মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য
উৎস বিচারে মণিপুরী ভাষা মঙ্গোলীয় মহাপরিবারের তিব্বত-ব্রক্ষ শাখার কুকি-চীন গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত।(৩১) মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য অত্যন্ত প্রাচীন। এর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সুদীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ। পন্ডিতরাজ আতোম্বাপু শর্মা, যাকে ড: সুনীতি কুমার চট্রোপাধ্যায় প্রাচ্যের ঋষি অগস্ত্য বলে অভিহিত করেছেন, তার মতে মৈতৈ বা মণিপুরী ভাষার বয়স অন্যুন ৩,৪০০ বৎসর এবং প্রাচীনতার দিক থেকে মণিপুরী সাহিত্যের স্থান ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য কৃষ্ণ-যজুর্বেদের পরেই।(৩২) মণিপুরী সাহিত্য বর্তমানে দ্রুত বিকাশমান এবং পূর্ব ভারতে এর স্থান তৃতীয়, বাংলা এবং অসমীয়ের পরেই।(৩৩)
মণিপুরী ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ যার অধিকাংশেরই বসবাস ভারতের মণিপুর রাজ্যে। অবশ্য মণিপুরের বাইরে ও ভারতের আসামও ত্রিপুরা রাজ্যে, বাংলাদেশ এবং বার্মায় ও বিপুল সংখ্যক মণিপুরী ভাষাভাষীর বাস। যেহেতু মণিপুরই মণিপুরী জনগণের আদি বাসস্থান এবং মূল মণিপুরী জনগোষ্ঠীর বসবাস ও সেখানেই সুতরাং মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিক আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই মণিপুর রাজ্যের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে।
প্রাগৈতিহাসিক কালে বর্তমান মণিপুর রাজ্য অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ইতিহাসের ধারা অনুযায়ীই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলির মধ্যে প্রভুত্ব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এমনি প্রেক্ষাপটে একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসনকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন শক্তিমান রাজা পাখংবা। তার সিংহাসনারোহনকাল ৩৩ খৃস্টাব্দ বলে অনুমিত। সে সময় মণিপুর রাজ্য ৭টি ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। পাখংবার নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোর একীভূতকরণ এবং ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির একক ও সমন্বিত রুপ দেয়অর কাজ শুরু হয়ে যায়। অষ্টম শতাব্দীর দিকে এসে মণিপুর রাজ্য প্রায় তার বর্তমান রুপ পরিগ্রহ করে এবং ভিন্ন ভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠী এবং তাদের বিচিত্র ভাষা ও সংস্কৃতি সমন্বিত হয় জন্ম নেয় মৈতৈ জাতির এবং গড়ে উঠে মৈতৈ ভাষা ও সংস্কৃতি। আর তাই আমরা অষ্টম শতাব্দী থেকেই লিখিত মণিপুরী সাহিত্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। তবে ইতিহাসের গভীর পর্যালোচনা প্রমাণ করে সপ্তম শতাব্দী থেকেই মৈতৈ ভাষা সংহত রুপ লাভ করে। সপ্তম শতাব্দীতে রাজত্বকারী রাজা উরা কোন্থৌবার শাসনামলে চালু করা ব্রোঞ্জ মুদ্রায় খোদাই করা বিভিন্ন বর্ণমালাই তার প্রমাণ। মৈতৈ ভাষার লিখিত রুপের অস্তিত্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে হলেও কথ্য ভাষার বয়স অনেক প্রাচীন।
এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমানে যারা মণিপুরী জাতি বলে পরিচিত বা মণিপুরী ভাষা সাহিত্য ও সাহিত্য ও সংস্কৃতি বলতে বর্তমানে যে ভাষা, সাহিত্য বা সংস্কৃতিকে বুঝানো হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত তা মৈতৈ জাতি, মৈতৈ ভাষা, সাহিত্য বা সংস্কৃতি নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিন্দু ধর্ম প্রচারক কর্তৃক 'মণিপুর' নামকরণের প্রেক্ষিতে বৃটিশদের সংস্পর্শে এসে মৈতৈ শব্দের পরিবর্তে 'মণিপুর' শব্দের নামকরণ ব্যবহার শুরু হয়। এবং সম্ভবত: ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত Capt. George Fordon এর 'A Dictionary in English, Bengali and Manipuri' গ্রন্থই প্রথম মুদ্রিত মণিপুরী গ্রন্থ যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে 'মৈতৈ' শব্দের পরিবর্তে 'মণিপুরী' শব্দ ব্যবহৃত হয়।(৩৪) পরবর্তীতে ১৮৯১ সালে স্বাধীন মণিপুর রাজ্য বৃটিশদের করতলগত হলে 'মণিপুরী' শব্দটি পুরোপুরিভাবেই 'মৈতৈ' শব্দের স্থান গ্রহণ করে। তবে এখানে উল্লেখ্য যে, 'মণিপুরী' শব্দটি ব্যবহৃত হয় 'মৈতৈ' শব্দের সমার্থক হিসেবে। মৈতৈ জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি হিসেবে- কোন রাজনৈতিক জাতীয়তা অর্থে নয়। ফলে মণিপুরে বসবাসকারী অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় 'মণিপুরী' পরিচয় গ্রহণ করেনি- বরং তারা তাদের নিজ নিজ জাতিগত বা সম্প্রদায়গত পরিচিতিই বহাল রাখে। যেমন: মণিপুরে বসবাসকারী নাগা, তাঙখুল, কুকি প্রভৃতি জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ পরিচয়েই পরিচিত হয়ে থাকেন- 'মণিপুরী' নামে নয়। 'মণিপুরী' ও 'মৈতৈ' যে সমার্থক শব্দ এবং মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য বলতে যে মৈতৈ ভাষা ও সাহিত্যকেই বুঝানো হয়ে থাকে তা নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিগুলো থেকে সপ্রমাণিত হবে।
১. 'During the Burmese invasion and the internal troubles which preceeded the advent of the British, many Manipuris settled in cachar and sylhet.. .. in Dacca, they call themselves Maitai or Mitai' (35)
2. 'The Meitheis or Manipuris are the most advanced section of the Kuki-chin people' (36)
3. 'Manipuri/Meitheis both the names referred to one and the same language' (37)
4. 'Manipuri Language means 'Meitei lon' written in Bengali script and spoken by the majority of Manipur population' (38)
5. 'The Meitheis call their language 'Meitai' or 'Manipuri'. This language being the state language of Manipur, is now called simply Manipuri' (39)
সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মণিপুর রাজ্যের রাষ্ট্রীয় ভাষা ও স্বীকৃত মণিপুরী ভাষা বলতে 'মৈতৈ লোন' বা মৈতৈ ভাষাকেই বুঝানো হয়ে থাকে- যা বর্তমানে মণিপুরী ভাষা নামেই সর্ব সাধারণ্যে পরিচিত।
বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় সমাপ্য
:: 'মণিদীপ্ত মণিপুরী ও বিষ্ণুপ্রিয়া বিতর্ক- ইতিহাসের দর্পণে দেখা' - এ.কে.শেরাম এর গ্রন্থ থেকে, পৃষ্ঠা ১৩-১৬। প্রকাশকাল: ২৯ নভেম্বর, ১৯৯৩ ::
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ দুপুর ২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


