কলেজ ম্যাগাজিন এখন প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য। দেশে বড় বড় কলেজ আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন সেখানে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সাধারণভাবেই আশা করা যায়, এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে মুখরিত হবে কলেজগুলোর ক্যাম্পাস। ভবিষ্যতের জন্য তারা নিজেকে প্রস্তুত করবে। কিন্তু কয়েক দশক ধরে দলীয় রাজনীতির অনুসরণ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আর কোনো কর্মকা-ের খবর তেমন একটা নজরে আসেনি। এখনো আসে না তেমন।
কলেজগুলোতে কলেজ সংসদের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে মাসিক ফি নেয়ার রীতি সেই আগের মতোই আছে। কিন্তু খুব কম কলেজেই সংসদ নির্বাচন হয় বা নির্বাচিত হলেও সংসদগুলো ঠিকঠাক মতো কাজকর্ম করে। অথচ যে গণতন্ত্রের জন্য আমাদের এতো হাহাকার তার প্রাথমিক চর্চাটা কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতে পারতো এ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই। কলেজ সংসদ, কলেজ সংসদের কার্যকারিতা নেই বলেই হয়তো আগের মতো করে কলেজগুলো থেকে সাময়িকী বা বার্ষিক সাহিত্য আয়োজন আর দেখা যায় না।
শুধু কলেজ কেন দেশের বড় ইউনিভার্সিটিগুলো থেকেও আর শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বড় বার্ষিকী বা সাময়িকীর আয়োজন দেখা যায় না। কারণ ইউনিভার্সিটির ছাত্র সংসদগুলো বহু দিন ধরেই অকার্যকর। নির্বাচন নেই। সংসদ নেই। তাই কর্মকাণ্ডও নেই।
এ রকম একটি পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই কোনো কলেজের ঢাউস ও সমৃদ্ধ সাময়িকী হাতে এলে বেশ অবাক হতে হয়। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজ অর্থাৎ এমসি কলেজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কলেজ বার্ষিকী পূর্বাশা। উদ্যোগ নিলেই যে হারানো একটি ঐতিহ্যকে নতুন করে ফিরে পাওয়া সম্ভব সেটাই প্রমাণিত হলো এ সাময়িকীতে।
উদ্যোক্তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষের সমর্থন ছাড়া এ ধরনের সাময়িকী প্রকাশিত হওয়া অসম্ভব কাজ। পাশাপাশি মানসম্মত কাজের জন্য দরকার কাজের মানুষ। সুখের কথা, এ সাময়িকী সম্পাদনায় দুই বা ততোধিক শিক্ষক জড়িত ছিলেন যারা দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও কবি। নিজেদের লেখালেখির বাইরে তারা এমন একটি কাজের জন্য সময় ব্যয় করেছেন যা কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য বিপুল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পূর্বাশা ম্যাগাজিনের একটি পর্ব সাজানো হয়েছে বিশেষ রচনা হিসেবে। এতে স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা দিয়ে। মজার ব্যাপার হলো, তিনটি লেখাই এমসি কলেজ কেন্দ্রিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমসি কলেজে এসেছিলেন। ছাত্রদের উদ্দেশে দেয়া তার বক্তৃতাটিই এতে সঙ্কলিত হয়েছে আকাঙ্ক্ষা শিরোনামে। নজরুলের কবিতা দুটিও সিলেট ও এমসি কলেজের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর বাঙালির ইতিহাস বিষয়ক কোষ গ্রন্থ বাঙ্গালীর ইতিহাস-এর লেখক নীহাররঞ্জন রায় এ কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। তার লেখার শিরোনাম সিলেটের জন্য মুরারীচাঁদ কলেজ যা করতে পারে। কলেজের শিক্ষার্থীরা যখন বড় সাহিত্যিকদের সঙ্গে তাদের শিক্ষাঙ্গনের এতো গভীর যোগাযোগের সূত্র খুজে পান তখন তাদের রোমাঞ্চ জাগাটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে বার্ষিকীর প্রবন্ধ বিভাগটি। প্রবন্ধ লিখেছেন মোঃ তাজিজুল ইসলাম, প্রশান্ত মৃধা, জফির সেতু, নন্দলাল শর্মা। এমনকি ইংরেজি ভাষায় লেখা বেশ কিছু প্রবন্ধ ও কবিতাও স্থান পেয়েছে সঙ্কলনটিতে। নিবন্ধ জাতীয় কিছু লেখাও প্রকাশিত হয়েছে এতে। স্থান পেয়েছে শিক্ষার্থীদের লেখা একগুচ্ছ কবিতা ও ছড়া এবং কয়েকটি ছোটগল্প। শিক্ষার্থীদের অনেক গল্প, ছড়া ও কবিতায় প্রাথমিক চর্চার ছাপ রয়ে গেছে। কিন্তু তাদের এ আত্মপ্রকাশের সময়ে তারা কলেজ ম্যাগাজিন থেকে যে পৃষ্ঠপোষকতা পেলেন তা নিশ্চয় ভবিষ্যতে তাদের লেখার জন্য একটি স্মৃতিময় ঘটনা হয়ে থাকবে।
ম্যাগাজিনটির বাড়তি আকর্ষণ দুর্লভ কিছু আলোকচিত্রের সঙ্গে বর্তমানের কিছু ছবি। সুন্দর ছাপা ও নিখুত বাধাইয়ের সঙ্কলনটি রীতিমতো সংগ্রহে রাখার মতো।
এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষ ও বার্ষিকী সম্পাদনা পরিষদকে ধন্যবাদ জানাই এ সুন্দর উদ্যোগের জন্য। আবার লুপ্তপ্রায় কলেজ ম্যাগাজিনের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটা বাড়তি পাওনা। দেশের অন্য কলেজগুলো বিশেষ করে বড় কলেজগুলো পূর্বাশাকে অনুসরণ করে নিজেদের বার্ষিকী প্রকাশ করতে পারলে সেটা আমাদের জন্য বাড়তি আশার কারণ হবে।
আজকের যায়যায়দিনে প্রকাশিত।
এম সি কলেজ বার্ষিকী 'পূর্বাশা' : হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের ফিরে আসা
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।
শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।