somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহরে সবচেয়ে কঠিন কাজ

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকাল আটটা নয়টার দিকে রাস্তায় নামা হয় কালেভদ্রে। শেষ কবে নেমেছিলাম মনে করে বলতে হবে এমন অবস্থা। পরশু আবার দেখা হলো আটটা-নয়টার ঢাকা। ঘর থেকে গলিতে নামলেই দেখি পোশাকশ্রমিকদের ঢল নেমেছে। খুব ভাল লাগে দৃশ্যটা। হনহন করে তারা কাজে যাচ্ছে। দল বেঁধে। রাস্তায় রিকশা, বাস, কারের চেয়ে তখন মানুষই বেশি চোখে পড়ে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কোনো ব্যাপার না। কাজ চলবেই। ঠিক সময় মতো ওরা অফিসে যাবেই। গলি থেকে মূল রাস্তায় এসে আমার মাথা রাখাপ হয়ে গেল। পোশাক শ্রমিকদের একটা দলের সঙ্গে রাস্তা পার হলাম নিরাপদেই। কিন্তু তারপর? কয়েক হাজার মানুষ স্রেফ বাসের অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে। একেকটা বাস সিটিং সার্ভিস হয়ে চলে যাচ্ছে। যাদের টিকেট কাউন্টার আছে তাদের অবস্থা করুণ। তিল ধারণের জায়গা নেই। ওর মধ্যেই লোকজন ওঠার চেষ্টা করছে। পিক আওয়ারে এমন সময়গুলোতে লোকাল বাসের দেখা পাওয়াও ভার। বাসের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে সিএনজির চেষ্টা করতে থাকলাম। দূর থেকে একটা সিএনজি ফাঁকা আসছে দেখলে দশজন এগিয়ে যান। তাদের দলে ভিড়ে আমিও জিজ্ঞেস করি, মহারাজ যাবেন কি না। মহারাজ কী যেন ভাবেন, তারপর কথার উত্তর না দিয়ে চলে যান। ভাবলাম ভেঙে ভেঙে রিকশায় যাই। এবার রিকশাঅলার পিছনে ছোটা। একটার পর একটা। নাহ, সে হালও ছেড়ে দিলাম। অবশেষে একটা টিকেট কেটে ভলভোর একমাইল লম্বা ঘোরানো পেঁচানো লাইনেই দাঁড়িয়ে গেলাম। একটার পর একটা ডবল ডেকার চলে যাচ্ছে। আমরা তার সম্ভাব্য যাত্রী। কোনোটাতেই কেউ উঠতে পারছে না। মেয়েরা বোকার মতো তাকিয়ে আছে। লাইনের সামনের যাত্রীকে বললাম, কতক্ষণ লাগতে পারে উঠতে? উনি করুণার একটা হাসি দিলেন। বললেন, প্রতিদিনই এই হয়। অফিসে যাবো কীভাবে। সময় অনুসারে পৌঁছানো তো দূরের কথা। দুপুরের আগে পৌঁছাবো কি না তারও নিশ্চয়তা নেই। এইভাবে এই লাইনে এক ঘণ্টা চলে গেল। দশটার দিকে একটা খালি ভলভো এলো। খালি মানে দুচারজন ওঠা যায়। উঠতে পারার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম। অদ্ভূত এই শহর। মানুষের সবচেয়ে বেশি কর্মঘণ্টা রাস্তাতেই চলে যায়। কত বাহারী বাসের আয়োজন! কত কোম্পানি, কিন্তু মানুষের প্রয়োজন মেটাবার মতো বাস তো নেই। দশটা না। সেদিন এগারোটায় দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে শত মানুষের বাসে ওঠার যুদ্ধ দেখলাম। এগারোটাতেও যদি যুদ্ধ করে বাসে উঠতে হয়, তবে মানুষ কাজে যাবে কখন?
ভলভো বিজয় সরণীর সিগনালে দাঁড়ালে দেখলাম, আগে পিছে একটা কর্ণফুলী আর একটা একুশে ছাড়া কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই। শুধু প্রাইভেট কার। এরকম প্রায়ই দেখি। প্রাইভেট কারের বিরুদ্ধে তো বলার কিছু নেই। কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এত কম থাকবে কেন? বাসা থেকে যতটুকু কাজের স্পৃহা নিয়ে মানুষ রাস্তায় নামে তার অর্ধেকটাই বাসের সংগ্রামে চলে যায়। দিনের পর দিন এই চলছে। কিন্তু কেউ ভাবছে বলে মনে হয় না। ভাবছে কি কেউ?
এতো গেল কাজে যাওয়ার খবর। ফেরার খবর কী?
ফেরার বেলাতেও আমি একটু দেরিতে ফিরি। সেদিন নয়টার দিকে ফিরছিলাম। ফার্মগেটে এক বৃদ্ধা উঠলেন হুড়মুড় করে। সবাই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সিটিং বাসে লোক ওঠে কেন? বৃদ্ধা উঠে বাসের মেঝেতে ধুপ করে বসে পড়লেন। কান্না জুড়ে দিলেন। আছরের আজানের সময় থেকে উনি ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে। একটা লাইন বলার পর আর কেউ কোনো কথা বলতে পারলো না। কেননা সবাই তো জানে, রাস্তার খবর।
বাসে ফেরার সময়, দেখবেন সবচেয়ে নিষ্ঠুর মানুষের মুখ। সবচেয়ে খিটখিটে, সবচেয়ে রাগী মুখ। ঘর্মাক্ত মানুষ। একজন আরেকজনকে ফেলে, ঠেলে উঠছে, সিটে বসার সংগ্রাম করছে।
মাঝে মাঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দেখে। তাদের ত্যাক্ত-বিরক্ত মুখ দেখে শহরের ওপর ভীষণ বিরক্ত লাগে। নিজের ওপর বিরক্ত লাগে। প্রতিদিন তো দেরিতে ফেরা যায় না। একদিন দুইদিন ফিরতে গেলেই মনে হয় লাইফ হেল হয়ে গেল। কিন্তু প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে এভাবেই অফিস যেতে হয়, এভাবেই ফিরতে হয়। আমি ভাবি বাংলাদেশের মানুষ কত ধৈর্যশীল।
এরকম অসহনীয় অবস্থায় প্রতিদিন একটা ভাঙচুর আর রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাবার কথা। অথচ কিছুই তো হয় না। মানুষগুলো কষ্ট করে। তাদের চিন্তা যাদের করার কথা, তারা এক্সট্রা জ্যাম বাঁধিয়ে চলে যান। দ্রুত। শাই শাই করে। অত্যন্ত দ্রুত।
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×