আমার ছোট বেলার কিছু প্রচলিত (এখনকার সময়ে অপ্রচলিত) খাবার আর বুনো ফলের কথা বলি যেগুলো এখন বড্ড মিস করি। আমার এলাকার (খুলনা) এইসব জিনিষের সবগুলো দেশের অন্য সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিচিত কি না সেটা আমার জানা নেই। তবে ছোট বেলাটা যাদের গ্রামে কেটেছে তাদের তাদের হয়ত এগুলোর বেশীরভাগের সাথে পরিচয় আছে। থাকবে না-ই বা কেন, বাংলার সব আনাচ-কানাচ তো একই রকম । দেখুনতো খেয়েছেন কি না এগুলো?
বেতফলঃ বেত ফলকে আঞ্চলিক ভাষায় আমাদের এলাকায় বলে বেত থোল। থোল অর্থ থোকা। ফলটি থোকায় থোকায় ধরে বলেই এ রকম নাম হয়ত। আঙুর ফলের আকৃতি কিন্তু আকারে আরো ছোট, সাপের গায়ের মত খোসা দিয়ে জড়ানো এই ফলটি কাঁচা অবস্থায় খুব কষা স্বাদ যক্ত হলেও পেকে গেলে ভেতরটা কালচে রং ধারন করে এবং সামান্য টক টক মত লাগে। ছোট বেলায় গ্রামের বেত ঝাঁড় গুলো হতে কাঁটার আঁচড় খেয়ে সংগ্রহ করে হাফ প্যান্টের কোচড়ে ভরে আনা এই ফল গুলোর স্বাদ আর বোধ হয় পাব না। বেত ঝাঁড়ই তো নাই আজ।
আমঝুমঃ আমঝুম ফলটিও বেশ ছোট, থোকায় থোকায় ধরে। গ্রামের ঝোঁপ ঝাড়েই জন্মাত গাছ গুলো। ফল গুলো কাঁচায় সবুজ, আধা পকায় কমলা আর পেকে গেলে লাল/কালচে লাল রংয়ের হত। স্বাদে কিছুটা বুনো গন্ধযুক্ত মিষ্টি হলেও শৈশবে ছিল পরম প্রিয়।
বলা ফলঃ খানিকটা গোলাকার ও মার্বেলের মত সাইজের এই ফল গুলো বেশী ব্যবহার হত আঁঠার জন্য বিশেষ করে ঘুড়ি তৈরির সময় এর খোঁজ পড়ত। আর তখন মুখেও পোরা হত দু’চারটে। কাঁচায় সবুজ ও কষা স্বাদযুক্ত এই ফলটি পাকলে সাদাটে রং ধারন করে। গাছ কিছুটা বড়, বাগানেই অগোচরে বেড়ে উঠত এদের গাছ। এই ফলের ভেতরের শাঁস দেখতে অনেকটা মুখের কফের মত এবং আঁঠালো।
গাবের আঁটি/পাকা গাবঃ দেশী গাব ফলটি গোলাকার, আকারে আপেলের চেয়ে কিছুটা ছোট। গায়ে এক ধরনের লালচে পাউডার জমে। কাঁচা অবস্থায় ঢেঁকিতে ছেঁচে এর কষ বের করে জালে ব্যবহার করা হত জাল কালো করার জন্য। সেই সুবাদে এর ভেতরের আঁটি গুলোও বের হত। প্রতিটি গাবে আঁটি থাকে সম্ভবত আটটি, সামান্য চ্যাপ্টা ও সাদা রংয়ের আঁটি গুলো খুব নরম থাকে গাবের কচি অবস্থায়। এগুলো সংগ্রহ করে পানিতে ধুয়ে লবন দিয়ে মেখে খাওয়ার সে যে কি মজা! আর গাব যখন পেকে যায় তখন এর গায়ের রং হয় হলুদ। আঁটি গুলো হয় সুপারির মত শক্ত, কিন্তু আঁটির গায়ে থাকে এক রকমের পিচ্ছিল আবরন যা খুব মিষ্টি। পাকা গাবের এটাই মজা, মুখে আঁটি পুরে দিয়ে চুষে ফেলে দেওয়া। পিচ্ছিল হওয়ায় কখনো কখনো পেটের ভেতরেও চলে যেত দু’একটা। অন্যরা তখন বলত তোর পেটের ভেতর গাছ হয়ে মাথা ফুটো হয়ে বের হবে। সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হল গাবে আঁটি খেলে পরের দুই একদিন আর পায়খানা হত না। দু একদিন পর যখন হত তখন অনেক কষ্ট হত। পায়খানা এত টাইট করার জিনিষ আমি আর দেখিনি। গাব গাছ অনেক বড় হয় ও এর ডাল ও সাংঘাতিক মজবুত ও ঘন। ঘন ডাল পালার ভেতর দিয়ে বিশাল গাছের একেবারে মগডালে উঠে যাওয়াটা ও আজ শুধুই স্মৃতি।
খৈয়া ফলঃ খৈয়া ফল কোথাও কোথাও খৈ ফল কিংবা জিলাপি ফল নামেও পরিচিত। আমাদের এলাকায় বলে খইয়ে। জিলাপির মত প্যাঁচানো ফলটির ভেতরের কোয়া গুলো দেখতে খানিকটা খইয়ের মতই। পেকে গেলে উপরের আবরণটা ভেতরের দিক দিয়ে ফেটে যায়, তখন খইয়ের মত কোয়াগুলো বাহির হতে দেখা যায়। এটিও কাঁচা অবস্থায় কষা ও পেকে গেলে মিষ্টি হয়। গাছ অনেক বড় হয়, ডাল কাঁটাযুক্ত হয়। গ্রীষ্ম কালের এই ফলটি কাক, কোকিল, বাঁদুড় ও অন্যান্য পাখিদের প্রিয় খাবার। আমরা বাঁশের লম্বা চটা কিংবা পাটকাঠির মাথায় ছোট একটা কাঠি উল্টা দিকে ঘুরিয়ে বাঁধতাম। এটাকে আমাদের এলাকায় বলে কোঁটা, কোথাও বলে নোগা। এই নিয়ে দল বেঁধে পাড়ায় বের হতাম খইয়ে পাড়তে। সবার কোঁচড় ভরে বাড়ি ফিরতাম। খইয়ে খেয়ে ঝাঁক বেধে নামতাম পুকুরে ঝাঁপাতে। কোথায় সেই খইয়ে খাওয়ার দিন! এখন অনেক কম দেখি গাছটি। বাড়ির পাশে খইয়ে গাছকে জায়গা দেওয়ার জায়গা কই?
বৈচী ফলঃ লম্বা লম্বা কাঁটা আর সবুজ পাতার মাঝে লাল লাল ছোট্ট ছোট্ট ফল, এই হল বৈচি ফল। আমরা বলি বুচ। বাগেরহাটে এর নাম শুনেছি ডুঙ্কর ফল। অন্য এলাকায় কি বলে জানা নেই। স্বাদ কাঁচায় কষা আর পাকায় মিষ্টি। ঝোঁপ ঝাড়ের মাঝে হত গাছ। কাঁটার খোচা খেয়ে বুচ খাওয়ার মজা এখনো জ্বল জ্বল করে স্মৃতিতে। মেলা থেকে তাল পাতার ছোটা দিয়ে গাঁথা বৈচি ফলের মালা কতবার যে কিনেছি। গলায় পরে বাড়ি ফেরার পথে মালা থেকে ছিড়ি ছিড়ে খাওয়া, কি মজা।
শালুকঃ শালুক তোলা গ্রামের এক কমন শৈশব অভিজ্ঞতা। পানিতে নেমে শালুক তুলে কাঁচা খাওয়া কিংবা আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া, কে না খেয়েছে? শালুকের তরকারিও যে কি মজার! কে দেবে আমায় পালংশাক আর শোল মাছ দিয়ে রান্না এক বাটি শালুকের তরকারি?
তালের আঁটিঃ পাকা তাল থেকে শাস ছাড়িয়ে নেওয়ার পর আঁটিগুলো গাদা করে রাখা হয় ঘরের কানাচের দিক কোথাও। দু’একদিন একটু মিষ্টি-কটু গন্ধ ছড়ায় আঁটিগুলো। ঝাঁকে ঝাঁকে একজাতীয় ছাই রঙের প্রজাপতির দল এসে বসে আঁটির উপর, আস্তে আস্তে পাখা নাড়ে আর পাকা তালের শাঁস খায়। ওরাও চলে যায় এক সময়। পড়ে থাকে তালের আঁটিরা। অনেকদিন সুপ্ত থাকার পর ভেতর থেকে বের করে দেয় শেকড়। সেই শেকড় আস্তে আস্তে প্রবেশ করে মাটির গভীরে। শুষে নেয় কানাচের রস। ভেতরে তার পরিষ্ফুট হতে থাকে নরম কোমল আর এক শাস। একসময় আমরা টের পাই। দা দিয়ে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দুই ভাগ করে ফেলি ওদের। ওরাও বের করে দেয় নারিকেলের ফোপড়ের মত সাদা নরম শাঁস। যারা তালের আঁটির শাঁস খায়নি তারা বুঝবে কিনা সন্দেহ
তালের গজঃ ঐ যে শেকড় থেকে তালের আঁটি বিছিন্ন করা হল, শেকড় কিন্তু মরে না। সে ঠিকই বড় হতে থাকে কানাচের মাটির ভেতর। কিছুদিন পর মাটি ভেদ করে উপরের দিকে মাথা বের করে জানান দেয় তাদের অস্তিত্ব, আমরা বেঁচে আছি। আমরা শাবল হাতে নিয়ে তুলে ফেলি এক হাত লম্বা এবং খানিকটা মোটা এই তালের গজ। এগুলো আসলে তালের কচি চারা। যারা জিনিষটা দেখিনি তাদের জন্য বুঝতে হয়ত কিছুটা সমস্যা হবে। এই তালের কচি চারা এক জায়গাতেই জন্মে অনেকগুলো যেহেতু তালের আঁটিগুলো একজায়গায় গাদা করে রাখাছিল। ওগুলোকে তুলে আগুনে পোড়ালে খাওয়ার উপযোগী হয়। শুধু উপরের আঁশগুলো একটু ছাড়িয়ে নিয়েই খাওয়া হয়। এর যে কি স্বাদ আর গন্ধ আমি কোন কিছুর সাথে তুলনা করতে পারব না। গ্রামে এগুলো ছিল দাদা-দাদীদের কাজ, এই সব বিচিত্র খাবার যোগাড় করা। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ছেলে মেয়েরা কোথায় পাবে তালের গজ? মা-বাবার কি সময় আছে এইসব ছাই-পাশ খাদ্য যোগাড় করার?
হোগলার গুড়ির পাটালীঃ হোগলার গুড়ির পাটালি আর এক বিচিত্র খাবার ছিল আমার ছোট বেলায়। আমাদের বাড়ির পেছনে ছিল বিশাল হোগলা বাগান। আচ্ছা, হোগলা কি এই প্রশ্ন জাগছে? হোগলা হল চ্যাপ্টা এক ধরনের লম্বা ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ যেটা দিয়ে ঘরের বেড়া কিংবা পাটি/মাদুর তৈরি করা হয় (লাশ মোড়াতে এই হোগলার পাটি ও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়)। এই হোগলার যে ফুল বের হয় সেটা অনেক লম্বা কাঠির মত। কাঠির মাথায় থাকে তুলার মত জিনিষ দিয়ে আবৃত একটা লম্বা অংশ যার মাঝে আবার থাকে ছোট একটা গ্যাপ। আমি বোধহয় সুন্দর করে বোঝাতে পারলাম না। আচ্ছা আমরা যদি একটা লম্বা কাঠির মাথায় একহাত জায়গা জুড়ে কিছুটা মোটা করে তুলা জড়াই, এরপর দুই ইঞ্চি ফাঁকা রেখে উপরের দিক আরো একহাত জায়গা জুড়ে তুলা জড়াই তাহলে তা দেখতে হবে হোগলার ফুলের মত। এটাকে ইংরেজিতে বলে ক্যাট-টেইল। এই ফুলের উপরের অংশ কেটে আনা হয় পরিস্পুট অবস্থায়, রেখে দেওয়া হয় রোদে। রোদে এটা আলগা হয়ে তুলো গুলো ছাড়িয়ে যায় এবং এর সাথে মিশ্রিত থাকে হলুদ রংয়ের এক রকম গুড়ো বা গুড়ি। তুলো থেকে এই গুড়ি আলাদা করে এর সাথে সামান্য পানি ও লবন মিশিয়ে পেষ্টের মত বানানো হয়। এটাকে চ্যাপ্টা করে কলার পাতায় মুড়িয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। নিদিষ্ট সময় পর তুলে কলার পাতা ছাড়িয়ে বের করা হয় হোগলার পাটালি। একটু নোনতা-মিষ্টি স্বাদের এই হোগলার গুড়ির পাটালি। এর স্বাদ আর গন্ধ আমার কাছে আজও মনে হয় অমৃতের সমান। আর কোনদিন খেতে পাব না, কোন দিন ও না।
খেজুরের ছাতু/মুঠিঃ খেজুর পেড়ে (আমরা পেড়ে আনতাম) পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে ঢেঁকিতে কোটা হত। আর আগে থেকেই চাল ভাজি করে গুড়ো করে রাখা হত। ঢেঁকিতে কোটার সময় সাথে এই চাল ভাজার গুড়ো দেওয়া হত। খেজুরের আঁটি আলাদা হয়ে যেত এবং আঁটি বাছাই করে শুধু বাকি মন্ডের মত অংশ মুঠি করে করে বানানো হত খেজুরের ছাতু বা মুঠি। খেজুর আছে এখনো কিন্তু ছাতু আর বানানোর সময় নেই, ঢেঁকি ও নেই যে!
ঢ্যাঁপের মুড়িঃ এটাও সবার প্রায় কমন শৈশব খাদ্য। আগের কোন এক পোষ্টে বলেছিলাম এটার কথা। নুতন করে আর কি বলব!
এরকম আরো অনেক কিছুর কথা মনে আসছে, চেষ্টা করলে আরো হয়ত মনে আসবে। কিন্তু অনেক বড় হয়ে যাবে পোষ্ট। এমনিতেই বিরক্তোৎপাদনের মত বড় করে ফেলেছি পোষ্টটি। কোনটার ছবি হাতে নেই, তাহলে ধারাবাহিকভাবেও হয়ত লেখা যেত ছবি সহ। শৈশবের কিছু স্মৃতি শেয়ার করলাম, হয়ত কারো কারো মনে পড়বে সেই দিন গুলোর কথা। আর ফিরে আসবে না দিন গুলো, খেতে পাব না সেই সব বুনো ফল বা খাবারগুলো। আমার অনাগতরা চোখে দেখা দূরে থাক নামও জানবে না হয়ত এসবের। ওরা খাবে "সম্পূর্ণ প্রিজারভেটিভ মুক্ত” লেবেলযুক্ত জুস আর আমাদের নাম না জানা আরো কত কি আধুনিক খাবার!!
(ছবিটা আমারই তোলা দুই বছর আগে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

