গতসংখ্যার পর-
মণিপুরী ভাষা ও সাহিত্য
মণিপুরী সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন হলো 'ওগ্রী'- যা রচনারীতি্বা আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রায়োগিক দিক থেকে একমাত্র বৈদিক স্ত্রোতের সাথেই তুলনীয়। কথিত আছে ৩৩ খৃস্টাব্দে মহারাজ পাখংবার সিংহাসনারোহন কালে সূর্য্য দেবতার উদ্দেশ্যে এই গীতিকবিতাগুলি পঠিত হয়েছিল।(৪০) তবে প্রথম লিখিত সাহিত্যের সন্ধান মেলে অষ্টম শতাব্দীতে মহারাজ খোঙতেকচার শাসনামলে একটি তাম্রফলকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের আবিষ্কৃত পান্ডুলিপির সংখ্যা সহস্রাধিক।(৪১) এগুলোর মধ্যে পোইরৈতোন খুনথোকপা, নুমিৎ কাপ্পা, খোংজোংনূবী নোংগারোন, পোম্বী লুওয়াউবা, হিজন হিরাও, নিংথৌরোল শৈরেং, পান্থোইবী খোঙ্গুল, চায়নারোল, চৈথাবা কুম্বাবা, নাউথিংখোং ফম্বান কাবা, লোইয়ুম্বা শিনয়েন, নেংথৌরোল লম্বুবা, খাহি ঙম্বা, সমসোক ঙম্বা ইত্যাদি উল্লেখের দাবী রাখে। এছাড়া ৩৯০০০ পদ সম্বলিত খাম্বা-থোইবী'র চিরন্তন প্রেমের মহাকাব্য হিজম অঙাংহল এর 'খাম্বা-থোইবী শৈরেং' মণিপুরী সাহিত্যের এক গর্বিত ঐতিহ্য। আধুনিক মণিপুরী সাহিত্যের অনেক গ্রন্থ ভারতের সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারে বৃত হয়েছে। পাচা মীতৈ এর উপন্যাস- ইম্ফাল অমসুং মাগী ইশিং নুংশিৎকী ফি বম, নোংথোম্বম কুঞ্জমোহন এর ছোট গল্প সংকলন- ইলিশা অমগী মহাও, লাইশ্রম সমরেন্দ্র, অশাংবম মীনকেতন, ও এলাংবম নীলকান্ত এর কাব্যগ্রন্থ- মমাঙ লৈকায় থাম্বাল শাৎলে, অশৈবগী নিতাই পোদ ও তীর্থযাত্রা এর কথা উদাহরণ স্বরুপ উল্লেখ করা যেতে পাবে। মণিপুরী ভাষায় প্রথম ছাপানো বই প্রকাশিত হয় ১৮৩৭ খৃস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৮৯১ খৃস্টাব্দ থেকে অদ্যাবধি প্রকাশিত মণিপুরী গ্রন্থের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। স্বকীয় সাহিত্য ছাড়া ও মণিপুরী ভাষঅয় অসুদিত হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত এর মতো কালজয়ী সাহিত্য কর্ম; মেঘদূত, ইলিয়াড, ওডেসীর মোতা ক্লাসিক সাহিত্য; শ্রী মদ্ভগবদগীতা, বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মের বিখ্যাত গ্রন্থাবলী; রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র, টলস্তয়, হোমার, বার্নাড'শ, সোফোক্লিস বঙ্কিম, শরৎ সহ বিশ্বসাহিত্যের মহৎ রুপকারদের অনন্য সব সাহিত্যকর্ম।
মণিপুরী ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। মণিপুরী বর্ণমালার অনুপম বৈশিষ্ট্র হলো এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে মানব দেহের এক একটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নামানুসারে এবং এগুলোর আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য ও দেহের ঐ প্রত্যঙ্গের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যেরই অনুরুপ। মণিপুরী লিপি ব্রাক্ষী লিপি থেকে উদ্ভুত এবং তিব্বতী লিপির সাথে এর সাদৃশ্য স্পষ্ট লক্ষ্যযোগ্য।(৪২) তবে কার ও কারো মতে এই লিপি বাংলা লিপি থেকে উদ্ভুত এবং এর সূত্রপাত ১৭০০ খৃস্টাব্দের দিকে। 'This script probably a descendant of the Bengali character, was adopted aboud A.D. 1700 in the regin of charairongba to Manipuri or Meithei, a kuki-chin speech, which belongs to the tibeto Burman group of Languages.(4৩)' G.H. Damant ও এই যুক্তি সমর্থন করেছেন। আবার T.C. Hodson মনে করেন, মণিপুরী লিপি উদ্ভুত হয়েছে চীন থেকে।(৪৪) কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে মণিপুরী লিপি প্রবর্তন করেন মহারাজ পাখংবা (৩৩-১৫৪)। তখন এর সংখ্যা ছিল ১৯টি। পরবর্তীতে মহারাজ খাগেম্বার শাসনামলে (১৫৯৬-১৬৫১) আর ও কয়েকটি বর্ণ সংযোজিত হয়।(৪৫) মণিপুরী লিপির উদ্ভবকাল নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও এটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, কমপক্ষে অষ্টম শতাব্দীতে, (যদি তার আগে না ও হয়ে থাকে) মণিপুরী লিপি উদ্ভুত হয়েছে। কারণ আমরা সম্প্রতি আবিষ্কৃত অষ্টম শতাব্দীতে রাজত্বকারী মহারাজ খোঙতেকচার শাসনামলের একটি তাম্রফলকের কথা জানি যেখানে মণিপুরী লিপিতে বিভিন্ন বর্ণনা লিখা রয়েছ।
মণিপুরী তথা মৈতৈ ভাষা শতাব্দীর পর শতাব্দীকাল ধরে মণিপুরী রাজ্যের রাজ্যভাষা এবং বিদ্যালয়ের ভাষা হিসেবে প্রচলিত হয়ে এসেছে। এছাড়া ও এ ভাষা বর্তমানে মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লীর সাহিত্য একাডেমী এবং মণিপুর,আসাম, দিল্লী পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত। আকাশবাণী ইম্ফাল সহ আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্রের মণিপুরী অনুষ্ঠানের প্রচার মাধ্যম ও এই মনিপুরী তথা মৈতৈ ভাষা।
অধিকন্তু, গত ২০/০৮/১৯৯২ তারিখে ভারতীয় পার্লামেন্ট এক বিল পাশ করে মণিপুরী ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তপশীলে অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে ভারতের অন্যতম জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
[সমাপ্ত]
:: 'মণিদীপ্ত মণিপুরী ও বিষ্ণুপ্রিয়া বিতর্ক- ইতিহাসের দর্পণে দেখা' - এ.কে.শেরাম এর গ্রন্থ থেকে, পৃষ্ঠা ১৩-১৬। প্রকাশকাল: ২৯ নভেম্বর, ১৯৯৩ ::

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

