বাংলাদেশে প্রায় ২০ প্রজাতির স্বাদু পানির কচ্ছপ রয়েছে। কিন্তু এদের অধিকাংশই আজ হুমকির সম্মুখীন। বাসস্থলের অভাব, খাদ্য হিসেবে এদের ব্যবহার প্রভৃতি কারনে আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে এদের অস্তিত্ব। গতকাল বাজারে গিয়ে দেখতে পেলাম তেমনই একটি প্রজাতি যেটি এখন বিপন্ন প্রজাতি। কচ্ছপটি ধরা হয়েছিল সুনামগঞ্জের সুরমা নদী থেকে। এটার ওজন আনুমানিক ৪কেজি হবে। বিক্রি হল ২০০০টাকায়। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? ঠিকই বলছি। আসুন এর কয়েকটা ছবি দেখি।
বাসায় এসে বইপত্র, নেট ঘেটে এর সম্পর্কে যা জানলাম তা হলো, এই কচ্ছপ প্রজাতিটির নাম খালুয়া কাছিম বা Indian softshell turtle । এর বৈজ্ঞানিক নাম Aspideretes gangeticus। Trionychidae পরিবার ও Testudines বর্গের অন্তর্গত এই প্রজাতিটি বাংলাদেশের স্বাদু পানির কচ্ছপের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রজাতি। এর গোলাকার ঢালের ব্যাস ৯৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। গায়ের রং হালকা জলপাই রংয়ের। বড় গভীর কিংবা ছোট নদী, হ্রদ, বড় খাল কিংবা পুকুরে বাস করে এরা। ঘোলা পানিতেও বাস করতে পছন্দ এদের।
এরা সর্বভুক। শামুক, পোকা মাকড়, মাছ, ব্যাঙই শুধু খায় না জলজ উদ্ভিদ ও খেয়ে থাকে এরা। এরা ১৭-৩১ সে.মি. গর্ত করে সেখানে ১৫-২০টি ডিম পাড়ে। ২৫১ দিন থেকে ৩১০ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় সাধারণত বর্ষাকালে।
অন্যান্য যে সব প্রজাতিগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় এর প্রায় সবগুলোরই অবস্থা দেখলাম আই.ইউ.সি.এন এর বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় চলে গেছে। বাংলাদেশে স্বাদু পানির কচ্ছপ ২০ প্রজাতি হলেও আমি নিজের চোখে দেখেছি মাত্র ৩ প্রজাতি। এগুলো নিয়ে আলাদা পোষ্ট দেওয়া যাবে পরে। তার আগে কচ্ছপ সম্পর্কিত আরো কিছু গল্প করা যাক।
কচ্ছপ হিন্দুদের একটি বিশেষ সম্পদ্রায়ের এবং কিছু কিছু উপজাতীয়দের প্রিয় খাবার। স্থানীয়ভাবে অনেক জায়গায় একে জল খাসি ও বলা হয়। মনে পড়ে ছোটবেলায় যখন হাটে যেতাম তখন দেখতাম ব্যাপারীরা কচ্ছপ সাজিয়ে বসে আসে বিক্রির জন্য। ছোট জাতের কচ্ছপগুলোকে চিৎ করে রাখা হত পাটের বস্তার উপর সাজিয়ে যাতে হেঁটে চলে যেতে না পারে। ওই প্রজাতিটির পেটের দিকটা হলুদ রঙের। সারি দিয়ে সাজানো হলুদ রঙের কচ্ছপ গুলোর কোন কোন টি উপুড় হওয়ার জন্য পা ছোড়াছুড়ি করত। এই দৃশ্য দেখে মজা পেতাম খুব। পাশে রাখা থাকত বস্তা ভর্তি আরো কচ্ছপ। কোন কোন ব্যাপারী বড় জাতের কচ্ছপগুলো (উপরে যে প্রজাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল) কেটেও বিক্রি করত, বিশেষকরে যেগুলো সাইজে অনেক বড় (ছবির এই প্রজাতিটিই আমি ৮- ১০কেজি পর্যন্ত দেখেছি)। এগুলো পেট থেকে কোন কোনটার বের হত ডিম। ডিম বিক্রি হত আলাদা দামে। বড় জাতের এই কচ্ছপগুলোর দুই পা ফুটো করে একটার সাথে আর একটা সুতো দিয়ে বেঁধে রাখা হত(ঠিক ছবির মত করে) যাতে চলে যেতে না পারে। ছোট প্রজাতির তুলনায় এরা যথেষ্ট শক্তিশালী।
আগে যেকোন জলাশয়, বিশেষ করে যেগুলো অগভীর এবং কচুরীপানায় ভর্তি থাকত, সে গুলো যখন শুকিয়ে যেত কিংবা সেচা হত মাছ ধরার জন্য তখন সেখানে পাওয়া যেত অনেক কচ্ছপ। শুষ্ক মৌসুমে দেখেছি কচ্ছপ শিকারীরা ৩-৪ হাত লম্বা লোহার তিন কাঁটা নিয়ে বের হত কচ্ছপ শিকারের জন্য। তারা কচুরীপানা ভর্তি যেসব অগভীর জলাশয় শুকিয়ে গেছে তার ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ঐ লোহার তিন কাঁটা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কচ্ছপ খুঁজে বেড়াত। কচ্ছপের গায়ের উপর পড়তেই ঠক ঠক শব্দ হত এবং সেখান থেকে কচুরীপানা সরিয়ে বের করে আনত কচ্ছপ। তাদের মাজায় বাধাঁ থাকত বিশেষ জাল যেগুলোর মধ্যে কচ্ছপ ভরে বেধেঁ রাখত অনেকটা বেল্টের মত করে। কারো কারো কাছে থলিও থাকত।
কচ্ছপ ডিম পাড়ে জলাশয়ের ধারে কোন উঁচু ভিটায়, রাস্তার পাশে, কিংবা পুকুর পাড়ে। এই ডিম পাড়তে এসেও মানুষের হাতে ধরা পড়তে দেখেছি কত কচ্ছপ। পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে মাটি খুঁড়ে বেজি কে কচ্ছপের ডিম বের করে খেতে দেখেছি। বর্ষাকালে, যখন একটু বড় বৃষ্টি হত তখন রাস্তার পাশে, জলাশয়ের পাশের কোন ভিটায় দেখেছি ডিম ফুটে সদ্য বের হয়ে আসা ছোট্ট ছোট্ট কচ্ছপের বাচ্চা। কি সুন্দর দেখতে! অনেকগুলো ধরে এনে মাটির চাড়িতে রেখে দিয়েছি পোষার জন্য। মাটির চাড়িতে পানির নীচে ছোট ছোট কচ্ছপের বাচ্চা, গায়ে ছোট ছোট হলুদ ফোঁটা, মনে এখনো গেঁথে আছে সেই সব দৃশ্য গুলো।
দেশের কোন কোন অঞ্চলে এখনো কিছু প্রজাতি টিকে থাকলেও শিকারীদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। এখনও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাগুলোর (বাগেরহাট, খুলনা) অনেক হাট-বাজারে আস্ত কিংবা কেটে বিক্রি হতে দেখা যায়। তবে আগে যেমন সস্তায় পাওয়া যেত, এখন দাম অনেক চড়া। প্রতি কেজি ২৫০টাকা থেকে ৫০০টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা যায় উল্লেখিত প্রজাতির কচ্ছপটির শরীরের বিশেষ অংশ (দেহের চারিদিকে চ্যাপ্টা কার্টিলেজ) বিদেশে রপ্তানী হয় উচ্চমূল্যে। এজন্য ঐ প্রজাতির কচ্ছপটি বাজারে কেটে বিক্রি হলেও ঐ অংশ বিক্রি করেনা। তবে অন্য প্রজাতিগুলো না কেটেই বিক্রি হয়।
(তথ্য সূত্রঃ প্রাণী ভূগোল- কে. এম. আওরঙ্গজেব এবং ইন্টারনেট। ছবি নিজের তোলা)
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০০৯ সকাল ৯:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


