শিল্পীমাত্রই ভাষায় নিজের প্রকাশরীতিটাকে আলাদা কইরা চিনাইতে চান। আমরা যখন কমলকুমার মজুমদারের ভাষা নিয়া কথা কই তখন সেইটা কলকাতার ভাষা না ইংরেজি সিনট্যাক্সে লেখা ভাষা না ফেঞ্চ সিনট্যাক্সে লেখা ভাষা না কথ্য রীতির ভাষা না লেখ্য রীতির ভাষা সেই তর্কের চাইতে বড় হয়ে কমলকুমারের ভাষা হয়েই থাকে। অমিয়ভূষণ মজুমদার নানাভাবে বাংলা লেখছেন, মহিষকুড়ার উপকথার ভাষা, রাজনগরের ভাষা ও ফ্রাইডে আইল্যান্ডের ভাষার মধ্যে মেলা ফারাক। তবু সব মিলায়ে অমিয়ভূষণের ভাষা বইলা একটা জিনিশ সাহিত্যের পাঠকে চিনে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বলেন বর্ষায় পদ্মায় ইলিশ ধরার মরশুম চলিতেছে। তখন বুঝা যায়, আঞ্চভাষার শব্দসম্ভার তিনি তার লেখায় যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করার পরও এইটা ওনার নিজস্ব স্টাইলের ভাষা।
ভাষার স্টাইলটা এক লেখকের ব্যক্তিত্বের মতো। এইটা তাকে প্রকাশে, প্রকাশভঙ্গিতে আলাদা হওয়ার জন্য তৈয়ার করতে হয়। নিজেকে চিনানোর জন্য সবার ভাষা থেকে পৃথক একটা ভাষায় নিজেকে জাহির করতে হয়। আর দুইটা লেখার পর, লেখকের ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠাক্রমে সেই ভাষাকে সেই লেখক নিজস্ব বইলা চিনাইতে পারেন। লেখার মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্ব পাঠকের কাছে আলাদা কইরা হাজির হয়। এইটা করতে গিয়া তিনি ভাষার মধ্যে কিছু পরিহাস আনেন, হয়তো কিছু নতুন শব্দ পুরানা শব্দ ব্যবহার করেন। নিজের দখলে থাকা আঞ্চলিক ভাষা থেকে শব্দ নেন। যার যেমন রুচি। স্টাইলের প্রয়োজনে লেখক যা করেন তাকে জেনারেল কোনো ব্যাপার বইলা মাইনা নেওয়া কঠিন বা লেখকও নিজের স্টাইলের সাধারণীকরণ দাবি করতে পারেন না। কথা ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথের মতো লেখক যখন লিখতেছিলেন তখন বাংলা চলতি ভাষা গঠনের সেই সময়টায় রবীন্দ্রনাথের স্টাইল, ভাষারীতি বাঙালি শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সাঙ্গ হইছিল। রবীন্দ্রনাথের লেখার ভাষারে আদর্শ ধইরা শিক্ষিত বাঙালি নিজের লেখার ভাষা ও মুখের ভাষারে ঠিক কইরা নিছিল। রবীন্দ্রনাথের পর আর কোনো লেখকের ভাগ্যে এমন শিকা ছেঁড়ে নাই, এইভাবে। কিছু শব্দ হয়তো কেউ নিছে, কোনো বাক্য এর বেশি না। ভাষার ব্যাপারে আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বিপ্লবী কোনো ভাষা চিন্তক শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে আসে নাই। উনি বাংলাভাষায় যত পরিমাণ মুখের ভাষাকে ঢুকাইছিলেন সেই উদারতা নিয়া আর কেউ আসে নাই। উনি মুখের ভাষার কাছাকাছি থাকার জন্য আজীবন ব্যাকুল আছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পর তিরিশের দশক পর্যন্ত একটা বিকাশ ঘটার পর মুখের ভাষার কাছাকাছি থাকার রাবীন্দ্রিক খায়েস কলকাতার শিক্ষিত সমাজ মনে রাখে নাই। ফলে, গত কয়েক দশকে কলকাতায় সাংবাদিক গদ্য, সাহিত্যিক গদ্য আর সভ্য গদ্যে কোনো উন্নতি হয় নাই। শিক্ষিত লোকেরা মান ভাষার একটা মান তৈরি করছেন। সেইভাষাটা সুন্দর বটে, কিন্তু সেটা স্থবির। সেইভাষার আর কোনো বিকাশ হয় নাই। হবে বলেও আশা করা দুরাশা। কলকাতা সেই যে নদীয়া কৃষ্ণনগরের ভাষাকে নিজের মান ভাষা বইলা মানলো তো আর কোনো দিকে ভাষার ভূগোলকে আগায়া নিতে পারলো না। কলকাতার গল্প উপন্যাস প্রবন্ধে হুগলি, মুরশিদাবাদ, বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমের ভাষা কই? কোনো শব্দ কই?
কিন্তু বাংলাদেশে ভাষা নিয়া কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়। এখানকার রক্ষণশীল বুদ্ধিজীবী সমাজ কলকাতার মতো একটা মান মান ভাষায় স্থির হওয়ার খায়েস মনে রাখেন বটে কিন্তু সেইটা এইখানে ঘটে নাই। ফলে, এইখানে গদ্যের নানা ভঙ্গি। সাহিত্যিক গদ্যের নানা প্রকাশ।
কলকাতার উপন্যাস (আনন্দ) পড়তে গিয়া বিষয় আলাদা হওয়া সত্ত্বেও আমার কেবলই মনে হয় যেন একটা লেখাই পড়তেছি। ভাষা যেন কথা কয় না। কিন্তু বাংলাদেশে শওকত ওসমান, শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক যার লেখাই পড়ি ভাষার ভেতর দিয়া আরেকটা ভাষা কথা কয়। একটা গন্ধ টের পাই। সৈয়দ হকের মতো স্টাইলিস্ট লেখকের ভাষার সঙ্গে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষার মিল নাই। বগুড়ার গন্ধ মাখা ভাষার পাশে সৈয়দ হকের রংপুরের গন্ধ মাখা ভাষাকে আমার ভাল লাগে। বুঝি সকল শুদ্ধতার বোধ ও আকাঙ্ক্ষা থাকার পরও সৈয়দ হক সেইভাষার ঘ্রাণ ছাড়াইতে পারেন নাই। বিচিত্র স্বাদ-গন্ধের এই ভাষার বৈচিত্রের মধ্যেই আমি লোকের মুখের ভাষার কাছাকাছি থাকার স্বাদটা পাই। একটা উপন্যাস থেকে আরেকটা উপন্যাসকে সহজে আলাদা করতে পারি। ব্যক্তি লেখকের স্টাইল ছাপিয়ে, স্যুট টাইয়ের বন্ধন ছাপিয়ে লুঙ্গি উঁকি দেয়। ঠিক মতো নাগরিক হইতে না পারার মধ্যেই আমি মুখের ভাষার গায়ে গায়ে সাহিত্যের ভাষার লেগে থাকার সম্ভাবনাটা টের পাই।
ক্লাশ নিয়া, সেমিনারে বক্তৃতা দিয়া, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বইলা আমাদের লেখক অধ্যাপক যখন গাড়িতে উইঠাই ড্রাইভারের সঙ্গে একটা শুদ্ধ-অশুদ্ধের মাঝামাঝি ভাষায় কথা বইলা উঠেন তখন সত্যিই আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
(আরও লেখতে হবে। মেলা কথা জইমা আছে।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


