ডরিস লেসিংয়ের জন্ম ১৯১৯ সালের ২২ অক্টোবর। তৎকালীন পারস্য অর্থাৎ বর্তমান ইরানের কেরমানশাহতে। তার বাবা ক্যাপ্টেন আলফ্রেড টেলর ও মা এমিলি মড টেলর দুজনই বৃটিশ। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে অংশগ্রহণের এক পর্যায়ে তার বাবা ব্যাংকের কাজের সূত্রে ইরান যান। সেখানেই লেসিংয়ের জন্ম হয়। পরে আফ্রিকার রডেশিয়াতে যান সপরিবারে।
সেখানে লেসিংয়ের শৈশব কাটে।
ডরিসের কাজকে মুখ্যত তিন ভাগে ভাগ করা হয় : কমিউনিস্ট থিম, সাইকোলজিকাল থিম ও সুফি থিম। ১৯৪৯ সালে লেসিংয়ের প্রথম উপন্যাস দি গ্রাস ইজ সিংগিং প্রকাশিত হয়। ১৯৬২ সালে তার সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস দি গোল্ডেন নোটবুক প্রকাশিত হয়। নারীর অন্তর্গত অভিজ্ঞতা ও যৌন পরিচয় নিয়ে লেখা উপন্যাসটিকে একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার অন্যান্য আলোচিত কাজ সিকাস্তা (১৯৭৯), দি মেকিং অফ দি রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর দি প্লানেট এইট (১৯৮২) ও দি গুড টেররিস্ট (১৯৮৫)।
# অন নট উইনিং দি নোবেল প্রাইজ #
আমি দাড়িয়ে আছি একটি দরজায়। তাকিয়েছি উড়ন্ত ধুলার মেঘের ভেতর দিয়ে। কারণ আমাকে বলা হয়েছিল, এখনো ওইখানে আস্ত একটা বন রয়ে গেছে। গতকাল আমি মাইলের পর মাইল রাস্তা গাড়ি চালিয়ে এসেছি। চারদিকে শুধু কাটা পড়া গাছের গুড়ি, পুড়ে খাক হওয়া গাছের অবশেষ। এ জায়গাতেই ১৯৫৬ সালে আমি সুন্দরতম অরণ্য দেখেছিলাম। সব ধ্বংস হয়ে গেছে। লোকের খাবার লাগে, তারা আগুন জ্বালাবার কাঠ সংগ্রহ করেছে।
এটা আশির দশকের উত্তর-পশ্চিম জিম্বাবুয়ের ঘটনা। আমি এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বন্ধুটি লন্ডনে এক স্কুলে পড়াতো। তিনি এখানে গেছেন ‘আফ্রিকাকে সহায়তা করতে’, এভাবেই বলি আমরা। তিনি আদর্শবাদী সজ্জন ব্যক্তি, এখানকার স্কুলে এসে তিনি যা দেখলেন, তাতে ভীষণ আহত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। এ অবস্থা থেকে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো খুব কঠিন। স্বাধীনতার পর তৈরি হওয়া অন্য স্কুলগুলোর মতো ছিল এ স্কুলটিও। পাশাপাশি চারটি ইটের ঘর, পুরো ধুলার মধ্যে রাখা, এক দুই তিন চার, শেষ মাথায় একটা অর্ধেক রুমÑ এটাই লাইব্রেরি। কাসরুমে ব্ল্যাকবোর্ড ছিল, কিন্তু বন্ধু চক রাখতো পকেটে। নইলে চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কাসরুমে নেই কোনো ম্যাপ, কোনো গ্লোব, কোনো পাঠ্যবই, কোনো অনুশীলন বই, লাইব্রেরিতে নেই শিক্ষার্থীদের পড়ার মতো কোনো বই। আছে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলো থেকে দেয়া মোটা মোটা বই, যেগুলো বহন করাও কঠিন। সাদাদের লাইব্রেরি থেকে বাতিল করা বই। গোয়েন্দা কাহিনী। যেগুলোর নাম হয়তো উইকএন্ড ইন প্যারিস বা ফেলিসিটি ফাইন্ডস লাভ।
একটি ছাগল হলদে ঘাস থেকে খাবার খুজে নেয়ার চেষ্টা করছে। হেডমাস্টার স্কুল ফান্ড তসরুপ করে চাকরি হারিয়েছেন। এখানে আমাদের সবার মনে একই প্রশ্ন জাগে : কিভাবে একজন মানুষ এ রকম আচরণ করতে পারে, যেখানে তিনি জানেন সবার চোখ তার দিকেই?
আমার বন্ধুর তেমন পয়সাপাতি ছিল না। কারণ যখনই সে বেতন পেতো তখনই ছাত্র-শিক্ষক সবাই ধার চেয়ে নিতো। সেগুলো হয়তো কখনো ফেরত আসবে না। শিক্ষার্থীদের বয়স ৬ থেকে ২৬। যারা আগে পড়ালেখা করতে পারেনি তারা এখন সেটা করে নিতে আগ্রহী। পথে বৃষ্টি হোক কি রোদ, কিছু শিক্ষার্থী প্রতি সকালে মাইলের পর মাইল পথ হাটে, নদী পার হয়ে আসে। তারা হোমওয়ার্ক করতে পারে না। কারণ গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। একটা জ্বলন্ত কাঠের আলোয় পড়াশোনা করা কঠিন। বাড়িতে ফিরে মেয়েদের পানি আনতে হয়, রান্না-বান্না করতে হয়। এ কাজ সারতে হয় স্কুলে যাওয়ার আগেও।
বন্ধুর রুমে আমার বসে থাকার সময় লোকজন লজ্জা সহকারে ভেতরে আসছিল। তাদের প্রত্যেকে বই চাইলো। একজন বললো, ‘আপনি লন্ডনে গেলে আমাদের জন্য বই পাঠাবেন। ওরা আমাদের পড়তে শিখিয়েছে কিন্তু আমাদের পড়ার কোনো বই নেই।’ যার সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে প্রত্যেকে বই চেয়েছে।
আমি ওখানে কিছু দিন ছিলাম। ধুলা উড়ে যাচ্ছিল, পানি কমে আসছিল। পাম্পগুলো ভেঙে গেছে। মেয়েরা আবার নদী থেকে পানি আনছিল। লন্ডন থেকে যাওয়া আরেক আদর্শবাদী শিক্ষক কাকে স্কুল বলে এটা দেখেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। একদিন শিক্ষা পর্বের শেষ দিনে একটা ছাগল জবাই করা হলো। সেটা কেটে বড় একটা পাতিলে ওঠানো হলো রান্নার জন্য। এটাই হলো শিক্ষা পর্ব শেষ করার একটা রেওয়াজ। একটা সেদ্ধ ছাগলের মাংস আর পরিজ সহকারে ভোজ আয়োজন। এ উৎসব যখন চলছিল তখন আমি আবার গাড়িতে করে সেই কাটা গাছের গুড়ি আর পুড়ে যাওয়া বনের মধ্য দিয়ে ফিরছিলাম।
আমার মনে হয় না, এ স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী পুরস্কার পাবে।
পরের একদিন আমি গিয়েছিলাম উত্তর লন্ডনের নামী এক স্কুলে। স্কুলের নামটা বেশ পরিচিত। ছেলেদের স্কুল। সুন্দর বিল্ডিং, বাগান ঘেরা।
প্রত্যেক সপ্তাহে এখানে নামিদামি ব্যক্তিরা সফরে আসেন। আর এটা হতেই পারে যে এদের অনেকের বাবা, আত্মীয় এমনকি মা-ই সেই সেলিব্রেটি। ফলে নামিদামি কোনো ব্যক্তির সফর কোনো বড় ঘটনা নয় তাদের কাছে।
ধুলায় ধূসর উত্তর জিম্বাবুয়ের সেই স্কুলের কথা আমার মনে ছিল। আমি এ মৃদু চাহিদার মুখগুলোর দিকে তাকালাম। তাদের বলার চেষ্টা করলাম, গত সপ্তাহে জিম্বাবুয়েতে আমি কি দেখেছি। বইপত্র, পাঠ্য বই, অ্যাটলাস এমনকি দেয়ালে সাটা একটি ম্যাপবিহীন কাসরুম। সেখানকার শিক্ষকরা কিভাবে শিক্ষা দিতে হয় তা শিখতে বই চেয়ে পাঠায়, ১৮-১৯ বছরের শিক্ষার্থীরা বই ভিক্ষা করে। আমি এ ছেলেদের বললাম, সেখানকার সবাই বই ভিক্ষা চায়। বলে, ‘আমাদের জন্য বই পাঠান।’ আমি নিশ্চিত, কথা বলার সময় আমি যে মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি সেগুলো শূন্য, অভিব্যক্তিহীন। আমি কি বলছি শ্রোতারা তা শুনতে পাচ্ছে না। যে বিষয়ে বলা হচ্ছে তার কোনো ছবিই তাদের মনে উকি দিচ্ছে না। এখানে সে ছবিটা হলো : ধুলার মেঘের ভেতর এক স্কুল। যেখানে পানি কমে আসছে। শিক্ষা পর্ব শেষে একটা ছাগল জবাই করে বড় পাতিলে রান্না করার মাধ্যমে শেষ হয় একটি টার্মের।
এ তীব্র দারিদ্র্য বোঝা কি তাদের জন্য সত্যিই খুব কঠিন?
আমি বেশ চেষ্টা করলাম। তারা বেশ ভদ্র।
আমি নিশ্চিত, এ দলে অনেকেই আছে যারা পুরস্কৃত হবে।
কথা শেষে আমি শিক্ষকদের সঙ্গে বসলাম, যা আমি সবসময় করি। শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করলাম, লাইব্রেরিটা কেমন, ছাত্ররা পড়ে কি না। এখানে এ উন্নত স্কুলে আমি যা শুনলাম তা সব স্কুলেই শুনি। এমনকি কোনো ইউনিভার্সিটিতে গেলেও একই কথা শুনতে হয়। ‘আপনি তো জানেনই, অনেক ছেলে কখনো পড়ে না। লাইব্রেরির অর্ধেকটা অব্যবহৃত পড়ে থাকে। আপনি তো জানেন ব্যাপারটা।’ হ্যা, আমরা জানি ব্যাপারটা কেমন। সবাই জানি।
আমরা এমন এক ভগ্ন সংস্কৃতির মধ্যে আছি যেখানে কয়েক দশক আগেও আমাদের নিশ্চয়তা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে তরুণ-তরুণীরা কয়েক বছরের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে দুনিয়া সম্পর্কে কিছু না জেনেই, কোনো কিছু না পড়েই। শুধু কমপিউটারের মতো কিছু বিশেষ বিষয়ে তারা দক্ষতাটুকুই অর্জন করে।
এ অভূতপূর্ব আবিষ্কারে, এ বিপ্লবে, এ টিভি কমপিউটার আর ইন্টারনেটে আমাদের কি হয়েছে। মানব জাতির জন্য এটাই প্রথম কোনো বিপ্লব নয়। ছাপাখানার বিপ্লব ছিল, যেটা শুধু কয়েক দশকের ব্যাপার ছিল না। বরং এটা ছিল আরো অনেক বেশি সময় দীর্ঘ। এটা আমাদের মানসিকতা আর চিন্তার পদ্ধতিকে পরিবর্তিত করে দিয়েছে। যেমনটা আমরা সবসময় করি, কোনো প্রশ্ন না করে আমরা এর সব কিছুই গ্রহণ করেছি। বলিনি, ‘ছাপা কাগজের আবিষ্কারের পর আমাদের কি হতে যাচ্ছে?’ যেমন করে এখন আমরা একটু দাড়িয়ে এ প্রশ্ন করার অবসর বের করতে পারছি না ইন্টারনেটের সঙ্গে কেমন আছি আমরা, আমাদের মন? ইন্টারনেট একটা পুরো জেনারেশনকে এর অনন্ত পরিসরের মধ্যে টেনে নিয়েছে। এমনভাবে এটি কাজ করে, খুব দায়িত্বশীল ব্যক্তিও স্বীকার করবেন একবার এর সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লে বের হয়ে আসা খুব কঠিন। তারা হয়তো ব্লগিং-ব্লাগিং করেই পুরো একটা দিন খুইয়ে বসেন।
কিছুদিন আগেও যে কেউ, এমনকি কোনো অল্প শিক্ষিত ব্যক্তিও বিদ্যা অর্জন, শিক্ষা ও আমাদের মহৎ সাহিত্য সংগ্রহ ইত্যাদির প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করতো। আমাদের এটা অবশ্যই জানা, এ অবস্থা যখন ছিল তখন সবাই পড়ার ভান করতো, বিদ্যা অর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করার ভান করতো। এমন প্রমাণও আছে, খেটে খাওয়া মানুষও বইয়ের জন্য ভালোবাসা দেখাতো। আঠারো ও ঊনিশ শতকের খেটে খাওয়া মানুষের লাইব্রেরি, প্রতিষ্ঠান ও কলেজগুলোতে এর প্রমাণ মিলবে।
বই পড়া ছিল সাধারণ শিক্ষার অঙ্গ। বুড়ো লোকেরা নতুনদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অবশ্যই বুঝতে পারেন বই পড়াটা কি রকম একটা শিক্ষা ছিল। নতুনরা এতোই কম জানে। বাচ্চা যদি পড়তে না পারে, তার মানে এই দাড়ায় যে তারা পড়েইনি।
আমরা সবাই এ করুণ কাহিনী জানি। কিন্তু এর শেষ কোথায় তা আমরা জানি না। আমরা এ পুরনো প্রবাদটা শুনেছি, ‘বই একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ করে তোলে’, আবার বেশি শুনে ভুলেও গিয়েছি। বই পড়লে মানুষ তথ্য জ্ঞান পায়, ইতিহাসসহ সব ধরনের জ্ঞান লাভ করে।
কিন্তু আমরাই পৃথিবীতে শুধু মানুষ নই। অনেক আগে আমার এক বন্ধু জিম্বাবুয়ে থেকে আমাকে ফোন করেছিল। তারা যেখানে ছিল সেখানকার লোকেরা তিন দিন ধরে খাবার পাচ্ছিল না। কিন্তু তারা কথা বলছিল বই ও শিক্ষা নিয়ে। কিভাবে বই পাওয়া যায় তা নিয়ে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

