কুষ্টিয়া থাকতে আততীয় বন্ধু যেই ঘুরতে যাইতো তাকেই নিয়া যাইতে হইতো শিলাইদহ। বহুবার গেছি। একা একাও গেছি মেলা। শহরের টেগার লজে গিয়ে অবাক হইতাম যে, এইখানে এসেও জমিদার পুত্র থাকতেন। এই ছোট বাড়িতে। কুঠিবাড়িও ছোট। কেমন যেন কম কম লাগে। রবীন্দ্রনাথ নৌকা-পাল্কি সহযোগে কুষ্টিয়া শহরে যাইতেন টেনিস খেলার জন্য। সেই শহরের কিছু সময় কাটাবার অর্থ আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে কাটাবার মতোই আনন্দময় মনে হয়েছিল। কলেজ জীবনের আগুনের পরশমণি মার্কা রাবিন্দ্রিক আবহে একটু উষ্ণতা জাগতো। জেগে থাকতো। রবীন্দ্রনাথ পড়া হতো। গান শোনা হতো এক সঙ্গীতসেবী বান্ধবীর সৌজন্য ও বদান্যতায়। ঘরে বাইরে নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখাও লিখেছিলাম স্থানীয় পত্রিকায়। এখন ভাবতে গেলেও ভয় ও লজ্জা লাগে। সুমন চট্টোপাধ্যায় তখন বেশ জনিপ্রিয়। প্রাণে গান নাই বলে বুঝি তাই রবি ঠাকুর মূর্তি গড়া। ফলে, আমরা চেয়েছিলাম মূর্তি না গড়ে প্রাণে একটু গান বহাবার। বুঝি, রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতা, মূর্তি গড়া আর বিশদ বিশেষণে কণ্ঠকিত করার জন্য মোক্ষম একটা নাম। তিনি আকাশ ও মাটিকে এক সূত্রে মিলিয়েছেন বললে কিছু বুঝা যায় না। তিনি অমুক তিনি তমুক। তিনি কত কিছু। কিন্তু প্রাণ ভরে না। কারণ প্রাণে সত্যিই কোনো গান নাই আজ।
এ সব উপলদ্ধি অনেক পরের। রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করার কিছু নাই।তাকে আয়ত্ত করার আছে। সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথ পড়ে ওঠাও এক কঠিন ব্যাপার। বিরোধিতা করবো কী? আগে তো পড়ে শুনে বুঝে উঠতে হবে। কিন্তু রবীন্দ্রবাদী রক্ষণশীল বৃদ্ধদের যে বিরোধিতা করতে হবে সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্র ব্যবসায়ীদের কথা সেই কবে ত্রিশের কবিরা বলে গিয়েছিলেন। ব্যবসার অন্ত ঘটে নাই। ব্যবসা প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে আরও।
এবার বাংলাদেশে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালনের বেশ একটা প্রাদুর্ভাব দেখা গেল। পালনের আতিশয্য দেখা গেল। দেশে একদা শ্রী ঠাকুর অস্পৃশ্য ছিলেন। সরকারি প্রচারযতন্ত্রে নিষিদ্ধ আছিলেন। নিষিদ্ধ থাকার কারণে তার গান গাওয়াটাই ছিল একটা প্রতিবাদ। ফলে বাংলাদেশে আমারও পরাণও যাহা চায়.. গাওয়া হতো প্রতিবাদ হিসেবে। প্রতিবাদের রেশ এখনও বহাল। মানে চলিতেছে। কত এমার্জেন্সি গেল, কত সামরিক সরকার এলো, কত গণতন্ত্র চর্চা হলো রবীন্দ্রনাথের নাম সগর্বে তর্পণ করার রীতি তো দেখি নাই। কিন্তু এবার সরকার বেসরকার সবাই রবীন্দ্রাবহে ভাসমান। একেক জনের বক্তিমায় সফেন হয়ে উঠলো ঢাকার আকাশ। সাটেলাইটের মাধ্যমে আকাশও কাঁপলো।
এমন তো পশ্চিমবঙ্গেও ঘটেছে বলে মনে পড়ে না।
সহসা মনে পড়লো, পার্থক্য তো আছেই। সেবার ক্ষমতা দখল হয়েছিল বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম বলে। আর এবার সিভিল সোসাইটি হলেন চালকের নাম ভূমিকায়। এবারের এমার্জেন্সি হলো, সিভিল শ্রেণীর সুসময়ের এর্মাজেন্সি। তাদের রবীন্দ্রনাথ, তাদের পোশাকী সংস্কৃতি, ভাল-মন্দ নিয়ে একটু বাতাস কাঁপবে। আকাশ কাঁপবে। ক্ষতি কী?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

