
১.
রুবার বয়স আর কত হবে!বড়জোর আট কি সাড়ে আট। সারা বিকেল খেলে বেড়িয়েছে,এ পাড়া ও পাড়া সব বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত।
: মা ক্ষুধা লেগেছে।কিছু খেতে দিবা নাকি দিবানা?
বাড়ি ঢুকার সাথে সাথে চিৎকার,যেন বাড়ি মাথায় তুলে ফেলবে।কেবল সন্ধ্যা লাগছে। ছোড়দা তাড়াহুড়ো করছে,বাইরে বেরুবে।
: এই পুলপুলি বেগম এদিকে আয়।
: ছোড়দা ভাল হবেনা বলে দিচ্ছি।
চোখ পাকিয়ে রুবা ছোড়দার ঘরে ঢুকে।
: কি করছো? এই সন্ধ্যাবেলায় আমি বাড়ি ফিরলাম আর তুমি কই যাও? পড়তে বসবানা? এইবার তো গোল্লা খাবা। খালি বাইরে ঘুরো। দাঁড়াও আব্বা আসুক সব বলে দিব। কাল রাতেও বাইরে গেছিলা পড় নাই,আজকেও বাইরে যাচ্ছো। আমার রেজাল্ট হইলে খালি কিছু বলে দেখো আমাকে।
: পাকামো শুরু করলি! সাধে কি আর পুলপুলি বলি। সোনাপুটা আমার ,যাতো মার সেলাইয়ের বক্স থেকে সুঁই আর কালো সুতাটা এক দৌড়ে নিয়ে আয় তো দেখি। শার্টের বোতামটা ঢিলা মনে হচ্ছে কোথায় আবার খুলে পড়বে। খালি তো পুলপুল করতে পারো,সেলাই করতে পারো?
: এহ! পারিনা আবার? খুব পারি। তাইলে কি দিবা বল?
: উম.. আচ্ছা যা কাল তোকে নিয়ে যাব দেখতে। রানী আসবে রানি,বুঝলি?
: রানী? সত্যি বলছো? গুল মারছো নাতো?
: ওরে পাকনী!দেখছিস না আব্বা ক'দিন কি ব্যস্ত? আব্বার উপর দ্বায়িত্ব যে! কালকেই আসবেন রানী।
: আচ্ছা... রানীর মাথায় কি মুকুট থাকবে দাদা?
: হ্যাঁ থাকবে।
: রানীর গায়ের রঙ কি পাকা ডালিমের মত দাদা?
: তুই নিজেই দেখিস কাল। যা যা তাড়াতাড়ি কর। পুলপুল বন্ধ করতো!
: দাদা!
কপট রাগে রুবা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। বাইরে আসতেই তার আর মনে থাকেনা কিছু। রানী কেমন হবে দিব্য চোখে সে দেখতে পায় যেন।
২.
সময়টা ১৯৯৬ সালের ৪ নভেম্বর। ঢাকার মাটিতে পা দিয়েছেন ইলা মিত্র। তেভাগা আন্দোলনের ৫০ তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পুরো নাচোলে তখন উৎসবের আমেজ। ইলা মিত্র দীর্ঘদিন পর আসছেন নাচোলে। এ মাটিতে শত কৃষকের রক্তের দাগ,তবু কোথায় যেন পূণ্যে ধন্য। আজীবন ইতিহাস হয়ে থাকার পূণ্য। ইলা মিত্র যিনি তেভাগা আন্দোলনের একজন কর্মী অথচ ত্যাগ আর তীতীক্ষায় নিঃসীম সাহসে যিনি বরন করে নিয়েছিলেন মৃত্যুর পরোয়ানা। বিভৎস অত্যাচারের দাগ তাঁর শরীরে খুঁজলে আজও পাওয়া যাবে হয়ত, কিন্তু এত মানুষের ভালবাসা ভোলার ক্ষমতা কি ইশ্বর কাউকে দিয়েছেন!
নাচোল ডিগ্রী কলেজের মাঠটিতে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। একধারে বিশাল স্টেজ! পঞ্চাশ বছর আগের তৈরি ইতিহাস আজো উজ্জল,তারই সূত্র ধরে আজকের আয়োজন। অতীত কিংবা ভবিষ্যতের জন্য স্মৃতিবাহক হয়ে থাকে বর্তমান। আগামী শত বছরে নাচোলে আর এমন দিন আসবে কিনা সন্দেহ । ইলা মিত্র এসে পড়েছেন প্রায়। চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে সবার মধ্যেই। মাঠে তিল ধারনের জায়গা নেই। কত দূর দূরান্ত থেকে বাস ভর্তি করে দু এক দিন আগে থেকেই সাঁওতাল রা আসছে। তাদের থাকার জায়গা করা হয়েছে কলেজের রুমগুলোতে। উপজেলা কম্পাউন্ডে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বাস। নাচোলের পথ ঘাট লোকে লোকারন্য। এক লক্ষের বেশী লোক অপেক্ষা করছে ইলা মিত্র কে এক নজর দেখার জন্য।
৩.
গাড়িটা যত নাচোলের পথে এগুচ্ছে ভেতর ভেতর ততটাই অস্থির হয়ে পড়ছেন ইলা। আনন্দ আর বেদনা দু পক্ষের স্মৃতিদের হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে ছোট্ট এই বুকটাতে। বহু দিন পর আসছেন তিনি এত স্মৃতির নাচোলে। কোনো কালেই আবেগ নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখানোর মত মানুষ তিনি নন। এত স্থির,এত শান্ত! বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই তাঁর ভেতরে কি চলছে।
এই সেই নাচোল! মাটির প্রতিটি কনা সেই একই পরমানু দিয়ে তৈরী। শুধু বাইরের রূপ বদলেছে কিন্তু বুক ভরে শ্বাস নিলে সেই পুরোনো গন্ধ পাওয়া যায় বাতাসে।
মাত্র বিশ বছর বয়সে ইলা সেন রমেন্দ্র মিত্রের বৌ হবার সুবাদে ইলা মিত্র হয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার বাড়ির সদস্য হয়েছিলেন।
সেই সব দিন কোথায় হারিয়ে গেছে!
মুক্তমনা রাজনৈতিক দলের সদস্য এক সময়ের অলিম্পিকে সুযোগ পাওয়া প্রতিভাবান নারী বিয়ের সুবাদে ঘরবন্দী রাজকন্যা। শ্বশুর বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে তিনি বন্দী প্রায়। শ্বাশুড়ির মুখে শুনছেন পুরোনো দিনের গল্প আর নিজেকে প্রস্তুত করছেন সেভাবেই। জমিদার বাড়ির গিন্নী একবার স্টিমারে চড়ে বাপের বাড়ি যাওয়ায় শোর উঠলো কে বলে জমিদার বাড়ির বৌদের মুখ দেখা যায়না? ভাশুর রেগে গিয়ে নিয়ম করলেন নৌকাতেই যেতে হবে যেন সাধারন মানুষের যানে যাওয়া জমিদার গিন্নীর মানায়না। নৌকা চলবে হাঁটু পানি দিয়ে আর সামনে সামনে এক লোক হাঁটবে গিন্নীকে অভয় দিতে এই পানিতে পড়লেও ডুববেন না রানী। এসব গল্প ইলামিত্র কে ভীত করে তুলতো সত্যি। কিন্তু এত বছর পর ভাবতে মন্দ লাগছেনা!
ধীরে ধীরে তিনি স্বামী রমেন মিত্রের যোগ্য সহধর্মিনী হয়ে গেলেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হবার পরও রমেন ছিল শোষিত মানুষের পক্ষে। গরীব কৃষকের কষ্ট তাঁর চেয়ে বেশি আর কে জানে। কিন্তু ইলা কম কষ্ট করেন নি। জমিদার পত্নী হওয়ায় সাঁওতালরা একদম বিশ্বাস করেনি ইলাকে।
মাসের পর মাস তিনি সাঁওতালদের সাথে থেকেছেন,একই খাবার খেয়েছেন তাদের ভাষা শিখেছেন। বছর খানেক লেগেছে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে। সেসবই বা তিনি ভুলবেন কি করে। এক একটি উত্তেজনাময় দিন,পার্টির কাজ চলছে গোপনে। এর মধ্যেই মোহনের জন্ম। মাত্র ষোল দিনের বাচ্চাকে শ্বাশুড়ীর কাছে রেখে তিনি তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গোপনে সংগঠিত করছেন কৃষকদের। সরকারের চোখ এড়িয়ে শাষকের বিপক্ষে শক্তি তৈরী করছেন । তখনই সাঁওতাল কৃষকদের রানী মাতা তিনি।
বাস্তবে ফিরেন ইলা। দেখেন তাঁকে বহন করে নিয়ে চলছে গাড়ীটা। গাড়ীতে এই সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। রাশেদ খান মেনন,ফজলে হোসেন বাদশা,আহসানুল হক ইনু। তিনি আবার ডুবে যান স্মৃতির বালিতে।
১৯৫০সালের ৫ই জানুয়ারী সকাল ৯টায় নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত দারোগা তিনজন কনস্টেবল সহ কেন্দুয়া ঘেচুয়ায় কৃষক সুরেন বর্মনের বাড়িতে যায়,তারপর কর্মীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। আরো কয়েকজন কৃষককে ধরে এনে শুরু হয় অকথ্য ভাষায় গালাগালি। পাশের গ্রাম চন্ডীপুরে তখন ঝান্ডা উড়িয়ে সাহায্য চাওয়া হয়। আর দ্রিম দ্রিম করে বেজে ওঠে বিপদ সংকেত। প্রায় ৫হাজার সাঁওতাল নারী পুরুষ জড়ো হয়। মারা যায় ১৫০ কৃষক আর ৪জন দারোগা কনস্টেবল সহ। সরকার ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন রমেন অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ইন্ডিয়ায়। ইলা মিত্র খবর পেয়েই ছুটে আসতে চান। কিন্তু ততক্ষনে হুলিয়া জারি হয়ে গিয়েছে পার্টির কর্মীদের নামে। এক দল সাঁওতালের সাথে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ধরা পড়েন রহনপুর সেনা যাত্রী ছাউনির কাছে।
সেই থেকে শুরু। নাচোল থানার সেই বিভৎস রাতের কথা তিনি এ জীবনে বহুবার ভুলতে চেয়েছেন। চোখের সামনে হরেককে মেরে ফেলল। নির্বিকার হরেক তবু বলেনি রানী মাতা পুলিশ মারতে হুকুম দিয়েছেন।এ মন মিথ্যে কি সে বলতে পারতোনা জীবন বাঁচানোর জন্য!
বুটের নিরবিচ্ছিন্ন আঘাত, হিংস্র পশুর মত একের পর এক জন দ্বারা ধর্ষিত,১০৫ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে জেলে রাত কাটানো ,রাক্ষসের মত কিছু মানুষের অবিবেচকের মত শারীরিক অত্যাচার,গরম ডিম যৌনাঙ্গে ঢুকানোর মত কষ্ট এক জীবনে হয়ত ভুলে যাওয়া যায়। এই যে এখনো তিনি বেঁচে আছেন এত সম্মান আর শ্রদ্ধায় অবনত মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে।
মানুষ অকৃতজ্ঞ নয় বলেই পৃথিবীটা এখনো এত সুন্দর। নবাবগঞ্জ জেলের পর রাজশাহী জেলে তিনি দীর্ঘ এক বছর একাকী সম্পূর্ণ একাকী একটি কক্ষে কাটিয়েছেন। তখন তাঁর নার্ভাস ব্রেকডাউন। পাশের কক্ষেই আরো ১৩ জন মহিলা রাজবন্দী। পরবর্তীতে সেখানে এক সাথে থাকার সময় তিনি ধীরে ধীরে কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন। স্মৃতি তাঁর সাথে বেঈমানী করেনি। তাঁদের দেয়া সাহসে তিনি তাঁর উপর অত্যাচেরের বিবৃতি দেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৫। সমাজের ভয়,পরিবার হারানোর ভয় আর শারীরিক অসুস্থ্যতায় তখন তিনি মুহ্য প্রায়।
অবশেষে ঢাকা মেডিকেলে প্যারোলে চিকিৎসার জন্য মুক্তি। ডাক্তার রা বুঝেছিলেন বাঁচানো সম্ভব নয়,তাই হয়ত দীর্ঘ সাত বছর পর ব্যবস্থা করেছিলেন মোহন কে দেখানোর। কলিজার টুকরা একমাত্র সন্তান ইলা মিত্রের। রমেন মিত্রের সাথেও তখন দীর্ঘবছর পর দেখা হয় ইলার। হাসপাতালের বেডে শুয়ে। সেই প্রথম দিনের ভালবাসায় এক সাথে হাতে হাত রেখে চলার অঙ্গীকার যেন ভালবাসায় ভেজা জল হয়ে চোখ বেয়ে ঝরছে।
৪.
একটু একটু ভেতরে ভয় হতে থাকে ইলা মিত্রের। এত বছর পর কিভাবে নেবে নাচোলের মানুষ! সে সময় যত কৃষক মারা গেছে, অত্যাচারিত হয়েছে,পুড়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম,সেসব মানুষ ইলাকে আপন ভাববেতো।নাকি মুখ ফিরিয়ে নিবে!
বেদনায় ভেতরটা টন টন করে ওঠে ইলা মিত্রের।যদি এমন হয় তিনি কিভাবে ফিরে যাবেন,এত দিন ধরে বেঁচে থাকাটা কি নিরর্থক নয়!
নাচোলে প্রবেশ করেছে গাড়ি। চোখ জুড়িয়ে যেতে থাকে ইলা মিত্রের। পথের দুধার শুধু মানুষ আর মানুষ। এরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে! ভয় ভেঙে যেতে থাকে তাঁর। স্টেজে উঠে একটু অসুস্থ্য বোধ করেন তিনি। এত দীর্ঘ জার্নি,সত্তুর বছর বয়সে এসে শরীর এত ধকল নিতে পারেনা হয়ত! কিন্তু ভালবাসার শক্তি বড় অদ্ভুত। তিনি জোর পান ভেতরটা আবেগে মথিত হতে থাকে তাঁর।
তিনি তৈরি হতে থাকেন ভেতরে ভেতরে,আজ কিছু বলার সুযোগ এসেছে,আর হয়ত কখনো পা রাখা হবেনা এই মাটিতে। জীবন কি এত সুযোগ দেবে বারবার!
ছোট্ট ফুটফুটে একটা মেয়ে কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কি নাম তোমার মা?হালকা যেন অনেক দূর হতে আসে কানে উত্তর টা। তিনি তখন আবার ডুবে যাচ্ছেন অতীতে।
কেউ এসে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বাচ্চা মেয়েটির হাত। তিনি তাকিয়ে আছেন স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে।
মাইক্রোফোন হাতে যখন তিনি কিছু বলার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিকে অসহ্য নিরবতা। তাঁর চোখ ঝেঁপে আসছে জলে। আবছা হয়ে যাচ্ছে এতগুলো সন্তানের মুখ!
৫.
: কি রে পুলপু রানী মাকে কেমন দেখলি?
: যাও দাদা তোমার সঙ্গে কথা নাই। উনি রানী নাকি? দূর্গার দিদুর মত দেখতে বুড়ি, চোখে চশমা। রানী আবার এমন হয় নাকি!
: ওরে পাকনী! তোকে যে স্টেজে দেখলাম! কি করছিলি? কথা বলল তোর সাথে?
: হ্যা আমার থুতনি নেড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে। নামও জিজ্ঞেস করলো। তারপর আব্বু আমাকে নামিয়ে নটবর কাকার হাতে দিয়ে বলল বাড়িতে রেখে আসতে। তোমাকে তো দেখলাম না দাদা। তুমি কোথায় ছিলা?
: আমি ছিলাম ওখানেই। আর কি কি দেখলি বলনা?
: দাদা জানো কেমন যে লাগছিল! খালি কালো চুল আর কালো মানুষ। মানুষের মাথা আর মাথা।
: তুই রানীকে দেখা বাদ দিয়ে এসব দেখেছিস?
হা হা করে হেঁসে উঠতেই রুবা চোখ পাকিয়ে বলে দাদা শোন আর গুল মারিওনা। রানী না ছাই! তুমি কিন্তু আমাকে কাল সাইকেলের সামনে যদি না উঠিয়েছো....
রুবা আর ছোড়দার খুনসুটি কেবল শুরু....।

উৎসর্গ : ফাইরুজ।সদা লাস্যময়ী এই ব্লগার অল্প দিনের মধ্যেই কমেন্ট করে সবার মন জয় করে ফেলেছে।তার নাচোলের ইলা মিত্রের প্রতি আগ্রহ আমাকে গল্পটি লিখতে উৎসাহ জুগিয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


