somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হারানো সময়ের সন্ধানে ফরাশি সংস্কৃতি

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দিন ছোট হয়ে আসে। ঠাণ্ডা বাতাস খসিয়ে দিতে থাকে গাছের পাতা। কোনো কোনো সকালে উঠানে দেখা দেয় কুয়াশা। ফ্রান্স জুড়ে শুরু হয় নতুন একটা কিছুর। ২০০৭ সালে কোন ফসল উঠলো ফ্রান্সের ঘরে। অন্তত ৭২৭টি উপন্যাস, শত শত নতুন মিউজিক অ্যালবাম, ডজন ডজন নতুন মুভি, বড় বড় মিউজিয়ামে কেতাদুরস্ত একজিবিশন, ঝাকালো হলগুলোতে টাটকা কনসার্ট, অপেরা, নাটক, বড় শহরগুলোতে মেলা। হেমন্ত মানে অনেক দেশেই অনেক কিছু। কিন্তু ফ্রান্সে হেমন্ত মানে নতুন এ সাংস্কৃতিক বছরের শুরু।
আর কেউই সংস্কৃতিকে ফ্রেঞ্চদের মতো এতো সিরিয়াসলি দেখে না। তারা সাবসিডি দিয়ে, কোটা সংরক্ষণ করে একে সমর্থন যোগায়। ফ্রেঞ্চ মিডিয়া প্রচুর প্রচার সময় ও পত্রিকা প্রচুর কলাম ইঞ্চি ব্যয় করে। এমনকি ফ্যাশন ম্যাগাজিনগুলোতেও সিরিয়াস বুক রিভিউ প্রকাশিত হয়। গত নভেম্বরে প্রিক্স গনকর্ট ঘোষণার পর সারা দেশের সংবাদপত্রের শীর্ষ খবর ছিল এটি। এ সাহিত্য পুরস্কারটি ৯০০ ফ্রেঞ্চ সাহিত্য পুরস্কারের একটি। ছোট-বড় যে কোনো ফ্রেঞ্চ শহরেরই নিজস্ব বার্ষিক অপেরা বা নাট্য উৎসব আছে। প্রত্যেক চার্চেই সপ্তাহ শেষে সঙ্গীত আসর বসে।
সমস্যা একটাই। ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক অরণ্যে যে বড় বড় গাছ জন্মাচ্ছে বৃহত্তর পৃথিবীতে তার কদর সামান্যই। একদা এর লেখক শিল্পী পেইন্টারদের বিশ্ব জোড়া প্রভাব ছিল বটে কিন্তু এখনকার বিশ্বায়িত সাংস্কৃতিক বাজারে ফ্রান্স হলো ক্ষীয়মাণ শক্তি। এখন অবশ্য এটা একটা আলোচনার বিষয়। কারণ ফ্রান্সের শক্তিমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি এখন হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু তিনি যদি সংস্কৃতির প্রসঙ্গে আসেন তবে হয়তো তাকে নিজের কাজকে কাটছাট করে আনতে হবে।
এ মৌসুমে যতো উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিই হয়তো ফ্রান্সের বাইরে প্রকাশক পেতো। এখানে বছরে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা ৩০% বই বিক্রি হয়। একই হিসাব জার্মানিতেও। কিন্তু গত এক দশকে সেখানে ইংরেজি থেকে অনূদিত বইয়ের সংখ্যা কমে এসেছে। কিন্তু ফ্রান্সে সেটা বাড়ছে ক্রমাগত। ফ্রান্সের প্রথমদিকের প্রজন্মের লেখক মলিয়ের, হিউগো, বালজাক, ফ্লবেয়ার, প্রুস্ত, সার্ত্রে, কামু, মার্লো কখনোই বাইরের পাঠকের দৃষ্টির বাইরে থাকেননি। তাদের এক ডজন নোবেল লরিয়েট আছেন, যে সংখ্যা অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। যদিও শেষ যিনি নোবেল পেয়েছেন তার নাম গাও জিনজিয়ান। আর তিনি লেখেন চায়নিজ ভাষায়।
ফ্রান্সে মুভি ইন্ডাস্ট্রি ১৯৬০-এর দশকের কৃতিত্বকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ব্যস্ত। তখন ফ্রাসোয়া ত্রুফো ও জা লুক গদারের মতো ডিরেক্টররা সিনেমার ব্যাকরণকে নতুনভাবে লিখতে শুরু করেছিলেন তাদের নিউ ওয়েভ আন্দোলনের মাধ্যমে। ফ্রান্সে এখনো বছরে ২০০ মুভি তৈরি হয়, ইওরোপের যে কোনো দেশের চেয়ে এ সংখ্যা বেশি। কিন্তু বেশির ভাগ ফ্রেঞ্চ মুভিই সাদামাটা, অল্প বাজেটে তৈরি আর তৈরি হয় স্রেফ অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্যই। ফ্রান্সে যতো মুভির টিকেট বিক্রি হয় তার অর্ধেকটাই যায় আমেরিকান সিনেমার পকেটে। পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের দৌড় হাতে গোনা।
ইম্প্রেশনিজম, সাররিয়ালিজম সহ অনেকে ইজমের জন্মদাতা প্যারিসে শিল্পকর্মের বাজার অন্তত বাণিজ্যিক দিক থেকে হলেও নিউ ইয়র্ক ও লন্ডনের চেয়ে পিছিয়ে। বেচা বিক্রি কম। জার্মান ম্যাগাজিন ক্যাপিটালের জরিপ অনুসারে, আমেরিকা ও জার্মানিতে এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রচারিত ১০ জন শিল্পীর মধ্যে চারজন করে আটজনের বাস। অথচ ফ্রান্সে তাদের একজনও থাকেন না।
ফ্রান্সের অবশ্যই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কমপোজার ও সঙ্গীতকার আছে কিন্তু তারা ২০ শতকের খ্যাতিমান সঙ্গীতকার ডেবুজি, সাতি, র‌্যাভেল ও মিলহাউদের সমকক্ষ নন। ফ্রান্সের শার্ল ত্রেনে, শার্ল আজনাভর ও এডিথ পিয়াফ এককালে সারা পৃথিবীতে শোনা হতো। এখন আমেরিকা ও বৃটেন পপ মিউজিক শাসন করে। ফ্রান্সের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি গত বছর ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করলেও এর প্রায় সবটাই অভ্যন্তরীণ বাজারের হিসাব। খুব কম শিল্পীই ফ্রান্সের বাইরে পরিচিত।
আছে আরো কিছু বিষয়। ফ্রান্স নিজেকে অন্যদের সভ্যকরণের জন্য নিয়োগ দিয়েছে যাতে নিজেদের মিত্র ও উপনিবেশ গড়ে তোলা যায়। এমনকি ২০০৫-এ সরকার ফ্রেঞ্চ স্কুলগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে তারা যেন ফ্রান্সের উপনিবেশবাদকে, অসভ্যদের সভ্য করার উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে না পড়ায়। অন্য দেশগুলোর মতো এ অষ্টাদশ শতকীয় প্রবণতা নিয়ে ফ্রান্স মোটেও লজ্জিত নয়। সারকোজি অনেকটা গর্বের সঙ্গেই এ ধরনের মত প্রকাশ করে থাকেন। অনেক ফ্রেঞ্চই মনে করেন কয়েকটা ঐতিহাসিক ঘটনা থেকেই তাদের সাংস্কৃতিক অধঃপতনের সূচনা ঘটেছে। ১৯৪০-এর লজ্জাজনক জার্মান অনুপ্রবেশ ও দখল, ১৯৫৪’র বিভেদে সৃষ্টিকারী এলজেরিয়ান ওয়ার, এবং ১৯৬৮’র বিপ্লবের বছর। ১৯৬৮ থেকেই মূলত সারকোজির মতো রক্ষণশীলদের উত্থান শুরু হয়।
মান অবশ্যই সংস্কৃতির সংজ্ঞায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কৃষি কাজের মতো সংস্কৃতি বা কৃষ্টি ক্রমবর্ধমান বিষয়কে বোঝায়। চিত্রকলা, সঙ্গীত, কবিতার মতো উচ্চমার্গীয় সংস্কৃতিক চর্চা উচ্চমার্গীয় বা এলিট উপাদান। আধুনিক সময়ে নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিকরা সংস্কৃতি ধারণাটি বৃহত্তর পরিসর এনেছেন নিম্নমার্গীয় সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে জনসাধারণের আগ্রহের বিষয়, জাতি প্রসঙ্গ, কবর প্রথাসহ অন্য সব ব্যবহারিক অনুষঙ্গ। ফ্রান্সে সরকার জিডিপির ১.৫ শতাংশ বৃহত্তর অর্থে সাংস্কৃতিক কাজে ও বিনোদন খাতে ব্যয় করে। এ খাতে জার্মানিতে ব্যয় ০.৭%, বৃটেনে ০.৫%, আমেরিকায় ০.৩%। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ১১ হাজার ২০০ কর্মীবাহিনী নিয়ে এ অর্থ ব্যয় করে উচ্চমার্গীয় সংস্কৃতি চর্চায় : মিউজিয়াম, অপেরা হাউস ও নাট্য উৎসবে। ১৯৮০-র দশকে মন্ত্রণালয় একজন রক অ্যান্ড রোল মন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছিল যাতে অ্যাংলো-স্যাক্সন প্রভাবের বিরুদ্ধে টিকে থাকা যায়। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়ে গেছে।
ফ্রান্স কিভাবে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে, এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে। কেউ বলছেন স্কুল পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে আনতে হবে। কেউ বলছেন, সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে সংস্কৃতিকে মুক্ত করতে হবে। ফ্রান্সে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পাবলিক সেক্টরের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আনতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে মানসিকতা পরিবর্তনের প্রস্তাবও উঠছে। ফ্রান্সের নতুন জেনারেশন সরকারি কাজের চেয়ে ব্যবসায় ক্যারিয়ার গড়ার কথা চিন্তা করছে। মতপার্থক্যের তফাত বোঝাতে কুয়েমিন বলেন, ‘আর্টিস্ট যদি ব্যবসা সফল হয় তাহলে আমেরিকানরা মনে করে তিনি অবশ্যই ভালো হবেন। আর আমরা ভাবি আর্টিস্ট সফল হওয়া মানে তিনি কমার্শিয়াল। সফলতা খারাপ রুচির পরিচায়ক।’
এতো কিছুর পর ফ্রান্সে নিত্য নতুন শিল্পীর আগমন ঘটছে। এ দেশে সহজেই আর্টিস্টরা থাকতে পারেন, আশ্রয় পান। ফলে এখানে বহু জাতির সমাবেশ ঘটছে। বহু জাতির শিল্পের সমাবেশ ঘটছে। গত কয়েক দশকের অন্যান্য দেশের শিল্পীরা ফ্রান্সে অনেক বেশি কদর পাচ্ছেন। এতে হয়তো যাকে ফ্রেঞ্চ সংস্কৃতি বলা হয় সেই সংরক্ষিত বিষয়টি থাকছে না। কিন্তু ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন ধারা যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে একে একটা মোক্ষম রাস্তা বলে অনেকেই মত পোষণ করেন।

২১ নভেম্বরের টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ডন মরিসনের লেখা থেকে
অনুবাদ : মাহবুব মোর্শেদ
২৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×