কত কিছু যে আছে এই দুনিয়ায় লেখার মতো। ব্লগে লেখতে কোনো কিছু ভাবা লাগে না। কে কী ভাবলো, কে ছাপবে না ছাপবে এইগুলা নিয়া চিন্তা নাই। মন চাইলো লেখলাম। শেষ। দ্য এন্ড।
এককালে দেশ পত্রিকাটা আমার খুব প্রিয় ছিল। গ্রামে আছিলাম। পত্রপত্রিকা পাইতাম না। তখন কার মাধ্যমে জানি অনেকগুলা পুরান দেশ বাড়িতে আসছিল। সেইগুলা মুখস্ত করার মতো কইরা পড়ছিলাম। কত অজানা জিনিশ যে জানতে পারছিলাম। সাগরময় ঘোষ সম্পাদক ছিলেন। দেশপত্রিকার আলাদা একটা পোড়া কাগজের মতো গন্ধ আছিল। পরে স্কুলে-কলেজে উঠে লাইব্রেরীতে গিয়া দেশ পত্রিকা পড়তাম।
বেশ কয়েক বছর এই রকম পড়ছি। পরে ঢাকা এসে নীলক্ষেতের খোঁজ পাইলাম। নীলক্ষেত গেলেই দেশ পত্রিকার স্তুপগুলা খুঁজতাম। বাদ পড়া গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলা পাইলেই চার-পাঁচটাকা দরে কিনতাম। বহুত ফায়দা হইতো। এমনে অনেকদিন চলছে। দেন সাগরময় ঘোষ মইরা গেলেন। শোনা আমাদের সুনীল নাকি সম্পাদক হবেন। হইলেন না। অমিতাভ চৌধুরী না কি নাম এক ভদ্রলোক আইসা দেশের টেস মাইরা দিলেন। দেশের মধ্যে কত কিছু যে আনলেন। দেশের স্বাদ মইরা গেল গা। ধীরে ধীরে দেশ পড়া বন্ধ হয়া গেল। মাঝে মাঝে দুই একটা সংখ্যার কথা জানা যাইতো হয়তো কেনা হইতো। অথবা দেখা হইতো। এই যা। ঘটনা যা দাঁড়াইলো তাতে নিজে যখন পত্রিকা কেনার সামর্থ্য অর্জন করলাম তখন দেশ পত্রিকা পড়া যায় না। হাতে নিয়া দেখার ইচ্ছাও করে না।
দেশ সাগরময়ের আমলে সুসম্পাদিত পত্রিকা আছিল। বাংলা ভাষায় সেইরাম পত্রিকা আর নাই। আমরা সাময়িক পত্রিকা বলতে যা বুঝি তা ছিল ওই দেশ।
ওই এক দেশ নিয়া কত যে কথা হইতো।
বলা হইতো, দেশ হইলো কালচারাল এলিটদের সাহিত্য ম্যাগাজিন। ওনাদের সাহিত্য রুচি তৈরি হয় দেশ পইড়া। দেশে যা লেখা হয় সেইটা আবৃত্তি করতে পারলেই বঙ্গদেশে বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক খেতাব মিলতো। ঘটনায় সত্য ছিল বটে। আমরা যখন কলেজে তখন আমাদের শিক্ষক আবুল আহসান চৌধুরীর একটা লেখা দেশে ছাপা হইছিল। ওই এক প্রবন্ধেই স্যারের অবস্থান নক্ষত্রদের সারিতে হইছিল। বছরে দুই বছরে দেশ পত্রিকায় বাংলাদেশের লেখকদের লেখা, চিঠি বা দুই লাইন কবিতা ছাপা হইতো। সেইটা নিয়া খুব তোলপাড় হইতো। দেশ পত্রিকা কেন এদেশের লেখকদের লেখা রেগুলার ছাপে না এইটা নিয়া খুব আফসোস করতো লেখকরা। দেশ পত্রিকার প্রভাবের কারণে সরকার খুব সতর্ক থাকতো। দেশ পত্রিকার বেশ কয়েকটা সংখ্যা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হইছিল।
কিছুটা বড় হয়ে জানতে পারলাম এস্টাবলিশমেন্ট আর এন্টি-এস্টাবলিশমেন্টের কথা। দেশ-আনন্দবাজার গোষ্ঠীর সাহিত্য রাজনীতির বিরুদ্ধে লিটল ম্যাগাজিনঅলাদের লড়াইয়ের কথা। দেশ ও দেশবিরোধিতা উভয় জায়গাতেই ভাল ফলন হইতো। প্রচুর কথা হইতো। দেশ পত্রিকা কাকে কেমনে কিনতেছে সে নিয়া অনেক জল্পনা হইতো।
দেশ আর সেইরকম নাই। দেশ বিরোধিতাও তেমন নাই।
সাগরময় ঘোষের মৃত্যুর পর দেশে পড়ার মতো লেখা বলতে সুনীলের অর্ধেক জীবন আর তপন রায়চৌধুরীরর বাঙ্গাল নামার ছাড়া আর কোনো ধারাবাহিকের কথা মনে পড়তেছে না। বছরে দুবছরে একটা দুইটা প্রবন্ধ পড়ার মতো হয়। আর কিছু মনে পড়ে না।
অনেকদিন পর আবার দেশ কিনলাম। এই সংখ্যা। দুঃশাসন সংখ্যা। পত্রিকার ঘ্রাণ আর তেমন নাই। হর্ষ দত্তের ফালতু লেখা পইড়া মেজাজ খারাপ হয়া গেল। দেশ হইছে এখন নিমলেখকদের আস্তানা। তবে এনারা রাজনীতি লেখেন। সেই ভারতীয় দম্ভ আছে, সেই বাম বিরোধিতা আছে, সেই সাম্প্রদায়িকতা আছে, সেই মাতব্বরি আছে। কিন্তু সেই সারবস্তু আর নাই।
প্রথমে ২৫ পৃষ্ঠা খালি রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি নিয়া বাজে লেখকদের কচকচানি। তারপর ধারাবাহিক। একটা দুইটা গল্প। সবাই এক ভাষায় লেখে। বিজয় লিখছে না তিথি লিখছে বুঝার উপায় নাই।
তবু একটা জিনিশ ভাল লাগলো। সেইটা হইলো ছাপা কাগজে ৫-১০ পৃষ্ঠা ধারাবাহিক কাহিনী দেশ এখনও ছাপতেছে। বাংলার ঘরে ঘরে মেয়েরা থান ইটের মতো যে বইগুলা পইড়া পেটি-বুদ্ধিজীবী হয়া ওঠে। হাজারে হাজারে বিক্রি হয় যেইগুলা দেশ-বিদেশে সেইগুলা দেশ ছাড়া এই বাংলায় লেখা হওয়া কঠিন আছিল। উপন্যাসের বাণিজ্য শুরু করছিল দেশ। টিকায়া রাখছেও দেশ। বাংলাদেশে দেশ নাই, তাই বছরভর উপন্যাস লেখার সাপোর্টও লেখকরা পান না। চিন্তা ভাবনা করে বছরভর উপন্যাস লেখার সামর্থ্যও অর্জন করতে পারেন না।
আরও একটা জিনিশ দেশে আছে। বই পইড়া, বিষয় জাইনা বই আলোচনা লেখার চল। এইটা বাংলাদেশে দেখা যায় না। আলোচনা বলতে কোনো জিনিশ বাংলাদেশে নাই। দেশে আছে।
দেশে কোনো প্রদর্শনী, নাটক, ছবি, আসরের আলোচনা পড়লে বুঝা যায়, এইগুলা লেখা তো দূরের কথা লেখার লোকও এই দেশে নাই।
১. ধারাবাহিক উপন্যাস ২. বই আলোচনা ৩. ইভেন্ট আলোচনা এই তিনটা জিনিশ দেশ ধরে রাখছে ভেবে শান্তি লাগতেছে। কারণ, ভাল হউক বা খারাপ হউক দেশই বাংলা ভাষায় মূলধারার একমাত্র জীবিত সাহিত্য সাময়িকী।
বাংলাদেশের পত্রিকা স্টলগুলাতে গেলে আমার কান্না লাগে। পর্নো ব্যবসায়ীর পিনআপ ম্যাগাজিন, লম্পটদের সিনেমা পত্রিকা, জামা বিক্রেতাদের ফ্যাশন ম্যাগাজিন, সচিবালয়ের ধান্দাবাজদের রাজনৈতিক সাময়িকী, আর লিটুদের বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে প্রকাশিত সাহিত্য সাময়িকী, বিজ্ঞাপন শিকারীদের আইটি পত্রিকা ছাড়া একটা দুইটা পত্রিকা যদি হাতে নেন দেখবেন দুই আনির বুদ্ধিজীবীদের নিবুদ্ধিতায় ঠাসা সেইগুলা। সাহিত্য সাময়িকী বলতে এই দেশে কিছু নাই।
তাই মৃতপ্রায় দেশের জন্যই আক্ষেপ লাগতেছে।
দেশের কাছে যাইতে পারে এমন একটা সাময়িকী এইদেশে কেন হইলো না এইটা নিয়া চিন্তা করা দরকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


