somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধুত্বের রাজনীতি : ফেসবুক, ব্লগ ও আরও কিছু প্রসঙ্গ

০৩ রা আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেলা আগে আমার গুরু আমারে ডাইকা নিয়া কইছিলেন, আমি যেন জাঁক দেরিদার পলিটিক্স অব ফ্রেন্ডশিপ বইটা পড়ি। আমি পড়ি নাই। গুরুর অনেক কথার সাথে এই কথাটাও অমান্য করছি। আর বইটা এমনই যে না পইড়া এর মেসেজ অন্য কারো থেকে শুইনা বুঝার কোনো উপায় নাই। আজকে সকালে কী মনে কইরা জানি গুরুর কথা মনে পড়লো। মনে পড়লো সেই বইটার কথাও। সার্স দিলাম গুগল বুকসে। পায়া গেলাম পলিটিক্স অব ফ্রেন্ডশিপ। আজ হউক কাল হউক বইটা আমার পড়তেই হবে। বুঝতেছি। আপনারা কেউ পড়তে চাইলে লিঙ্ক নিতে পারেন। (Click This Link)। জাঁক দেরিদা বন্ধুত্ব নিয়া কী লেখছেন আর কী লেখেন নাই এইটা আমি জানি না। বন্ধুত্ব প্রসঙ্গেই গুরু আমারে বইটা পড়তে কইছিল নিকি বিষয় অন্য তাও জানি না। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক কী এইটা আমি জানি। আর বন্ধুত্বের মধ্যে রাজনীতি বিষয়টা কেমনে কাজ করে এইটা অনুমান করি।
এরিস্টোটল কইছেন, যখন নাগরিকরা বিবদমান বিষয়ের নিষ্পত্তি বন্ধুত্বপূর্ণভাবে করতে পারে না। যখন তাদের সম্পর্ক ব্যর্থ হয় সেই জায়গা থেকে বিচার ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। ব্যক্তি বনাম ব্যক্তিতে যে ভালের বোধ সেইটারে একটা কমন ভালোর জায়গায় নিয়া গিয়া বিচার ব্যবস্থা কাজ করে। যখন বন্ধুরা কোনো সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করতে পারে না, আপোষ রফায় আসতে পারে না। তখন তারা আইনের আশ্রয় নেয়। দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের উর্ধ্বে উইঠা দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ চরিতার্থ করে দেয় আইন। প্রাচীন কাল থেকে বন্ধুত্বের ব্যর্থতার ওপর দাঁড়ায়া ন্যায়বিচার এমন এক জায়গা কইরা নিছে যে গণতন্ত্রের মূল শক্তি হয়া পড়ছে এই ন্যায়বিচার। স্বাভাবিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বন্ধুত্ব বৎসল হবে এইটাই আমরা ভাবি। কিন্তু উৎসে কর্তন হয়া আছে। গণতন্ত্রে তাত্ত্বিকভাবে বন্ধুত্বের জায়গা আসলে নাই। বন্ধুত্ব ও গণতন্ত্র পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত। ফলে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র বন্ধুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে। এবং চূড়ান্ত গণতন্ত্র অর্থাৎ ন্যায়বিচার সহ অন্য উপাদানগুলা তাদের শক্তিতে সক্রিয় হয়া উঠলে বন্ধুত্বের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়। নাগরিকরা কোনো বিষয় আর আপোষে, দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের সূত্রে নিষ্পত্তি করতে চান না। তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ওরফে ন্যায়বিচার আইসা খাড়া হয়া যায়। আর সেইখানে কেউ যদি কাউকে বন্ধু হিসাবে সম্বোধন করে তারমানে সে সেইটারে তাত্ত্বিকভাবে মিন করে না। কারণ আইনের চোখে সবাই সমান। কেউ কারো বন্ধু হইলে অন্য আরেকজনের চাইতে তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া গণতন্ত্রে কঠিন।
এই পর্যন্ত জাইনা এখন আমাদের গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রে কি আমি এখন বন্ধুত্বের পক্ষে দাঁড়াইতে গিয়া গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিতে যাইতেছি? আসলে তা নয়। রাষ্ট্র তার মতো আগায় বা পিছায়। সমাজ তার মতো কইরা চলে। বন্ধুত্ব সামাজিক এক বিষয়। এই দুইয়ের সংঘর্ষ ও আপোষের মধ্য দিয়া ব্যাপারগুলার একটা চেহারা তৈরি হয়। ফলে, গণতন্ত্র চাই বইলা আমার বন্ধু থাকবে না সেইটা হয় না। আবার বন্ধুত্ব চাই বইলা গণতন্ত্র থাকবে না সেইটাও হয় না। আমি খালি কথাটা কয়া রাখলাম।
গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলা বন্ধুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে। কিন্তু গণতন্ত্র ও প্রযুক্তির বিকাশের একটা পর্যায়ে আমরা দেখতে পাইতেছি বন্ধুত্ব নতুন রূপে ফিরা আসতেছে। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষরে যন্ত্র বানাইতেছিল। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি মানুষরে আবার মানুষ বানাইতেছে। কেমনে?
ব্যাপারটার অনেকটাই ভার্চুয়াল। তথাপি কিছু বিষয় খুব খিয়াল করতে হয়।
১৩ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিন যে সংখ্যাটা করছিল সেইটা বিষয় আছিল ‌'ইউ'। আপনি/তুমি। আমি সংখ্যাটা পড়তে গিয়া এক ফেসবুক সেলিব্রেটির দেখা পাইলাম। তাকে দেখার জন্য ফেসবুকে গিয়া দেখি লগ ইন না করলে হবে না। লগ ইন করে তার প্রোফাইল দেখলাম। আর তৈরি হইলো আমার অ্যাকাউন্ড। ছবি, অন্যান্য ডিটেইল ছাড়া ওই অবস্থায় অ্যাকাউন্ট পইড়া ছিল। হঠাৎ একদিন একটা মেসেজ পাইলাম। সামোয়ান ইজ লুকিং ফর সাম মাহবুব মোর্শেদ। কথাবার্তার মধ্যে বন্ধুত্ব হয়া গেল। বহুদিন পর জানা গেল, তিনি আমার খুব কাছের লোক। নানা কারণে পরিচয় হয়া ওঠে নাই। এক জন দু জন করে অনেক বন্ধু জুটলো। অনেক, এনাফ। ফেসবুকের বন্ধুর সঙ্গে রাস্তায় ধাক্কা খায়া চইলা গেলেও মনে পড়বে না হয়তো অনেকেরই অনেককে। কিন্তু তারপরও আমরা বন্ধু। কারণ, আমরা একটা শব্দের মধ্য দিয়ে নিজেদের সম্পর্কটাকে চিনতে চেয়েছি। শব্দটা বন্ধুত্ব। সেইটার একটা সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ আছে। আমরা সেইটা নানাভাবে ফিল করি। হয়তো একজনকে ঠিক চিনে উঠতে পারছি না। হয়তো একজনের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে সহসা তার প্রোফাইলের চেহারারা সঙ্গে তাকে মেলাতে পারলাম না। হয়তো একজনের ওয়ালে কিছুই লিখি নি আমি। হয়তো একজন কোনোদিনই আমাকে কোনো মেসেজ দেননি। কিন্তু তিনি আমাকে আমি তাকে বন্ধু বলে স্বীকার করেছি। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে একটা সামাজিক সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হইছে। এই সম্ভাবনাটাই এইখানে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হইলো, যে জেনারেশনটি যান্ত্রিক হবে, অনুভূতি, আবেগ, ভালোবাসা বইলা যাদের কিছু থাকবে না বইলা ভাবা গিয়েছিল তারা দেখি রীতিমতো ফেসবুক অ্যাডিক্ট হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে। হ্যাঁ, ওখানে এমন অনেক কিছুই আছে যাকে সন্দেহের চোখে দেখলে দেখা যেতে পারে। কিন্তু বন্ধুত্বটাকে সন্দেহ করার উপায় কী? আমি কইতে চাইতেছি, রাষ্ট্র সমাজের জায়গা দখল কইরা নেওয়ার অনেক পর। অথবা দখল কইরা নিতে নিতে আরেকটা সমাজ এই রাষ্ট্রের ভিতরে, এমনকি এই রাষ্ট্রের সীমানার বাইরেও জায়গা কইরা নিতেছে। সেই সমাজটা আইজা ভার্চুয়াল কিন্তু কাইলকা যে বিয়েল হবে না এই গ্যারান্টি কই। সো রাষ্ট্র এইটারে সন্দেহ করে। করতে পারে। করবে।
এখন ব্লগের কথায় আসি। এরিস্টোটলের কথা আবার টাইনা আনি। ব্লগে লোকে লেখে এবং এইটা জাইনাই লেখে যে যাদের সঙ্গে সে লিখতেছে তাদের সঙ্গে মোটামুটি বন্ধুত্বের শর্তেই আবদ্ধ সে। মতের পার্থক্য হউক, কি চিন্তার তাকে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের মধ্যে সেইটার নিষ্পত্তি করতে হবে। অথবা নিষ্পত্তি না কইরা সেইটারে টাইনা নিতে হবে। ব্লগারদের পারস্পারিক বিষয়ে রাষ্ট্র আইসা পক্ষ হইছে এই রেয়ার ঘটনা। বরং ব্লগ একটা পক্ষ রাষ্ট্র আরেকটা পক্ষ এইটাই দেখা গেছে। আরেকটা বিষয়, শুধু তো রাষ্ট্র না তথ্য, তথ্যসরবরাহের উপায়ের ফাঁকে কত বড় বড় প্রতিষ্ঠান। তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও নামপরিচয়হীন কিছু মানুষ যে, নাম পরিচয়হীন কিছু মানুষের উপর নির্ভর কইরা তথ্য-বিনিময়ের এতবড় একটা উপায় তৈরি করতেছে সেইটা কিসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত?

অতএব, সেই গানটার কথা কই।
সবাই বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ উঠেছে।
না গো না, চাঁদ নয়, আমার বন্ধু এসেছে।
২৬টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×