেট বাঁধা বাঁশের পাশে। কি বলবো কি বলবো ভাবতে ভাবতে, হঠাৎ মুখ থেকে বের হয়ে গেল

- আমারে তোমরা খেলায় নিবা?

তখনও ঘরে আর বাইরে দুইরকম করে কথা বলা আয়ত্ত করতে পারিনি। নিতান্তই গাঁইয়া উচ্চারণে কথা শুনে ওরা চারজনই খেলা থামিয়ে আমার দিকে তাকালো। তারপর মিথিলা গান গাওয়ার মতন সুর করে বললো - না আ আ আ । বলতে বলতেই হাসিতে গড়িয়ে পড়লো। কোর্টের মাঝখানেই বসে পড়লো হাসতে হাসতে। ওর হাসি দেখে অন্য সবাইও হাসতে থাকলো। আমার চোখের কোন অবধি পানি চলে আসলেও মনে মনে বললাম কিছুতেই কাঁদা যাবে না। আমি জানি বারান্দায় গ্রীলের ওপাশ থেকে আম্মা ঠিকই নজর রাখছে আমার দিকে। আমার এমন ভাব করতে হবে যেন ওদের সাথে আমিও হাসছি। আমার সেই কাঁদো কাঁদো মুখে হাসির অভিনয় খুব অনবদ্য হয়েছিল কিনা কে বলবে, আমি ছাড়া দর্শকও তো ছিল না আর কোন।

এরপরে আর চেষ্টা করিনি। আম্মা অবশ্য করেছিল। একবার পাড়ার আমার বয়সী মেয়েদেরকে বিকালের নাস্তা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিল। এসেছিল সবাই। কেক, পেস্ট্রি, চানাচুর, গ্লুকোজ বিস্কুট, সাগর কলা ইত্যাদি অনেক মজার মজার খাবার খেতে খেতে আমার সাথে গল্পও করেছে টুকটাক। ওরা চলে যাওয়ার সময় আম্মা অনুরোধ করেছিল বিকাল বেলায় আমাকেও যাতে খেলতে ডাকে। এরপর কয়েকদিন আমার বাসার সামনেও - রিইইইনাাাা, রিইইইনাাাা করে ডাকতো কয়েকজন। আর ওদের কন্ঠস্বরে নিজের নাম বাতাসে মিশে যেতে শুনতে শুনতে খুশীতে ডগমগ করতে করতে আমি নীচে নেমে যেতাম খেলতে। কিন্তু এক বিকালের চানাচুর-বিস্কুট আর কতদিন পেটে থাকে। একসময় ডাক থেমে গেল। আমিও আবার আগের মতোই।
- রিনা মা, দরজাটা একটু বন্ধ কইরা দাও তো, আমি ডিপার্টমেন্টে যাই।
- দাঁড়াও আব্বা, আমিও দোলনায় যাই একটু? লালবিল্ডিংয়ের ছবি আঁকা দেইখা আসি।
- আইচ্ছা চল। স্যান্ডেল পড়।... কইগো রিনার মা, দরজাটা লাগাইয়া দেও।

আব্বার সাথে বের হয়ে গেলাম। দোতলায় দেখি বিভার আম্মা কলাওয়ালার সাথে দরদাম করছে। - এটা কি কলা নাকি? কলার বাচ্চা! এতো দাম চাও কেন?

আমাদের দেখে লজ্জা পেয়ে হেসে ফেললেন। তাঁর সাথে সালাম বিনিময় করে নীচে নেমে এলাম আমরা। আব্বার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করলাম -
- আচ্ছা আব্বা রাজাকার মানে কি?
- কই শুনলা এই শব্দ?
- সেইদিন রাজুভাই আর ছোটমামা কার কথা জানি বলতেছিল। তার বাবা নাকি রাজাকার ছিল। আমি ভাবলাম রাজা হওয়া তো ভালো কথা, কিন্তু ওরা ওই বন্ধুরে পছন্দ করে না।
- রাজাকার শব্দের আক্ষরিক অর্থ খারাপ না। আরবী থেকে এসেছে, এখন উর্দুতেও ব্যবহার করা হয়। ‘রাজা’ শব্দের অর্থ খুশী, যে খুশী করে সে রাজাকার। কিন্তু বাংলাদেশে এর অন্য অর্থ।
- কি অর্থ?
- স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যেইসব বাংলাদেশী পাকিস্তানের হয়ে কাজ করেছিল, তাদের নাম ছিল রাজাকার। তাই এইটা গালি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যেমন কাউকে যদি বেঈমান বল..
- বা মীরজাফর বল..
- হ্যাঁ, ওইরকমই রাজাকারও। শব্দ বা নামের তো কোন দোষ নাই। মীরজাফর নাম টা কি খারাপ? কোন শব্দ বা নামের সাথে ইতিহাস থাকে, তাতেই সে ভালো হয় বা খারাপ হয়।

আমরা হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম মনীষা আসছে । আমরা এক ক্লাসে পড়ি। মাঝে মাঝে একসাথে স্কুলে যাওয়া আসা করি। মনীষাও পাড়ার কারো সাথে তেমন মেশে না। যদিও ওর না মেশা টা আমার মতন না। আমাকে তো কেউ খেলতে নেয় না, তাই। ওর ভাবটা রাজকীয়, যেন সবাইকে ও বন্ধুত্বের যোগ্য মনে করে না। আমার ওর সাথে কথা বলতে অনেক ভালো লাগে। আব্বাকে বিদায় দিয়ে ওর কাছে গেলাম -

- মনীষা জানো, একজন আর্টিস্ট নাকি লাল বিল্ডিংয়ের ছবি আঁকছে। দেখতে যাবা?
- তাই নাকি? চলো।

দোলনার সামনে গিয়ে দেখি পাঞ্জাবী-পায়জামা পড়া দাড়ীওয়ালা একটা লোক তুলি হাতে ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাল বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে দাড়ি চুলকাচ্ছে। আমি সামনে যেতে একটু ইতস্তত করছিলাম, মনীষা আমার হাত ধরে বেশ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেল।

- আপনি নাকি লাল বিল্ডিংয়ের ছবি আঁকছেন? দেখতে আসলাম
- খুব খুশীর সংবাদ, দেখ!
দিদাস ভাই হাসি মুখে বলে ক্যানভাস থেকে কয়েক পা পিছিয়ে আসলেন।
- আপনি লাল বিল্ডিংয়ের ছবি আঁকতেছেন কেন?
আমি জানতে চাইলাম।
- অনেক আগের বিল্ডিং, শুনেছি ইংরেজ আমলে এক জজসাহেব থাকতেন এখানে। মাঝেমাঝে জানতে ইচ্ছা করে সেই সময় এই বিল্ডিংটা কেমন লাগতো দেখতে। তখন হয়তো বাগান ছিল, মালি ছিল, বাসার ভিতর অনেক মানুষের ভিড় ছিল, এখন কেমন একলা। একসময় হয়তো থাকবেই না, অথচ কত রকম দিনের স্ক্ষাী দালানটা...
দিদাস ভাই বিভোর হয়ে কথা বলছিলেন, হয়তো আমাদের উপ¯িথতিও ভুলে গিয়েছিলেন খানিকক্ষণের জন্য।

- কয়দিন ধরে আঁকছেন?
মনীষার প্রশ্ন।
- আজকে নিয়ে তিনদিন আসলাম এখানে। কিছু কিছু কাজ অবশ্য বিল্ডিংয়ের সামনে না দাঁড়িয়েও করেছি। ছবিটা শুরু করেছি প্রায় দুই সপ্তাহের মতন।

আমি ছবি দেখে বেশ মুগ্ধই হয়ে গেলাম। সত্যিকারের বিল্ডিংটার চেয়েও অনেক সুন্দর লাগছে ছবিতে। একদম গাঢ় লাল ইটের বাড়ির সামনে, পিছনে, চারদিকে অনেক রকমের সবুজ - ঘন, হালকা, কোনটা আবার হলুদের কাছাকাছি, কোন পাতার রং গাঢ় হতে হতে প্রায় মেরুন।

লাল বিল্ডিংয়ের একদিকে, দোলনার পাশেই একটা জংলা মত জায়গা আছে। সেখানে একটা পানির ট্যাপ আছে আর তার পাশেই ড্রেন। ট্যাপের জায়গাটা শ্যাওলা জমা, পিচ্ছিল। মাঝে মাঝে বাসার ট্যাপে পানি না থাকলে আমরা এখান থেকে পানি নিয়ে যাই, মানে পাড়ার সবাই। ওই জায়গাতে এমনিতে কারো আসতে ইচ্ছা করেনা, নোংরা, ড্রেনের গন্ধ। কিন্তু ছবিতে কি সুন্দর লাগছে। যেন রূপকথার ছোট্ট বন। আবার ছবিতে ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে হলুদ সাদা ফুল আঁকা। আর গাড়ীবারান্দার বাগান বিলাসটাকে কি রূপসী লাগছে ছবিতে! সবুজ লতাপাতার মধ্যে কি সুন্দর থোকায় থোকায় ফুটেছে ফুলগুলি।

দিদাস ভাই তুলিতে রঙ মাখতে মাখতে আমাদের সাথে কথা বলছেন আর সামনেই ঝাড়–দারের দুই মেয়ে পাতা জড়ো করছে ঝাড়– দিয়ে দিয়ে। আমাদের বয়সীই দুইজন। ময়লা প্রিন্টের জামা পরা।

- আপনি ছবি আঁকেন, আমরা দেখি।
আমি বললাম।

দিদাস ভাই ক্যানভাসের জঙ্গলের মধ্যে তুলি দিয়ে কয়েকটা আঁক দিতেই ম্যাজিকের মতোন ফুটে উঠলো ছাপা শাড়ী গাছকোমর করে পরে দুটি মেয়ে ঝাড়– দিচ্ছে। মেয়েগুলিকে দেখাচ্ছে ছদ্মবেশী রাজকন্যার মতো। ওদের শাড়ীর রঙে চারদিকটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

- আপনি ওই মেয়েগুলিকে আঁকলেন এখন, তাইনা?
- হ্যাঁ।
- কিন্তু ওরা তো শাড়ি পরে নাই, জামা পরা।
- সব কিছু যেমন আছে ঠিক তেমনি আঁকলে আর আমার ছবিটা আমার হবে কি করে? আমি তো আমি যে ভাবে দেখছি, অথবা দেখতে চাইছি, তাই আঁকছি। খানিকটা কল্পনা, খানিকটা সত্যি।
- আচ্ছা, আপনি যে একটা মাটির হাতি বানাইছিলেন, ওইটা কাকে দিলেন?
- নাদিয়া পেল, ওই সবচেয়ে আগে আমার ধাঁধাঁর উত্তর দিয়েছিল তো।

মনীষা বললো - এই ছবিটা আবার কাউকে দিয়ে দিয়েন না যেন!

- দিতে মানা করছো?
দিদাস ভাই কৌতুক মেশানো হাসি হাসলেন।

- এতো কষ্ট করে ছবি এঁকে দিয়ে দিবেন কেন? আপনি রেখে দেন।
এমনভাবে বললো মনীষা যেন দিদাস ভাইকে ছবিটা রেখে দেওয়ার পারমিশান দিল ও।


আর কেউ কিছু বলার আগেই ধুপধাপ শব্দে নাদিয়াদের বাসা থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে আসলো ওরা কয়েকজন। কে কার আগে দিদাস ভাইয়ের সামনে পৌঁছাতে পারে তার কম্পিটিশান। রিমা-লিমাও আছে সাথে।
সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে নীলা বললো -

- জানেন দিদাস ভাই, আমাদের পাড়ায় না ফাংশান হবে!! আমরা নাচবো।
- আল্লাহ তাই!
আমি উৎসাহ চাপতে না পেরে প্রশ্ন করি।
- হ্যাঁ! স্বাধীনতা দিবস আর পহেলা বৈশাখ মিলায়া একটা ফাংশান হবে!
লিমা বললো।

- দারুন মজার ব্যাপার। তোমরা কে কি করছো ফাংশানে?
- এখনো জানি না, তবে আমি আর রিমা তো টুইন, আমাদেরকে নাকি একসাথে একটা নাচ দিবে, কল্যাণী আপা শিখাবে। উনি তো সার্কেও নাচছিল, জানেন?
- বাহ!
- হ্যাঁ, আপনি আসবেন কিন্তু দিদাস ভাই, পাড়ার মাঝখানে স্টেজ বানাবে। কালকে বিকালের মিটিং হবে, তখন ঠিক করবে কে কি করবে ।
- তোমরা আমাকে তারিখ বলে দিও, আসবো।

আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর বাসায় ফিরে আসলাম আমরা। বসার ঘরে মামা, রাজু ভাই আর উপর তলার রেহানা, সোহানা আপারাও আছে। দেখলাম ফাংশানের খবর ওদের জানা হয়ে গেছে এর মধ্যেই। ওই নিয়েই কথা চলছে।

- আসেন না আমরা প্রস্তাব দেই সিরাজোদ্দৌলা যাত্রা করবো। পাড়ায় তো যাত্রা হয় নাই কখনো, নতুন ব্যাপার হবে।
রেহানা আপা বললো।
মামা বললো - ঠিক হ্যায়, আমি রাজি। কিন্তু আমাকে সিরাজোদ্দৌলা বানাতে হবে। আনোয়ার হোসেন এর মতন ‘অভাগা দেশ’ বলে ঘুমায়ে পরার আমার বহুতদিনের খায়েশ। তবে তুমি তাহলে লুতফা বেগম সাজবা আর সোহানা আলেয়া!

- ইস মামু! একজন লুতফা, একজন আলেয়া! অন্যদের কে থাকবে তাইলে?
রাজু ভাই বললো।
- কেন বাবা মীরজাফর, তোমার ভাগ্যে ঘষিটি খালাম্মা আছে তো।
- আহারে ঘষিটির মতন একটা নাম নিয়ে ভদ্রমহিলার ভিলেন হওয়া ছাড়া গতি ছিল নাকি? তার নাম যদি হইত ‘জেবুন্নেসা’ বা ‘মেহজাবিন’ আর তারপরেও স্পাইগিরি করতো তাইলে নাহয় কথা ছিল।
ঘরের সবাই হেসে উঠলো রাজু ভাইয়ের কথায়।

পরদিন বড়দের মিটিংয়ের পর ঠিক হলো ছোটদের একটা নাটক থাকবে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে, বিভার আব্বা বাংলার প্রফেসার ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, উনি নাকি এরমধ্যেই নাটক লিখেও ফেলেছেন। কলেজ ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা মিলে সিরাজোদ্দৌলা যাত্রা করবে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে থাকবে ঋতুরঙ্গ। কোরাসে গান গাইবে কয়েকজন মিলে আর ছোট মেয়েরা নাচবে। আরও থাকবে কিছু আবৃত্তি, গান এইসব।

এরপরের কয়েকদিন সারা পাড়া জুড়েই বেশ ব্যস্ত সময় কাটলো। একেকজনের বাড়ীতে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে রিহার্সেল। সিরাজোদ্দৌলার দল আমাদের বাসায়, নাচের দল কল্যাণী আপার বাসায়, কোরাস গানের দল তপু ভাবীর বাসায় এইরকম। ছোটদের নাটকের দলটার কোন স্থায়ী নিবাস নেই, যে যখন জায়গা দেয় আরকি। এরমধ্যে রিমা-লিমাকে নাচের জন্য সিলেক্ট করা হয়েছে। ওরা দুইজন হেমন্তের নাচ করবে - ‘হিমের রাতের ওই গগনের দীপগুলিরে..’। মনীষা কবিতা আবৃত্তি করবে। আমাকে যেহেতু কেউ তেমন চেনে না, তাই কোরাসের দলে যাওয়া আসা করছি ।

সেইদিন তপু ভাবীর বাসায় পৌঁছে দেখি নাটকের দলও সেখানেই, অর্থাৎ - জিয়া ভাই, নিপু ভাই, রণক, বিভা, কামিনী আপা আর শায়লা। জিয়া ভাই ক্লাস এইটে পড়তো তখন, আমার হিরো। সবসময় হাসিখুশী, ভীষণ ফরসা, চোখে চশমা। পাড়ার সবাই তাকে চেনে, সবার বাসাতেই অবাধ যাওয়া আসা। অন্য কেউ যা করলে লোকে ভাবে পাগলামী, জিয়া ভাই করলে সবাই মেনে নেয়। কারণ তাকে সব কিছুতেই মানিয়ে যায়। যেমন পাড়ায় ছেলেদের খেলার দলে বস্তির কয়েকটা ছেলেও আসে খেলতে কারণ ওরা জিয়া ভাইয়ের বন্ধু। মাঝেমাঝেই তাকে দেখা যায় কাজের বুয়া সুফিয়ার দুই বছরের ছেলেকে কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। আবার গত বছর মুকুল ভাই যখন একদম বেঁকে বসেছিল এ্সএসসি পরীক্ষা দেবে না বলে, আর বাসার কেউ তাকে বোঝাতে পারছিল না, তখনও জিয়া ভাইয়ের ডাক পরেছিল, জিয়া ভাই ঠিকই রাজী করালো তাকে শেষমেষ। আমার খুব ইচ্ছা ছিল নাটকের দলে থাকার, কিন্তু নিজের থেকে বলার সাহস হয় নাই।

নিপু ভাইকেও আমি ভালো চিনি। আমাদের বিল্ডিংয়েই থাকে। মাঝে মাঝে মাঠ থেকে ফেরার সময় আমার ছোট বাইসাইকেলটা উপরে তুলে দেয়। আর রণক ও আমার মতন ক্লাস ফাইভে পড়ে, তবে অন্য স্কুলে। ওর সাথে আমার মাঝে মাঝে কথা হয়, একদিন কাঁঠালি চাপা ফুল তুলে দিয়েছিল।

আমি ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই জিয়া ভাই বলে উঠলো - কি খবর রিনা?

আমি বললাম - মোটামুটি

- হা হা মোটামুটি! আমি মোটা আর ও মুটি হো হো হো!
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো, যেন জিয়া ভাইয়ের এই ছোট্ট একটু ঠাট্টাতেই আমি দলের একজন হয়ে গেছি।

নাটকের রিহার্সাল হচ্ছিল। সবাই বসে বসেই নিজেদের লাইন বলছে স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে। সবার ফুলের নামে নাম। ছেলেদের - গোলাপ, টগর আর রঙ্গন। মেয়েদের - কামিনী, বেলী আর শিউলি। জিয়া ভাই আমাকে ডেকে তার পাশে বসিয়েছে। তার স্ক্রিপ্টও আমার হাতে, আমি প্রম্পট করে দিচ্ছি আর ও ডায়ালগ বলছে। হঠাৎ বললো - তুমি নাটক করবা?

- আমাকে তো কেউ বলে নাই করতে।
- তাই কি হলো? আমি বললাম। অ্যাই বিভা, রিনাও নাটক করবে। চাচাকে বলবা ওর জন্যও ডায়ালগ লিখে দিতে।

আমি খুশীতে বাকবাকুম করতে করতে বাসায় ফিরলাম সেদিন। আমার জন্যও একটা চরিত্র ঠিক হলো। আমার নাম চাঁপা। দুইটা ডায়ালগ আছে সর্বমোট। আর জিয়াভাই, মানে রঙ্গন যখন যুদ্ধে আহত হয়ে ফিরে আসবে, তখন বেলী আমাকে বলবে পানি এনে দিতে, আমি পানি এনে দিব। বাসায় সারাদিন পানি আনার প্র্যাকটিস শুরু করলাম। আব্বা - আম্মাকে পানি খাওয়াতে খাওয়াতে অতিষ্ট করে ফেললাম।

এদিকে ঠিক হলো, সব দল একসাথে হয়ে রিহার্সাল করতে হবে। কিন্তু কারো বাসায় এতো জায়গা নাই। তাই বড়রা মিলে ঠিক করলো, রিহার্সালের উদ্দেশ্যে লাল বিল্ডিংটা ঝাড়ামোছা করে দেয়া হবে আর কিছু বাল্বও লাগানো হবে, সন্ধ্যায় রিহার্সালের সুবিধার জন্য।

যে কথা সেই কাজ। সেদিন সন্ধ্যায় লাল বিল্ডিয়ে রিহার্সাল। জিয়া ভাই আর নিপু ভাই আসলো আমাকে ডাকতে। আম্মা আব্বা সাধারণত সন্ধ্যার পরে আমাদেরকে একা কোথাও যেতে দেয় না, কিন্তু আজকে সানন্দে রাজী হয়ে গেল । অবশ্য ছোটমামা আর রাজুভাইও বাইরে থেকে সরাসরি লাল বিল্ডিংয়েই চলে যাবে। আমরা তিনজন হেঁটে যাওয়ার সময় মাঠের কোনার লাইটপোষ্টের আলোতে আমাদের ছায়া দেখা যাচ্ছিল, লম্বা লম্বা। নিজেকে কত বড় বড় লাগছিল যে তখন!

পৌঁছে দেখি বড় হল ঘরটার একদিকে পোস্টার আঁকছে তনু ভাই আর তাঁর আর্ট কলেজের বন্ধুরা, দিদাস ভাইও আছে সেখানে। ওরা নাকি মঞ্চও সাজাবে। আমরা অন্য পাশে নাটকের দলের মাঝখানে বসে পড়লাম। আরেক দিকে তনু ভাইয়ের বোন, তরু আপা গান করছে - ‘ আমি পথ মঞ্জরী ফুটেছি আধার রাতে’, ইস কি সুন্দর গলা, আর তার গলার স্বর সারা হলঘরে ছড়িয়ে পড়ে উঁচু সিলিং পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, আবার ঘুরতে ঘুরতে নেমে আসছে নীচে। ‘দেবতা চাহে না মোরে, গাঁথে না মালার ডোরে’, এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়ালে ঘুরে ঘুরে ফিরছে সুরটা। ঘরভর্তি মানুষের জমজমাট হট্টোগোলের মধ্যেও কেমন রিনরিন করে দুঃখের মতো মনে বেঁধে।যেন আমরা চলে গেলেও গানটা সুরটা এখানেই ঘুরে ঘুরে ভারাক্্রান্ত করবে ঘরটাকে।

মামা, রাজু ভাই, রেহানা-সোহানা আপা আর সিরাজোদ্দৌলার বাকী দলবল বসেছে অন্য পাশে। মামা আব্বার পুরানো সাদা সেরোয়ানীটাতে জরী লাগাতে লাগাতে গুনগুন করছে - মোর পিয়া হবে সেরোয়ানী...’ হঠাৎ গুনগুন থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললো - আলেয়া!

- জাঁহাপনা
- চা বানা!
সবাই হেসে উঠলো একসাথে। হাসির শব্দও একই ভাবে ঘুরতে লাগলো ঘরের ভেতর, ঠিক যেখানে যেখানে সুরটা পৌঁচেছে সেখানে সেখানে, গানের সুরের দুঃখকে আড়াল করা পর্দার মতন, তবু হাসির আড়ালেই সেই সুরটাও আছে আমরা জানি।

এমন সময় পাশের ঘরের নাচের রিহার্সাল থেকে কল্যাণী আপা বললো, এই তোমাদের কারো আম্মার কাছে ছাই রঙের শাড়ী আছে। আমি ভাবছি, বৈশাখের জন্য নীলাকে ছাই রঙের শাড়ী পরাবো। কালবৈশাখী সিম্বলাইজ করবে।

আমি বললাম - আপা আমার আম্মার আছে। ছাইরঙের, লাল পাড়, হবে?

- নিয়ে আসতে পারবা এখন? তাহলে বোঝা যেত চলবে কিনা।
- জ্বী পারবো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

রাজু ভাই বললো - রিনা তুমি একলা ভয় পাইতে পার। রুমা একটু ওর সাথে যাবা প্লিজ।

যাত্রার দলের থেকে রুমা আপা উঠে এলো।

বাইরে গাড়ীবারান্দা তে আসতে রুমা আপা বললো - একটু দাঁড়াতে পারবা? আমি বাসায় এই বাটিটা রেখে আসি।

- আচ্ছা

ওদের বাসা লালবিল্ডিংয়ের পাশেই। রুমা আপা স্যান্ডেলে শব্দ তুলে বাসার দিকে গেল।

আমি গাড়ীবারান্দার দুই থামের মাঝখানের ইটের ছোট দেয়ালের উপর উঠে বসলাম। ঘরের ভেতরের আলো আর বাইরের বাগান বিলাসের ছায়া মিলেমিশে আজব চিকরিমিকরি প্যাটার্ন হয়েছে মাটিতে, অনেকটা আমার দাদীর বানানো চালের গুড়ির পাপড়ের মতোন। যখন ঘরের ভেতরের কেউ নড়ছে, এ ঘর ওঘর করছে, তখন বাইরের ছায়াটাও দুলে দুলে উঠছে। একই সাথে, গান, হাসি, হইচইয়ের শব্দ ভেসে আসছে। সব শোনা যাচ্ছে এখান থেকে, তবু মনে হচ্ছে কত দূরে এসব ঘটে চলেছে, যেন আরেকটা জীবনের অংশ এসব।

একটা বাতাস দিল হঠাৎ, বাগান-বিলাসের লতাগুলিকে কাঁপিয়ে দিয়ে বয়ে গেল। যেন বাড়িটা গাঢ় নিঃশ্বাস নিয়ে জেগে উঠছে, আড়মোড়া ভাঙছে। যেন এতদিন গভীর ঘুমের অন্ধকারে তলিয়ে ছিল রূপকথার হারিয়ে যাওয়া রাজত্বের মতো। দেয়াল বেয়ে নেমে যাওয়া বটগাছের শিকরগুলি দোল খাচ্ছে বাতাসে। আমি ফিরে তাকিয়ে দেখলাম বাড়িটাকে ভালো করে। সিঁড়ি ঘরের ভাঙা জানালাটা গলে আলো উপচে আসছে। ভিতরের উজ্জল আলোতে, হইচই, গানে কি মানিয়েছে বাড়িটাকে। সুন্দর লাগছে খুব, দিদাস ভাইয়ের ছবিটার চেয়েও!












]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28908034 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28908034 2009-02-07 21:14:28
'দ্য স্পিট চিলড্রেন' বই থেকে অনুবাদ
কোথাও কে যেন কাঁদছে, শুনতে পাচ্ছি
জানি থামলে বিপদ হতে পারে তবু
খুব ক্লান্ত লাগছে
আমি কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবো
কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।

বিশেষ করে আজ আমার একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে
যদিও তেমন করে ভাবলে আজ আলাদা কোন ব্যস্ততা ছিল না।
অন্য যে কোন দিনের চেয়ে বেশী বা কম ক্লান্তিকর কিছু না
সাধারণের বাইরে আর কিছুই আজ ঘটে নাই।

সবকিছু সবসময় যেমন ছিল ঠিক তেমন।

সাধারণের বাইরে আর কিছুই আজ ঘটে নাই।
অন্য যে কোন দিনের চেয়ে বেশি বা কম ক্লান্তিকর কিছু না
যদিও তেমন করে ভাবলে আজ আলাদা কোন ব্যস্ততা ছিলনা।
বিশেষ করে আজ আমার একটু বেশিই ক্লান্ত লাগছে।

কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।
আমি কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবো
খুব ক্লান্ত লাগছে
জানি থামলে বিপদ হতে পারে তবু
কোথাও কে যেন কাঁদছে, শুনতে পাচ্ছি। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28906157 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28906157 2009-02-03 14:36:13
নতুন কবিতা নাম যদিও 'নতুন কবিতা' । এই লেখাটা অনেক আগের । মনে হয় ১০ বছরেরও বেশী আগের। খুব যে ভালো কিছু এরকম মনে হয় না। তবু আমি আমার সব লেখাই কোথাও জমাতে চাইছি, তাই এটাও পোস্ট করলাম।


মুহুর্তগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, লিখছি নতুন কবিতা আমার।
কোথায় যাচ্ছি, কোথায় আছি, মাঝে মাঝে খেই থাকে না।
হয়তো কোন উপগ্রহ, ঘুরছি...ঘুরছি ছন্দবিহীন।
হয়তো কোন ভাসন্ত মেঘ, ভাসছি...ভাসছি স্পন্দরহিত।

রুদ্র রৌদ্র উপচে পড়ে, আমার সারা ঘরটা জুড়েই।
সহ্য হয় না, অসহ্য সে, তবুও আমি দাঁড়িয়ে থাকি।
তাকিয়ে থাকি, তাকিয়ে থাকি, চোখ ভরে যায় চোখের জলে।
সিন্ডারেলার নতুন গল্প, লিখতে থাকি, নিজেই শুনি:
এক যে ছিল রাজকণ্যা রাজপুত্র কেউ ছিল না
জানতো যে সে একলা চলা একলা বলাই জীবন যাপন।


রৌদ্র তাকে প্রখর করে, চাঁদনী তাকে স্নিগ্ধ করে,
আকাশ তাকে অসীম করে, সাগর আনে গভীরতা।
পাহাড় তাকে সৌম্য করে, বাতাস ভরে চঞ্চলতা,
বৃষ্টি তাকে সজল করে, সবুজ জোগায় সজীবতা।

বলতে থাকি, শুনতে থাকি। চোখ ভেসে যায় চোখের জলে।
বন্ধু আমার, একলা লাগে, ভীষণ ভীষণ শূণ্য লাগে।
স্বপ্ন আমার চোখের পাতায়, স্বপ্ন রাজ্য উধাও হলো।
করুণাটুকু চাইছিনা আর,প্রেমিক তুমি কই হারালে?

লিখছি লিখছি কবিতা আমার, পাগলামীতে যাচ্ছি ভরে।
একলা একলা চলতে চলতে, স্ব্প্নগুলো প্রজাপতি।
কৃষ্ণচুড়া মন জুড়ে রয়, ভরন্ত সব দিনের কথা।
কবিতা আর হয় না লেখা, মিলিয়ে যাচ্ছি, হয়তো ধোঁয়া


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28905098 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28905098 2009-02-01 07:03:08
প্রজাপতিটা! যখন তখন উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে.. রাঙা মেঘের মতন...
যদিও অলস লাগছিল, তবুও উঠলাম। বিড়ালকে খুঁজলাম চারপাশে, সে অনেক আগেই ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। মনে হয় সজারুর গর্তের কাছে। সেই গর্তে যে তার কি আকর্ষণ কে জানে! ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।

বাসস্টপে বেশীদূর হেঁটে আসতে হয়না। এক মিনিট লাগে বাসা থেকে। আমার বাড়ীটা কয়েকটা বাড়ীর পেছনে একটাই ব্লকে। অনেক পাখি ডাকছিল আর ডেক এর উপরে সূর্যের আলো। খুব ইচ্ছা হচ্ছিল বসে বসে চা খেতে খেতে বই পড়ি, অথবা কিছুই না করি, বসে থাকি শুধু। আরো বসে থাকলে হয়তো কিছুক্ষণ পর ওই হাঁস পরিবারটা - একটা মা হাঁস আর পেছন পেছন পাঁচটা পিচ্চি হাঁস চলে এসেছে বাগানে। একটা পাম ট্রি আছে আমার বাগানটায়, হাঁসেরা মাঝেমাঝেই সেখানে বসে ঝিমায়। আমার বিড়ালটা বেশ ভদ্র ব্যবহারই করে তাদের সাথে। মানে সাধারণত তো পাখি দেখলেই খেয়ে ফেলার মতলবে থাকে, হাস গুলাকে কোনই পাত্তা দেয়না। হাঁসেরা গাছের তলায় আর সে ডেকের উপরে শান্তিময় সহাবস্থান। আমার আজ আফসোস হচ্ছিল যে এসব কিছুই দেখা হবে না!

রাস্তায় গাছের ছায়া আর রোদ মিলেমিশে বেশ চিকরিমিকরি ধরণের ছিল, দেখতে ভালো লাগে। ওই দেখতে দেখতেই পৌঁছালাম বাসস্টপে, প্রথমে একা ছিলাম, তারপরে শালিকটা। সেই ছোটবেলার থেকেই আমি একটা শালিক দেখলেই সারা দুনিয়া দুইনাম্বার শালিক খুঁজতে থাকি। সেই one for sorrow, two for joy মনে পড়ে যে! কিন্তু মনে হলো এই শালিকটাকে আমি গতকালও দেখেছি, তার আগেও। একটু গুন্ডা টাইপ পাখি। রাস্তায় লাফায়ে বেড়াচ্ছে। অন্য শালিকের চেয়ে লম্বা লাগছে দেখতে। গাড়ি টাড়ি তেমন একটা পাত্তা দিতেছে না। এর কি সঙ্গী সাথী নাই নাকি? মনে হয় শালিক রাজ্যের কবি, অথবা দার্শনিক, বা পাগল। অথবা তার সঙ্গী হয়তো অলস খুব, আরামে ঘুম দিতেছে আর এই ব্যাটাকে পাঠাইছে কাজকর্ম সামলাতে। হতেই তো পারে।

পাশে সেই আজব মহিলা এসে বসলো। ইনি থাকেন বাসস্টপের ঠিক সামনের বাসায়। বাসাটা মহা জংলা (ছিল, এখন নাই, তবে সেই বিষয়ে পরে আসছি) । এর সাথে প্রথম কথা বলার ঘটনা অদ্ভুত। সেইদিন আমি অন্য একটা বাসস্টপে অপেক্ষা করছিলাম বাসায় ফেরার সময়। মানে সাধারণত সেখানে আমার যেতে হয়না, সেইদিন বাস বদল করতে হচ্ছিল। কয়েক বছর আগের ঘটনা এটা।

তো আমি বসে বসে Da Vinci Code পড়ছি, এমন সময় মহিলার আবির্ভাব। আমার মুখের উপর থেকে বই সরিয়ে দিয়ে বলে যে
- খবরদার! এই বই পড়বা না, একদম রাবিশ!

আমি বললাম - কেন, কি সমস্যা?

- অনেক ভুল ভাল লিখছে বইয়ে, এগুলি কিছুই সত্যি না ।

- সত্যি তা তো দাবি করে নাই, এটা তো গল্প!

- যাই হোক, তুমি পড়বা না এই বই!

আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়লাম দেখি । কোথাকার কে, আমাকে এসে বই পড়তে মানা করতেসে!

- ঠিক আছে আপাতত পড়বো না, কিন্তু আপনি তাহলে আমাকে এখন বইয়ের চেয়েও ইন্টারেস্টিং কিছু শোনান!

সে তারপরে বিড়বিড় করে কি বলছিল আমার কিছু মনে নাই। তার কারণ হলো অর্ধেক কথাই বুঝি নাই। এত আস্তে কথা বলে যে ধরে ঝাঁকি দিতে ইচ্ছা হয়! তারপরেও হাসিমুখে তার দিকে তাকায়ে ছিলাম অনেকক্ষণ! তো এই হলো পরিচয় কাহিনী।

তারপরে বাসস্টপে প্রায়ই দেখা হতো, হয়।

একদিন ভোর পাঁচটার সময় আমি যাচ্ছিলাম। দেখি মহিলাও আছে। সামনেই তার বাড়ি (যদিও তখনও জানতাম না এই বাড়িই তার। ) আমি বাড়িটার দিকে অনেকক্ষন চেয়ে দেখছিলাম।

বাড়ির সামনে সাধারণ বেড়ার বদলে একটা বাঁশঝাড়। ঝাড় বললে অবশ্য বাগান বাগান একটা ভাব আসে মনে, ওইরকম কিছু না, একদমই জঙ্গল। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ভিতরের ঘাস দেখা যাচ্ছে, বিশাল গাছ সাইজের ঘাস। আল্লাহ জানে কতদিন কাটা হয় নাই। বাড়িতে টিনের চাল, রং চটা আর ঘরের কাঠের রং ও জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে। কেমন একটা পোড়ো বাড়ির মত ভাব। আমি কখনোই ওই বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখি নাই। জানলাগুলিও একদম ছোট ছোট। চারপাশের অন্ধকার মনে হচ্ছিল বাড়িটার সামনে এসে আরো গাঢ় হয়েছে। আমি হঠাৎ নিজের মনেই বললাম -

- কে জানে ওখানে কেউ থাকে কিনা!

মহিলা বললো, কি বলো? আমি থাকি ওইখানে!
আমার দিকে একটা রাগ রাগ, অবাক অবাক চোখে তাকালো।

আল্লাহর দরবারে হাজার শুকরিয়া যে এরচেয়ে বেশী কিছু বলি নাই। একটু হলেই বলতে যাচ্ছিলাম যে ওই বাড়িতে ভূত থাকা বিচিত্র কিছু না। তারপরে সেই বাড়ি, বাড়ির বাঁশ, ঘাস, এই সবকিছুর অনেক প্রশংসা করলো । তার বাগানে কত রকমের পাখি আসে সব ফিরিস্তি দিল, আমি শুনলাম।

আর আজকে আবার দেখা হলো। লক্ষ্য করলাম আর বাঁশের জঙ্গল নাই। জানতে চাইলে যা বললো সে এক বিরাট রোমহর্ষক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। আজকের লেখাটা এমনিই বড় হয়ে গেল। বাকিটুকু কাল বলবো! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28903817 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28903817 2009-01-29 08:14:26
দ্যা হোয়াইট টাইগার
কোন কোন বই শুধু নামের জন্যই পড়তে আগ্রহ হয়েছে। আর কিছু কিছু নামের কারণে পড়তে দেরী করেছি। The White Tiger দেরী করাদের দলে। আমি সাধারণত ম্যান বুকার প্রাইজের ওয়েব সাইটটা দেখি প্রায়ই। এখন তো শুরু থেকেই ধারা বিবরণী চলতে থাকে, আবার প্রতি বছর জাজরা ব্লগও লিখেন। ওইভাবে অনেক বইয়ের নামও জানা যায়। এর নামও জেনেছি আগেই অনেক । কিন্তু ভেবেছিলাম, বাঘ ভাল্লুক নিয়ে বই এখনই পড়বোনা। শেষমেষ যখন লঙ লিস্টে চলে এলো, ভাবলাম দেখি।

অনেকদিন পর আমি সারারাত ধরে এই বইটা পড়েছি। এবং শেষ হওয়ার সাথে সাথে আবার শুরু করেছি। প্রথম লাইন পড়েই মুগ্ধ হয়েছিলাম আর সেটা ধাপে ধাপে বেড়েছে - Neither you nor I speak English, but somethings can be said only in English. এই ছিল প্রথম বাক্য।

বইটাতে এক ড্রাইভার যে পরবর্তীতে একটা ট্যাক্সি কোম্পানির মালিক হয়েছে, চিঠি লিখছে চায়নার প্রিমিয়ার ওয়েন জিয়াবাও কে। সাত রাত ধরে সাতটা চিঠিই হলো বইটা। সবাইকে ছেড়ে হঠাৎ জিয়াবাও কে চিঠি কেন? কারণ খবরের কাগজে এসেছিল চৈনিক প্রিমিয়ার ভারতে আসছেন Entrepreneurship সম্পর্কে জানতে আর বইয়ের Protagonist এর মনে হয়েছে এ সম্পর্কে কেউ যদি কিছু জেনে থাকে তাহলে সে নিজে।

চিঠিগুলির মাধ্যমেই সে তার জীবনের কথা বলে। বাবা ছিল রিকসাওয়ালা, ভাই একটা চায়ের দোকানে কাজ করে। তারও এরকম একটা গন্ডীতেই থাকার কথা ছিল কিন্তু সবকিছুর পর সে একটা বিশাল ঝাড়বাতিওয়ালা অফিস ঘরে টেবিলের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে জিয়াবাওকে চিঠির লেখার কথা ভাবছে - তার এই সফর নিয়েই গল্পটা।

বেশী কিছু বলে দেবনা। তাহলে কেউ যদি পড়তে চান সেই রকম ভাবে অবাক হবেন না। কিন্তু কিছু কিছু ডায়ালগ একদম মনে গেঁথে যাওয়ার মতন, যেমন এক জায়গায় আছে -

Like eunuches discussing the kamasutra, voters discuss the elections in Laxmangarh.

এরকম আরো অনেক খুব অন্যরকম বাক্য আছে। আরেকটা খুব মনে করার চেষ্টা করছি, মনে পড়ছেনা। যাই হোক নিজেরাই পড়ে নিয়েন। বলতে পারি যে একই সাথে এমন হাসির. দুঃখের এবং রাগের বই আমি আর পড়ি নাই।

পুনশ্চ ১: White Tiger কয়েক পুরুষে একবার জন্ম নেয়। অনেকটা লেজেন্ড এর মতোন। এই জন্যই বলরাম হালুইকর (protagonist) নিজের এই নাম দিয়েছিল।

পুনশ্চ ২: অরবিন্দ আদিগার কিছু সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম। এক জায়গায় বলেছেন। এই বইটা নাকি অনেক আগে একদম অন্য একটা স্টাইলে লেখা ছিল। এবং তার মনে হয়েছিল এই পান্ডুলিপি দিয়ে কিছুই হবেনা। তাই ফেলে রাখা ছিল। অনেক বছর পরে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারত ফিরে এক দেড় মাসের মত সময় তার হাতে কোন কাজ ছিল না। ওই সময়টুকুতে বইটা আবার লিখেছেন

পুনশ্চ ৩: বুকার জেতার পরে আদিগাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল 'টাকাটা দিয়ে কি করবেন?" তাঁর জবাব ছিল 'প্রথমে একটা ব্যঙ্ক খুঁজে বের করে টাকাটা জমা দিব!'

পুনশ্চ ৪: আদিগার জন্মদিন অক্টোবারের ২৩ তারিখ, আর আমার জন্মদিন অক্টোবারের ২৪, আমি তাই মহা খুশী হইছি।

পুনশ্চ ৫: পুনশ্চ লেখার এই কায়দা আমি অনাহুত আগন্তুকের থেকে নকল করেছি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28903086 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28903086 2009-01-27 16:51:38
সেই কবেকার.. কি যেন কি যেন নাম ছিল ছেলেটার
বিশাল একটা লেখা লিখলাম। তারপরে ওস্তাদী করে লিঙ্ক যোগ করতে গিয়ে সবই শেষ। এখন আর কিছু লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে না। তবে আমার লেখাটার কিন্তু শিরোনামের সাথে একদম মিল ছিল না। যাই হোক আর লিখবোনা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28902135 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28902135 2009-01-25 12:02:00
কবিতা (আমার ধারণা): রোদ ও বৃষ্টি যখন রোদ ছিল, তখন বৃষ্টি ছিল না
তাই আমি চলে গেছি দূরে, আমি তাই
কাউকেই, কোনকিছু সাথে নেই নাই।

চলে গেছি দূরে, দূরের কাছে গেছি এসে
আর কাছ থেকে দূরে সরে গেছি যেহেতু
কাছে ছিলাম যখন, তখন দূরে ছিলাম না।

যা কিছু গেলাম রেখে, সবকিছু ঠিক ঠিক
তাই ছিল না, বৃষ্টিতে হয়েছিল অদলবদল
যা কিছু চেনা ছিল, তা কিছু অচেনা ছিল না।

কাছের দূরের থেকে, দূরের কাছে ফিরতে
ফিরতে ভাবলাম, ফেরা তো বলে না একে
শুধু অবিরত দূর থেকে দূরে সরে যাওয়া

কারণ

যখন বৃষ্টি ছিল, তখন রোদ ছিল না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28901269 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28901269 2009-01-23 04:52:38
জর্জ বুশের বাণী
'The vast majority of our imports come from outside the country.'
- George W. Bush

'If we don't succeed, we run the risk of failure.'
- George W. Bush

'One word sums up probably the responsibility of any Governor, and that one word is 'to be prepared'.'
-George W. Bush


'I have made good judgments in the past. I have made good judgments in the future.'
- George W. Bush

'The future will be better tomorrow.'
- George W. Bush

'We're going to have the best educated American people in the world.'
- George W. Bush

'I stand by all the misstatements that I've made.'
- George W Bush

'We have a firm commitment to NATO, we are a part of NATO. We have a firm commitment to Europe . We are a part of Europe '
- George W. Bush

'Public speaking is very easy.'
- George W. Bush

'A low voter turnout is an indication of fewer people going to the polls.'
- George W. Bush

'I have opinions of my own -- strong opinions -- but I don't always agree with them.'
-George Bush

'We are ready for any unforeseen event that may or may not occur.'
- George W. Bush

'For NASA, space is still a high priority.'
-George W. Bush

'Quite frankly, teachers are the only profession that teach our children.'
-George W. Bush

'It isn't pollution that's harming the environment. It's the impurities in our air and water that are doing it.'
- George W. Bush

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28900728 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28900728 2009-01-22 03:43:33
ভাবনা চিন্তা : ২২ জানুয়ারী ২০০৯
বাসস্টপে সব সময় এক মোটামুটি বুড়ি বলা যায় এমন একজনের সাথে কথা হয়। তাকে আমার বেশ ভালোই লাগে। সবসময় কাশে যদিও। চেইন স্মোকার মনে হয়। বৃটিশ মহিলা, তবে নিউজিল্যন্ডে আছে অনেকদিন। আগে একটা স্কুলে মাস্টারী করতো। রিটায়ার করার পরে এখন অকল্যান্ড সিটি কাউন্সিলে কাজ করছে। তার এক মেয়ে আছে engineer আর মেয়েরও মেয়ে আছে একটা। এইসব বাসস্টপের পরিচয়ের মজার একটা ব্যপার আছে । অনেককিছু জানা হয়, অনেক কথা হয় কিন্তু নাম জানা হয় না। সাধারণত অন্য আর যে কোন পরিস্থিতিতে কারো সাথে কথা বলতে গেলে প্রথমেই পরিচয় দেয়া হয়। এখানেই আলাদা শুধু। কথা হয় বাস আসা পর্যন্ত, তারপর কোন ভবিষ্যতে দেখা হওয়ার পরিকল্পনা ছাড়াই বিদায়। পরের দিন দেখা হবে কিনা কে জানে। হয়ও না অনেক সময়।

যেমন একটা মেয়েকে আমি এখনো অনেক খুঁজি। আমার আগের অফিসের সামনের বাস স্টপে দেখা হতো। ভারতীয়। মনে হয় আর্কিটেক্ট ছিল। সাথে সবসময় বিশাল এক ছবির ক্যানভাস নিয়ে ঘুরতো আর দেখতে কেমন উদাস উদাস। আবার স্বাস্থ্য সচেতন। অন্যদের দেখতাম, চিপস- চকোলেট খাচ্ছে দাঁড়িয়ে, এই মেয়ে খাইতো carrot sticks।

একদিন তার সাথে তুমুল আলাপ হলো বাসে বসে। হিন্দি সিনামা নিয়ে । আমি তখন swades দেখেছি। শুনেছি যে ইন্ডিয়াতে ফ্লপ। আমার তবু অনেক ভালো লাগছে। দেখলাম যে ওরও খুব প্রিয় ছবি। কথায় কথায় ওর নাম জানা হয়ে গিয়েছিল, এটাও exception বাসস্টপ নিয়মের। নাম হলো প্রগতি! আগে কোনদিন এইরকম নাম শুনিনাই। তার বাবা মা মনে হয় ইন্টারেষ্টিং আছে ভালোই। সেইদিনই প্রথম আর শেষ আলাপ। এরপর একবছরেরও বেশী সময় কোন দেখা নাই!

কি আর করা কত কাউকে না দেখেই দিন পার করে দিতেছি! এবার অফিসের কাজ করি একটু, কে জানে আজ কেমন যাবে। এ পর্যন্ত তো ভালোই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28900698 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28900698 2009-01-22 02:09:52
ভাবনা চিন্তা : ২০ জানুয়ারী ২০০৯
বছরের শুরুতো, তেমন কাজ নাই। অনেকদিন পরে বাংলা বই পড়ছি। হুমায়ৃন আহমেদ এর - হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার। প্রথম গল্প টা পড়ছি এখন। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম। হুমায়ুন আহমেদএর লেখায় সিনামার অনেকের কথা চলে আসছে। আর মনে হলো খুব স্মৃতিমুখী। অনেক আগে নোটবুকে কি কি লিখেছিলেন তার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করছেন। মানুষ কখন পেছনে তাকায়? সামনে কিছু দেখার না থাকলে? নতুন কিছু বলার নাই হয়তো, তবু কেন বলতেই হচ্ছে?

কবে যেন গার্সিয়া মার্কেজ এর একটা ইন্টারভিউ পড়ছিলাম। আর কিছু লিখবেননা বলেছেন, কারণ লেখার নাকি কিছু নাই। সেটাই তো লজিক্যাল অনেক, না? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28899768 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28899768 2009-01-20 04:07:17
প্রথম বই
আম্মা ওই তিন বছর অনেক রকম এক্সপেরিমেন্ট চালাইছে আমাদের উপর। সেই এক্সপেরিমেন্টরে গিনিপিগ হিসাবে আমরা - শিশু একাডেমি, আঁকার ক্লাস, ছায়ানটে নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস ইত্যাদি সব পার হয়ে আসছি। এখন অবশ্য মনে করলে ভাল লাগে। আম্মা কখনো খুব বড়দের মতন চিন্তা করতে পারে না, না পারাতে সুবিধাই ছিল আমাদের। সেইটাও আবার অন্য কাহিনী।

তো এই এক্সপেরিমেন্ট কার্য্যক্রমের এক পর্যায়ে আম্মার মনে হলো আমাদের লেখাপড়ার মান বাড়াইতে হবে। তাই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়া হলো যে বাসায় আমাদের তিনজনকে পড়ানোর জন্য টিচার লাগবে। আমি বোধহয় তখন ক্লাস টুতে পড়ি আমার মেঝ বোন সানিয়া উদয়নে কেজি ওয়ান আর সবচেয়ে ছো্ট ইফা, কেজি ক্লাসে।

অনেকের ইন্টারভিউ নেয়া হলো, টিকলো নিলাম আপা। উনার বান্ধবী ইরা আপাও সাথে আসছিল। ইন্টারভিউয়ের দিন নিলাম আপা শাড়ি পড়ে আসছিল, ইরা আপা জিনস আর পাঞ্জাবী। সেই সময় মেয়েরা খুব জিন্স পড়তো না, আমরা শুরু থেকেই ইরা আপাকে 'মডার্ণ আপা' ডাকা শুরু করলাম। আর এই মডার্ণ গিরির জন্য উনাকে প্রথমেই বাদ দেয়া হলো। যদিও পরে বুঝছিলাম ইরা আপা খুব ভাল মানুষ। তবে সেটাও আরেক কাহিনী।

আমার প্রথম পড়া যে বই দুইটার কথা মনে আছে তার একটা নিলাম আপার দেয়া। বইটার নাম মনে নাই। লেখকের নামও মনে নাই। কিন্তু ভিতরের সব ছবি আর গল্পটা মনে আছে। আমার জন্মদিনে বইটা দিছিলো নিলাম আপা। সানিয়া আর ইফাকেও দুইটা বই দিছিল সাথে। উনি কখনো শুধু একজনকে গিফ্ট দিতো না।

গল্পটা ছিলা একটা বিড়ালকে নিয়ে। তাও আবার সত্যিকারের বিড়াল না। একটা ছবির বিড়াল। কোন একটা ছবির প্রদর্শনীতে বিড়ালটার ছবি ছিল, খুব সুন্দর। সবাই প্রশংসা করছিল বিড়ালটার তখন তার অহংকার হলো । ভাবলো যে আমি এত সুন্দর, আমি কেন এই ফ্রেমের মধ্যে বসে আছি। এর আমার দরকার নাই, আমি বের হয়ে যাই। বিড়াল বের হয়ে গেল, আর তার অহংকারের কারনে তার কাগজ রং সব তাকে ছেড়ে গেল আস্তে আস্তে। ওই ছবিগুলিও মনে আছে আমার। কিভাবে রংগুলি উড়ে যাইতেছে আর বিড়ালটা সাদা কালো হয়ে খুব রাগ করে রংগুলির দিকে তাকাচ্ছে। আমি অনেক্ষন ধরে ছবি দেখতাম। অনেক পরে যখন ওর শরীর থেকে রেখাগুলিও ভাঙতে থাকলো তখন বিড়াল বুঝলো যে ওর রং, রেখা, কাগজ ছাড়া ও কিছুই না। এই বইটা কি কেউ পড়ছেন ছোটবেলায়? নাম বলতে পারবেন, বা লেখকের নাম? আমার বোনের মেয়েকে এইটা দেয়ার খুব ইচ্ছা আমার।

আরেকটা বইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। ওইটা আরেকদিন বলবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28714662 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28714662 2007-06-05 05:47:48
এখন খবর ০৩ জুন ২০০৭
সামোয়ার এক পরিবার থাকে সাউথ অকল্যান্ডে। বেশীর ভাগ পলিনেশিয়ান লোকই সেই এলাকায় থাকে । এই এলাকা এবং এর লোকজন নিয়ে কিছুটা খুঁতখুঁত ভাব এমনিতেই আছে মানুষের।

তার কারণও আছে। পলিনেশিয়ানদের বেশ বড় একটা অংশ কোন কাজকর্ম করেনা, ওদের জন্য নিউজিল্যান্ডে আসা সহজ এবং বেকার ভাতা পাওয়াও সহজ। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী একজন মানুষের উপর কয়জন নাবালক নির্ভরশীল তার উপর ভিতিত করে ভাতার পরিমান ঠিক করা হয়। তাই যার যত বেশী বাচ্চা,সে তত বেশী টাকা পায় সরকার থেকে। দেখা যায় যে এদের অধিকাংশেরই বিশাল পরিবার। সাধারণত মায়েরা এই পরিবারের দায়িত্বে থাকে। বাবারা মদ খায়, বাসায় থাকে, কখনো কখনো বাচ্চা-বউদের মারে, সেইগুলির কোন কোনটা খবরেও আসে। অনেক সময় বাচ্চাদেরকে স্কুলে পাঠায়না, রাস্তায় একা ছেড়ে দেয়। সাউথ অকল্যান্ডে ক্রাইম রেটও বেশী। বিশেষ করে টিনেজ গ্যাঙ অনেক বাড়ছে।

এইসব কারণে ‌‍পলিনেশিয়ান শুনলেই একধরনের জেনারালাইজেশান কাজ করে মনে। আমারও। এদেরকে কোনকিছুর ভুক্তভোগী বলে মনে হয় না, বরং যে কোন ঘটনায় এদের দোষ খুঁজতে যাওয়া অথবা অবিশ্বাস করাটাই সাধারণ প্রতিক্রিয়া।

তাই মারকিউরি এনার্জি যখন দেখলো যে বিল দেয়া হয় নাই আর ফোন করলেও কেউ ধরছে না, তখন লোক পাঠালো বাসার ইলেট্রিসিটি লাইন কাটার জন্য। এবং সেই লোক লাইন কেটে দিয়ে আসলো। এর দুই একঘন্টার মধ্যেই বাড়ির কর্ত্রী ফললে মুলিয়াগা মারা গেলেন। ফলোলে অসুস্থ ছিলেন এবং সেইদিনই হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে তাকে। তার নিশ্বাস নিতে হতো একটা যন্ত্রের মাধ্যমে, যা ইলেকট্রিসিটিতে চলে।

যখন মারকিউরির লোক বাসায় আসছে তখন বাচ্চারা বাসায় ছিল ফললে সহ, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সেই লোককে তাদের মায়ের অসুখের কথা বলার পরেও সে পাওয়ার কেটে দিছে। মারকিউরি বলতেছে যে কেউ অসুস্থতার কথা বলে নাই।

তবে খবরে যে ফুটেজ দেখালো তাতে ব্রিথিং যন্ত্রটা দেখলেই বোঝা যায় যে কেউ বেশী রকম অসুস্থ হলেই এই যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। মারকিউরির লোক বাসায় এসে যন্ত্রসহ ফলোলেকে দেখেছে, তারপরেও পাওয়ার বন্ধ করে গেছে।

ফলোলের পরিবার সামোয়া'র হলেও কখনো বেকার ভাতা বা সরকারী সাহায্য নেয় নাই। মহিলা একটা স্কুলে পড়াতেন। তাঁর স্বামী খুব কম বেতনের কাজ করেন, এবং পুরা বেতনটা বাসার ভাড়া মিটাতেই যায়। তাই ইলকেট্রিসিটি বিল পুরাটা দিতে পারেন নাই, তবে দুই ইন্সটলমেন্টে কিছু কিছু দিয়েছেন।

এখন মারকিউরি মহা সমস্যায় আছে। মিডিয়াতে অনেক হইচই হচ্ছে এই ঘটনা নিয়ে । যে কোন বড় করপোরেশান এর মানবিক দায়িত্ব থাকার কথা মিডিয়ার মতে।

আদিবের সাথে কালকে আমার এই নিয়ে অনেক তর্ক হয়ে গেল। আমার মনে হইছে, এইটা একটা স্পেশাল কেইস ছিল, এবং যখন দেখা যাচ্ছে যে এর উপরে একজন মানুষের বাঁচা মরা নির্ভর করছে তখন পাওয়ার কাটা উচিত হয় নাই। একটা বিল দিতে না পারার কারণে কারো মরে যাইতে হবে না।

আদিবের মতে মারকিউরি একটা বিশাল কোম্পানী এবং এর গ্রাহক সংখ্যাও অনেক। তাদের পক্ষে এটা ট্র্যাক রাখা সম্ভব না যে কে অসুস্থ, কার জীবন রক্ষার জন্য ইলেকট্রিসিটি লাগবে ইত্যাদি। ফলোলের পরিবারের কেউ তো তাদেরকে ফোন করে জানায় নাই যে এই সমস্যা, এবং অনেকবার ফোন করেও তাদেরকে পাওয়া যায় নাই, তখনই লোক পাঠাতে হইছে। এবং যাকে পাঠানো হয়েছে সে তার কাজ করে আসছে, এতে কোম্পানীর কি দোষ।

আপনাদের কি মনে হয়?

----------
নীচের পেজে বিস্তারিত খবর দেখা যাবে

http://tvnz.co.nz/view/page/488120/1158892]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28714070 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28714070 2007-06-03 02:42:27
স্পুকারস
বিভিন্ন ঘর আছে, বাগান আছে। একদম হন্টেড হাউসের মত। কোন ঘরে ঢুকলে হয়তো লাশ উঠে এসে ওয়েলকাম জানায়। কোথাও কেউ রক্তাক্ত চেইন স নিয়ে অপেক্ষা করে মানুষ দেখলেই কোপ মারার জন্য। ভুট্টা ক্ষেতের ওপর দিয়ে হেঁটে যাইতে হয়, আশেপাশে ভয়ঙ্কর ফিসফিস, হাসি এইসব শোনা যায়। অনেক ছায়া ঘুরঘুর করে, তার সাথে ভয়ের বাজনা আর লাইটিং তো আছেই। বাস্তব জীবনে হরর সিনামার অভিজ্ঞতা। খুব নাকি জনপ্রিয় হয়ে গেছে জায়গাটা এর মধ্যেই।

ছোটবেলায় আব্বা আম্মা ঘোস্ট ট্রেনের কথা বলেছিল লন্ডনে। আমাদের জন্মের আগের কথা। আম্মা নাকি কোন মেলায় গিয়ে ওই ট্রেনে চড়ছিল। তখন থেকেই আমার খুব ইচ্ছা ছিল এইরকম কিছু দেখার।

ভাবতেছি দেখতে যাব স্পুকারস। আবার ভাবতেছি এই জায়গা জনপ্রিয় হওয়া মানে আমার মতন অনেক মানুষই ইচ্ছা করে ভয় পেতে চায়। আমি ভয়ের সিনামাও দেখি। ভয় কি কোন আনন্দের অনুভূতি? সাধ করে এই অনুভুতির কাছে কেন যাই? আবার এইসব ক্ষেত্রে জানি যে ভয় টা বানানো, তারপরেও ভয় পাই ঠিকই। কেন?

কোন জিনিষটা টানে বেশী, ভয়ের অভিজ্ঞতাটা, নাকি এই অনুভুতি শেষ হওয়ার পরের অংশটা? এক সময় শেষ হবে আর সবকিছু আবার স্বাভাবিক হবে, কিন্তু কয়েক মুহুর্তের জন্য সেই স্বাভাবিক পরিবেশটাই কেমন অস্বচ্ছ আর স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হবে, ঠিক মতন ধাতস্থ হওয়ার আগের প্রায় বায়বীয় পর্যায়টা? কোন সাইকোলজি পড়ুয়া মানুষকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28713596 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28713596 2007-05-31 00:54:05
সকাল বেলার আলাপ
লোকটা হাঁটতে হাঁটতে একদম আমার পাশে এসে বললো। তারপরে একইসাথে হাঁটতে থাকায় তারে এড়ানো গেল না। তাই বললাম - হ্যাঁ, ভীষণ।

নিউজিল্যান্ডে এখন শীতকাল মাত্র শুরু হইতেছে এবং দিন অনেক ছো্ট। আমাকে আদিব কুইন স্ট্রিটের মাথায় নামায়ে দেয় ভোর ছটায়, সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে ১৫ মিনিট লাগে হেঁটে।

রাস্তাঘাট অন্ধকার থাকে তখনও আর অপরিস্কার। গাড়ীও কম, মানুষ প্রায় চোখেই পড়েনা শুধু রাস্তায় বেঞ্চে দুই একজন ঘুমায়, আর কিছু মাতাল বসে ঢোলাঢুলি করে, তাদের ছাড়া। এদের সবাইকে আমার ভয় লাগে। আর ইদানিং টিনএজারদের মধ্যে ফ্যাশান হইছে বড় সাইজের জ্যাকেট গায়ে দিয়ে মাথায় হুড তুলে রাখা। কারো মুখ চোখ দেখা যায় না। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বারের সামনে এদের জটলাও থাকে। অন্ধকারে সবাইরে তিনকোনা মাথাওয়ালা ভুতের মতন লাগে, তাছাড়া একা হাঁটতে থাকলে কোন দলের সামনে পড়লে এমনিতেই একটা অসস্তি তো থাকেই।

ইত্যাদি কারণে আমি মনে মনে সুরা পরতে পরতে হাঁটি। আর নিজের হার্টবিট মাঝে মাঝে নিজেও শুনতে পাই। এমন সময় এই লোকের পাল্লায় পড়লাম। এত কাছে হাঁটতেছিল যে তার আর আমার মধ্যের বাতাস চলাচল টের পাচ্ছিলাম।

- আমি শীতের চোটে গ্রীনলেন থেকে হেঁটে হেঁটে আসছি। বললো সে।

আমি অবাক হলাম, গ্রীনলেন থেকে সিটি সেন্ট্রালে গাড়ীতে আসতেই লাগে ১৫/২০ মিনিটের মতন। হেঁটে আসলে ১ ঘন্টা অন্তত লাগার কথা, বা তার চেয়ে বেশী।

- বাহ! আপনার ব্যায়াম হইল অনেক। আমার কফি না খাইলে হবে না এখন।

- চলেন রাস্তা পার হই। ওইপাশের ফুটপাথে একটা মেয়ে ঘুমায়, স্যালি, ওর সাথে আলাপ করে আসি। চিনেন ওকে?

- না, অনেককে ঘুমাতে দেখি, আমি কখনও আলাপ করি নাই।

- ওই যে গীটার আছে একটা, গান গায়।

- ও আচ্ছা, হতে পারে। এরা রাস্তায় ঘুমায় শীত লাগে না?

- তা লাগে। আমিও তো রাস্তায় ঘুমাই, গ্রীনলেনে। অবশ্য চাইলে সরকারী শেলটারেও ঘুমাতে পারি, কিন্তু রাস্তাই ভালো।

হায় হায়, এতক্ষন আমি রাস্তার পাগলের সাথে কথা বলতেছি!আরচোখে আশেপাশে দেখলাম আর কেউ আছে নাকি। রাস্তা মেরামত হচ্ছে, কিছু লোক কাজ করতেছে সেখানে, বেশী বিপদ হইলে চিতকার দেয়া যাবে। আপাতত হাসিমুখে কথা বলাই ভালো।

-ওহ্ আচ্ছা। তো বৃষ্টি আসলে কই যান?

- কোন শপিং সেন্টারে ঢুকি, অথবা ম্যাকডোনাল্ডে। যাওয়ার অনেক জায়গা আছে।

- আর বিছানাপত্র কই রাখেন আপনার?

- বিছানা আপাতত কিছু নাই। গতবছর কম্বল পাইছিলাম শীতের সময়, ওইটা সামারে রেললাইনে ফেলে দিছি, তাই তো এতদূর হাঁটলাম, আর ঘুমাতে পারছিলাম না, এমন শীত! আচ্ছা, আমি যাই এখন, ওইদিকে একটা ছেলে ঘুমায়, ওর সাথে আলাপ করে আসি।

হাফ ছাড়লাম। অবশ্য অনেক কৌতুহল ছিল, ওইগুলা মিটলো না। পরে হবে কোনদিন। একই শহরে কত পরতে পরতে থাকে মানুষ, আমি শুধু একটা লেয়ার জানি। যে যেমনে থাকে সেইটাই স্বাভাবিক মনে হয়, হয়তো।

এদের দেখলে ভয় লাগে কেন? কি ভাবতেছে জানি না তাই? নাকি সবসময় অপেক্ষাকৃত উপরের শ্রেনীর মানুষেরা নীচের শ্রেনীর লোকদের ভয় পায়? এই ভয় আবার একদম বেশী বড়লোকরা পায় না বোধহয়। কে জানে!


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28713354 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28713354 2007-05-30 01:21:45
ভাষা বিষয়ক কৌতুহল
যেমন একবার আব্বা দোকানের পার্কিং থেকে গাড়ি বের করছিল, পিছনে একটা খাম্বা মতন ছিল, ওইটা আব্বা দেখেনাই। আম্মা মহা তাড়াহুড়ায় বললো যে - তোমার গাড়ী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে! এইরকম আরো আছে - আম্মা ব্যাথা পাওয়ার বদলে 'আঘাত' পায়, কোন কিছু ছুড়ে ফেলার বদলে 'নিক্ষেপ' করে ইত্যাদি। এইগুলি নিয়া আমাদের সাথে সাথে আম্মাও হাসে।

তো এইসব ইতিহাসের কারণে, নতুন কিছু লেখা সাধুভাষায় দেখলে প্রথমে বুঝতে পারি না সিরিয়াসলি নিব নাকি রম্য রচনা হিসাবে নিবো। কিন্তু ইদানিং বাংলা পত্রিকার সাহিত্য পাতায় দেখি অনেকে সাধু ভাষায় লিখেন। সিরিয়াস লেখাই।

এই জিনিষ হঠাত শুরু হইছে কিনা জানিনা। আমার নজরে পড়লো হঠাতই। এর কারন অনুমান করতে পারেন কেউ? আমার কৌতুহল হচ্ছে এই বিষয়ে।

আমার মনে হয় সম্ভাব্য দুইটা কারণ আছে।

সাধুভাষা সম্পর্কে প্রিকন্ডিশানড মনোভাব দুর করা। এই যেমন আমার হাসি আসে এই ভাষায় নতুন লেখা দেখলে (পুরানো গুলাতে হাসি আসে না, হাসির না হইলে)।

আরেকটা কারণ হতে পারে, বাংলা ভাষা আস্তে আস্তে বদল হইতে হইতে অনেক হইছে, এখন অনেক লেখকরা আবার সাধু থেকে শুরু করতে চাইছেন। বৃতত সম্পুণ করার উদ্দেশ্যে।

আপনাদের কি ধারণা ? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28712478 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28712478 2007-05-25 15:10:59
নাম বিষয়ে ভাবনা
কেন?

একটা কারণ হতে পারে কালচার। মানে শুরুর থেকেই এইরকম হয়ে আসছে, সবাই ইউজারনেম হিসাবে অন্য কোন নামই বুঝতো, সেই জিনিষই রয়ে গেছে। এক সময় হয়তো সিসটেম ক্রিয়েটেড নাম ছাড়া অন্য ইউজারনেম নেয়া যেত না।

অথবা নাম দিয়ে মানুষ নিজের সম্পর্কে একটা ধারণা দিতে চায়। নিজের সম্পর্কে কোন একটা বিশ্বাস প্রচার করতে চায়। যেমন - মুক্তমনা, মুখফোঁড় বা অপবাক এইগুলা হলো রাজনৈতিক নাম। এইসব নামের আড়ালে লুকায়ে অনেক রকম উটপটাং কথা বলা যায়, নিজে সেইসব কথাবার্তার দায়িত্ব নেয়া ছাড়াই।

এইরকম আরো নানা ধরনের নাম আছে -কাব্যিক, রোমান্টিক, স্পিরিচুয়াল ইত্যাদি।

আর কোন কোন নাম আছে অন্যদেরকে গালি দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। নিজের পরিচয়ে গালি দিতে ভয় লাগে, তাই একটা নন এক্সিটেন্ট এনটিটির সাহায্য নেয়া। তারমানে গালিবাজ নিজেও বুঝতেছে সে যে তার কাজটা খারাপ। এই গালাগালির ফলে যেই মজা পাচ্ছে সেইটাও খারাপ। তারপরও সুযোগ থাকায় দিয়ে নিতেছে।

আমার মনে হয় নিজের পরিচয়ে কিছু বলতে না পারলে না বলাই ভালো। বেচারা কথাগুলারও তাইলে পিতৃমাতৃহীন অবস্থায় ভাসমান থাকতে হবে না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28712284 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28712284 2007-05-24 07:27:22
আমার ছুটি http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28696848 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28696848 2007-02-05 16:50:25 স্যাডেষ্ট পোয়েম -------------
স্যাডেষ্ট পোয়েম - পাওলো নেরুদা


আজ রাতে আমি লিখতে পারি সবচেয়ে কষ্টের কবিতা।

যেমন, লেখা যায়, 'রাতটা তারায় ভরা
আর তারারা, নীল, কাঁপছে দূরে।'

রাতের বাতাস ঘুরে ঘুরে গান গাইছে।

আজ রাতে আমি লিখতে পারি সবচেয়ে কষ্টের কবিতা।
তাকে আমি ভালোবাসতাম, আর মাঝেমাঝে সে ও আমাকে।

এইরকম রাতগুলোতে, তাকে আমি জড়িয়ে থাকতাম
আর কতবার চুমু খেলাম অনন্ত আকাশের নীচে!

সে আমাকে ভালোবাসতো, মাঝে মাঝে আমিও তাকে।
তার বড় বড় শান্ত চোখদুটিকে ভালো না বেসে কি পারতাম?

আজ রাতে আমি লিখতে পারি সবচেয়ে কষ্টের কবিতা।
যদি ভাবি সে আমার না, যদি অনুভব করি তাকে হারিয়েছি।

এই গাঢ় রাত্রির নিস্তব্ধতা, আরো নিরেট তাকে ছাড়া।
শিশিরের মতন হূদয়ে ঝরে পড়ে কবিতা ।

আমার ভালোবাসা তাকে বাঁধতে পারেনি, কি যায় আসে তাতে
আজ রাত তারায় ভরা আর সে আমার সাথে নেই।

এইটুকুই। অনেক দূরে। কেউ গাইছে। অনেক দূরে।
তাকে ছাড়া দিশাহারা আমার অন্তর।

যেন কাছে টানবে বলেই আমার চোখ খোঁজে তাকে।
আমার হূদয় তাকে খুঁজছে আর সে আমার সাথে নেই।

একই রাত, সেই গাছেরই আবছা অবছায়া
আমরা, আমরা যা ছিলাম, আমরা নেই আর।

তাকে আর ভালোবাসিনা আমি, সত্যি, তবু কত ভালোবাসতাম তাকে।
আমার কন্ঠ বাতাসে ভেসে ভেসে তার কানে পেঁৗছাতে চেয়েছিল।

অন্য কারো। সে অন্য কারো হবে। যেমন একসময় শুধু আমার ছিল।
তার স্বর। তার হালকা শরীর আর অনন্ত চোখ।

আমি তাকে আর ভালোবাসিনা, সত্যি, তবে হয়তো তাকে ভালোবাসি।
প্রেম কত সাময়িক আর ভুলে যাওয়া অসীম।

কারণ এরকম রাত্রিগুলোতে তাকে আমি জড়িয়ে থেকেছি।
তাকে ছাড়া দিশাহারা আমার অন্তর।

হয়তো তার কারণে এই আমার শেষ কষ্ট পাওয়া।
আর তার জন্য এটাই হয়তো আমার শেষ কবিতা।


অনুবাদ: লুনা রুশদী ( 13 জানুয়ারী 2007)
-------------------

Saddest Poem

I can write the saddest poem of all tonight.

Write, for instance: "The night is full of stars,
and the stars, blue, shiver in the distance."

The night wind whirls in the sky and sings.

I can write the saddest poem of all tonight.
I loved her, and sometimes she loved me too.

On nights like this, I held her in my arms.
I kissed her so many times under the infinite sky.

She loved me, sometimes I loved her.
How could I not have loved her large, still eyes?

I can write the saddest poem of all tonight.
To think I don't have her. To feel that I've lost her.

To hear the immense night, more immense without her.
And the poem falls to the soul as dew to grass.

What does it matter that my love couldn't keep her.
The night is full of stars and she is not with me.

That's all. Far away, someone sings. Far away.
My soul is lost without her.

As if to bring her near, my eyes search for her.
My heart searches for her and she is not with me.

The same night that whitens the same trees.
We, we who were, we are the same no longer.

I no longer love her, true, but how much I loved her.
My voice searched the wind to touch her ear.

Someone else's. She will be someone else's. As she once
belonged to my kisses.
Her voice, her light body. Her infinite eyes.

I no longer love her, true, but perhaps I love her.
Love is so short and oblivion so long.

Because on nights like this I held her in my arms,
my soul is lost without her.

Although this may be the last pain she causes me,
and this may be the last poem I write for her.

-- Pablo Neruda

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693799 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693799 2007-01-13 07:18:57
যেবার ওদের সঙ্গে যেতে হলো বেড়াতে পশ্চিমে - মানুষ বেড়ায়! (পর্ব - 2)
পথে একটা ডিটুর নিতে হলো। কোন এক্সিডেন্ট হয়েছিল বোধহয়। একজন মহিলা পুলিশ রাস্তা বলে দিল। সাধারণত পুলিশদের চেহারা কেমন একটু গম্ভীর হয়, আর মেয়ে হলে একটু রুক্ষ ধরণের। আমি এর আগে যাদের দেখেছি, সবাই কম বয়সী, 25 থেকে 30 এর মধ্যে। এই পুলিশ বেশ বয়স্কা, আর খুব হাসি খুশী, অনেক ঘরোয়া চেহারা। ভালই লাগলো।

আমরা একটা রিসর্ট সেন্টারে দুইটা ঘর ভাড়া করেছিলাম। সেন্টারটাই পার্কের মতোন। আবার ব্যাক প্যাকারও আছে। ফয়সালের আবার ব্যাকপ্যাকার দেখলেই চিত্ত চাঞ্চল্য শুরু হয়। তার মধ্যে আমরা যখন রিসেপশানে গেলাম, তখন বেশ সুন্দরী একটা চাইনিজ মেয়ে পাশেই কমন রান্নাঘরে কি যেন করছিল। ও প্রায় ওইখানেই আস্তানা গাড়তে যাচ্ছিল, আমরা কোন মতে টেনে টুনে নিয়ে আসলাম।

আদিবের নামের শেষে আবার 'মোহাম্মদ' আছে। নাম সাইন করার সময় রিসেপশানিস্ট জিজ্ঞেস করলো যে এই পদবী নিয়ে চলতে ফিরতে কেমন লাগে। আদিব বললো নিউজিল্যান্ডে কোন সমস্যায় পরে নাই। হয়তো অ্যামেরিকা হলে আলাদা ব্যাপার হতো। রিসেপশানিস্ট (রিচ) তখন তার এক বোন জামাইয়ের কথা বললো। সে নাকি সাদ্দাম হোসেনের বেশ দুর সম্পর্কের আত্মীয়। প্রায় চার পাঁচ বছর ধরে এই দেশে ছিল এবং ভাল চাকরিও করছিল। তাকে নাকি কিছুদিন আগে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

মনে হলো সাধারণ ভাবে সেরকম কিছু বোঝা না গেলেও সবসময়ই ভিতরে ভিতরে একটা কেমন গা বাঁচানো, একটা দুরত্বের ভাব থাকে অনেকেরই, আমরা মুসলিম এইটা শুনলেই। অনেকে আবার 'উদার' মনা যারা আছে, নানান কিছু জানতে চায় ধর্ম বিষয়ে। অন্তত পলিটিক্যালি কারেক্ট একটা জায়গায় থাকতে চায় যে কোন আলাপে, তারপরেও বিভিন্ন মন্তব্য, কথোপকথন ইত্যাদিতে তাদের আড়ষ্টতা/ভীতি/বিদ্বেষ ধরা পরে। এই নিয়ে আরেকদিনের ঘটনা লিখবো পরে।

যাই হোক ঘরে যাওয়ার পথে একটা ডোরা কাটা ট্যাবি টরটইসশেলের দেখা পাওয়া গেল। আদিব তো বিড়াল দেখলেই একবার কোলে নেয়ার চেষ্টা করে। এটাকেও তাই করলো, তবে এর তেমন কোলে আসার ইচ্ছা ছিল না। আর কিছুদুর যাওয়ার পরে বেশ কিছু মুরগী দেখলাম, কয়েকটা একদম সাদা ধবধব আর কয়েকটা কালো কুচকুচ। আর সাধারণ মুরগীর মতন না দেখতে। ওদের পা দেখা যাচ্ছিল না। নীচের অংশটা কেমন ভঙ্ওয়াগন গাড়ীর মতন।

(বাকীটা কালকে ইনশাল্লাহ!)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693790 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693790 2007-01-13 05:35:38
যেবার ওদের সঙ্গে যেতে হলো বেড়াতে পশ্চিমে - মানুষ বেড়ায়! (পর্ব 1)
তো মিয়াও কে রেখে যেতে হলো আমাদের পাশের বাসার বুড়ির কাছে। আদিব আমাকে ভয় দেখালো যে এই দুইদিনে বিড়াল আমাকে ভুলে যাবে, এবং ফ্রানসিসের বাসায় থাকা শুরু করবে। ভয় সাথে নিয়েই রওনা হলাম। শুধু এই ভয় না, আরো অনেক ভয় আছে রাস্তায় রাস্তায়। যদি আমরা বিচে যাই, আর সেখানে যদি কুকুর থাকে তাইলে আমার কি হবে! অথবা ফয়সাল (আদিবের বন্ধু) যে আমারে বললো 10 কিলোমিটার হাাঁটাবে পাহাড়ের উপরে, এইটা যদি জোক না হয়ে সিরিয়াস হয় তাইলে কি হবে? যদি হোটেলের বাথরুম নোংরা হয়? যদি রাস্তায় বাথরুম আসে আর ভালো কোন জায়গা না থাকে? এসসেটরা এসসেটরা।

জায়গাটার নাম নিউ প্লিমিথ (New Plymouth)সেখানে একটা পাহাড় আছে, মাউন্ট তারানাকি (Mount Taranaki)। টম ক্রুজের সিনামা 'দ্যা লাস্ট সামুরাই' এর শুট্যিং নাকি এখানে হয়েছিল। জায়গাটার সাথে জাপানের মাউন্ট ফুজিয়ামার মিল আছে সবাই বলে। আমি তো আর জাপান দেখি নাই। যাওয়ার পথে ফরগটেন হাইওয়ে নামে একটা রাস্তা ধরে গেলাম। 151 কিলোমিটার ধরে রাস্তা শুধু গোল গোল ঘুরতেছেই। এক পাহাড় থেকে নামে আবার আরেকটায় উঠে, এইরকম। পেছনের সিটের অন্যাান্য মালপত্রের সাথে সাথে আমিও একবার এইদিকে গড়ালাম আরেকবার ওইদিকে। ঝাঁকি খেতে খেতে হাড্ডিটাড্ডি নরম হয়ে গেছে। আমি মহা রাগত হয়ে আদিবকে ধমকালাম ু 'তুমি ইচ্ছা করেই আমাকে ব্যাথা দেওয়ার জন্য জোরে জোরে চালাইতেছ!' ভাগ্যিস আমাকে ওই পাহাড়ের উপরে নামায়ে রেখে চলে যায় নাই। ওর আবার এই রকম রেকর্ড আছে।

আমি তেমন প্রকৃতি প্রেমিক বোধহয় না। যেমন বন্য পশুপাখির মধ্যে আমাকে ছেড়ে দিলে আমি ভয়েই মারা যাবো। পাখি অবশ্য ভালো লাগে। আমি হাফ ভেজিটেরিয়ান হওয়াতে এই ভালো লাগাটা অনেক নিষ্পাপ। আমার এক বন্ধু আছে, সে যে কোন পাখি দেখলেই বলে যে 'ওহ! এই পাখি তো আমি খাইছি! রোস্ট খুবই মজার।' যাই হোক, সবুজের মধ্যে সবুজ হতে বা উইপোকার সাথে উইপোকা হয়ে হাঁটতে ইচ্ছা না হলেও অনেক খোলা মেলা মাঠ, পাহাড়, সমুদ্র এইসব দেখতে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে গাড়ীতে যেতে যেতে জানালা দিয়ে বাইরে একটার পরে একটা দৃশ্য বদল দেখা এবং কিছুই না ভাবা, অনেক আরামের।

(বাকি টা পরে লিখবো)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693581 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28693581 2007-01-11 06:20:44
কমলা নেইল পলিশ
লোকজন যা ছিল কাউকেই তেমন অফিস অফিস লাগছিল না দেখতে। অবশ্য এর একটা কারণ হতে পারে আমি আজকে তাড়াতাড়ি চলে আসছিলাম, দুপুর আড়াইটার দিকে। অন্য দিন এ সময়ে কারা রাস্তায় থাকে দেখি না। অনেকেরই টুরিস্ট টুরিস্ট ভাব।

লাইটের কাছে দেখলাম একজন মহিলা, বয়স মনে হয় 40 এর আশেপাশে। পোশাক এক নজর দেখলে মনে হয় হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তাই পরেই বের হয়েছে। কমলা একটা টি সার্ট, জিনস আর কালো স্যান্ডেল। কিন্তু দেখলাম পায়ের নখে কমলা নেইল পলিশ। তাই দেখে প্রথম ধারণা বদলালাম। হয়তো বেশ সময় নিয়েই পোশাক বেছেছে। কমলা তো নেল পলিশের েেত্র তেমন কমন রঙ না। সাধারণত দেখি মেরুন অথবা নেচারাল কালার। তাই কমলা টি-সার্টের সাথে ম্যাচ করেই কমলা নেল পলিশ। অবশ্য এরকমও হতে পারে নেল পলিশ টা আগেই দেয়া ছিল অন্য কোন কারণে, আর টি সার্টটাও আজকে মিলে গেছে। কে জানে। আমি যে কোনায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখান থেকে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

মনে হলো কমলা রঙটা কালোর সাথে অনেক বেশী মানায়। অথবা শ্যামলার সাথেও। মহিলার পায়ে তেমন ভালো লাগছিল না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28692316 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/28692316 2006-12-29 04:07:37
গল্প: অচেনা: শেষ পর্ব
- কিরে সন্ধ্যাবেলা শুয়ে পড়েছিস কেন?

- এমনি।

- শরীর খারাপ লাগছে?

- না। - বাহ ! সুন্দর তো বাজনাটা! কে বাজাচ্ছে?

- ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ।

- তুই রেগে আছিস, না?

- রাগ করার কি আছে? -

শোন, I have been thinking, you are right, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আজকে আমি টিকেট বুক করেছি। পরশু যাচ্ছি।

আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল। আমি অনেক্ষণ আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তাঁর চোখ পানিতে ভরে যাচ্ছিল। কান্না কি সংক্রামক? আমি তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বল্ললাম

- thank you আব্বা।

এখন খেতে চল ।সারাদিন তো কিছু খাস নাই।

আব্বা আর আমি খাওয়ার ঘরে আসলাম। সবাই অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য।
----------
রাত অনেক হয়েছে। প্রায় তিনটা বাজে। আব্বা আম্মা ঘুমিয়ে পড়েছে এর মধ্যে। আমরা তিনজন বসে কথা বলছি। এরকম অনেকদিন হয় না। রবীন্দ্রসংগীত বাজছে সাগর সেনের গলায়

'ঝরোঝরো বারি ঝরে বনো মাঝে, আমারো মনের সুর ওই বাজে...

" আমরা মৃদু গলায় কথা বলছি। রাজ্যের সংলাপ। হাসিকান্না মেশানো, ছোট ছোট মুহুর্ত, অনন্ত লুকিয়ে আছে এরই মধ্যে।

...


সকাল হচ্ছে ধীরে ধীরে। প্রায় সারা রাত অনিদ্রার পরে ইরা,ইলা এখন ঘুমে অচেতন। কিছুক্ষণ আগে আমি ওদের গায়ে লেপ তুলে দিয়ে এসেছি।

আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি বেশ একটু শীত শীত। অন্ধকার কেটে গেছে অনেকটা। কিন্তু সূর্যউঠতে এখনও বেশ দেরী। অনেকদিন এরকম সকাল হতে দেখিনা। কেমন পবিত্র চারপাশ। আমি যে সময় ঘুম থেকে জেগে উঠি, ততক্ষণে পৃথিবী এগিয়ে যায় অনেকখানি। মানুষ হারিয়ে ফেলে তার নমনীয়তা আর কোমলতা। যান্ত্রিকতার মুখোশ আঁটা হয়ে যায় ততক্ষণে। আর ওদের মুখ দেখা হয় না।

আজ অন্যরকম। আজ আমি জানবো পৃথিবী অনেক সুন্দর। আকাশে মেঘ জমেছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণ পর । নতুন সূর্যের লাল আর মেঘের ছাইরঙ মিলেমিশে আকাশটাকে অদ্ভুত লাগছে। কিছুক্ষণ আগে আমি সাদা শাড়ী পড়েছি। চুল ছড়িয়ে দিয়েছি পিঠময়। আজ আমি বৃষ্টিতে ভিজবো।

আমি ঘাসের ওপর নেমে এলাম। সকালটা খুব সুন্দর মনে হলো। পাতার ওপর শিশির বিন্দুর স্পর্শ পেতে পেতে মনে হলো বহুদিন পর পবিত্রতা আমাকে ছুঁয়ে গেলো। আমি নতুন হলাম । বাতাসে একটা পরিচিত সুগন্ধ, যা মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা কিছুস্মৃতি, প্রায় পূর্বজন্মের মত। এরকম সকালে অনেক কিছুই ক্ষমা করা যায় হয়তো।

আব্বা তুমি আমাকে কখনো বুঝতে চেষ্টা করোনি আমার মতো করে । কখনোই বলোনি শুধু আমার জন্যই আমি চাইবার মতো দামী। সায়ন তুমি যে কোথায়, তাও এখন আর জানি না। অনেক কথা জমা ছিল তোমাকে বলার, কথাগুলি বলা হবে না। কতদির বৃষ্টিতে একা একা ভিজতে ভিজতে ভেবেছি একদিন তুমিও আমার সাথে থাকবে, অথবা ভীড়ের ভেতর একা একা হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়েছে একদির তোমার হাত ধরে হাঁটবো। আমি জানি এরকম কিছুই হবে না। ভীড়ের ভেতর সবসময় একাই থাকবো। যেমন ছিলাম। তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম।

বৃষ্টি নামতেই নেমে পড়লাম রাস্তায়। আজ আমি নিরুদ্দেশে যাবো। আমাকে যে খুব সুন্দর লাগছিল, তা বুঝতে পারছিলাম পথচারীদের দৃষ্টিতে। যে দৃষ্টি সুন্দরকে সুন্দরের মত করে দেখে। যে দৃষ্টি পবিত্র কে আরো পবিত্র করে। আমার খুব গর্ব হচ্ছিল।

স্টেশানে বাস এসে থামতেই উঠে পড়লাম। ড্রাইভার হেসে জানতে চাইলো - তুমি কোথায় যাবে সিনোরিতা?

..বোধহয় স্প্যানিশ শব্দ, আমার জানা নেই। তবে এই মুহুর্তে শব্দটা শুনে নিজেকে খুব রূপসী আর দামী মনে হচ্ছিল।

আমি হেসে জবাব দিলাম, আমি জানি না, আজ আমি সারাদিন তোমার সাথে ঘুরবো।

ও কি বুঝলো কে জানে। হেসে জায়গা দেখিয়ে দিল।

সকালের গাড়ি, ভীড় তেমন নেই। আমি জানালার পাশে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে। আর আমি গাড়ির মানুষগুলিকে অবাক করে দিয়ে গেয়ে উঠলাম

- 'আমি কান পেতে রই, আমার আপন হূদয় গহন দ্্বারে, বারে বারে...'
-----------
এপ্রিল 1994
প্রকাশ: পরবাস ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/18689 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/18689 2006-09-09 22:28:49
গল্প: অচেনা: 7ম পর্ব
বাইরের পৃথিবীতে রাত নেমে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। আব্বা, আম্মার সাথে পরামর্শ করছিল দেশে যাওয়ার ব্যাপার নিয়ে। দেশে যাবে কি যাবে না এই। আম্মা মনে করছে দেশে গিয়ে শুধু শুধু বাড়তি ঝামেলা, আর আব্বারও শরীর ভালো নেই, তার চেয়ে এখানে থেকেই যা করা যায় করলে ভালো হয়। আমার খুব অবাক লাগছিল ওদের কথা শুনে।

- তোমার ভাই মারা গেছে আর তুমি যাবে না?

- কি করবো মা। আমার অফিস থেকে ছুটি যে দেবে না তা না, কিন্তু এটা খুব ব্যস্তসময়। এখন ছুটিতে গেলে একটা ইরেসপনসিবল ব্যাপার হবে।..আর তা ছাড়া ওরা আমার আশা করছে খরচ টরচ সা মলানোর জন্য। এখান থেকে টাকা পাঠিয়ে দিলে বেশী ভালো হবে।

- একজন মানুষ, তোমার ভালোবাসার মানুষ। যে ছিল, আজ নেই। তোমার মা অসুস্থ। এদের সবার থেকে তোমার কাছে দায়িত্ব, টাকা এইগুলি বড় হলো?

আম্মা বললো - ইতি, চুপ কর! যা বুঝিস না তা নিয়ে কথা বলবি না। এখন তোর আব্বা যেতে পারবে না, তার শরীরে কুলালে তো যাবে। সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পরে থাকলে তাকে কে দেখবে?

- আম্মা তুমি যদি এত দূরে অসুস্থ হয়ে পরে থাকতে, আমি তখন আমার নিজের অসুস্থতা বা চাকরীর কথা ভাবতাম না। আমি যেভাবেই হোক তোমার কাছে যেতাম...'

...আমি বুঝতে পারছিলাম আমার গলা চড়ে যাচ্ছে। আর নিজেকে সামলাতেও পারছিলাম না। ভীষণ রাগ হচ্ছিল, আব্বার উপর, আম্মার উপরও।

আব্বা বললো - যাক। এত কথার দরকার নাই। তোমার সময় আসলে তখন দেখা যাবে তুমি কতটুকু কর। মুখে বড় বড় বুলি সবাই ছাড়তে পারে। তোমার ভেতর প্র্যাকটিকালিটির খুব অভাব। আমার কাছে তো রাজভান্ডার নাই। দেশে না গেলে টিকেটের টাকাটাও পাঠানো যাবে, আর আর্থিক সাহায্যেরই সবার প্রয়োজন এখন...

- আমি শুধু মুখেই বুলি ছাড়ছি না। I mean what I am saying। তোমরা মুখেই শুধু ভালোবাসার কথা বল, অথচ নিজেদের ছাড়া কিছুই ভাবো না। তোমার মা, যার জীবনের একমাত্র অবলম্বন তুমি এবং সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেনও তোমাকে। you are a part of her... আর she's in her death bed now আর তুমি লাভ ক্ষতির হিসাব করে তাকে দেখতে যাবে? it's so damn funny abba! I feel like laughing my head off!

...আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছিল। গলা কেঁপে যাচ্ছিল । আব্বার চোখে রাগের ছায়া গাঢ় হচ্ছিল। আমার দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে আব্বা বললো -

- তুই আমার সামনে থেকে যা। আমাকে ভালোবাসা শেখাতে আসিস না। I have lived longer than yourself, তোর চেয়ে অনেক বেশী জানি আমি। তুই তোর নিজের জীবন নিয়ে ভাব, that would be more than enough!।

- তুমি আমার চেয়ে বেশী দেখেছ হয়তো। কিন্তু তারমানে এই না যে সব ব্যাপারেই তুমি কারেক্ট। কোন কোন ব্যাপারে আমিও ঠিক হতে পারি। আর মানুষ মানসিক ভাবে তখনই ম্যাচিওরড হয় যখন সে এই সত্যটা বুঝতে পারে।

- আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নসিহত দিতে হবে না। তুই যা।

ভীষণ কান্না আসছিল আমার। গলার কাঁপুনিও সামলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। শুধু বললাম - I never expected this of you Abba

আমি আমার ঘরে চলে এলাম। প্রচন্ড একটা কষ্ট জমাট বেঁধে ছিল মনে। কষ্টগুলো গলার কাছে এসে আটকে আছে। আমার আব্বা! তাঁর ভেতর কেন এসব ক্ষুদ্রতা থাকবে? আত্মকেন্দ্রিকতার ছোটর থেকে ছোট ছায়াও কেন তাকে স্পর্শ করবে। আমার আব্বা তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ! এমন কেন হয় তাহলে? আব্বা তোমাকে আমি কত ভালোবাসি, তুমি জানো না? তবু কেন এমন কর? কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

...

ঘুম ভাঙলো চোখের ওপর রোদের আঁচ পড়ায়। বেলা হয়ে গেছে অনেক। বাসায় কেউ নেই মনে হয়। বাড়ীটা লাগছে নির্জনপুরীর মত। এটাই বোধহয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় - রেীদ্রময়ী রাতি। মনের ভেতর তখন থেকে একটা গজল ঘুরপাক খাচ্ছে।
..শাব রোজ মাওসাম বাদালতে রাহে
নায়ে গাম পুরানোমে ঢালতে রাহে
মুহাব্বাত, ওয়াফা, দোস্তী, ইনকিলাব
খিলোনে বানায়ে ব্যাহেলতে রাহে..'

চারপাশে অন্য ধরনের বিষন্নতার উপস্থিতি টের পাই। কি যেন হারানোর অনুভুতি আমাকে টেনে নিয়ে যায় তার গভীরে। সময় ঝরে যায়। আমি একাকীত্বকে সঙ্গী করে, শূণ্যতার সাথে চালাই কথোপকথন। কি এক আবিষ্টতা ঘিরে থাকে আমাকে।

(চলবে)

প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/16205 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/16205 2006-08-11 17:41:07
গল্প: অচেনা: 6ষ্ঠ পর্ব
সোনামনি ডাকটা তাকে আমি শিখিয়েছি আর আমাকে শিখিয়েছিল সায়ন।

মামা বললো - আপা দুলাভাই কই রে?

- বাজারে গেছে বললো ওরা..

- তুই কখন আসলি?

- এইতো একটু আগে

আমি অলকাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

- অলিবাবু। তুমি কি আমায় ভালোবাসো?

- হুম ! ভালোবাথি!

- এই, ওই গান টা গাও না

- কোনতা?

- পাগলারে ছাড়িয়া পাগলি যায় চলিয়া..

- পাগলাল মন ঘলে তাকে না...তাকে না.

এই গানটা সায়ন গাইতো মজা করার জন্য। কোন গানেরই সুর হতো না ওর। কিন্তু এই দুই লাইন ওর মতো করে কেউ গাইতে পারে না, কেমন যেন ভেঙে ভেঙে গায়, খুব মজা লাগে শুনতে। ক্যাসেট প্লেয়ারে চন্দন দাশের গান বাজছে -

উয়োহ না হোগা তো কিয়া কামি হোগী
বাস আধুরী সি জিন্দেগী হোগী...

আব্বা আম্মা চলে এসেছে এর মধ্যে । সঙ্গে রাজ্যের সব বাজার। আব্বা কোন জিনিষই কম কিনতে পারে না।

- কিরে মা! কেমন আছিস?

- ভালো। তুমি কেমন আছ?

- আছি রে মা। এই গরীবের খোঁজ কে রাখে বল।

এটা আব্বার প্রতিদিনের ডায়ালগ।

আমি বললাম - কেন গরীবের খোঁজ গরীবের বউ রাখে। আম্মা প্রতিদিন আমার হলে ফোন করে তুমি যখন অফিসে থাক, আর বলে যে ইতি তোর আব্বা তো এখনও এল না, কি যে করি! আম্মা তোমাকে মহা ভালোবাসে তুমি খোঁজ তো রাখোনা কিছু।

আব্বা হেসে ফেলে আমার মাথার চুল এলো মেলো করে দিতে দিতে বললো - থাম তুই, তুই একটা মহা ঘটক। আমি আর তোর কথা বিশ্বাস করছি না।

মাঝখান থেকে আম্মা বললো - সত্যি কথা বিশ্বাস করবে কেন?

- সত্যি নাকি? না মেয়ের সামনে একটু দেখিয়ে নিচ্ছ?

- দেখানোর জন্যও তো কিছু থাকতে হয়। তুমি তো দেখাতেও পার না।

আমরা সবাই বসার ঘরে বসে গল্প করছিলাম। মামা সবসময়েই মজার মজার কথা বলে। ওদের ছোটবেলার এক একজনের কথা বলে বলে অভিনয় করে দেখাচ্ছিল আর আমরা সবাই হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফেলছিলাম। ভীষণ পরিপূর্ন লাগছিল ঘরটাকে।

হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। আমি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে অপারেটার বললো বাংলাদেশের ফোন, লাইনে থাকতে। আমি আব্বার হাতে ফোন দিলাম।

ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আব্বা খুব গম্ভীর হয়ে গেল। কেমন একটা ছায়া নেমে এল তার চোখে। বুঝতে পারছিলাম খারাপ কোন খবর। ফোন রেখে দিয়ে আব্বা প্রায় মৃত মানুষের গলায় বললো - ভাই মারা গেছে, মা খুব অসুস্থ।'

ঘরের ভেতর একটা অসস্তিকর নীরবতা নেমে এল। আব্বার কষ্টটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি কিন্তু কেউ অনুভব করতে পারছি না তেমন করে।

আব্বার ভাই, অর্থাৎ আমার বড় চাচার সাথে সেরকম ভাবে মেশার সুযোগ আমরা পাইনি কখনও। বাংলাদেশে যখন ছিলাম তখনও না। আর এখানে আসার পরে সেই ব্যবধান আরও বেড়েছে। তাই এই মৃতু্য তেমন ভাবে আমাকে স্পর্শ করলো না, যেমনভাবে করলো আব্বার কষ্ট। আমি তার পাশে বসলাম, হাত ধরলাম। কিই বা বলার আছে আমার? মৃতু্যর মত সুনিশ্চিত অথচ আকস্মিক ঘটনাও তো আর নেই পৃথিবীতে। আব্বার চোখের পাতায় ফোঁটায় ফোঁটায় শিশিরের মত পানি জমতে লাগলো...

প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান

(চলবে)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/14840 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/14840 2006-07-29 07:15:12
গল্প: অচেনা: 5ম পর্ব
- এইতা কে লে! ইতিস পিতিস পুতুস পাতুস নাকি লে?

আমি হেসে ফেলতেই ও হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার গাল টিপে দিল। আমার খুব ভাল লাগছিল, কারণ ইরা কে এইরকম খুশীমনে দেখতে পাওয়া ইদানিং বিরল সব ঘটনার একটি। নিজের চারপাশে ধীরে ধীরে কেমন এক দেয়াল তৈরী করে ফেলছে ও। সে না চাইলে তাকে ভেদ করে ওর মন স্পর্শ করা প্রায় অসম্ভব।

ও হয়তো জানে তাকে আমি প্রচন্ডরকম ভালোবাসি। বুঝতে পারার কথাই তো। কারণ ভালোবাসা কোন না কোন ভাবে তো অনুভব করাই যায়। কিন্তু বেশীর ভাগ সময়েই ও আমার ছোঁয়ার বাইরের মানুষ হয়ে থাকে। ওর মনে সব সময়েই কোন না কোন চিন্তা চলতে থাকে। কী যে এত ভাবে সারাক্ষণ আমি অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারি না।

বেশীর ভাগ সময়েই সে তার নিজের ঘরে ব্যস্ত থাকে, কেউ ঘরে ঢুকলে বিরক্তভাবে তাকায়। বন্ধুরা মজা করে ওর ঘরের নাম দিয়েছে 'গুহা', আর ও হলো সন্যাসী উপগুপ্ত। উপগুপ্ত কারণ এখনও মাঝে মাঝে গুহার ভেতর থেকে মাথা বের করে চারপাশের জীবনধারা লক্ষ্য করে। যেদিন থেকে আর এটুকুও করবেনা, সেদিন উপগুপ্তর জায়গায় নাম হবে পুরাগুপ্ত।

- আব্বা আম্মা কই?

- বাজারে গেছে,

ইলা বললো - তোমার দেশ পত্রিকা এসেছে।

ইরা বললেঅ - হুম। তোমার সুনীর বুইড়্যার কবিতাও আছে একটা।

- এই খবরদার! সুনীলের নামে উলটা পালটা কথা বলবি না!

ওরা দুইজন সমস্বরে বলা শুরু করলো - সুনীল কিছুই পারে না, ওর কবিতা কিছুই হয় না। বুইড়্যা ব্যাটা কি সব ন্যাকা ন্যাকা কবিতা লেখে!

- ওই, চুপ কর কইলাম! সুনীর মোটেও ন্যাকা ন্যাকা কবিতা লেখে না।

- লেখেই তো, আর কবিতার মধ্যে গালাগালি দেয় এইটাই বা কেমন অভ্যাস?

- কোন কবিতায় গালাগালি দিল আবার?

ইরা বললো - ওই যে
সাধ ছিল তো সকাল বেলার শুভ্র মানুষ হবো,
তবু ভেতরে ভেতরে এক শুয়োরের বাচ্চা...

- ধুর! তুমি এক কবিতার সাথে আরেকটা জোড়া দিছো।

- সেইটা না হয় দিলাম। কিন্তু আসল কথা হলো শুয়োরের বাচ্চা। বলো has he used this word or not?

- তা করেছে। কবিতায় গালাগালি অবশ্য আমারও একটু কেমন জানি লাগে। মানে কবিতায় যে কোন অনুভুতিই সাবলীল আর জোড়ালো ভাবে প্রকাশ করতে পারা উচিৎ। এখন একেকজনের প্রকাশ ভঙ্গি তো একেকরকম। কারো যদি মনে হয় যে গালিটাই সবচেয়ে যুৎসই শব্দ কোন একটা লাইনে, তাইলে তো গালি দিতেই পারে।

- কেন রবীন্দ্রনাথ জোরালো ভাবে মত প্রকাশ করে নাই? উনি তো গালি দেয় নাই।

- আহা, এর মধ্যে বেচারা রবীন্দ্রনাথ কই থেকে আসলো। the two aren't even comparable! দুইজনের প্রকাশ ভঙ্গিই তো আলাদা। সবাই রবীন্দ্রনাথ হইলে সুনীল হবে কে? তবে ওইটা আলাদা তর্ক। আমার পয়েন্ট হলো সুনীল ট্র্যাশ লিখে না। কবিতা তাই, যা মনকে ছুঁয়ে যায়, and his surely does.

'দেশ' এর পাতা উলটাতে উলটাতে সুনীলবাবুর কবিতা বের করলাম - ইয়াল্লাহ! দেখ দেখ! এই দুই লাইন আমাকে নিয়ে লেখা!

- কোন দুই লাইন? ওরা ঝুঁকে পরে

- একটি পাখির শিষ মাঝেমাঝে শুনি
কোনদিন দেখাও হবে না।

উফ! ইতি আপা! তুমি যে কোন দুনিয়ায় থাকো! ওই বুড়ার তো খাইয়া দাইয়া কাজ নাই, তোমারে নিয়া কবিতা লিখবে, না?

- যাই বলো না কেন, এই কবিতা আমাকে নিয়েই লেখা।

প্রকাশ: পরবাস
ছবি: সাহিদুর রহমান

(চলবে) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/14584 http://www.somewhereinblog.net/blog/lunastuff/14584 2006-07-26 04:11:35