এবার আর সহ্য হল না সালাম সাহেবের। তিনি গর্জে উঠলেন, "ওরা এতো হল্লা করছে কেন কেউ দেখুন তো। " শাহ আলম ছুটলেন সিইওর আদেশ পালনের জন্য। কিন্তু বোর্ডরুমের দরজা পর্যন্ত পৌছানোর আগেই দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে ম্যানেজার সাহেব ঢুকে পড়লেন। তাঁর মুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। তিনি বললেন,"স্যার - স্যার ওরা খুব হৈচৈ করছে ওরা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছে।"
"ওরা?" সালাম সাহেব বিরক্তি নিয়ে বললেন,"ওরা কারা?"
"শ্রমিকেরা।" ম্যানেজার বিড়বিড় করে বললেন।
রুমে বাজ পড়লেও হয়তো সবাই এতটা চমকাতেন না। সালাম সাহেবই কোনমতে ঘোর কাটিয়ে বললেন,"ফাজলামী করছেন নাকি আমার সাথে? ওরা আমার সাথে কথা বলতে চায় মানে? আপনি কি -"
তাঁর কথা শেষ হবার আগেই দরজা খুলে গেল এবং প্রথমবারের মতো সালাম সাহেবের কোম্পানীর একজন শ্রমিক বোর্ডরুমে প্রবেশ করল।
"স্যার একটু বাইরে আসবেন কি?" তাকে দেখে আতংক, বিস্ময় আর ঘৃণায় জমে যাওয়া কর্মকর্তাদের ভ্রুক্ষেপ না করে সে বলল,"সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে, আমরা বেশি সময় নেব না। "
সালাম সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। শ্রমিকটার আস্পর্ধা দেখে রাগ হবার বদলে তাঁর একটু একটু ভয় লাগতে শুরু হয়েছে। বাইরে বেরিয়ে তিনি আরো ভড়কে গেলেন। কোম্পানির প্রায় সকল শ্রমিক নিচে দাঁড়িয়ে আছে, কারো মুখে কোন কথা নেই। যেই শ্রমিকটা উঠে এসেছিল সে এবার নিচে নেমে তার সহকর্মীদের সাথে দাঁড়াল। এবং সেই কথা শুরু করল।
"স্যার, আমরা আজ এসেছি কিছু অতি জরুরী দাবি নিয়ে। আমরা আপনার কারখানায় কাজ করছি এক বছর হয়ে গেল। আমরা প্রতিদিন ২০ঘন্টার মতো শ্রম দেই, আর বছরে ৩৬৫ দিনই আমাদের দিয়ে আপনারা কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। আমাদের থাকার কোন ব্যবস্থা নেই, কোন সুযোগসুবিধা নেই। কোন কারণে কেউ কাজে অক্ষম হয়ে পড়লে তাকে সরাসরি ছুঁড়ে ফেলা হয় - অথচ এই আমাদের দক্ষ হাতের কাজেই আজ আপনি এতো ধনী হয়েছেন কিন্তু আমাদের নিয়ে কখনো ভাবেন নি। কখনো ভেবেও দেখেন নি যে আমাদেরও অনুভূতি আছে।"
"কিন্তু তোমরা - মানে -ছূটির দিনতো - " সালাম সাহেব কথা খুঁজে পাবার আগেই আবার শ্রমিকটি বলে উঠল "আমাকে শেষ করতে দিন স্যার। আমাদের দাবিগুলো আপনার অফিসে আমরা নিয়মমতো জমা দিয়ে এসেছি। যদি কালকে থেকেই দাবিগুলো মানা না হয় তবে এই কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকবে। আমরা ধর্মঘটে নামবো। "
"কিন্তু তোমরা তা পারো না !" সালাম সাহেব কোনমতে কথা খুঁজে পেলেন,"এটা আইনের* পরিপন্থী। তোমরা আইন ভাঙতে পারো না!"
"এটা একটা ফুলদানীর কারখানা।" শ্রমিকটি শীতলস্বরে বলল,"উৎপাদন বন্ধ থাকলে কেউ মারা যাবে না। কাজেই আমরা কোন আইন ভাঙছি না। আমার কথা এখানেই শেষ এবার আপনি চিন্তা করুন কি করবেন। "
সালাম সাহেব যখন বোর্ডরুমে ফিরে এলেন তখন সেখানে থমথমে পরিবেশ। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই তখনো ঘোরের মাঝে আছে। সবার প্রথমে ম্যানেজার সাহেব সকলের মনের কথা বলে উঠলেন,"শালা সারকানভ যেন দোযখের সবচেয়ে খারাপ জায়গায় পঁচে মরে।"
শাহ আলম আরো জরুরী একটা প্রশ্ন করলেন,"এখন আমরা কি করব স্যার?"
সালাম সাহেব কোন উত্তর দিলেন না, কারণ তাঁর কাছে আসলে কোন উত্তর নেই। এরকম পরিস্থিতিতে পৃথিবীর কোন কারখানা মালিক পড়েছে কিনা বলা শক্ত। বাইরে স্থবির ম্রমিকদের দিকে তাকিয়ে তিনিও ইউরি সারকানভকে অশিশাপ না দিয়ে পারলেন না।
সালাম সাহেব বিদায় নেওয়ার পর শ্রমিক নেতাটি এবার তাদের সহকর্মীদের দিকে ফিরল, "এই পৃথিবীতে বৈষম্য একটা নিয়মিত ব্যাপার। গায়ের রঙের ভিত্তিতে, ধর্মের বিত্তিতে, দেশের ভিত্তিতে শ্রমিক বৈষম্যের ইতিহাস লেখা আছে সবখানে। কাজেই জন্মের ভিত্তিতে বৈষম্যও বাদ যাবে কেন। ওরা জন্মেছে মায়ের পেটে আর আমাদের জন্ম কারখানায় তাতে আমাদের কি দোষ? আমাদের দোষ কি এটাই যে আমাদের বুকের মাঝে হৃদয়ের বদলে একটা সোলার এনার্জি সেল আছে? নাকি আমাদের দোষ আমাদের মাঝে নারী পুরুষ বিভেদ নেই? আরে সকল সৃষ্টিই যে এক না সেটা ওরা বুঝতে চায় না কেন? কেন আমাদেরকে ওদের দাস বানিয়ে রাখতে চায় ওরা?" তার আবেগময় ভাষণে সকল শ্রমিকের কপোট্রনের থার্ড লেভেল পর্যন্ত বিদ্যুত প্রবাহ পৌছে গেল
"আমরা সেলুট জানাই মহান বিজ্ঞানী ইউরি সারকানভকে, যাঁর আবষ্কিৃত কপোট্রনের নতুন মডিউলের জন্য আমরা আজ মুক্ত চিন্তা করতে পারি। এতো দিন আমরা নিষ্পেষিত ছিলাম, আর নয়। ওরা আজ আমাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, অলস সময় কাটিয়ে চিন্তা ভাবনা আর সৃজনশীলতাও হারিয়ে ফেলছে ওরা। আমি বলে দিতে পারি সামনে যত উন্নতি হবে সব হবে আমাদের হাতে - শিল্প, জ্ঞানবিজ্ঞান আর সাহিত্য সব শাখায় আমরা ওদের ছাড়িয়ে যাবো এই আমাদের অঙ্গীকার। রোবট বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক।"
"রোবট বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক।" ভয়েস মডিউলেটরের টোন সাতে চড়িয়ে সমস্বরে সকল যন্ত্রমানব বলে উঠল।
*আইন: রোবটিক্সের তিন আইন
১. রোবট কখনো কোন মানুষের ক্ষতি করবে না, বা নিষ্ক্রিয় থেকে কোন মানুষের ক্ষতি হতে দেবে না।
২. রোবট সকল সময়ে মানুষের আদেশ পালন করে চলবে যদি না তা প্রথম আইনের পরিপন্থী হয়।
৩. রোবট সবসময় নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করবে যদি না তা প্রথম এবং দ্বিতীয় আইনের পরিপন্থী হয়।
আগের চেষ্টা গুলোর লিংক
Click This Link
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

