somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অথবা বলা যেতে পারে গল্পটির কোনো নাম নেই...

২৪ শে জুন, ২০১১ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাতুলের কথা;

টানা ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। এতক্ষন উপেক্ষা করেছে। এবার বিরক্ত হয়ে কেটে দিল রাতুল। সারা শরীর ঘামে ভেজা। রিকশা ওয়ালা গুলা একেকটা এমন হারামি। খালি রিকশা টানছে। যাবেন বললেই এমন ভাব নেয় যেন কানে শোনেনা!

সূর্য মাথার উপর। বাংলা ভাষায় গনগনে বলে একটা শব্দ আছে । আগুনের মত রোদ! ঠিক তালু ফুঁড়ে ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। এখন একটা রিকশা টিকশা না পেলে ভেতরে সব কলকব্জা গলে ছাতু হয়ে যাবে। চামড়ার স্যান্ডেল আর পায়ে দেয়ার মত অবস্থায় নাই। মনে হচ্ছে রাস্তার পিচ গলে স্যান্ডেলে লেগেছে, দুনিয়ার ভারী হইছে তার উপরে ঘামে পা পিছলিয়ে যাচ্ছে।

হাতের পেপারস গুলোর দিকে আর একবার তাকিয়ে একটা ছোট পানবিড়ির দোকানের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় রাতুল। বাবা একটার পর একটা সিগারেট খেত। ছোটবেলার অধিকাংশ স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়। রাতুলের তিন চার বছরের স্মৃতিও দিব্যি মনে আছে। সে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আপন মনে শব্দের পিঠে শব্দ বসিয়ে খেলছে। বাবা তার জন্য বাঁশের তৈরি ভুটভুটি গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। উঠান থেকেই চিৎকার করে ডাকছে কই রে সব! আমার ছোট ব্যাটা কই?
বাবার এই ডাকটা রাতুলের কানে এখনো স্পষ্ট আসে।

এত ছোট বেলায় বাবা মরে গিয়ে রাতুলকে যে অগাধ জলে ফেলে গেছে এমনটা নয়। তবে একটা লাভ তো হয়েছেই। রাতুল অন্যের উপর নির্ভর করেনা। টিউশনি করে নিজেই নিজেকে চালায়। আর মাত্র ক মাস!
অনার্সের রেজাল্ট হবে! কোনো একটা চাকরি!

- হু স্বপ্নটা একটু বেশিই দেখে ফেলছো ব্যাটা''

এমন করেই বলে তার আপন বন্ধু। ওর একটা বহু পুরোনো নাম আছে। অথচ বন্যা তাকে কোকিল বলে। এই নিয়ে এই বিশেষ মানুষটার সাথে তার কম ঝগড়া হয়না।
এত সংগ্রামের মধ্যে প্রেম অবশ্যই বিলাসীতা। তারপরও কেমন কেমন করে তার প্রেম হয়ে গেছে। ইন্টারে পড়ার সময় একবার সিরিয়াস প্রেমে পড়েছিল মেয়ে পাত্তা দেয়নি।
রাস্তাঘাটে প্রায়ই সুন্দরী মেয়েদের প্রেমে পড়ে যায় সে। আর এই মুহূর্তে কেটে দেয়া ফোনটাও তার বিশেষ মানুষ।

সারি সারি জ্যামে আটকে থাকা প্রাইভেট কার গুলোর দিকে তাকিয়ে শরীরে জ্বলুনী টের পায় সে। তবে উপেক্ষা করা যায়, এমন একটা গাড়ি তারও হবে এমন সুখস্বপ্নের কথা ভেবে।

টু..টু... বিরক্ত হয়েই চিপা জিন্সের পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে রাতুল। বন্যার ফোন। উফ.. ফোনটা কেটে দিতে তার একটুও বাধেনা। সাইলেন্ট করে ঢুকিয়ে রাখে পকেটে। বন্যা ফোন দিতেই থাকবে। বিরক্তিতে রাতুলের ভ্রু কুঁচকে যায়।

প্রায় আধাঘন্টার চেষ্টায় একটা সি. এন. জি রাজী হল বাংলামোটর যেতে।
ফোন বের করে হাতে নিয়ে দেখে আঠারোটা মিসকল। সতেরোটাই বন্যার। একটা ফয়সালের। তার দুই মাত্র আপন বন্ধুর একজন। আপন বন্ধু নামটা রুমেলের দেয়া।
ঠোঁটে ঝুলে থাকা হাঁসিটা সি.এন. জি জয়ের জন্য নাকি আপন বন্ধু কথাটা ভেবে কে বলবে!
দুএকবার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় শব্দটা। আনমনে ডায়াল করে বসে বন্যাকে। ও প্রান্তে ফোনটা ধরতেই ঠান্ডা গলায় রাতুল বলতে থাকে,

- মেয়ে শোন, তুমি মারাত্মক বিরক্তিকর। এভাবেও বলা যায় যে মাত্রাতিরিক্ত! এটা তুমি নিজেও জানোনা। যা হয়েছে হয়েছে, ফোন দিয়ে আমাকে আর বিরক্ত না করলে খুশি হব। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।

দাঁতে চিবিয়ে চিবিয়ে কথা কটি বলতে রাতুলের দ্বিধা হয়না।
ওপাশের আর্তনাদ উপেক্ষা করে ফোন কেটে দিল সে।
আবার ফোন!
ওহ এই মেয়েরে নিয়েতো আর পারিনা!


বন্যার কথা;

বন্যা আজ খুব তাড়াতাড়ি কলেজ থেকে ফিরেছে। কোনো কিছুতেই মন লাগছিল না তার। আইনুল ঐ লুচ্চা খচ্চর স্যারটা এমন বিশ্রী করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল! একবার বন্যা ভাবলো একটা সিনক্রিয়েট করতে পারলে মন্দ হতনা। ধরা যাক সে ক্লাস ভর্তি মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ওড়না সরিয়ে বলবে,স্যার আর কিছু দেখবেন?''
এমন হলে স্যারের চেহারা কেমন হবে ভাবতেই হাসি এসে যায়। স্যার যেহেতু তাকিয়েই ছিলেন হয়ত অপমানিত বোধ করে থাকবেন।
- এই মেয়ে খুব হাসি পাচ্ছে? বই খাতা নিয়ে বাইরে চলে যাও। ইচ্ছে মত হাসতে পারবা।''
বন্যা খুশি মনেই বই খাতা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। স্যার অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন। ছাত্রী সরি বলবে হয়ত এমনটায় আশা করেছিলেন তিনি।

গতকাল রাত থেকেই বন্যার মন খারাপ। ক'দিন পরপর রাতুল এমন করে। সামান্য ব্যাপার নিয়ে তুলকালাম কান্ড বাধায়। বন্যা এখনো জানেনা তার অপরাধ কি!
রাতুলের অতীত হয়ে যাওয়া মুঠোফোনের মেসেজ গুলো দেখে তার কান্না এসে যায়।

কি মধুময় ছিল একেকটা দিন! প্রথমদিকে রাতুল কে পাগল ছাড়া আর কিছুই মনে হতনা বন্যার। তার জন্য পাগল।

- ভালবাসা আছে?''

ওহ কি মিথ্যে! কি ভন্ডামি! তোমার ভেতরে আমার জন্য ভালবাসা ছিল রাতুল? গলার কাছে কান্না এসে আটকে থাকে বন্যার। খুব মনে আছে এর উত্তরে সে রাতুলকে মেসেজে বলেছিল,

- আগুন হয়ে আছে। পুড়ে যাবে তুমি।''

আরেকটা মেসেজ ওপেন করে বন্যা।

- আমি এতদূর থেকেই পুড়ে যাই। বাবুন তোমার এতই ক্ষমতা!''

উফফ...! এই তোমার পুড়ে যাওয়া? আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি রাতুল। আমি মরে যাচ্ছি। প্লিজ রাতুল প্লিজ! ফোনটা ধর। প্লিজ...
কেটোনা রাতুল। না...
একবার.. দুবার.. তিনবার..
এভাবে আমাকে তুমি ভুলে যেতে পারোনা। কোনো কারন বলবেনা? আমি যে নিজেকে বোঝাতে পারছিনা। গলা ছেড়ে একলা বাড়িতে বন্যা কাঁদে।
কাঁদতেই থাকে।
আমি তোমার জুঁইবালিকা রাতুল!

উঁহু তুমি আমার কনকচাঁপা।

তাহলে বকুল কন্যা কে?

খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়া মেয়েটি ছিল সে। চোখ বন্ধ করলে নিজেকে দেখে বন্যা।
প্রায় আট মাস ধরে এই ছেলেটা তার চেনা। বিচ্ছিরি রকমের বড় হওয়ার সাথি। কত দ্রুত বড় হয়ে গেল, কত দ্রুত কষ্টের ভেজা জলে স্যাঁৎস্যাঁতে হয়ে যাচ্ছে তার পৃথিবী।

হঠাৎ স্ক্রীনে রাতুলের নম্বর। ধ্বক করে ওঠে বুক।
কান্না আর উৎকন্ঠায় হ্যালো রাতুল--
যেন রাতুলের কানে পৌঁছায়না, ভেসে ভেসে বাতাসে ছড়িয়ে যায়।
ওপারের মুঠোফোনে থাকা ছেলেটি এক নাগাড়ে বলতে থাকে, তাকে স্পর্শ করেনা মেয়েটির আবেগ!
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে বন্যার। তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলতে থাকে রাতুল,

-মেয়ে শোন, তুমি মারাত্মক বিরক্তিকর। এভাবেও বলা যায় যে মাত্রাতিরিক্ত! এটা তুমি নিজেও জানোনা। যা হয়েছে হয়েছে, ফোন দিয়ে আমাকে আর বিরক্ত না করলে খুশি হব। ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।

না... বন্যার আর্তচিৎকার ঘরের দেয়ালে আটকে থাকে। ততক্ষনে ফোন রেখে দিয়েছে রাতুল!

আমার কথা;

গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। মাঝখানে বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। বন্যার এমনটা প্রাপ‌্য নয়। পৃথিবীতে কত কি তো অকারনেই ঘটে। অকারনে ভালবাসা হয়, আবার অকারনে ভেঙে যায়!
সময়ের পাখা থাকে। কত কি ঘটতে থাকে রোজ! আমার আর গল্পের শেষ টুকু লেখা হয়না। মাঝে মাঝে বসি। কলম দাঁতের মধ্যে নিয়ে ইচ্ছে মত কামড়ায়,কাগজের কোনায় শব্দ অক্ষর লেখার থেকে আমার বেশি আগ্রহ থাকে ফুল লতা পাতা আঁকার।
হঠাৎ করে একদিন লক্ষ্য করি, চরিত্রগুলোর প্রতি আমার মমতা জন্মে যাচ্ছে।
মেয়েটিকে যেমন আমার ছোট্ট একটা নরম পাখি মনে হয়, তেমনি ছেলেটির অবাধ্যতা, কঠিন আচরনেরও একটা দূর্বার আকর্ষন খুঁজে পাই আমি।
আমার মনে হতে থাকে জগতের সব কিছুই ভালবাসার জন্য হয়।
এত কষ্ট দেয়াটাও একসময় বুকে টেনে নেবার জন্যই।
তাই যখন মাস ছয়েক পরে বন্যার মুঠোফোনে একটা ক্ষুদেবার্তা আসে আমি আর অবাক হইনা।

গল্পের শেষটুকু;

বন্যা অবাক হয় ভীষন। রাতুলের মেসেজ! কোনো রকমে কাঁপা কাঁপা হাতে মুঠোফোনটা ধরে থেকে পড়তে থাকে সে,

- মেয়ে তোকে অনেক কাঁদিয়েছি। তবু ভালবাসার দাবী নিয়ে বলছি, হাত বাড়ালে ঘর ছাড়তে পারবি? আমার একটা চাকরি হয়েছে।''

যেন এটাই স্বাভাবিক! মাঝের কটা দিন আসলে আসেনি। ওসব ছিল দুঃস্বপ্ন। কেটে গেছে। ভোরের আলোয় এখন তার নতুন দিনের শুরু।

নিজের মনে সে আবৃত্তি করতে থাকে,

'' আমাকে কে ভালবেসে জেগে থাকে রাত
নেই যেন জানার উপায়
কতটুকু আর লিখে বলা যায় কাগজে পাথরে
কথা ও চোখের ইশারায়...''



অ:ট: শেষের চমৎকার চার লাইন কবি স্বদেশ হাসনাইনের রচনা। তাঁকে ধন্যবাদ এত সুন্দর কটা লাইন লেখার জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:০২
৪৭টি মন্তব্য ৪৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×