কে বলছিলেন মনে নাই। কিন্তু কেউ একজন বলছিলেন যে, লোকে টিভি খুব মনোযোগ দিয়া দেখে না। লোকে নাকি টিভির দিকে তাকায়, অবলোকন করে না। সম্প্রতি একটা লেখায় পড়লাম ঘটনা সত্য না। অডিওভিজুয়াল মাধ্যমের সাঁড়াশি আক্রমণ দর্শক-শোতার পুরা মনোযোগটাকেই নাকি টেনে নেয়। সে যতই অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করুক। কান আর চোখ নিলে মন সাধারণত পর্দাতেই থাকে। অন্য কোথাও নয়। নিজের ক্ষেত্রে যখন বিষয়টা ভাবি, বুঝতে পারি, কথা ঠিক। লোকে আসলে অভ্যাসবশতই টিভি মনোযোগ সহকারে দেখে। অথবা অডিও-ভিজুয়ালের সামনে মনোযোগ বিষয়টা খুব প্রাসঙ্গিক কিছু নয়। লোকে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ে, গান শোনে, প্রদর্শনী দেখে। কিন্তু টিভি দেখতে আলাদা করে মনোযোগ দিতে হয় না।
টিভি সম্পর্কে বুদ্ধিজীবীরা খুব সমালোচনা প্রবণ। সৃষ্টিশীল চিন্তার জন্য টিভি খুব কাজের জিনিশ না, এইটা অনেকেই মানে। টিভি হইলো, মোটামুটি একটা তথ্য ও বিনোদনের মধ্যে থাকার যন্ত্র। মিডিওকার থাকার একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। ঘাটে, বাটে, বাসে, ট্রেনে যে লাইভ বুদ্ধিজীবীদের দেখা যায় তারা মোটামুটি টিভি থেকেই নিজেদের বুদ্ধিজীবীতার মালমশলা সংগ্রহ করেন।
এক গল্পকার বলতেন, টিভিই আমাকে খাবে। কারণ উনি ছিলেন টিভি আসক্ত। টিভি-আসক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে সৃষ্টিশীল কাজ করা কঠিন। কারণ সময় বহিয়া যায়। আমিও টিভি আসক্ত। আমার মনে হয়, টিভি নির্মাতা কোম্পানিগুলো রিমোর্ট কন্ট্রোল বানানো ঠিক করে নাই। রিমোর্ট কন্ট্রোল না থাকলে টিভি দেখার অভ্যাসটা অন্যরকম হতে পারতো। তখন টিভি চ্যানেলের লোকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চ্যানেল বদলিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতো হয়তো।
বাসায় ফিরে প্রথম যে কয়টা কাজ করি তার মধ্যে টিভি চালু করাটা অন্যতম। তারপর রিমোর্ট হাতে নিয়ে বসা, এলানো, চাহিয়া দেখা।
রিমোর্ট বদলানো। একের পর এক চ্যানেল সার্ফ করে আবার মনে করা যে দেখার মতো অনুষ্ঠানটা কোথায় হচ্ছে। অথবা কোথায় কোথায় হচ্ছে? সেখানে কিছুক্ষণের জন্য স্থির থেকে আবার অন্যত্র। আমাদের জীবনে অপশন কয়টা? সামান্য। অথবা নাই। দৈনন্দিন কাজে? একেবারেই নাই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে। কিন্তু টিভি ছাড়ুন। ৭০টা চ্যানেল। এ বলে আমাকে দেখো, ও বলে আমাকে দেখো। অনেক সময় তো এমনও হয় যে, দেখার মতো দশটা চ্যানেল সামনে, ১০টা অনুষ্ঠান। কী দেখবেন? কী দেখতে চান। বেছে নেয়ার এই অবারিত সুযোগের মধ্যেই ওই বোকাবাক্সের কৃতিত্ব, বিজনেস। আই থিংক সো।
আবার এমনও তো হয়, ৭০ চ্যানেলের কোথাও দেখার মতো কিছু হচ্ছে না। চ্যানেল সার্ফ করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছি। বন্ধ করে দেবো ভাবছি। অমনি পছন্দের কিছু একটা শুরু করে গেল। অথবা সামান্য পছন্দের কোনো কিছুকে অধিক পছন্দ হতে থাকলো।
টিভিতে সবচেয়ে বিরক্তিকর সিনেমা দেখা। কখন শুরু হয়েছে আমি জানি না। কত সময় গেছে জানি না। কী নাম সিনেমার জানি না। পরিচালক কে জানি না। একটা গান, অ্যাকশন দৃশ্য, বা কিছু ডায়ালোগ শুনে দেখতে শুরু করলাম। আধাঘণ্টা কি বিশ মিনিট দেখলাম। বিজ্ঞাপন শুরু হলে চ্যানেল বদলিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে আটকে গেলাম। তারপর হঠাৎ হয়তো মনে হলো, আহা সেই সিনেমাটা! কখনো বিজ্ঞাপন,সিনেমা একাকার হয়ে যায়। কোনটা সিনেমা, কোনটা বিজ্ঞাপন। লাগে রাহো মুন্না ভাই না বিজ্ঞাপন কী দেখছি মনে করা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। তবু দেখি।
আংশিক সিনেমা, অর্ধ সিনেমা, সিকি সিনেমা, বিজ্ঞাপন মাখানো সালাড সিনেমা, একটা সিনেমার সঙ্গে আরেকটা মেশানো সিনেমা। একটা দেখছি তাতে সালমান খান নায়ক, আবার আরেকটাতেও। মিশে যায় একটার সঙ্গে আরেকটা মিক্স হয়ে গেল। টিভি খুব কৌশলে, কোনো ন্যারেটিভ তৈরি হইতে দেয় না। না ন্যারেটিভ সব ওই টিভির। খবর দেখেন। মনে হবে, একটা মেগা সিরিয়াল চলছে। আগের দিনের সঙ্গে পরের দিনের খবরটা জোড়া দেয়া। বিজ্ঞাপন দেখেন, মনে হবে একটা কাহিনী চলছে। একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া দেয়া। তবু মাঝে মাঝে সেই ভাঙা সিনেমাগুলোর জন্য খুব কষ্ট হয়। কিরাম কিরাম জানি লাগে।
এইসব চলতে থাকে। মোহ, মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকা। কিন্তু একবার যদি বন্ধ করতে পারেন সুইচ, তাহলে আপনার মতো সুখী মানুষ আর পৃথিবীতে নাই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

