'বিএনপির সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেল।' কথাটা আমার নয়, এক প্রতিথযশা সাংবাদিকের। ১১ জানুয়ারির পর যখন গুদামে তালা পড়তে থাকলো। কেউকেটারা গ্রেফতার হলো, কেউ পালিয়ে বাঁচলো। বাগানবাড়ি, মিনি চিড়িয়াখানায় চোরাগোপ্তা হামলা চলতে থাকলো। রাস্তায় বাঘ, বানর, ময়ূর সাপ পাওয়া যেতে থাকলো। সিটি কর্পোরেশনের ভাংচুর অভিযানে ব্যবসায়ীরা ভয়ে অস্থির হতে থাকলো। দুর্নীতি বিরোধী, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাপন্থী, সুশীল সমাজ মুর্হূমুহু সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে জানিয়ে দিতে থাকলেন আমরা আছি। আমরা আছি।
গল্পটা অনেক মজার। শাসকদের একটা ট্রেন যাচ্ছিল বাংলাদেশের হৃদয়ের মধ্য দিয়ে। ট্রেন চলছে। কিন্তু হঠাৎ সুশীল সমাজ খেয়াল করলো, ট্রেনটা লাইন দিয়ে চলছে না। অন্যায়, অবিচারের মধ্য দিয়ে ট্রেনটা চললে দেশ শেষ হয়ে যাবে। সুশীল সমাজের সেমিনারে ব্যাপারটা নিয়ে অনেক কথা বার্তা হলো। ট্রেন শূন্য দিয়ে চলছে নাকি, থেমে গেছে, নাকি পুকুরে পড়ে গেছে? কেউ বললো না ট্রেনটা কোথায়। কিন্তু ট্রেনটাকে তুলতে হবে, এটা তখন সবার দাবি। কিন্তু সুশীল সমাজ আর তাদের পলিসি সংগঠনগুলো তো আর নিজেরা ট্রেন তোলার ক্রেন আনতে পারবে না। তাই তারা যাদের সাহায্যে চলে তাদের কাছে গেল। আন্ডার সেক্রেটারিরাও বললো ট্রেন তো লাইনে নাই। অতএব ট্রেনকে লাইনে তুলতে হবে। পত্রিকাগুলো বললো, হ্যা ট্রেনকে এবার লাইনে তুলতে হবে। ব্যবসায়ী নেতারা বললো, ট্রেন টেনে না তুললে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। সমগ্র শাসক শ্রেণী যখন একমত হলো তখনই ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্রেন এসে সেই অবাক, আশ্চর্য, ভার্চুয়াল ট্রেনটাকে লাইনে তুললো। অন্তত দাবি করা হলো, পিসি সরকারের সেই জাদুর ট্রেনটা লাইনে উঠেছে। সবাই প্রশ্ন করলো, তাইলে ভেঁপু বাজে না কেন? ধাড়াক ধড়াক আওয়াজ পাওয়া যায় না কেন? সিঁটি বাজে না কেন? বলা হলো, ড্রাইভার নেই। দুর্নীতিবাজ ড্রাইভাররা সব জেলে তাই শাসনের ট্রেন আর স্টার্ট করা যাচ্ছে না। একে একে অনেকেই ড্রাইভার সাজতে চাইলো। কিন্তু কেউ শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স পেল না। নোবেল লরিয়েট থেকে ভাঁড় পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করলো। কেউ পারলো না। আজ পর্যন্ত ড্রাইভার পাওয়া গেল না। তাই সামনে অনিশ্চিয়তা। ড্রাইভার না পাওয়া গেলে ক্রেন দিয়ে গুন টেনে ট্রেন চালানো হবে কি না?
ট্রেনের গল্পটা ভালই চলছিল। কিন্তু লাইনের গল্প শুরু হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র থাপ্পড় খাওয়ার পর। সেই এক থাপ্পড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ। দুই দিনের মাথায় সরকারের যাই যাই পরিস্থিতি। পুরো ব্যাপারটার কথা মনে হলে, একটা ফিকশন মনে হয়। পাঁচ মাস চলে গেল। গ্রেফতার হওয়া ছাত্র-শিক্ষকরা এইটা প্রমাণ করে বের হলেন যে, সরকারের একমাত্র অর্জন অর্থাৎ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও এখন স্রেফ লোক দেখানো ব্যাপার। লাইনের কথা আবার আলোচনা হলো, প্রত্নসম্পদ পাচারের ঘটনা থেকে। বেহেশতী সুশীলদের প্রতিনিধিরাও যে পাপ করতে পারেন। তাও দেখা গেল। তারপর এলো, দ্রব্যমূল্য। চাইলের চাইলে চারজন উপদেষ্টা কুপোকাত। লাইনে যে ট্রেন নাই সেইটা বোঝা যাচ্ছে। লাইন থাকলে না দেখা যাবে ট্রেন কোথায় থাকার কথা।
যে রাতে উপদেষ্টারা পদত্যাগ করলেন সে রাতে এক বন্ধুকে ফোন করেছে সুশীল সমাজের এক প্রতিনিধি। বন্ধু বললো, স্যার আপনে এখনও ফোন বন্ধ করেন নাই? স্যার বললেন ক্যান? বন্ধু বললো, উপদেষ্টা হতে না চাইলে এখনি ফোন বন্ধ করে ঘরের লাইট নিবিয়ে শুয়ে থাকেন। একদা কত কত সুশীল সমাজে চারদিক মুখরিত ছিল। টিভিতে চেহারা মোবারক দেখে কতজনাই পলিসি দিতেন। অথচ সরকার এখন নাকি উপদেষ্টাই পায় না। একদা আমরা ভাবতাম, নুতন ধরনের এই শাসনে সুশীল সমাজের সাজানো গোছানো পলিসির বাগানের ভেতর দিয়ে যাবে সেই ভার্চুয়াল, আশ্চর্য ট্রেন। নাগরিকরা যে ট্রেন কোনোদিন দেখেনি। শুধু একটা ট্রেন আছে বলে শুনছে। সেই ট্রেন লাইন থেকে পড়ে যাচ্ছে। উঠছে। আহ, এখন গাড়ি চলে না, চলে না চলে না রে।
থাইল্যান্ডেও নাকি এইরকম হইছিল। সুশীল সমাজ এইরকম সক্রিয় হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে কী হয়েছে সবাই জানেন।
এখন বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলে আর সুশীল সমাজের প্রতিনিধি তেমন দেখা যায় না। মাঝে মাঝে এলেও গলায় তেমন জোর নাই। তারা এখন কী বলেন সেইটা তারাও বোঝেন কি না বোঝা যায় না। টকশোগুলোকে এখন অ্যাবসার্ড নাটকের মহড়া মনে হয়। মাঝে মাঝে কিছু রাগী মানুষ এসে বাতাস গরম করে যান। ব্যস। এর বাইরে যারা আছেন সেই পলিটিকাল টাউটদের কথা শুনলে ট্রেনের নিচে মাথা দিতে ইচ্ছা করে। আমাদের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক আশ্চর্য ট্রেন। আসুন লাইনে মাথা পেতে দেই। যদি কখনো চালু হয় তবে অন্তত মাথাটা তো কাটা পড়বে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

