স্যার, আমিতো নিয়মিত পানির বিল জমা দিয়েছি। এক মাসেরও বকেয়া নেই। আপনাদের লোক আমাকে গত ৯ মাসে ১৩শ' টাকা পানির বিল দেইনি বলে একটি কাগজ দিয়ে এসেছে। বলেছে খুব শীঘ্রই এই টাকা পরিশোধ না করলে পানির লাইন বিচ্ছিন্ন না করে দেয়া হবে। এভাবে খুব নমনীয় সুরে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন-৭ এর মতিঝিল কার্যালয়ে কথাগুলো বলছিলেন মাতুয়াইল এলাকার স্বল্প শিক্ষিত গ্রাহক রহিম মিয়া। অনেকটা না শুনার ভান করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বললেন, সমস্যা না হলে কি বিল দিয়েছে নাকি? বসুন, আপনার কাগজ দেখতে দেরি হবে। আপনার আগে আরও কয়েকজন আছে। সময় হলে ডাকবো।
ওয়াসার রাজস্ব জোন-৭ এর মতিঝিল কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, অধিকাংশ গ্রাহকের একই অভিযোগ। দেখা গেল, কারো কাগজে ২ হাজার, কারো আড়াই হাজার, কারো কাগজে আরো বেশী ভুতুড়ে বকেয়া বিলের কাগজ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোন মাসের বিল বাকি তা উল্লেখ নেই। বিভিন্ন গ্রাহককে দেয়া বিলের কাগজে লিখা আছে গত ৮ অথবা ৯ বা ১০ মাসের এই বিল পরিশোধ করা হয়নি। এভাবে অবৈধভাবে ভুতুড়ে বিল দিয়ে অন্যায়ভাবে হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করছে ওয়াসা সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পানির বিল পরিশোধ হয়েছে এ মর্মে ওয়াসার একটি প্রত্যয়নপত্র দেয়া বাবদ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। অথচ এই প্রত্যয়নপত্রটি সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় দেয়ার বিধান রয়েছে। সূত্র জানায়, এর সাথে জোনটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত। ভিকটিমরা জানান, বাড়তি ঝামেলা এড়াতে তারাও বিল যা আসে তা দিয়ে আসেন। এছাড়া কারো কাছে কোন অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না বলে তারা জানান।
ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা অহিদুল ইসলামের কাছে রাজস্ব জোন ৭ এ পানির ভুতুড়ে বিল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, এটা খুবই অন্যায়। যদি কারো পানির বিল বকেয়া থাকে তা সংশ্লিষ্ট কাগজে মাসের নামসহ নির্দিষ্ট করে টাকার অংক লিখা থাকতে হবে। ৯ মাসের মধ্যে কোন মাসের উল্লেখ না করে যে ভুতুড়ে বিল গ্রাহকদের দেয়া হয়েছে সেটা অবৈধ। কোন্ কোন্ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে তা বিলের মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে। তিনি বলেন, আমি নিজেও এ ধরনের অভিযোগ শুনেছি। ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেন, কেউ যদি এ ধরনের ভুতুড়ে বিল ও প্রত্যয়নপত্রের নামে টাকা নেয়ার প্রমাণ দেখাতে পারে তাহলে ওয়াসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিনই ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন-৭ এ ভুতুড়ে বিলের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ রকম একটা অন্যায় কাজ হচ্ছে জেনেও ঢাকা ওয়াসা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন ৭ এ চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। এই জোনে একবার বিল দিলে পরে আবারো দিতে হয়। অবৈধ টাকা আয়ের জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাসার মালিকদের নামে ভুতুড়ে বিল পাঠান। ঢাকা ওয়াসার প্যাড ব্যবহার করে এই বিলের কাগজে হাতে লেখা থাকে গত ৯ বা ১১ মাসে আপনি ১০৮০/১৩০০ টাকা জমা দেননি। এখন তা জরিমানা ও ভ্যাটসহ কাগজ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। অথচ ভুতুড়ে যে বিল দেয়া হয় সেখানে বিলের কাগজগুলো নিয়ে আসারও কোনো নির্দেশ নেই। বাসার মালিকরা কাগজ নিয়ে দৌড়ে আসেন সংশ্লিষ্ট জোন কার্যালয়ে। সেখানে আসার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তা অতীতের সবগুলো বিল জমার রশিদ দেখাতে বলেন। যদি কোন একটি মাসের বিল না থাকে তখন বলে, আপনি এ মাসের বিল দেননি। পরে যদি সেই রশিদটিও দেখানো হয় তখন তারা বলে আপনার অমুক মাসের বিল কম হয়েছে। অথবা বলে আমরা আপনার বিল ব্যাংক থেকে পাইনি। তখন তারা নিজ হাতে একটি বিল করে দেয় এবং বলে আজকের মধ্যেই বিলটি জমা দিতে হবে। এ সময় সংশ্লিষ্ট বিল প্রদানকারীর কাছ থেকে হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। বলা হয় টাকা না দিলে পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। এছাড়া বিল দিয়েছে এমন প্রত্যয়নপত্র দিবে বলে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা নেয়া হয়। যদিও এ পত্রের জন্যে কোন টাকা দিতে হয় না। এভাবেই চলছে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন ৭ এর কার্যক্রম। ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংকে জমাকৃত পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল কয়েক দিনের মধ্যেই তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে জমা দেয়া হয়।
জানা গেছে, নিয়ম হলো যদি কোন গ্রাহক কোন মাসের পানির বিল জমা না দেয় তাহলে সংশ্লিষ্ট মাসের কথা উল্লেখ করে গ্রাহক বরাবর চিঠি দেয়া। কিন্তু এ নিয়ম এখানে মানা হয় না। তারা লিখে দেয় এভাবে, ২০০৯-এর মার্চ থেকে ২০০৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিশোধ না হওয়া বিল পাওনা ১০৮০ টাকা, এর সাথে ১৫ শতাংশ করে ভ্যাট ও সারচার্জ দিতে হবে। প্রশ্ন হলো যদি কোন গ্রাহক জমা দেয়া রশিদ হারিয়ে ফেলেন তাহলে কি করবেন। যেহেতু এখানে নির্দিষ্ট করে কোন মাসের নাম উল্লেখ নেই তাই তাকে পুরো ১০ মাসের রশিদ সাথে করে নিয়ে আসতে হয়। যদি কোন কারণে উল্লেখিত সময়ের কোন মাসের বিল রশিদ না থাকে তাহলেই হলো। তারা হাতে লিখে একটি বিল করে দেয়। তখন বলা হয় আপনি যদি পরবর্তীতে আগের বিলের রশিদ পানও তাহলে আপনার টাকা ফেরত দেয়া হবে না। জানা গেছে, ব্যাংকে জমাকৃত এই টাকার পুরোটাই সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তারা ভাগ করে নিয়ে নেয়।
সরেজমিনে গিয়ে রাজস্ব জোন-৭ এর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন এভাবে ভুতুড়ে বিলের কাগজ নিয়ে অর্ধশতাধিক গ্রাহক ভিড় করে এখানে। হাতে এই কাগজটি দেখলেই খুশি হয়ে যান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তারা ধরে নেয় এখনই নিশ্চিত নগদ টাকা তাদের হাতছানি দিচ্ছে। ভুতুড়ে এ বিলের কাগজ দিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে শতশত টাকা। এ ক্ষেত্রে নতুন পানির লাইন নিয়েছে এমন অথবা মধ্যবিত্ত বাড়ির মালিকদের বেশী হয়রানী করা হয় বলে জানা গেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


