বাস্তব জীবন থেকে চিত্রায়ন করার সময় শিল্পীর কিছু স্বাধীনতা থাকে। তাদের বাছাই করার স্বাধীনতা থাকে, পরিবর্তন করার স্বাধীনতা থাকে আর থাকে নিয়ম লঙ্ঘন করার স্বাধীনতা। দি নাইনথ অফ জানুয়ারি সিনেমার নির্মাতারা এর কোনোটাই ব্যবহার করেন নাই। তারা বলছেন, ছবিটার জন্য কয়েক শ হাজার রুবল খরচা গেছে। পুরাটাই পানিতে পড়ছে। দুইটা ভিড়ের দৃশ্য ছাড়া সিনেমাটার আর কোনো গুরুত্ব নাই। নির্মাতাদের ভুল হইলো, তারা স্বাধীনতার সুযোগ নেন নাই। যেইটা করা অসম্ভব তারা সেইটাই করছেন। যা সামনে দেখছেন তাই শুট করছেন। একটা বিরক্তিকর বিপ্লবের ছবি তুলছেন তারা। আইজেনস্টেইন এইখানে মাস্টার, উনি স্বাধীনতাকে কামে লাগাইছেন। তার পয়লা ক্যু হইলো তিনি ঘটনা বাইছা নেওয়া সুবিধা করার জন্য সিনেমার ফোকাস কমায়ে আনছেন। ১৯০৫ পুরাটা না দেখায়া শুধু পটেমকিন দেখাইছেন। ওডেসা পুরাটা না তুইলা শুধু সিঁড়ি তুলছেন। খুব বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত। বিপ্লবে দৃশ্যপট ধারণ করার জন্য খুব কার্যকর একটা সিদ্ধান্ত নিছেন।
পটেমকিনের বিদ্রোহ ব্যর্থ হইছিল। জাহাজ বা উপকূল কোনোটাই একে অন্যের সাহায্যে আগায়া আসতে পারে নাই। কন্সট্যান্টায় বিদ্রোহ পর্যুদস্ত হইছিল। আইজেনস্টেইন জানতেন কেমনে বিদ্রোহের সময়কার বীরত্বকে দেখাইতে হয়। আর কেমনে ধ্বংসকারীদের নৌকা বিপর্যয় ঘটানোর সময়কার বেদনাকে কেমনে অংকন করতে হয়।
আইজেনস্টেইনের কাজ আর বাস্তব ইতিহাসের মধ্যে একটা গুরুতর পার্থক্য আছে। বিপ্লবের ঝাণ্ডা উড়ায়ে আইজেনস্টেইন পটেমকিনের মতোই একটা ইতিহাস তৈরি করেছেন। ছবি ছিল পুরাটাই সফল, দর্শকদের টানতে পারছিল, আর ছবিটা ছিল আকর্ষণীয়। মনে রাখার মতো সময়গুলাকে ধরে রাখতে পারছিল ছবিটা।
দ্বিতীয় কিস্তি
মহা থিমগুলা তখনও রাশিয়ায় পৌঁছায় নাই।
রাশিয়ান সিনেমা না আইজেনস্টেইন কে জিনিয়াস সেইটা নিয়া এখনও আলোচনা হয়। আইজেনস্টেইনের প্রতিভা এইখানে আলোচনার বিষয় না। বিষয় হইলো রাশিয়ান সিনেমাকে আগায়া নিতে কোনটা দরকার আছিল? আমরা যখন একটা বাজার চলতি ছবি বানাইতে চাই, মিনারেট অফ ডেথের মতো সিনেমায় যখন আমরা ন্যাংটা মেয়েদের দেখাই, যখন আমরা নিজেদের এই বইলা বুঝ দেই যে এইটা চটি না এইটা হইলো ভ্রমণকাহিনী তখনই আমরা আমাদের স্বাধীনতাকে মসিবতে ফেলে দেই। আমাদের সময়ে চোখামাথা সোভিয়েট সিনেমার জন্য প্রতিভার ওপর বিশ্বাস যেমন রাখতে হবে তেমনি এইটাও স্বীকার করতে হবে যে, আইজেনস্টেইন আকাশ থিকা পড়েন নাই আবার পানিতেও ভাইসা আসেন নাই। তার সিনেমা ছিল বাম চিন্তার যুক্তিযুক্ত চূড়ায়। পয়লা আইজেনস্টেইনের দরকার আছিল তারপর কুশলেভেরও আসার প্রয়োজন পড়ছিল সিনেমাকেন্দ্রিক বিষয়গুলো নিয়া সচেতন হওয়ার জন্য। প্রথমে জিগা ভের্তবের দরকার ছিল, দরকার আছিল গঠনবাদীদের । শুরুর আগের ধারণাগুলোর বিকাশ ঘটার দরকার ছিল।
আইজেনস্টেইনের প্রতিভার স্বীকৃতি দেওয়া সোজা। একলা একজন ব্যক্তি প্রতিভা কখনো এত লজ্জাজনক হয়ে ওঠে নাই। জিনিয়াসরে ফিল্ম আর ক্যামেরাম্যান হিসাবে টিজিরে দেন, অসাধারণ! কষ্টকর হইলো সমসাময়িক জিনিয়াস খুঁইজা বাইর করা। সোভিয়েত সিনেমা নিজের স্রোতে চলে নাই, নিজে নিজেরে আবিষ্কার করছে।
তৃতীয় কিস্তি
আইজেনস্টেইন কী করতে পারতেন আর কী না করতে পারতেন?
আইজেনস্টেইন জানতেন কেমনে জিনিশপত্র দেখাইতে হয়।
তার জিনিশপত্র দারুণভাবে কাজ করতো। তার যুদ্ধজাহাজ ছিল কাজের জন্য নায়কোচিত এক বাছাই। এর বন্দুক, চলাফেরা, মাস্তুল, সিঁড়ি, অভিনেতা সব। ডাক্তারের চোখের কাঁচ ছিল ডাক্তারের চেয়েও ভাল। অভিনেতা বা মডেলরা, ওইসময় মডেলই বলা হইতো আইজেনস্টেইনের জন্য কাজ করেন নাই। তিনি এদের সঙ্গে কাজ করা পছন্দ করতেন না। এইটা সিনেমার প্রথম অংশকে দুর্বল করে দিছে। অধিকাংশ সময় আইজেনস্টেইনের মনে কোনো চরিত্র ছাপ ফেললে তিনি তাকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করছেন। একেকটা চরিত্রকে একেকটা টাইপ হিসাবে উপস্থাপন করছেন। পটেমকিনের ক্যাপ্টেন বারস্কিজ কামানের মতোই ভাল, কিন্তু সিঁড়ির ওপরের মানুষগুলো আরও ভাল। আর সবচেয়ে ভাল সিঁড়িটা।
সিঁড়ি হলো প্রস্থানবিন্দু। ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলাকে বাড়াইতে এইগুলা ব্যবহার করা হইছে। এরিস্টোটলের পোয়েটিকস অনুসারে সিঁড়িগুলা বসানো হইছে। সেইটা হইলো এই : উল্টাপাল্টা আকার থিকা নয়া নাট্যঘটনা তৈরি হয়।
টিজি (সিনেমাটোগ্রাফার) দারুণ প্রতিভাধর এক ব্যক্তি। তিনি শুরুর দিকের কাজ ভীষণ শিল্পিতভাবে করছেন। কেমনে ছোটখাট জিনিশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আর কেমনে এইটা ডিরেক্টররে পরিবর্তন কইরা দেয় সেইটা তিনি ভালভাবে দেখাইছেন। কিন্তু সেইটা ঘটছে অন্য সিনেমায়। গ্রানোভস্কিজের সঙ্গে আইজেনস্টেইনের ওডেসা সিঁড়ির তুলনা করলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়। চেনা ক্যামেরাম্যান, চেনা সিঁড়ি কিন্তু ফল ভিন্ন।
চতুর্থ কিস্তি
পুশকিনের শব্দকোষ। পুশকিনের কাজে নতুন শব্দ খুবই কম। তিনি আছিলেন তার সময়ের সম্মেলনে। তার শব্দকোষ, ছন্দ ছিল আগের লোকদের থেকে আসা, তিনি এইটারে ছাইকা নিছিলেন। এই ঘটনাটা ঘটছিল সিকিসচেতনভাবে। বুঝদার পাঠক সাহিত্যের মাঠের এই ফসল আস্বাদন করতে পারছিলেন।
১৯০৫ এর জন্য আইজেনস্টেনের চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, ডিজলভ, ডায়াগ্রাম সবই ছিল স্ট্রাইক সিনেমার চাইতে কম কম। গোটা সিনেমায় মাত্র দুইটা ডিজলভ। দুইটাই মোম জায়গায় ব্যবহৃত হইছে। এক সিঁড়িগুলা লোকে ভইরা যাইতেছে। দুই পটেমকিনের ডেক খালি হয়ে গেছে।
ফোকাস সম্বন্ধে ভাবতে না দিয়াই ডিজলভ দৃশ্যের প্রকাশকে কমায়ে আনতে পারে। সিনেমাটা ভাল কারণ এইখানে ব্যাপারগুলা সুন্দর ভাবে সাজানো। আমার মতে, পরিমিতি হইলো একটা বিষয় যেটা এই সিনেমায় সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হইছে। এইটা কাজের সংহতি তৈরি করছে।
বহু দৃশ্য পুরানা আইজেনস্টেইনের বৈশিষ্ট্য। ত্রিপলে ঢাকা কমান্ডারের দৃশ্য নেওয়া হইছে স্ট্রাইক থেকে। বাতাসে দুললেই শুধু ত্রিপল ভাল কাজ করে। আর কিছু দরকার হয় না। বিনাপারিশ্রমিকের কর্মীরা ভালনিচুককে খুন করতেছে এই দৃশ্যটা ছিল অপ্রয়োজনীয়। নাবিকদের বিজয়ের সময় অফিসারদের মৃত্যুর পর তার মৃত্যু হইলে কেউ এইটারে সংক্ষিপ্ত দণ্ড বইলা মনে করতে পারতো না।
পঞ্চম কিস্তি
পটেমকিনের মাস্তুলের পতাকার রঙ লাল হওয়ার বিষয়টা। এইটার কি দরকার ছিল? আমার মনে হয়, ছিল। এইখানে শিল্পীর দোষ ধরার দরকার নাই। বিপ্লবকে দর্শকই করতালি দিয়েছে, তিনি নন।
ক্রেমলিনের উপরে তো লাল পতাকা কতই উড়লো, কেউ করতালি দেয় নাই।
পতাকায় রঙ দিয়া আইজেনস্টেইন রিস্ক নিছেন। উনি রংয়ের অধিকার অর্জন করেছিলেন।
একটা বিরক্তিকর রিস্ক। এর মাধ্যমে সহজেই ভীতি ও ভালগারিটির আবহ তৈরি হইছে। সিনেমায় পতাকা টাঙানো সময়ের একজন সাহসী মানুষের কাজ।
(কনটেক্সট ম্যাগাজিনের এই সংখ্যায় লেখাটা রাশিয়ান ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন অ্যাডাম সিগেল)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

