টিউব লাইটের নিচে পোকার দল উড়াউড়ি করছে। একটা টিকটিকি উদাস দৃষ্টি মেলে সেদিকে তাকিয়ে আছে। টিকটিকির চোখগুলো নিশ্চয় ছোট ছোট হবে। কোনোদিন দেখা হয়নি। তারপর ও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি সে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে।
আমি নিজেও খুব একটা ভালো নেই। চুপচাপ ল্যাপটপের সামনে বসে আছি। একটা সস্তা প্রেমের গল্প লেখার সুতীব্র ইচ্ছা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। প্রেমের গল্পের সূচনা কেমন হতে পারে?
বৃষ্টি পড়ছিল ঝমঝম করে- কবিতার ছন্দে। সেদিন ছিল ঘোরলাগা পূর্ণিমা। সেই সময় আমি তাকে দেখলাম।
লাইনটি লিখে ব্যাকস্পেস বাটনে দ্রুত চাপ দিয়ে দেই। হচ্ছে না- যতটুকু সস্তা হলে জ্ঞাণী পাঠকেরা দূরে সরিয়ে দিবে অতটুকু সস্তা হচ্ছে না।
টিকটিকিটি আগের জায়গাতেই বসে আছে। পোকাগুলো আগের মতোই উড়ছে । আমার লেখার পেইজ এখনো শূন্য।
অথচ সময় পার হয়ে যাচ্ছে।
কোথা থেকে জানি একটা তেলাপোকা উড়তে শুরু করল। সাথে সাথে সস্তা লাইন মাথায় এসে গেল।
মেয়েটিকে দেখে তমাল আকাশে উড়তে শুরু করল। আর তমালের সাথে সাথে তেলাপোকা আর পোকার দল।
আবার থেমে যেতে হয় । মানুষ যেমন উড়তে পারে না,পোকার ওড়ার সাথেও কোনো কিছুর সাদৃশ্য নেই।তাহলে কী লিখব আমি?
বুঝতে পারি বয়স হয়ে গেছে আমার। ভার্সিটি লাইফে চোখের পলকে কবিতা লিখে ফেলতাম। তখন মূলতঃ প্রেমের কবিতা লিখতাম; হয়ত সেগুলো কবিতা হতো না, ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার মতো আবর্জনা হতো, তবু হৃদয় আবগের কোনো কমতি ছিল না।
বয়স বেড়েছে,আর কবিতা লেখার আগ্রহ দিনদিন কমে গেছে। যারা কবি-তারা জন্ম থেকে কবি। আমি ছিলাম খুব সাধারণ একজন। তাই আমার আর কবি হয়ে ওঠা হয় নি। যতদিন গেছে ধীরে ধীরে পুরোদস্তুর এক লেখক হয়ে ওঠেছি। কোথায় গেলে আমার নাম শুনলে মানুষ সমীহ করে তাকায়; তাদের শ্রদ্ধা মাখানো দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে বলে দেয়- আমি সাধারণ কেউ না।,বিশেষ কেউ।শৈশব-কৈশোর সাধারণ ভাবটা খুব তাড়াতাড়ি কেটে গিয়েছিল।
একের পর এক গল্প-উপন্যাস লিখে চললাম। আজ হঠাৎ করেই মনে হলো- কোনো নিটোল,মিষ্টি,সস্তা প্রেমের উপন্যাস লেখা হয় নি।
দরজায় টোকা দেয়ার শব্দ।
বাবা-তুমি এখানে কী করছ?
ছেলের বিস্মিত প্রশ্ন। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে হতাশ হয়ে চলে গেল।
হতাশ হওয়ার-ই কথা।নিজেই যেখানে নিজেকে নিয়ে হতাশ- ছেলেরাতো হবেই।
কখনো ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খবর নেয়া হয় নি।কি তাদের ভালো লাগে,কি লাগে না- তাও আমার জানা নেই। অথচ আমার গল্পের সংগ্রামী চরিত্রগুলো ভেতরের সব খবর আমার জানা। গল্পের সুন্দরী মেয়েটিকে কি বললে খুশী হবে- আমি তা অবলীলায় বলে দিতে পারি।শুধু পারি না নিজের স্ত্রীর কথা বলতে। ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম।
বিয়ের দু বছরের মাথায় এক মন খারাপ করা দুপুরে আমি যখন গল্পের চরিত্রের চিত্র-অঙ্কনে ব্যস্ত তখন সহধর্মিনী রুমানা এসে বলল, লেখকদের কখনো ভালবাসতে নেই। ওই একবার-ই অভিযোগ করেছিল,আর কোনোদিন টু শব্দ করে নি। আপনমনে সংসারের কাজ করে গেছে।
আজ কয়েক ঘণ্টা আগে যখন রুমানা মারা গেল,প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম- লেখকদের ভালবাসতে নেই। পয়ত্রিশ বছর সংসার করার পর,বুঝতে পারলাম- একটা প্রেমের গল্প আমার লেখা হয় নি,বলা হয় নি।
রুমানা আমার লেখা পড়ে বুঝত না। কিন্তু যখন সমালোচনায় ডুবে ছিলাম,কিছু না বুঝেও পাশে থেকেছিল সে।সবসময়,সারাজীবন।একজন অ-লেখক হয়ে লেখকের সাথে জীবন কাটিয়ে দেয়া যে কত কষ্টের হতে পারে!
কিছুক্ষণ পর তাকে দাফন করা হবে। আমার ছেলে এসে ব্যথাতুর দৃষ্টিতে দেখে গেছে তার বাবা লিখছে। সে তার মা’কে হারিয়েছে আর তার বাবা লিখছে। কিন্তু আমাকে এখন লিখতে হবে একটা সস্তা প্রেমের গল্প। যে গল্পে চরিত্র হিসেবে থাকব আমি নিজেই।যে গল্পে আমি শুধু সস্তা প্রেমের কথা বলে যাব-রুমানাকে,যে গল্পে আমরা জোছনাস্নান করব রাতের পর রাত।
টিকটিকির পাশে আরেকটি টিকটিকি চলে এসেছে। তারা দুজন একসাথে পোকাগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে-সুখী দম্পতি আর পোকাগুলো তাদের কাছে জোছনা। আমি সস্তা গল্প না লিখে টিকটিকির জোছনাস্নান দেখতে থাকি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



