চীনে যাওয়ার আগেই আমার প্ল্যান ছিল, যদি কখনো চীনে যাই তবে নিউচিয়ে মসজিদে যাব। আমার সৌভাগ্য, নিউচিয়ে মসজিদে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। সত্যিই আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম, নিউচিয়ে মসজিদের জৌলুস আর প্রাচীনতা দেখে। বাংলাদেশেও সচরাচর এধরণের সমৃদ্ধ মসজিদ দেখা যায় না।
পেইচিংয়ের শহরাঞ্চলের দক্ষিণাংশের স্যুয়ান উ জেলায় অবস্থিত নিউচেই রাস্তা এ মহানগরের একটি মুসলমান অধ্যুষিত আবাসিক এলাকা । এ অঞ্চলে ১০ হাজারেরও বেশি মুসলমান বসবাস করছেন । তারা অন্যান্যজাতির লোকজনের সঙ্গে সম্প্রীতিতে মিলেমিশে আছেন । এ অঞ্চলের মুসলমানদের শান্ত ও নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ইসলাম ধর্মের ঐতিহ্য ফুটে ওঠে ।
শুক্রবার দুপুরে নিউচিয়ে মসজিদে নিয়মিতভাবে মুসলমানরা জুমার নামাজ আদায় করেন । নামাজ আদায়ের জন্য শুক্রবার দুপুরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এ মসজিদে মিলিত হন । নামাজ আদায়ের জন্য ১ হাজারেরও বেশি মুসলমান এ মসজিদে সমবেত হন । প্রবীণ মুসলমান ইয়াং ছুং ছিং তাদের মধ্যে একজন । তিনি ছোট বেলা থেকেই নিউচিয়ে আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন । অবসর নেয়ার পরবর্তী দশ বারো বছরে নামাজ পড়ার জন্য তিনি রোজ নিয়মিতভাবে এ মসজিদে আসে আসছেন । এ প্রাচীন মসজিদ তার জন্য খুবই আনন্দদায়ক ও উপভোগ্য ।
নিউচিয়ে মসজিদে নামাজ পড়া ও এত সুন্দর আবাসিক এলাকায় বসবাসের জন্য তিনি খুব আনন্দ বোধ করেন । মসজিদে নামাজ পড়া তার নিত্য জীবনযাত্রার একটি প্রয়োজনীয় বিষয় । তার পিতামহ ও বাবাও নিয়মিতভাবে এ মসজিদে নামাজ পড়তেন । এখন তার সন্তানরাও এ মসজিদে নামাজ পড়ে ।
নিউচিয়ে মসজিদ পেইচিংয়ের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রাচীন একটি মসজিদ। এ মসজিদ নিউচিয়ে আবাসিক এলাকার স্থাপত্যশৈলীর একটি অন্যতম প্রতীকও । ৯৯৬ খ্রীষ্টাব্দে অর্থাত্ চীনের লিয়াও রাজবংশ আমলে একজন আরব স্থাপত্য শিল্পীর উদ্যোগে এ মসজিদ নির্মিত হয় । পেইচিং ইসলাম ধর্ম সমিতির চেয়ারম্যান , নিউচিয়ে মসজিদের ৭৬ বছর বয়স্ক ইমাম স্যু থিয়ান লি সংবাদদাতাকে বলেছেন , ইসলাম ধর্মের নিয়মবিধি অনুযায়ী মসজিদে রোজ ৫ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় । প্রতি বার কমপক্ষে ২ শ'রও বেশি মুসলমান এ মসজিদে নামাজ পড়েন ।
মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতা আইনের রক্ষা পায় । সরকার মুসলমানদের ধর্মীয় কর্মকান্ডের জন্য নির্দিষ্ট অংকের অর্থ সাহায্যও দেয় । যেমন ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল- আযহা উদযাপনী অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষা জন্য সরকার নিরাপত্তা কর্মী পাঠায়। মুসলমানরা যাতে ভালভাবে ছুটি ভোগ করতে পারেন , সেজন্য সরকার তাদের ছুটি দেয় ।
নামাজ পড়ার জন্য যারা মসজিদে আসেন , তাদের মধ্যে ৪০ জনেরও বেশি বিদেশীও রয়েছে । মসজিদের এক কর্মকর্তা বলেন , নামাজ পড়ার জন্য পাকিস্তান , তুরস্ক এবং আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলমানরাও এ মসজিদে আসেন । তাদের মধ্যে অনেকেই পেইচিংয়ে কাজ করছেন । এ ছাড়াও বেশ কিছু বিদেশী পর্যটকও এ মসজিদে এসে নামাজ পড়েন । জার্মানীর তরুণ মার্ক হারটোক বলেন , প্রাচীন ও আড়ম্বরপূর্ণ এ মসজিদের পরিবেশ তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে ।
এ মসজিদটি সুন্দর , পরিবেশ শান্ত ও সুশৃঙ্খল । মসজিদের কর্মী ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ । ইসলাম ধর্ম শান্তিকামী মানুষের ধর্ম , প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজের বিশ্বাসের জন্য গৌরব বোধ করেন ।
নিউচিয়ে মসজিদ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত । রাস্তায় পথচারী ও গাড়ির ভিড় আছে । ভিতরে সর্বত্র শান্ত পরিবেশ বিরাজমান । মসজিদে রোজ ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় । এ ছাড়াও ইসলাম ধর্মের কবিত্র কুরআন শেখানোর কোর্সও চালু করা হয়েছে ।
নিউচিয়ে রাস্তা সবুজ গাছপালায় পরিপূর্ণ । পরিপাটি ও সুন্দর আধুনিক আবাসিক এলাকা ইসলামী স্থাপত্যশৈলী ঘরবাড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ । এ আবাসিক এলাকায় বেশির ভাগ অধিবাসীই হুই জাতির লোকজন । তাদের ধমীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় মুসলিম সুপারমার্কেট , হুই জাতির হাসপাতাল , মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুল এবং মৃতদের দাফন ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট পরিসেবারও ব্যবস্থা করা হয় । মসজিদের ইমাম স্যুই থিয়ান লি নিউচেই আবাসিক এলাকায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন । আবাসিক এলাকার পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
আগে নিউচিয়ে রাস্তা খুবই সংকীর্ণ ছিল , তা পুরানো পেইচিংয়ের সাধারণ অলি-গলির মতো । অধিবাসীরা পুরানো ও জরাজীর্ণ বাড়িতে বাস করতেন । এখন রাস্তা সংস্কার হয়েছে । তা চওড়া হয়ে ৪০ মিটারে এসে দাঁড়িয়েছে । পুরানো পরিবর্তে এখন নতুন আবাসিক এলাকা নির্মাণ করা হয়েছে । মুসলিম সুপার মার্কেক গড়ে তোলার পর অধিবাসীদের কেনা-কাটা অনেক সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে । সুপার মার্কেটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পণ্য পাওয়া যায় ।
চিন শাও ছুন নামে নিউচেয়ের ৫৯ বছর বয়স্ক একজন অধিবাসী সংবাদদাতাকে বলেন , সরকার মুসলমানদের জীবনযাপনের সুবিধার ওপর খুব মনোযোগ দিয়ে আসছে । এখন এ আবাসিক এলাকায় বিভিন্ন জাতির লোকজন শান্তি ও সম্প্রীতিতে মিলেমিশে বসবাস করেন ।
নিউচিয়ে মুসলমানদের জীবনযাপন ও আমোদ প্রমোদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে । হুই জাতির খাওয়া দাওয়ার সুবিধার্থে আবাসিক এলাকায় মুসলিম রেস্তোরাঁ রয়েছে । এলাকার দক্ষিণাংশে হুই জাতির একটি হাসপাতালও গড়ে তোলা হয়েছে । সরকার সংখ্যালঘু জাতির লোকজনের প্রতি খুব যত্ন নেয় । নিউচিয়ে আবাসিক এলাকায় বিভিন্ন জাতির অধিবাসীরা সম্প্রীতিতে মিলেমিশে বসবাস করছেন ।
বর্ণনার তথ্যসূত্রঃ সিআরআই

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

