মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর প্রযোজনায় ভাইবেরাদর গ্রুপের কচি খন্দকারের পরিচালনায় ”খসরু + ময়না” নাটকটারে বলা যাইতে পারে ইভটিজিং এর একেবারে নির্বিষ উপস্থাপনা, ছোট বাচ্চাদের দুষ্টুমি যেরকম নির্দোষ, তেমন নির্দোষ ও নির্বিষ আকারে এই নাটকে ইভটিজিং এর উপস্থাপনা। এই নাটকে, খসরু (মারজুক রাসেল) বার বার ফেল করে। সে ৫ বার ফেলকরার পর ৬ষ্ঠ বারের মতো পরীক্ষা দিয়া ২য় বিভাগে পাশ কইরা ভীষণ খুশি কারণ সে তার পছন্দের মেয়ে ময়নার(তিশা) সাথে একই বছরে পাশ করছে অর্থাৎ তাকে ময়নার জুনিয়র হইতে হয়নাই। ময়নাকে জয় করার লাইগা খসরু ময়নার বাসার জানালার সামনে খাড়ায়া থাকে। বন্ধুর পরামর্শে তাকে মুগ্ধ করার লাইগা তাকে দেখলে চোখ টিপ মারে। ময়নার নামের প্রথম অক্ষর ”এম” দিয়া গলার লকেট বানায়। নড়াইলের মতো একটি মফস্বল শহরে যে কোন কিশোরীর জন্য তার প্রেম প্রার্থী যুবকের এই সব কর্মকান্ড ভীষণ বিড়ম্বনার পরিস্থিতি তৈরী করাই স্বাভাবিক। কিন্তু নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র খসরুর পয়েন্ট অব ভিউ এর প্রাধান্যে ময়নার সেই বিড়ম্বনার কোন ছায়াই নাটকে নাই। মনে হয় এইসবে ময়নার কিছুই যায় আসে না। ময়নাকে উপলক্ষ করে খসরু ”দুটি মন দুটি আশা” নামের নাটক মঞ্চস্থ করলে কিংবা ”ময়না গো তোর বিহনে আমি একেলা” জাতীয় গান বাজাইলেও ময়নার দুই একবার ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া অন্য কোন সামাজিক বিড়ম্বনার দেখা আমরা পাই না। বরং ”দুটি মন দুটি আশা” নাটকের প্রচারণার জন্য দেয়াল চিত্র আকার সময় খসরুর চেহারায় দাড়ি যুক্ত করা নিয়া ময়নার রঙ্গ তামাশা দেখলে মনে হইতে পারে ময়না যেন এসব উপভোগই করতাছে। সেই নাটক খসরু নিজে রচনা করলেও শুরুতে সে গেছিল এক নাট্য ব্যাক্তিত্বের কাছে কিন্তু ঐ ব্যাক্তি কেবল ”ঘুনে ধরা সমাজ” জাতীয় নাটক করতে চায়, কিন্তু খসরুর মতো ”ছেলে পেলেরা” চায় প্রেম ভালোবাসার নাটক। ফলে সেই সিরিয়াস নাট্য ব্যাক্তিত্বকে দিয়া নাটক লেখানো আর হয় না। একই ভাবে গ্র“প থিয়েটার আন্দোলনের সাথে যুক্ত নাট্য ব্যাক্তিত্বকেও দেখা যায় প্রেম ভালোবাসার প্রতি বিরূপ কারণ তিনি মনে করেন সমাজের এই পরিস্থিতিতে তরুণদের প্রেম ভালোবাসা নিয়ে ব্যাস্ত থাকা উচিত নয়। ফলে খসরুকে নিজেই নাটক লেখার কাজে হাত দিতে হয়। এর মধ্যে দিয়া কচি খন্দকার কিংবা ভাই বেরাদর গ্র“পের সমাজ সচেতনা মূলক নাটক সম্পর্কে তাদের একটা পরিস্কার বক্তব্য পাওয়া যায়। তারা স্পষ্টতই ”ঘুনে ধরা সমাজ” জাতীয় নাটককে প্রেম ভালোবাসার নাটকের সাথে বিরোধাত্মক জায়গায় খাড়া করায়া দিয়া তাগো মনের মতো কইরে বানানো প্রেম-ভালোবাসার নাটকের প্রতি তাগো পক্ষপাতকে প্রকাশ করলেন বইলাই মনে হয়।
তো এই প্রেম ভালোবাসার যে রিপ্রেজেন্টেশান আমরা দেখি তাতে দেখা যায়, খসরুর আহবানে সাড়া না দিলেও পাশের বাড়িতে বেড়াতে আসা যুবক রাঙা কর্তৃক ময়নার জানালার নীচে দাড়ায়া ”এঙগেজ না ফ্রি” জাতীয় আওয়াজে ময়না পজেটিভ সাড়া দেয়, ময়না সেই যুবকের মাথায় পানি ঢাইলা দেয়, রিকশায় করে ঘুরতে বাইর হয় ইত্যাদি। পরে দেখা যায় মেয়েটি খসরু কিংবা রাঙা কারো সাথেই সম্পর্ক করে নি, করছে দিনাজপুরের কোন একজনের সাথে। ভাই বেরাদরদের অন্যান্য নাটকের মতোই এ নাটকেও নারী চারিত্রের নির্মাণটি খেয়াল করার মতো। নাটকের শেষে দেখা যায়, ইভটিজিং কারী খসরু একজন নাট্যকারে পরিণত হয়েছে, ময়নার যে বান্ধবীকে দিয়ে ময়নার কাছে প্রস্তাব পাঠাইতো তাকেই বিয়ে কইরা থিতু হইছে কিন্তু তারপরও অনেকটা দেবদাস সুলভ মনোভাব নিয়া ময়নাকে চিঠি লিখতাছে।
এ ঘটনাটাকে ভাইবেরাদরদের নাট্যব্যাক্তিত্বে রূপান্তরিত হওয়ার ইতিহাস কওয়া যাইবো কি-না জানি না! তবে সমস্ত ইভটিজিংকারী/ গলির মোড়ে/ বাসার সামনে/ স্কুলের সামনে দাড়িয়ে থাকা ইভটিজিংকারীদের যদি এমন রূপান্তর ঘটতো যে তারা একেবারে সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব, নাট্যকার বা এক একটা দেবদাসে পরিণত হইয়া যায় তাইলে বোধ হয় ময়নাদের আত্মহত্যার খবর দুইদিন পরপর পত্রিকার পাতায় ছাপা হইতো না।
এতো গেল ইভটিজিং এর ডাইরেক্ট অনুপ্রেরণার কথা। কইতে পারেন এই ধরণের ডাইরেক্ট অনুপ্রেরণা আর কয়টা নাটকে দেখা যায়। ঠিক কথা। ডাইরেক্ট এর চেয়ে ইনডাইরেক্ট অনুপ্রেরণা/আশকারাই বেশি এবং সবমিলিয়ে এই আশকারা ডাইরেক্ট একটা দুইটা নাটকের চেয়েও ভয়ংকর। নাটক সিনেমায় বিষয় বস্ত একটাই- প্রেম। তা নারী পুরুষের মধ্যে প্রেম তো হইবই। আর সেইটা নিয়া নাটক হইলেই বা সমস্যা কি? এমনিতে সমস্য নাই, কিন্তু বিষয় বস্তু যদি এইরকম হয় যে নাটকগুলা দেখলে মনে হবে ----
ক) নারী পুরুষের সম্পর্ক মাত্রই হইলো প্রেমের সম্পর্ক/ যৌনতা তাড়িত সম্পর্ক
খ) পুরুষের একমাত্র কাজ হইল প্রেম করা/প্রেমের চেষ্টা করা/একটা ছাইড়া আরেকটা প্রেম করা/গলির মোড়ে খাড়ায়া থাকা/ ভাইঙা যাওয়া সম্পর্কের লাইগা হা হুতাশ করা/প্রতিশোধ লওয়া ইত্যাদি। এর ফলে একজন তরুণের মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে,প্রেম ছাড়া জীবনে কিছুই নাই। ফলে একটা প্রেম না করলে জীবন ব্যার্থ। ফলে নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যদি প্রেম করার কোন সুযোগ সেই তরুণটির না থাকে, তাইলে সে উইঠা পইড়া লাগে জোর কইরা সম্মতি আদায় করতে।
গ) আর নারীর একমাত্র কাজ হইলো প্রেম করা/অতি সহজেই হুটহাট প্রেমে পড়া/একটা ছাইড়া আরেকটা প্রেম করা/ চাইনিজ ,গিফট, ফ্লেক্সি লোডের মাধ্যমে পুরুষের মানিব্যাগ খালি করা/ সাজগোজ করা/ ডেটিং/মোবাইল টকিং ইত্যাদি। এইসবের মধ্যে দিয়া মিডিয়ার নাটক/সিনেমা/বিজ্ঞাপণ/রিয়েলিটি শো’তে নারীর যে চেহারা ফুইটা উঠে তাতে নারী যে একজন অনুভূতিশীল মানুষ, তার যে আত্মমর্যাদা বোধ বলে কোন বিষয় আছে, নারী যে কেবল পুরুষের ভোগের বস্তু নয়--- এইটা বোঝার কোন উপায় নাই। ফলে মিডিয়া নারীর প্রতি কেবল অশ্রদ্ধাই উৎপাদন করে।
এইভাবে, একদিকে নির্বিচার ভোগের বস্তু হিসেবে নারীর ভাবমূর্তি নির্মাণ আর আরেকদিকে সেই বস্তুটিকে ভোগ করার উপযুক্ত ভোক্তা হিসেবে তরুণদেরকে তৈরী--- এই দুইটা কাজই মিডিয়া সফল ভাবে করতাছে, যে সাফল্যের ছাপ সাম্প্রতিক মডেলের যৌন নিপীড়ণের মধ্যে সুস্পষ্ট ভাবে ফুইটা উঠছে। সেই ছাপ ঢাকার জন্য মিডিয়া ইভটিজিং বিরোধী প্রচারণা করবো, ইভটিজিং বিরোধী সামাজিক আন্দোলণ করতে জনগণতে নসিহত করবো আর অন্যদিকে ইভটিজিং বা নারীর প্রতি যৌন আগ্রাসনের সকল ধরণের বাস্তব ভিত্তি উৎপাদন/পুরুৎপাদনের বাণিজ্যিক কারখানাটি চালু রাইখা দিবো তা মাইনা নেয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হইব না বইলাই মনে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


