হাসিব সাহেব রাশেদের বাসায় প্রথম বেড়াতে এসেই চমকে গেলেন।
হাসিব সাহেব কোম্পানীর বড় কর্মকর্তাদের একজন হলেও মনটাও তার বড়। ছোট পদের সহকর্মীদের দাওয়াত গ্রহনে কোন আপত্তি করেন না। রাশেদ কোম্পানীতে যোগ দিয়েছে মাত্র কয়মাস আগে। হাসিব সাহেবের বদান্যতার কথা শুনে ধুম করে একটা দাওয়াত দিয়ে দিলে হাসিব সাহেব তা গ্রহনও করলেন।
হাসিব সাহেবের চমকে যাওয়ার কারনটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। ১৫ বছর আগে এই বাসাটিরই ভাড়াটিয়া ছিলেন তিনি। আর ঐসময় রাশেদের মতই একটি ছোটখাট চাকরি করতেন ওনি অন্য একটি অফিসে। আশেপাশের অবস্থাদির পরিবর্তন ঘটলেও বাসাটির খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি। বয়স বেড়ে জীর্নশীর্ন হয়েছে শুধু।
বাসাটিতে ঢুকতেই পুরানো দিনের সৃতিচারনে আবেগাক্রান্ত হলেন হাসিব সাহেব।
সাংসারিক জীবনের হাসিকান্নার প্রথম কয়টি বছর এই বাসাটিতেই কাটিয়েছেন তিনি।
টানাটানির সংসারটির অপুর্নতাকে ভালবাসায় ভরিয়ে দেয়া ছোট্ট সংসারটির কথা মনে পড়তেই একধরনের দু:খের আবেশ ছড়িয়ে পড়ল তার পুরো মনটা জুড়ে।
ধীরে ধীরে নিজেকে আবিস্কার করতে শুরু করলেন এক যুগেরও আগের সেই সংসারে।
এরই মাঝে রাশেদের বৌ চা নাস্তার পর্বটি শেষ করে মুল খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাশেদের বৌকে দেখে নিজের প্রৌড়া স্ত্রীর যৌবন কালের চেহারাটিও ভেসে উঠল তার মনে, যে চেহারাটি ছিল সারল্যে আর বিনয়ে ভরা। তার স্ত্রীর জীবনটি শুধু তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল। তার সুখ দু:খের অনুভুতিগুলি প্রকাশ পেত শুধুমাত্র তাদের পারস্পরিক স্বর্গীয় সম্পর্কটিকে নিয়েই।
অথচ ইদানিংকালে প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা বাক্যালাপ হয় না স্ত্রীর সাথে। সংসারের এবং তার ব্যক্তিগত আয় উন্নতি ধীরে ধীরে তার এবং তার স্ত্রীর মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল গড়ে দিয়েছে।
একসময় উঠে দাড়িয়ে জানালার পাশে দাড়ালেন হাসিব সাহেব। ১৫ বছর আগে যে খালটি বর্ষাকালে পানিতে ফুলে ফেপে নদীর আকার ধারন করত দালান কোঠা আড়ালে তাকে খুজেপেতে কষ্ট হল তার। তিনি ভাবেন তার মনের ভেতরের অনেক আবেগ অনুভুতিও ঐ খালটির মত শুকিয়ে নালা হয়ে গেছে। তবুও দুপুরের সূর্যের প্রখর আলোতে তার অনুভুতিগুলি একসময় শানিত হতে শুরু করে। কোথাও কর্কশ গলায় কাক ডাকতে থাকে। আশেপাশে কাপড় কাচার শব্দের সাথে পানির নল থেকে পানি পড়ার শব্দটাও তার খুব পরিচিত মনে হয়। ইন্দ্রিয়লব্দ সমস্ত অনুভুতিগুলোকে তিনি চেষ্টা করেন সময়ের রথে চড়িয়ে দিয়ে ১৫ বছরের আগের সময়টিতে নিয়ে যাওয়ার যেখানে তার সংসার জীবনের প্রথম বছরগুলোকে পার করে দিয়েছিলেন। এক সময় কানপেতে শুনার চেষ্টা করেন এঘর ওঘোর ছোট ছোট পায়ের ছোটে বেড়ানোর শব্দ। আর মাঝে মাঝে শিশু মুখের অবোধ্য ভাষার ছোট ছোট শব্দগুলো যা বাতাসে গুনগুনিয়ে বেড়ায়। বুকের ভেতর খা খা করতে থাকে তার।
একসময় রাশেদের "স্যার সম্বোধনে সম্বিত ফিরে পান হাসিব সাহেব।
দুপুরের খাবারের আয়োজনটা ভাল হলেও খুব বেশি মুখে তুলতে ইচ্ছে করেনা হাসিব সাহেবের। কষ্টের একটা ছোয়া তার মনটাকে আছন্ন করে থাকে। রাশেদের বৌ ঘোমটা টেনে সামনে এসে দাড়িয়ে এসে নিচু গলায় শুধায়, "ভাইজান আমার রান্না কি খুব বাজে হয়েছে?"
"আরো কয়েকবার না খেলে ভালমন্দ যাচাই করা যাচ্ছেনা যে" হেসে হেসে বলেন হাসিব সাহেব।
একসময় বিদায় নেয়ার জন্য উঠে দাড়ান হাসিব সাহেব।
"তোমার না একটা ছেলে আছে বলেছিল" হঠাত মনে পড়তেই জিগ্গেস করেন হাসিব সাহেব।
কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে রাশেদ। রাশেদের বৌ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফুপিয়ে উঠে।
"কি ব্যাপার তোমরা কিছু লুকোচ্ছ নাকি?"
"স্যার বেড়াতে এসে আপনার মন খারাপ করবে বলে বলা হয়নি, আমার ছেলেটা কয়মাস ধরে খুবই অসুস্থ।"
"ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দাও আমার" রূঢ় সুরে কথাগুলো বলেন হাসিব সাহেব।
কিছুক্ষন নীরবে দাড়িয়ে থেকে রাশেদ হাসিব সাহেবকে নিয়ে পাশের আরেকটি কক্ষে প্রবেশ করে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই বিষাদময় একটি পরিবেশে নিজেকে আবিস্কার করেন হাসিব সাহেব। বিছানায় শুয়ে থাকা আটনয় বছরের ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আতকে উঠেন তিনি। ছোট্ট শরীরটা বিছানায় একেবারে মিশে গেছে। পরম মমতায় ছেলেটির চেহারায় চোখ বুলিয়ে নেন তিনি। ছেলেটির চেহারার দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই মনে পড়ে তার। আবেগে বুক ভেংগে আসতে চায় তার। কিন্তু নিজেকে সংযত রাখেন তিনি। ছেলেটি শিয়রে বসে আশেপাশে চোখ বুলান খুব সতর্কতার সাথে। কি একটা ভয় যেন চেপে থাকে তার বুকটা জুড়ে। একসময় ঠিকই তার চোখ আটকে পড়ে দেয়ালে টাংগানো ছবিটির দিকে।
কাচা হাতের আকা গায়ের ছবিটি ক্রমেই জীবন্ত হতে থাকে তার চোখের সামনে। একসময় পায়ের তলার মাটিতে কম্পন অনুভব করেন তিনি। একহাতে খামচে ধরেন বিছানার চাদর আর এক হাতে ছেলেটির হাত ধরে বুকের কাছে টেনে আনেন। প্রানপনে চেষ্টা করেন চোখের পানি চেপে রাখার। আবেগের জোয়ার বাধ ভাংগার উপক্রম করে। সবার অলক্ষে জানালার কাছে গিয়ে চোখ মুছেন হাসিব সাহেব। হঠাত করেই বুকে জোর পান তিনি। রাশেদের সামনে দাড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলেন, "সব ঠিক হয়ে যাবে রাশেদ মিয়া"
"আমার ছেলের জন্য শুধু দোয়া করবেন।" অস্বাভাবিক শান্ত সুরে কথাগুলো বলে রাশেদ। রাশেদের মানসিক দৃঢ়তায় মুগ্ধ হন তিনি রাস্তায় নেমে সবিস্তারে জেনে নেন রাশেদের ছেলের শরীরের অবস্থা। এরপর তার অটল সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেন রাশেদকে। রাশেদের ছেলের জন্য প্রয়োজনীয় একটি কিডনী আর চিকিতসাবাবদ টাকার সবটুকুই দিবেন তিনি।
কিছুক্ষন নীরবে থেকে রাশেদ বলে, "এরপরও আমি ছেলেকে বাচিয়ে রাখতে পারব তার কোন নিশ্চয়তা নেই"
"শুধু শুধু বিনয় দেখিয়ে লাভ নেই, আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাব না।"
একসময় রাশেদকে জড়িয়ে ধরে হাসিব সাহেব আবেগজড়িতে কন্ঠে বলেন, "দেয়ালে টাংগানো ছবিটা শুধু দয়াভিক্ষে চাইছি আমি।"
"ছবিটা আমার ছেলের হাতে আকা নয়। শুনেছি বহুবছর আগে ঐ কামড়াটিতেই নাকি একটি ছোট্ট ছেলের জীবনাবসান ঘটে জটীল এক রোগে। মৃত্যুর আগে ছবিটি একেছিল ছেলেটি। ছেলেটির বাবা ছবিটা রেখে যান বাড়িওয়ালার কাছে, সেই অব্দি বাড়িওয়ালা যত্ন করে ছবিটা দেয়ালে টাংগিয়ে রেখেছেন। ছবিটি যে দু:খ বয়ে বেড়াচ্ছিল তার ভার বইবার শক্তি ছিল না তার বাবার।" কথাগুলো বলতে বলতে বুকচিড়ে দীর্ঘস্বাস বেরিয়ে আসে রাশেদের।"
"জান রাশেদ, ছোট্ট সন্তান, আর তার হাতে আকা ছবিটির মত মুল্যবান অনেককিছুই হারিয়েছিল তার বাবা, ভুলে বসেছিল সৃতিময় অমুল্য এক স্বর্গীয় সময়কে।"
কিছুক্ষন নীরব থেকে হাসিব সাহেব নরম সুরে বলেন, " জীবনের ব্যস্ততায় ছেলেটির বাবা যে দু:খকে এতবছর ভুলে বসেছিল দু:খটাকে সে ফিরে পেতে চাইছে আবার। ছবিটার সাথে আমার ছেলের সৃতিগুলোও তোমার কাছ থেকে ফেরত চাইছি আমি। আর আমি আমার ছেলেকে খুজে পেতে চাই তোমার ছেলের মাঝে।"
কথাগুলো বলেই ত্রস্ত পদক্ষেপে সামনের দিকে পা বাড়ান হাসিব সাহেব। রাশেদের সামনে চোখের পানি ফেলতে লজ্জাবোধ করে তার। আর পেছনে স্থানুর মত দাড়িয়ে থাকে রাশেদ।
(রিপোষ্ট)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

