ফরহাদ মজহার একটা লেখা দিছেন বিডিনিউজের মতামত বিভাগে। প্রথমে লেখাটা আমি লাইক করছি। ফেসবুকে ব্লগে লেখাটার লিঙ্ক শেয়ার করছি। মন থেকে চাইছি লেখাটার বহুল প্রচার হউক। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষাশেষি তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমীর কিছু উদ্যোগের কথা শুনা যাইতেছিল। শুনা যাওয়া মানে গুজব বা কথার কথা না। সংসদে উঠানোর জন্য একাডেমী আইন করা প্রস্তুতি নিতেছে। তথ্য মন্ত্রণালয় টিভি রেডিওর কর্তাদের ডাইকা নিয়া শাসাইছে। বলছে, ভাষা ঠিক করো। খবর শুনার পর থেকে মেজাজটা খারাপ হয়া গেল। ফ্যাসিজমের রকমভেদ আছে। কিন্তু ভাষা নিয়ন্ত্রণের ফ্যাসিবাদ কেমন চিজ? ভাষা ঠিক করার জন্য এখন আইন করা? কর্মহীন, সৃষ্টিছাড়া, অপদার্থ লোকদের ফ্যাসিবাদী কায়দা ছাড়া আর কোনো কায়দা নাই।
কিছু লেখার চিন্তা করতে করতেই দেখি, ব্রাত্য রাইসু একটা গ্রুপ খুলছেন ফেসবুকে। ভাষা ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে। আমি একটা স্টেটাস লেখলাম। কেমনে কী ভাবতেছিলাম। ঘটনা বেশি দূরে আগনোর আগেই দেখি আনিসুল হক একটা কলাম লিখছেন প্রথম আলোয়। আমি সমকালে একটা ছোট লেখা দিলাম। নেটেই মূলত কথাবার্তা হইতেছিল। বাংলাদেশের কুয়ার ব্যাঙ কোনো বুদ্ধিজীবী এই নিয়া লেখবে বইলা মনে হইতেছিল না। পারলে তারা বিরুদ্ধেই লেখবে। রবীন্দ্রনাথ বাঁইচা থাকলে লেখতেন। শিওর। আহমদ ছফাও লেখতেন মনে হয়। ফরহাদ ভাই যে লেইখা ফেলবেন এইটা কেন জানি মনে আসে নাই। ফরহাদ ভাই লেখছেন দেইখা মনটা খোশ হইলো।
চিকন দাগে উনি, লেখার ভাষার গায়ে গা ঘেষে মুখের ভাষাকে রাখার পক্ষপাতি। আমরা যে কারণে ভাষা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতেছি, সেই কারণে উনিও দাঁড়াইছেন, পড়লাম। কিন্তু তার বিচার নিয়া কয়দিন ধইরা মনটা খচখচ করতে লাগলো। ফরহাদ ভাইয়ের লেখা আমি লাইক করি। আমাদের মতে উনি জীবিত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল। এই অবস্থায় উনার লেখা নিয়া খচখচানিটা আমার ভাল লাগলো না।
তাই লেখাটা চিন্তা করলাম।
টাসকি খায়া গেলাম। ফরহাদ ভাই কিছু জিনিশ খেয়াল করেন নাই বইলা মনে হইলো। অথবা বাংলাদেশের নতুন ভাষার উত্থানের কর্মীদের বাঁচানোর জন্য উনি কিছু কৌশলও করতে পারেন।
কেমনে কী, এই সময় এই নিয়া কথা বলা ঠিক হবে কিনা ভাবতে আছিলাম।
শেষে ভাবলাম কথাগুলা বইলা দেওয়াই ঠিক হবে। তর্ক যখন উঠছে তখন পুরাটাই উঠুক। অল্প উইঠা লাভ নাই।
পয়েন্ট কইরা বলি :
১. বাংলা একাডেমী যারে ভাষার নৈরাজ্য বলতেছে ফরহাদ ভাই সেইটারে কতিপয় সাহিত্যিকের ভাষা ব্যবহারে সাহিত্যিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হিসাবে দেখার উদ্যোগ নিছেন। শুধু এইখানেই শেষ না। উনি কইছেন, এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা মোটামুটি ক্রিয়াপদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ফরহাদ ভাই কলকাতায় সংস্কৃত ও ইংরাজ পণ্ডিতদের হাতে প্রস্তুত প্রমিত ওরফে সাধু ওরফে শান্তিপুরি ভাষার ব্যাপারে বেখেয়াল ছিলেন বইলা মনে হয় না। কিন্তু নিশ্চিত বাংলা ভাষার কথা কইতে গিয়া বাংলাদেশের কথা উনার মনে আসে নাই। উনি নোয়াখালির কথা কইছেন। কইছেন, নোয়াখালির ভাষার সাহিত্যও সাহিত্য। নোয়াখালির ভাষাও ভাষা। কলকাতা ও নোয়াখালির মধ্যে সুরাহা করতে নিয়া উনি বাংলাদেশের কথা ভুইলা গেছিলেন, এমনও হইতে পারে। বিষয় হইলো, এই দুনিয়ায় কেউ আর আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্যকে অস্বীকার করে না। বাংলা একাডেমীর মতো প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিষ্ঠানগুলা যখন এইসব সাহিত্য কালেক্ট করার জন্য মন দেয় তখন বুঝতে হয়, তর্ক শেষ। এইটা সবাই মাইনা নিছে। ব্যাপার পেকে গেছে।
তর্কটা অন্য জায়গায়। প্রশ্নটা আঞ্চলিক ভাষা নিয়া না। মান ভাষা নিয়াই। একথা ঠিক যে, আমাদের আঞ্চলিকভাষাগুলা ভাল হইলেও বাংলাদেশের সব এলাকার লোক যে কোনো একটা এলাকার ভাষায় কমিউনিকেট করতে পারবে না। এইজন্য সবার বুঝের মধ্যে একটা ভাষা দরকার। একটা ভাষা আমাদের আছে। সেইটা বইপত্রের চলিত ভাষা। ভাষাটা ভাল আছিল। নদীয়া শান্তিপুরের ভাষাটা ভায়া কলকাতা আমরা ইনহেরিট করছি। ভাষার লগে সাহিত্যও আমরা নিছি। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণে কলকাতার ইনহ্যারিটেন্স আমরা আর রাখতে পারতেছি না। কলকাতার উত্তরাধিকার রাজনীতিতে যেমন ভাষায়ও তেমন ক্রমে দূরে সইরা যাইতেছে। ফলে, আমাদের সবার অজান্তে ঢাকা শহরে একটি নতুন মান ভাষা গজাইতেছে। এই ভাষাটায় ঢাকাইয়া, বরিশালী, নোয়াখালী, রংপুরী সব এলাকার শব্দ ও বাচনভঙ্গি ঢুকছে। ভদ্রলোকেরা এরে নাম দিছে খিচুড়ি ভাষা। মজার ব্যাপার হইলো- ঘরে বাইরে সবাই এখন এই ভাষায় কথা কয়। মেলা দিন ধইরা কথা কইতেছে। ব্রিটিশ ইংরেজি থেকে আমেরিকান ইংরেজি যেমনে আলাদা হয়া গেছিল সেইভাবে আমাদের বাংলাও আপসে আপ কলকাতার বাংলা থেকে আলাদা হয়া যাইতেছে। এইটা ব্রাত্য রাইসু, আনিসুল হক, মুস্তাফা সরয়ার ফারুকীর সাহিত্য বা সিনেমার মামলা না। এইটা একটা জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষা বানানোর মামলা। এইখানে বইলা রাখা ভাল, এই ভাষা শুধু ক্রিয়াপদ দিয়া আলাদা তা না। অনেক কিছুতেই আলাদা। আমি ভাষা বিষয়ে নাবুঝ। ফলে, বিশেষ কইরা কইতে পারবো না। ফরহাদ ভাই কইতে চাইলে কইতে পারতেন।
আমি স্পষ্ট দেখতেছি, লোকজন যেইখানে সমানে একটা ভাষায় কথা কইতেছে তখন ফরহাদ ভাই সেইটারে তরুণ সাহিত্যিক এক্সপেরিমেন্টাল ভাষা উদ্যোগ হিসাবে চালানোর চেষ্টা করলেন। সাহিত্যিকরা আগায়া গিয়া ভাষাটারে আলিঙ্গন করছে, তারা বানায় নাই।
২. ফরহাদ ভাইয়ে আরেকটা পর্যবেক্ষণে আমি টাসকি খাইছি। উনি কইছেন, সংবেদনশীল ও সৃষ্টিশীল তরুণদের একটা অংশ (বড় অংশ?) নাকি বিজ্ঞাপন তৈরি কাজকেই নিজেদের মূল কাজ হিসাবে বাইছা নিছে। এদের প্ররোচনা রইছে ডিজুস সংস্কৃতি তৈয়ার হওয়ার পিছনে।
আমার জানা মতে, গ্রামীন ফোন সহ কর্পোরেট কোম্পানিগুলার বিজ্ঞাপন বানানোর কাজে লিপ্ত আছেন খুব কম তরুণই। মুস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা, গাওসুল আজম শাওন, আদিত্য কবীর- এইরকম লিস্টি ধইরা আগইলে ২০ জনও হবে না। বিজ্ঞাপনের বড় ব্যবসা এখনও রুচিশীল রবীন্দ্রপূজারিদের হাতেই নিবেদিত। সংবেদনশীল ও সৃষ্টিশীল তরুণরা এখনও সংবেদনের লাইনেই আছে। ফরহাদ ভাই কোথাও ভুল দেখতেছেন। আর ডিজুস সংস্কৃতি বইলা কোনো সংস্কৃতি তৈরি হয় নাই। এইটা সংস্কৃতি না ফ্যাশন। জীবনধারা ফাস্ট হইছে। চুলে জেল, কোমরের নিচে প্যান্ট কানে রেডিও, রেডিওতে ইংরেজি বাংলা মিশানো কথা হইলেই সংস্কৃতি হয় না। আর এইটাতে সৃষ্টিশীল তরুণদের যতটুকু অবদান তার চাইতে জীবনযাত্রার নিজস্ব প্রকৃতির অবদান বেশি। তরুণদের একটা অংশকে ডিজুস বইলা ফরহাদ ভাই যদি তাদের গ্রামীণ ফোনের হাতে সঁইপা দেন। তাদের ভাষায় গ্রামীন ফোন আর রেডিও ফূর্তি যদি তাদের কানে কানে মন্ত্রণা দিতেই থাকে তাইলে আখেরে লস। লাভ হবে যদি সংবেদনশীল ও সৃষ্টিশীল বুদ্ধিজীবীরা ওই ভাষাটাকে রপ্ত কইরা তাদের সঙ্গে কথা বইলা ফেলতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিরা অভিযোগ কইরা আগে যেমনে তরুণদের আদার হিসাবে চিনতো, তেমনে ফরহাদ ভাই করলে সেইটা দুঃখের বিষয় হবে।
৩. বিক্রি হয়ে যাওয়া। ফরহাদ ভাই বলছেন একটা জেনারেশন পুরাটাই এমএনসির কাছে বেচা হয়া গেছে। শুধু তাই না, কম দামে বিক্রি হয়া গেছে। দাম কত এখন আর কত হইতে পারতো, সেই দামে কে কিনতো সেইটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমার তো মনে হয়, দাম ঠিকই আছে। আমাদের আগের জেনারেশনের লোকেরা যে দামে বিক্রি হইতো তার চাইতে আমরা বেশি দাম নিতেছি। অতএব দাম নিয়া কথা চলতে পারে।
কিন্তু যেইটা নিয়া কথা চলতে পারে না সেইটা হইলো বিক্রি হয়া যাওয়া নিয়া। জব মার্কেটই কই আমরা এইটারে। বিক্রিই হই। শ্রম বেচি। মেধা বেচি। ফরহাদ কইতে চাইছেন, স্বাধীনতা বেচি। এইটা ঠিক না। এমনকি অনেক সময় চিন্তাও বেচা দেই না আমরা। বুঝা যাইতেছে ফরহাদ ভাই গ্যাপে আছেন।
প্রশ্ন হইলো, মার্কেট ইকোনোমিতে কম হউক আর বেশি বেচাবেচির বিকল্প নাই। আমরা তো ফরহাদ ভাইদের আগে পরে বিপ্লবী জেনারেশন দেখছি, তারা বেচা হন নাই। তাতে লাভের লাভ কী হইছে সেইটা খুঁজার জন্য গবেষণার দরকার হবে না। ইতিহাসে চোখ বুলাইলেই চলবে।
আপাতত এই। কথা আগাইলে আরও কিছু বলবোনে।
ফরহাদ ভাইয়ের লেখার লিঙ্ক :
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



