somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দ্য ম্যান হু লাভড উওমেন অ্যান্ড ওয়াইন

২০ শে নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ২:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাল ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর একটা মুভির কথা ঘুরে ফিরে মনে পড়তেছিল। আমার মোস্ট পছন্দের একটা। যতদূর মনে পড়ে মুভিটা নিয়া সামহোয়ারে লিখছিলামও। মুভি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। এক শাদামাটা মানুষের প্রেম নিয়ে তৈরি মুভিটির শুরু হয় একটা অন্তেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে। একে একে মেয়েরা গাড়ি থেকে নামছে, বাজছে সূচনা সঙ্গীত, ক্রেডিট লাইনগুলো ভেসে যাচ্ছে একে একে। অন্তেষ্টিক্রিয়ায় আসা মেয়েরা নানা রকমরে কেউ বয়স্ক, কেউ কম। কেউ রাফ কেউ কুল। কেউ খুব সেজেগুজে কেউ স্রেফ আটপৌরে পোশাকে। এসে তারা যোগ দিচ্ছেন কফিনের পেছনে চলমান অল্প কয়েক মানুষের ভিড়ে। কফিন কবরে নামানো হলো। ওই মেয়েদের মধ্যে একজন বর্ণনা করতে শুরু করলেন, মৃত ব্যক্তিটির কথা। ফ্লাশব্যাকে জানা গেল, অন্তেষ্টিক্রিয়ায় আসা সব নারী ছিলেন ওই ব্যক্তির প্রেমিকা। তাদের ভালোবাসতেন তিনি। তারা ভালোবাসতেন তাকে। সবাই উপস্থিত হয়েছিলেন তার শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে। পুরো সিনেমা জুড়ে দেখানো হলো এই নারীদের সঙ্গে তার প্রেমের বৈচিত্রপূর্ণ নানা কাহিনী। ত্রুফো যেখানে একেবারে মাত করে দিয়েছেন সেটা বিশেষভাবে বলা দরকার। লোকটির কোনো প্লেবয় ইমেজ তিনি দাঁড় করাননি। কোনো কাউবয় ইমেজও নয়। শাদামাটা এক লোক একের পর এক প্রেমে পড়ছে, লাম্পট্যের ছিটেফোটা নেই তার অ্যাপ্রোচে। সিরিয়াসলি প্রেমেই পড়ে যাচ্ছে স্রেফ। এরকম এক মারেফতি প্রেমের সিনেমার কথাই কাল বেশি করে মনে হচ্ছিল।
না। সঞ্জীবদার প্রেমের খবর আমি জানি না। তার প্রেমিকারা অন্তেষ্টিতে উপস্থিত হয়েছিলেন কি না তাও জানি না। তাকে স্মরণ করতে গিয়ে তার প্রেমের প্রসঙ্গ নিয়ে আসাও হয়তো গর্হিত অপরাধ। তবু মনে পড়েছিল ওই সিনেমার কথা। শুধু এইটুকু জেনে যে, লোকটি নারীদের ভালোবাসতে পেরেছিলেন। তার প্রথম পছন্দ ছিল ওয়াইন। না, ওয়াইন নয় হুইস্কি, বিয়ার। ওয়ার কখনোই পছন্দ করতেন না। কোনো ঝগড়ার আশপাশ দিয়ে হাঁটতেন না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কেউ চাইলেও সঞ্জীবদাকে ঝগড়ায় জড়ানোটাই কঠিন কাজ। উনি থাকতেন মোগমুগ্ধ এক মৌ মৌ গন্ধের মধ্যে, যেন কোনো কিছুতেই লিপ্ত নন, কিন্তু আছি তোদের সঙ্গে এরকম এক ভঙ্গি নিয়ে।
সঞ্জীবদার কথা হবে অথচ মদ খাওয়ার প্রসঙ্গ উঠবে না এটা তো তার জীবিতকালে একটা অসম্ভব ঘটনা ছিল। কিন্তু তিনি মারা গেলেন বলেই কি আমরা রাতারাতি ভুলে গেলাম মাদকতা ও মাদকের প্রতি তার অসম্ভব প্রেমের কথা? মদ খেলেই শুধু সঞ্জীবদার ভেতর থেকে তার ছোট ছোট রাগ, সজনে ফুলের মতো ছোট ছোট অভিমান বের হয়ে আসতো। অন্য সময় সেই লিপ্ত-নির্লিপ্ত সঞ্জীব। উনি বসে বসে থাকলে বোঝা যেত না কখনো আবার কোনো গান ওনার পক্ষে গাওয়া সম্ভব হবে কি না। মনে হতো, কোথাও ভুল হচ্ছে, এই সঞ্জীব সেই সঞ্জীব নয়। উনি নিজেও ভুলে থাকতেন হয়তো। কখনো সেলিব্রেটি কোনো গায়ক-গায়িকার সঙ্গে দেখা হলে মনে হতো সঞ্জীবদাকে তারা আগের জন্মে কোনো ভুলে যাওয়া সঙ্গী মনে করে। আবার টিভিতে হঠাৎ চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সঞ্জীবদাকে দেখা গেলে মনে হতো এই লোকটাই কি আমাদের সঙ্গে কাজ করে? না মনে হয়। আর যদি কাজ করেও থাকে তাহলে হয়তো কাল আর কথা বলবে না। কিন্তু পরদিন একই শাদামাটা সঞ্জীবের দেখা মিলতো। সবাই ভাবতো, সঞ্জীব তার সঙ্গে আছে। অনেকে ভাবতো সঞ্জীব তার সঙ্গে নেই।
সঞ্জীব চৌধুরী আশির দশকের ব্যর্থ গল্পকার। ব্যর্থ কবি। সঞ্জীব চৌধুরী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পরিচিত মুখ। সফল সাংবাদিক। সঞ্জীব চৌধুরী সফল গায়ক। গান নিয়ে তার চিন্তা সফল হয়েছে অনুসৃত হয়েছে। শাহ আবদুল করিমের গান তিনি প্রথম শহরের মানুষের কাছে এনেছিলেন, তাই না? সঞ্জীব চৌধুরী সফল সাংবাদিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক দীর্ঘ হাইবারনেশনে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন নিজের ভেতরের সাংবাদিক সঞ্জীবকে। তার অনেক গান জনপ্রিয় হয়েছে। অনেক শিল্পীর দীর্ঘ জীবনেও এমন ঘটে না। কিন্তু তিনি তো লেগে থেকে গানটাও চালিয়ে যান নি, তাই না?
এরকমই সঞ্জীবদা। সাংবাদিকতার চাকরি চলে গেলে তিনি তো গানই গাইবেন। একটা অ্যালবাম বের হলে আবার চাকরি খুঁজবেন। অন্তহীন টানাপোড়েনের মধ্যে বসে থাকা এক মানুষ সঞ্জীবদা। সফল বললে সফল, অসফল বললে অসফল। সঞ্জীবদাকে সমানা সামনি বললে, উনি টেবিলে তাল ঠুকে কোনো একটা লাইন গাইতেন হয়তো। এইসবে তার কিচ্ছু আসতো যেত না। কিন্তু জীবিত মানুষ একটা জায়গায় তো বাঁধা। টাকা। টাকা মানুষকে ডোন্ট কেয়ার মানুষকে কেয়ারফুল করে দেয়। এইভাবেই পুঁজির সাম্রাজ্য নিরাপদ থাকে।
সঞ্জীবদা মারা যাওয়ার পর আসলেই ওরকম মানুষ আর থাকলো না। যিনি একসময় লিটল ম্যাগাজিন করতেন, দৈনিক পত্রিকায় চাকরি করেন, শিল্প-সাহিত্য বোঝেন আবার গান করেন, গানের জগতে সবাই তাকে মান্য করে, তার গান জনপ্রিয় হয়, মুখে মুখে ফিরতে পারে। এরকম লোক আর কেউ থাকলো না। থাকলো না বলেই তার সাথে হাঁটতে আনন্দ হতো। কথা বলতে আনন্দ হতো। দাদা এখন নাই। আর দেখা তো হবে না। দাদার মতো করে আনন্দ হবে না আর।
সঞ্জীবদা জীবিত থাকা অবস্থায় আমি সত্যিই জানতাম না এত মানুষ তাকে ভালোবাসে। সঞ্জীবদাকে সবাই একা একা আলাদা আলাদা করে ভালোবাসতো। একসাথে শুধু কালকেই ভালোবাসলো। পরিচিত অপরিচিত এত মানুষ দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। একজন একজন করে মানুষ মিলিয়ে এত মানুষ তবে জমে উঠতে পারে!
মদের গল্প হবে অথচ সঞ্জীবদার কথা উঠবে না? বারে গেলে এবার বারে বারে দাদার কথাই মনে পড়বে। মদ খাওয়া খারাপ কিছু না। প্রেম করাও খারাপ কিছু না। যাদের মনে এ নিয়ে খারাপ কথা উঁকি দেয় তাদেরই উচিত নিজেদের চিন্তা শোধরানো।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০০৭ দুপুর ২:২৬
৩৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×