আমার নাম লি পেং।
চীনের ক্রমবর্ধিষ্ণু একটিতে শহরে আমার বসবাস। যে শহরটিতে নতুন আনকোরা গাড়ীগুলো হাকিয়ে বেড়ালেও এখন আর কেউ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে না। বাবা মাকে নিয়ে শহরের উপকন্ঠে আমার বসবাস। একটু উচুতে আমাদের ছোট্ট বাড়ীটির আশেপাশে খোলামেলা, বড় বড় অট্টালিকার আড়ালে এখনও হারিয়ে যায়নি। প্রতিদিন সন্ধাবেলায় দুর পাহাড়ের গায়ে সূর্য যখন গা এলিয়ে দেয় আমি ঠায় বারান্দায় বসে তখন প্রকৃতির শোভা উপভোগ করি।
তরুন বয়সী এই আমার জীবনে সবকিছুই আনন্দময় ছিল।
কিন্তু হঠাৎ একদিন জ্বরে আক্রান্ত হলে আমার জীবনের সবকিছুই বদলাতে শুরু করে।
প্রথমে ভেবেছিলাম ভাইরাস জ্বর। সপ্তাহান্তেও জৃর যখন কমল না, আমার বাবা আমায় কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। হাসপাতালে লোকেরা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা সেরে ঐদিনকার মত বিদায় দিল আমায়।এরদুদিন পর আমার জীবনের সবচাইতে বড় দু:সংবাদটি নিয়ে এলেন আমার বাবা। হাতে ডাক্তারী পরিক্ষার কাগজপত্র। আমার মার চোখ বেয়ে অনবরত জলের ধারা বয়ে চলেছিল। আমার বোন ক্যান্সার হয়েছে। শীঘ্রই সারিয়ে তোলার ব্যবস্থা না নিলে মারা পড়ব আমি। আমাদের পরিবারটি সচ্ছল ছিল কিন্তু এই জটীল রোগটি সারাবার মত অর্থসম্পদ আমার বাবার ছিল না। প্রথমেই মা গো ধরলেন বাড়ীটি বিক্রি করে দেবার। বাবা জানতেন এর থেকে যে কয়টি টাকা পাওয়া যাবে তা যৎসামান্য। আমায় সমবেদনা জানাতে পাড়াপড়শিরা এল, আত্মীয়রা এল, এল সহপাঠিরা। অনেকে আবার বাবাকে আশ্বাস দিল বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চালানোর।
জ্বর এবং রোগের অন্যান্য সব উপসর্গে আমার শরীরের ক্রমাবনতি ঘটছিল। ধীরে ধীরে আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম মৃত্যুর দিকে। অর্থ সংগ্রহের বিচ্ছিন্ন সব সংবাদে বাবা মা মাঝে মাঝে উৎফুল্ল হয়ে উঠতেন, কিন্তু তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হত না।
এতসবকিছুর পরও প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধাবেলায় মা আমাকে ধরে নিয়ে বারান্দায় বসাতেন। সূর্যটা যখন তার শেষ আলোটুকু ছড়িয়ে দিয়ে পাহারের ওপারে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেত, আমি আনমনে তাকিয়ে থাকতাম দুরপানে। একসময় বিষাদময় হয়ে উঠত পুরো পরিবেশটুকু। তারপরও কিছু একটা ভালোলাগার অনুভুতিতে মনটা হালকা হয়ে উঠত। আর এভাবেই আমার ভেতরে প্রস্তুতি ঘটছিল যেন সহজেই আমি মৃত্যুটাকে বরন করে নিতে পারি। আমি জানি আমার বাব মার জন্য সহজ ছিল না এই পরিস্থিতির মাঝে স্বাভাবিক থাকা। মাঝে মাঝে তার খুবই ভেংগে পড়তেন। তাদের জন্য এটা মেনে নেয়াটা খুবই কষ্টের ছিল তাদের একমাত্র সন্তানটি তাদেরই সামনে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। মা আমার সবসময় আমার কাছে কাছে থাকতেন। তাকে দেখলে মনে হত তিনি প্রানান্তকর চেষ্টায় রত মৃত্যুর কাছে থেকে তার সন্তানটিকে আগলে রাখতে
এক সন্ধায় মা আমার চোখের আড়াল হলেন আমার জন্য স্যুপ বানিয়ে আনবেন বলে।
যথারীতি আমি তাকিয়ে আছে দুরের পাহাড়গুলোর দিকে। এমনি সময়ে আমার শরীরটা হঠাৎ করেই যেন কেপে উঠল। আমার চেয়ারটাও যেন দুলতে থাকল। মৃত্যুভয়ে মন আচ্ছন্ন হল আমার। ভাবলাম মৃত্যুক্ষনে দাড়িয়ে হয়তবা আমি। মাকে আমি চেচিয়ে ডাকার চেষ্টায় সব শক্তি জড়ো করছিলাম যখন তার চিৎকার কানে এল আমার। মনে হল চেচিয়ে তিনি বারবার একটি শব্দই উচ্চারন করছিলেন। কাছে এলে বুঝলাম শব্দটি ছিল ভুমিকম্প। টের পেলাম শুধু আমি নেই পুরো শহরটা দুলছে। আমার মা দৃষ্টিগোচর হওয়ার আগেই ভারী কিছু একটা পতনের শব্দ হল। আমি জ্ঞান হারালাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

