আমার প্রিয় পোস্ট
- ইউটিউবের ভিডিও ডাউনলোড করুন
- মুয়ীয মাহফুজ
- গল্পঃ মুখোমুখি, বেড়ালের পাশে বসে - মোস্তাফিজ রিপন
- কেউ নই শূন্য মাতাল - রেটিং
- সান্ধ্য-মৌনতা ও ছায়া-অন্ধকার জটিলতা - সুতরাং
- পাবেলা নেরুদা: জীবন ও বাস্তবতা পেরিয়ে ১০৪.... - রহমান মাসুদ
- জল প্রিজমের গান - মৃদুল মাহবুব
- চার পাঁচ হাজার পিঁপড়ার দুঃখ - সরকার আমিন ১৯৬৭
- কঙ্কাল - মাজুল হাসান এর তাগাদায় পোষ্টাইলাম - সারওয়ার জামান চন্দন
- অচেনা বন্দরের প্রতি প্রেম হলো আবিষ্কারেচ্ছার জনয়িত্রী - মুজিব মেহদী
- বিবাহিত প্রেমের কবিতা - সরকার আমিন ১৯৬৭
- বাংলা বই এর সাইট - মাহবুব জামান আশরাফী
- সবার জন্য দরকারী কিছু ওয়েবসাইট এর ঠিকানা - রন্টি চৌধুরী
- মির্জা গালিব : : গালিবের একটি চিঠি - ইমরুলকায়েস
নথাল
১৫ ই মে, ২০০৮ রাত ১২:১৪
বিহানবেলা জলজ্যান্ত রোদ দেখে কে বুঝেছিল বেলা দ্বিপ্রহরে আকাশ কালো করে মহারাজার লেঠেলের মতো ফরমানি বাতাস সব কালো মেঘেদের কয়েদিবৎ হাজির করবে হঠাৎপাড়ার আকাশে? উত্তর-দক্ষিণ পুব-পশ্চিম সবদিক থেকে খসে-গলে ঝরে পড়বে পেরেক বৃষ্টি!
তবলার লয়-এ শেলের মতো এখন শিল পড়ছে, সত্যি পড়ছে—স্কুল ঘরের চৌচালা চালে, আমন খেতে, সবে দুধ আসা ধানে। হাঁপানি রোগীর পাঁজরার হাড়ের মতো বেঁকে যাচ্ছে বাঁশথোড়ার মাকলা বাঁশগুলো, পাশের বারোমাসি পেয়ারা গাছটা... বাতাসে লক্ষকোটি হাপরের শ্বাসটান। ইস্রাফিল বোধহয় শিঙায় ফুঁক দিয়েছে! পতন শব্দ... চাপা পড়ে যাচ্ছে গোঙানির পেছনে। ছাঁট-দৃষ্টির ক্ষীণতায় আঁকাবাকা আইলগুলো, ব্লক বসানো বাধটা উবে গেছে; শূন্যতায়...নিঃসীম জলজ জলরঙে।
—আসল ব্যাপারখান্ কি? আকাশত্ গুলি ঠুকিল কাঁয়?
... ফিরতি পথে একটা ইউরিয়ার বস্তা মাথায় চাপিয়ে ভাবতে থাকে খদেজা। কিছুদিন, মানে মাঝারি পূর্ণিমার পর থেকে তার হাবভাব আউঠাট কিসিমের। ...ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি... নয়তো প্রজারা এসে বসে থাকবে। প্রজা বলতে দুটো কাঠাবিড়ালী। আর পাশের বাড়ির দুমসো মোরগ; খদেজা ওটার নাম দিয়েছে মোড়ল। ওরা বিশেষত: মোড়ল একটু বেশি সাহসী। ডাকলেই আসে। নির্দ্বিধায় হাত থেকে খুদি-কুঁড়া খেয়ে যায়...কুটকুট।
সময় যত ডিগবাজি দিতে থাকে আতশবাজির মতো একটা বর্ণচ্ছটা এসে ততো দখল করে খদেজার উড়ু-বিড়ু মন। সে মহারানি কলবতী হয়ে উঠে। সেই কলাবতী-! জানো না? কলাবতী বৃষ্টিকে শাহি ফরমান শোনায়—‘বৃষ্টি কান্না থামাও-সবুজ ধুয়ে যাচ্ছে; মাটি ধুয়ে চলে যাচ্ছে সোঁদাল গন্ধ’। থামেক বৃষ্টি, আইজকা তোর ছুটি... আজকার মতন্ পড়া শ্যাষ। ঢং ঢং ঢং... কাছে দূরে বাজ পড়ে; দ্রিম! কেপে ওঠে লেবু বাগানের নব্যকিশলয়।
একদিনে জনম হলি বোইন দুইজন
মাও আছে বাপ নাই বিধাতার গড়ন
দুই কন্যার এক নাম এক ঠিনায় ঘর
ছোটবেলা থেকি কাপড় মাথার উপর—
সময়টা ছিল নাতিশীতোষ্ণ, মাঝে মাঝে উদাসী চৈত্রের তাপ। মাটি থেকে ভাপ উঠছিল। শৈবাল ঘাম জানতে শিখেছে শরীরের বাড়ন্তী জোয়ার, ভক-ভক করে উঠে আসে উলটোমুখী দুটো কলস। বুকে ভার লাগে। ভার লাগে, ভালও। নিজেকে মহারানি কলাবতী মনে হয়। প্রথম যেদিন দুপুরের ভ্যাপসা-চড়চড়িয়া রোদে কণ্ঠ ভাসিয়ে খদেজা ডেকেছিল—“কুনঠে মোর সৈন্য সামন্তরা?” একটা কাঠবিড়ালী নেমে এসেছিল রাধাচূড়ার গন্ধ বেয়ে। খদেজার বাবা খইল্লা মিয়া সাথে মা ফিরজা সমস্বরে হা-হা করে ওঠে—জিন ধরিছে! জিন ধরিছে! পরে অবস্থা খারাপের দিকে না যাওয়ায় আর মাহান ডাকা হয়নি। “জিন হইলেও পরহেজগার জিন”! খদেজার গুটানো, অহংকারী, নির্লিপ্ত ভাব দেখে দুজনেই রায় দিয়েছিল শেষে।
সে খুব সাবধানে থাকে—যদি কেউ ...যদি কেউ ...; সে যে স্বয়ং মহারানি কলাবতী! অনিশ্চিত দোলনা, দোলাচালা বয়স কথা বলে মেপে-মেপে; মুখে-ইঞ্চি টেপ ফেলে। ডায়াবেটিক রোগীর পথ্যের মতো পরিমাণ মতো হাসে। কেবল আকলিমার বাপকে দেখলে আড়মোড়া ভেঙে সে খদেজা হয়ে ওঠে। একটা দমফাটানো হাসি তাকে শূন্যে তুলে ছোট্ট খুকির মতো লোফালুফি করে। অনেক চেষ্টা তদবিরের পরেও একটা মিটামিটিয়া ঘাসফড়িং তিরতির হাসে। খদেজা মহারানি কলাবতীকে তার হাসির কারণ ব্যাখ্যা করে—
—আকলিমার বাপতো পুব পাড়াত বিয়া বসিবা যাইয়া ডাং খ্যাইছে। দে ডাং—পান্ঠির বাড়ি। যেংকা বাও তেংকা ছাও-। আবার হাসে...হাসির পরে আসে হুল ফোটানো ক্ষোভ—
এই তো আজও আকলিমার বাপ আর বিয়াস্তা বড় ভাই রশিদের চোখে উড়ছিল চিল-শকুন, জিবলা থেকে বিড়ির ধোয়ার সাথে টপাস টপাস ঝরছিল ভাইদ্রমাসি নেড়িকুত্তা। দু-বছর বয়সী পালেস্টারের কামিজও তালে তাল দিয়ে খামচে ধরেছিল খদেজার বাড়ন্তী বুক। “বোইন দুইজন”... দ্যাখিলে তো আর খয়া যাবি না—কলাবতী ওদের পাত্তা দেয় না। আগে পিছে অদৃশ্য হাতিরা চলে; ভিতরে দুরু দুরু নয়াল হরিণী।
ক্যানরে বড়ুয়ারে গারুর ক্যানে এতো দেরি
শালী নাইটনীক সাজাইতে হয়া গেইল দেরি
—দেরি কইল্যু ক্যানে? খইল্যা মিয়া খদেজাকে জিজ্ঞেস করে অস্থির ভাবে-
—যেই ঝড় বাদলা শুরু হইল গ্যাইল! ক্যাং করি আসিম?
—এলা ক্যাং করি আসিলু? স্বরে সরব শ্লেষা খইল্লার-
খদেজা রা’কাড়েনা। ঘরে ঢুকে দেখে চৌকিতে নতুন বৌয়ের মতো টুমটুম বসে আছে ফোঁপানি কান্না। ফিরজা কাঁদছে।
—কি হইল ফের, মা বারে কান্দেছি ক্যানে?
ফিরজাকে গোঙ্গাপীর ধরেছে। ‘চুলা’ত হাড়ি চড়েনি’.. এংকা সময়... বাপুক ক্যাং করি কও কাথা খান?”
আরেকবার ভাবতে হয় খদেজাকে।
—এত্তকরি কহিনু মানুষটাক্ চলো বাহে বন্ধেত য্যায়া উঠি... ছ্যাওয়াখান্ মোর পানিত ডুবি মারিল্। ফিরোজাকে গোঙ্গাপীর মুক্তি দেয়।
খদেজা খেয়াল করে দেখেছে যেদিন হেসেলে আগুন হাসে না সেদিনই ফিরজা মৃত ছেলের জন্য কাঁদে। হায়রে অতীত, সোনালি স্বর্ণলতিকা অতীত। হায়রে ব্যাটা ছাওয়া! ছেলে যেন সঞ্জয়, সেই সঞ্চয় চুরি করেছে কোন সিঁধেল চোর?
বড় নোক গরিব হইলে কিনিবা জানে না ধান
ছোট নোক ধনী হইলে কিনিবা পারে না পান
খাইল্লা কি বুঝবে খদেজার সলজ্জ অপমান? —“কি কহিবে বাপু”?
সবকিছু ঠিক চলছিল। শহর থেকে বড় অফিসার এসেছিল আজ। সুন্দর পিরান-স্টকিন পরা খইলকা মাছের মতো টিকাল নাক প্রত্যেক কাসে গিয়ে উপবৃত্তির টাকা দেয়া দেখছিল স্বচক্ষে। মজিদ মাস্টর ডাকে—“ওল নাম্বর এ——উবিনা খাতুন”... রুবিনা এগিয়ে গেলে খইলকামাছের কঙ্কাল আঙুল বাড়িয়ে দেয়-“এই নেও সাড়ে সাতশো টাকা”... সাড়ে সাতশো! বাপুক্ সাড়ে চাইরশো দিলেই হই যাবি। বাকি তিনশো... তিনশো টাকা খদেজার...! তৎক্ষণাৎ সচল হয় গনিতশাস্ত্র। এত টাকা দিয়ে কি করবে সে? মনেমনে চিতই পিঠা ফুলে ওঠেছিল। কিন্তু চিতই পিঠা পুড়ে গেছে—খইল্লা কি বুঝবে? এক সাথে দুই স্কুলের ছাত্রী—বাড়তি সাবধানতায় বাবার নামটা বদলে একটু ছোটবড়ো করে দিয়েছিল সে। খইলকা মাছ চলে গেলে মজিদ মাস্টার সবাইকে দিয়েছিল ঐ সাড়ে চারশো করেই। সবাই টাকা পেয়েছে কেবল খদেজা ছাড়া। বাপের নাম চট করে মনে আসেনি। মওকা পেয়ে মজিদ মাস্টার কদবেলের মতো গাল করে বলে
— “তোর বাপের নাম খলিল মিয়া ? তাইলে এ্যইন্না যে লেখা আছে জলিল মিয়া...হে-হে-হে.. তোর মাও তো খোউব ...” অনুচ্চারিত অশ্লীল ইঙ্গিতের তীর খদেজার কানমুখ রক্তাক্ত করে তোলে। খইল্লা মিয়া কি বুঝবে? জানতে পারেবে? বাজান তুই মোক বাঁচা বাজান, মোক কউয়া-চিলা ঠকরাই খাছে ... বাজান! মোক বাঁচা বা’!
উপবৃত্তির টাকা দেয়া শেষ হলে মজিদ মাস্টার নিজেই খদেজাকে ডেকে নিয়েছিল খেজুর গাছতলার তার রুমে। বাইরের খেজুরগাছটা খদেজার শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়। খোঁচার যন্ত্রণা!
—ইস্কুল কমিটি জানা পাইছে তুই দুই স্কুলত্ পড়িস। বড় আপা তোক পুলিশদি’ ধরে দিবা চাহিছেলো। মুই কঁহো... নে ঠেলা। শেষমেষ মুই মানা করিনু। মজিদ ফিসফিসিয়ে বলে
—তোমার বাড়িত খোউব টানাটুনি ন-ওয়? সাজবেলা মোর বাড়ি আসিছ। ক-ত-ত ট্যাকা নাগিবে তোর?।
খদেজার হাতের পিণ্ডিটাতে গোল গোল ঘুরে নারিকেলকোরা আঙুল।
কিচ্ছুটি বলেনি সে। দৌড়। ভোঁ দৌড়। পথে ঝড় বাদলা ; শিলা। পৃথিবীটা কাদায় ভরা, পিছলা, আইলগুলো সরু, মাঝে মাঝে পানির নীচে তলানো ; পলিল। মাও - মোক ধরেক। মা, মুই পিছলি পড়েছো; মা—ওমা ..।
ইল্লত যায় না মইলে
খাসলত যায় না ধুইলে
—টাকালা’ দে। খদেজার কাছে টাকা চায় খইল্লা মিয়া
—“না বারে টাকা দে’ নাই——একটা অজানা আতঙ্কের ঢেউ গলা দিয়ে নামে খদেজার—
—টাকা দেয় নাই? (নিশ্চয়তা সূচক ; দ্বিরুক্তিসূচক বাঁক্য)
—না— (কম্পমান, মৃদু ছোট্ট। অথবা বড় বিধাতার চেয়েও , শ্লেষময় পিচ্ছিল সত্য)
ঘুরে ফিরে খইল্লা কচকচি কড়ির কথায় আসে।
—ঠিক করি কহেক টাকা দে নাই? না তুই তোর নাংগক্ টাকাদি’ আইছি?
কড়া কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় খদেজা—
—মুই দুই দুই স্কুলত্ পড়... তার বাজে টাকা দে নাই।
—মজিদ মিয়াক মোর কাথা কহিছিলু? বাঁচের কঞ্চি তিরতির কাপে।
—কি বলবে খদেজা? কি বলবে? খদেজা নিশ্চুপ। ও এখন পুরোপুরি কলাবতীর দখলে। চোখ দুটো রাসসাগরের জলের মতো সুনীল সুস্থির, স্বচ্ছ স্ফটিক বালি দুলছে নীচে। কাছের জিনিসগুলো কেমন ফিকে ঝাপসা। শ্বাসের বাতাসে শেকল বেঁধে কে যেন টেনে ধরছে ধুকপুক হৃদশব্দ। কানটা বোধির, ওখানে ঢুকে পড়েছে স্নানশৃঙ্গার গোলাপজল—নয়তো একডেলা প্যাককাদা।
আঙিনায় নেমে খদেজা উশখুশ...আসমানে সেঁটে যায় বিষ্ময়ের চোখ। তখনই গিরগিটির মতো রং বদলে নেয় কুড়ির ফাঁদে আটকা-পড়া আলো; মেঘের আলোয়ান। এলানো আসমান। বিপ্তি ধোয়ারু মেঘগুলো থেকে ভুলকি দেয় একটা বিরাট চান্দা মাছ। কানসায় একটা বড় নোলক। লোকে ভুল জানে... রামসাগরে মহারাজপুত্র নয় আত্মাহুতি দিয়েছিলেন স্বয়ং মহারানি কলাবতী! তারপর থেকে কী আশায়, অতিপ্রাকৃত যুক্তিঅভিলাশে প্রত্যেক পূর্ণিমার রাতে একটা চান্দা মাছ ভু-স্-স্-স্ করে ভেসে ওঠে রামসাগরের জলে। নাকে থাকে কলাবতীর বিরাট নোলকটা। প্রায়শ ওকে আকাশে আবিষ্কার করে খদেজা। কলাবতী চান্দামাছের ভেস ধরে নামিয়ে দেয় আষাঢ়িয়া দেয়া, অকাল বর্ষা, শিলা খণ্ড। আইলশা থেকে, নোলকের হিরার ঝলকানিতে আকিবুকি হয় বিজলি-শেকড়। বড় কষ্ট তার। কারন নোলকে শেকল বাঁধা আছে... উড়ছে কিন্তু নিজের ইচ্ছেয় নয়। হেঁচকাটানে কানকা থেকে পিচকারীর মতো ছিটকে পড়ে তপ্ত লউ। সূর্যের তেজ কমছে - লাল পোঁচ খাওয়া সূর্য।
বাঁশের থেকে কঞ্চি দড়
পাত্তা কাঁপে থর থর —[/si]
কথাটা শোনার পর থেকে খইল্লা মিয়া চইত্ মাসি বাতাসের মত গুম। আঙিনার নীচে খাটিয়ার চৌদিকে উড়ছে বিকট তামাকী ঘ্রাণ; বিড়ির পাছায়-মুখে সঞ্চালিত আগুন। জিউ পুড়ে পুড়ে জমছে অম ছাই। মাগরিবের আজানের শেষ সুরের হাইফেন বিরতিতে খইল্লার হেঁড়ে-গলা গজরায়
—খদেজা! খদেজা! কুনঠে গেলুরে বজ্জাত মাগি?
শুকনো গলা, চোখ। নাকের সিসকিনি ঝড়ে পচনী মদের গন্ধ মেখে
—খ-দে-জা? এলাও যাইনি?
আগিলা-পাছিলা কিছু না বুঝে ঝাপসা চোখ জাফরানি আলোর ঝাপসা ছায়ায় মিলিয়ে যায়।
—কুনঠে যাম?
—মজিদ মাস্টার যাবা কইছে ন্যা? যা কেনে, মাস্টার বোধয় বিত্তির টাকা উঠাই খুইছে। যা কেনে মা... হেড়ে গলা সুর হয়ে ঝরে। তেলতেলে পিচ্ছিল সুর।
কখন যে, ফিরোজ পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে খদেজা মালুম পায়নি; হাতের কুলায় ভেল্টে পড়ে আছে ইরির খুদি, মাউড়িয়া...।
—যা মা বাড়িত্ এনা ফুটা কুড়িও নাই। ট্যাকালা পাইলে...। একটা জলশ্বাসী দীর্ঘশ্বাস আছড়ে পড়ে খদেজার পিঠে; গরম-ভ্যাপসা পাট-পচানী বাতাস ...মাও তাইলে সউক জানে! খদেজার গলায় পুঁটি মাছের কাটা গেতে থাকে। আকাশটা কেমন রক্তের মতো লাল। বাজান মোক কাউয়া চিলা ঠকরায়! মা মুই পিছলি পড় মা! না-না। কলাবতী চেঁচায়...নাথ্ আমাকে বিসর্জন দিয়ো না। তোমার ঠোঁটে এখনও আমার চুম্বন রেখা মিলিয়া যায়নি।
ঈশ্বর মারা গেলে তিন ঠেঙা কুকুরের মতো সময় এগোয়। কলার থোড়া থেকে শ’ শ’ জোনাক জিগায়—“যাছি কুনঠে? যাছি কুনঠে?” অংপুরিয়া ফারুক মেম্বারের ছেলে মিরাজ ,পথ আগলে ধরে প্রিন্টের শার্ট। স্বর্ণের চেইন ঝিলিক দেয়। “মিরাজের কাছে গেলে কেমন হয়?” —খদেজা ভাবে। পরক্ষণে... “কাশ-টেন পড়া ছাত্রী ক্যাং করি যায় এইট-ফেল চেংড়ার গোড়ত্?”—কলাবতী নাকচ করে দেয়। কোথাও একটা জলা আছে থৈ-থৈ!
সে হাঁটছে। নন্দীর পিসির খাঁকারি—“কাঁয় যায়? নন্দী নেম্পোখান আনেক তো?” বাধের ছককাটা লুডু—, কামাইলের ফিরতি পথ, ঝিঁঝির আর্তদৃষ্টি বাঁচিয়ে... যে সবুজ ধান গাছগুলো চিতয়ে ছুঁয়ে কলাবতী সবুজ হয়ে উঠত, তারা এখন অন্তঃসত্ত্বা... পাতার ধারে তালু কেটে যায়। মজিদ মাস্টারের বাড়ি আরো আধ-মাইল, কাশীপুরের বগলে কদমতলীতে। কোন ঘর তার? চিৎকার শোনা যাবে বাইরঘর থেকে? কে করল তার এমন সর্বনাশ? “ ট্যাকা নিবার তনে ন-ওয়; মজিদ চোষ্ঠাত্ থেকি খালি হারামিটার নাম শুনি আসিম—কলাবতী মনস্থির করে। একটা দোলনা তবু দুলতে থাকে খড়গের মত। কারো সাড়া পেয়ে কলাবতী নেমে আসে বিঘত পানির জমিতে; ছড়াৎ শব্দে গুঁড়ো হয় সপ্তমী চাঁদ, চাঁদোয়া জায়নামাজ। পা দেবে যাচ্ছে। যেন ফোরল ডোবা হচ্ছে। মাটির পাতিলে তেল-হলুদ পানিতে মিশিয়ে ভাসানো হয়েছে কয়েকটা টকটকে লাল শাপলা; সাথে আট-দশটা দেবদারুর ঝিঙ্গাসদৃশ পাতা...নববধুর মতো উলখড় দিয়ে সাজানো ফোড়ল। এই পুরো জমিন যেন একটা ফোড়ল। পরীা করা হচ্ছে বিবাহিত-বন্দি বাতাস কতটুকু অক্সিজেন পাবে!
এখন কলার ভেলায় ফোড়ল ভাসিয়ে মাটির ডিয়ার চাপানো হবে। যত ভার সহ্য করে ভেসে থাকবে ফোড়ল - ততই বর কনের মনের মিল, হবে সমৃদ্ধ আগামী, আগামী প্রজন্ম। মসিময় ফসলি ফোড়লে মাটির ঢেলার মতো খদেজা নিজেকেই তুলে দেয়। ফোড়ল ডুবে যাচ্ছে - দেবে যাচ্ছে... কেউ বুঝছে না। সকলেই; খইল্লা-ফিরজা-মোটকী স্কুলআপা গেয়ে যাচ্ছে ফোরল ডোবা বিসর্জন সংগীত...
চলো আইয়োলি ফোড়ল ডুবাবা
থাইকি আইয়োলিও
চ্যাংড়া আঁচলাদ ভোক্ষে হয়রান হয়
কি আইয়োলিও.....
হঠাৎ বৃষ্টি নামে। উড়ো মেঘের বৃষ্টি। ফিরজা কুলায় খুদি ঝাড়ে ঝমঝম। বাঁশের ব্যাংকে খদেজা নিজেই ফেলছে চারানি-আটানি। দুটো রাস্তা চলে গেছে—কদমতলী আর নিমতলী। নিমতলী থেকে লেজকামড়ে ট্রেন যায় কাউনিয়া, পার্বতীপুর, ঢাকা। বুক, কুচকি, চুল—ভিজে যাচ্ছে উপবৃত্তির টাকা। ওগুলো খদেজা লুকাবে কোন কোটরে? বিষ্টি! মন্নের বিষ্টি!
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হইয়াও হইল না শেষ —
শেষ হইয়াও হইল না শেষের মতো খদেজার গল্প কখনই শেষ হয়ে গেছে। গল্পের ক্যারাভান গুটিয়ে ফিরে আসছি নগর জঙ্গলে। পথে, সাভার নবীনগরের কোন গার্মেন্টস ফেকট্রির সামনে শ’ তিনেক লোকের দঙ্গল। ওদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে খাইরুন, নীরু, শাবানাদের। আজ দুপুরে কোন মেয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে শরীরে দাউ দাউ করে দেশলাই ঠুকে দিয়েছে। পুড়ে ছাই পাটের চুল, তালপাতার আটটা-রাত দশটা রুটিনের শরীর।
ঘটনা অনুসন্ধানে জানা গেল, স্টোর কিপারের চোখ বাঁচিয়ে মেয়েটি ওদের তলার এক লাইন ম্যানকে নিয়ে ঢুকে পড়েছিল স্টোরে। কাপড়ের রোল, স্টেক লাগানো কার্টুনের আড়ালে মেয়েটিকে বাৎস্যায়নের আসনে ছেলেটির উপরে সঙ্গমরত অবস্থায় ধরা হয় হাতেনাতে। ওর কাছে পাওয়া গেছে চুরি করা দেড় গজ বিদেশি কাপড়। কী সাংঘাতিক! চুন্নি মেয়ে! বদের হাড়ি!
ঈষাণে শো-শো বাতাস দিচ্ছে। সূর্য গুটিয়ে নিচ্ছে শেষ বিকেলের সিন্দুরী উপস্থিতি পাখির কলতানের মতো। মৌ মকিার মতো বিন বিন বাজছে নানান টুকরো কথা—শরিল থাইক্যা দূরো খাড়ো। গরম লাগতাছে
নাজু, শেফালি—এই যে বোনটি এইদিকে...। সব কণ্ঠগুলো ঘুরছে—কক্ষপথে। নীরু-শাবানা ঘরে বার বার বলে যাচ্ছে কক্ষপথ বিচ্ছুরিত গুঢ় কথা—
—ওয় তো এই মাস থেকি অন্য ফ্রেকট্রিত কাম নিছে। মোক কহিল : দুই মাসের ওভার টাইম উঠাবার তনে আইজ এই ফেকট্রিত আসিপে।——ওয় চুরি করে নাই—মাইরি, চুরি করে নাই। মাইরি খালা ...
পুলিশ-সিকিউরিটি-বয়বাবুর্চি-ওয়ার্কার-অন্য ফেকট্রির ওয়ার্কার। জটলা বাড়ে, ঘাস বাড়ে, বাঁশ বাড়ে... বাড়তে থাকে। জটলার মাঝ থেকে একখানা আধলা-ইট উড়ে এসে ছত্রখান করে ফেলে জানালার কাচ। কেউ একজন চেঁচিয়ে ওঠে—“শ্রমিক হত্যার বিচার চাই। আরো গভীর জটলা থকে ঝড়-কবলিত নাবিকের কণ্ঠ ভেসে আস্তে—“সুময়মতো বেতন চাই”। চুপলকে মেয়েটার শরীরের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে জটলায়। তারপর মাঠে, ঘাটে...বেঁচে যাওয়া বনদেবীর আস্তানায়। ভাওয়াল বনে...
ভাটির আকাশে তখন সহস্র নিযুত মেঘেরা পুঞ্জীভূত স্কেচ আঁকতে ব্যস্ত। নিগুন্তি চান্দামাছ খলবলিয়ে ওঠে। নোলকে বাধা ঝনঝন শেকল ছিঁড়ে তারা উড়তে থাকে লালিমায় রত্তি-রত্তিতে; দখল করে সকল নীলিমা। ঝুপ করে আঁধার নামলে বিউগলে, ফেকট্রির কিংবা ইটভাটার চিমনি উগলে বেরিয়ে আসে করুণ, বিধুর উচ্ছ্বলা কয়লা-পোড়া স্বপ্নসংগীত...
গুয়া কাট চটিয়ে চটে
পান বা বরইর কুশি
কি চলো রে নীলমন মধু আঁজায় দ্যাশে
মধু আঁজার দ্যাশে গেইলে
মা বলিমো কারে ? ... বাপ বলিমো কারে?
কি চলোরে নীলমন মধু আঁজার দ্যাশে...
পুনশ্চ: আত্মঘাতিনী মেয়েটির নামও ছিল খদেজা।
সততার আলো বলেছেন:
হুহ.....+
লেখক বলেছেন: হুম..
ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: হে লেখাটা একটু বড়ই।
এটা ছাপা অক্ষরে আমার প্রথম গল্প। এরপর অনেক লিখেছি.. কিন্তু এটার প্রতি এক অদ্ভূত মায়া কাজ করে। তাই শেয়ার করলাম।
লেখক বলেছেন: কি খবর ফারহান? আজকাল খুব দেখা যায় না?!
অন্যরকম। কথা বুননে মুন্সিয়ানা আছে!
কেমন আছেন মাজুল?
গত সপ্তাহে এক দিন মাত্র ব্লগে উঁকি দিয়েছিলাম। অসুস্থ ছিলাম একটা দুর্ঘটনাজনিত কারণে। দু'দিন হাঁটতে বসতে ঘুমাইতে খুব কষ্ট হয়েছিলো।
'টিকি' কি বুঝি নাই?
লেখক বলেছেন: টিকি মানে সব চুল চেচে ফেলে পেছনে লম্বা একটা লেজের মতো চুলের ফোয়ারা রাখা।
আপনি কি সত্যি টিকি'' কি জানতেন না?![]()
তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠেন। শুভ কামনা।
রাশেদ বলেছেন:
পুরাটা পড়লাম। অনেক শব্দই বুঝি নাই। কিন্তু থিমটা ধরতে পারছি। এতেই আমি খুশি। এখন প্রশ্ন হইলো নথাল মানে কি?
লেখক বলেছেন: নথ> নথাল> নথপরিহিতা
আমি শব্দটা বানাইছি। একটু লেখকের স্বাধীনতা নিছি.. আর কী।
আন্দালীব বলেছেন:
একটু সময় নিয়ে আসতেছি...
লেখক বলেছেন: মোস্ট ওয়েলকাম।
লেখক বলেছেন: কাছাকাছি গেছেন। ভাষাটা দিনাজপুরের পশ্চিমাঞ্চলের, বিরল-কাহারোল, কালীগঞ্জের। আসলে রংপুর ও দিনাজপুরের ভাষায় অনেক মিল। তারপরেও কিছু ফারাক তো আছেই। বিশেষতঃ একসেন্টে।
রাশেদ বলেছেন:
নথ মানে কি!!
লেখক বলেছেন: নাকের গয়না। বড় আংটির মতো, যাকে নোলক বলে।
আপনি কী বুদ্ধু!![]()
কৈথ্ থেইকা ভুলকি দিয়া বারাইলেন অহন? যারা ব্লগে আছে... দেখলাম, আপনার নাম তহন দেহি নাই।
সব ঠিক তো?
লেখক বলেছেন: আমি খদেজাকে মারিনি। আর এই খদেজা যে সেই খদেজা তাও বলি নাই।
বিষয়টা এইরকম... সামন্ত ব্যবস্থা থেকে খদেজারা বেরিয়ে আসতে পারে না। অথবা পারলেও পূজির বাজারে আবো অসহায় তারা।
আর মৃত্যু তো এক ধরণের প্রতিবাদ।
রাশেদ বলেছেন:
হা হা! আমি জানুম কেম্নে এত কিছু! আমার সাইধারন জ্ঞাণ মেলা কম! হে হে! আছি ভালৈ। তবে লৌড়ের উরপে আছি।
লেখক বলেছেন: কি কন্? ভাবি জেদ করে না নোলকের লাইগা?
অহন তো দারুন চল্ শুরু হইছে নোলকের!
নাকি আপনে খাটকাটা পাবলিক?
খাটকাটা'র গল্পটা জানেন তো?![]()
রাশেদ বলেছেন:
আপ্নে কি বাংলাদেশে থাকেন?
লেখক বলেছেন: শত ভাগ। ঢাকায় থাকি।
বেবি রহমান বলেছেন:
পুরা বিষয়টা তাহলে মার্কসবাদীদের সাহিত্য প্রজেক্ট হয়ে গেলো না?
লেখক বলেছেন: এইটাকে প্রজেক্ট বলা উচিৎ হবে না। কারণ কোথাও এই বিষয়টাকে মূখ্য করে তোলার চেষ্টা ছিলো না। আর এমন ঘটনা তো ঘটেই। আমি তো ইউটোপিয়া লিখি নাই।
আর সাহিত্য সাহিত্যই। সেখানে মতাদর্শ ফলানোর সচেতন চেষ্টাকে আমি ষড়যন্ত্রের মতো নিন্দোনীয় মনে করি।
ধন্যবাদ আপনাকে।
লেখক বলেছেন: আহারে.... বিদেশ-বিভুই খালি খালি লাগে।
তসলিমা নাসরীনের একটা কবিতার বইয়ের নাম আছিলো...খালি খালি লাগে।
তাড়াতারি লাড্ডু খান দোয়া করি।![]()
![]()
![]()
লেখক বলেছেন: হাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহহাাহাহাহাহাহাহাহাহহাাহাহাহাহহাহাহাহাহাহাহাহাহাহহাহাহাহাহহাহাহাহাহাহাহাহাহহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাহহাহাহাহাহাহহাহাহাহাহাহহাহাহাহাহাহাহাহাহাহাাহহাহাহাহাহাহাহাাহহাহাহাহা
দেইখেন শেষে, আকাশ থেইকা হুর-পরি না নাইমা আসে!
নুরের চোটে কয়লা অইয়া যাইবেন!
![]()
![]()
![]()
![]()
লেখক বলেছেন: তথাস্তু!
মনোবান্ছা পূর্ণ হোক!
রাশেদ বলেছেন:
আপ্নে কি facebook এ আছেন?
লেখক বলেছেন: না দিলেও সমস্যা নাই গন্ধ্য শুইকা চইলা আসমু।
ভুকভুক প্রজাতির কীনা!![]()
শুভ কামনা
হে ফেসবুকে আছি। name: majul hassan
google-e surch dile paben.
প্রণব আচার্য বলেছেন:
হুম!
লেখক বলেছেন:
খুব বেশি তাড়া আছে কি?
লেখক বলেছেন: নাই কাজ তো খৈ ভাজ অবস্থা, মজনু ভাই।
অবশ্যই মেইল করবো।
আমার টিকি পাওয়া যাচ্ছে
প্রথমে টিকিটা বুঝি নাই কারণ আপনি গহনে গহনে সাঁতার কাটার কবি তো তাই
লেখক বলেছেন: টিকির দেখা আর কৈ পাইলাম?
মন্তব্য লিখে দেখি আপনি আর ব্লগে নাই।
এখনো অসুস্থ নাকি?
রেটিং বলেছেন:
ওরে বাবা কি কঠিন ভাষা, অনেক কথাই বুঝি নাই, আন্চলিকতার জন্য। থিমটা বুঝেছি, তয় আবর পড়তে হইব ভালো কইরা বুঝার জন্য। জমাইয়া রাকলাম।
লেখক বলেছেন: হে একটু বড়ই হযে গেছে।
ভাবছিলাম পাট বাই পাট দিবো। কিন্তু তাতে আসলে জমে না। তাই একবারেই দিলাম।
কস্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।![]()
লেখক বলেছেন: )![]()
![]()
![]()
সত্যি বলেন তো, ভালো লাগেনি, তাই না?
সামনে ভাল লেখার চেষ্টা করবো।
সুরিজত স্বপন বলেছেন:
ভালো লাগলো।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: কি খবর আপনার?
রাশেদ বলেছেন:
কই হারাইলেন!
আন্দালীব বলেছেন:
স্যরি, এতো দেরী হবে বুঝিনি। নেট এর কাছেই আসার সুযোগ হয়নাই এই কয়দিন। সেদিনই পরে পড়া হয়েছিলো। গদ্যের চেয়েও গদ্য লেখার ভঙ্গীটি বড়ো ভালো লেগে গেলো।
মাজুল, আমি আসলেই আপনার লেখার ভক্ত হয়ে যাচ্ছি।
আপনি দুর্দান্ত লেখেন।
সুলতানা শিরীন সাজি বলেছেন:
কেমন আছেন বাহে?অংপুড়িয়া ভাষাত্ গল্পখান পড়নু।
ভালো থাকেন ............
শুভেচ্ছা।
মাজুল হাসান বলেছেন:
রাশেদ এইত ফিরে এলাম ....আন্দালীব আমারে টুকা মারে সরপুটরি মতও...
সাজির বাড়ি কি ভাওয়াইয়ার দেশে?

















1.jpg)
