বিনা বিচারে মানুষ চরম মানবাধিকার লংঘন, জঘন্য অপরাধ। এ অপরাধ যখনই সংঘটিত হয়, আমাদের গনমাধ্যম সোচ্চার। ইংরেজীতে একে বলে এক্সট্্রা জুডিশিয়াল কিলিং। কিলিং যারাই ঘটায় গনমাধ্যম কাউকে রেহাই দেয়না, সেটা ব্যক্তি,দল এমনকি রাষ্ট্র হলেও। রাষ্ট্রের বিষয়টি এসেছে ক্রসফায়ারের সাথে। এ কয়দিনে শিক্ষাঙ্গনে যে হত্যা হয়েছে তার, বিরুদ্ধে গনমাধ্যম প্রধান শিরোনাম করেছে, লেখকরা লিখেছেন এখন ও লিখছেন। অর্থাৎ বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে, আলোচনার প্রয়োজন ও ছিলো। বিষয়টা সবাই ঘৃনার চেেেখই দেখছেন। নিরীহ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালযে পড়তে এসেছে লাশে হতে নয়।--গনমাধ্যমের এ বিষয়টিকে হাইলাইটস করা ছিলো সময়ের দাবী, সেটা তারা করেছে,এজন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এর পাশাপাশি নিরীহ মানুষ হত্যার অন্যান্য বিষয়গুলোও এভাবে ব্যাপক আলোচনার দাবী রাখে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তে মানুষ হত্যার বিষয়টি গনমাধ্যম কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। সীমান্তে কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে। বিএসএফ নির্বিচারে ব্াংলাদেশীদের হত্যা করছে। বিএসএফ যেখানে রক্ষকের ভূমিকায় থেকে ভক্ষকের ভূমিকায় উত্তীর্ন সেখানে আমাদের গনমাধ্যমের সরবতা তেমন লক্ষ্যনীয় নয়। বাস্তবতা ও আছে বটে, কারন মিডিয়া এ বিষয়ে শিরোনাম করলেতো প্রায় প্রত্যেক দিনই একই শিরোনাম হয়ে যাবে, এটা মিডিয়া আইন বিরোধী হয়ে যাবে কীনা! আবার একই সংবাদ কতো দেয়া যায়, বেশী দিলে তেতো হয়ে যেতে পারে। এজন্য পত্রিকা গুলো দায়সারা গোছের সংবাদ দিয়েই ক্ষান্ত হয়।
ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী রাষ্ট্র, আযতনে তারা আমদের চাইতে কয়েক গুন বড়। ভারত যেমন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও তেমন। আযতনে বড় বলে তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফ এর এ অধিকার নাই যে তারা বাংলাদেশীদের হত্যা করবে। আশ্চর্য়ের বিষয় হলো যখন আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন ঠিক তার প্রাককালে এবং সে দেশে আবস্থানকালীন সময় ও বিএসএফ আমাদের নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে।
গত মাসের ১০ জানুয়ারি ছিলো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, এর আগের দিন ৯ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বেনাপোল সীমান্তে মনিরুল ইসলাম এবং হজরত আলী নামে দুজনকে হত্যা করে। এদের একজন নিরীহ কৃষক আরেকজন গরু ব্যবসায়ী। আগে যেটা দেখা যেতো শুধু গুলি করে হত্যা, এবার পিটিয়েই হত্যা করেছে গরু ব্যবসায়ীকে। ১০ জানুয়ারি প্রধান মন্ত্রী ভারত গেলেন। ১২ তারিখ তিনিতখনও ভারতে সে অবস্থায়ও দৌলতপুর সীমান্তে ১ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে ১ জনকে। ১৩ তারিখ প্রধানমন্ত্রী সফর শেষ করে বাংলাদেশে আসেন সেদিন সাতক্ষীরা সীমান্তে ১জন নিহত হয় বিএসএফ এর হাতে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে অত্যন্ত এ কয়দিনের জন্য হলেও এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা যেতো। যাইহোক প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল । প্রধানমন্ত্রী তার সফরে নিশ্চয়ই বিএসএফ এর এ খুনি আচরন বন্ধের বিষয়টি উল্লেখ করছেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাঁর সফরের আগে, সফরকালীন সময়ে এবং এর পরের বিএসএফ এর সে নিরীহ মানুষ হত্যার চিত্রের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং বেড়েই চলেছে খুনের পাল্লা। গত ১৪ তারিখ রোববার এর আগে ৬ ফেব্রƒয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ৩০ জানুয়ারি, ২৮ জানুয়ারি ও এ হত্যাকান্ড হয়েছে। কাউকে মেরেছে গুলি করে আবার কাউকে পিটিয়ে।
শেষ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ এর অতর্কিত গুলিতে এক মহিলা সহ আহত হয়েছেন চার বাংলাদেশী। সীমান্তের একই স্থানে ৪ ফেব্র“য়ারি গুলি চালিয়ে এক বিডিআর সদস্যকে হত্যা কওে বিএসএফ। লাশ নিয়ে যাওয়ার একদিন পর ফেরত দেয় তারা। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরও আগের হিংস্রতা কমেনি।
এর আগে এ সমস্যার সমাধানে গত ১০ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই বিডিআর ও বিএসএফ-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক হয়। ঢাকার বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় অনুষ্ঠিত হয় এ বৈঠক। বৈঠকের সফলতার কথা বলেছিলেনন দুই মহাপরিচালক-ই। বৈঠক সফল হলেও কতটা সুখকর হয়েছে তা-ই প্রশ্ন। প্রথম দিনের ঘটনা ছিলো সত্যিই দুঃখজনক। তিন দিনের বৈঠকের বসতে না বসতেই খবর বিএসএফের গুলিতে দুজন বাংলাদেশি নিহত। আশ্চর্য বৈ কি! নিস্ফল দুটি প্রাণ। কোনো কারণ নেই। একজন কৃষক। মাঠে কাজ করছেন। হঠাৎ বিএসএফের গুলি। সাথেসাথে প্রাণ হারান। অন্যজন ব্যবসায়ী। গরু কিনে বাংলাদেশে আসছেন। বিএসএফের গুলিতে তিনিও প্রাণ হারান।
নিরীহ প্রাণগুলো ঝরে যাচ্ছে। নির্বিকার বিএসএফ। বৈঠক হয়েছে অনেক। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিএসএফ দাবি করেছে নিহতদের মধ্যে ৮৫ ভাগ-ই অপরাধী। গুলির যত ঘটনা ঘটেছে সব-ই রাতে। বিএসএফ বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। ভারতের সীমান্ত রক্ষায় অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে তারা। শ্রদ্ধা করি তাদের। কিন্তু সীমান্তের এ হত্যাকা্েন্ড বিএসএফ এর যুক্তি কতটা ব্স্তাব সম্মত । সেদিন দুজনের হত্যা কী প্রমান করে। তারাতো রাতে নিহত হননি তারা চোরা কারবাবী ও ছিলেন না। অতীতের এ নিরীহ মানুষ গুলি করে হত্যার দৃশ্য আরো করুন। বিএসএফ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে বৈঠকের প্রথম দিন অর্থাত ১০ জুলাই পর্যন্ত ৫৯ বাংলাদেশীকে গুলি কওে হত্যা করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ”অধিকার” এর দেয়া তথ্য মতে, গত ১০ বছরে বিএসএফ এর হাতে ৮৪৮ জন বাংরাদেশী নিহত হয়েছে আহতের সংখ্যা ১০০০ এর মত।,এছাড়া ও ধর্ষন হয়েছে, অনেক বাংলাদেশী ধরে নিয়ে গেছে যাদেও কোম হদিস মেলেনি।
বিএসএফ এর গুলিতে ২০০৮ এ মোট নিহত হয়েছে ৬২ জন। জানুয়ারী ২০০৮ থেকে ১০ জুলাই, বিডিআর-াবএসএফ বৈঠকের প্রথম দিন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১২১ জন। ২০০৭ এ নিহত হয়েছে ১২০ জন। ২০০৬ এ ১৪৬ জন্ ২০০৫ এ১০৪ জন। ২০০৪ এ ৭৬ জন। ২০০৩ এ ৪৩ জন। ২০০২ এ ১০৫ জনঅ ২০০১ এ ৯৪জন। এবং ২০০০ সালে ৩৯ জন নিরীহ বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ এর গুলিতে নিহত হয়েছে ।
এ ১০ বছওে বিডিআর-ব্এিসএফ বৈঠকের সংখ্যা ও কম ছিলোনা। বিডিআর-বিএসএফ সমঝোতা ও হয়েছে অনেক বার। কিন্তু বেপরোয়া বিএসএফ, কোন চুক্তি, সমঝোতা কিংবা অলোচনাকে আমলে নেয়নি তারা।
বাস্তবে দেখা গেছে সীমান্তে গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন অধিকাংশই কৃষক। যারা কৃষি কাজ করে জীবন ধারন করেন। এছাড়া ও নিহতদের মধ্যে রয়েছে জেলে, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, রাখাল, নারী এমনকি শিশু ও ।
ভারত বলেছে তাদের সীমানায় তারা অপরাধীদের নিধন করেছে, অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এরা অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেও সীমানায় । ৪১৪৪ কিলোমিটার সীমান্ত এর মধ্যেই এত হত্যা। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে বিএসএফ এর গুলিতে বেশী নিহত এলাকা গুলো হলো- সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাংগা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাপাইনবাব গন্জ. নওগা, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম।
এসব এলাকার সীমান্তবর্তী মানুষ খুবই গরিব । অধিকাংশই কৃষিকাজ করে খায়। এছাড়াও মাছ ধরে কিংবা কোনমতে জীবনধারন করে খায়। এ অসহায় মানু ষগুলো সবসময়ই বিএসএফ এর গুলির ভয়ে তটস্থ থাকেন ।
বিএসএফ এর এ বেপরোয়া ভাবের কথা খোদ ভারতেও শোনাযাচ্ছিল। ভারতের মোচার্” নামক একটি মানবাধিকারন সংগঠন তাদের এক জরিপে বলেছে, ২০০৮ এর জানুয়ারী থেকে ১৩ জুলাই ২০০৯ পর্যন্ত এ ১৯ মাসে বিএস এফ এর হাতে ভারতেরই ১৮ জন নাগরিক মারা গেছে।
বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা সম্পর্কে বিএসএফের বক্তব্য” গুলিতে নিহত হওয়া ৮৫ ভাগই অপরাধী। তাদের এ বক্তব্য যদি সঠিক ও হয়, অপরাধী হলেই কী তাদের দেখা মাত্রই গুলি করতে হবে? গুলি করে হত্যা ই কী সমাধান..?এ ছাড়া বুঝি কোন পথ নেই। দেখা মাত্রই গুলির প্রবনতা বন্ধ হওয়া উচিৎ
চোরাকারবারী, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, নারী-শিশু পাচারকারীদেও মতো অপরাধীদেও বিরুদ্ধে সীমান্তে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেটা যে দেখলেই সাথে সাথে গুলি, তা নয়। গুলির এ প্রবনতার ফলে নিরীহ মানুষ বিনা অপরাধে মারা পড়ছে। আবার সীমান্তে অনেক সময় সীমানা চিহ্নের খুটি দেখা যায়না, ভুলে কেউ ওপাওে গেলেই গুলি চালায় বিএস্এফ।
বিডিআর-বিএসএফ বৈঠকে অবশ্য এ নিরীহ নাগরিক হত্যার বিষয়টি প্রধান্য পেয়েছিলো। বিএসএফের মহাপরিচালক মাহেন্দ্র লাল কুমাওয়াত এ হত্যা বন্ধের অংগীকার করেছেন। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে পাকিস্তান-ভারত সীমান্তেও মত যৌথ টহলের ব্যবস্থা করলে হয়তো এ হত্যা বন্ধ হতে পারে।
ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। প্রতিবেশী বললেও পরিচয়টা খাটো হয়ে যায়্। ভারত গোটা বাংরাদেশকে ঢেকে রেখেছে। প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এ ব্যাপারে ভারতের আগ্রহ সেভাবে লক্ষ্যনীয় নয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে অনেক অমীমাংসিত সমস্যা রয়েছে। প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত করা এখনো বাকি রয়েছে। আমাদের তালপট্টি দ্বীপ রয়েছে ভারতের দখলে। ছিটমহর সমস্যা জিইয়ে রেখেছে ্্ ভারত আমাদের উপক’লীয় গ্রাস-তের ক্ষেত্্র গুলোকে আন্তর্জাতিক লিজ দেয়ায় বাধা সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক ফোরামে এগুলোর মালিকানা দাবী করে বসেছে।
একবার ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে বাংলাদেশের একাংশকে মরুকরনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশে ান্য একটি বিস্তীর্ন অন্চল বিপর্যত্ত করে তোলার পথে।
ভারতের সাথে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও অন্তত নিরীহ মানূষ হত্যার বিষয়টির জরুরী সমাধান হওয়া দরকার। সীমান্তে বারবারই জিরো টলারেন্স নীতির কথা শোনা যায়। কিন্তু বস্তবে ফলেনা। আমাদের নিরীহ বাংলাদেশীদেও গুলি কওে, পিটিয়ে এমনকি বিদ্যুতের শক দিয়ে মারছে। এগুলো কখনোই মেনে নেয়ার মআে নয়। আমরা আমাদের সার্বভৌম কী এভাবেই ভারতের হতে বিকিয়ে দেবো?
পাশাপাশি দুই দেশের উন্নয়নে বন্ধুত্বতা জরুরী। এর জন্য আলোচনার বিকল্প নেই । সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশের অর্থনৈতিক, বানিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। আমরা প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশী সুলভ আচরনই চাই। এটা সত্যিকারই দুঃখজনক এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের নিরীহ লোকগুলো প্রাণ হারাবে। এ বিষয়ে সমঝোতা বৈঠক হলেও বাস্তবে ফলবেনা।
বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক অনেক ভালো বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভালো সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এ বিষয়টির দফারফা করা সময়ের দাবী। সরকার নিশ্চয়ই চাইবেননা আমাদের নাগরিকরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে এভাবে মারা পড়–ক। দেশের স্বার্থে, নাগরিকের কল্যানে এ ব্যপারে সরকারের কিছু করা আবশ্যক। সীমান্তের সাথে জড়িত তাদের কর্র্র্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রের উচ্চ মহলে আলোচনা বা যেভাবে সম্ভব একটা সমাধান সবাই চ্ায়।
আমাদের বিশ্বাস বিএসএফকে তাদের খুনি আচরন বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগ কজে দিবে। নিরীহ কোন বাঙ্গালী আর এভাবে বিনা বিচরে মারা যাবেনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



