গভীর রাত পর্যন্ত ভোটের রেজাল্ট দেইখা কালকে একটা শান্তির ঘুম দিলাম। জানলাম আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্টতা পাইছে। বিএনপি এরশাদের সমান আসন পাইছে। জামাত প্রায় হাওয়া হয়ে গেছে। যুক্তফ্রন্ট, কিংস পার্টিগুলার খবর নাই। তরুণ ও নারী ভোটাররা এইবার নীতিনির্ধারণী ভূমিকা নিছে। ভোটব্যাংকের হিসাব কাজে আসে নাই। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিশ্লেষকদের চেহারা দেইখা বুঝলাম টকশোয়ে অভ্যস্ত লোকেরা এইটা বুঝানোর ক্ষমতা রাখে না। গভীর রাইতে দেখলাম আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ভিড় বাড়তেছে। তারা বেশ আলোচনা করতেছেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে লেটেস্ট ফল দেখলাম। কবি এখানে কী বুঝাইতে চাইছেন? ভাবতে থাকলাম। মানে জাতি এইখানে কী বুঝাইতে চাইলো? সারাদিন চিন্তা কইরা বুঝতে পারলাম না।
এখন সন্ধ্যা ঘনায়ে আসছে। না বুইঝা শেষে একটা পোস্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে এইটা আমরা সবাই জানতাম। কিন্তু এইভাবে আসবে সেইটা কল্পনা করি নাই। রাষ্ট্রপরিচালায় যাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত স্বার্থ আছে তারা সবাই মনে প্রাণে চাইছে আওয়ামী লীগ আসুক। তারমানে এই না যে, আওয়ামী লীগরে জিতানোর জন্য তারা অসৎ পন্থা নিছিল। ভোট ভাল হইছে। আওয়ামী লীগ ভোট পাইয়াই জিতছে।
কিন্তু এটাও ঠিক যে, বাংলাদেশে যাদের ব্যবসা আছে। নিহিত স্বার্থ আছে। নিরাপদ এক্সিট প্লান আছে। যারা প্রতিহিংসার ভয়ে ভীত আছিলেন তারা সবাই আওয়ামী লীগের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন।
আল্লাহ এই বৈষয়কি স্বার্থের কাণ্ডারীদের দোয়া কবুল করছেন।
মিডিয়ার একটা বড় অংশ চাইছে আওয়ামী লীগ আসুক। আল্লাহ তাদের দোয়াও কবুল করছেন।
জনগণের সরাসরি কোনো নিহিত স্বার্থ বা পিঠ বাঁচানোর ব্যাপার আছিল না। তারা তো আওয়ামী লীগকে আরও কম ভোট দিতে পারতো। দিল না কেন?
তবে কি তাদেরও কোনো বৈষয়িক স্বার্থ আছে?
আওয়ামী লীগ ক্ষমতা নেওয়ার পরদিন থিকা তারা ১২ টাকায় চাল, ৬০ টাকায় সয়াবিন আর ৪০ টাকায় পেট্রল কিনতে চায়? রাস্তা দিয়া নিরাপদে হাঁটতে চায়? দখল, দুর্নীতি থিকা মুক্তি পাইতে চায়? ছেলে মেয়ের জন্য চাকরি পাইতে চায়?
চায়। অবশ্যই চায়।
কিন্তু তারা কি জানে না, এইগুলা সম্ভব না। তাদের এই স্বার্থ পূরণ করার শক্তি আওয়ামী লীগের নাই। জানে। পাবলিক ঘাস খায় না। তারা জানে।
তাইলে? কেন এই বৃথা আশা?
অল্প কিছু লোক দাম কমানোর কথায় বিশ্বাস করলেও বাকীরা ঠিকই জানে শান্তি পাবে না পাবে না পাবে না।
তাইলে?
কারণ,
মানুষ ভোট দিছে মাননীয় খালেদা জিয়ার তিনপুত্রের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি, দলীয়করণ ও জঙ্গীত্ব তার এই তিন সন্তান।
মানুষ খালেদা হাসিনার দুর্নীতির কথা বিশ্বাস করে কি না জানি না। কিন্তু তারা মনে করে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান দুর্নীতি করেছে।
তারা বিশ্বাস করে বিএনপি ক্ষমতাকে পর্যন্ত দলীয়করণ করেছিল। তাদের কারণেই দেশ রাজনীতি ছাড়া হয়ে দুই বছরের জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়েছিল।
তারা বিশ্বাস করে ৪ দলীয় জোট সরকার প্রত্যক্ষভাবে বাংলাভাই শেখ আবদুর রহমানদের লাই দিয়েছিল। যারা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্যোগ সহ বিভিন্নভাবে নাগরিকদের মনে ভীতি সঞ্চার করে তাদের তটস্থ করে রেখেছিল দীর্ঘসময়।
কারণ,
মানুষ ধর্মের বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে ভোট দিছে। উগ্র ইসলামী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা ব্লাসফেমি চায় না বলেও ভোট দিছে। তারা একটা অগ্রসর বাংলাদেশ চায়। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার চায়। বিপুল সংখ্যক তরুণ ভোটার বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। যদিও তাদের সে বিশ্বাস ঠিক নয়। আওয়ামী লীগের অন্যতম শরিক এরশাদ ব্লাসফেমি আইন করতে চায়। উগ্র ইসলামী রাজনীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ আদতে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
আওয়ামী লীগ যা পারবে তা হলো, আমেরিকার সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধকে ঘরে টেনে আনবে। পাকিস্তান ও ইনডিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, যারা আমেরিকার যুদ্ধকে নিজের যুদ্ধ মনে করেছে তারাই নিজেদের ঘর অরক্ষিত করে তুলেছে। ফলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জঙ্গীত্ব বাংলাদেশের মতো করেই প্রতিরোধ করুক। আমেরিকার মতো করে নয়। এইটা হবে আমাদের আশা।
আওয়ামী লীগ যা করতে পারবে তা হলো, সশস্ত্রবাহিনীর স্বায়ত্তশাসন। সেটি হলে হলে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসাবে বাংলাদেশ ইতিহাসে নাম লেখাতে পারবে যেখানে বিচারবিভাগের মতো সশস্ত্র বাহিনী স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে।
আওয়ামী লীগকে মানুষ ভোট দিছে কারণ তারা রাজনীতির প্রত্যাবর্তন চায়। তারা মনে করে দেশের বড় চেয়ে ঐতিহ্যবাহী দল হিসাবে আওয়ামী লীগের মাধ্যমে রাজনীতির পুররুদ্ধার হোক। ১৯৭১ সালের পর আওয়ামী লীগ নিজেই বাকশাল করে সে পথ রুদ্ধ করেছিল। ২০০৮ সালে মানুষই তাকে 'বাকশাল' গঠন করে দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। এবার এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে না পারলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের মানুষ ও আওয়ামী লীগ উভয়ের ভাগ্যই খারাপ।
মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে তার অতীত দেখে নয়। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। দিন বদলের প্রত্যয় দেখে। কিন্তু আওয়ামী লীগ দিন বদলাবে কি না জানি না। কিন্তু খুব সহজেই অতীতের বাসিন্দা হয়ে যেতে পারে। বিশেষণের বন্যায় অতীত কীর্তিকে বর্তমানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারে।
তারা মনে করতে পারে ১৯৭১ সালের কারণে মানুষ তাদের ভোট দিয়েছে। ১৯৭১ অবশ্যই কারণ। কারণটা অতীতের নয়, ভবিষ্যত প্রত্যাশার। সেটা হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।
কিন্তু অনেকেই জানেন মানুষ আওয়ামী লীগেকে ভোট দিয়েছে নিকট অতীতের শাসনের কথা মনে করে। তারা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তারা ড্রয়িংরুম রাজনীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। তারা বিএনপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। জামাতের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসনাধীনে যারা একবার কাটিয়েছেন যা খুব ভাল জানেন আওয়ামী রাজনীতির আশঙ্কার দিকগুলোর কথা। কিন্তু এবার তা না হোক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। ফাও ফাও। কারণ ইতিমধ্যেই দখলদারিত্ব শুরু হয়ে গেছে।
.........................................
শেষে আমার একটা দুঃখের কথা। ভোট হইলো। একদল হারলো। একদল জিতলো। কিন্তু গতকাল বিকালের পর কারো মুখ দেখলাম না।
মাননীয় শেখ হাসিনা ও মাননীয় খালেদা জিয়া উভয়েই কি ক্লান্ত?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

